বুধবার, ৫ মার্চ, ২০১৪

ভাষা নিয়ে: মিশেল ফুকো

কল্যাণ সেনগুপ্ত
ঢাকা: মিশেল ফুকো (ফরাসি: Michel Foucault) ফরাসি দার্শনিক। তিনি ১৫ অক্টোবর ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার মৃত্যু হয় ২৫ জুন ১৯৮৪ সালে। তিনি কলেজ দে ফ্রান্সের নিয়মতান্ত্রিক ধারণার ইতিহাস বিভাগের প্রধান ছিলেন, এই বিভাগের নামকরণ তিনিই করেন। সমাজ ও মানবিক বিজ্ঞান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফলিত এবং পেশাদারি ক্ষেত্রে ফুকোর প্রভাব বিস্তৃত। ফুকো বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা শাস্ত্র, কারাগার পদ্ধতির পর্যালোচনার জন্য বিখ্যাত। তার জ্ঞান ও ক্ষমতা বিষয়ে লেখার ওপর ভিত্তি করে অনেক গবেষক ও চিন্তাবিদ বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। পাশ্চাত্য ধারণার ইতিহাস এসব লেখার কেন্দ্রবিন্দু। এবং সর্বোপরি ফুকোর ডিসকোর্স (Discourse - বয়ান, আলাপ, বক্তৃতা, কথোপকথন, সন্দর্ভ, জবানি- দুটো নীরবতার মাঝখানে কোনকিছু...) সংক্রান্ত কাজের অবদান উল্লেখযোগ্য।

দেশে ও বিদেশে সব দর্শনেরই ভাবনার এক বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। ভাষা-দর্শনের এই বিভিন্ন রূপায়ণ, এই বিভিন্ন ধ্যান-ধারণার বিস্তর বিবরণ দেয়া অবশ্য আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য উত্তর আধুনিক দর্শনের, বিশেষ করে এই দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা মিশেল ফুকোর ভাষা-চিন্তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরা। এখানে একটি কথা বলা দরকার। আমরা এখানে ফুকোকে উত্তর আধুনিক দার্শনিক বলে চিহ্নিত করছি। কিন্তু এটি কতখানি সঙ্গত সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। স্বয়ং ফুকো এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন। তার মৃত্যুর আগের বছরে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছেন: ‘কাকে আমরা উত্তর আধুনিকতা বলবো? এ ব্যাপারে আমি একেবারে আনাড়ি।’ যিনি তার এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি তখন ব্যাপারটি এভাবে ব্যাখ্যা করলেন: ‘উত্তর আধুনিকতার মূল কথা যুক্তির (reason) বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্রোহ, একে সম্পূর্ণ নির্বাসন দেয়া। যদি কথাটা এমন জোর দিয়ে নাও বলা যায়, তবুও অন্তত এইটুকু বলতেই হবে, উত্তর আধুনিকতা যুক্তিকেই একমাত্র সত্য বলে মনে করে না; বরং মনে করে, অনেক ন্যারেটিভের মধ্যে যুক্তি কেবল একটি মাত্র ন্যারেটিভ।’ উত্তর আধুনিকতার এই ভাষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ফুকো তার নিজের দর্শন কীভাবে দেখছেন সে কথা তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তার উত্তর ছিল: ‘স্বীকার করছি এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার পক্ষে শক্ত। তার প্রথম কারণ, ‘আধুনিকতা’ বলতে কী বোঝায় এ বিষয়ে আমার পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। আমি জানি জার্মানরা কথাটিকে কোন অর্থে নেয়। আমেরিকায় হ্যাবারমাস ও আমাকে নিয়ে একটা সেমিনার হওয়ার কথা হচ্ছে। হ্যাবারমাস বলছেন, সেমিনারের বিষয় হোক ‘আধুনিকতা’। আর, এখানেই আমার অসুবিধে। কথাটির হয়তো তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। হয়তো এটি একটি নিছক নাম এবং আমরা সুবিধের জন্য একটি নাম তো ব্যবহার করতেই পারি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি বুঝতে পারি না- ‘আধুনিকতা’র বিষয় কী, লোকে যাকে উত্তর আধুনিক বলে তার সঙ্গে এর সম্বন্ধ কী। আধুনিকতা ও উত্তর আধুনিকতা- দুটো কথাই বেশ গোলমেলে’ (এল. ডি ক্রিজম্যান সম্পাদিত, মিশেল ফুকো, পলিটিক্স, ফিলোসফি, কালচার)। ফুকোর এই বক্তব্য মনে রেখেও তাকে যদি মোটামুটিভাবে উত্তর আধুনিক দর্শনের একজন বলে মনে করা যায় তবে বোধ হয় তেমন অন্যায় হবে না। কারণ এটিই তার দর্শনের মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠিত মত। এছাড়া ভাষা বা ডিসকোর্স সম্বন্ধে তার বক্তব্য যা আমার প্রবন্ধে বিবেচ্য- সেখানেও আমরা দেখবো, ঐক্যকে না মেনে শুধু বহু’র (plurality) দিকে যে ঝোঁক, ধ্রুবকে না মেনে ঐতিহাসিকতা বা কনটিনজেনসির দিকে যে প্রবণতা উত্তর আধুনিকতার মূল বৈশিষ্ট্য ফুকো তা বিশ্বস্ত ভাবে অনুসরণ করেছেন। এবার আমরা প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আসব।
ডিসকোর্স বলতে কী বোঝায়? এ বিষয়ে ফুকো তার ‘দ্য আর্কিওলজি অব নলেজ’ (এ. এম. সেরিড্যান অনূদিত) এ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার উত্তর, প্রতিটি বিষয় যেমন: দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান বা সাহিত্য- এক একটি ডিসকোর্স; এবং যে কোনো বিষয়ে ডিসকোর্স এক বিশেষ জাতীয় উক্তি সমূহের বিধিবদ্ধ রূপায়ণ। এবার প্রশ্ন, উক্তি বা স্টেটমেন্ট কী? এ বিষয়েও ফুকো বিশদ আলোচনা করেছেন। কিন্তু তা বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। এ ব্যাপারে আমাদের সুবিধা হয় যদি আমেরিকান দার্শনিক জে. আর. সার্লের সঙ্গে ফুকোর যে ভাব বিনিময় হয়েছিল সেটি চোখের সামনে রাখি (হার্বার্ট ড্রেফার্স ও পল র‍্যাবিনো, মিশেল ফুকো: বিয়ন্ড স্ট্রাকচারিলিজম অ্যান্ড হার্মিনিউটিকস দ্রষ্টব্য)। তখন জানতে পারি উক্তি বা স্টেটমেন্ট বলতে ফুকো যা বোঝেন ইংরেজি দার্শনিক জে. এল. অস্টিনের স্পিচ অ্যাক্ট বা ভাষা-ক্রিয়ার সঙ্গে তার বিশেষ মিল আছে। অস্টিনের এই মত অনুসারে কথাবলার অর্থ কোনো কিছু করা যেমন: বর্ণনা করা, আদেশ বা অনুরোধ করা ইত্যাদি। ভাষা-ক্রিয়ার তিনটি অংশ আছে: (ক) লোকিউশানারি অ্যাক্ট, যখন কোনো অভিপ্রেত অর্থ (meaning) পৌঁছে দেয়ার জন্য এবং কোনো বস্তুকে নির্দেশ (reference) করার জন্য বাক্য ব্যবহার করি; (খ) ইলোকিউশনারি অ্যাক্ট, যখন কিছু বলার জন্য, আদেশ বা সতর্ক করার জন্য বাক্য ব্যবহার করি; (গ) পারলোকিউশনারি অ্যাক্ট, যখন শ্রোতার ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য, তার বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য বাক্য ব্যবহার করি। অস্টিনের এই ভাষা-ক্রিয়ার সঙ্গে যদি ফুকোর স্টেটমেন্ট এর মিল থাকে, তবে ফুকোর ডিসকোর্স বলতে বোঝায় কোনো বিষয়ে এক শ্রেণীর উক্তি- যার উদ্দেশ্য প্রথমত কিছু বলা (ইলোকিউশনারি অ্যাক্ট) দ্বিতীয়ত, যে বলার একটি পারলোকিউশনারি ক্ষমতা আছে, অর্থাৎ যে বলা আমাদের বিশ্বাস উৎপাদনে সমর্থ। একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার করা যায়। ধরা যাক, ‘অসুস্থ রাম ক্রমশই সুস্থ হয়ে উঠছে’- এই উক্তিটি। এই উক্তি আমাদের কিছু বলছে যা অবহিত করছে। এই উক্তিটি অসুস্থ রামের সুস্থ হয়ে ওঠার কথা বলছে। আমরা এর অর্থ বুঝতে পারি এবং সত্য কি না তার নির্ধারণ করতে পারি। এই উক্তিটি যদি কোনো চিকিৎসক করেন তবে তা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। যদি উপরের আলোচনা যথার্থ হয় তবে বলতে হবে স্পিচ অ্যাক্ট বা ভাষা ক্রিয়ার প্রেক্ষাপটেই ফুকোর স্টেটমেন্ট বা ডিসকোর্সের তাৎপর্য বেরিয়ে আসে। অবশ্য নিঃসন্দেহে একথা বলা যায় কি না তাও ভাবতে হবে। কারণ দি আর্কিওলজি অব নলেজ এ ফুকো এমন কথাও বলেছেন যে স্টেটমেন্ট বা উক্তি (ফুকোর ভাষায়, enonce) ভাষা-ক্রিয়া নয়। তবে কি ধরে নিতে হবে স্টেটমেন্ট বা উক্তি বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি তার ইঙ্গিত সেইদিকেই?  স্টেটমেন্ট বলতে আমরা বুঝি বক্তব্যের বিষয় বা কনটেন্টকে- যাকে প্রোপজিশন বা বচন বলা হয় এবং যেখানে সত্য বা মিথ্যার প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে। যদি তাই হয়, তা হলে ডিসকোর্স প্রসঙ্গে ভাষা-ক্রিয়া হিসেবে দেখা সংগত হবে না, বরং অস্টিন যাকে লোকিউশনারি অ্যাক্ট বলেছেন, যা প্রোপজিশন বা বচনেরি নামান্তর, সেই লজিক্যাল অংশটুকু সমর্থন করে বলে ধরে নিতে হবে। ফুকোর যে এখানে কনফিউশন নাই তা নয়। তবে এসব প্রশ্নের মধ্যে না গিয়ে আমরা গুরুত্ব দেব মৃত্যুর আগে সার্লের সঙ্গে আলোচনায় ফুকো স্টেটমেন্ট সম্পর্কে যে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন তাকেই। তাই আমরা স্পিচ অ্যাক্ট বা ভাষা-ক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই স্টেটমেন্টকে দেখবো। এই সঙ্গে মনে রাখবো ফুকো ও অস্টিনের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। স্টেটমেন্টকেন্দ্রিক ডিসকোর্স বা ভাষা-ক্রিয়ার যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পটভূমি আছে যে বিষয়ে ফুকো যতটা সোচ্চার অস্টিন ততটাই নীরব। এখানে বরং অস্টিনের চেয়ে সার্লের সঙ্গে তার মিল অনেক বেশি।

ডিসকোর্স কী তা বলার পর ফুকো এবার ডিসকোর্সের বৈশিষ্ট্য, পৃথকীকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দিচ্ছেন।
প্রথমত, আমরা তাকে এইভাবে সাজিয়ে দিচ্ছি। ডিসকোর্সের ক্ষেত্রে বক্তা ও স্থানের একটি ভূমিকা আছে। আমরা সবাই জানি বক্তব্য বা মতামত প্রকাশ করার জন্য একটি বিশেষ জায়গা বা মাধ্যমের অপরিহার্যতা যেমন: জার্নাল, বক্তৃতাগৃহ অথবা গবেষণাগার কিন্তু শুধু স্থান নয়, ব্যক্তির ভূমিকাও সমান উল্লেখযোগ্য। বক্তা যদি যোগ্য না হন, যদি তার অধিকার না থাকে তবে তার কোথায় বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। ‘অস্ত্রোপচারের পর রাম ক্রমশই সুস্থ হয়ে উঠছে’- একথা একজন চিকিৎসক বললে যেমন আস্থা অর্জন করবে, একজন সাধারণ মানুষ বললে তা হবে না। এর কারণ চিকিৎসাশাস্ত্রে চিকিৎসকের বিশেষ নৈপুণ্য বা পারদর্শিতা। চিকিৎসকের কথা বা ডিসকোর্সে অন্যদের এই বিশ্বাসের উৎস চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, চিকিৎসক মহলে এক বিশেষ ঐকমত্য সমর্থন। প্রত্যেক ডিসকোর্সের পিছনেই এক একটি বিশিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো থাকে। এই ইনিস্টিটিউশনাল সেটিং বা কাঠামো একটি বিষয়ের ডিসকোর্সকে চিহ্নিত করে এবং অন্য বিষয়ের ডিসকোর্স থেকে তাকে পৃথক করে। অবশ্য এই বিষয়ে যেমন চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিসকোর্স পাল্টে যেতে পারে। সেখানেও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান আছে। যদি কোনো কারণে চিকিৎসকদের ওপর, অথবা তাদের কথায় আমাদের আস্থা হারিয়ে যায়, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের যে ঐকমত্যতার ধারক তাও নিরালম্ব হয়ে পড়বে। এর ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন একটি ডিসকোর্স তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, ফুকো বলেছেন, প্রতিটি ডিসকোর্স এক বিশেষ বস্তুর কথা বলে এবং ডিসকোর্স অনুযায়ী এই বস্তুও ভিন্ন হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই বস্তু কী হবে তা ডিসকোর্সই তৈরি করে। যেমন: মনঃসমীক্ষণে যে ধরনের কথা বলা হয়, যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয় তার উদ্দিষ্ট বিষয় বা বস্তুর মানসিক রোগ। মনঃসমীক্ষণের ভাষা-নিরপেক্ষ মানসিক রোগ নামক বস্তুটির কোনো অস্তিত্ব নেই। তেমনি অন্যান্য ডিসকোর্স বা ভাষা, কোনো বস্তুর কথা বলে তা জানতে গেলে সেই ভাষার মধ্যেই তাকে খুঁজে নিতে হবে। তাহলে কি এই কথাই দাঁড়ায় যে ফুকো যা বলেছেন তা একধরনের ভাষাগত ভাববাদ? মনে হয় সাধারণত ফুকোর ইঙ্গিত সেইদিকেই। ভাষা বা ডিসকোর্সের বাইরে বস্তুর কোনো নিরপেক্ষ অস্তিত্ব নেই তিনি যেন সেই কথাই বলেছেন।
তৃতীয়ত, প্রত্যেক ডিসকোর্সে যে উক্তি বা স্টেটমেন্টগুলি থাকে সেখানে বিশেষ প্রত্যয় (কনসেপ্ট) ব্যবহার করা হয়। এই প্রত্যয়গুলি ডিসকোর্স ভেদে ভিন্ন। অথবা, এক ডিসকোর্সে যে প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় অন্য ডিসকোর্সে ব্যবহৃত প্রত্যয় থেকে তা একেবারেই আলাদা। এর কারণ ডিসকোর্সের ভিত্তি হচ্ছে স্টেটমেন্ট বা উক্তি এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যয়ের তাৎপর্য নির্ভর করে। যেহেতু প্রত্যেক ডিসকোর্সের উক্তিগুলো স্বতন্ত্র, সেজন্য প্রত্যয়গুলিও স্বতন্ত্র। এক ডিসকোর্সের প্রত্যয়ের সঙ্গে অন্য ডিসকোর্সের প্রত্যয়ের, দার্শনিক কুনোর ভাষায়- দুস্তর ব্যবধান।
চতুর্থত, প্রতিটি ডিসকোর্সের পিছনে এক বিশিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তির একটি বিশিষ্ট ছক থাকে। যুক্তির এই ছক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বিভিন্নভাবে সাজানো হয়ে থাকে বিভিন্ন ডিসকোর্সে। উদাহরণ হিসেবে বিবর্তনের তত্ত্বটি ধরা যাক। ডারউইন যখন প্রথম জীব-বিবর্তনের কথা বলছিলেন তখন তিনি মনে করেছিলেন, প্রক্রিয়াটি অনেক সময় ধরে চলবে। কিন্তু গুল্ড ও এলডরিজ প্রমুখ বিজ্ঞানীরা অন্যরকম কথা বললেন। তাদের মতে, এই বিবর্তন পক্রিয়া খুব দ্রুত ঘটতে পারে। সুতরাং ডারউইনের ডিসকোর্স এবং এলডরিজের ডিসকোর্সের মধ্যে পার্থক্য রচনার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বক্তব্য, দৃষ্টিকোণ ও যুক্তি প্রয়োগের বিশেষ অবদান আছে।

ডিসকোর্স বা ভাষা বিষয়ে ১ম পর্বের ( সংক্ষিপ্ত আলোচনাটিতে আমি ফুকোর দি আর্কিওলজি অব নলেজ বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। আর্কিওলজি বলতে মোটামুটি বর্ণনামূলক পদ্ধতিকে বোঝায়। এখন ফুকো ডিসকোর্স, তার ঐতিহাসিকতা, তার বহুত্বের ও ধারাবাহিকহীনতার বিস্তর বিবরণ দিয়েছেন। দি আর্কিওলজি অব নলেজ ফুকো লিখেছিলেন ১৯৬১ সালে। তার পর ১৯৬৬ সালে দি অর্ডার অব থিংগস। এখানেও বিভিন্ন বিষয় যেমন ব্যকারণ, অর্থনীতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ইত্যাদির মধ্যে যে কোনো সাযুজ্য নেই সেকথা ফুকো বিস্তারিতভাবে বলেছেন। কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলের কিছুটা আভাস পাওয়া যায় এই বইটির ১৯৭০ সালের ইংরেজি সংস্করণে- যার মুখবন্ধে ফুকো কতগুলো সমস্যার কথা বলেছেন।
তার মধ্যে একটি হচ্ছে- কারণ খুঁজে বের করার সমস্যা। কেন ডিসকোর্সগুলির  মধ্যে এই ভিন্নতা? এই ধারাবাহিকতার অভাব? কেন ডিসকোর্সে পালাবদল ঘটে? কী এর ব্যাখ্যা? ফুকো বলেছেন: কেন কোনো একটি বিজ্ঞানে পরিবর্তন আসে তা নির্ণয় করা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। নতুন তত্ত্ব, নতুন প্রত্যয় কোথা থেকে আসে? কোথা থেকে আসে নতুন ব্যাখ্যা, নতুন ভাষ্য? এই সব প্রশ্ন আমাদের বিড়ম্বিত করে। কারণ এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো কোনো নির্দিষ্ট পথ বা পদ্ধতি নেই।
ফুকো অবশ্য পরিবর্তনের দুই একটি কারণের কথা বলেছেন, যেমন: নতুন যন্ত্রের আবিষ্কার, নতুন ভাব (আইডিওলজি) এবং প্রবণতা অর্থাৎ কারণগুলো মোটামুটি সামাজিক। আর এখানেই একটি ফাঁক নজরে আসে। শুধু সামাজিক নয়, এপিস্টেমিক বা জ্ঞানীয় কারণেও যে বিজ্ঞানের তত্ত্ব বা ডিসকোর্স বদলে যায় সেদিকে ফুকো তেমন নজর দেননি। কোনো একটি তত্ত্বের বদলে আরেকটি তত্ত্ব আসতে পারে বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে তার কারণ বিকল্প তত্ত্বটির ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা বেশি, অথবা সেটি বেশি সরল অথচ ঘটনার আরও বেশি অর্থবহ ব্যাখ্যা দিতে পারে। এই ধরনের এপিস্টেমোলজিকাল কারণের ভিত্তিতেই বৈজ্ঞানিক বা বিজ্ঞানের দার্শনিক একটি তত্ত্ব বা ডিসকোর্স পরিহার করে অন্যটিকে বরণ করেন।
তাছাড়া শক্তিশালী চিন্তাও যে নতুন ডিসকোর্স সৃজন করতে পারে ফুকো সেদিকেও তেমন নজর দেননি। যেমন: আমরা সকলেই জানি নিউটন ডিনামেক্সের নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে একজন ঐতিহাসিক এবং নিউটনের জীবনচরিতকার রিচার্ড ওয়েস্টফল লিখেছেন: ‘নিউটনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি কীভাবে মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার করলেন? নিউটনের উত্তর ছিল, এ বিষয়ে ক্রমাগত ভাবনার ফলেই এই আবিষ্কার।’ (আর. এস. ওয়েস্টফল, নেভার অ্যাট রেস্ট:এ বায়োগ্রাফি অব আইজাক নিউটন ) সুতরাং ফুকো সচেতন ছিলেন না, তত্ত্ব বা ডিসকোর্সের পিছনে শুধু একটি নয়, একাধিক কারণ থাকতে পারে, শুধু সামাজিক কারণই নয় জ্ঞানীয় কারণও আছে।
অবশ্য ১৯৭০ সালের দি অর্ডার অব থিংগস এর ইংরেজি সংস্করণের মুখবন্ধে ফুকো উল্লেখ করেছেন, সাধারণভাবে মেনে নেয়া পরিবর্তনের অনেক ব্যাখ্যা তার কাছে সন্তোষজনক নয়। তিনি বলেছেন: ‘পরিবর্তনের অনেক ব্যাখ্যা, যথা কালের নতুন যাত্রা, যন্ত্রীয় বা সামাজিক পরিবর্তন, আমার কাছে যথাযথ বলে মনে হয় না। বরং অসংলগ্ন মনে হয়। এইজন্যই আমি এই বইয়ে কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করিনি। বরং দেখতে চেয়েছি এই পরিবর্তনের স্রোতকে। আমার মনে হয় এভাবে দেখা বিশেষ জরুরি। কেননা, তাহলেই বিজ্ঞান-তত্ত্বের পট পরিবর্তনের কারণ ধরা যাবে।’  ফুকোর এই কথাটি মনে রাখলে আমরা ঠিক আগে যা বলেছি তা অত জোরালোভাবে বলা যাবে না। বরং আমাদের বলার ধরনটি পাল্টাতে হবে। বলতে হবে, পরিবর্তনের পটভূমিকায় সামাজিক অবদানের কথা তিনি নিশ্চিতভাবে বলেননি। শুধু ইঙ্গিত দিয়েছেন মাত্র। বরং শেষ পর্যন্ত একে তার তেমন সন্তোষজনক বলেও মনে হয়নি। আসলে সামাজিক বা জ্ঞানীয় যে কোনো কারণ অনুসন্ধান প্রসঙ্গটি তিনি মুলতবি রাখতে চেয়েছেন।
কিন্তু এই কথা তবু থেকে যায়, ডিসকোর্স পরিবর্তনের কারণ খোঁজা বা ব্যাখ্যা দেয়ার অন্তত একটি প্রবণতা পাওয়া যাচ্ছে ১৯৭০ সালের ইংরেজি সংস্করণে। যদিও শেষ পর্যন্ত একে তিনি তেমন প্রশ্রয় দেননি। বিশেষ করে দি অর্ডার অব থিংগস  অথবা দি আর্কিওলজি অব নলেজ পর্যন্ত। এই ব্যাখ্যা দেয়ার বা জিনিয়লজির দিকে ঝোঁক বা মনোযোগ সুস্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে ১৯৭০ সালের শেষের থেকে। ১৯৭১ সালে ফুকো লিখেছেন, নিটশে, জিনিয়লজি অ্যান্ড হিস্টরি প্রবন্ধটি। এই পর্বে ঘটেছে তার পদ্ধতির রূপান্তর: আরকিওলজি থেকে জিনিয়লজি। এখান থেকে তিনি বলতে শুরু করেছেন পাওয়ারের কথা, যে পাওয়ারের ধারনাটি তিনি নিয়েছেন নিটশে থেকে। নিটশের দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে উইল টু পাওয়ার প্রসঙ্গটি। কী এর ব্যঞ্জনা? নিটশের উত্তর: জগতের কোনো কিছু যে স্থির বা স্থায়ী নয়, হঠাৎ যে সবকিছু একেবারে ওলট-পালট হয়ে যেতে পারে সেই কনটিনজেনসি বা অনিশ্চিয়তার মুখোমুখি দাঁড়াতে আমরা ভয় পাই। আমাদের ভিতরে তা নিয়ে আসে সার্ত্রের ভাষায় এক বিবমিষা বোধ, এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা।
এই সঙ্কট থেকে মুক্তির জন্য আমাদের থাকে কোনো এক স্থিরতার বা ধ্রুবত্বে উপনীত হওয়ার বাসনা। এই ধ্রুবত্বের বাসনার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই আমাদের নিরাপত্তা, ফিরে পাই আমাদের শক্তি, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করি কনটেনজেনসির ওপর। অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সের জন্ম এখান থেকেই।
তাহলে এক কথায়, উইল টু পাওয়ার অমোঘ পরিবর্তনের অনিশ্চিয়তার বিরুদ্ধে মানুষের নিজেকে প্রবলভাবে প্রকাশ করার দুর্মর বাসনা। আগেই বলেছি, এই পাওয়ারের ধারণাটি ফুকো আহরণ করেছেন নিটশে থেকে, এবং বলেছেন, এই পাওয়ারই কোনো ভাষা বদলে যাওয়ার কারণ। বিশেষ করে কথাটি বলেছেন, ১৯৭০ সালের শেষে অর্ডার্স অব ডিসকোর্স  প্রবন্ধে। অবশ্য এই প্রবন্ধে তার পাওয়ার হাইপোথিসিস খানিকটা যেন দ্বিধায় আক্রান্ত যে দ্বিধা তিনি সম্পূর্ণ অতিক্রম করেছেন পাওয়ার/নলেজ: সিলেকটিভ ইন্টারভিউজ অ্যান্ড আদার রাইটিংস নামক সংকলনে।
ডিসকোর্স বা ভাষা বিষয়ে গত দুই পর্বে  ফুকোর দি আর্কিওলজি অব নলেজ, ডিসকোর্স, ঐতিহাসিকতা, বহুত্বের ও ধারাবাহিকহীনতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।  এ পর্বে ফুকোর পাওয়ার-এর চরিত্র ও ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হলো।

পাওয়ার-এর কথা উল্লেখ করে তিনি সরাসরি বলেছেন, কতগুলো বিধি নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণের কথা এবং তারপর বলেছেন এদের সঙ্গে পাওয়ার-এর যোগ আছে। এই নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কাজ করে তা বোঝাতে গিয়ে ফুকো কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমত, নিয়ন্ত্রিত হয়ে সেক্স সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে কতদূর যাওয়া যাবে, কী কথা বলা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, কোন ধরনের কথা পাগলামি, কোন ধরনের কথা তা নয় তার মধ্যে সীমারেখাও ঠিক করে দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা তাও ঠিক করে দেওয়া। এখানে একটি প্রশ্ন বিবেচনা করার মতো। আমরা যখন সত্য/মিথ্যার কথা বলি তার ব্যাখ্যা দু’রকমের হয়। (ক) উক্তি বা স্টেটমেন্ট সত্য বা মিথ্যা কী হবে তা বস্তুগতভাবে নিরপেক্ষ জগতের দ্বারা নির্ধারিত হয়। (খ) উক্তি বা স্টেটমেন্ট সত্য বা মিথ্যা হয়ে ওঠা আমাদের সামাজিক বিশ্বাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফুকো যখন সত্য/মিথ্যার কথা বলছেন তখন তার তাৎপর্য কোনটি: (ক) না (খ)? এ ব্যাপারে ফুকোর মধ্যে সামান্য দোলাচল আছে।
অধিকাংশ সময়ে তিনি যেন বলছেন, যা আমরা সত্য বা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করি তাই সত্য বা মিথ্যা। আর আমাদের এই বিশ্বাসের পিছনে একটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, বলা বাহুল্য যার সঙ্গে পাওয়ার-এর একটি যোগ আছে। আবার ‘অর্ডার্স অব ডিসকোর্স’ প্রবন্ধে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বস্তুগতভাবেই স্থির হয়, বিধি-নিষেধ, বর্জন বা নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে নয় (অর্থাৎ কোনো পাওয়ারের ভিত্তিতে নয়)। একথা স্পষ্ট হয় যখন তিনি বলেন, ‘ভেবে বিস্মিত হতে হয় কেন উনিশ শতকের উদ্ভিদ ও জীববিজ্ঞানীরা মেন্ডেলের বক্তব্য সত্য বলে মনে করেননি। যে তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত পরিপ্রেক্ষিতে মেন্ডেল তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন নিঃসন্দেহে সেই তত্ত্ব, পদ্ধতি সমসাময়িক বিজ্ঞানী মহলে গৃহীত হয়নি। কিন্তু তবু তার বায়োলজিক্যাল ডিসকোর্স সত্য। এই সত্য বস্তুর দ্বারা সমর্থিত।’ এখানে নিরপেক্ষ সত্যে তার আস্থাই প্রকাশিত হয়েছে।
তাহলে সংক্ষেপে ‘অর্ডার্স অব ডিসকোর্স’ প্রবন্ধের বক্তব্য এই। সমাজে কতগুলি বিধি-নিষেধ নিয়ন্ত্রণ থাকে যার মধ্য দিয়ে পাওয়ার প্রকাশিত হয়। এই পাওয়ার ঠিক করে দেয় কতদূর বল যাবে, কোন স্টেটমেন্ট সত্য বা মিথ্যা। অবশ্য একই সঙ্গে ফুকো নিয়ন্ত্রণ বা পাওয়ার নিরপেক্ষ সত্যাসত্যের কথাও বলেছেন।
পরবর্তী কালে বিশেষ করে ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ অথবা পাওয়ার/নলেজ সংকলনে সত্যের এই নিরপেক্ষতা অবজেক্টিভিটির কথা ফুকো আর বলছেন না। তখন তিনি অকুণ্ঠভাবে বলছেন, ডিসকোর্সের সত্যাসত্য সমাজে কেন্দ্রীভূত পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। এ থেকে হয়তো বোঝা যায়, সমাজকে তিনি কীভাবে দেখছেন। নিটশের মতো তিনি বলেছেন, যে কোনো সামাজিক কাঠামো এক বিশেষ পাওয়ার সম্পর্কে গড়ে ওঠা। এই বিশেষ সোশাল পাওয়ার রিলেশনস শুধু ডিসকোর্স, তার সত্যাসত্যই তৈরি করে না, তার পালাবদলেরও কারক।
এবার পাওয়ার-রিলেশন বলতে কী বোঝায়, বা ফুকো যাকে বলেছেন রিলেশন এন্টোলজি অব পাওয়ার সেটি কী- সে বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া যাক। সাধারণত আমরা বুঝে থাকি পাওয়ার ব্যক্তি বা সমাজে নিহিত থাকে। ব্যক্তি বা সমাজই আমাদের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করে। ফুকোর ব্যাখ্যা অন্যরকম। তার মতে, পাওয়ার ব্যক্তি বা সমাজের অধীন নয়, বরং ব্যক্তি বা সমাজের মাধ্যম। অর্থাৎ ব্যক্তি বা সমাজের মধ্য দিয়ে পাওয়ার নিজেকে প্রকাশ করে। সে থাকে অলক্ষ্যে। জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটিফোর উপন্যাসের বিগ ব্রাদারের মতো সে একটি স্বয়ংনির্ভর সত্তা। যা সব সময়েই একটি সম্পর্কে থাকে। এই সম্পর্কের সূত্রেই তার অনুশাসন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ কথা বোঝাতে ফুকো অনেক মেটাফর ব্যবহার করেছেন যা অধিকাংশই দুর্বোধ্য।
আমরা বরং এখানে মার্টিন কুশের সাহায্য নিব, যিনি একটি উপযোগী এনালজি দিয়ে ব্যক্তি ও সমাজ নিরপেক্ষ এই পাওয়ারের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তিনি পাওয়ারের তুলনা করেছেন চৌম্বক শক্তি বা চৌম্বক আকর্ষণের সঙ্গে। যেমন চৌম্বক আকর্ষণ জাগতিক বস্তুর সম্পর্কে ক্রিয়াশীল হয়, তেমনি পাওয়ার সমাজের বস্তু অর্থাৎ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন চৌম্বক আকর্ষণ সব জায়গায় আছে, তেমনি পাওয়ারও সর্বত্র বিরাজিত।
কুশের এই এনালজির সমর্থনে কিছু উক্তি এখানে স্মরণীয়। যেমন পাওয়ার/নলেজ সংকলনে, ‘সমাজ দেহের প্রতিটি বিন্দুতে পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে, শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে পাওয়ার-এর ক্ষেত্রে যখন আমি সম্পর্কের কথা বলছি তখন তার অর্থ এই সমস্ত মানব-সম্পর্কের মধ্যে তা যে প্রেমের, প্রাতিষ্ঠানিক বা আর্থ যে সম্পর্কই হোক না কেন সব জায়গাতেই পাওয়ার উপস্থিত থাকে।’ ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ-এ তিনি বলেছেন, ‘পাওয়ার ‘বাতিল করে’ ‘দমন করে’ বা ‘নিয়ন্ত্রণ করে’- এমন ধরনের নেতিবাচক কথা একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে। বরং জোর দিতে হবে এই কথায়, পাওয়ার ডিসকোর্স আর বস্তু ও সত্যাসত্য নির্ধারণ করে।’ উপরের আলোচনা থেকে যা বেরিয়ে আসে তা সংক্ষেপে: (১) পাওয়ার সোশাল স্পেসের সব জায়গাতেই আছে। (২) এই পাওয়ার এর সত্তা একটি সম্পর্কের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। অর্থাৎ পাওয়ার একটি অনটোলজিকাল রিলেশনাল আইটেম। (৩) শুধু শিক্ষাক্ষেত্র বা পরিবারই নয়, ডিসকোর্সও এই পাওয়ার-সম্পর্কের জালে আবদ্ধ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন