বুধবার, ৫ মার্চ, ২০১৪

সময় ও উত্তর আধুনিকতা: হাসান আজিজুল হক


উত্তর আধুনিকতার আলোচনার সূত্রপাত করতে হয় সময়ের আলোচনা দিয়ে। সময় তো কোন বস্তু নয় যে, তার ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা আছে। বলা হয়ে থাকে, সময়ের মাত্রা একটাই। তা হচ্ছে সময় পেছন থেকে সামনের দিকে যাচ্ছে। সময়ের ভাগটাও সেভাবেই করা হয়। যেটা পেছনে সেটা অতীত, যে মুহূর্তে আমি আছি, আমার বেঁচে থকার বোধটা আছে, তাকে বর্তমান বলছি। আর এখনো যেটা অভিজ্ঞতায় আসেনি, সামনে আছে, সেটাকে ভবিষ্যৎ বলছি। তবে কোথায়, কীভাবে আছে তা স্পষ্ট বলা যাচ্ছ না।
একটা গাছ, একটা নদী কোথায় আছে তা বলতে পারছি না। আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতা দিয়েই বলতে পারছি যে সময়টা আছে। আমি যখন থেকে সচেতন হয়েছি, তখন থেকেই দেখতে পাচ্ছি কিছু জিনিস পার হয়ে যায়, কিছু জিনিস মধ্যে থাকে এবং কিছু জিনিস সামনে। কাজেই সময়ের অস্তিত্বটাকে অন্যান্য জিনিসের মতো সমান ভাবে তুলনা করা যায় না। কেউ কেউ বলতে পারে, সময় জিনিসটা প্রকৃতিতে নেই আছে মানুষের সচেতনতায়। সচেতনতা যদি না থাকে, তাহলে সময়ও নেই। সেজন্য সব মানুষের যদি মৃত্যু হয়, তাহলে সময়ের বোধ কিংবা অস্তিত্ব আর থাকবে কিনা বলা যায় না। হকিংস যেমন বলেছেন যে সময়ের শুরুও আছে, শেষও আছে। অর্থাৎ সময়কে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা কিছুটা অ্যান্টিনমি কিংবা স্ববিরোধিতার মধ্যে ঢুকে পড়ি। কেননা সময় জিনিসটার ধারণা, নিজেই নিজের স্ববিরোধিতা করে অনেক সময়। সে কারণে সাধারণ ভাবে দেখাটাই ভালো- অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ।
যদি সময়ের অস্তিত্ব শুধু চেতনাতেই আছে বলে মনে করা যায়, তাহলে সময়ের যে কোনো জায়গাকে অর্থাৎ কালখণ্ডকে যে কোন একটি নাম দেওয়াই যায়। কারণ সময় যেভাবে বিভাজিত হচ্ছে, যেভাবে সময়কে দেখছে সেভাবেই। তাহলে তো সময়ের একটি বিভাজিত অংশকে কেউ উত্তর আধুনিক নাম দিতেই পারে। উত্তর আধুনিকরা বলতে পারে যে, প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ, আদিম যুগ- এগুলো সবই মনগড়া বিভাজন। কোন একজন বা একদল সচেতন মানুষ সময়কে এভাবে বিভাজিত করেছেন। অর্থাৎ চেতনার মধ্যেই ভাগ করেছেন। কোন অবজেকটিভ এখানে হয়নি। তা যদি যুক্ত হয় তাহলে উত্তর আধুনিক নামক বিভাজনটাকে মেনে নিতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আপত্তিটা করতে হচ্ছে। কেননা উত্তর আধুনিকরা একটা জিনিস মনে রাখেন যে, আধুনিকতা তখনই হবে যখন সেই সময়ের সমাজ, মানুষ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজব্যাবস্থা তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হবে। এগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত না হলে কিছুতেই সমকালীন হবে না, আধুনিক তো নয়ই। আমি এই সময়ে বেঁচে আছি, লিখছি, কিন্তু বসে আছি মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা নিয়ে। তাহলে আমি কিছুতেই সমকালীন মানুষ নই, আধুনিক তো নই-ই। কাজেই বলা যেতে পারে, প্লেটো অমুক সালে জন্মগ্রহণ করেছেন বলেই তিনি প্রাচীনকালের মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন, এই মন্তব্যটা ভুল। নির্মাণ-বিনির্মাণের ব্যাখ্যাটি এখানে এসে হোঁচট খায়। কেননা আমরা তো অতীতকে টেনে যেমন বর্তমানকে আনতে পারি, বর্তমানকে প্রসারিত করে তেমনি ভবিষ্যতে নিয়ে যেতে পারি। এভাবে চিন্তা না করে কেউ যদি উত্তর আধুনিকদের মতো মনোডাইমেনশনে দেখে সেটা ভুল। আশির দশক ধরে, শতক ধরে যে আধুনিকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটাও ভুল। যদি ভুল নাই হতো তাহলে এতো শত বছর পড়ে কেউ হোমার পড়তো না।
এখন কথা হচ্ছে, আধুনিকতাকে শুধু একটি কালখণ্ড দিয়ে চিহ্নিত করা হয়নি। চিহ্নিত করা হয়েছে কিছু লক্ষণ দিয়ে। কিছু অর্জন দিয়ে। যেমন ইহজাগতিকতা, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, যেমন বিজ্ঞানমনস্কতা, যেমন যুক্তিবাদিতা। মানুষ তার বিবর্তনের পদযাত্রায় যেসব অর্জন নিয়ে শ্রদ্ধাবোধ করতো ইহজাগতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদিতা ইত্যাদি হচ্ছে সেগুলার মধ্যে অন্যতম।
আধুনিকতাকে অস্বীকার করতে গেলে এসব অর্জনকেও অস্বীকার করতে হয়। হয় অস্বীকার করেতে হয় অথবা বলতে হয় যে, এগুলোর চেয়ে উন্নততর বোধ বা উত্তর আধুনিকতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে বা দিতে যাচ্ছে।
সময় যদি ঘটনাবিহীন হয় তাহলে সেটাকে সময় ধরা হয় না। সময় মানে পরিবর্তন। আর পরিবর্তন মানেই কোন না কোন ঘটনা। যেমন ঘুমের মধ্যে মানুষের কোন সময় নেই। কেননা যে ঘুমিয়ে, তার ক্ষেত্রে সময় কিছু ঘটেনি অর্থাৎ তার জন্য ঘটনাও নেই, সময়ও নেই। উত্তর আধুনিক তত্ত্ব অনুসারে যেহেতু সময় মানেই কিছু ঘটনা, ইতিহাস মানে কিছু ঘটনা, কাজেই বলা যায় ইউরোপে আমরা যাওয়ার আগে আফ্রিয়া মহাদেশে কিছু ঘটেনি। আফ্রিকার কোনো ইতিহাস নেই।
আমি মনে করি, ইলাস্টিসিটি নমনীয়তা যদি আমার না থাকে তাহলে লেখক হিসেবে আমার কোন অর্থ থাকে না। সেই হিসেবে এক কথায় উত্তর আধুনিকতাকে নাকচ করে দেয়ার প্রবনতা আমি পোষণ করি না। কিন্তু উত্তর আধুনিকতা এমন জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে যেখানে কোন ক্ষেত্রে ইভ্যালুয়েশন বলে কিছু থাকছে না। সাহিত্যের ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অনুৎকর্ষ, ভালো মন্দ বলে কোনো কিছু থাকছে না। কী শিল্প, কী সাহিত্য, সম্পূর্ণটা চলে যাচ্ছে পাঠকদের দিকে। ফলে উত্তর আধুনিকতার দিকে তাকালে শিল্প-সাহিত্যের আলোচনা-সমালোচনা, উৎকর্ষ-অপকর্ষের চিন্তাকেই তুলে দিতে হয়। দিয়ে বলতে হয়, ‘পথের পাঁচালী’ নিছকই একটা টেক্সট। এই টেক্সটি আমি যতবার পড়ে শেষ করছি, ততবার টেক্সটি পাল্টাচ্ছে। যখন একজন পাঠক দশবার ‘পথের পাঁচালী’ পড়ছে, তখন দশটি টেক্সট হচ্ছে। এই দশটি টেক্সটের বাইরে ‘পথের পাঁচালী’র আর কোন অস্তিত্ব থাকছে না। থাকছে না যুগোত্তীর্ণ বলেও কিছু। সেই হিসেবে তত্ত্বটি যে সৃজনশীল লেখকের জন্য ক্ষতিকর সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয় ব্যাপারটি হচ্ছে, এদের বক্তব্য অন্যের জন্য পরিস্কারভাবে বুঝতে পারার ব্যাপারটা এরা কখনোই রাখেন না। অনেক সময় এদের চরম সঠিক বলে মনে হয়। মনে হয় এরা মানুষের খুব বড় মাপের মুক্তির কথা বলেন। কিন্তু আদতে তা নয়। এই তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে যে সাম্যের কথা বলা হচ্ছে, তা খণ্ডিত মানুষের সাম্য। মানুষ এবং মানুষ্যসৃষ্ট সব শিল্প সাহিত্য, সংস্কৃতিকে এরা এমন একটি জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে সব ব্যাপার প্রায় নিরর্থক হয়ে পড়ে। এর নিজস্ব অর্থ নিজস্ব সত্তা বলে কিছু আর থাকছে না। এটা এই তত্ত্বের একটি প্রধান অসুবিধা বলে আমি মনে করি।
এই তত্ত্বের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির ভীষণ মিল। এতে আর কোন কিছুকে পার্থক্য করা হচ্ছে না। গোটা পৃথিবীকে একটা বাজার ছাড়া আর কোনভাবে দেখা হচ্ছে না। সেখানে পণ্য কার জন্য বা কাকে দেওয়া হবে কি হবে না, তা ভাবা হয় না। মানুষকে শুধু পণ্য সৃষ্টিকারী এবং পণ্য ক্রেতা—এই দুইএর বাইরে অন্য কোন শ্রেণীবিভাগ করা হয় না—এই দুইয়ের বাইরে অন্যভাবে দেখার দরকার আছে বলে মনে করা হয় না। সেখানে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির সঙ্গে এই তত্ত্ব সহযোগিতা করে চলে। ফলে পণ্য সৃষ্টিকারী প্রথম বিশ্বে হয়তো এই তত্ত্ব প্রয়োজনীয়, হয়তো নয় কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য এই তত্ত্ব খুবই বিপজ্জনক।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী সময়ের অতীত নেই, বর্তমান নেই, আধুনিক নেই। ফলে আধুনিকতাও নেই। তার ফলে দাঁড়াচ্ছে এইযে, আধুনিকতা বলে যেটুকু আমাদের আছে বলে আমরা চিহ্নিত করেছি, বাঙালি সংস্কৃতি ইউরোপীয় রেনেসাঁস থেকে যতোটুকু সদর্থকতা গ্রহন করেছিল সেটুকুও তখন আর নেই। অর্থাৎ ইহজাগতিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদিতা—সবটুকু বাতিল হয়ে যাচ্ছে। তখন আমাদের মৌলবাদী এবং চরম সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, যারা ইতিহাসকে টেনে পেছন দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, সব অর্জনের মূলে কুঠারাঘাত করতে চাইছে, তারা তাদের কাজের সপক্ষে চমৎকার যুক্তি এই তত্ত্ব থেকে পেয়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে যেটা দাঁড়াচ্ছে, এর মাধ্যমে অবয়ব পেয়ে যাচ্ছে একটি চরমতম প্রতিক্রিয়াশীলতা। আমি শুধু একদিক থেকে ব্যাপারটিকে দেখার চেষ্টা করছি না। যদি এই তত্ত্ব আমাদের সৃজনশীলতাকে সাহায্য করে তবে তাকে গ্রহন করতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে লেখকদের নিজস্ব দীপ্তি না থাকলে কোন তত্ত্বই তাকে সাহায্য করতে পারে না। উত্তর আধুনিকতা নিয়ে এক শ্রেণীর তরুণ লেখকের মাতামাতি আমরা দেখছি। এটা খুব স্বাভাবিক। নতুন প্রজন্ম সবসময় নতুন কিছুকে আবাহন করে। তবে তার মধ্যে যে খানা খন্দগুলো থাকে সেগুলোর কথাও ভাবা দরকার। কিন্তু যার কেবল মাত্র দাঁত গজিয়েছে, সে সবকিছুকেই কামড়াতে চায়। এমনটি আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল ষাটের দশকে। সুরিয়ালিজম, দাদাইজম, কিউবিজম। এখন ধুলো সরিয়ে দেখা যাচ্ছে সোনা কম, পিতলই বেশি। সোনা যেটুকু আছে তাও লেখকের নিজস্ব ব্যাপার।
লেখক: প্রখ্যাত ছোটগল্পকার ও কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন