গল্পপাঠ ১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?
বিনোদ ঘোষাল ১. সত্যি বলতে গল্প লেখার কথা কোনওদিনই ভাবিনি। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকতাম আর গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয় করতাম। স্বপ্ন দেখতাম একদিন খুব নামকরা মঞ্চাভিনেতা হব। আমাদ্র নিজেদের একটা গ্রুপ ছিল। খুব কষ্ট করে সবাইমিলে গ্রুপটা তৈরি করেছিলাম। ভালো নাম হয়েছিল আমাদের গ্রুপের। কিন্তু একদিন গ্রুপের ডাইরেক্টর আর অ্যাসিট্যান্ট ডাইরেক্টরের ঝগড়ায় গ্রুপটাই বন্ধ হয়ে গেল। এত কষ্ট হয়েছিল যে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলাম আর কোনওদিন স্টেজে দাঁড়াব না। সত্যি তারপর থেকে আর দাঁড়াইওনি।
কিন্তু অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর টের পেতে থাকলাম আমি ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। কারন আমি যা ভালোবাসতে চাই তা বোঝানোর মতো কাউকে পাচ্ছি না। বন্ধুদের মধ্যে সারাক্ষন থেকেও ভীষন একা লাগতে শুরু করেছিল আর সেইসঙ্গে একটা ভয়। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে তখন বেকার বন্ধুরা মিলে পাড়ার অর্জুন গাছের নিচে বসে দুবেলা আড্ডা মারি আর অর্জুনতলা স্ট্যান্ডের রিক্সাওলাদের সঙ্গে তাস খেলি। জীবনে কোনও লক্ষ নেই। একটা সিগারেট সাতজন মিলে খাই। কেউ পাঁড় বেকার কেউ হয়তো দু-তিনটে প্রাইভেট টিউশন করছে। এমন একটা সময়ে আমাদের এক বন্ধুর মা মারা গেলেন। ক্যান্সার হয়েছিল কাকিমার। আমাদের মা-দের মধ্যে ওই কাইমাকে সবথেকে বেশি সুন্দর দেখতে ছিল। সবাই মিলে শ্মশানে গেছি। আর একটু পরে চুল্লিতে ঢোকানো হবে। আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছিয়ার কাকিমাআমাদের সামনে ছোট্ট একটা কঞ্চির মাচায় শুয়ে। হঠাৎ কাকিমার মখের দিকে চোখ পড়ল আমার। কী অসহায় মুখটা। আমাদের পায়ের সামনে এইভাবে শুয়ে রয়েছে। বুকের ভেতর ভীষন মোচর দিল। মনে হল একটা মানুষ আজীবন তো বড় অসহায়, কিন্তু মৃত্যুর পরেও তাকে এত অসহায় লাগে নাকি?
অনুভূতিটা নিয়ে সেদিন বড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু কি যেন একটা বলার জন্য ভেতর থেকে বারবার ঠেলা দিতে থাকল। কী বলব জানি না, কীভাবে বলব জানি না। আসলে ভেতরে জমে ওঠা ওই কষ্টটা থেকে আমি নিস্তার চাইছিলাম কোনওভাবে উগড়ে দিয়ে। কিছু উপায় না পেয়ে একদিন দুম করে লিখে ফেললাম ডায়েরিরি পাতায়। গল্পের মতো করে। লেখার পর মনটা শান্ত হল। ভুলেও গেলাম একসময়।তার বেশ কয়েকমাস পর আমাদের পাড়ায় একটা গল্পপাঠ অনুষ্ঠান হবে, আমাদের পাড়ার এক সাহত্যিক দাদা আমাকে যেতে বলল আর যদি নিজের কোনও লেখা থাকে সেটাও সঙ্গে নিয়ে যেতে বলল। আমার তো কোনও লেখা নেই... ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল সেই লেখাটার কথা। ওটাই নিয়ে গেলাম। পড়ার সুযগও পেলাম। পড়া শেষ হওয়ার পর সকলের খুব প্রশংসা। গল্পটা নাকি হুব ভালো হয়েছে। আমাকে অনেকে বললেন দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতে। তাদের অথায় পাঠিয়েও দিলাম। নিশ্চিত ছিলাম ছাপবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মাস কয়েকের মধ্যে গল্পটা ছেপে গেল। আরও অনেকের প্রশংসায় ভেসে গেলাম আমি। সেটা ২০০৩ সাল। গল্পের নাম ছিল একটু জীবনের বর্ণনা। চিরকাল্পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম, খেলাধুলোতেও একেবারে পিছিয়ে পড়া। ফলে সেই জীবনে প্রথম সাবাশি পাওয়ার মোহে পড়ে গেলাম আমি। শুরু হয়ে গেল লেখা। স্রেফ সকলে প্রশংসা করবে আর আমি সেটা তারিয়ে তারিয়ে খাব এই লোভে, আর কোনও মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না, এখনও নেই। আমি আর কিছু পারি না, শুধু এটাই একটাধুটু পারি, তাই গল্প লিখি।
গল্পপাঠ ২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?
বিনোদ ঘোষাল ২. শুরুর দিকের লেখাগুলোতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাই সবসময় প্রাধান্য পেত। প্রধান চরিত্র বেশিরভাগ সময়েই হত একজন বেকার অল্পবএসি যুবক। তার মুখে গালাগাল, তার সব কিছুতে রাগ, আর গল্পগুলোতে মেলোড্রামা থাকত একটু বেশি। যদিও আমি আজও গল্পে একটু ড্রামায় বিশ্বাস করি। আমাকে এই ধরনের গল্প বেশি আকর্ষন করে।
গল্পপাঠ ৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?
বিনোদ ঘোষাল ৩. পৃথবীতে সাহিত্যই বোধ হয় একমাত্র শিল্প যা শিক্ষার জন্য কোনও প্রতিষ্ঠান নেই। সবাই সেলফ টট। একলব্যের মতো কাউকে মনে মনে গুরু ভেবে এগোতে হয়, নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। আমিও করেছি। দিনের পর দিন লিখে বারবার পড়ে দেখেছি কোথায় আমি অতিরিক্ত কথা বলছি, কোথায় থামা উচিৎ। একটা অক্ষরও যেন অতিরিক্ত না থাকে। আসলে আমার বহু আগেই কেন জানি না মনে হয়েছিল শিল্পের আসল মজা লুকিয়ে থাকে তার প্রকাশে নয়, আড়ালে। আমি যতটা বললাম তার থেকে যতটা না বললাম সেটাই আসল ক্ষমতার।
গল্পপাঠ ৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?
বিনোদ ঘোষাল ৪. আমার মনে হয় এ আমি আমার কোনও লেখায় আসলে কী বলতে চাইছি সেটা আবিস্কারের আনন্দ যেন পাঠককে দিতে পারি। মানে সব কৃতিত্ব যেন পাঠকের। তখনই একটা লেখা পড়ে পাঠক সব থেকে খুশি হয় যখন সে লেখকের কোনও না বলা কথাকে আবিস্কার করতে পারে। আমি সেই কৌশলটাকেই রপ্ত করার চেষ্টা করি। আর সেই সঙ্গে আরেকটা বিষয় সবসময় খেয়াল রাখি যে আমি আমার গল্পকে এমনভাবে বলব যেন মনে হয় গল্পটা আমি নয়, পাঠক আমাকে পড়ে শোনাচ্ছে। সেইজন্য আমি যখন লিখি, এখনও প্রত্যেকটা লাইনকে উচ্চারণ করে লিখি, যেন এমন কখনও না মনে হয় এটা লেখার ভাষা, বলার ভাষা নয়।
গল্পপাঠ ৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?
বিনোদ ঘোষাল ৫. প্রশ্নটা কঠিন। উত্তরটা আরও কঠিন। কিন্তু তবু আমি সরাসরি সহজ সত্যিটাই বলব, আমি মনে করি আমি এই সময়ের বাংলা গদ্যকারদের মধ্যে অবশ্যই প্রথম শ্রেণীর একজন। জানি কথাটা তীব্র অহংকারের। কিন্তু আমি যদি নিজে এটা না বিশ্বাস করি তাহলে আমি লিখতে পারব না। আর যদি বিনয় করি তাহলে মিথ্যি বলা হবে। কিন্তু এটাও ঘটনা, যখন দেখি আমার পূর্বজরা এবং এই সময়ের কোনও গদ্যকার আমার ভাবনার-ক্ষমতার বাইরের কোনও লেখা লিখেছেন যা আমি কোনওদিনও লিখতে পারব না, তখন ঠিক সেই মুহূর্তে আমি তাদের পায়ে মনে মনে চুম খাই এবং একই সঙ্গে তীব্র একটা ঈর্ষা বোধ করি। যে কেন এই লেখাটা আমি লিখতে পারলাম না। তবু বলব এয়াবৎ যা গল্প লিখেছি তার মধ্যে দু-একটা অন্তত থেকে যাবে। কিন্তু উপন্যাস আমি এখনও পারছি না। বাগে আনতে পারছি না।
গল্পপাঠ৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেনো তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন?
গল্পপাঠ ৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?
বিনোদ ঘোষাল ৭. আমি প্রথমত বাহবা পাওয়ার জন্য গল্প লিখি, খ্যাতির জন্য গল্প লিখি। দ্বিতীয়ত আমি খেয়াল করে দেখেছি আমি সব থেকে আনন্দে থাকি যখন একটা গল্পের মধ্যে থাকি। আর তৃতীয়ত লিখে টাকা পেতে আমার বেশ ভালো লাগে। বেশ উপরি রোজগারের মতো একটা ছিকছিকে আনন্দ। বেশ লাগে। আমি যেহেতু শুরু থেকেই বরাবর বানিজ়্যিক কাগজে গল্প লিখছি সুতরাং কোন পত্রিকার জন্য কোন ধরনের পাঠক সেটা আমাকে জানতেই হয়, এবং সেই মতো আমাকে লিখতে হয়। অনেক সময়েই দেখা যায় অবশ্য আমি যেমনটা চেয়েছিলাম গল্পটা ঠিক তার উল্টো হল। তখন আর সেই কাগজে দেওয়া গেল না। কিন্তু পাঠকের কথা মাথায় তো রাখতেই হয়, কিন্তু সেটা গল্প শুরুর প্রথমে। লেখা চলার সময় আমি নিজের কথাও ভাবি না, তখন শুধু গল্প কী চাইছে সেই ভাবেই চলি।
গল্পপাঠ ৮. এখন কি লিখছেন?
বিনোদ ঘোষাল ৮. এখন পয়লা বৈশাখ সংখ্যার জন্য কয়েকটা পত্রিকা গল্প চেয়েছে, সেগুলো লিখছি এক এক করে।
বিনোদ ঘোষাল ১. সত্যি বলতে গল্প লেখার কথা কোনওদিনই ভাবিনি। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকতাম আর গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয় করতাম। স্বপ্ন দেখতাম একদিন খুব নামকরা মঞ্চাভিনেতা হব। আমাদ্র নিজেদের একটা গ্রুপ ছিল। খুব কষ্ট করে সবাইমিলে গ্রুপটা তৈরি করেছিলাম। ভালো নাম হয়েছিল আমাদের গ্রুপের। কিন্তু একদিন গ্রুপের ডাইরেক্টর আর অ্যাসিট্যান্ট ডাইরেক্টরের ঝগড়ায় গ্রুপটাই বন্ধ হয়ে গেল। এত কষ্ট হয়েছিল যে প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলাম আর কোনওদিন স্টেজে দাঁড়াব না। সত্যি তারপর থেকে আর দাঁড়াইওনি।
কিন্তু অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর টের পেতে থাকলাম আমি ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। কারন আমি যা ভালোবাসতে চাই তা বোঝানোর মতো কাউকে পাচ্ছি না। বন্ধুদের মধ্যে সারাক্ষন থেকেও ভীষন একা লাগতে শুরু করেছিল আর সেইসঙ্গে একটা ভয়। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে তখন বেকার বন্ধুরা মিলে পাড়ার অর্জুন গাছের নিচে বসে দুবেলা আড্ডা মারি আর অর্জুনতলা স্ট্যান্ডের রিক্সাওলাদের সঙ্গে তাস খেলি। জীবনে কোনও লক্ষ নেই। একটা সিগারেট সাতজন মিলে খাই। কেউ পাঁড় বেকার কেউ হয়তো দু-তিনটে প্রাইভেট টিউশন করছে। এমন একটা সময়ে আমাদের এক বন্ধুর মা মারা গেলেন। ক্যান্সার হয়েছিল কাকিমার। আমাদের মা-দের মধ্যে ওই কাইমাকে সবথেকে বেশি সুন্দর দেখতে ছিল। সবাই মিলে শ্মশানে গেছি। আর একটু পরে চুল্লিতে ঢোকানো হবে। আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছিয়ার কাকিমাআমাদের সামনে ছোট্ট একটা কঞ্চির মাচায় শুয়ে। হঠাৎ কাকিমার মখের দিকে চোখ পড়ল আমার। কী অসহায় মুখটা। আমাদের পায়ের সামনে এইভাবে শুয়ে রয়েছে। বুকের ভেতর ভীষন মোচর দিল। মনে হল একটা মানুষ আজীবন তো বড় অসহায়, কিন্তু মৃত্যুর পরেও তাকে এত অসহায় লাগে নাকি?
অনুভূতিটা নিয়ে সেদিন বড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু কি যেন একটা বলার জন্য ভেতর থেকে বারবার ঠেলা দিতে থাকল। কী বলব জানি না, কীভাবে বলব জানি না। আসলে ভেতরে জমে ওঠা ওই কষ্টটা থেকে আমি নিস্তার চাইছিলাম কোনওভাবে উগড়ে দিয়ে। কিছু উপায় না পেয়ে একদিন দুম করে লিখে ফেললাম ডায়েরিরি পাতায়। গল্পের মতো করে। লেখার পর মনটা শান্ত হল। ভুলেও গেলাম একসময়।তার বেশ কয়েকমাস পর আমাদের পাড়ায় একটা গল্পপাঠ অনুষ্ঠান হবে, আমাদের পাড়ার এক সাহত্যিক দাদা আমাকে যেতে বলল আর যদি নিজের কোনও লেখা থাকে সেটাও সঙ্গে নিয়ে যেতে বলল। আমার তো কোনও লেখা নেই... ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল সেই লেখাটার কথা। ওটাই নিয়ে গেলাম। পড়ার সুযগও পেলাম। পড়া শেষ হওয়ার পর সকলের খুব প্রশংসা। গল্পটা নাকি হুব ভালো হয়েছে। আমাকে অনেকে বললেন দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতে। তাদের অথায় পাঠিয়েও দিলাম। নিশ্চিত ছিলাম ছাপবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মাস কয়েকের মধ্যে গল্পটা ছেপে গেল। আরও অনেকের প্রশংসায় ভেসে গেলাম আমি। সেটা ২০০৩ সাল। গল্পের নাম ছিল একটু জীবনের বর্ণনা। চিরকাল্পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম, খেলাধুলোতেও একেবারে পিছিয়ে পড়া। ফলে সেই জীবনে প্রথম সাবাশি পাওয়ার মোহে পড়ে গেলাম আমি। শুরু হয়ে গেল লেখা। স্রেফ সকলে প্রশংসা করবে আর আমি সেটা তারিয়ে তারিয়ে খাব এই লোভে, আর কোনও মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না, এখনও নেই। আমি আর কিছু পারি না, শুধু এটাই একটাধুটু পারি, তাই গল্প লিখি।
গল্পপাঠ ২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?
বিনোদ ঘোষাল ২. শুরুর দিকের লেখাগুলোতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাই সবসময় প্রাধান্য পেত। প্রধান চরিত্র বেশিরভাগ সময়েই হত একজন বেকার অল্পবএসি যুবক। তার মুখে গালাগাল, তার সব কিছুতে রাগ, আর গল্পগুলোতে মেলোড্রামা থাকত একটু বেশি। যদিও আমি আজও গল্পে একটু ড্রামায় বিশ্বাস করি। আমাকে এই ধরনের গল্প বেশি আকর্ষন করে।
গল্পপাঠ ৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?
বিনোদ ঘোষাল ৩. পৃথবীতে সাহিত্যই বোধ হয় একমাত্র শিল্প যা শিক্ষার জন্য কোনও প্রতিষ্ঠান নেই। সবাই সেলফ টট। একলব্যের মতো কাউকে মনে মনে গুরু ভেবে এগোতে হয়, নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। আমিও করেছি। দিনের পর দিন লিখে বারবার পড়ে দেখেছি কোথায় আমি অতিরিক্ত কথা বলছি, কোথায় থামা উচিৎ। একটা অক্ষরও যেন অতিরিক্ত না থাকে। আসলে আমার বহু আগেই কেন জানি না মনে হয়েছিল শিল্পের আসল মজা লুকিয়ে থাকে তার প্রকাশে নয়, আড়ালে। আমি যতটা বললাম তার থেকে যতটা না বললাম সেটাই আসল ক্ষমতার।
গল্পপাঠ ৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?
বিনোদ ঘোষাল ৪. আমার মনে হয় এ আমি আমার কোনও লেখায় আসলে কী বলতে চাইছি সেটা আবিস্কারের আনন্দ যেন পাঠককে দিতে পারি। মানে সব কৃতিত্ব যেন পাঠকের। তখনই একটা লেখা পড়ে পাঠক সব থেকে খুশি হয় যখন সে লেখকের কোনও না বলা কথাকে আবিস্কার করতে পারে। আমি সেই কৌশলটাকেই রপ্ত করার চেষ্টা করি। আর সেই সঙ্গে আরেকটা বিষয় সবসময় খেয়াল রাখি যে আমি আমার গল্পকে এমনভাবে বলব যেন মনে হয় গল্পটা আমি নয়, পাঠক আমাকে পড়ে শোনাচ্ছে। সেইজন্য আমি যখন লিখি, এখনও প্রত্যেকটা লাইনকে উচ্চারণ করে লিখি, যেন এমন কখনও না মনে হয় এটা লেখার ভাষা, বলার ভাষা নয়।
গল্পপাঠ ৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?
বিনোদ ঘোষাল ৫. প্রশ্নটা কঠিন। উত্তরটা আরও কঠিন। কিন্তু তবু আমি সরাসরি সহজ সত্যিটাই বলব, আমি মনে করি আমি এই সময়ের বাংলা গদ্যকারদের মধ্যে অবশ্যই প্রথম শ্রেণীর একজন। জানি কথাটা তীব্র অহংকারের। কিন্তু আমি যদি নিজে এটা না বিশ্বাস করি তাহলে আমি লিখতে পারব না। আর যদি বিনয় করি তাহলে মিথ্যি বলা হবে। কিন্তু এটাও ঘটনা, যখন দেখি আমার পূর্বজরা এবং এই সময়ের কোনও গদ্যকার আমার ভাবনার-ক্ষমতার বাইরের কোনও লেখা লিখেছেন যা আমি কোনওদিনও লিখতে পারব না, তখন ঠিক সেই মুহূর্তে আমি তাদের পায়ে মনে মনে চুম খাই এবং একই সঙ্গে তীব্র একটা ঈর্ষা বোধ করি। যে কেন এই লেখাটা আমি লিখতে পারলাম না। তবু বলব এয়াবৎ যা গল্প লিখেছি তার মধ্যে দু-একটা অন্তত থেকে যাবে। কিন্তু উপন্যাস আমি এখনও পারছি না। বাগে আনতে পারছি না।
গল্পপাঠ৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেনো তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন?
বিনোদ ঘোষাল ৬. আমার আদর্শ গল্পকার অনেকে। সদত হসন মান্টো, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, মতি নন্দী এবং রতন ভট্টাচার্য। এদের গল্প আমি ভাতের মতো খাই, সর্ষের তেলের মতো গায়ে মাখি। বালিশের মতো মাথায় রেখে ঘমোই, আর প্রেমিকের মতো আদর করি। আসলে এদের প্রত্যেকের লেখার মধ্যে একটা ভয়ংকর অন্ধকার রয়েছে, একটা জ্বালা রয়েছে, ড্রামা রয়েছে। আমি এই ঘরানার লেখা লিখতে ভালোবাসি। মিষ্টি মিষ্টি লেখা আমার ভাল লাগে না। তার জন্য হয়তো জীবনে দশ জনের বেশি পাঠক পাব না, কিন্তু কিছু করার নেই। আমি যেটা পারব না, তাই নিয়ে আক্ষেপ করে লাভ নেই।
গল্পপাঠ ৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?
বিনোদ ঘোষাল ৭. আমি প্রথমত বাহবা পাওয়ার জন্য গল্প লিখি, খ্যাতির জন্য গল্প লিখি। দ্বিতীয়ত আমি খেয়াল করে দেখেছি আমি সব থেকে আনন্দে থাকি যখন একটা গল্পের মধ্যে থাকি। আর তৃতীয়ত লিখে টাকা পেতে আমার বেশ ভালো লাগে। বেশ উপরি রোজগারের মতো একটা ছিকছিকে আনন্দ। বেশ লাগে। আমি যেহেতু শুরু থেকেই বরাবর বানিজ়্যিক কাগজে গল্প লিখছি সুতরাং কোন পত্রিকার জন্য কোন ধরনের পাঠক সেটা আমাকে জানতেই হয়, এবং সেই মতো আমাকে লিখতে হয়। অনেক সময়েই দেখা যায় অবশ্য আমি যেমনটা চেয়েছিলাম গল্পটা ঠিক তার উল্টো হল। তখন আর সেই কাগজে দেওয়া গেল না। কিন্তু পাঠকের কথা মাথায় তো রাখতেই হয়, কিন্তু সেটা গল্প শুরুর প্রথমে। লেখা চলার সময় আমি নিজের কথাও ভাবি না, তখন শুধু গল্প কী চাইছে সেই ভাবেই চলি।
গল্পপাঠ ৮. এখন কি লিখছেন?
বিনোদ ঘোষাল ৮. এখন পয়লা বৈশাখ সংখ্যার জন্য কয়েকটা পত্রিকা গল্প চেয়েছে, সেগুলো লিখছি এক এক করে।


0 মন্তব্যসমূহ