সোমবার, ১০ মার্চ, ২০১৪

লুতফুন নাহার লতা'র দুটি বই : জীবন ও যুদ্ধের কোলাজ এবং চাঁদের উঠোন

লুতফুন নাহার লতা'র জন্ম ১২ই নভেম্বর সাংস্কৃতিক শহর খুলনায় । মা লাইলুন নাহার ও বাবা শেখ ইউনুস আলী দুজনেই ছিলেন সাহিত্যের অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক । একটি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠেন তিনি । খুব ছোটবেলা থেকে পথ প্রদর্শক বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন কেমন করে দিনপঞ্জী লিখতে হয়, তিনি পত্রমিতালী করিয়ে দেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃত সাহিত্যিক মাহাবুবুল আলমের সাথে যাতে তার সাহিত্যের অনুরাগী মেয়েটি পান অমৃতের সন্ধান । আজো চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি সেকেন্ড লেন ঠিকানাটি তার মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে । স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের যে বিপ্লব ঘটে যায় তারি হাত ধরে এগিয়ে যান লেখালিখির জগতে। হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকায় প্রথম লেখা।
মোহাম্মাদ আব্দুল মজিদ (বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সচীব ) সেসময় বাংলাদেশ পরিষদ খুলনার সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি প্রথম প্রকাশ করেন লতার লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও অন্যান্য বিষয় খুলনার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে ।

লতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স সহ মাস্টার্স করেন। ১৯৭৭ এ উচ্চোমাধ্যমিকে যশোর বোর্ড থেকে মেধা তালিকায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত ভাবে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন । তিনি উল্লেখযোগ্য ভাবে জড়িত থেকেছেন খুলনা , রাজশাহী ও ঢাকা বেতারে একাধারে সংবাদ পাঠক , উপস্থাপক ও নাট্য শিল্পী হিসেবে। ১৯৮০ থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত সাপ্তাহিক ও মাসিক নাটক, বিশেষ নাটক ও জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকে কাজ করে গেছেন অসম দক্ষতায় । সমাজ ও দেশ তার সচেতন স্বত্বার অংশ । নিজেকে বার বার জড়িত করেছেন প্রতিবাদে, আন্দোলনে । থেকেছেন রাজপথে সাধারন মানুষের পাশে । জড়িত থেকেছেন শহিদ জননী জাহানারা ইমামের ডাকে ' ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাথে । স্বপ্ন দেখেন সুখী সুন্দর মানুষের সমাজ ও স্বপ্ন সফল বাংলাদেশের । 

১৯৯৭ থেকে বেছে নিয়েছেন পরবাস । কাজ করছেন অধিকার বঞ্চিত অটিস্টিক বাচ্চাদের নিয়ে নিউইয়র্কের একটি পাবলিক স্কুলে । যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ছাত্র ও আমেরিকার মুলধারার একজন লেখক তার একমাত্র সন্তান সিদ্ধার্থ নাসির উদ্দিন কে নিয়ে তার একান্ত সরল জীবন, উপার্জনের চেয়ে অর্জন যার জীবনের মোক্ষ ।। 

 'জীবন ও যুদ্ধের কোলাজ' 
১০টি গল্পের সংকলন এই বইটি প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ । প্রকাশক, মজিবর রহমান খোকা ও প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুবএষ। গল্প ১০টি হল--জীবন ও যুদ্ধের কোলাজ, অন্তর্গত আর্তনাদ, দ্যা ফিউজিটিভ, উকুন, সুদূর রাতের গান, গল্লামারী ব্রীজের নীচে, কঙ্কনা, ফেরারী, রেইপ কেস ও একটি হত্যাকান্ড ও লাল গোলাপ।

লেখকের অন্তর্গত স্বচ্ছ দৃষ্টির আলোয় দেখা চারিপাশের মানুষের জীবন । তিনি একজন নাট্য শিল্পী । শিল্পিত সুষমায় একান্ত নিজেস্ব সাবলীল অভিনয় শৈলী দিয়ে নির্মান করেন বাস্তব মানুষের জীবন চরিত্র। লেখকের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি তাই দেখতে পায় যা সাধারনের চোখ এড়িয়ে যায় । যে বাঁধা, যে সংশয়, যে জীবন যুদ্ধ মানুষকে পলে পলে দগ্ধ করে সেই না বলা বানীর অন্তর্গত রোদন এই বইয়ের প্রতিটি গল্পে । প্রবাসী মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির টানাপোড়নে গড়ে ওঠা এক নতুন ডায়াসপোরা। যেখানে তীল তীল করে দেখান হয়েছে নির্মম উত্থান পতনের ভেতর দিয়েও জীবনের কি অমিত শক্তি! কি দুর্বার সেই প্রতিরোধ! কি অসামান্য সেই জাগরন। প্রচলিত সমাজ ব্যাবস্থার অন্ধকানুন কে ভেঙ্গে একটি আলোকিত জীবনের পথে ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যেও এগিয়ে যাবার যে প্রচেষ্টা তার গল্পের চরিত্রগুলোর ভেতর দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন তা গভীর জীবন বোধে উজ্জীবিত । আলাদা আলাদা জীবন ও সংঘাতের ভেতর দিয়ে একটি বিবর্তনের পথ কেটেছে চরিত্রগুলি । জীবনের প্রয়োজনে অন্ধকার সরিয়ে নতুন আলোয় এসে দাঁড়িয়েছে। তার প্রতিটি গল্পে আনিবার্য ভাবে নারী হয়ে উঠেছে এক একজন চিত্রাঙ্গদা, সিমোন দা ব্যোভোয়ার । আÍবিশ্বাস ও মানবিক মুল্যবোধে সমুজ্জল নারী। লেখকের গদ্যে একটি কাব্যময়তা আছে যা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে একটি বেদনার সুরের অনুরনন তোলে। প্রাঞ্জল বর্ননায় তিনি অসামান্য করে তুলেছেন তার গল্পগুলি । তার হাতে রচিত এই বাংলা ডায়াসপোরা সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য সংযোজন হয়ে উঠবে।।

কবিতার বই
চাঁদের উঠোন
প্রকাশক : বিদ্যাপ্রকাশ, ঢাকা।
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন