সোমবার, ১০ মার্চ, ২০১৪

রেজা ঘটকের প্রকাশিত বই নিয়ে নিজের কথা

রেজা ঘটক বাংলাদেশের পরিচিত গল্পকার, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার। এ বছরের বইমেলায় তাঁর একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মনে করেন--যারা সিরিয়াস পাঠক তাদের হাতে 'পঞ্চভূতেষু' থাকাটাই স্বাভাবিক। 

নিজের বই নিয়ে তিনি লিখেছেন--

এ বছর আমার পঞ্চম গল্প সংকলন 'পঞ্চভূতেষু' প্রকাশ পেয়েছে মেলায়। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন কবি আলফ্রেড খোকন। বইটি প্রকাশক ছায়াবীথি।

এর আগে আমার চারটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। 'বুনো বলেশ্বরী' প্রকাশ করেছিল পাঠসূত্র ২০০৮ সালে। বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পী মোবাশ্বির আলম মজুমদার। 'বুনো বলেশ্বরী' বইটিতে মোট নয়টি গল্প। আমি গ্রামের ছেলে। প্রথম গল্পের বইয়ে গ্রামের গল্পই বেশি। আমার গল্পের সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য প্রথমে আমার যে কোনো একটি গল্পের বই পড়ার জন্য পাঠকের প্রতি অনুরোধ রইল। পাঠক যদি মনে করেন, আমার গল্প তার ভালো লেগেছে, তাহলে আমার অন্য গল্পের বইগুলো পাঠক নিজেই সংগ্রহ করবেন। আর যদি পাঠক মনে করেন, আমার গল্প কোনো গল্পই না, তাহলে আমার দুর্বলতাগুলো কি, তা যদি দয়া করে আমাকে জানাতে পারেন, খুব ভালো হয়। কিন্তু আমি একটা বিষয় একটু জানিয়ে রাখতে চাই যে, যদি কোনো পাঠক প্রচলিত গল্পের বাইরে ভিন্ন স্বাদের গল্প পড়তে চান, তাহলে আমার গল্প তার ভালো লাগবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

২০১০ সালে প্রকাশিত হয় আমার দ্বিতীয় গল্প সংকলন 'সোনার কঙ্কাল'। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ঝন্টু যোগী। বইটি প্রকাশ করেছে বিবর্তন প্রকাশন। বইটিতে মোট নয়টি গল্প। 'সোনার কঙ্কাল' গল্পটি যিনি পড়বেন, তিনি আমার অন্য গল্পগুলো পড়ার জন্য আগ্রহী হবেন, এটা আমি হলপ করেই বলতে পারি। গল্পে বালক অনির্বাণ মায়ের লাশ চুরি করে চুরি বিদ্যায় হাতেখড়ি নেয়। 

আমার তৃতীয় গল্প সংকলন 'সাধুসংঘ'। বইটির প্রচ্ছদ করা হয়েছে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো'র মোসেস অবলম্বনে। বইটিতে মোট নয়টি গল্প। বইটি প্রকাশ করেছে আল-আমিন প্রকাশন। 'গান গল্প উদ্যান অথবা সাধুসংঘ' গল্পটি যারা পড়বেন, তারা সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ইতিহাসের সঙ্গে নিশ্চিত নতুনভাবে পরিচিত হবেন। 

আমার চতুর্থ গল্প সংকলন 'ভূমিপুত্র'। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী চারু পিন্টু। বইটিতে মোট সাতটি গল্প। বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ ২০১৩ সালে। যারা গল্পে নতুত্বের স্বাদ পেতে চান, তাদের এই গল্পগুলো ভালো লাগবে। 'ডিজিটাল গোরস্তান' নামে একটা গল্প আছে বইয়ে। এই গল্প পাঠককে গল্পের নতুন মোড়কের সঙ্গে পরিচিত করবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আর যারা অতি প্রাকৃত গল্প পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য 'সুনামি' নামে একটা গল্প আছে। মৃত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার কিভাবে নেওয়া যায়? যদি কেউ মৃত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিতে চান, তাদের অবশ্য পাঠ্য এই বইয়ের 'সাক্ষাৎকার' গল্পটি। 

আমার প্রথম উপন্যাস 'মা'। 'মা' প্রকাশ করেছে আল-আমিন প্রকাশন ২০১২ সালে। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী চারু পিন্টু। যারা ম্যক্সিম গোর্কি'র 'মা' পড়েছেন, বা মুনীর চৌধুরী'র 'জননী' পড়েছেন, বা শওকত ওসমান-এর 'জননী' পড়েছেন বা আনিসুল হকের 'মা' পড়েছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে আমার লেখা 'মা' উপন্যাসটি পড়ার জন্য। এই মা একজন বাঙালি মা। একজন গ্রামের মা। একজন সাধারণ অশিক্ষিত মা। যার সন্তানরা সবাই শিক্ষিত। যার কাকতলীয়ভাবে বারো মাসে বারোটি সন্তানের জন্ম। আটি ছেলে চারটি মেয়ে। তিনটি ছেলে ছোটবেলায় মারা যায়। আর একটি ছেলে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি বাড়িতে তার লেখা কিছু ডায়েরি ফেলে যায়। এই মা ছেলেকে মনে পড়লেই হারিয়ে যাওয়া সেই ছেলের লেখা ডায়েরির পাতা থেকে পড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকে একুশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত প্রায় সত্তর বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক ঘটনার প্রতিচ্ছবি মা এই ডায়েরি পড়ে ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। যারা ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য আমার 'মা' উপন্যাসটি একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। যারা ইতিহাসের সত্যিকার ঘটনার অন্তরালের খবরে উকি দিতে চান, তারা হয়তো আমার 'মা' উপন্যাসে অনেক অজানা তথ্যের সন।ধান পাবেন। 'মা' উপন্যাসটি শুরু হয়েছে এই বাঙালি মায়ের স্বামী'র শবযাত্রা দিয়ে। আর এটি শেষ হয়েছে হারিয়ে যাওয়া ছেলের একটি চিঠি দিয়ে। উপন্যাসে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মনান্তর, দেশ বিভাগ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, কয়েকজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সত্যিকারের পরিচিতি, কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের খবর, পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-আণ্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী, '৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনা, জেলহত্যা, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রে উত্তরণ, ডক্টর হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা, কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ড, সত্তরের ঘূর্ণিঝড় গোর্কি, ঘূর্ণিঝড় সিডর, হজ ও রেমিটেন্স, মহাভারত-রামায়ন, হিমালয় কন্যা নেপালের গল্পসহ অনেক অনেক ঘটনা ও ঘটনার ভিন্নধারার বিবরণ। প্রচলিত উপন্যাসের কোনো কাঠামো এই উপন্যাসে আমি গ্রহন করিনি। এই উপন্যাসের কাঠামো ও দেশ-কাল-স্থান আমার নিজস্ব স্টাইলে রচিত। যারা প্রচলিত উপন্যাস পড়ে অভ্যস্থ তাদের হয়তো এই উপন্যাস একটু বিচলিত করতে পারে, কিন্তু নতুনকে গ্রহন করার মত মানসিকতা নিয়ে আমার 'মা' উপন্যাসটি কেউ পড়া শুরু করলে, বাংলাদেশের সত্তর বছরের একটি কমপ্যাক্ট ধারণার পাশাপাশি একটি নতুন জিজ্ঞাসা হয়তো সেই পাঠকের মনের খোাড়াক যোগাবে।

আমার সমালোচনা সংকলন 'শূন্য দশমিক শূন্য'। বইটির প্রচ্ছদ করা হয়েছে অ্যান্টনিও কানোভা'র কুপিড কিস অবলম্বনে। বইটি প্রকাশ করেছে আল-আমিন প্রকাশন ২০১১ সালে। বইটির বৈশিষ্ট্য হল, এই বইয়ে অনেক বইয়ের সমালোচনা যেমন আছে, তেমনি আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার আলোকপাত। আছে জীবনের সংগ্রাম, চড়াই-উৎরাই, নানান ঘটনার অনুপুঙ্খ বয়ান। জীবনের অভিজ্ঞতাই সমালোচনার আলোকে এই বইয়ে গদ্যের আকারে সাজিয়েছি। যারা টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সত্যিকারের ইতিহাস জানতে চান, তাদের আমার এই বইটি পড়তে হবে। 

আমার শিশুতোষ গল্প সংকলন 'গপ্পো টপ্পো না সত্যি'। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী কিবরিয়া শাহীন। বইটি প্রকাশ করেছে জয়তী পাবিলকেসান্স ২০১১ সালে। বইটির সকল চরিত্র বাস্তবে বড় হচ্ছে। গল্পের চরিত্রগুলো আমার বন্ধুবান্ধবদের ছেলেমেয়ে-ভাইপো-ভাতিজা। এই লিলিপুট বাহিনী নানান ধরনের ঘটনা ঘটায়। একটার পর একটা দুর্ধর্ষ ঘটনা ঘটিয়ে এরা এখন রীতিমত সবাই হিরো। বইয়ে এদের অনেকের ছবিও আছে। এদের নিয়ে দৈনিক সমকালে নিয়মিত গল্প লিখতাম 'ঘাস-ফড়িং' পাতায়। সেই গল্পগুলো'র সংকলন 'গপ্পো টপ্পো না সত্যি'। 

সবকিছুর পরে আমি ছোটগল্পেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ অনুভব করি। তাই পাঠককে আমার গল্প পড়ার জন্য অনুরোধ করি। আমি নিশ্চিত যারা আমার একটি গল্পের বই পড়বেন, তারা নিজ গরজে আমার অন্য গল্পের বইগুলো সংগ্রহ করবেন। নইলে আর পঁচিশ বছর ধরে কি লিখি!!!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন