বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

নবারুণ ভট্টাচার্যের গল্প--টয়

টয়কে একা রেখে মিথিল আর মিমি একসঙ্গে কোথাও অনেকদিন যায়নি। যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। কিন্তু মিথিলই অফিস থেকে ফোন করে মিমিকে বলল যে মহেন্দ্রর বাড়িতে সন্ধেবেলা তারকোভস্কির ‘নস্টালজিয়া’ ভিসিআর- এ দেখার খবর। অমিতাদিকে বলে টয়-কে দেখার একটা ব্যবস্থা করতে। একটেরে ছোট্ট তিনতলা ফ্লাটবাড়ির ওপরতলাটায় লোক নেই। রোগা বাড়িটাতে একটাই করে ফ্লাট এক এক তলায়। দোতলায় টয়রা। একতলায় অমিতাদি। আর এগোবার আগে একোরিয়ামের ব্যাপারটা জেনে নেওয়া যাক।
গতবছর মিথিলের অফিস থেকে বেশ ঝামেলা পাকিয়েছিল। মিথিলের ডিভিশনের বস রিটায়ার করলেন। তাঁর জায়গায় নতুন একটা লোক বম্বে থেকে এল। ওখানে কোনো টাটা কনসার্নে ছিল। আর এল তো এল শুরু হল খাটাখাটি। এটা নিয়ে খুচরো ঝামেলা, ওটা নিয়ে খিঁট। শুরু হল মিথিলের টেনশন। সেই সময় মিথিল যোগব্যায়াম শুরু করল। প্রাণায়াম, শবাসন। যে ছেলেটা যোগ শেখাতে আসত সেই মিথিলকে বলেছিল বাড়িতে একটা একোরিয়াম আনতে। সে ছিল শ্রীঅরবিন্দ ও মাদারের ভক্ত। মাদারের কোনো লেখায় নাকি আছে একোরিয়ামের মধ্যে মাছ দেখলে মন খুবই শান্ত হয়। কয়েকজন এটা করে বেশ ভালো ফল পেয়েছে। অতএব একধরনের চিকিৎসার প্রয়োজনেই একোরিয়ামের আবির্ভাব। খুব বড় নয়। বেশি মাছ ধরেও না। সোর্ডটেল, গাপ্পি, এঞ্জেল, ব্লাক মলি, গোরামি। পরে এসেছিল ক্যাট ফিশ। কেঁচো রাখা হত বাথরুমে। ফোঁটা ফোঁটা জলের তলায়। অনেক ঝামেলা। তাই ড্রাই ফুড এল। মিথিলের দেখাদেখি টয়ও বাবার মতো টিভি না দেখে একোরিয়াম দেখার নেশায় মেতেছিল। বুক ফেয়ার থেকে মিথিল আর মিমি টয়কে ‘মাল্টিকালারড ফিনস’ বলে একটা বই কিনে দিয়েছিল। সেই বইটা পড়ে টয় একদিন বলেছিল,

--বাবা, আমাদের মাছের ঘরে ফাইটার নেই কেন?
--ও এনে লাভ নেই। নিজেরাই মারামারি করে মরবে।
--বইটাতে কিন্তু লিখেছে ওরা মেরে ফেলে না। পাখনা ছিঁড়ে দেয়। আবার গজায়।
--তুই পড়েছিস?
--হ্যাঁ। এঞ্জেলের ভালো নাম কী বলো তো?
--কী?
--টেরোফাইলাস এমিকেই।
সেই সন্ধেবেলায় টয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় কী করবে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিল মিমি। সাতটায় যেন ভালো ছেলে হয়ে কমপ্লান খেয়ে নেয়। রাতে ফ্রুট কাস্টার্ড। তা ছাড়া টয়-এর জন্য একটা সারপ্রাইজও আসতে পারে। টিভিতে কোনো বাচ্চাদের প্রোগ্রাম নেই। থাকলে ভালো হত। কমপ্লান খেয়ে নিয়ে টয় যেন পড়তে বসে। আটটায় অমিতাদি এসে দেখে যাবে। দারোয়ান-ও খেয়াল রাখবে। তেমন চেনা না হলে দারোয়ানই বলে দেবে পরে আসতে। যদিও কারো আসার কথা নেই। আর মিমিরা তো সোয়া নটার মধ্যে এসে যাবেই। অবশ্য এতো শান্ত, ভদ্র আর চুপচাপ ছেলে যে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এটা মিমি আর মিথিল জানত। মিমি বাড়ির সামনে থেকে মিনিবাসে উঠে গেল। টয় বারান্দা থেকে হাত নাড়ল। তখন সোয়া ছটা। চারটে স্টপ পেরোলেই মহেন্দ্রদের বাড়ি।

টয় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে গাড়ি গুনল। সেই খেলাটা খেলল। ইচ্ছেমতো গাড়ি আনা। খুব একটা শীত পড়েনি এবার। যদিও সূর্য তাড়াতাড়ি ডুবছে আর আলোর পাশে ধোঁয়া ধোঁয়া। ইচ্ছেমতো গাড়ি আনার খেলাটা টয়-এর তৈরি। টয় ছাড়া এই খেলাটার কথা কেউ জানে না। এইবারে একটা এম্বেসাডর আসবে। এল। ওয়ান নিল। এবার মারুতি। তার বদলে একটা পুলিশ ভ্যান। ওয়ান ওল। এবারেও মারুতি। মারুতি টু টু ওয়ান। সাইকেল টু হুইলার, বাস, মিনি—এদের এই খেলায় ধরা হয় না। ফ্লাটের তিনটে ঘরেই আলো জ্বলছে। ৪৫—৩৭-এ জিতে টয় যখন কমপ্লান খেতে গেল তখন সাতটা পাঁচ। সোয়া সাতটায় মিথিল-মিমির ফোন।

--সব ঠিক আছে তো?
--হ্যাঁ।
--ভয় করছে না তো?
-- না।
--পাঁচটা অঙ্কের হোম টাস্কটা শেষ করে রাখলেই হবে। হাতের লেখাটা কাল সকালে করবে টয়।

টয় ফোন রেখে দিয়ে অঙ্ক নিয়ে বসল। অঙ্কগুলোর মধ্যে শেষটা ছিল কঠিন আর বড়। অনেকগুলো গুন-ভাগ। শেষ অঙ্কটার সময়েই দরজায় বেল। অমিতাদি!

--কী করা হচ্ছে টয়বাবু?
--হোম টাস্ক করছি। অঙ্ক।
--এতো ভালো ছেলে আমি কখনো দেখিনি। ভয় করছে না তো?
--একটুও না।
অমিতাদি টয়কে চারটে হজমোলা ক্যান্ডি দিয়ে গেলেন। টয় নিজের টেবিলে দুটো রাখল। দুটো রাখল বাবা-মার খাটের পাশের বেডসাইডের ওপর। অঙ্ক শেষ অব্দি হল না। তখন আটটা দশ।

তারপর টয় বাথরুমে গিয়ে হিসি করল। ফ্ল্যাশ টানল। তারপর বাথরুমের পাশের দেওয়ালে, টয়ের হাতের নাগালের বাইরে, যে বাক্সটা লাগানো আছে, সেটা কমোডের ওপরে দাঁড়িয়ে খুলল। খুলতেই চমৎকার একটা গন্ধ। ইউ ডি কোলন, আফটার শেভ লোশন সব মিলিয়ে। মিথিল টুরে গেলে একটা ছোট্ট, মিনিয়েচার, অসম্ভব কিউট দেখতে ইমারসান হিটার নিয়ে যায়, দাড়ি কামাবার জন্যে জল গরম করে, সেটা নামাল।

মিথিল, মিমি ঠিক সাড়ে নটায় বাড়িতে ফিরেছিল। ফিরে দেখেছিল টয় মন দিয়ে টিভি দেখছে। কেবল টিভিতে তখন অস্ট্রেলিয়াতে পিংক ফ্লয়েডের একটা লাইভ প্রোগ্রাম। সাইকোডেলিক আলো। ধোঁয়া। স্নো মেশিনে বড় বড় চুলের ঢেউ। নীল গিটারের তারে বিদ্যুতের মতো চড়া আলোর ঝলক। ওরা টয়ের জন্য আইসক্রিম এনেছিল। টয় তাই খাবার পরে কাস্টার্ড খেল না। টয় ঘুমোতে চলে গেল। মিমিও টয়ের পাশে শুয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মিথিলের ঘুম আসেনি। নস্টালজিয়াতে মোমবাতির আলোগুলো তাকে ঘিরে যেন জ্বলছে। পরে একটা মোমবাতির আগুন বাঁচানোর জন্যে...মিথিল দেখল তার মাথায় আবার সেই অস্থিরতটা হচ্ছে। সিগারেট নিয়ে একোরিয়ামের সামনে বসা যায়!

একোরিয়ামের আলো জ্বলছে। ওপরে টিনের ছোট্ট ঢাকাটা সরিয়ে একটা পেন্সিল আড়াআড়ি রাখা। তার থেকে ঝুলছে ছোট্ট ইমারসন হিটার। মাছগুলো মরে গেছে। ইমারসন হিটারটা জ্বলছিল বলে জলের মধ্যে একটা অদৃশ্য তরঙ্গ সৃষ্টি করে গরমজলের ওপরে ওঠা ও ঠাণ্ডা জলের নীচে নামা চলছে। সেই অদৃশ্য স্রোতের মধ্যে মরা মাছগুলো কখনো উলটে, কখনো কাত হয়ে সরে সরে যাচ্ছে! জলটা বেশ গরম। ডুবুরি পুতুলের মুখ ফাঁক হয়ে রুপোলি বুদবুদ উঠছে। ইমারসন হিটারের গা থেকেও ছোট ছোট বুদবুদ উঠছে।

পরদিন টয় স্কুলে যায়নি। টয়কে নিয়ে তার বাবা-মা সাইকিয়াট্রিস্ট দিব্যেন্দু মুখা্ররজির কাছে যায়। উনি মিমির মামার চেনা। মিথিল ও মিমি বাইরে বসেছিল। ডঃ মুখার্জি প্রায় ঘণ্টাখানেক টয়কে নিয়ে ভিতরে ছিলেন। পরে যখন ড: মুখার্জির সঙ্গে চেম্বার থেকে বেরিরে এল তখন টয়ের হাতে আমুল চকলেট আর দুজনের মুখেই হাসি।
--মিঃ টয়, তুমি বসে এই ছবির বইটা দেখতে থাক, আমি একটু বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে নিই।
টয় ঘাড় নাড়ল।
ড: মুখার্জি বললেন, ওফ কত গল্প যে হল আমাদের। ভেতরে ড: মুখার্জি মিথিল ও মিমিকে বলছিলেন।
--ঘটনাটা আপনাদের কাছে যতটা ম্যাকাবার মনে হচ্ছে আমার মতে সেটা খুব সিরিয়াস কিছু নয়। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে, যেটাতে বিশেষভাবে ইম্প্রেসড সেটা হল, আপনাদের ছেলের মধ্যে একেবারে এগ্রাশন নেই। এত মিষ্টি, ঠাণ্ডা মন.. আপনাদের আমি বলব ব্যাপারটা ইগনো করতে। এটা কোনো প্রবলেম নয়। হি ইজ পারফেক্টলি নরমাল। সর্ট অফ কিউরিসিটি..অল মোস্ট সায়েন্টিফিক...।

এই ঘটনার কিছুদিন পরে, একটি বিদেশি পত্রিকাতেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কয়েকজন হত্যাপরাধী শিশুকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়েছিল মিথিল। ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ নিয়ে বিতর্ক জমে উঠেছে। তার মধ্যে জনৈক ফরাসি মনস্তত্ত্ববিদ বলেছিলেন যে রকম ঠাণ্ডা মাথায়, নির্লিপ্তভাবে এরা নিজেদের অপরাধের বর্ণনা দিয়েছে তাতে মনে হয় যে এর মধ্যে কোথাও একটা বিজ্ঞানমনস্কতার ব্যাপারও রয়েছে। মিথিল মিমিকেও পড়াল।

টয়কে নিয়ে তার বাবা-মার দুশ্চিন্তা আর থাকল না।

১৯৯৪


লেখক পরিচিতি
নবারুণ ভট্টাচার্য

জন্ম : ১৯৪৮-এ, বহরমপুরে | বিজন ভট্টাচার্য ও মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র সন্তান নবারুন ভট্টাচার্য | পড়াশোনা করেছেন কলকতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে এবং আশুতোষ কলেজে প্রথমে ভূতত্ত্ব নিয়ে ও পরে সিটি কলেজে ইংরেজী নিয়ে | ১৯৭৩-এ বিদেশি সংস্থায় যোগদান করে ১৯৯১ পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন |কিছুদিন বিষ্ণু দে-র 'সাহিত্যপত্র' সম্পাদনা করেন এবং ২০০৩ থেকে চালাচ্ছেন 'ভাষাবন্ধন' পত্রিকাটি | এর আগে দীর্ঘদিন 'নবান্ন' নাট্যগোষ্ঠীর পরিচালনা করেছেন | ১৯৬৮-তে 'পরিচয়' পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রথম ছোটগল্প 'ভাসান' | প্রথম কবিতার বই 'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না' ১৯৭২ এবং প্রথম উপন্যাস 'হারবার্ট' (পত্রিকায়প্রকাশ: ১৯৯২)| প্রথম উপন্যাস 'হারবার্ট' এর জন্য নবারুন নরসিংহ দাস (১৯৯৪), বঙ্কিম(১৯৯৬) ও সাহিত্য আকাদেমি(১৯৯৭) পুরুস্কার পেয়েছেন | কাঙাল মালসাট, অটো ও ভোগী, হালাল ঝান্ডা ও অন্যান্য, মহাজানের অন্য, ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচক, মসোলিয়ম, রাতের সার্কাস, খেলনানগর,

২টি মন্তব্য:

  1. মন্তব্য করার স্পর্ধা নেই।

    উত্তরমুছুন
  2. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ১ আগস্ট, ২০১৪ ৩:২৯ PM

    আজ ১আগস্ট ২০১৪ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!! মৃত্যুর হিমশীতল পরশ তাকে আমাদের থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেল। হায় আমরা কি আরেকটা নবারুণ পাবো কোনোদিন।...। সাহস যার আপদ-মস্তক ভূষণ। যুগ যুগ জিইয়ো নবারুণ দা। মহিউদ্দীন মোহাম্মদ, কবি ও সাহিত্যসম্পাদক দ্য রিপোর্ট ২৪.কম

    উত্তরমুছুন