মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

নৃপেন্দ্র নাথ সরকারের দুটি ব্যক্তিগত জার্নাল: বয়স যখন পয়ষট্টি ও পুতুল পুতুল খেলা



১. বয়স যখন পঁয়ষট্টি

আগামী বছর এই দিনে মাকে ফোন করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। তাই আজ ঘুম থেকে উঠেই বললাম, মা আজ আমার পয়ষট্টি বছর হল। মা বলল, আমার বয়সটা কি তুই বলতে পারবি? আমার কুষ্টিটা দেখছি না অনেক দিন।

নিউ ইয়র্কে থাকে উত্তম সিংহ। দুই হাজার সাল পর্যন্ত বাংলা সনের পঞ্জিকা বানিয়েছে। ধৈর্য বটে! আমার কুষ্টির ছেড়া অংশে বাংলা জন্ম তারিখ ছিল। সেটা থেকে আমার প্রকৃত ইংরেজী জন্ম তারিখটা বের করে দিয়েছে।


প্রকৃত জন্ম তারিখ বলছি এই জন্য যে, আমরা সব সময় ভুল জন্ম তারিখটা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। এমনও ঘটনা জানি, একমায়ের দুই ভায়ের জন্ম একই বছরে জানুয়ারী এবং মার্চ মাসে। আমাদের স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক সতীশবাবুর হাতে ছিল জন্মদিন বিতরণের দায়িত্ব। রেজিস্ট্রেশনে দিন মেয়েদের মত চিকন গলায় বললেন, “তরে সেপ্টেম্বরের তিরিশ তারিখটাই দিলাম। ভাল দিন। উন্নতি অইব।”

তিরিশ তারিখটাই আমেরিকার নথিপত্রে ঢুকে গেছে। ফলে সব কিছুই দুই বছর করে বিলম্বে আছি। সিনিয়র সিটিজেনশীপ, রিটায়ার্মেন্ট, সোস্যাল সিকিউরিটি বেনিফিট, সব কিছু। আমার মৃত্যুও দু বছর বিলম্বে হবে।

উত্তম সিংহ গত বছর জানিয়েছে আমার বয়স আজ পয়ষট্টি পূর্ণ হল। ধন্যবাদ উত্তম।

এখনও আমার বৌ ঘুম থেকে উঠেনি। ছেলেমেয়েরা জন্মদিন করেছে তিরিশ তারিখে। ওরা অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত এখন। ভাবছি আজ আমি নিজেই চুপিচুপি একটা কিছু করব। মুসকিল হল, করব সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না।



২. 
পুতুল পুতুল খেলা

জন্মেই ছোটবেলায় একবার। বড় বেলায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেষবার। পুতুল দিয়ে জীবন শুরু। পুতুল দিয়েই শেষ। মাঝখানে কিছুদিন গোল্লাছুট।

আমার দুর্নিবার আকর্ষনের মধ্যে একটি হল - পুরণো দিনের লোকদের সাথে আর একটি বার দেখা করা। বাংলাদশে গেলেই আমি ইন্ডিয়া বেড়াতে যাই। অনেকে ভাবে আমি হয়ত বা সম্পত্তি কিনতে যাই। একজন বলল, আপনি এসব জায়গায় না এসে গয়া-কাশী দেখেন, কাশ্মীর দেখেন, আগ্রায় তাজমহল দেখতে যান। আমি বললাম, আমি কি ছোট বেলায় তাজমহল দেখেছি? দেখিনি। তোমার মুখটা দেখেছি। তোমার মুখ দেখার আনন্দের সাথে কি তাজমহল বা কাশ্মীরের তুলনা হয়? কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর তাজমহলের প্রেমকাব্য আমার কাছে ছাতা-মাতা তেজপাতা।

১ প্রফুল্ল মামা। গ্রাম সম্পর্কে মামা। ১৯৭১ সনে কলকাতায় একত্রে অনেক সময় কাটিয়েছি। ২০০৮ সালে কলকাতা গিয়ে মনে পড়ল মামার কথা। চারিদিকে মশার ছড়াছড়ি। বেলঘরিয়ার এমনি একটি জায়গায় ছোট্ট একটি একতলা বাড়ী বানিয়ে হার্ট এটাকে মারা গেছেন ছবছর আগে। আমার মাসতুত বোন বুড়ি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। দুহাতে মশা সরিয়ে ঘরে ঢুকলাম। মূল ঘরের বিরাট একটি অংশ নানাবিধ পুতুলে সাঁটা। এরা সবাই মামীর ভগবান। মামী আগে খুব কথা বলতেন। এখন মানুষের কথা বলেন না। এখন কথা বলেন পুতুলের সাথে। সকালে এদের ডেকে তুলেন, দুপুরে ন্যাপ, রাতে ঘুম পাড়ানো। তারপর সময় মত খাবার দেওয়া। প্রায় পয়ত্রিশ বছর পরে দেখলাম মামীকে। কিন্তু তিনি একটু তাকিয়েও দেখলেন না আমি কে! মাত্র একটা বারের জন্যও আমার সাথে আই কন্ট্যাক্ট হলনা।

২ আমার কাকার শ্যালককে আবছা আবছা মনে পড়ে। এই রসরাজ মামাকে দেখেছি পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে। তার তখন যুবা বয়স। এদিক-ওদিক বেরিয়ে পরার সময়। কাউকে না জানিয়ে একদিন নিরোদ্দেশ হলেন। মা কানতে কানতে মারা গেলেন। অনেক পরে একদিন চিঠি এল তিনি আকাশবাণী কলকাতায় চাকুরী পেয়েছেন। সেবারে এই মামাটির খোঁজ পেলাম। ব্যারাকপুর লাইনে দমদম থেকে বিশ মিনিট দূরে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। রিটায়ার্মেন্টের টাকা দিয়ে দুতলা বাড়ী বানিয়েছেন। পুত্র, পুত্রবধু আর নাতি নিয়ে সংসার। স্ত্রী গত হয়েছেন। সময় কাটে কী করে? তিনিও ভীষণ ব্যস্ত। সময় নাই।

ছাদে একটি বিশেষ রুম বানিয়েছেন। সেটা ভগবানদের উদ্দেশে নিবেদিত। প্রচুর আগ্রহ ভরে আমাকে ছাদের কক্ষটিতে নিয়ে গেলেন। একগাদা পুতুল। সবাই তাঁর ভগবান। তাঁর নিজের বুদ্ধির তারিফ তিনি নিজেই করলেন। ভগবানদেরকে দুতলা কিম্বা একতলায় বসবাসের ব্যবস্থা দেবতার প্রতি অবজ্ঞা করা হয়। পাপ হয়। করেন নি। ছাদে কেউ হাটা হাটি করলে সেই ভগবানদের মাথায় পড়বে। এটা মহাপাপ। বুঝেশুনে তিনি তা করতে পারেন না। তাই রিটার্মেন্ট থেকে কিছু বাড়তি খরচ করে ভগবানদের মাথার উপরে রেখেছেন।

সকালে উঠেই এই ঘরটিতে আসেন। হাতে তালি মারেন। ভগবানরা ঘুম থেকে উঠেন। একটুকরা করে বাতাসা দেন। ভগবানরা ব্রেকফাস্ট সারেন। ছোট একটা তামার গ্লাসে জল রাখেন। দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করেন। রাতে ডিনার। তারপর মামা ভগবানদের গান শুনান – হরে কৃষ্ণ হরে রাম। ভগবাননা ঘুমিয়ে পড়েন। এছাড়া দুপুরে খাওয়ার আগে মামা ভগবানদের ন্যাংটা করে স্নান করিয়ে দেন। পুতুল নিয়ে মামার দিন চলে যায়, রাত চলে যায়। ব্যস্ততার শেষ নেই।

ধর্ম মানেই বিশ্বাস - অন্ধ বিশ্বাস। সবগুলোই পুতুল পুতুল খেলা।



অনুবাদক পরিচিতি 

ডঃ নৃপেন্দ্র নাথ সরকার 
বর্তমানে টেক্সাসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং ডিগ্রী মূল্যায়ন ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। মাঝে কিছুদিন জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তির্জাতিক গবেষক হিসেবে কাজ করেন।

ব্লগার। অনুবাদক। লেখক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন