বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা : সুহাসিনীর পমেটম, ভাষা ও অমরত্ব

কমলকুমার মজুমদার (জন্ম: ১৭ নভেম্বর১৯১৪ - মৃত্যু: ৯ ফেব্রুয়ারি১৯৭৯) বিংশ শতাব্দীর একজন বাঙ্গালী ঔপন্যাসিক যিনি আধুনিক বাঙলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিগণিত। তাকে বলা হয় 'লেখকদের লেখক'। তাঁর উপন্যাস অন্তর্জলী যাত্রা এর অনন্যপূর্ব আখ্যানভাগ ও ভাষাশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ। বাঙলা কথাসাহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস ইয়োরোপীয় উপন্যাসের আদলে গড়ে উঠেছে, কমলকুমার মজুমদার সেই অনুসরণতা পরিহার করেছিলেন।

তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুরূহতম লেখকদের একজন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিলেন; যেমন সুহাসিনীর পমেটম উপন্যাসে ২৫০ পৃষ্ঠায় যদি-চিহ্ন বিহীন মাত্র একটি বাক্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের দুবোর্ধ্যতম লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। দীক্ষিত পাঠকের কাছে কমলকুমার অবশ্যপাঠ্য লেখক হিসেবেই সমাদৃত হলেও অদ্যাবধি তিনি সাধারণ্যে পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন নি।
কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস নিয়ে আরেক কৃতি লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা
সুহাসিনীর পমেটম, ভাষা ও অমরত্ব
----------------------------------------------------------------------------------------------
কমলকুমার মজুমদারের আসর দেখতে দেখতে ফাঁকা হয়ে এল। লোক ওঠা শুরু হয় সেই অনিলা-স্মরণে থেকে, এখন আসর প্রায়-ফাঁকা, আজ, সুহাসিনীর পমেটম-এর পর, পিছন থেকে, সামনে থেকে, যত্রতত্র থেকে লোক উঠে যাচ্ছে। অন্তর্জলি যাত্রা ও নিম অন্নপূর্ণা যখন পুস্তকাকারে বেরোয়, সেই ছিল তাঁর সুসময়, তখন তাঁর পাঠকসংখ্যা ছিল সুদীর্ঘ - যেমন একটা শালগাছ - তারপর আজ কমলকুমার মজুমদারের পাঠক সশব্দে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। সুহাসিনীর পমেটম মাত্র ২০ জন পাঠকও পেয়েছিল কি না সন্দেহ, আমাকে পায় নি।

ঘন জঙ্গলের মধ্যে সহসা খানিকটা ফাঁকা জায়গা যেখানে সরলরেখার মতো পড়ে আছে ওই শালগাছ, - কমলকুমার মজুমদারের পাঠক, তার বুকে কুড়াল, আজ থেকে মাত্র দশ বছর পরে এই দৃশ্য। দশ বছর পরে কমলবাবুর কোনো পাঠক নেই, মিথ্যাবাদী ছাড়া আজ মার্শেল প্রুস্তেরও নেই কোনো পাঠক, কিংবা, যেমন ফিনগানস্ ওয়েক, যা আজ কিংবদন্তী। “যদি ডবলিন কখনো ধ্বংস হয়ে যায়, আমার ইউলিসেস থেকে অবিকল ডাবলিন তৈরী করা যাবে...” বৃথা গর্ব করে একথা জয়স একদিন বলেছিলেন। 

কিন্তু এতে জয়স বা প্রুস্তের কিছু এসে যায় নি। যে ব্যক্তি প্রুস্ত পড়েছে সে ছাড়া অন্য কেউ শিক্ষিত এ-রকম অন্তত প্যারিজিয়ানরা মনে করে না - ডাবলিনে দেদোলাস-দিবস পালন করা হয় ঠিকই, আমাদের বাঙলাদেশেও হয় কেঁদুলির মেলা।

তাতে কমলবাবুর কিছু এসে যাবে না। ‘তাহাদের কথা’ থেকে ‘গোলাপসুন্দরী’ - যখন গোলাপসুন্দরী হাতে পাই, সেই তাঁর শেষ লেখা যা পুরোটা পড়ি, কেননা পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল তাঁর শেষ লেখা পড়ছি ও পাঠ শেষ করে মনে হয়েছিল তাঁর শেষ লেখা পড়লুম। এ-ভাবেই, প্রকৃতপক্ষে, সব লেখাই মনে হয়েছিল তাঁর শেষ রচনা - এবং গোলাপসুন্দরী, যখন গোলাপসুন্দরীর পরে পুস্তকাকারে বেরুল তাঁর গল্প ও উপন্যাস, পর পর বেরিয়েছিল, আমাদের কালের বটতলা থেকে একসঙ্গে তাঁর দু’দুটি বই কিনতে পেরে অতিনাটকের চাঞ্চল্য অনুভব করা গিয়েছিল, যাকে বলে গ্লোরিয়াস এন্ড, মনে হয়েছিল, ঠিক যে-রকম হবার কথা ছিল। সেদিন ডুন এক্সপ্রেসের আলোয় অন্তর্জলি যাত্রাকে মনে হয় ধর্মগ্রন্থ, আমাদের গীতা, ভূমিকায় লেখক প্রণাম জানিয়েছিলেন পাঠককে, এ-প্রণাম উপহার, এ-উপহার আমার, পাঠকের, প্রাপ্য মনে হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও বের হল অনিলা-স্মরণে, কিছুটা পড়েছিলাম এবং অবশেষে সুহাসিনীর পমেটম – পড়েছি আট লাইন – কেবলমাত্র চরিত্রলিপিটুকু। এরপর কিছু বেরুলে আমি শুধু তার নামপত্র পড়ব ও দশ বছর পরে কমলবাবু যা লিখবেন তাতে আমার কিছু এসে যায় না। বস্তুত, এটা আমি খুব ভালো ক’রে লক্ষ্য করি যে কমলবাবুর পাঠক হিংস্র হয়ে ওঠে গোলাপসুন্দরীর পর থেকে, তখন থেকেই তিনি নীরবে ডেজার্টেড হতে থাকেন, আজ থেকে দশ বছর পর কমলকুমার মজুমদার প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, পাঠকহারা, একা, যেমন একা আমাদের বিবাহহারা জীবন।

এতে কমলবাবুর কিছু এসে যাবে না; যে কমলকুমার মজুমদার পড়ে নি, কলকাতা তাকে শিক্ষিত মনে করে না, কলকাতার বাইরে, প্রাদেশিক লেখকমহলে, উনিই এখন কিংবদন্তী – এ জন্য নয়। কেননা একথা আমরা এখন জানি যে কমলকুমার মজুমদার একজন সাধক, যেমন সাধনা ছিল একমাত্র বঙ্কিমের বা বালুকাস্তূপের উপর শবারূঢ় সেই মনুষ্যমূর্তির, যার সামনে ছিল নরকপাল, চতুর্দিকে ছিল অস্থি ও দুর্গন্ধ, সমুখের অগ্নির প্রভায় যাকে, নবকুমারের, আকাশপটস্থ চিত্রের ন্যায় মনে হয়েছিল। প্রসঙ্গত, ১৮৭৫ খ্রীস্টাব্দে, কাঠের টেবিলের ওপর ঝুঁকে, দীর্ঘ মোমবাতির আলোয় বন্দেমাতরম রচনাকালে ৩৮ বছর বয়স্ক বারাসতের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের মদ্যপানরত মূর্তি ভেসে ওঠে। ইনিও, কমলকুমার মজুমদার, কোনো নির্দেশ পেয়েছেন মনে হয়, কেবল স্বার্থত্যাগ, কেবলি স্বার্থত্যাগ করে যাওয়া ছাড়া এঁর আর করণীয় কিছু নেই। এঁর রয়েছে স্থির পরকাল। গোলাপসুন্দরীতেই বোঝা গিয়েছিল তাঁর উদ্দেশ্য, তারপর – আর লেখার দরকার ছিল না। বোঝা গিয়েছিল কমলবাবু যা চান তা হল অমরতা। এবং এখানেই তিনি ট্র্যাজিক, নচিকেতা থেকে আমস্টার্ডামের বিষণ্ণ ইহুদী পর্যন্ত সবাই, অমরতা, এ-পৃথিবীতে, এখন আর, মোটে মানায় না। ঈশ্বর বা আত্মা বলে কিছু নেই – অমরতা নেই! “অমরতায় বিশ্বাস মানে অমরতায় বিশ্বাসী হবার ইচ্ছা, অমরতায় বিশ্বাসী হবার ইচ্ছাই অমরতায় বিশ্বাস”, কিন্তু, তবুও, নিছক জঠরের ক্ষুধা বা স্ত্রীলোকের সামনে হাঁটু মুড়ে বসার তুলনার অমরতার জন্য নতজানু হওয়া, এটা কতো অশ্লীল। যখন “মানুষের প্রতিটি চেতনাই তার নিজের মৃত্যু-সম্পর্কে চেতনা” তখন পৃথিবীর খেয়ে-পরে এ-পৃথিবীতে অমর হতে চাওয়া, ওঃ, কী অমানুষিক!

কমলবাবু চেয়েছিলেন আমাদের কিছু জানাতে, কিন্তু আমরা কিছু জানতে চাই না, আমাদের কারো কিছু জানবার থাকতে পারে না। মানুষ জানতে চেয়েছিল কেন? উত্তর, ১. যাতে সে বেঁচে থাকতে পারে। নিছক, শুধু, বেঁচে থাকার সুবিধে হবে বলেই মানুষ জানতে চেয়েছিল- যেমন, একই কারণে, চেয়েছিল বিজ্ঞান। ২. পরে সে আরো জানতে চায়, নিছক জানার ক্ষুধাতেই সে জানতে চেয়েছিল আরোও আরো জানতে পারে। “আমি জানি”- এই চরম জানা সে জানতে পারে। আজ মানুষের জ্ঞান তার প্রয়োজনের চেয়ে অনেক অনেক বেশি, আমরা দেখছি নিছক-বাঁচার জন্যে ঐ অতিরিক্ত-জ্ঞানের কোনো প্রয়োজন ছিল না - কোনো প্রয়োজন নেই। এখন একদিকে ঐ স্তূপাকার অতিরিক্ত-জ্ঞান, পণ্ডশ্রম, অন্যদিকে রক্ত, মাংস ও হাড়ের মানুষ – টলস্টয়-র‍্যাঁবো-ভালে্রি, প্রুস্ত-জয়স (হায়, এদের নামগুলো পর্যন্ত ঠিকভাবে মনে পড়ে না) কমলবাবু, এ-সব তার কাছে ছিবড়ে, অতিরিক্ত, তার শুধু-বেঁচে-থাকার জন্যে এ-সবের কোনো রূপ প্রয়োজন নেই বা উপযোগিতা।

“মানুষের স্পন্দনহীনতার কাছে সমগ্র বিশ্বসাহিত্য আজ তামাশা মাত্র।” বাস্তবিক, ভাষা-দ্বারা যা-কিছু হবার হয়ে গেছে, তুমুল সাহিত্য হয়ে গেছে, ভাষা দিয়ে আর-কিছু হবার নেই – এই বোধ থেকেই আধুনিক সাহিত্যের পুনর্জন্ম হবার কথা, মানে, আমি বলছি, যদি তা আদৌ হয়। কেন না, আমরা ভাষা দিয়ে চিন্তা করি এটা একটা র‍্যাশনালিস্ট চিন্তা, যা ভুল, র‍্যাশনালিজম নামক গোটা জিনিসটা বাজে, যেমন বাজে স্ত্রীলোকের কাছে একটা হিজড়ে। ইরর‍্যাশনালকে র‍্যাশনালাইজ করা গিয়েছিল কি, যায় নি। আমরা ভাষা দিয়ে চিন্তা এ তো ভুলই, এ-ছাড়া, একমাত্র মাথা, বা মাথা আদৌ থিঙ্কিং অর্গান, এটাও অনুমান মাত্র। আসলে চিন্তা করে আমাদের সমস্ত শরীর, আমাদের রক্ত আমাদের জন্য চিন্তা করে, আমার পেট, আমার কিডনি, আমার ফুসফুস ও হার্ট, আমার হাড়গুলি ও তাদের অভ্যন্তরস্থ মজ্জাও আমার জন্য চিন্তিত আমি টের পাই – পা থেকে মাথা পর্যন্ত আমার শরীর, এই আমার সমগ্র জীবন, আমার শরীরময় সমস্ত জীবন আমার জন্যে চিন্তা করে। এবং আমরা এমন একটা ভাষা চাই, এমন একটা ভাষা আছে, আমরা টের পাই, যা আমাদের মধ্যে আমাদের ঐরূপ, শরীরময়, জীবনের জন্যে চিন্তা করে।

সম্ভবত এটাকে ভাষা বলা যাবে না, বোধকরি এটা অভাষা। যে ভাষায় আমরা নাকি চিন্তা করি তা দিয়ে, নতুন ও পুরাতন রীতি, প্রচলিত বা অপ্রচলিত ছাঁচ এ-সব দিয়ে তো চুলও ছেঁড়া গেল না, যে-জন্যে, আজ, অবশেষে খোঁজ পড়েছে ঐ অভাষার, বিশ্বব্যাপী যখন এই শেষ চেষ্টা চলছে, তখন কমলবাবু মাথার ভেতর থেকে টেনে ওড়াতে চাইছেন ভাষার পতাকা, ভাষা দিয়ে কিছু জানাতে চাইছেন, ভাষা দিয়ে চাইছেন চিন্তা করতে।
রচনায় আলোচিত বিষয়ের একটা ছোটো বিবরণ নিচে দেওয়া গেল।

১. তিনি চাইছেন ভাষা দিয়ে চিন্তা করতে, ভাষায় আমাদের কিছু জানাতে চাইছেন। প্রথমত তো তিনি যা জানাতে চাইছেন তা অতিরিক্ত-জ্ঞান, আমাদের শুধু-বেঁচে-থাকার জন্যে যার কোনো উপযোগিতা নেই, দ্বিতীয়ত, এটাই প্রধান কথা, ভাষা দ্বারা চিন্তা করাই যায় না, কারণ ভাষা স্বয়ং আমাদের মধ্যে, আমাদের জন্য, চিন্তা করে। কেননা, আমাদের চিন্তা মাত্রই মৌলিক পদার্থ, স্বয়ম্ভূ – অতএব বলা বাহুল্য যে ভাষা-নিরপেক্ষ – সেগুলি এসেছিল চিরস্তব্ধতা থেকে এবং চিরস্তব্ধতাতেই তারা ফিরে যাবে।

২. কমলবাবু চান অমরতা। এ-কিছু সত্যিকারের অমরতা নয়, যা রিয়াল, এ-কেবল অমরতায় বিশ্বাস বা অমর হতে-চাওয়া; এও সেই অ্যাবস্ট্রাক্ট অমরতা। কিন্তু আমরা মরণশীল ও আমাদের প্রতিটি চেতনাই মৃত্যুচেতনা।



এই রচনা ১৯৬৬ সালের...



লেখক পরিচিতি
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

 (২৫ অক্টোবর ১৯৩৩ - ১২ ডিসেম্বর ২০০৫) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি বাংলা সাহিত্যের 'আভাঁ গার্দ' লেখকগোষ্ঠীর অন্যতম। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হল ক্রীতদাস ক্রীতদাসী (১৯৬১), সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৯), এখন আমার কোনো অসুখ নেই (১৯৭৭), হিরোশিমা মাই লাভ (১৯৮৯), কলকাতার দিনরাত্রি (১৯৯৬) ইত্যাদি।[১] তিনি বঙ্কিম পুরস্কার ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন।

২টি মন্তব্য: