বুধবার, ৫ মার্চ, ২০১৪

আহমেদ খান হীরকের গল্প ঘর

১.

সেয়ানা হওয়ার পর থেকেই রমিজ মিয়া বাপের সাথে কবর খোঁড়ে। সোজা সমান বুরুশ করা কবর খোঁড়ায় তার জুড়ি নাই। কালিপুরের গোরস্তানে তাই সে বাঁধা কবর খোদক। বাঁধা, কিন্তু মাইনে বাঁধা না; মানুষ মরলে তার খোঁজ পড়ে। তখন আরো দুচারজনকে নিয়ে লেগে যায় কবর খুঁড়তে। কোদাল আর শাবল দিয়ে মানুষের নতুন ও শেষ ঘরটা যতোটা পারে মন দিয়ে তৈরি করার চেষ্টা করে। তার বাপে বলত, বাজান, কব্বরই আখেরি ঠিকানা- এইটারে এট্টু ভালো বানাইলে সুয়াব পাওয়া যায়।


তবে রমিজ মিয়া এখন ঠিক সোয়াব টোয়াবের জন্য কবর খোঁড়ে বলে মনে হয় না। এ দিয়ে তার সংসার চলে। বাড়িতে বউসহ দুই ছেলে। একটা মেয়েও তার ছিল। বিয়েও দিয়েছিল সারকীটনাশক ডিলার বিল্লালের সাথে। মেয়েটা কিন্তু টিকল না। বছর ঘুরতেই বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে মরল। কতজনে নিষেধ করেছে, কিন্তু গোঁয়ারের মত রমিজ মিয়া নিজের হাতেই মেয়ের শেষ ঘরটা বানিয়ে ছিল। বোধহয় সবচেয়ে যতœ করেই বানিয়ে ছিল।

রমিজ কাঁদে নি। কাঁদলে মুর্দার কষ্ট হয় এমন জ্ঞানে না- সে কাঁদে নি অভ্যাসেই! কোদাল কুপিয়ে কুপিয়ে, শাবল দিয়ে মাটির ধার কেটে কেটে, বাঁশের ফাংরি দিয়ে মেয়ের ঘর সাজিয়েছিল। যতটা তার বিয়েতেও সাজাতে পারে নি। দুরুদ পড়তে পড়তে যখন মেয়ের লাশ কবরে নামানো হয়, মেয়ের জন্য এতটুকু ভয়ও লাগে নি রমিজ মিয়ার। তার মনে হয়েছিল এই ঘরে সে ভালো থাকবে। বিল্লালের ঘরের থেকেও ভালো থাকবে বোধহয়। কবর থেকে ওঠার আগে আতর লোবান ছিটিয়ে দিয়েছিল সে। ফিনফিনে কাফনের কাপড়ে আতরের লাল দাগ রক্তের মতো মনে হলে রমিজ মিয়া একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলেছিল, মাবুদ মাইয়াটারে শান্তিতে রাইখো!

আসলে মানুষ নিজে যা পারে না তাই তো চায় ওই ওপরওয়ালার কাছে। রমিজ মিয়া আজীবন তার মেয়েকে শান্তিতে রাখতে পারে নি। শুধু মেয়ে কেনো, সংসারের কাউকেই পারে নি। রমিজের সংসার যে অভাবের সংসার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বাহুল্য। খাসজমির উপর মাটিচালার দুটো ঘর। ছাদ দিয়ে আলো-বাতাস-বৃষ্টির নিত্য ডাকাতি চলে। রমিজের বউ এ নিয়ে লক্ষবার বলেছে, রমিজ না শোনার ভান করে থেকেছে। শুনে তো লাভ নাই। ঘরের মাথা কী বাঁচাবে, নিজের পেটই যেখানে বাঁচে না!

তবু ভালো বড় ছেলেটা এখন করিমনের ড্রাইভার হয়েছে। দুপয়সা হাতে থাকছে তার। সংসারের চালটা ডালটা কিনছে। তবে তা আর কয় দিন! হাতে দুপয়সা থাকলে যা হয়, ছেলের দেমাগটাও বেড়েছে। কথায় কথায় ‘বাড়ি ছাইড়া চইলা যামু’ বলে হুমকি দেয়। তা হয়তো যাবে। তার জীবনটা তার। ছোট ছেলেটা ছেঁড়া বইখাতা নিয়ে প্রায়মারি যাতায়াত করে- পড়ে কি পড়ে না রমিজ মিয়া জানে না।

কিন্তু মেয়েটা তো পড়ত! এইটে বৃত্তি না কী এক পরীক্ষা দিতে চান্সও পেয়েছিল! রমিজ মিয়ার সাথে তার আগেই বিল্লালের কথা হয়ে গেল। অভিভাবকের মত বিল্লাল জানালো, রমিজ ভাই, মাইয়া তো ডাঙর হইছে...বাজার বেবাজারে মইধ দিয়া ইশকুলে যায়... ইশকুল ডেরেসও তো ভালো না- উঁচা বুক দেখা যায়। মাইয়ারে বোরকা পরাও...আর তার লগে আমার বিয়া দিয়া দাও!

বিল্লালের আগের বউ ছিল। আগের বউয়ের দুটো ছেলেও ছিল। রমিজ মিয়া তবু রাজি হয়েছিল। বিল্লালের ঘরে ভাতের কি অভাব? আর দুনিয়াজুড়ে মানুষ কি সতিনের ঘর করে না? আইনেও চার বিয়ের উল্লেখ আছে। তাই বিয়েটা হলো। ভাই বিল্লাল রমিজের জামাই বিল্লাল হয়ে গেল। সতিনের ঘরে যা যা সমস্যা হওয়ার তার সবই রমিজের মেয়ের হয়েছিল, স্বাভাবিকভাবে ইশকুলও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; রমিজের তবু মনে হয়েছিল- মেয়ে তার সুখে আছে। বিল্লালের চোখে তার মেয়ের জন্য আলগা একটা ভালো লাগা সে দেখেছিল।

সেই মেয়ে বাচ্চা দিতে গিয়ে মরল। গুজব রটল সতিনে কী জানি খাইয়ে দিয়েছিল মেয়েকে। রমিজ বিশ্বাস অবিশ্বাস কিছুই করে নি। যে গেছে সে গেছে, যেমন করেই হোক গেছে। কবরের পাশে রমিজের ঘাড়ে হাত দিয়ে বিল্লাল বলেছিল, আপনে আমারে মাইয়া দিছিলেন, সেই মাইয়া আমি রাখতে পারি নাই...কিন্তুক আমি আপনের সাথে আছি। আপনের যেকুনো পরবলেম আমার পরবলেম! এইটা মনে রাইখেন!

রমিজ এসব কথা মনে রাখে নি। মানুষ তো কত কথা কত সময়ে বলে। সব কথা কি আর দিলের কথা হয়? রমিজ মিয়া তাই কোদাল শাবল নিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছিল।

২.

ইউনিয়ন উন্নয়ন সড়ক হবে। আর হবে তো হবে ওই রমিজ মিয়ার ভাঙাচোরা ঘরদুটোর উপর দিয়েই হবে। কালিপুরের সাথে আলিনগরের রাস্তাটা অন্যপাশ দিয়ে ছিল। রাস্তাটাও ছিল কাঁচা। ফলে মানুষজনের চলাফেরায় দুর্ভোগ ছিল যথেষ্ট। এখন সেই দুর্ভোগের অবসান হবে। পিচঢালা পথ হবে। রাস্তার দৈর্ঘ্য কমাতে ইঞ্জিনিয়র সাহেবরা অনেক যন্ত্রপাতি কাটাকম্পাস দিয়ে ঘেঁটে ঘুঁটে, যথেষ্ট হিসাব নিকাষ করে, সম্ভাব্য যে নকশা দিয়েছেন তাতে রমিজ মিয়ার ঘরদুটো এক বাধা বটে। ফলে একদিন চেয়ারম্যান ডেকে পাঠালেন রমিজ মিয়াকে।

ইউনিয়ন পরিষদের সিঁড়ি দিয়ে একধূলো পা নিয়ে রমিজ যখন চেয়ারম্যানের চৌকাঠে দাঁড়াল তার হাঁটু তখন ঠকঠক করে কাঁপছে। চেয়ারম্যান আন্তরিক মানুষ। বেশ ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেন সড়কের কথা। গ্রামের উন্নতির কথা। তারপর রমিজকে দুসপ্তাহ সময় দিলেন।

কিসের সময়? রমিজ মিয়াকে সপরিবারে ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে। রমিজ মিয়া কী উত্তর করবে বুঝতে পারে না। কিন্তু তার তো অনেক কিছু বলার আছে। রমিজকে ইতস্তত করতে দেখে চেয়ারম্যান বলেন, দেখো মিয়া, তুমি থাকো খাস মাটিতে। মানে সরকারী জমিতে। সরকার এতদিন কিছু কয় নাই কারণ ওই মাটি তার দরকার হয় নাই। এখন ওই জমি সরকারের লাগব। এখানে তুমার বা আমার কিছু করার নাই।

রমিজ হয়তো বুঝতে পারে, কিন্তু রমিজের বউ কিছুই বুঝতে চায় না। রমিজ চুপচাপ বউয়ের চিল্লাফাল্লা শোনে। এ ঘর ভেঙে অন্যত্র ঘর করবে এমন সাধ্য কি রমিজের আছে? নাই। যার সাধ্য নাই তার চুপ থাকাই ভালো। রমিজ মিয়া একটি ঘরই তৈরি করতে পারে, কিন্তু জ্যান্ত মানুষের সে-ঘর কোনো কাজে আসে না।

ড্রাইভার পুত্র এসে আরেক দফা হইহল্লা করে সজনে শাক আর ডাল দিয়ে মেখে মেখে ভাত খেয়ে চলে যায়। ইশকুল ফেরত ছোট ছেলেটা শুধু রমিজের সাথে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বসে থাকল। আর কিছুক্ষণ পর বলল, আব্বা নদীর হোইপাড় যাই গিয়া!

এ সময় রমিজের বউ কান্ডটা করল। চুলায় জ্বলতে থাকা একটা লাকড়ি দিয়ে ছোট ছেলেটার পিঠে জীবনের সমস্ত খেদ উজার করতে থাকল। ছেলেটা মা মা বলে যে-মা মারছে তারই শাড়ি আকড়ে ধরে থাকল, নড়ল না একচুল। অন্য সময় রমিজ হয়তো ধরতে যেত, বউকে বাধা দিত, কিন্তু আজ কেমন একটা অবসাদ তাকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখল- দুপুরে কিছু মুখে না দিয়েই বেরিয়ে পড়ল। পেছন থেকে আসা ‘মা মা’ আওয়াজ তাকে কোনোভাবেই স্পর্শ করল না।

৩.

ছোট ছেলেকে মারটা বেশিই হয়ে গিয়েছিল।

ছেলেটাকে নিয়ে ছুটতে হলো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বিল্লাল কীভাবে কীভাবে খবর পেয়ে আগে আগে ছুটছিল। ছেলেটা তার কোলে ছিল।

খবর পেয়ে রমিজ মিয়া হাসপাতালে এসে দেখে ছেলেটার পিঠে পোড়া পোড়া দাগ। ডাক্তারেরা কী সব মলম লাগিয়ে কাফনের কাপড়ের চেয়ে পাতলা কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। কী একটা ইঞ্জেকশনও করতে বলল। ইঞ্জেকশন হাসপাতালে নেই। বিল্লালই ছুটে গিয়ে নিয়ে এল। প্রায় জ্ঞানহীন ছিল বলে সুঁই ফোটানো নিয়ে কোনো ভয়ডর ছিল না ছেলেটার; কিন্তু রমিজের খুব ভয় করছিল। ছেলেটার হাতে যখন নার্স সুঁইটা ঢুকিয়ে দিল, ব্যথা যেন রমিজই পেল। কোলে করে ছেলেটাকে নিয়ে ফিরতে ফিরতে বিল্লাল অভিযোগ করল শ্বশুরের কাছে,‘এতকিছু ঘইটা যাইতেছে কিন্তুক আপনে আমারে কিছুই কন না...’

রমিজ বিল্লালকে আর কী বলবে! কিন্তু তারপরেও বলে ভিটাটার কথা। রাস্তা হবার কথা। ভাঙা ঘরদুটো নতুন করে ভাঙলে তার যে আর ঘর তোলার সাধ্য নাই এটুকু শুধু বলে না। কিন্তু বিল্লাল যে তা বুঝল না তা তো নয়। ছেলেটাকে ঘরের মাদুরে শুইয়ে দিতে দিতে বিল্লাল বলল, চিন্তা কইরেন না। এট্টা না এট্টা ব্যাবুস্থা হইবোই!

রমিজের মাথায় তখনো ইঞ্জেকশন। ইঞ্জেকশনটা নিয়ে এসেছিল বিল্লাল। কিনেই তো এনেছিল! কত টাকা দাম সে কথা জানতে চাওয়ার সাহস সে কোথায় পাবে?

বিল্লাল চলে যায়। রমিজের বউ ছেলেকে নিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। যে-ছেলেকে মেরে হাসপাতালে পাঠালো, সে-ছেলের মায়াতেই মা কাঁদছে, এমন অদ্ভুত ঘটনা এখানে হরহামেশায় ঘটে। রমিজ মিয়া চুলার আগুনে বিড়ি জ্বালিয়ে চুলার পাশেই বসে থাকে।

৪.

দিন পাঁচেক পর রমিজের কাছে বিল্লাল এল ‘ভালো খবর’ নিয়ে। যদিও শোনার পর রমিজ ধন্ধে পড়ে গেল খবরটা আসলেই ভালো কিনা!

রাস্তার যে নকশাটা রমিজদের ভিটার উপর দিয়ে গেছে সে নকশা বদলানো সম্ভব। একটু এদিক ওদিক করলেই ঘরের পাশ দিয়ে রাস্তা যাবে। কিন্তু নকশা পাল্টাবে কে? এটাতো আইলের মাটি কাটা না যে চাইলেই আইল এদিক দিয়ে না কেটে ওদিক দিয়ে দেয়া হলো! এই নকশা পাল্টাতে পারে ইঞ্জিনিয়ারের কলমের খোঁচা। সে খোঁচার দাম পঞ্চাশ হাজার টাকা মাত্র!

রমিজ মিয়া শুনল, কিন্তু কোনো জবাব করল না। শ্বশুরের এমন নির্বিকার চেহারা দেখে বিল্লাল কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, খাস জমির ঘর বাঁচানো সহজ কাম না। আর একবার বাঁচলে জমি ধরেন আপনেরই! হেরা ছাড়-কাগজও দিবে!

রমিজ অল্প একটা শ্বাস ফেলে বলল, মোর কাছে পঞ্চাশ টেকাও নাই...পঞ্চাশ হাজার টেকা কই পামু?

বিল্লাল শাশুড়ির দেয়া মোয়া চিবালো কিছুক্ষণ। তারপর কিছু না বলেই চলে গেল।

আজ, এই প্রথমবার, নিজের অসহায়ত্বের উপর রমিজ মিয়ার খেদ জন্মাল। থু করে একদলা থুতু সে ঘরের ভেতরেই ফেলল।


৫.

কোনো কারণ ছাড়াই রমিজ মিয়া আজ গোরস্তানে গিয়ে বসেছিল। দুদশ গ্রামের কেউ মরে নি। কিন্তু না মরলেও মাঝে মাঝেই রমিজ এ কাজটা করে। মাটির তলার ঘরগুলোর পাশে গিয়ে বসে। কখনো কখনো কথাও বলে কবরগুলোর সাথে, বা নিজের সাথে। আজ যেমন আজিমুদ্দিনের কবরের পাশে বসে ছিল। বিড়বিড় করে বলছিল, আজিমুদ্দি...তুমরাই ভালো আছ মিয়া। ঘর-টর নিয়া কুনো টেনশান নাই। মইরা সুখে আছ। মোরা বাঁইচ্চা জ্বলতাছি...জ্বলতাছি আর জ্বলতাছি...কিন্তুক ভিতরে তো কুনো বারুদ নাই...আইচ্ছা, বারুদ ছাড়া মানুষ কেমনে জ্বলে কও তো?

হন্তদন্ত বিল্লাল আসে গোরস্তানে। শ্বশুরের এমন চিরবিরানি শুনে নিজের মেজাজ হারায়। আদব লেহাজের হিল্লে না করেই বলে, আপনে এখানে খ্যাপামি করতাছেন আর আমি সারা দুনিয়া আপনেরে খুঁজতাছি!

রমিজ মিয়া উত্তেজিত হয় না। বিল্লালকে তার আগে খারাপ লাগত না; কিন্তু এখন কেমন অসহ্য লাগে। তাকে দেখলে নিজের অসহায়ত্বটা আরো বড় হয়ে নিজের সামনে ছেঁড়া কাঁথার মত খালি দলা পাকিয়ে যায়।

রমিজ মিয়াকে ধরে বিল্লাল গোরস্তান থেকে বের করে নিয়ে আসে। নসিমন করিমন স্ট্যান্ডের পাশে নির্জনতা খুঁজে বসে। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, টেকার ব্যাবস্থা হইছে। খালি আপনের হেল্প লাগব!

রমিজের ভেতর দিয়ে বিল্লালের কথা প্রবাহিত হয় কিনা বোঝা যায় না। রমিজের মুখ আগের মতোই শীতল। তা খেয়াল করে বিল্লাল চটেই যায়। বলে, আপনে মানুষ? না লাশের লগে থাকতে থাকতে লাশ হইয়া গেছেন?

শ্বশুরের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ভাব-সাব বোঝার চেষ্টা করে বিল্লাল। তারপর কণ্ঠ একেবারে খাদে নামিয়ে বলে, টেকার ব্যাবুস্থা হইতে পারে আব্বা, বুঝছেন?

রমিজ মিয়া মাথা নাড়িয়ে বোঝায় সে বুঝেছে, তবে তাকে দেখে মনে হয় না যে সে বুঝেছে।

বিল্লালের কণ্ঠ খাদেই থাকে। বলে, লাশের হাড্ডির ম্যালা দাম। শহরে ডাক্তারি পড়তে কামে লাগে। আগে হাড্ডি ইন্ডিয়া থেইকে আসত, এখন দেশেই পাটি আছে। এক পাটিরে আমি চিনি- হে হাড্ডি কিন্যা নিব। হর হাড্ডি দিব দশ হাজার। আপনে পাঁচ হাড্ডির ব্যাবুস্থা করেন!

রমিজ মিয়া এতক্ষণে চমকায়। হাড্ডি? বিক্রি? এমন অনেক কথা বলতে চেয়েও শুধু বলতে পারে, মাইনে?

বিল্লাল বলে, গোরস্তানে সবচে পুরানা কবরের খবর আপনের চে কে ভালো কইতে পারব? আপনি ভালো দেইখা পাঁচটা হাড্ডি বাইর করেন। বাস্...নগদ পঞ্চাশ হাজার টেকা! একদিনে না পারলে আস্তেশুস্তে একটা একটা কইরা তুলেন। তাড়াহুড়ার কিছু নাই!

রমিজ মিয়া দাঁড়িয়ে যায় ঝট করে। তার মাথা যেন ঘুরছে। তীক্ষè কণ্ঠে বলে, বিল্লাল তুমারে আমি মাইয়া দিছিলাম। মাইয়া মইরা ভালো হইছে। তুমার মতোন সিমারের লগে মাইয়াটা জিন্দা লাশ হইয়া থাকত!

রমিজ মিয়া সশব্দে থুতু ফেলে আবার গোরস্তানের দিকে হাঁটা ধরে।


৬.

আরো কদিন যায়।

রমিজ মিয়ার বসতভিটা ঘিরে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে মাপযোগ করতে দেখা যায় সরকারী লোকদের। এইসব মাপযোগ দেখতে দেখতে রমিজ ক্লান্ত। রমিজের বউয়ের গলার স্বর বাড়তে বাড়তে আকাশ স্পর্শ করে। রমিজ মিয়া তাতে আগের মতোই নির্বিকার থাকে। তার ভেতরে কোনো কিছু বয়ে যেতে পারে না। বন্ধ্যা নদীর মতো দীর্ঘশ্বাস ছাড়া রমিজ মিয়ার কোনো অবলম্বন থাকে না।

তবে যে-রাতে বড় ছেলেটা কোথা থেকে জোগাড় করা ভোজালি নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারকে মারতে যেতে উদ্যত হয়, সে-রাতে বিল্লালের কাছে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখে না রমিজ মিয়া।

রমিজ মিয়াকে দেখতে পেয়ে বিল্লাল যেন আকাশের চাঁদ পায় হাতে। দাওয়ার চেয়ারে বসতে দিয়ে সব শুনে সে বলে, আপনার পোলার রক্ত গরম। কখন কী কইরা বসে তার ঠিক নাই। সরকারী মানুষরে মারা আর গলায় ফাঁস নেয়া একই কথা! আমি তারে কী বুঝামু কন?

রমিজ মিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে পারে শুধু। বিল্লাল সে দৃষ্টির দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে, উপায় তো টেকা। আর টেকা আছে গোরস্তানে। খালি ধইরা বাইর করবেন!

রমিজ মিয়া শূন্য দৃষ্টিতেই তাকিয়ে থাকে। বিল্লাল জানায় গোরাজাব হয় রুহের, কঙ্কালের না। তাই কঙ্কাল বের করলে কোনো পাপ নাই। কত বড় বড় গোরস্তানে জায়গার অভাবে পুরনো কবরে হাল বাওয়া হয়, তখন কোথায় হাড্ডি কোথায় গুড্ডি?

রমিজ বোধহয় তখন বোধ অবোধের উর্ধে¦ চলে গেছে। মৃদু কণ্ঠে বিল্লালকে বলে, তুমার ঘরে কোদাল আছে?


৭.

রাত কৃষ্ণপক্ষের। তাছাড়া গোরস্তানের দিকে এই রাত বিরাতে কেইবা আসে! অতএব, রমিজ মিয়া তার জানা সবচেয়ে পুরনো কবরটার ওপর কোদালের প্রথম কোপটা মারল। তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয়। তারপর অজ¯্র।

একসময়, অবশেষে, সন্ধানের বস্তুটা পাওয়া গেল। বিল্লাল কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল রমিজ মিয়া জানেও না। পুরো কঙ্কালটা বেরিয়ে এলে বিল্লাল একটা চটের বস্তা এগিয়ে দিল। কীটনাশকের বস্তা এখন কঙ্কালের বস্তায় রূপান্তরিত হবে।

রমিজের শুধু হাত না, পুরো আত্মাও যেন কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতেই কঙ্কালটা বস্তাবন্দি করল সে।

বিল্লাল ফিসফিস করে বলল, গোরের মাটি ভরাট কইরা দেন। দুচাইরটা ঝোপঝাড় কাইট্টা গোরকে এমুন বানায়ে দেন যেন না চিনা যায়। হাড্ডি লইয়া আমি গেলাম।

রমিজ মিয়া ওর মধ্যেই, কোন শক্তিতে কে জানে, বলে উঠল, কিন্তুক টেকা?

বিল্লাল অভয় দিল। জানালো দরকারে কাল সকালেই সে টাকা পেয়ে যাবে।

কঙ্কালের বস্তাটা ফেরিওয়ালার বস্তার মতো কাঁধে লম্বা করে ফেলে চলে গেল বিল্লাল।

রমিজ মিয়া ধীরে ধীরে সময় নিয়ে যতœ করে কবরের মাটি ঢাকা দেয়। তার ওপর একটা সজনে ডাল ভেঙে ফেলে; কিন্তু এসব না করলেও চলত। কবরটা গোরস্তানের অনেক ভিতরে। কারো নজরে আসবে না। আর এলেও বড় জোর মনে করবে শেয়ালের কাজ।

রাতে রমিজ ঘুমাতে পারে না। বারবার কঙ্কালের হাত, কোমর আর অত বড় বড় চোখের কোটর তাকে উত্তেজিত উৎকন্ঠিত রাখে। এখন, এইরাতে, যতো না ভয় সে পাচ্ছে ওই কঙ্কালটাকে তারচেয়ে ভয় পাচ্ছে ধরা পড়ার। কাল সকালে যদি গ্রামময় মানুষ এসে তাকে ধরে? যদি বলে কঙ্কাল সে-ই চুরি করেছে -তখন? রমিজ ছটফট করে।

রমিজের বউ নাক ডাকতে ডাকতে ঘুমের ঘোরেই হঠাৎ গালাগালি শুরু করে। পাশের ঘর থেকে থেকে গাঁজার গন্ধ ভেসে আসছে। বড় ছেলেটা আজকাল গাঁজা খাওয়া ধরেছে, রমিজ জানে। এরপর তাড়ি মদ ধরবে, মাগি ধরবে। আর ভাবে না রমিজ মিয়া। তার জীবনটা তার।

ভোর ফুরালেই রমিজ মিয়া বেরিয়ে পড়ে। গোরস্তানে যায়। দেখে সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। গ্রামের দুয়েকজনের সাথে অযথা বাড়তি কথা বলে। তারপর বিল্লালের বাড়ি যায়। বিল্লাল তখন নিমের ডাল দিয়ে দাঁত ঘষছিল। রমিজকে দেখেই বলল, মাল ডেলিভারি হইয়া গেছে...ঘরের ভিতর চলেন...টেকা রেডি।

দশ হাজার টাকা রমিজ মিয়া একসাথে কখনো দেখে নি। ফলে টাকা গুনতে গিয়ে বারবার ভুল হয়ে যাচ্ছিল তার। উত্তেজনায় ঘাম হচ্ছিল। হাত কাঁপছিল, পা কাঁপছিল।

বিল্লাল বলল, টেকা গুনা আছে...ভালো কইরা রাখেন...আরো চল্লিশ লাগব, কাম এখনো মেলা বাকি!

সিমেন্টের ঠোঙায় টাকা ভ’রে, লুঙ্গির ট্যাপে নিয়ে রমিজ মিয়া নিজের ঘরে যায়। তোশকের তলায় টাকাটা রেখে এই প্রথমবারের মতো বউয়ের গালাগালি শাপশাপান্ত উপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়ে।

৮.

পরের রাতেও কোদাল নিয়ে রমিজ মিয়াকে গোরস্তানে দেখা যায়। বিল্লাল আজ আসে নি। বস্তা সে নিজেই এনেছে। উত্তরপূর্ব কোণের কবরটা আজ সে বাছাই করেছে। কবেকার কবর। ভেঙে গর্ত হয়ে গেছে। ভেতর থেকে শেয়াল বেরিয়ে আসাও অসম্ভব কিছু না। কোদালের এক কোপেই মাটি ভুস করে ধ্বসে পড়ে। আর শব্দটা তখনই শুনতে পায় রমিজ। সর সর একটা শব্দ। সাপ নাকি? কবরটা থেকে বেরিয়ে কিলবিল করতে করতে আগাছার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে। গোখরা। বোধহয় পদ্ম গোখরাই। এই অন্ধকারে তেমন ভালো দেখতে পাবার কথা না, কিন্তু তবু যেন দেখতে পায় রমিজ; সাপের মাথার কাছে আঁকিবুঁকি। আগাছার ভেতর ঢুকে যাওয়ার আগে যতটুকু দেখা গেছে তাতে বেশ দীর্ঘ বলতে হয় সাপটাকে। রমিজ মিয়া ইচ্ছা করলেই সাপটাকে উপেক্ষা করতে পারত; কিন্তু সারা জীবনের নির্লিপ্ততা ঝেড়ে ফেলে কোদালটা মাথার ওপর তুলে সাপটাকে সে খুঁজতে বের হয়। আগাছা ডিঙিয়ে চলে তার পা। সাপের লেজের ঝিলিক যেন দেখতে পায়। ভূতে পাওয়া লোকের মতো সাপটাকে সে অনুসরণ করতে থাকে।

অনুসরণ করছে, কিন্তু সাপটাকে নাগালে পাচ্ছে না রমিজ মিয়া। অবশেষে যখন নাগালে পেল, তীব্র গতিতে কোদালটা চালালো সাপের কোমর বরাবর- মুহূর্তে দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল সাপটা। দুইখন্ড কিছুক্ষণ ছটফট করল, মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে গেল লেজটা। তারপর সব শান্ত হয়ে গেল।

হঠাৎই আশপাশ সমন্ধে সচেতন হয়ে উঠল রমিজ মিয়া। নিজেকে আবিষ্কার করল তার মেয়ের কবরের ওপর। সাপটা মরে পড়ে আছে কবরের বুকে। কোদালের কোপে কবরের কিছু মাটি ঝরে গেছে। গর্ত হয়ে গেছে মাথার দিকে। গর্তের ওই অংশ দিয়ে সাদা কাফন দেখা যাচ্ছে কি? একবার দেখে দ্বিতীয়বার সেদিকে আর তাকাতে পারল না রমিজ মিয়া। হাঁটু ভেঙে এল তার। বসে পড়ল কবরের উপরেই। মনে হচ্ছে কোথাও অনেক কুয়াশা ছিল, ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। গাছে গাছে কালো বাকলের ভেতর থেকে সাদা হাড়ের মত কান্ড বেরিয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত যেন, হঠাৎই, চন্দ্রালোকিত হয়ে ওঠে।

রমিজ সম্মোহিতের মতো সাপের খন্ড দুটি বস্তায় ভরে বিল্লালের বাড়ি পৌঁছে। বিল্লাল তখন ঘুমে। রমিজের হাঁকডাকে তিতিবিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে উঠানে। বস্তা দেখে বেশ খুশি হয়ে ওঠে।

রমিজ মিয়া থমথমে গলায় বলে, বিল্লাল খুশি হইও না...এ বস্তায় কুনো কঙ্কাল নাই, তয় লাশ আছে। আমার মাইয়ার লাশ। তারে আমি কোদাল দিয়া কুপাইয়া দুইভাগ করছি। তুমারে দিতে আইলাম। এই লাশে তুমারও হক আছে!

কাঁচা ঘুম ভাঙা বিল্লাল কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তার মনে হতে থাকে কন্যা-শোকে, ভিটা-শোকে লোকটার মাথা বোধহয় খারাপ হয়ে গেছে। রমিজ যখন জানায় দশ হাজার টাকা সে ফেরত দিয়ে গতকালের কঙ্কালটা এখন ফিরিয়ে নেবে, বিল্লাল সতর্ক হয়। সবকিছু ঠিকঠাক না বুঝেও বলে, হাড্ডি তো ডেলিভারি হইয়া গেছে...! ওই হাড্ডি কই পামু!

রমিজ মিয়া কেমন যেন হাসে। এই হাসি বিল্লালের ভালো লাগে না। গত বছর পাগলা কুকুর তাকে তাড়া করেছিল, কুকুরটার কথা কেন যেন তার মনে পড়ে যায়।

রমিজ মিয়া বলে, তুমারে আমি চিনছি বিল্লাল। কাশেম শেখের কঙ্কাল এখন তুমার ঘরের কোঠায় আছে...এই যে আমার দিকে তাকায়ে আছে...

বিল্লাল চমকায়। কঙ্কাল তার কোঠার উপর আছে সত্য, কিন্তু রমিজের দিকে তাকিয়ে আছে মানে কী?

বিল্লাল বলে, আলগা ফাল পাইরেন না মাঝরাইতে। আছে তো আছে মিয়া...ওইটা দশহাজার টেকার জিনিস? শহরে নগদ চল্লিশে বিকাইবে ওইটা... বেশি তেড়িবেড়ি না কইরা ঘরে যান!

ঘরের কথা শুনে রমিজ মিয়া ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। কোমর থেকে টাকার ঠোঙাটা বের করে বিল্লালের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর বিল্লালের কোঠার দিকে রওনা দেয়, কিন্তু পারে না। বিল্লাল তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে ধরে।

‘হাড্ডি আপনি পাইতে চাইলে নিজের ভিটাটা ছাড়েন...আইজ রাইতেই ছাড়েন।’ বিল্লাল ধস্তাধস্তির মধ্যেই বলে।

রমিজ মিয়া হতবাক হয়ে বিল্লালের দিকে তাকায়। বিল্লাল হাতের বাঁধন আলগা করে বলে, হ, ঘর দুইটা দ্যান। হিসাব তো আপনের নাই...আপনে আছেন বালের হাড্ডি নিয়া...

রমিজ এতক্ষণে তার কোদালটা চালায়। মাটি কাটা ধারওয়ালা পাকা কোদাল। কোপটা গিয়ে লাগে বিল্লালের গর্দানে।

বিল্লাল দশ বছর আগে মরে যাওয়া মায়ের নাম নিয়ে পড়ে যায়। কোরবানিতে জবাই করা ছাগলের গলা দিয়ে যেমন ভসভস করে রক্ত বেরোয়, বিল্লালের গলা দিয়েও তেমনি বের হতে থাকে।

৯.

পরদিন পুলিশ আসে।

মৃত বিল্লালকে পাওয়া যায় উঠানের ওপর। সাথে সিমেন্টের ঠোঙায় দশহাজার টাকা। একপাশে একটা কীটনাশকের খালি বস্তা। ঠিক খালি না, বস্তার ভেতর দুই টুকরা সাপ।

সারা বাড়ি তল্লাশি করে এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু পাওয়া গেল না। গ্রামবাসীর সাথে পুলিশও অনুমান করল মূর্তি, সাপ ইত্যাদির অবৈধ ব্যবসার সাথে হয়তো জড়িত ছিল বিল্লাল। টাকাপয়সাতে বনিবনা না হওয়ায় খুনটা হয়েছে আরেক পার্টির হাতে। শুধু দশহাজার টাকার পড়ে থাকাটা কিছুতেই মিলল না।

যথারীতি রমিজের ডাক পড়ল কবর খোঁড়ার জন্য। রমিজ তার কোদাল শাবল নিয়ে পৌঁছে গেল; নতুন একটা জায়গার মাটি কোপাতে শুরু করল।

গোরস্তানের পাশের রাস্তায়, নসিমন স্ট্যান্ডে, হাড়ি-পাতিল-পোটলা আর ছোট ছেলেটাকে নিয়ে বড় ছেলের করিমনে বসে আছে রমিজের বউ। গোর খোঁড়া শেষ হলেই রমিজ তাদের নিয়ে চলে যাবে। ছোট ছেলেটার কথা মতো তারা নদীর ‘হোই পাড়ে’ই যাবে। সেখানে ঘর তুলতে পারবে কিনা কে জানে!

কোপের পর কোপ পড়ছে কোদালের। নতুন ঘর তৈরি হচ্ছে। বিল্লালের জন্য ঘর। কোদাল চালাতে চালাতে আজ প্রথমবারের মতো রমিজ মিয়া তার মৃত মেয়েটার জন্য কাঁদল।




লেখক পরিচিতি

আহমেদ খান হীরক
জন্মসাল- ১৯৮১
জন্মস্থান- রহনপুর, রাজশাহী, বাংলাদেশ।
বর্তমান আবাসস্থল-ঢাকা, বাংলাদেশ।
পেশা- লেখক, টুন বাংলা এ্যানিমেশন স্টুড...
প্রকাশিত লেখা- উত্তরাধিকার, নতুন ধারা ইত্যাদিসহ বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা।
প্রকাশিত গ্রন্থ- কাব্যগ্রন্থ- আত্মহননের পূর্বপাঠ।
ইমেইল- hirok_khan@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন