মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

মুজিব ইরমের সেরা গল্প নিয়ে আলাপ : দড়াটানার মাছ

গল্পপাঠ ১ : আপনার লেখা কোন গল্পটি সেরা বলে মনে হয়?

মুজিব ইরম: কোনো গল্পকেই সেরা বলে মনে হয় না। মনে হয় সবই লাস্টবেঞ্চ, রুল নং ৭১, অংকে কাঁচা, হিসাব-নিকাশে ফেইল, ফেল্টুশ, আদু ভাই। সেই ২০০০ সাল থেকে এক ক্লাসেই পড়ে আছে। আজতক ৩৩ পেয়েই টেনেটুনে পাশ করা গেলো না। তাই নতুন জামা-কাপড় পরে নতুন ক্লাসে আর উঠাও হলো না! গল্পগুলো পান্ডুলিপি হয়েই পড়ে আছে পিসিতে। কবে যে বই হয়ে বের হবে কে জানে!


তবে এতো কিছুর পরেও ২০০০ সালের কোনো এক শীতসন্ধ্যায় জন্ম নেওয়া দড়াটানার মাছ গল্পটিকেই কেনো জানি আজও বড়ো মায়া মায়া লাগে। দেখলেই মনে হয় কলিজার ধন, বড়ো মায়ার আধুলি!

গল্পপাঠ :  ২. গল্পটির বীজ কিভাবে পেয়েছিলেন?

মুজিব ইরম: ১৯৯৯ সালের শীত শেষে এইসব চরিত্রদের মাঝে নিজেও যখন একজন হয়ে উঠি, গল্পের বীজটি তখনই রোপন হয়ে যায়। এইসব চরিত্র আমি এতো করে চিনি, এতো করে মিশি, নিজের ভিতরেই সেই হাহাকারটা তৈরি হয়ে যায়। কবিতায় এই হাহাকার ধরা সম্ভব নয় বলেই এক তুষার ঝরা সন্ধ্যায় কবিতার খাতায় গল্পটা আমি লিখতে শুরু করি। লিখতে লিখতে মনে হয় কোনো এক ভবিষ্যতের আমিকেই যেনো লিখে চলছি তরতর।

গল্পপাঠ : ৩. গল্পের বীজটির বিস্তারি কিভাবে ঘটল? শুরুতে কি থিম বা বিষয়বস্তু নিয়ে ভেবেছেন? না, কাহিনীকাঠামো বা প্লট নিয়ে ভেবেছেন?

মুজিব ইরম: শুরুতে আউটবই, অর্থাৎ উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু দূর লেখার পর আউটবই লেখার পরিকল্পনাটি বাদ পড়ে যায়। গল্প হিসাবেই সে হয়ে উঠতে চায়, অথবা বলা যেতে পারে বিষয় ও চরিত্র আমাকে এই ফর্মের ভিতরই আটকে ফেলে।

গল্পপাঠ : ৪. গল্পটির চরিত্রগুলো কিভাবে এসেছে? শুরুতে কতটি চরিত্র এসেছিল? তারা কি শেষ পর্যন্ত থেকেছে? আপনি কি বিশেষ কোনো চরিত্রকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে লিখেছেন? তাদের মধ্যে কি আপনার নিজের চেনা জানা কোনো চরিত্র এসেছে? অথবা নিজে কি কোনো চরিত্রের মধ্যে চলে এসেছেন?

মুজিব ইরম: শুরুতে আর কি কি ছিলো, এখন আর কিছুই মনে নাই। অনেক কিছুই কাটাকুটিতে বিলুপ্তি ঘটেছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৩ সাল অবধি কতোবার যে গল্পটিতে হাত দিয়েছি! প্রতিবারই কিছু না কিছু রদবদল হয়েছে। এর ১ম রূপটি ছাপা হয়েছিলো সংবাদের সাহিত্য পাতায় ২০০৩ সালের দিকে মনে হয়। তারপর ২০০৪/৫ সালের দিকে সিলেটের কোনো এক সাহিত্যপত্রে, নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। গেলোবার ছাপা হলো বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকারে, তারপর লন্ডন থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজ লোকনে। সর্বশেষ বেরিয়েছিলো গেলো ঈদে বিডি নিউজ ২৪ এর ঈদ ই-ম্যাগাজিনে। আজ যখন গল্পটি আবার গল্পপাঠে পাঠাচ্ছি, তখনও যে হাত দিচ্ছি না, তাই বা বলি কী করে! প্রতিবারই গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হয় জন্ম থেকেই সে এরকম ছিলো। কাটাকুটি করতে করতে এতোই মিশে যেতে থাকি, মনে হয় নিজেকেই যেনো পাঠ করছি, পাঠ করছি নিজেরই শৈশব, জন্মভিটা, দেশ ও হাহাকার!

গল্পপাঠ : ৫. এই গল্পগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত কিভাবে নির্মাণ করেছেন?

মুজিব ইরম: মনে হয় গল্পটিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতই নেই! তাই দ্বন্দ্ব-সংঘাত নির্মাণের ইতিহাসও বলা গেলো না। যদি পরিকল্পিত আউটবইটি লিখতে পারতাম, তাহলে হয়তো দ্বন্দ্ব-সংঘাত আসতো, প্রশ্নটির উত্তরও আজ বড়ো কঠিন করে দিতে পারতাম! আহারে, কেনো যে গল্পটিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এলো না!

গল্পপাঠ : ৬. গল্পের পরিণতিটা নিয়ে কি আগেই ভেবে রেখেছিলেন?

মুজিব ইরম: যতোদূর মনে পড়ে, ঠিক আগেই পরিণতি নিয়ে ভাবিনি। তবে শুরুতে যখন শেষ করেছিলাম, তাতে অবশ্য আরেকটি প্যারা ছিলো। হাসান যখন দড়াটানার মাছ ও বেলকই নিয়ে আইজ্যাক আলীর বাড়ির সামনে দাঁড়ায়, দেখে এ্যাম্বুলেন্সের লোকজন আইজ্যাক আলীর বডি বের করে নিয়ে আসছে। তখন বেলকইগুলো তার হাত থেকে পড়ে যায়, আর গড়াতে গড়াতে এ্যাম্বুলেন্সের দিকে এগুতে থাকে। পরে প্যারাটি বাদ দিয়ে দেই। মনে হয় বহু ব্যবহৃত ট্রিটমেন্ট। তবে কেনো জানি প্রতিবারই গল্পটি পড়তে গেলে প্যারাটি মনে পড়ে যায়।

গল্পপাঠ : ৭. গল্পটি ক’দিন ধরে লিখেছেন? এর ভাষা ভঙ্গিতে কি ধরনের শৈলী ব্যবহার করেছেন?

মুজিব ইরম: ১ম রূপটি ক’দিনে লিখেছিলাম আজ আর ঠিকঠাক মনে নাই। প্রায় ১৩ বছর হতে চললো। আর গল্পটি তো এখনও লিখে চলেছি। বই আকারে বের না-হওয়া পর্যন্ত কাটাকুটি হয়তো চলতেই থাকবে। আর যথারীতি আমার আঞ্চলিক ভাষাভঙ্গিতেই গল্পটি আমি লিখতে পেরে বড়ো আনন্দ পেয়েছিলাম। কবিতায় তো আর নিজের অঞ্চলটাকে এভাবে ঠিক বিস্তারিত ভাবে তুলে আনতে পারিনি! আর পারিনি বলেই হয়তো গল্প/আউটবই লিখতে শুরু করেছিলাম।

গল্পপাঠ : ৮. গল্পটিতে কি কিছু বলতে চেয়েছিলেন?

মুজিব ইরম: যা বলতে চেয়েছি তা মনে হয় গল্পতেই আছে। পাঠক যদি ধরতে না-পারে, তাহলে মনে হয় কিছুই বলতে চাইনি বা বলতে পারিনি।

গল্পপাঠ : ৯. গল্পটি লেখার পরে কি আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন? আপনি কি মনে করেন আপনি যা লিখতে চেয়েছিলেন, তা লিখতে পেরেছেন এই গল্পটিতে?

মুজিব ইরম: না, সন্তুষ্ট হইনি। আর হইনি বলেই এখনও বই বের হয়নি, কাটাকুটিও বন্ধ হয়নি। আজও গল্পটি পড়তে গিয়ে বড়ো শরমিন্দা হয়েছি। দেখা যাক, ভবিষ্যতে কী হয়!

গল্পপাঠ : ১০. এই গল্পটি পাঠক কেনো পছন্দ করে বলে আপনার মনে হয়?

মুজিব ইরম: গল্পটি পাঠক পছন্দ করে কি না, বা আগামীতেও করবে কি না জানি না। আমি নিজেও তো এখন গল্পটির পাঠক। লেখকের মৃত্যু তো কবেই ঘটেছে! ১৩ বছর আগে। আজকাল গল্পটি পড়ি আর মনে হয় আমি তো গল্পটির লেখক নই, পাঠকমাত্র। আগেই বলেছি, এখনও বলি, পাঠক হিসাবে গল্পটি যখন পড়ি, বিষয় ও চরিত্রটির সাথে এতোই মিশে যাই, বড়ো মায়া মায়া লাগে, বড়ো হাহাকার বাজে। কিছু কিছু পাঠকেরও হয়তো মায়া মায়া লাগবে, হাহাকার বাজবে।#

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন