বুধবার, ৫ মার্চ, ২০১৪

ফ্রানৎস কাফকা.র গল্প এক গ্রাম্য ডাক্তার

ভাষান্তর: মাসরুর আরেফিন

বিরাট দ্বিধার মধ্যে আছি আমি; জরুরি একটা ডাকে বেরুতে হবে আমাকে; খুবই অসুস্থ এক রোগী আমার জন্য অপেক্ষা করছে দশ মাইল দূরের এক গ্রামে; তার আর আমার মধ্যের বিশাল পথ ভরে আছে ঘন ঝড়ো তুষারে; চার চাকার একটা ঘোড়াগাড়ি আছে আমার, বড় চাকাওয়ালা হালকা একটা গাড়ি, আমাদের গাঁয়ের রাস্তার জন্য একদম ঠিক জিনিস; আমার পশুর লোমে বানানো কোটটাতে শরীর মুড়িয়ে নিয়ে, ডাক্তারির জিনিসপত্তরের ব্যাগ হাতে ধরে, রওনা দেবার জন্য পুরো তৈরি হয়ে আমি উঠোনে দাঁড়ালাম; কিন্তু ঘোড়াটা কোথাও নেই, ঘোড়াটা।
আমার নিজের ঘোড়াটা কাল রাতে এই বরফ-ঢাকা শীতকালের বেশি খাটাখাটনিতে ক্লান্ত হয়ে মারা গেছে; এখন রোজ নামে আমার কাজের মেয়েটা গ্রাম জুড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে একটা ঘোড়া ধার করবে বলে; কিন্তু আমি জানি, ওতে কোনো কাজ হবে না; নিরর্থক আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি এখানে, তুষারে ঢাকা পড়ছি আরও আরও বেশি করে, আর ততই বেশি নড়বার ক্ষমতা হারিয়ে বসছি। রোজকে দেখা গেল গেটে দাঁড়িয়ে আছে, একা, হাতের লণ্ঠন দোলাচ্ছে; ঠিকই তো, কে এই এত রাতে এরকম একটা সফরের জন্য তার ঘোড়া ধার দেবে? আবার একবার উঠানে পায়চারি করলাম আমি; কোনো বুদ্ধি মাথায় এলো না; না বুঝেই, এ রকম এক হতাশ অবস্থায় হাবুডুবু খেয়ে, একটা লাথি মেরে বসলাম শুয়োরের খোঁয়াড়টার পচে যাওয়া দরজায়, খোঁয়াড়টা ব্যবহার করা হয়নি অনেক বছর। দরজা খুলে গেল, কবজার ওপর দাঁড়িয়ে বাড়ি খেতে লাগলো এদিক-ওদিক। ভেতর থেকে একটা ভাপ বেরোলো, আর ঘোড়ার মতো একটা গন্ধ। ভেতরে একটা দড়িতে ঝুলছে টিমটিমে আস্তাবলের লণ্ঠন। একজন মানুষ পাছায় ভর দিয়ে গুটিসুটি বসে আছে ওই নিচু ছাউনির খোঁয়াড়টার মধ্যে, সে তার নীল চোখের অমায়িক মুখটা তুলে তাকালো। ‘আমি কি ঘোড়াগুলো জুড়বো গাড়িতে?’ চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল সে। কী বলবো তা বুঝে পেলাম না, কেবল মাথা নোয়ালাম ওই খোঁয়াড়ে আর কী আছে তা দেখার জন্য। কাজের মেয়ে আমার পাশে দাঁড়ানো, সে বললো, ‘নিজের ঘরের মধ্যে কী লুকানো থাকে তা নিজেরাই জানি না’, আর হেসে ফেললাম আমরা দু’জনে।

‘ও ভাই গো, ও বোন গো!’ ডাক দিলো সহিস আর দুটো ঘোড়া, পুরু-মোটা পাছার দুই প্রকাণ্ড জীব, একটার পেছনে অন্যটা, স্রেফ ওদের মোচড়ানো শরীরের শক্তি দিয়েই ঘুরে বেরিয়ে এলো সামনের দিকে, ওদের পাগুলো শরীরের ভাঁজে টানটান হয়ে আছে, সুঠাম মাথা দুটো নুয়ে আছে উটের মতো, দরজার ফুটোটা গলে [ওটা ভরে গেছে তাদের শরীরের আয়তনে] বেরিয়ে এলো ওরা। পরমুহূর্তে লম্বা পায়ের উপরে উঁচু হয়ে উঠে দাঁড়ালো, ওদের লোম থেকে বেরুচ্ছে একটা ঘন বাষ্পের মেঘ। ‘ওকে একটু সাহায্য করো’, আমি বললাম, কাজের মেয়েটা নিজের থেকেই জলদি এগিয়ে এলো সহিসকে ঘোড়া জুতবার জিনিসগুলো দিতে। কিন্তু মেয়েটা ঠিকমতো তার কাছে যেতেও পারেনি, সহিস তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো, নিজের মুখ চেপে ধরলো মেয়েটার মুখে। মেয়েটা চিৎকার করে ছুটে এলো আমার কাছে; তার গালে দুই সারি দাঁতের লাল চিহ্ন পড়ে গেছে। ‘অই জানোয়ার’, আমি রাগে চিৎকার দিলাম, ‘চাবকানো লাগবে নাকি তোকে?’ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো, এ একটা অচেনা লোক; আমি জানিও না কোত্থেকে সে এসেছে, আর সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সে এগিয়ে এসেছে আমাকে সাহায্য করতে, যখন কিনা বাকি সবাই আমাকে হতাশই করেছে শুধু। যেন সে জানে যে, আমি কী ভাবছি, তাই আমার ধমকে সে মনোক্ষুণ্ন হলো না, কেবল ঘোড়াগুলো নিয়ে ব্যস্ত অবস্থায়— একবার ঘুরে দেখলো আমাকে। ‘উঠুন’, বললো সে, আর আসলেই সবকিছু তৈরি। আমি খেয়াল করলাম, এর আগে কোনোদিন এত সুন্দর ঘোড়ার গাড়িতে উঠিনি, তাই খুশি মনে চড়ে বসলাম। ‘গাড়ি আমি চালাবো, তুমি পথ চেনো না’, বললাম আমি। ‘অবশ্যই’, সে বললো, ‘আমি তো আর আপনার সঙ্গে আসছি না, আমি রোজের সঙ্গে থাকছি।’ ‘না’, তীক্ষষ্ট চিৎকার দিলো রোজ, আর নিজের অবধারিত নিয়তিকে ঠিক অনুমান করতে পেরেই দৌড়ে পালালো ঘরের মধ্যে; আমার কানে এলো দরজায় সে শিকল বাঁধছে ঝনঝন শব্দ করে; শুনলাম তালা লাগানোর শব্দও; এমনকি আমি দেখতে পাচ্ছি কীভাবে সে নিভিয়ে দিচ্ছে বসার ঘরের বাতি, তারপর সবগুলো ঘরে দৌড়ে দৌড়ে ওগুলো অন্ধকার করে দিচ্ছে, যেন তাকে খুঁজে বের করা না যায়। ‘তুমি আমার সঙ্গে আসছো, সহিসকে বললাম আমি, তা না হলে যত জরুরিই হোক না কেন, আমি যাওয়া বাতিল করছি। তোমার ঘোড়ায় চড়ার দাম হিসেবে আমি তো মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিতে পারি না।’ ‘হেঁট, হেঁট’! চিৎকার করলো সে; হাত দিয়ে তালি বাজালো; ঘোড়ার গাড়িটা ঘূর্ণি খেয়ে উড়ে গেল স্রোতের মধ্যে কোনো কাঠের টুকরার মতো; আমি কেবল ওটুকুই শুনতে পেলাম যে, সহিসের ধাক্কার মুখে আমার বাড়ির দরজা দড়াম করে খুলে ভেঙে পড়েছে, এরপর একটা প্রবল ঝড়ো হাওয়ায় আমার চোখ, কান আর বাকি সব ইন্দ্রিয় অসাড় হয়ে এলো। কিন্তু সেটাও কেবল এক মুহূর্তের জন্য, কারণ মনে হলো আমার নিজের বাসার গেট যেন সোজা খুলে গেছে সেই রোগীর বাসার উঠানে, আমি হাজির; ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে শান্ত হয়ে; বরফ পড়া থেমেছে, চারপাশে চাঁদের আলো; আমার রোগীর বাবা-মা ছুটে এলেন বাড়ির ভেতর থেকে; রোগীর বোন ওদের পেছনে; গাড়ি থেকে আমাকে বলতে গেলে কোলে তুলে নেওয়া হলো; এদের হিজিবিজি কথাবার্তার কিছুই ধরতে পারছি না আমি; রোগীর বদ্ধ ঘরের হাওয়ায় প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসবে এমন অবস্থা; ফেলে রাখা স্টোভটা থেকে ধোঁয়া উঠছে; আমাকে ধাক্কা দিয়ে জানালা খুলতে হলো; কিন্তু সবার আগে আমি চাচ্ছি রোগীকে দেখতে। দুবলা-পাতলা, গায়ে কোনো জ্বর নেই, গা না ঠাণ্ডা না গরম, চোখে শূন্য দৃষ্টি, গা খালি, কিশোর বয়সী ছেলেটা বিছানার চাদর থেকে শরীর তুললো, আমার গলা জড়িয়ে ধরলো আর কানে ফিসফিস করে বললো : ‘ডাক্তার, আমাকে মরতে দিন।’ আমি তাকালাম চারপাশে; কেউ শোনেনি; ছেলের বাবা-মা কোনো শব্দ না করে সামনে ঝুঁকে আছেন আর আমার রায়ের অপেক্ষা করছেন; ওর বোন আমার ব্যাগ রাখার জন্য একটা চেয়ার নিয়ে এসেছে। আমি ব্যাগ খুলে ডাক্তারির জিনিসপত্তরের মধ্যে ঘাঁটতে লাগলাম; ছেলেটা বারবার তার অনুরোধ মনে করিয়ে দেবার জন্য বিছানা থেকে আমার কাছে আসতে চেষ্টা করছে; ছোট সাঁড়াশিটা হাতে তুললাম আমি, মোমের আলোয় ওটা পরখ করলাম, তারপর আবার রেখে দিলাম ব্যাগের মধ্যে। ‘হ্যাঁ’, অধার্মিকের মতো ভাবলাম আমি, ‘এ রকম অবস্থায় পেঁৗছানোর পরে খোদা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। হারানো ঘোড়া ফেরত পাঠান, তাড়া বুঝতে পেরে আরও একটা ঘোড়া যোগ করে দেন, আর ষোলআনা পূরণ করতেই একটা সহিসও পাঠান—’ এ পর্যন্ত এসে হঠাৎ আমার মনে গেল রোজ মেয়েটার কথা; আমার করার আছেইবা কী, কী করে আমি বাঁচাবো ওকে, কী করে ওকে ওই সহিসের নিচ থেকে টেনে বের করবো, ওর থেকে এই দশ মাইল দূরে, আর আমার গাড়িতে-জোড়া বেপরোয়া ঘোড়াগুলো নিয়ে? এই ঘোড়াগুলো, ওদের লাগাম যেন ওরা কী করে খুলে ফেলেছে; বাইরে থেকে গুঁতো দিয়ে কী করে যেন জানালাও খুলেছে, কী করে আমি জানি না; ওরা দুটো দুই আলাদা জানালা দিয়ে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছে, আর এ বাসার লোকজনের চিৎকারে কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে গভীর মন দিয়ে দেখছে রোগীকে। ‘খুব শিগগিরই রওনা হয়ে বাড়ি ফিরছি আমি, মনে মনে বললাম’, যেন বা ঘোড়াগুলো আমাকে যাত্রা শুরু করার জন্য ডাকছে, তারপরও বাধা দিলাম না যখন রোগীর বোন [সে ভাবছে আমার খুব গরম লাগছে] আমার কোট খুলে দিতে লাগলো। আমার সামনে রাখা হলো এক গ্গ্নাস রাম, বুড়ো লোকটা আমার কাঁধে চাপড় দিলেন, তার এ মহামূল্যবান সম্পদ আমাকে খেতে দিয়ে তিনি আমার আপন হবার অধিকার পেয়ে গেছেন। আমি মাথা ঝাঁকালাম; বুড়ো মানুষটার চিন্তার সংকীর্ণতা দেখে আমার নিজেকে অসুস্থ লাগছে; স্রেফ এ কারণেই আমি ফিরিয়ে দিলাম তার রামের গ্লাস।

ছেলের মা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছে ওখানে; আমি তাই করলাম, আর যখন একটা ঘোড়া জোরে চিঁ-হি-হি করে ছাদের দিকে মাথা তুলে ডেকে উঠলো, আমি ছেলেটার বুকে মাথা রাখলাম, আমার ভেজা দাড়ির ছোঁয়ায় কাঁপতে লাগলো সে। যা আমি এরই মধ্যে আন্দাজ করে ফেলেছি, তাই নিশ্চিত হলো : এ ছেলের কিছুই হয়নি, তার মা দুশ্চিন্তার তোড়ে তাকে এত বেশি কফি খাইয়েছেন যে, তার রক্ত চলাচল খানিক ক্ষীণ হয়ে গেছে; কিন্তু ওটুকুই, তার স্বাস্থ্য একদম ভালো, আরও ভালো হয় এখুনি ওকে লাথি মেরে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিলে। কিন্তু পুরো দুনিয়া ঠিক করার দায়িত্ব আমি নিয়ে আসিনি, তাই তাকে শুয়ে থাকতেই দিলাম। আমি চাকরি করি জেলা প্রশাসনের আওতায়, আমার কাজ আমি করি একটা মানুষের পক্ষে যতটা করা সম্ভব তার চেয়েও বেশি নিবেদিত প্রাণে। যদিও মাইনে পাই খুব সামান্য, তারপরও মানুষের জন্য আমার দয়ামায়ার কমতি নেই, গরিব মানুষের জন্য সব সময় খাটতে রাজি। রোজ-এর দেখভালের বিষয়টাই আমাকে যা ভাবায়; তারপর এই ছেলে শুধু না, আমি নিজে মরে গেলেও আমার আর দুঃখ থাকবে না। এই বিরামহীন শীতকালে আমি করছিইটা কী এখানে! আমার নিজের ঘোড়া হাওয়া হয়ে গেছে, আর গ্রামে একটা লোকও নেই যে তারটা আমাকে ধার দেবে। শুয়োরের খোঁয়াড় থেকে আমাকে একজোড়া বার করতে হলো; ওরা যদি ঘোড়া না হতো, তাহলে আমাকে মাদী শুয়োরের পিঠে চেপে আসতে হতো এখানে। ব্যাপারটা এমনই। আমি মাথা নাড়লাম পরিবারের লোকজনের উদ্দেশে। এরা এসবের কিছুই জানে না, আর যদি জানতোও, তবু বিশ্বাস করতো না। প্রেসক্রিপশন লেখা সোজা, কিন্তু গাঁয়ের লোকের সঙ্গে মানিয়ে চলা অনেক কঠিন। হুঁ, আমার আজকের ভিজিট তাহলে মনে হচ্ছে এখানেই শেষ; আরও একবার আমাকে জ্বালানো হলো বিনা কারণে; আমার অভ্যাস হয়ে গেছে এসবে, আমার বাড়ির কলিংবেল বাজিয়ে বাজিয়ে পুরো জেলার লোকজন আমাকে উত্ত্যক্ত করে; কিন্তু তাই বলে এবার যা হলো, রোজকে ফেলে রেখে আসতে হলো, আহারে ফর্সা বাচ্চা মেয়েটা কত বছর ধরে আমার বাড়িতে, কখনোই বলতে গেলে ওর খেয়াল নেওয়াই হয়নি আমার — এই কোরবানি অনেক বেশি হয়ে গেছে, যে কোনোভাবে হোক এখন আমাকে এটা মাথার মধ্যে হালকা করে আনতে হবে, না হলে আমার সব রাগ গিয়ে পড়বে এই পরিবারটার ওপর, হায়রে ওরা সারা দুনিয়ার সদিচ্ছা নিয়েও তো আর রোজকে আমার কাছে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু তারপরও, আমি যখন আমার ব্যাগ বন্ধ করছি, কোটটা আমাকে দিতে ইশারা করছি, যখন পুরো পরিবার একসঙ্গে ওখানে দাঁড়িয়ে, ছেলের বাবা রামের গ্গ্নাস নাকে নিয়ে শুঁকছেন, ছেলের মা খুব সম্ভব আমার ব্যাপারে হতাশ হয়ে — আচ্ছা, মানুষ আশা করেটা কী? — চোখ ছলছল করে তার ঠোঁট কামড়াচ্ছেন, আর যখন ছেলের বোন একটা রক্তে ভেজা রুমাল হাতে তুলে নাড়াচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে তখন শেষমেশ আমি মোটামুটি মানতে রাজি হলাম যে, ছেলেটা হয়তো আসলেই অসুস্থ। আমি ওর কাছে গেলাম, সে আমার উদ্দেশে হালকা একটু হাসলো যেন আমি ওর জন্য সবচাইতে পুষ্টিকর কোনো স্যুপ নিয়ে এসেছি — আহ্, এখন দুটো ঘোড়াই ডাক ছাড়ছে; কোনো সন্দেহ নেই ওকে আমার পরীক্ষা করে দেখার কাজ সহজ করার জন্যই আসমান থেকে আদেশ এসেছে এই ডাক দেবার — আর এবার আমি দেখলাম : হ্যাঁ, ছেলেটা অসুস্থ। তার ডান পাশে, পাছা ও কোমরের দিকে, আমার হাতের তালুর মতো বড় আকারের একটা ক্ষত খুলে বেরিয়ে আছে। গোলাপের মতো লাল আভা নিয়ে, গভীর অংশে কালো আর কিনারের দিকে রঙটা হালকা হয়ে — সূক্ষ্ম দানা দানা মতো, বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত চুইয়ে বেরুচ্ছে — ক্ষতটা হাঁ করে আছে মাটিতে পোঁতা বোমার মতো। দূর থেকে দেখতে এমনই লাগছে। কাছ থেকে দেখলে বিষয়টা আরও জটিল। কার সাধ্য তা দেখবে মুখে হালকা শিস না বাজিয়ে? অনেক পোকা, আমার কড়ে আঙুলের মতো মোটা আর লম্বা, এগুলোরও রক্ত-গোলাপ রঙ আর তার সঙ্গে রক্তের ছোপে ভরা, আঁকড়ে আছে ক্ষতের গভীরে, ওদের সাদা সাদা মাথা আর অসংখ্য ছোট পা নিয়ে কিলবিল করে মুচড়িয়ে উঠে আসতে চাইছে আলোর দিকে। হতভাগা কিশোর, তোমাকে সারিয়ে তোলার আর কারও সাধ্য নেই। তোমার বিশাল ক্ষতটা আমি খুঁজে পেয়েছি, তোমার শরীরের পাশের এই ফুল তোমাকে খতম করে দিচ্ছে। পরিবারটা এখন খুশি, তারা দেখছে আমি মন দিয়ে কাজ করছি; বোনটা বলছে মা-কে, মা বলছেন বাবাকে, আর বাবা বলছেন দেখতে আসা কিছু লোককে, যারা পা টিপে টিপে খোলা দরজার চাঁদের আলোর মধ্য দিয়ে, তাদের দুই হাত দু’পাশে ভারসাম্য রাখার জন্য বাড়িয়ে, এই ঘরে ঢুকেছে। ‘আপনি বাঁচাবেন আমাকে?’ ফোঁপানি দিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো ছেলেটা, তার এই জীবন্ত ক্ষত তাকে একদম হতবিহ্বল করে দিয়েছে।

এই হচ্ছে আমার জেলার লোকজন। সব সময় ডাক্তার সাহেবকে অসম্ভব সব আবদার জানানো তাদের স্বভাব। তাদের আগের সেই ধর্মবিশ্বাস আর নেই; পুরোহিত মশাই ঘরে বসে আছেন, তার বেদিতে পরার কাপড়গুলো এক এক করে ছিঁড়ে-কেটে ফেলছেন; কিন্তু ওদিকে ডাক্তারের কাছ থেকে মানুষের আশা যে তিনি তার শল্য চিকিৎসকের নাজুক হাত দিয়ে অলৌকিক জিনিস ঘটিয়ে দেবেন। তাহলে তাই হোক : আমি তো আর স্বেচ্ছায় রাজি হইনি, তোমরা যদি আমাকে পুজো-অর্চনার কাজেও ভুলভাবে লাগিয়ে দাও, আমি তাতেও বাধা দেবো না কোনো; এর চেয়ে ভালো আর কীইবা আমি আশা করবো, আমি, বুড়ো এক গ্রাম্য ডাক্তার, যার কাছ থেকে কাজের মেয়েটাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে!

তারপর এগিয়ে এলো তারা, পুরো পরিবার এবং গ্রামের সব প্রবীণ লোকজন, তারা সবাই মিলে আমাকে ন্যাংটো করলো; স্কুলে-পড়া-বাচ্চাদের একটা ধর্মগীতি গাইয়ের দল, দলের নেতৃত্বে তাদের শিক্ষক, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে খুব সাদামাটা সুরে গাওয়া শুরু করলো :

কাপড় খোলো ওর, তবেই তিনি অসুখ সারাবেন

যদি না সারান তো মেরে ফেলো তাকে!

এক ডাক্তারই তো সে, স্রেফ ডাক্তারই তো শুধু।

ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি, উলঙ্গ, মাথা নিচু করে আর দাড়িতে আঙুল বুলিয়ে শান্তভাবে দেখছি উপস্থিত সবাইকে। পুরো শান্ত-স্থির আমি, এদের সবার চাইতে উঁচুতে আমার মর্যাদা, আর আমি সেটাই থাকবো, যদিও তাতে আমার কোনো লাভ হচ্ছে না কারণ তারা এবার আমার মাথা ও পা দুটো ধরে তুলে ফেলেছে উপরে আর নিয়ে গেছে বিছানায়। এরা আমাকে শুইয়েছে দেয়ালের পাশে, ক্ষতের দিকটাতে। তারপর সবাই এরা চলে গেল ঘর ছেড়ে; দরজা বন্ধ করা হলো; গান থামলো; মেঘ ঢেকে দিল চাঁদকে; আমার চারপাশে পড়ে আছে গরম কাঁথা-কম্বল; খোলা জানালাগুলোয় ঘোড়ার মাথা দুটো সামনে-পেছনে দুলছে ছায়ার মতো। ‘আপনি জানেন কি’, শুনলাম একটা গলা আমার কানের মধ্যে বলছে, ‘আপনার ওপরে আমার তেমন কোনো বিশ্বাস নেই। অন্যদের মতোই আপনাকেও যেন কোত্থেকে ভাসিয়ে আনা হয়েছে, এমনও না যে, নিজের পায়ে ভর দিয়ে আপনি নিজেই এসেছেন। উপকার করার বদলে আপনি বেশ আমার মরবার বিছানায় আমার নিজের জায়গাটুকুও দখল করে নিয়েছেন। খুব চাচ্ছি যে, আপনার চোখ দুটো খুঁচে তুলে ফেলি।’ ‘তুমি ঠিকই বলেছ, কী লজ্জা! কিন্তু কী আর করার, আমি তো ডাক্তার। কী করার আছে আমার? বিশ্বাস করো, আমার জন্যও ব্যাপারটা সহজ না।’

‘আপনার এই অজুহাতে আমি সন্তুষ্ট থাকবো চাইছেন? ওহ, মনে হয় তা-ই থাকতে হবে। সব সময় আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এই দুনিয়াতে আমি এসেছি সুন্দর একটা ঘা নিয়ে; আমার সৌন্দর্য বলতে স্রেফ ওটুকুই।’ ‘বাচ্চা ছেলে বন্ধু আমার’, আমি তাকে বলি, ‘তোমার সমস্যা হচ্ছে : তোমার দেখার চোখ খুব সংকীর্ণ। আশপাশে যত রোগীর ঘর আছে, সব দেখা হয়ে গেছে আমার, তোমাকে শুধু এটাই বলতে পারি : তোমার ঘায়ের অবস্থা অন্যদের মতো অতো খারাপ না। কুড়ালের দুটো নিখুঁত বাঁকা আঘাতে এর জন্ম। অনেক লোক আছে যারা তাদের শরীরের পাশটা সামনে বাড়িয়ে দেয়, তারপরও বনে কুড়ালের আওয়াজ তাদের প্রায় কানেই আসে না, আর ওটা যে ওদের কাছে এগিয়ে আসছে তা বোঝার কথা তো বাদই দাও।’ ‘আসলেই তাই? নাকি আপনি আমার জ্বরের সুযোগ নিয়ে আমাকে যা খুশি মিথ্যা বলছেন?’ ‘সত্যিই তাই, একজন সরকারি ডাক্তার হিসেবে জবান দিচ্ছি তোমাকে।’ সে কথাটা বিশ্বাস করলো, স্থির হলো। কিন্তু এবার আমি নিজে এখান থেকে কী করে বেরুবো, তা ভাববার পালা। ঘোড়াগুলো এখন বিশ্বস্ত দাঁড়িয়ে আছে ওদের জায়গায়। কাপড়চোপড়, কোট আর ব্যাগ জড়ো করলাম তাড়াতাড়ি; ঠিকমতো সেজেগুজে বের হবার জন্য নষ্ট করার মতো সময় আমার হাতে নেই; ঘোড়া দুটো যে গতিতে এসেছে যদি সেই একই গতিতে ফেরত যায়, তাহলে তো এটা স্রেফ আমার এই বিছানা থেকে নিজের বিছানায় লাফ দেবার ব্যাপার। একটা ঘোড়া বাধ্যগত সেবকের মতো জানালা থেকে সরলো; আমি আমার সব জিনিসের পুঁটলিটা ছুঁড়ে মারলাম ঘোড়ার গাড়িতে; কোটটা উড়ে যাচ্ছিল একটু বেশিই দূরে, এটার একটা হাতা কোনোমতে একটা হুকে গিয়ে আটকে গেল। তাতেই চলবে। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম ঘোড়ার পিঠে। লাগামগুলো ঢিলে হয়ে হেঁচড়ে চলেছে পেছন পেছন, দুই ঘোড়া বলতে গেলে একসঙ্গে জোড়াই নেই, গাড়িটা পেছনে কোথায় কোনোমতে সঙ্গে চলেছে, শেষমেশ কোটটা আসছে মাটিতে তুষারে ঘষটে। ‘এবার চলো বিদ্যুতের বেগে!’ আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম, কিন্তু কোনো কাজ হলো না তাতে; বুড়ো মানুষদের মতো ধীরে আমরা হামা দিয়ে চলেছি তুষারের তেপান্তরে; অনেকক্ষণ ধরে আমরা পেছন দিকে শুনতে পেলাম বাচ্চাদের নতুন কিন্তু ভুল এক গান :

ও রোগীরা সব, ফুর্তি মনে থাকো

ডাক্তার শুয়ে আছে বিছানায় তোমাদের পাশে !

এভাবে কোনোদিনও আমি বাড়ি পৌঁছতে পারবো না; আমার ফুলেফেঁপে উঠতে থাকা ডাক্তারি চর্চার এই শেষ; এর পরের জন এসে আমার যা আছে সব কেড়ে নেবে, কিন্তু লাভ কী — আমার জায়গাটা নিতে কোনোদিনও পারবে না সে; আমার বাড়িতে ওই জঘন্য সহিস সব কিছু তোড়ফোঁড় করছে; রোজ মেয়েটা তার শিকার; ওসব নিয়ে ভাবতে রাজি নই আমি। উলঙ্গ, সবচেয়ে দুর্ভাগা এই সময়ের তুষারের কাছে অসহায় উন্মুক্ত হয়ে, পার্থিব এক চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি আর অপার্থিব ঘোড়াগুলো নিয়ে, এই বুড়ো লোক আমি উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার পশুর লোমে তৈরি কোট গাড়িটার পেছন থেকে ঝুলছে, কিন্তু ওটার কাছে পৌঁছাতে পারছি না আমি, আর আমার ব্যস্ত রোগীদের দলের কেউ আমাকে সাহায্য করতে একটা আঙুলও তুলছে না। জোচ্চুরি হলো আমার সাথে! জোচ্চুরি হলো! রাতের-ঘণ্টার ভুল আওয়াজে একবার সাড়া দিয়েছো কী — সেই ভুলের মাশুল দেওয়া শেষ হবে না, কোনোদিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন