মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

অমর মিত্রের গল্প অলীক ক্রন্দনধ্বনি

 রিনি বুশরার সঙ্গে কমলের দেখা ফেস বুকে।কমল মধ্য বয়সী। মধ্য বয়সে  এসে আন্তরজাল আর ফেসবুকে তার নেশা হয়ে গেছে। সারাজীবনে এত সফল পুরুষ আর এত রূপবতী নারীর মুখ সে দ্যাখে নি। এত নারীর সঙ্গে কথাও বলে নি কমল।  বরং তার একটি গোপন আক্ষেপ ছিল। স্ত্রী নুপুর বাদ দিয়ে তার আর কোনও বান্ধবী নেই এমন যার সঙ্গে কিছু কথা শেয়ার করা যায়। এ জীবনের সফলতা আর ব্যর্থতার কথা শোনাবে তাকে। সে জানে তার সমস্ত কথা সে নুপুরকে শোনাতে পারে না। আবার নুপুরেরও নিশ্চয় তেমন কিছু কথা আছে, হতাশা আছে, অপূরণ সাধ আছে যা সে নিজের কাছেই রেখে দেয়।  সুতরাং ইন্টারনেট ফেসবুকের পৃথিবী তাকে টানবে।
টানবে সেই তুলোর কারবারিকে যেমন ক্ষুধিত পাষণ টানত ঘুঙুর আর যুবতী কন্যাদের খিলখিল হাসি ফিসফিসানি নিয়ে। তেমনি ভাবেই টানে কমলকে ফেসবুকের নারীদের মুখ, নানা বিভঙ্গ। হাসি বিষণ্নতা, অশ্রু সজলতা—সব।  কমল নিজের প্রোফাইল ছবিতে এক পুরোনো দিনের স্বল্পখ্যাত চরিত্রাভিনেতের ছবি লাগিয়েছে। তাঁকে এখন সবাই ভুলে গেছে। তাঁর সেই ছবি কয়টিও ভুলে গেছে। টেলিভিশনে তা দেখান হয় না। কমল সেই তিনটি ছবির নায়ক অঞ্জনকুমারের ছবি পেয়েছিল ইন্টারনেটেই। চুরুট মুখে বেশ ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক চেহারা তাঁর। অঞ্জনকুমারের আসল নাম ছিল আরসাদ আলি। হিন্দি ছবি করেছিলেন তিনি বোম্বে টকিজের হয়ে।  সে হল কমল ধরের জন্মের আগের কথা। পারটিশনের পর আরসাদ আলি ওরফে অঞ্জনকুমার চলে যান পাকিস্তানে। গিয়ে হারিয়ে যান। পাকিস্তানে গিয়ে আর সুবিধে করতে পারেন নি। হয়ত পেরেছিলেন। কিন্তু ইন্টারনেট উইকিপিডিয়াতে অঞ্জনকুমার সম্পর্কে বিশেষ কিছু পায় নি কমল। ইউ টিউবে তাঁর কোনো ফিল্ম পায় নি। কিন্তু এই ছবিটা পেয়েছিল বম্বে টকিজের উপর একটি লেখায়। যাই হোক সেই প্রোফাইল ছবিতে কমল যেন আরসাদ আলি ওরফে অঞ্জনকুমার হয়ে গেছে। সে নিজেকে অমন করে তুলেছে। কমল তার নামটি দিয়েছে  অঞ্জনকুমার বসু। অঞ্জনকুমার বসু আবার তার যৌবনকালের কবি বন্ধু। সে আত্মহত্যা করেছিল। কমল ব্রহ্ম ফেস বুকে অঞ্জনকুমার বসুকে বাঁচিয়ে তুলেছে। অঞ্জন কিন্তু ছিল সুদর্শন। কিন্তু সে তো ২৫ বছর আগের কথা। অঞ্জনের ফোটো কি সুদেষ্ণার কাছে পাওয়া যাবে? সুদেষ্ণা ছিল অঞ্জনের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। কিন্তু বিয়ের চার মাসের মধ্যে সে অঞ্জনের  বন্ধু তৃণাঙ্কুরের সঙ্গে চলে যায় বিজয়নগর। সেই কর্ণাটক। এখন ফিরে এসেছে কলকাতায়। অঞ্জন সেই ঘটনার অপমানে ঘুমের বড়ি খায় গোটা চল্লিশ। বিয়ের আগে থেকে অঞ্জনের সঙ্গে সুদেষ্ণার সম্পর্ক ছিল। আর তৃণাঙ্কুরের সঙ্গে আলাপ বউভাতের দিনে নববধূ হয়ে। পৃথিবী কী অদ্ভূত! অঞ্জনকুমারের ছবি দিয়ে অঞ্জনকুমার বসু ফেসবুকে আবির্ভূত হতেই না হতে সুদেষ্ণা চৌধুরীর কাছ থেকে এসেছিল বন্ধুতার অনুরোধ। মনে রেখেছে ? ওকি জানে না ও হত্যা করেছিল এক কবিকে। এই সময় হলে ঝড় উঠত। খবরের কাগজে রসাল স্টোরি বেরত। তখন সব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল নানা কুটকচালির ভয়ে। কেন তৃণাঙ্কুরের সঙ্গে পালিয়েছিল সুদেষ্ণা ? অঞ্জনের কি শারিরীক অসুবিধে ছিল ? তিন বছর প্রেম করে কি তা টেরও পায় নি সুদেষ্ণা ? নাকি সুপুরুষ তৃণাঙ্কুর তাকে আকর্ষণ করেছিল প্রবল। আচমকা আসা পাহড়ি নদীর হড়কা বানের মতো ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল? কী হয়েছিল তা জানে সুদেষ্ণা আর তৃণাঙ্কুর। তৃণাঙ্কুরের কোনো ফেসবুক আছে কিনা জানে না অঞ্জন, সে সারচ করে দেখেছে কুড়ি একুশ জন রয়েছে  ঐ নামে। তৃণাঙ্কুর চৌধুরী। তৃণাঙ্কুরের চেহারা তার মনে নেই। তাই চিনতে পারে নি আদৌ কোনজন সে হবে। সুদেষ্ণা তার বন্ধু হয়েছে, কিন্তু দূরে দূরে থাকে। অঞ্জন হয়তো এখন তার ঘুমে স্বপ্নে হানা দেয়। সে চাইছে হয় তো অঞ্জন তার সঙ্গে কথা বলুক। তাকে ডাকুক। কিন্তু কমল ব্রহ্মর একটা দুঃখ আছে, রাগ আছে ওই সুদেষ্ণার প্রতি। সে কী ভয়ানক সাহসে ছেড়ে গেল অঞ্জনকে চার মাসের মাথায়। কাম শীতল বা নপুংসক হলেও তো কদিন দেখে চেষ্টা করে তারপর ফিরে যায়। অনেক সময় থেকেই যায় সঙ্গে। সারা জীবন।  সুদেষ্ণা সময় নষ্ট করে নি। আর তা না হলেও যদি প্রবল আকর্ষণ বোধ করে থাকে সে তৃণাঙ্কুরকে প্রথম দেখেই, সাহসে ভর করে সমাজ তুচ্ছ করে তার হাত ধরে কর্ণাটক চলে গিয়েছিল। এখন আবার তার মনে হয়েছে ভুল করেছিল, তাই মৃত অঞ্জনের কাছে আসতে চাইছে।
      তার ফেসবুকের বন্ধু খুলনার  রিনি বুশরা বলল,  বন্ধু তিনি হয় তো সত্যিই ভুল করেছিলেন, তাই ফিরতে চাইছেন, তুমি তার সঙ্গে কথা বলো।
       রিনি জানে সে অঞ্জন বসু। রিনিকে সবটা বলে নি অঞ্জন। কিছুটা বলেছে। রিনি যদি জানে তার নাম অঞ্জন নয়, অঞ্জন একটা ফেক আইডেন্টিটি, তাহলে রিনি তাকে ত্যাগ করে যাবে। এমন কি ব্লক করে দিতে পারে। তখন সে রিনিকে আর দেখতে পাবে না। অথচ এই বছর বাইশের কন্যাটি তার খুব বন্ধু হয়েছে। এমন বন্ধু পেয়ে সে এই বয়সে আপ্লুত। মেয়েটির ভিতরে আছে এক স্নিগ্ধ রূপ। ঈষৎ লম্বাটে মুখ, টানা টানা দুটি চোখ, তার ভিতরে আবছা নীলকান্ত মণি। গোলাপি ঠোঁট, ছোট চিবুক আর তীক্ষ্ণ নাসা। অঞ্জন ওরফে কমল ব্রহ্ম  নিজেই তাকে বন্ধুতার অনুরোধ জানিয়েছিল। সে  গ্রহণ করেছিল পরদিনই। আসলে রিনি বুশরার সঙ্গে বন্ধুতার আর এক উদ্দেশ্য ছিল অঞ্জনের। তার পৈতৃক ভিটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা জেলার সাতক্ষিরে। সে ফেসবুকে খুঁজে খুঁজে সাতক্ষিরের মানুষ বের করে বন্ধু করে খোঁজ নেয় তার পিতৃপুরুষের গ্রামের। রিনি রিনি তুমি তো সোনাডাঙায় থাকো, তুমি কি সাতক্ষিরে চেন ?
    রিনি বলল, আপনে মুন্সিগঞ্জ চিনেন স্যার?
    মুন্সিগঞ্জ, সে কোথায় ?
    ওই সাতক্ষিরে উপজিলায়, সেখেনে আমার মাসির বাড়ি, নানাঘর।
    আমি সেই ছোটবেলায়, ১৯৫৮য় যখন চার বছর বয়স, তখন চলে এসেছি, আমি কী করে চিনব, আমি শুধু চিনি ধূলিহর, মানে গ্রামের নামটি জানি, আর আছে অস্পষ্ট স্ম্রৃতি
     রিনি বলল, মাকে আমি জিজ্ঞেস করব।
      এই ভাবে আলাপ হয় তাদের সঙ্গে। রিনি ঠিক একটি সময়ে অন লাইন হয় ওদের দেশে তখন সাড়ে দশ। সে দশটার সময় সে ডিনারে বসে মা বাবার সঙ্গে। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে ফেসবুকে আসে। কম বয়সীরা রাত জাগতে ভালবাসে। অঞ্জন ওরফে কমলও তাদের আকর্ষণে রাত জাগছে এখন।
    রিনি এক কন্যা। তার আর কোনো ভাই নেই। কমল ব্রহ্ম তার রাত সোয়া দশটায় হাজির হুয় ফেসবুকে। রিনি আসে। না আসতে  পারলে আগে জানিয়ে দিয়ে যায় ইন-বক্সে মেসেজ পাঠিয়ে। তাদের যা কথাবার্তা ইন-বক্সে হয়। মেসেজে মেসেজে। দুজনে একসঙ্গে অন-লাইন হলে, তা ঠিক এক আড্ডায় পরিণত হয়। রিনি কমল ব্রহ্মকে মানে অঞ্জন বসুকে জিজ্ঞেস করেছিল, হাউ ওল্ড আর ইউ স্যার, এই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোটো তো এখন হয় না, এখন তো সব কালার, এটা কি আরকাইভ থেকে বের করে এনেছ ?
     রিনি খুব বুদ্ধিমান। অবশ্য সন্দেহ করে নি যে ছবিটি তার নয়। কিন্তু অনেক আগের ছবি যে তা ধরে নিয়েছিল। শাদা কালো ছবির যুগ বহুদিন চলে গেছে। তার বাবার অমন একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোটো আছে বাড়িতে। মনে হয় অঞ্জনস্যার তার বাবার বয়সেরই হবে।
       হ্যাঁ, এটা পুরোনো ছবি। স্বীকার করেছিল কমল ব্রহ্ম, যখন আমি ২৭ বছর।
       ওয়া, কী হ্যান্ডসাম ছিলে তুমি স্যার, আই ডোন্ট ওয়ন্ট টু সি ইওর প্রেজেন্ট পিকচার, আমার বাবার মতো হয়ে গেছ ঠিক তুমি, দ্যাট ওল্ড অ্যান্ড কঞ্জারভেটিব ম্যান, আমি আমার পেরেন্টসের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না।
    কী চমৎকার তার কথার বাঁধুনি। তার সঙ্গে কথা বলতে কমল ব্রহ্মের খুব ভাল লাগে। পাকিস্তানের মেয়ে সোমায়া আখতার তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। আর খুলনার মেয়ে রিনি বুশরা হয়ে গেছে তার বন্ধু। অঞ্জনকুমারের বন্ধু। অঞ্জনকুমার কবিতা লেখে। কী কবিতা ? মৃত কবি অঞ্জনকুমারের কবিতার বই যত্ন করে রাখা ছিল তার কাছে। সেই বইয়ের কথা সবাই ভুলে গেছে। অঞ্জন ছিল অতি সাধারণ কবি। মাঝে মধ্যে দু-একটি ভাল কবিতা সে লিখেওছিল। সেই বই থেকে একটি-দুটি কবিতা সে রিনির মেসেজ বক্সে দিয়েছে। তাতে রিনি আপ্লুত। একজন কবি তার বন্ধু, এর চেয়ে বড় কথা কী হতে পারে ? ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোটো কবির ভিতরে এনেছে এক প্রাচীন নিস্তব্ধতা
    এখনো কি শাদা কালো ছবি হয় না, হয় তো। অঞ্জন ওরফে কমল ব্রহ্ম বলেছিল।
     হয় কি না কে জানে। রিনি বলেছিল, বাট হলেও তা রেয়ার বন্ধু।
    আসলে সে ফেস বুকের অনেকের কাছেই ওই ছবির ভিতর দিয়ে ২৭-২৮-এর যুবক হয়ে গিয়েছিল। তরুণী, কিশোরীরা তার বন্ধুতা প্রার্থনা করছিল প্রতিদিন ৫-৭জন।  তার যৌবনের মানে ৪০-৫০ দশকের সেই ব্যর্থ নায়ক অঞ্জনকুমারের যৌবনের আগুন প্রার্থনা করছিল কেউ কেউ। একটি পাকিস্তানি কন্যা সোমায়া আখতার তাকে লিখেছিল, আই লাভ ইউ অঞ্জনকুমার, লাভ ইউ, লাভ ইউ, ইউ আর সো বিউটিফুল, আই ওয়ান্ট ইওর ডার্কনেস।
     ডার্কনেস, অন্ধকার ! তার অন্ধকার চায় সে। অথচ অঞ্জনকুমার, আরসাদ আলি তো তার দেশে গিয়েই হারিয়ে গেল। সে খুব চেয়েছিল আরসাদ আলি মানে অঞ্জনকুমারের সঙ্গে নানা কথা শেয়ার করতে। করেছে কমল ব্রহ্ম, কিন্তু একটি জায়গায় গিয়ে মনে হল সে ঠকাচ্ছে বছর উনিশের সে মেয়েটিকে। মেয়েটি সত্যি অঞ্জনকুমারের প্রেমে পড়েছিল। বলত তার সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করবে। কমল ব্রহ্মকে সে লিখেছিল তার ইন-বক্সে কত রকম কথা। প্রেমের সে কত রকম বহিঃপ্রকাশ। শেষে নিজেকে উজাড় করে নিবেদন করতে চাইল সে। নিজের নিলাজ ছবি পোস্ট করল তার মেসেজ বক্স-এ। তখন ষাট ছুঁই ছুঁই কমল ব্রহ্মের মনে পাপ বোধ এল। বুঝতে পারছিল পাকিস্তানি কন্যা সোমায়া আখতার প্রকৃত প্রেমে পড়েছে এক অলীক পুরুষ অঞ্জনকুমার বসুর প্রতি। তাকে কখনো হাই বাসু মাই লাভ, কখনো হাই আঞ্জান মেরি জান বলে সম্বোধন করছিল। কমল তাকে ব্লক করেছে তাকে বাঁচাতেই। অলীক এই ভুবনের অলীকতার থেকে তাকে মুক্তি দিতে নিজে অদৃশ্য হয়েছে তার কাছ থেকে। তাকে নিজেও সে আর দেখতে পাবে না।  
      রিনি বলল, বন্ধু, তুমি যদি এদেশে আস, আমাদের বাড়ি এস।
    হ্যাঁ যাব, যাব তো নিশ্চয়।
    নো নো, না বন্ধু এস না, তাহলে তো ২৭ বছরের তুমি আসবে না, দ্যাট গ্রেট টাইম ইস নাউ ফিনিসড।
     তাই হবে রিনি, কিন্তু রাজকন্যে তোমায় যে একবার দেখব আমি।
     আমি রাজকন্যে বুঝি ?
     তাই তো।
     কিন্তু এই রাজকন্যেকে দেখলে যে তুমি রাজপুত্তুর বুড়ো হয়ে যাবে এক লহমায়, যৌবন নিয়ে সে দেখতে পাবে না, আর রাজকন্যেও তার দিকে ফিরে তাকাবে না
     কী সুন্দর বললে তুমি রিনি, রূপকথা।
     তুমি তো রূপকথার রাজপুত্রের মতো কবি, আগে জন্মালে তোমায় পেতাম, হা হা হা।
      রিনি খুব খোলা মেলা আবার সম্ভ্রমের বাইরে কথা বলে না। বলল, আমার নানা, মায়ের বাবা বলত, আমি কেন আগে জন্মালাম রিনরিন, তাহলে তোকে নিয়ে পালিয়ে যেতাম।
     রিনির কাছে অঞ্জনকুমার বসু একদিন কথায় কথায় বলল, সেই কথা। সুদেষ্ণা তাকে ছেড়ে চলে গেছে সেই কথা। কেন যে বলল, আসলে দুজনে কথা বলতে বলতে প্রমিস করেছিল যে যার প্রেমের কথা বলবে। রিনিকে একজন প্রোপোজ করেছিল, রিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সে ফিরে গেছে নিজের গ্রামে। খুলনা কলেজে পড়তে এসেছিল সে মাগুরা থেকে। এখন কদিন রিনির খুব মন খারাপ করছে তার জন্য। কান্না পাচ্ছে। না সে ফেস বুকে নেই। রিনির কথা শুনে অঞ্জন ওরফে কমল ব্রহ্ম জিজ্ঞেস করে,  তাহলে তখন তাকে না করেছিলে কেন ?
      জানি না অঞ্জন জানি না, তখন কলেজের এক অধ্যাপক আমায় প্রোপোজ করেছিলেন, বাংলার স্যার নয়িমউদ্দিন,  তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন, আসলে চট্টগ্রামের লোক, টল অ্যান্ড ফেয়ার, খুব ফর্শা, আমি সেই সময় সাধারণ চেহারার জালালকে রিফিউজ করি, অপমান করেছিলাম, বামন হয়ে চাঁদ ধরতে চাও তুমি জালাল, বাট মাস ছয় বাদেই শুনলাম নয়িম ম্যারিড, নয়িমুদ্দিন স্যার, ইস, কী আঘাত পেয়েছিলাম,  হি কিসড মি, টাচড মি বন্ধু, বলতেই গা ঘিনঘিন করছে, জালাল চলে গেছে বাড়ি, একজাম শেষ, আমি আঘাত পেয়েছিলাম খুব, নয়িম চট্টগ্রামে গিয়েছিল বিয়ে করতে, নতুন বউ বাড়িতে আর আমাকে কোয়ার্টারে ডেকে আদর করতে চাইছে, হায় আল্লাহ, কেমন ইবলিশের মতো লোক সে।
      এমন হয়, জীবন এমনি, খুব কষ্ট পেয়েছ তুমি রাজকন্যে, কিন্তু সারাজীবন যদি কষ্ট পেতে ওই প্রতারকের হাতে পড়ে।
       তা জানি বন্ধু, কিন্তু এতদিন বাদে জালালের কথা মনে পড়ছে তোমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর, কদিন ধরে শুধু তার জন্য কান্না পাচ্ছে কেন পোয়েট ?
        তুমি তাকে ভালবাস তাই।
        ভালবাসি তো তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম কেন ?
         হয়তো ভেবেছিলে তার চেয়েও তুমি ওই নয়িমকে ভালবাস বেশি।
         আমি কি আমার মনকে বুঝতে পারি নি?
          তখন কমল ব্রহ্ম বলেছিল সুদেষ্ণার কথা। অঞ্জনের আত্মহত্যা বাদ দিয়ে সব। তারপর বলল, এতদিন বাদে সে ফেস বুকে অঞ্জনকুমার বসুর বন্ধু হয়েছে।
            সত্যি ?
            হ্যাঁ সত্যি।
            সে কী বলে?
              কিছুই বলে না, শুধু নিজের ওয়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
              চ্যাট করতে আসে না, হ্যালো, হাই বলে না ?
              না, দূরে দূরে থাকে।
              ইস তুমি আর বিয়ে কর নি সত্যি ?
              না, আমি সুইসাইড করতে গিয়েছিলাম, c
              হায় আল্লাহ, অঞ্জন তুমি এত কষ্ট পেয়েছ, সে আবার এল  কেন?
              কমল ব্রহ্ম বলল, জানি না।
             আমার মতো হয় তো, মানুষ শুধু কষ্ট পায় অঞ্জন।
        তা কেন, কতজন সুখেও থাকে। কমল ব্রহ্ম বলল, বিয়ের চার মাস কাটে নি সে চলে গেল, এতকাল বাদে তার আর কী কথা থাকতে পারে অঞ্জন বোসের জীবন শেষ করে দিয়ে।
        সে তো ভোলে নি তোমাকে ?
        না, কিন্তু করুণা করতে এসেছে মনে হয়।
        রিনি বলল, কিন্তু সে গিয়েছিল কেন?
         আমি জানি না।
         না, তুমি জান, মনে করে দ্যাখো।
          আমি জানি না রিনি।
         তুমি খুব জান অঞ্জনকুমার বসু, তুমি তো তারপর আর বিয়েই করলে না।
          ঘেন্নায়। অঞ্জন বলে।
          কতদিন থাকে ঘেন্না !
           অঞ্জনকুমার বসু চুপ করে থাকে। এই রিনি বুশরার কাছে সে ধরা পড়ে যাচ্ছে যেন। রিনি বলল, তুমিই জান কেন সে চলে গিয়েছিল, বল জান কি না?
           কমল ব্রহ্ম শুনেছিল ভাসা ভাসা। অঞ্জন বলে নি, বলেছিল তার আর এক বান্ধবী চন্দ্রা। সে এখন ইউ,কে তে। সে বলেছিল, অঞ্জন এক ট্রাজিক ক্যারেকটার, সে কেন গিয়েছিল বিয়ে করতে, আমি ওকে বারণ করেছিলাম।
            রিনি বুশরা তাকে ডাকল, বলল, সি ইজ কারেজাস লেডি, সি কুড ডু ইট, সে পালাতে পেরেছিল, তাই না।  
        কমল ব্রহ্ম বলে, এতে অঞ্জন যে কষ্ট পাচ্ছে, তুমি তাকে কষ্ট দিচ্ছ রিনি।
         তুমি তার কথা তুললে কেন বন্ধু, মেয়েরা কি সুখে থাকে, সে এই কাজ করে লুকিয়ে তোমার শহরে এসে ফিরে যেত বিজয় নগর, তাই না?
         আমি জানি না।
          তুমি সব জান মিঃ বাসু, জান না কি?
          না, আমি জানি না রিনি।
          ওক্কে, তোমাকে বলতে হবে না, আমি এখন নানির কাছে যাব, আমার মায়ের মা।
          তিনি কোথায় থাকেন?
           আমাদের বাড়িতেই, বাট, থাক, তুমি জান না আমি যখন সেই জালালের জন্য কাঁদি, নানি আমাকে বলেছিল, নানি সারাজীবন কেঁদেছে তার হাজব্যান্ডের জন্য।
           এ তুমি কী বলছ রিনি ?
            ইয়েস, দিস ইজ দ্য ফ্যাক্ট, আমার দাদু, আমার মায়ের বাবা ইসলাম নেন অ্যাট দ্য এজ অফ ফোরটি ফোর,  বাট আমার নানি নেয় নি, বড় মাসি দীপালি নেয় নি, আমার দাদু আর তাঁর দুই মেয়ে ইসলাম নেয় আফটার দ্য লিবারেশন অফ বাংলাদেশ, আমার মায়ের তখন দশ আর ছোট মাসির ছয়, মামা ছিল না, ইন্ডিয়ার রিফিউজি ক্যাম্পে মারা গিয়েছিল, নানি বলে, সে খুব সুন্দর ছিল, কলেরায় আর এক মাসিও মারা গিয়েছিল রিফিউজি ক্যাম্পে, হেল্লো, তুমি শুনছ ?
      শুনছি রিনি।
      রিনি বুশরা যার কথা বলছে সে পদ্মাবতী, তার নানি। পদ্মাবতী এক মেয়ে  আর এক ছেলে হারিয়েছিল বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় অঞ্জনের দেশের রিফিউজি ক্যাম্পে। পরপর। সারারাত কোলে মরা সন্তান নিয়ে বসে ছিল। আর তার নানা, কৃষ্ণ মিদ্দে বসে যত ঠাকুর দেবতা ডেকেছিল। যুদ্ধ শেষ হল। তারা ফিরে এল পোড়া ভিটেয়। পাঁচ সন্তান নিয়ে গিয়েছিল, তিন সন্তান নিয়ে ফিরল। নানা কৃষ্ণ মিদ্দে কেমন হয়ে গেল। শেষে কিনা ইসলাম নিল শোক থেকে বাঁচতে। তার দুই সন্তানের জন্য কত প্রার্থনা করেছিল নাকি। কিন্তু নানি বেঁকে বসল। নানি আর বড় মাসি রাজি হয় নি, নানা আর তার দুই নাবালিকা মেয়ে ইসলাম নিল। এক বাড়িতে থাকল বটে, কিন্তু নানির কান্না আরো বেড়ে গেল। নানি সেই যে কান্না শুরু করেছে, তা আর থামে নি। আমরা মুসলমান, নানি সনাতন ধর্মে রয়েছে। মাসির বিয়ে হয়েছে মুন্সিগঞ্জে হিন্দু ঘরেই। নানি বলে কলেরায় তখন সে আর তার বাকি তিন মেয়ে মরে নি কেন, শুধু লোকটা বেঁচে থাকত।
         তুমি সত্যি বলছ রিনি ?
          আমার কথা কি মিথ্যে মনে হয় তোমার ?
          না রিনি না।
           নানা মরে গেছে তিন বছর আগে, তখন নানি তার শাঁখা ভেঙে সিঁদুর তুলে বিধবা হয়েছে, তার শ্রাদ্ধ করেছে বড় মাসির বাড়িতে, ইসলাম মতে আমরাও করেছি তার কাজ, কিন্তু নানি এখনো কাঁদে, তুমি কী বলবে ?
       অঞ্জনকুমার নিশ্চুপ। রিনি বলছে, নানির কান্না থামে নি। কেন সেই লোক ধর্ম ছেড়ে গেল, কেন গেল? রিনি আজ মুন্সি গঞ্জে যাবে, অম্বুবাচির জন্য নানির হাতে টাকা দিতে। ফল কিনে দিলে যদি না খায় ? রিনি গেলে বুড়ি আনন্দ পায় আবার রেগেও যায়। আবার চোখ দিয়ে অবিরাম জল ফেলে যায়। নাতনিকে নিয়ে শুতেও ভয় হয় তার। কি জানি কী হয়। নিজের দুটো তো মরেছিল ক্যাম্পে। নাতনির যেন ক্ষতি না হয়। সেই ছেলেবেলা থেকেই কোলে নিতে ভয় পেত। হায় আল্লা ! নানি তার খুব কষ্ট পায়। নানার কোনো কষ্ট ছিল না। অঞ্জনকুমার তোমার সুদেষ্ণা সারাজীবন ধরে কাঁদছে তো, তুমি কি জান তা?
     অঞ্জনকুমার বসু চুপ করে থাকে। রাত এখন অনেক। কমলের বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে। নিস্তব্ধ অন্ধকারে কমল ব্রহ্ম কান্নার শব্দ শুনতে পায়।   তার ল্যাপটপ ভেদ করে মিলিত কান্নারশব্দ ভেসে আসে। সে দেখল সুদেষ্ণা চৌধুরী অন লাইন। রাত এখন অনেক। সে ডাক দিল এই প্রথম, হেল্লো।
      হেল্লো, সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পায় সে, অঞ্জন, আমি কাঁদছি অঞ্জন, যেদিন গেলাম সেদিন থেকে কাঁদছি অঞ্জন, আমি না গেলে তুমি বেঁচে থাকতে তো অঞ্জন।

       কমল ব্রহ্ম কী করবে এখন, কান্নার সঙ্গে কান্না জড়িয়ে দিতে লাগল। মিথ্যে পরিচয়টি তার কাছে সত্য হয়ে ঊঠতে লাগল ক্রমশ। সে অঞ্জনকুমার বসু হয়ে যেতে যেতে অশ্রুপাত করতে লাগল মধ্য নিশীথে।



পরিচিতি
অমর মিত্র

জন্ম :৩০ আগস্ট, ১৯৫১
বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কাছে ধুলিহর গ্রামে | বিজ্ঞানের ছাত্র | কর্ম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক দপ্তরে | তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।]
প্রকাশিত বই
পাহাড়ের মত মানুষ, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, অর্ধেক রাত্রি, ডানা নেই উড়ে যায়, ধুলোগ্রাম, অশ্বচরিত, আগুনের গাড়ী, ধ্রুবপুত্র, নদীবসত, কৃষ্ণগহ্বর, আসনবনি, নিস্তব্দ নগর, প্রান্তরের অন্ধকার, ভি আই পি রোড, শ্যাম মিস্ত্রী কেমন ছিলেন, গজেন ভূঁইয়ার ফেরা, জনসমুদ্র, সবুজ রঙের শহর, সমাবেশ, সারিঘর, সুবর্ণরেখা, সোনাই ছিলো নদীর নাম, হাঁসপাহাড়ি।
পুরস্কার : সাহিত্য একাডেমী।

1 টি মন্তব্য:

  1. জড়িয়ে গেলাম গল্পের সঙ্গে। কী অনবদ্য... !

    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন