বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

অঞ্জন আচার্যের গল্প : অতঃপর আত্মহত্যা ও তৎপরবর্তী সংবাদ-বিরতি

পারমিতার মরদেহের পাশে পাওয়া সুইসাইড নোট-এ লেখা ছিল কী করে পারলে তুমি? এ কাজ কেমন করে পারলে? যাই হোক, আমি আর পথের কাঁটা হয়ে থাকতে চাই না, তাই চলে যাচ্ছি। তোমরা ভালো থেকো।

রাতের ঘটনা। সকালে কে যেন তাকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকতে দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠে। আমরা তখন কেউ ক্লাসে যাওয়ার জন্য, কেউ কেউ প্রেমিকের সাথে সকাল-সকাল দূরবর্তী জায়গায় ডেটিং করার জন্য, কেউবা বাসিরাতে মোবাইলে শ্লীল-অশ্লীল কথোপকথন শেষে ভোররাতে ঘুমিয়ে, জেগে ওঠার পর যে যার মতো করে তৈরি হচ্ছিলাম। মনে হয় প্রথম চিৎকারটা দিয়েছিল সানজিদা অথবা রেহনুমা নতুবা শিউলি অথবা অন্য কেউ। আমরা সেই চিৎকার শুনে আতকে ওঠার আগেই ভার্সিটির বাইরের গেটের আকবর মামার চায়ের দোকানে বাঁশের ফালি দিয়ে বানানো বেঞ্চিতে বসে ডান-পাটা বামপায়ের ওপর অথবা বাম-পাটা ডানপায়ের ওপর রাখতে রাখতে কে-একজন যেন হাতে দৈনিক পত্রিকার বিনোদন পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে আর চা-এ চুমুক দিতে দিতে বলে উঠলো বুঝলা মামু, দুনিয়াডা একটা আজব চিড়িয়া।

যাই হোক, আমি বা আমরা সেই চা-পায়ীর নাম জানি না। হতে পারে তার নাম রহিম উদ্দিন ব্যাপারী নয়তো কালাম শেখ নয়তো হরনাথ পোদ্দার তাতে আমাদের কিচ্ছু আসে যায় না। তাই এ ব্যাপারে আমাদের কোনো মাথাও ব্যথা নেই। আমরা আমাদের পুরাঘটিত-বর্তমান নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি। ফলে চিৎকারের উৎস সন্ধানে যে-যেভাবে পারি এদিক ওদিক ছুটে যাই।

পারমিতার সম্পর্কে সর্বজনবিদিত কিছু কথা বলা যেতে পারে। অনার্স থার্ড ইয়ারের বাংলা ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট সে। ছাত্রী হিসেবে মাঝারি। দেখতে মাঝারি পদের পরের পদের পরের পদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে কিনা তা নিয়ে আমরা বহুবার ভেবেছি। আমরা মানে আমি, মনিষা, শ্রীময়ী, সানজিদা, রেহেনুমা, শিউলি প্রমুখ কজন। আমাদের কারো কারো মতে তারও পরের পদ সৃষ্টি করে তাকে সেই আসনে উপবিষ্ট করা যেতে পারে। জানা মতে, ভার্সিটির কেউ তাকে কোনো প্রকার প্রোপোজ করা দূরে থাক, রাস্তাঘাটে ছেলেদের গুরুত্ববাহী অথচ বিরক্তি উদ্রেককারী কোনো সাইড-টক পর্যন্ত পারমিতার ভাগ্যে জোটেনি। তা ছাড়া গোপন তদন্ত মতে, তার মোবাইল ইনবক্সে হালকা-পাতলা রোমান্স মেশানো কোনো এসএমএস দেখতে পাওয়া যায় না। তবে প্রায় সময়ই তার মুখে শোনা যেত জয় গোস্বামীর মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় কবিতাটির কিছু অংশ বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাব/বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাব? ফলে গোপনে আমরা তাকে আতেল নামকরণ করেছিলাম।
আমাদের ক্লাসের মাঝারি গড়নের সুন্দরীরা প্রায়শই তাকে পাশে রেখে বিকালে ভার্সিটির রাস্তায় উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ঘুরে বেড়াতো। কারণ তাকে সঙ্গে রেখে হাঁটলে তুলনামূলক বিচারে মাঝারিকেও উচ্চমান-সম্পন্ন সুন্দরী ভেবে ভ্রম হতো অনেকেরই। কিন্তু সকালবেলার দিকে প্রোভোস্ট স্যারের বামদিকে অথবা আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান ম্যাডামের ডানদিকে দাঁড়ানো তদন্তকারী পুলিশ অফিসারটি সুইসাইড নোটটি এমন গম্ভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল, যেন এই আত্মহননের পেছনে সমগ্র ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীই দায়ী। অথচ এই পুলিশ অফিসারটি বিবাহিত কিনা অবিবাহিত, বিবাহিত হলে তার কোনো সন্তান আছে কিনা, থাকলেও তা মেয়ে না ছেলে, ছেলে বা মেয়ে হলে সে কোন ক্লাসে পড়ে, আর সেই ছেলে বা মেয়েটি তাদের স্কুলের অংক ক্লাসে একদিন তেরোর ঘরের নামতা বলতে গিয়ে আটকে গিয়েছিল কিনা তা যেমন আমাদের কাছে অজানা, তেমনি এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটাও আমাদের সকলের জ্ঞান পরিসীমার বাইরে। কিন্তু সবার মনে হচ্ছিল কিনা জানি না, তবে আমাদের এবং পুলিশ অফিসারের কাছে খটকা ছিল ওই বহুবচন-বাচক শব্দটি তোমরা নিয়ে।
পরিশেষে ভিসি স্যারের অনুমতিক্রমে পারমিতাকে ময়নাতদন্তে নিয়ে যাওয়ার আগে তার বাম হাতের উল্টো পিঠে যেখানে কিশোর প্রেমিকেরা ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে অথবা আগুনের ছ্যাঁক দিয়ে অথবা অন্যকোনো উপায়ে অমুক প্লাস তমুক লিখে থাকে, সেখানে একটা নাম চোখে পড়ে সকলের এবং আমরা অনেকেই আতকে উঠে মুখে কাপড় দিই। তবে সেই নামের কেউ আমাদের ভার্সিটির তো দূরে থাক, সারা বাংলাদেশ ঘুরেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। যাবেই বা কি করে অভিষেক বচ্চন নামের কোনো বাঙালিই যে নেই!

অতঃপর পারমিতার হাতের পিষ্ঠদেশ নামাঙ্কিত নামটি দেখতে দেখতে আমাদের গতকালের রাতের একটি সংবাদ মনে পড়ে যায় অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সাতপাকে বাঁধা হলো বলিউড তারকাজুটি অভিষেক-ঐশ্বরিয়া।


লেখক পরিচিতি
অঞ্জন আচার্য। 


জন্ম : ময়মনসিংহ জেলার প্রাণকেন্দ্রে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে নিয়োজিত আছেন সাংবাদিকতা পেশায়। বর্তমানে জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিবর্তন-এ জ্যেষ্ঠ সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। পেশাগত জীবন শুরু হয় দৈনিক ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, ইত্তেফাক পত্রিকায় কাজ করার মধ্য দিয়ে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের গবেষণা সহকারী হিসেবে ‘জেন্ডার ও উন্নয়ন’ বিষয়ে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন। বাংলা ভাষার বিবর্তনের ওপর গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন বাংলা একাডেমিতে। লিখেন- কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার, সাহিত্য- সমালোচনা। প্রকাশিত বই- জলের উপর জলছাপ (কবিতা, শুদ্ধস্বর), আবছায়া আলো-অন্ধকারময় নীল (কবিতা, বিজয় প্রকাশ), রবীন্দ্রনাথ : জীবনে মৃত্যুর ছায়া (গবেষণা-প্রবন্ধ, মূর্ধন্য), জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত গল্প (সম্পাদনা, বিজয় প্রকাশ), পাবলো নেরুদার কবিতা সংগ্রহ (সম্পাদনা, বিজয় প্রকাশ), ধর্ম-নিধর্ম-সংশয় (যৌথ-সম্পাদনা, রোদেলা প্রকাশনী)।



২টি মন্তব্য: