বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

নীহারুল ইসলামের গল্প : কলমিস্ত্রী সেন্টু ও সোনার ফিলটার

সেন্টুমিস্ত্রীর কিছু ভাল্লাগছে না। সে আজ বাঁটলার ঠেক কিংবা অগ্রদূত ক্লাবে যাওয়ার কথা ভুলে আছে। তাস খেলা কিংবা মদ খাওয়ার কথা তার মনে নেই। ইশকুল মাঠে একা একা বসে কী যেন ভাবছে মনে মনে! নাকি কিছুই ভাবছে না? সত্যিই হয়ত কিছু ভাবছে না! হয়ত আর কিছু ভাবতেই পারছে না!


অথচ আজ সারাদিন সে খুব ভেবেছে। শেষপর্যন্ত ভাবনার কূলকিনারা পায়নি যখন, ইশকুল-মাঠের রোদ-পোড়া হলুদ ঘাসে এসে বসেছে। এই ভর সন্ধ্যেই ফাগুনের কুয়াশা মাথায় মেখে বসে বসে একটার পর একটা বিড়ি টানছে। তবু তার মাথায় কোনওকিছু খেলছে না। বিড়ির ধোঁয়া পাঁক খেতে খেতে আকাশে যেভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে, তার ভাবনাও ওভাবেই মিলিয়ে যাচ্ছে। সে টের পাচ্ছে না।

***

সেন্টু একজন কলমিস্ত্রী। দ্যাশ-দুনিয়ার টিউবয়েল সারিয়ে বেড়ানো তার কাজ। জং ধরা নাট-বল্টু খুলতে, মাটির নীচে পচে হেজে যাওয়া পাইপ তুলতে তার জুড়ি নেই। সে কিনা এমন একটা সামান্য ব্যাপারে নাস্তানাবুদ হবে, ভাবতেই তার নিজেরই অপমান অপমান লাগছে! অথচ আজ ভোর ভোর সে খুব অহং নিয়ে - উৎসাহ নিয়ে চামিন্ডার মাঠে গেছিল।

কেন যাবে না? ওই অঞ্চলের সবচেয়ে নামজাদা মানুষের বাড়ি থেকে ডাক এসেছিল যে! নামজাদা লোক বলতে চামিন্ডার ইশাহাক হাজী। এক কালে চামিন্ডার গোটা মাঠটার দলিল ছিল নাকি একা ওই লোকটার নামে! ছোটবেলায় বাপ-ঠাকুরদার মুখে শুনেছিল সেই গল্প!

সেন্টু খুব ভোর ভোর গেছিল। ওদিকটায় সে আগে কখনও যায়নি। আজকেই প্রথম। স্বভাবতই খুব আগ্রহ ছিল তার। কৌতূহলও ছিল। এককালে নাকি তার বাপ-ঠাকুরদার এলাকা ছিল সেটা! ওই এলাকার যত শ্যালো, সব তার বাপ-ঠাকুরদার হাতে পোঁতা। তখন টিউবয়েলের চল ছিল না। বড়লোক যারা তাদের বাড়িতে কুয়া থাকত। আর গরীবদের ছিল সরকারি ইঁদারার পানি। তবে সবুজ বিপ্লবের নামে মাঠে মাঠে ছিল শ্যালো-মেশিনের দাপাদাপি। গরীব কি বড়লোক, সবার জমির আলে আলে শ্যালো পোঁতা। চাষে উৎসাহ দিতে সরকার বিনা সুদে টাকা ধার দিত চাষীদের। শুধু চামিন্ডার মাঠ নয়, আশপাশে যত মাঠ ছিল, কোনও মাঠ বাদ ছিল না। দ্যাশের ছেল্যা যে তখন রাইটার্সে কৃষিমন্ত্রী!



শ্যালো-মেসিনের দৌলতে হোক কিংবা কৃষিমন্ত্রীর দৌলতে, ফসলও ফলত তখন মাঠে! এক জমিতে তিন-তিনবার। পাট উঠল তো ধান। ধান উঠল তো গম। গম উঠল তো আবার পাট। বাপ, ঠাকুরদারা সারাদিন পাইপ পুঁতে এসে শোনাত সেই সব গল্প। দ্যাশে নাকি আর কেহু না খেয়ে থাকবে না! সবাই তিন বেলা পেটপুরে খেতে পাবে! তাদের পাড়ার মনসা মন্দিরের চাতালে বসে আরও অনেকের সঙ্গে সেন্টু নিজেও শুনত সেই সব গল্প। পাশের টিউবয়েল থেকে তখন মা-মাসিরা হ্যাচাং হ্যাচাং শব্দে জল তুলছে। মা-মাসির জল তোলার শব্দের সঙ্গে গ্রামের লোকের কুয়া কিংবা ইঁদারার জল খাওয়া, কিংবা মাঠে শ্যালোর পাইপ পোঁতার সঙ্গে সবার খেতে পাওয়ার ব্যাপারটা তার ঠিকঠাক হজম হতো না। হজম না হওয়ারই কথা! তখন সে ছোট ছিল।

যদিও পরে, একটু বড় হয়ে যখন বাপ-ঠাকুরদার সঙ্গী হল সে, নিজের চোখে দেখল। ব্যাপারটা বুঝল। আরও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাপ-ঠাকুরদার কাজটাও রপ্ত করল। তাই তো আজ সে ‘সেন্টুমিস্ত্রী’! নামটা ইশাহাক হাজীর গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কাল সেখান থেকেই ডাক এসেছিল। আর আজ সকালে দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে সাইকেল চড়ে পৌঁছে গেছিল ইশাহাক হাজীর গ্রাম হয়ে একেবারে চামিন্ডার মাঠে।

কিন্তু পৌঁছে কী দেখেছিল? নামেই মাঠ! আদতে শুকনো খট্‌খটে একটা ডাঙা। কোথাও কোথাও কাঁটাঝোপ। একটা দু’টো বাবলা গাছ।

আজকাল কোনও ব্যাপারেই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবু আশ্চর্য না হয়ে থাকতে পারেনি সেন্টু। জিজ্ঞেস করেছিল, এটা মাঠ?

ইশাহাক হাজীর বড়ছেলে রমজান আলি সঙ্গে ছিল। বলেছিল, তুমি দেখোনি সেন্টু। তুমার বাপ-দাদো দেখ্যাছিল। মস্ত মাঠ ছিল এই চামিন্ডার মাঠ। তারও আগে নাকি এটো একটো বিল ছিল। দুনিয়া-জাহানে খুব নাম ছিল সেই বিলের। চামিন্ডার বিল! যেমন কলের মিস্ত্রী হিসাবে তুমার দাদোর নাম ছিল ‘নিপেনমিস্ত্রী’! তোমার দাদো শুধু ভালো মিস্ত্রী ছিল না গো! মানুষ হিসাবেও খুব ভালো ছিল। আহাঃ কী মানুষ ছিল গো নিপেনদাদো ... !

রমজান আলির কথা শুনতে শুনতে সেন্টু চামিন্ডার ডাঙাটাকে মাঠ হিসাবে কল্পনা করছিল! একটা আবাদী মাঠ। ঠাকুরদাকেও মনে মনে ভাবছিল। ঠাকুরদার মুখে শোনা গল্প মনে পড়ছিল তার। ঠাকুরদার মুখে শোনা গল্প মনে না পড়লে রমজান আলিকে এতক্ষণ তার পাগল মনে হত। অথচ ঠাকুরদার মুখে শোনা গল্প মনে করতে করতে রমজান আলির কথা শুনে যখন সে ডাঙাটার দিকে তাকিয়েছিল, ডাঙা নয়- একটা তিন ফসলী মাঠ ভেসে উঠেছিল তার চোখের সামনে। জমির আলে আলে পোঁতা শ্যালোগুলিকেও স্পষ্ট চাক্ষুষ করছিল সে। শুধু তাই না, শ্যালোতে ফিট করা দমকল মাটির তলদেশ থেকে ফটফট শব্দে জল তুলছে। ফিলটার ছাঁকা জল! ইস্পাত-রঙের! কী ধারালো তোড়! রীতি মতো সবকিছু তাজ্জ্বব লাগছিল তার। থাকতে না পেরে তাই সে জিজ্ঞেস করে বসেছিল, বিল মাঠ হয়- মাঠ ডাঙা হয় কী করে?

রমজান আলি বলেছিল, মানুষের লোভে। লোভ খুব খারাপ জিনিষ! মানুষের লোভে ডাঙা সমুদ্র হয়। সমুদ্র হয় মরুভূমি। তা হাঁরঘের ভাগ্য ভালো বুলতে হবে যে মরুভূমি হয়নি!

তারপর একটু থেমে ফিস্‌ ফিস্‌ করে বলেছিল, জানো তো- সুনার তৈরী ফিলটার পুঁতা আছে এই ডাঙায়। কাহুকে বুলিও না ভাই সেন্টু! তোমার বাপ-দাদোরা পুঁত্যাছিল সব। হামার দাদো যেমন তুমার বাপ-দাদোর ওপর বিশ্বাস



রেখ্যাছিল। অরাও তেমনি হামার দাদোর বিশ্বাস ভাঙ্গে নি। কাহুকে বুলেনি খো সুনার ফিলটারের কথা। হামার দাদো হজ করতে যেই সুনা এন্যাছিল আরব দ্যাশ থেক্যা। মেলা সুনা! আবু জমজমের পানি ভরে এন্যাছিল যে পিপাতে ভরি, ওই পিপাটোই ছিল সুনার তৈরী ...

রমজান আলির কথা শেষ হতেই আর একটুও দেরী করেনি সেন্টু। যেখানে যেখানে তার মনে হয়েছে, সঙ্গী যে দু’জন ছিল তাদের ডাঙা খুঁড়তে হুকুম দিয়েছিল। কোথাও এক হাত গর্ত! কোথাও এক হাঁটু! কোথাও বা এক কোমর! একটার পর একটা জায়গা খুঁড়ে চলেছে তার দুই শাগরেদ।

না, কোথাও কিছু নেই। কোনও চিহ্ন নেই। তাহলে কী সবই গল্প! রমজান আলি কি তাহলে তাকে আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছিল?

কিন্তু রমজান আলি তাকে খামোখা খরচা করে এনে ভরা ফাগুনে আষাঢ়ে গল্প শোনাবে কেন?

সেন্টুর আশা যায় না। এই বুঝি গর্ত থেকে খটাম আওয়াজ উঠবে! আর সেই আওয়াজে তার বুকে ঢাকের বোল বাজবে! সে নেচে উঠবে!

যদিও সেন্টুর আশা পূরণ হয় না। শেষপর্যন্ত তার বুকে ঢাকের বোল বাজে না। সে নাচতে পারে না। অথচ সূর্য পূর্ব দিগন্ত থেকে দৌড়ে গিয়ে পশ্চিম দিগন্তে সিজদা ঠোকে। আঁধার ঘনিয়ে আসে। অগত্যা নাচার সেন্টু কাজ বন্ধ রেখে বাড়ি ফিরে আসে।


***

সেন্টু নিজে কলের মিস্ত্রী। তার বাড়িতে কল না থাকলে চলে কী করে? বাড়িতে কল আছে। সে বাড়ি ঢুকলেই বউ চুমকি সেই কল থেকে স্নানের জল তুলে দেয়। আজ কিন্তু সে চুমকিকে জল তুলতে দেয়নি। নিজেই জল তুলেছে। স্নান করেছে। চুমকি অবাক হয়েছে। খেতে বসে অন্যদিন মুখে কত কথা থাকে। তুই খুব সুন্দর! তুই খুব ভাল! চুমকি লজ্জ্বা পায়। অথচ আজ তার মুখে কোনও কথা নেই। কেমন গুমসুম যেন!

ব্যাপারটা চুমকির ভাল ঠেকেনি। জিজ্ঞেস করেছিল, আজ কী হয়েছে তুমার? মুখে রা নাই ক্যানে? ভূতে ধর‍্যাছে নাকি!

ভূতে ধরলেও না হয় কথা ছিল! কিন্তু ভূতে তো ধরে নি! তাকে জ্বিনে পেয়েছে!

হ্যাঁ, তাকে আজ জিনেই পেয়েছে। যে কারণে তার মুখে রা সরছে না। চামিন্ডার ডাঙায় শ্যালো-পাইপের নীচে নাকি ঈশাহাক হাজীর সোনা পোঁতা আছে! সেই ডাঙা খুঁড়ে মান্ধাত্বার আমলের সাত সাতটা পাইপ তুলবে সে। একেবারে তলার ফিল্টারটারটাও তুলবে! যেটাই সোনার নেট পরানো আছে!

হজ করতে গিয়ে আরব দেশ থেকে ইশাহাক হাজী কেজী কেজী সোনা এনেছিল! আবে জমজমের পানি এনেছিল যে পিপেতে ভরে, সেই পিপেটাই নাকি ছিল সোনার! খবরটা চারপাশে কীভাবে চাউর হয়ে গেছিল। আরব দেশ থেকে সোনা আনতে ভয় না পেলেও ইশাহাক হাজী বাড়িতে সেই সোনা রাখতে ভয় পেয়েছিল। এত কষ্ট করে - বুদ্ধি করে আরব থেকে আনা সোনা যদি কুলগাছির সানা-মানারা ডাকাতি করে নেয়! সানা-মানাদের তখন খুব বাড়-বাড়ন্ত। আরব থেকে সোনা আনার রিস্ক নিলেও সেই সোনা বাড়িতে রাখার রিস্ক নেয় নি ঈশাহাক হাজী। নিপেনমিস্ত্রীকে ডেকে ওই সোনা দিয়ে ফিল্টারের নেট বানিয়ে কোন্‌ জমির আলে পুঁতে দিয়েছিল চামিন্ডার মাঠে!



রমজান আলির কাছে শোনা এই গল্প সেন্টুমিস্ত্রী বউ চুমকিকে বলতে পারে না। বলবে কী? তার ঠাকুরদা নিপেনমিস্ত্রী তাকে কিছু বলেছিল নাকি? কত কথা বলেছে! অথচ এই সোনা পোঁতার কথাটা বলেনি। কেন বলেনি? তাহলে কি তার ঠাকুরদা তাকে মানা বা সানা দুই ভাইয়ের একজন ভেবেছিল? নিশ্চয় ভেবেছিল।

সেন্টুর হেঁচকি ওঠে। চুমকি তার পিঠে থাবা মারে। মুখে বলে, আজ কী হয়েছে তুমার? তুমি এমন করছো কেনে?

চুমকির কথার উত্তর করতে পারে না সেন্টু। উত্তর করবে কী, সে যে ভাত খাচ্ছে- সেটাই তার খেয়াল নেই। বাড়িতে আছে না চামিন্ডার ডাঙায় আছে- হুঁশ নেই। এমনই অবস্থা তার।

ছেলে কার্তিক কোথায় ছিল কে জানে! তার এমন অবস্থার মাঝে ছুটতে ছুটতে এসে পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, বাপি- আমি বুল্টিদির নাচের ইশকুলে ব্রেকডান্স শিখব!

ব্রেকডান্স আবার কী জিনিস? সব কিছু ভুলে ফ্যাল ফ্যাল করে চায় সেন্টু। একবার ছেলের মুখের দিকে। আর একবার বউ চুমকির মুখের দিকে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। জিজ্ঞেস করবে কোন লজ্জ্বায়? কত বড় নামকরা কলমিস্ত্রী হয়ে চামিন্ডার ডাঙায় কোথায় কোথায় শ্যালো পোঁতা আছে সেটাই তো বুঝতে পারে নি সে আজ সারাদিন। তাহলে ছেলে কী বলল, বুঝবে কী করে?

সেন্টুর অমন ভাবভঙ্গি দেখে চুমকি হাসতে হাসতে বলেছিল, কী হল? কী দেখছো অমন করে? বেটা তুমার নাচ শিখবে। সেদিন ইশকুল মাঠে সিমেন্ট কোম্পানি বিনা পয়সায় যে নাচ দেখিয়েছিল, তেমন নাচ!

সেন্টুর মনে পড়ে। সে নিজেও দেখেছিল কিছুক্ষণ। অল্প বয়সী পাঁচ-সাতটা ছেলেমেয়ে! বক্সে তারস্বরে বাজা বাজনার তালে নোংরা ভাবে বুক-পাছা কাঁপাচ্ছিল। বেশীক্ষণ দেখতে পারেনি। ছিঃ! বলে সে বাঁটলার ঠেকে চলে গেছিল।

আর আজ কিনা শালার বেটা কার্তিক বলে কী? বাড়ির পাশে সরকারি ইশকুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। সামনের মজুমদারবাবুদের বাড়ির ছেলেটা! তার কার্তিকের বয়সী। ওই ইশকুলে পড়ে। রোজ ইশকুলে যায়! তার সখ ছিল কার্তিকও অমন রোজ ইশকুলে যাক্‌। কিন্তু কার্তিক ইশকুলে গেল না। তা নিয়ে তার কষ্ট আছে। সেই কার্তিক আবার আজ বলছে, নাচ শিখবে!

খাওয়া ছেড়ে তড়পে উঠতে যাচ্ছিল ছেলেকে শাসন করতে। কিন্তু শরীরে শক্তি পায়নি। পেটে ক্ষিদে, তার ওপর সারাদিনের খাটা-খাটুনির সঙ্গে দেহমনে যে সব ঘটনা ঘটেছে আজ!

নাকি খালি গল্প শুনেছে? একটা বিল কী করে মাঠ হয়? একটা মাঠ কী করে ডাঙা হয়ে যায়? হজ করতে গিয়ে পাচার করে আনা সোনা কীভাবে কোথায় লুকিয়ে রাখে- সেই সব গল্প!

যাইহোক, সেসব ঘটনা কিংবা গল্পের কথা সে কাউকে বলতে পারছে না। ইশাহাকহাজীর বড় ছেলে রমজান বলতে বারণ করেছে। এও বলেছে বাপের পুঁতে রাখা সেই সোনা পেলে তাকেও এক তোলা দেবে! কথাটা মনে পড়তেই সেন্টুমিস্ত্রী তৎক্ষণাৎ শরীরে শক্তি ফিরে পেয়েছে! পেটে ক্ষিদে থাকা সত্ত্বেও ভাতের থালা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপর বাড়ির কলে হাত মুখ ধুয়ে বিড়ির বান্ডিল আর দেশলাই হাতে নিয়ে এসে বসেছে ইশকুল মাঠে। একটার পর একটা বিড়ি টানছে। ভাবছে, একতোলা সোনা পেলে মজুমদারবাবুদের সংসারের মতো তার সংসারেও সুখ আসবে। শান্তি আসবে। সে তখন তার ছেলে কার্তিককে ইশকুলে পড়তে পাঠাতে পারবে।



কিন্তু ঈশাহাক হাজীর পোঁতা সোনার ফিলটার চামিন্ডার ডাঙা থেকে কী ভাবে উদ্ধার করবে সেটাই বুঝতে পারছে না। রাত পেরোলেই আবার সেখানে যেতে হবে। তারপর! তারপর কী করবে?

ইশকুল মাঠটাকে চামিন্ডার মাঠ মনে করে সেন্টু মনে মনে তল্লাশি চালাচ্ছে এখন। রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। পাল্লা দিয়ে আকাশের একটা অনুজ্জ্বল তারাও ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। সেন্টুর চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।



***

রাত গভীর হলে সবার অজান্তে আকাশে উঠে এসেছিল একটা ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ। মায়াবি জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিচ্ছিল চরাচরে। তার প্রভাবেই কিনা কে জানে, ইশকুল-মাঠ ছেড়ে উঠে সেন্টু দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে হাঁটতে শুরু করে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিংবা ইশকুল-মাঠ ছেড়ে উঠে অন্যদিন সে যায় বাঁটলার ঠেক্‌ কিংবা অগ্রদূত ক্লাবে। কিন্তু আজ তার কোনও গন্তব্য নেই। আছে বলতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটা-দু’টো প্যাঁচার ডাক। আশপাশে কুকুর-শেয়ালের চিৎকার। যদিও সে কিছুই শোনে না। শুনতে পায় না। রাস্তা হাঁটে অথচ ঘোর থেকে ঘোরের ভেতরে প্রবেশ করে।

অবশ্য একসময় সে লক্ষ্য করে যে, সে এসে পড়েছে একটা বিশাল বিলের পাড়ে। যেখান থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আর কোনও পথ নেই।

- এটাই কি তাহলে চামিন্ডার বিল? সেন্টু নিজে নিজেকেই প্রশ্ন করে।

কে যেন তার প্রশ্নের উত্তর দেয়, হ্যাঁ এটাই চামিন্ডার বিল। তারপর সেন্টুকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে, কী চাও? কে তুমি?

সেন্টু অপরিচিত কন্ঠ শুনেও চমকায় না। ভাবে, হয়ত আকাশবাণী!

হ্যাঁ- আকাশবাণীই। একটু বাদেই বুঝতে পারে সেন্টু। কেননা, ততক্ষণে সে চামিন্ডার বিলের ঝিলমিল জলে তার বাপ-ঠাকুরদাকে দেখতে পেয়েছে। কোনওদিন না দেখা ঈশাহাক হাজীকেও দেখছে। তার জন্মের আগে ঘটে যাওয়া সবুজ বিপ্লবকেও অনুভব করছে। শুধু নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে না। স্বভাবতই সে বলে ওঠে, আমি চাই সামনে এগোতে।

- সামনে এগোতে চাও! কেন?

- আমি আমাকে ভাল করে দেখতে চাই বলে আমি এগোতে চাই।

- নিজেকে ভাল করে দেখতে চাও? আমি যদি দেখাই! দেখবে?

- হ্যাঁ দেখব।

- বেশ। দেখো তাহলে!

আকাশবাণী শেষ হতেই ফাগুনের ছেনালি বাতাস বিলের জলে জোর আন্দোলন তোলে। জল সাংঘাতিক রকম আলোড়িত হয়। সেই আলোড়নে জলের ভেতর সেন্টু এতক্ষণ যা দেখছিল- যাদের দেখছিল, সেসব আর কিছুই দেখতে পায় না। বদলে একটা সোনার ফিলটারকে ঘুরপাক খেতে দেখে। জলের উথালপাতাল আলোড়নে ফিলটারটা এক হাত ওপরে উঠে আসছে তো তিন হাত গভীরে নেমে যাচ্ছে। যেন ব্রেকডান্স করছে। তবু সে আশা

করছে এই বুঝি ফিলটারটা ভেসে উঠবে চামিন্ডার বিলের জলের ওপর। আর সে লাফ মেরে সাঁতরে গিয়ে সেটাকে তুলে আনবে ডাঙায়।



কিন্তু আচমকা বিলের জলে ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। সেই ঘূর্ণি নিমেষেই ফিলটারটাকে নিজের চপটে নিয়ে নেয়। ফিলটারটার আর কোনও উপায় থাকে না। সেন্টু দেখে কত অসহায় ভাবে ঈশাহাক হাজীর সোনার ফিলটার দুমড়ে মুচড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে জলের গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে।

এতক্ষণে সেন্টুর মনে হয় ইশাহাক হাজীর ফিলটার নয়, সে নিজেই তার ভাবনার গভীর থেকে গভীরে ওভাবে তলিয়ে যাচ্ছে।

খেই পাচ্ছে না।





লেখক পরিচিতি
নীহারুল ইসলাম

‘সাগরভিলা’ লালগোলা, মুর্শিদাবাদ, ৭৪২১৪৮ পঃ বঃ, ভারতবর্ষ।
 জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (মাতুলালয়)। 
শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। 
সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। 
রৌরব, দেশ সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেন নববই দশক থেকে। 
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ 

পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব (১৯৯৬),  জেনা (২০০০),  আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল (২০০৪), ট্যাকের মাঠে, মাধবী অপেরা (২০০৮), মজনু হবার রূপকথা (২০১২)। 
দু’টি নভেলা--,  জনম দৌড় (২০১২), উপন্যাস।
 ২০০০ থেকে ‘খোঁজ’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী’র সম্পাদনা। 
পুরস্কার : 
লালগোলা ‘সংস্কৃতি সংঘ’ (১৯৯৫)এবং শিলিগুড়ি ‘উত্তরবঙ্গ নাট্য জগৎ’ কর্তৃক ছোটগল্পকার হিসাবে সংবর্ধিত
 (২০০৩)। সাহিত্য আকাদেমি’র ট্রাভেল গ্রান্ট পেয়ে জুনিয়র লেখক হিসাবে কেরালা ভ্রমণ (২০০৪)। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)। রুদ্রকাল সম্মান (২০১৩) প্রাপ্তি। 
niharulislam@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন