মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

অমর মিত্রের গল্প অলীক ক্রন্দনধ্বনী নিয়ে আলোচনা

শমীক ঘোষ

অমর মিত্র ভারতীয় ভাষার লেখক। তাঁর সাথে আমার সখ্যতা প্রগাঢ়। খুব নিকট জনের লেখা নিয়ে লিখতে যাওয়া বিড়ম্বনা। কারণ তাতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা লেগে থাকে। অমর মিত্রের “অলীক ক্রন্দনধ্বনী” আপাত অর্থে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখা নয়। কিন্তু তাঁর ইদানিংকালের লেখার মত এই লেখাটিও বহুস্তরের। একটা লেখার পরতে পরতে আলাদা আলাদা স্তর, আবার সেই স্তরগুলো পরস্পরকে নিয়ে একটা অবিভাজ্য একক। অমর মিত্রের লেখা উদার অর্থনীতি, ইন্টার্নেট, সোশাল মিডিয়া উত্তর জমানার মানুষের পোস্ট মডার্ণ অন্ধকারের ভাষ্য। “অলীক ক্রন্দনধ্বনী” ও তাই।

কমল ব্রহ্ম একজন মধ্যবয়সী আটপৌরে সাধারণ মানুষ। আর দশজনের থেকে কোন অর্থেই আলাদা নয়। যাঁর নারীসঙ্গ স্ত্রী নুপুরেই আবদ্ধ। সেই কমল আলাদা হতে চায়। নিজেকে নিয়ে নির্মাণ করতে চায় আলাদা মিথ। সেও চায় হিরো হয়ে উঠতে। ফেসবুকে কমল তাই নিজের নাম নেয় অঞ্জনকুমার বসু। অঞ্জনকুমার বলিউডের এক স্বল্পখ্যাত অভিনেতা, যিনি আসলে পাকিস্তানি আরসাদ আলি। তাঁর কথা কেউ মনে রাখেনি এই ইনফরমেশন এজ-এ। উইকিপিডিয়া তাই নিরব তাঁকে নিয়ে। এই আরসাদ আলির অল্পবয়সের সুপুরুষ ছবি লাগায় কমল। অঞ্জনকুমার বসু আবার তার মৃত স্বল্পখ্যাত কবি বন্ধুর নামও। যাঁর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল বিয়ের কয়েকদিন পর। অঞ্জনেরই এক বন্ধুর সাথে। এইখানে অমর মিত্র চেতন অবচেতন মিলিয়ে দেন। কমল ব্রহ্মের অলটারনেট ইগো, যা তাকে ফেসবুকে অন্য নাম নিতে বাধ্য করে তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হেরে যাওয়া মৃত বন্ধুর প্রতি শোক বা হয়ত আরো সুপ্ত তার থেকেও বেশী ব্যর্থ একজন মানুষকে মনে রেখে নিজের ইগোকে বুস্ট করার অভিপ্রায়।

কমল এই অঞ্জনের নাম নিয়ে বন্ধুত্ব করে বাংলাদেশের রিনা বুশেরার সাথে। কখনও বা পাকিস্তানের সোমায়া আখতারের সাথে। পাকিস্তানের সোমায়া আকৃষ্ট হয় আরসাদ আলীর ছবিতে, মুগ্ধ হয় বয়সে বড় অঞ্জনকুমার বসুতে। অথচ ভীষণ মধ্যবিত্ত কমল ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতেই অভিসারে সাহস পান না। বরং ব্লক করে দেন তাকে। কিন্তু রিনি বুশরার সাথে গড়ে ওঠে এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক। অসম বয়সী। হয়ত প্রেম লুকিয়ে আছে অন্য নাম নিয়ে। কাম লুকিয়ে আছে বন্ধুত্বের অনর্গল উচ্ছাসে। কমল ব্রহ্ম রিনি বুশেরাকে পাঠান বন্ধু ব্যর্থ অঞ্জন বসুর কবিতা। মুগ্ধ করতে চান এই যুবতী মেয়েটিকে। বাঙালী পুরুষ যেমন চেয়েছে কবিতায় নারীকে পেতে। কারণ তাঁর নারী অলীক কল্পবাস্তব। সেই প্রেম বাস্তবের থেকে কবিতার পরাবাস্তবের শরীরে প্রতীকের মত উজ্জ্বল। রিনি গল্প বলে তার ব্যর্থ প্রেমিক জালালের। তার সাথে সম্পর্ক করতে চাওয়া তার শিক্ষকের। যিনি আসলে বিবাহিত। এবং যা জানার পর রিনি অক্ষম রাগে ফিরে যেতে চায় জালালের কাছে।

এই রিনি বুশেরার ঠাকুর্দা ছিলেন হিন্দু কৃষ্ণ মিদ্দ্যা। সন্তানের অসুস্থতায় যিনি নাম নিয়েছিলেন হিন্দু দেব দেবীর। আর তার মৃত্যুতে পরিত্যাগ করেন ব্যর্থ ধর্ম। কবুল করেন ইসলাম। এই কাহিনী বাংলার প্রচলিত মিথ। যার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক স্মিত সাম্প্রদায়িকতা। ধর্মপরায়ণ গোঁড়া হিন্দুর কাছে ইসলাম এক ম্লেচ্ছ ধর্ম। যা তার সনাতন ধর্ম বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধীতায় দাঁড়িয়ে আছে। তাই নিজের ধর্মের ঈশ্বরের প্রতি প্রচণ্ড অভিমানে কৃষ্ণ মিদ্দ্যা উলটো অবস্থান নেন। মুসলমান হয়ে যান। খুব গভীর মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণে এই আচরণ আসলে বলে দেয় বাংলা হিন্দু মুসলমানের মৌলিক অবস্থান – একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীতে।

কৃষ্ণ মিদ্দ্যার স্ত্রী এবং তার এক কন্যা থেকে যান সনাতন ধর্মেই। একই পরিবারের মানুষেরা আলাদা ধর্মের হয়ে ওঠেন। এবং আসলে এক হয়েও মানুষের তৈরী করা সংস্কারে আলাদা হয়ে যান। রিনি বুশেরার হিন্দু ঠাকুমা তাই নাতনীকে কাছে ডাকেন। কিন্তু তার স্পর্শ করা খাবার ছুঁতে চান না। ঠাকুমার অম্বুবাচির উপোসে, নাতনি তাই বড়জোর অর্থ দিতে পারে। আর কিছুই না। এ যেন বাংলার দুই সম্প্রদায়ের উপমা। যাঁরা ভাষায় সংস্কৃতিতে, আচারে এক। একই পরিবারের মত। অথচ সংস্কারে আলাদা। ছোঁয়াছুঁয়ি এড়িয়ে ক্রমশ এক না হতে পারার অন্ধকারে পতিত।

গল্পের শেষে কমল ব্রহ্ম ফিরে পান বন্ধু অঞ্জনের স্ত্রীকে। যিনি এক কুহক বাস্তবে অপরাধ স্বীকার করেন তাঁর মৃত স্বামীর কাছে। আর কমল ব্রহ্মও যেন সেই কুহকে আবদ্ধ হন। তিনি অঞ্জনকুমার বসুও নন, আরসাদ আলী – অঞ্জনকুমারও নন। আবার ফেসবুকের তিনি কমল ব্রহ্মও নন। তিনি আসলে কেউ নন, নিজের নির্মিত মিথে পর্যবসিত এক অসহায় মানুষ।

কমল ব্রহ্ম সেই সম্প্রদায়ের বাঙালী যারা নিজেদের চিনতে শেখেনি। মেলে ধরতে শেখেনি। পৌঁছতে চেয়েও যারা নারীর কাছে পৌঁছতে পারেনি সাংসারিক পাপবোধে। আবার পৌঁছতে চেয়েওছে বারংবার। মেলে ধরতে চেয়েছে অহংকে, অহংকারকে। যা তার নেই। যা পেতে গেলে অতিমিথ্যার বুনোট গড়তে হয়।

রিনি বুশেরা আবার সেই সম্প্রদায়ের নারী যার কাছে বিবাহিত পুরুষ মানেই অচ্ছুত। যাকে ছোঁয়া যায় না। চাওয়া যায় না। ছুঁয়ে ফেললেও পাপস্খলনের জন্যে ফিরিয়ে আনতে চাইতে হয় প্রত্যাখ্যাত পুরুষকে। কিংবা অঞ্জনের স্ত্রী সুদেষ্ণা, যে অক্ষম স্বামীকে ছেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দায়ী করে একা।

এই সমস্ত মানুষ ফেসবুকে, ইন্টার্নেটের কল্যানে, প্রকৌশলের, বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ উন্নতির সুবিধা নিতে নিতে নিজস্ব মূল্যবোধে অসম্ভব একা, অসম্ভব সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠে পরস্পরকে বিচার করছে। পৌঁছাতে চাইছে একে অপরের কাছে। কিন্তু পারছে না। আর মাঝে গোটা বাংলার বাঙালী দুটো সম্প্রদায়ে আবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক ছুঁতে চাওয়া আটকাচ্ছে।


বহুস্বর। বহুস্তর।





আলোচক পরিচিতি
শমীক ঘোষ

গল্পকার। 
প্রবন্ধকার। 
পড়াশুনা ঃ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
বোম্বে থাকেন। চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন