সোমবার, ১০ মার্চ, ২০১৪

স্বকৃত নোমানের সেরা লেখা নিয়ে নিজের কথা

গল্পপাঠ : আপনার লেখা কোন উপন্যাসটি সেরা বলে মনে হয়?
স্বকৃত নোমান : নিজের উপন্যাসকে নিজে সেরা বলি কীভাবে? জানতে যেহেতু চেয়েছেন, উত্তর তো দিতেই হবে। এখনো পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০১৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত লেখক হিসেবে আমার কাছে ‘হীরকডানা’ উপন্যাসটিই সেরা মনে হয়। আগামি বছর হয়ত এটি আর সেরার তালিকায় থাকবে না। কারণ, আমি একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি, ২০১১ সালে ‘রাজনটী’ প্রকাশিত হওয়ার পর আমার কাছে মনে হয়েছিল, আমি যে কটি উপন্যাস লিখেছি তন্মধ্যে এটিই সেরা। কিন্তু পরের বছর ‘বেগানা’ লেখার পর মনে হলো এটি আগেরটিকে ছাড়িয়ে গেছে। আমার কাছে তখন ‘বেগানা’কে সেরা বলে মনে হলো। তার পরের বছর প্রকাশিত হলো ‘হীরকডানা’। আমি তখন আগের উপন্যাস দুটি হাতে নিই। দেখি, শেষের উপন্যাসটি আগের দুটিকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন যে উপন্যাসটি লিখছি, যদি ভালোভাবে শেষ করতে পারি, আগামি বছর আমার মনে হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয় যে, এই উপন্যাসটি ‘হীরকডানা’কেও ছাড়িয়ে গেছে। এটিই আমার সেরা উপন্যাস।

গল্পপাঠ : হীরকডানা উপন্যাসটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন?
স্বকৃত নোমান : এটির বীজ আমার ভেতরেই ছিল। উপন্যাসটি যে পটভূমিতে রচিত তা আমার জন্মভূমি। শৈশব-কৈশোরে উপন্যাসের নায়ক শমসের গাজীর কথা আমি বড়দের মুখে শুনতাম। শমসের গাজীর বহু স্মৃতিচিহ্ন আমাদের এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ‘রাজনটী’ লেখার পর আমি যখন নতুন কাহিনির সন্ধান করছিল, তখন হঠাৎ মনে হলো, উপন্যাসের বিষয় তো শমসের গাজীও হতে পারে। আমি তখন নতুন করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শুরু করি।

গল্পপাঠ : গল্পের বীজটির বিস্তার কিভাবে ঘটল? শুরুতে কি থিম বা বিষয়বস্তু নিয়ে ভেবেছেন? না, কাহিনীকাঠামো নিয়ে ভেবেছেন?
স্বকৃত নোমান : শুরুতে অবশ্যই বিষয়বস্তু নিয়ে ভেবেছি। আমি সবসময় উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দেই। আমার পূর্বজ ঔপন্যাসিকগণ যেসব বিষয়ে লেখেননি আমি সেসব বিষয়কে থিম হিসেবে বেছে নিই। আমার কাছে উপন্যাসের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তারপর গুরুত্বপূর্ণ কাহিনিকাঠামো। হীরকডানার বিষয়বস্তু যখন আমার কাছে ক্লিয়ার হয়ে গেল তখনই আমি কাহিনকাঠামো নিয়ে ভাবতে শুরু করি।

গল্পপাঠ : উপন্যাসটির চরিত্রগুলো কিভাবে এসেছে? শুরুতে কতটি চরিত্র এসেছিল? তারা কি শেষ পর্যন্ত থেকেছে? আপনি কি বিশেষ কোনো চরিত্রকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে লিখেছেন? তাদের মধ্যে কি আপনার নিজের চেনা জানা কোনো চরিত্র এসেছে? অথবা নিজে কি কোনো চরিত্রের মধ্যে চলে এসেছেন?
স্বকৃত নোমান : কাহিনির প্রয়োজনে চরিত্র এসেছে। আমি প্রায় আড়াই শত বছর আগের একটি বিস্মৃতি ইতিহাসকে ইতিহাস ও কল্পনার রঙে রাঙিয়ে বর্ণনা শুরু করি। স্বাভাবিকভাবেই শুরুতে চরিত্র হিসেবে আসে শমসের গাজী, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত ছিল। এই চরিত্রটিকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে লিখেছে। গুরুত্ব তো আসলে প্রত্যেক চরিত্রকেই দিতে হয়। কোনোটি কম কোনোটি বেশি, এই যা। তবে এ উপন্যাসে আমাকে শমসের গাজী ছাড়াও প্রায় ২৫টির বেশি চরিত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে লিখতে হয়। কারণ তারা প্রত্যেকেই ঐতিহাসিক কারেক্টার।

গল্পপাঠ : এই উপন্যাসের দ্বন্দ্ব-সংঘাত কীভাবে নির্মাণ করেছে?
স্বকৃত নোমান : কিছু দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল ঐতিহাসিক। ঐতিহাসিক সত্যতাগুলোকে ঠিক রেখে আমি নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছি, যা ইতিহাসের সঙ্গে কোনো মিল নেই। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ছাড়াও অসংখ্য দ্বন্দ্ব আমার নিজের তৈরি। কল্পনা দিয়ে সৃষ্টি করেছি। কারণ দ্বন্দ্ব না থাকলে তো উপন্যাস জমবে না।

গল্পপাঠ : উপন্যাসের পরিণতিটা নিয়ে কি আগেই ভেবে রেখেছিলেন?
স্বকৃত নোমান : না, আমি অন্য একটি পরিণতি ঠিক করে রেখেছিলাম, যে পরিণতি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। কিন্তু লিখতে লিখতে পরিণতির প্রায় কাছাকাছি গিয়ে আমার মনে হলো, শুধু ঐতিহাসিক সত্যকে স্টাবলিস্ট করা তো ঔপন্যাসিকের কাজ নয়। ঔপন্যাসিক নিজের মতো করে উপন্যাসের পরিণতি ঘটাবেন। তখন আমি নতুন পরিণতির কথা ভাবি। উপন্যাসটি আমি এমন একটা পরিণতিতে নিয়ে যাই, যা ঐতিহাসিক সত্যতাকেও অস্বীকার করেনি, লোকশ্রুতিকেও অস্বীকার করেনি, আবার লেখক হিসেবে আমার কল্পনাকেও পাশ কাটিয়ে যায়নি।

গল্পপাঠ : উপন্যাসটি কতদিন ধরে খিলেখেছেন? এর ভাষাভঙ্গিতে কী ধরনের শৈলী ব্যবহার করেছেন?
স্বকৃত নোমান : আমি সাধারণত দীর্ঘ সময় নিয়ে লিখি। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে প্রায় মাস ছয়েক কেটে যায়। তথ্য-উপাত্তগুলো মাথায় নিয়ে কদিন চুপচাপ থাকি। আঙ্গিকটা খুঁজি। যখন আঙ্গিক পেয়ে যাই, হঠাৎ একদিন লিখতে শুরু করি। শুরুর পর প্রায় সাত মাস লেগে যায় উপন্যাসটি শেষ করতে। এডিট করতে লাগে আরো দুই মাস। সাকুল্যে উপন্যাসটি লিখতে বছর দেড়েক সময় লেগেছে। আর উপন্যাসটির ভাষাটাকে খানিকটা লোকায়ত করার চেষ্টা করেছি। প্রচুর লোকায়ত শব্দ ব্যবহার করেছি, যেসব শব্দ দক্ষিণপূর্ব বঙ্গে বহুল ব্যবহৃত। এ ছাড়া আড়াইশ বছর আগেকার প্রচুর আরবি-উর্দু-পারসি শব্দও এসেছে কাহিনির প্রয়োজনে। আর শৈলীটা বর্ণনাত্মক। এ রীতিতে লিখতে আমার ভালো লাগে।

গল্পপাঠ : উপন্যাসটিতে কি আপনি কিছু বলতে চেয়েছেন?
স্বকৃত নোমান : ইতিহাস কীভাবে মিথে রূপান্তরিত হয়, এ দিকটার প্রতি আমি ফোকাস করতে চেয়েছি।

গল্পপাঠ : উপন্যাসটি লেখার পর কি আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন? আপনি কি মনে করেন, আপনি যা লিখতে চেয়েছিলেন তা লিখতে পেরেছেন?
স্বকৃত নোমান : সন্তুষ্ট তো হয়েছি বটেই, নইলে তো ওটা ছাপতে দিতাম না। পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত পা-ুলিপিতে আমার ঘষামাজা চলতেই থাকে। কোনো কোনো পা-ুলিপি আমি বাইশ বার এডিট করেছি এমন রেকর্ডও আছে। আর হ্যাঁ, যা বলতে চেয়েছি তা আমি লিখতে পেরেছি বলেই মনে হয় আমার।

গল্পপাঠ : এই উপন্যাসটি পাঠক কেন পছন্দ করে বলে আপনার মনে হয়?
স্বকৃত নোমান : না, এটি খুব বেশি পাঠক পছন্দ করে না। আমার সবচেয়ে বেশি পঠিত উপন্যাস হচ্ছে ‘রাজনটী’। দ্বীতিয় মুদ্রণও প্রায় শেষ। কদিন পর এটির তৃতীয় মুদ্রণ বাজাওে আসবে। নামের কারণে, বিষয় ও আঙ্গিকের কারণে উপন্যাসটি বহু পঠিত।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান বাংলা ভাষার প্রতিশ্রুতিশীল ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। জন্ম ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর―ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায়। বাবা মাওলানা আবদুল জলিল ও মা জাহানারা বেগম। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজমা ও কন্যা নিশাত আনজুম সাকিকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন, এরপর তিনি স্বউদ্যোগে ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসে একাঙ্গ হয়ে থাকে গ্রামবাংলার বিচিত্র মানুষ, প্রকৃতির বিপুল বৈভব, ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, বাস্তবতা ও কল্পনা। এখন পর্যন্ত তার ছয়টি উপন্যাস এবং একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । এছাড়া আরও সাতটি অন্যান্য গ্রন্থ আছে তার লেখা। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে নাভি, বংশীয়াল, জলেস্বর, রাজনটী, বেগানা ও হীরকডানা। গল্পগ্রন্থ নিশিরঙ্গিনী ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়।

বর্তমানে তিনি সংবাদ ম্যাগাজিন এই সময়-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। ২০০২ সালে দৈনিক আজকের কাগজের পরশুরাম উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। ২০০৪ সালে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি)-এর ফেলোশীপ লাভ করেন। ২০০৬ সালে প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে সংবাদ ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক’-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আবার সাংবাদিকতায় যোগ দেন। এছাড়া তিনি সম্প্রীতি [সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা]-এর সম্পাদক। ‘রাজনটী’ উপন্যাসের জন্য ২০১২ সালে এইচএসবিসি-কালি ও কলম কথাসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন