রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস :` মৃত্যুর ওপরে জীবনের নাছোড় জয়গাথা


মাসুদুজ্জামান

এই মহাকাব্যিক উপন্যাস, যার আখ্যানাংশ গড়ে উঠেছে যৌথস্মৃতি, আর্কিটাইপ, গোষ্ঠী, পুরাণ, ইতিহাস ও নস্টালজিয়াকে কেন্দ্র করে, লাতিন আমেরিকাতো বটেই সর্বকালের বিশ্বসেরা একটি রচনা। গদ্য আর আখ্যানের শক্তি যে অমোঘ, নতুন করে সেকথাই বুঝিয়ে
দিয়েছেন মার্কেস।


জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। সাহিত্যবিশ্বের অনেকেই কথাসাহিত্যের জগতে বিচরণ করে খ্যাতিমান হয়েছেন, কিন্তু কেউ-ই তার মতো বিশ্বনন্দিত লেখক হয়ে উঠতে পারেননি। এমনই শিল্পসমৃদ্ধ তার রচনা, একটি নয় একাধিক, মাইলফলক হয়ে আছে, পেয়ে গেছে চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা। শুধু নিজের ভাষাকে নয়, নিজের ভাষার সাহিত্যকে নয়, বিশ্বসাহিত্যেরই গতিপথ বদলে দিয়েছেন তিনি। বিশ্বনন্দিত এই কথাসাহিত্যিক হচ্ছেন গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, প্রিয়জনরা যাকে অন্তরঙ্গতার সূত্রে গাবো বলে সম্বোধন করতেন।

সবমিলিয়ে পনেরোটি উপন্যাস লিখেছেন মার্কেস, কিন্তু এর প্রত্যেকটিই এক-একটি হিরকখণ্ডের মতো, যার নান্দনিক দ্যুতি পাঠককে চমকে দেওয়া নয়, মানবিক বোধে দীক্ষিত করে তুলেছে। বিশশতক কথাসাহিত্যের কাল, অনেকেই এরকমটা বলে থাকেন। এই বিশশতকের যদি একটি উপন্যাসের কথা বলা হয় তাহলে সবার শীর্ষে উঠে আসবে সেই রচনাটি — 'শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা', যার রচয়িতা হচ্ছেন মার্কেস। উপন্যাসটি শুধু লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যকে নয়, প্রভাবিত করেছিল বিশ্বকথাসাহিত্যকে। সমালোচক এবং পাঠকদের কাছে মার্কেসের আরও কয়েকটি উপন্যাস বেশ সমাদৃত হয়েছিল : 'গোষ্ঠীপতির হেমন্ত', 'কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না', 'কলেরার দিনগুলোতে ভালোবাসা' এবং 'বেচারী এরেন্দিরা আর তার নিষ্ঠুর দাদিমার অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনি'।



জন্ম কলোম্বিয়ার সমুদ্র উপকূলবর্তী ছোট্ট শহর আরাকাতাকায়, ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ। হিস্পানি, কৃষ্ণাঙ্গ আর স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিয়ে গড়ে ওঠা মিশ্র সংস্কৃতির মধ্যে ছেলেবেলার কয়েকটা বছর কেটেছে তার। মাতামহ আর মাতামহীর সাহচর্যে একদিকে যুদ্ধবিগ্রহের ভেতর দিয়ে কীভাবে মানবিক অভিজ্ঞানকে সমুন্নত রাখতে হয়, অন্যদিকে দাও-দানো, ভূত-প্রেত আর রূপকথার কল্পজগত কিভাবে মানুষের সুকুমার অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, মার্কেসের উপন্যাসগুলো তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মার্কেসের জাদুবাস্তবতার মায়াজালে এই আরাকাতাকাই পরবর্তী কালে হয়ে উঠেছিল মার্কেসের বিশ্বখ্যাত মাকোন্দো। সেই বালক বয়সেই গল্পবলার শৈলী আর দক্ষতা এভাবেই পেয়ে গিয়েছিলেন তার মাতামহের কাছে।

মার্কেসের জন্মের দেড় বছরের মাথায় ১৯২৮ সালে আরাকাতাকায় ঘটে কলা ধর্মঘটের নিষ্ঠুর গণহত্যা। মার্কেস নিজে এই আন্দোলন আর গণহত্যা সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন ছিলেন। অনেকে মনে করেন, এই ঘটনাই হয়তো তাকে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক মতাদর্শে দীক্ষিত করেছিল, যদিও তিনি কখনই সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না।

কলোম্বিয়ার বহুজাতিক ইতিহাস উপনিবেশমুক্তির প্রায় সূচনালগ্ন থেকেই সংিহসতা আর হিংস্রতায় ক্ষতবিক্ষত। গৃহযুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ছিল এই দেশটির অনিবার্য নিয়তি। নিজের মাতামহের কাছেই মার্কেস শুনেছেন কিভাবে তিনি 'হাজার দিবসের যুদ্ধে' (১৮৯৯-১৯০২) জড়িয়ে পড়েছিলেন। এই ঘটনাই পরে স্থান পেয়েছিল তার 'কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না' শীর্ষক বড় গল্প বা উপন্যাসে। আরাকাতাকার স্মৃতি মার্কেসের মনে আরও গভীর হয়ে ওঠে যখন মাত্র আট বছর বয়সে তাকে মাতামহের মৃত্যুর পর ওই শহর ছেড়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাররানকুইলায় চলে যেতে হয়। পরে স্কুলের গণ্ডি পেরুলে অবিভাবকদের আগ্রহে রাজধানী বোগোতায় আইন পড়তে এসেছিলেন মার্কেস। কিন্তু বোগোতায় তার মন টেকেনি। এই শহরটাকে তিনি শীতল, নিঃসঙ্গ, নির্বাসিতদের জায়গা বলে উল্লেখ করেছেন। আইনের পরিবর্তে তার আগ্রহ নিবদ্ধ হলো সাহিত্যে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন কবি হবেন, কিন্তু যখন কাফকাকে আবিষ্কার করে ফেললেন তখন তার মনে হলো সৃষ্টিশীল কল্পসাহিত্যে সবই রচনা করা সম্ভব। কুড়ি বছর বয়সে ছেড়ে দিলেন আইন পড়া, ডুবে গেলেন অনিঃশেষ পঠনপাঠন আর লেখালেখিতে। কাফকার 'রূপান্তর' উপন্যাসই তাকে লেখক হতে উদ্বুদ্ধ করলো। অনেক পরে প্যারি রিভিউতে দেয়া সাক্ষাত্কারে মার্কেস বলেছিলেন, রূপান্তরের প্রথম লাইনটা তাকে এতটাই আলোড়িত করেছিল যে তিনি নিজেই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন। 'যদি আমি কাফকাকে আরও আগে পড়ে ফেলতাম তাহলে আমি অনেক আগেই লেখালেখি শুরু করে দিতে পারতাম।' অন্তর্গত স্বগতোক্তির জন্য ভার্জিনিয়া উলফের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন মার্কেস। তবে সব ছাপিয়ে ফকনারের বর্ণনাশৈলী, আখ্যানরীতি, বিষয়, একটা ছোট্ট শহরকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনি ঘনিয়ে ওঠা, দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল মার্কেসকে। তার প্রথম উপন্যাস 'পাতার ঝড়ে'র প্লট এই ফকনারীয় ঘরানায় গড়ে তুলেছিলেন তিনি। 'শতবর্ষের নিঃসঙ্গ' উপন্যাসের মাকোন্দোও কল্পিত হয়েছে ফকনারের পুরাণাশ্রিত ইয়োকনাপাতাফা গ্রামীণতার আদলে।



কলোম্বিয়ার ইতিহাস যখন সবচেয়ে দ্বন্দ্বমুখর, গোষ্ঠী আর জাতিগত সংঘাতে জর্জরিত, তখনই লেখক হিসেবে বিকশিত হতে থাকেন মার্কেস। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ আগেই ছেড়ে দিয়েছিলেন, এরপর শুরু করলেন সাংবাদিকতা। ১৯৫০-এর দশকে এল স্পেকতাদোর পত্রিকায় সরকারি নৌবাহিনীর এমন একটি সংবাদকাহিনি প্রকাশ করলেন যার প্রতিক্রিয়ায় সরকারের পতন ঘটে। তাকেও সরকারি রোষানলে পড়ে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয় ইউরোপে। সাংবাদিক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। এই ইউরোপ প্রবাসকালেই ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস 'পাতার ঝড়', শুরু হয়ে যায় তার সাহিত্যিক ক্যারিয়ার। খুব বেশি মানুষ উপন্যাসটি পড়েননি, মার্কেসও জীবিকার জন্য চালিয়ে যেতে থাকেন তার সাংবাদিকতার পেশা। সাংবাদিকতা ছিল আসলে তার প্যাশন, সারাজীবন ধরে তাই সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। সাংবাদিকার ভেতর দিয়েই তিনি তার উপন্যাস আর গল্পের ভাষা, আখ্যানশৈলী আর গল্পবলার বিচিত্রভঙ্গির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কোন গল্পটি কীভাবে বললে পাঠকরা গ্রহণ করবেন, সেটা তিনি সংবাদকাহিনি লিখতে লিখতেই রপ্ত করেছিলেন। এইসময়েই তিনি লিখলেন 'কুসময়ে' আর 'কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না' শীর্ষক আখ্যান। এই দুটি রচনা সরাসরি যুক্ত ছিল সমকালের তীব্র সংঘাতময় ঘটনা 'লা ভায়োলেন্সিয়া' বা হিংসাহিংস্রতার সঙ্গে। এই ঘটনাই তাকে রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

ইউরোপে থাকার সময়েও তিনি লাতিন আমেরিকার লেখকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন এবং নিয়মিতভাবে 'মুন্দো ন্যুভো'তে হিস্পানি ভাষায় লিখে গেছেন। পরবর্তী কালে লাতিন আমেরিকার যেসব লেখক 'বুম পর্বে'র লেখক বলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, মার্কেস নিজেও ছিলেন যাদের একজন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। এই লেখকদের মধ্যে যারা উল্লেখযোগ্য তারা হলেন আর্হেন্তিনার হুলিও কোর্তাসার, মেহিকোর কার্লোস ফুয়েন্তেস এবং পেরুর মারিও ভার্গাস ইয়োসা। বলা প্রয়োজন, বুম কোনো সংগঠিত সাহিত্য আন্দোলন ছিল না, কিন্তু নতুন ধরনের উপন্যাস রচনার অভিন্ন অভিপ্রায়ে আলাদা আলাদাভাবে শুরু করেছিলেন লেখালেখি। বুম লেখকেরা প্রভাবিত হয়েছিলেন আধুনিকতাবাদ, বাম রাজনীতি এবং লাতিন আমেরিকার সেইসব লেখকের দ্বারা যারা ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে সাহিত্যচর্চা করেছিলেন। বিশেষ করে আর্হেন্তিনার হোর্হে লুই বোর্হেস, কুবার আলেহো কার্পেন্তিয়ার ছিলেন তাদের আদর্শ। সনাতন বর্ণনারীতি ছেড়ে তারা সূচনা ঘটিয়েছিলেন এক নতুন ধরনের শৈলীর এবং গ্রহণ করেছিলেন ভিন্ন ধরনের বিষয়আশয়। এ প্রসঙ্গে কার্পেন্তিয়ারের কথা বলা যায়, যিনি আফ্রো-ইন্দিয়ান লোকঐতিহ্যকে গ্রহণ করে রচনা করেছিলেন সমকালস্পর্শী উপন্যাস। মনে করা হয় কার্পেন্তিয়ারই সর্বপ্রথম তার উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার ব্যবহার ঘটিয়েছিলেন। অন্যদিকে বোর্হেস ছিলেন বিচিত্র শৈলী ব্যবহারের আবিষ্কারক এবং রূপদক্ষ শিল্পী। ফ্যান্টাসি বা সৃজনীকল্পনার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক ব্যবহার আছে তার রচনায়। রক্ষণশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যদিও বোর্হেস মার্কেসের তেমন প্রিয় ছিলেন না, তবে 'শতবর্ষের নিঃসঙ্গ' উপন্যাসে এই পূর্বসূরি এবং মেহিকোর হুয়ান রুলফোর 'পেদ্রো পারামো'র আখ্যানশৈলী এবং জাদুবাস্তবতার প্রভাব আছে বলে জানিয়েছিলেন মার্কেস।

শুধু কথাসাহিত্য নয়, ইউরোপে থাকা কালে মার্কেস চলচ্চিত্রের প্রতিও দারুণ উত্সাহী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে তিনি রোমের নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র স্কুলে চলচ্চিত্রের আনুষ্ঠানিক পাঠ গ্রহণ করেন। এরপর যখন ষাটের দশকে মেহিকোতে বসবাস করা শুরু করেন তখন তিনি বেশকিছু চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। টেলিভিশনের জন্য জনপ্রিয় সোপ অনুষ্ঠান রচনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মার্কেস। আর আশির দশকে কুবার হাভানায় নিজের অর্থায়নে স্থাপন করেছিলেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র স্কুল। গত শতকের শেষ দশকে নিজের টাকায় একইভাবে কলোম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূল কার্তাহেনা দে ইন্দিসে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তবে চলচ্চিত্র বলি আর সাংবাদিকতা, লেখক হিসেবেই তিনি আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলেন।

'শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা'র আগে ষাটের দশকে তিনি রচনা করেন চারটি উপন্যাস : 'পাতার ঝড়', 'বড়মার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া', 'কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না' এবং 'কুসময়'। রচনাগুলোর প্রতি লাতিন আমেরিকার সমালোচকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল; কিন্তু বাণিজ্যিক সাফল্য বা আন্তজার্তিক খ্যাতি অর্জন সম্ভবপর হয়নি। একটা ছোট্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তার খ্যাতি। এইসময়ে কেউ-ই ভাবতে পারেননি এই লেখক অচিরেই লাতিন আমেরিকায় আলোড়ন তুলবেন, অর্জন করবেন বিশ্বখ্যাতি। তার পঞ্চম উপন্যাস 'শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা' কলোম্বিয়ায় নয় প্রকাশিত হয়েছিল আর্হেন্তিনায়, আর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো সারা পৃথিবী। সাফল্যের আলোয় উদ্ভাসিত হলো মার্কেসের সাহিত্যিক ক্যারিয়ার। রাতারাতি সবকিছু বদলে গেল। কুবার বিপ্লবের পর থেকে মার্কেস মেহিকোতে বসবাস করছিলেন। জীবিকার জন্য রচনা করছিলেন চিত্রনাট্য। এইসময়ে প্রায় ছ বছর কোনো উপন্যাস লেখেননি তিনি। কিন্তু ১৯৬৫ সালে চলে গেলেন অজ্ঞাতবাসে, একটানা আঠারো মাস লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে রচনা করলেন মাকোন্দোর গল্প। এই গল্পটি আর্কিটিপিক্যাল বুয়েন্দো পরিবার এবং সেই পরিবারের প্রজন্মের কাহিনি, যে-কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মাকোন্দো নামের পুরাণসৃদশ শহরকে ঘিরে। প্রাচীনতাকে ছেড়ে বিচ্ছিন্ন এই শহরটি যতই আধুনিক হয়ে উঠছিল, ততই ঘনিয়ে উঠছিল কলোম্বিয়ার (লাতিন আমেরিকার) ইতিহাসের সংকট। ঘটনা ও কল্পফ্যান্টাসির অব্যাহত বুননে মার্কেস উপস্থাপন করলেন তার নিজের ঘরানার জাদুবাস্তবতার অনন্য শৈলী।

বইটি প্রকাশের আগেই মার্কেসের পাঠানো প্রথম তিনটি পরিচ্ছেদের ওপর নির্ভর করে বুম সহলেখক ফুয়েন্তেস 'মুন্দো ন্যুভো' পত্রিকায় প্রসংশাসূচক একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আর প্রকাশের পর মারিও ভার্গাস ইয়োসা লিখলেন, "লাতিন আমেরিকায় সাহিত্যিক ভূমিকম্প" ঘটে গেছে। প্রকাশক প্রথমে আট হাজার কপি ছেপে পাঠকরা কী

প্রতিক্রিয়া দেখায় তার জন্য অপেক্ষায় থাকতেই লক্ষ করলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হয়ে গেছে। এর পর প্রতিদিন উপন্যাসটির নতুন নতুন মুদ্রণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো। রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে গেলেন মার্কেস, যেন তিনি লাতিন আমেরিকার কোনো কিংবদন্তী ফুটবলার কিংবা জননন্দিত গায়ক।

পরবর্তী দুই বছর সারা বিশ্বজুড়ে এভাবেই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন মার্কেস। গত শতাব্দীতে উপন্যাসটি পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বিক্রি হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি কপি। শুধু পাঠকনন্দিত নয়, সালমান রুশদি কিংবা ইসাবেলে আয়েন্দের মতো লেখকেরাও এই উপন্যাসটির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। মার্কেসের জীবনও এই খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। সমালোচকেরা উল্লেখ করেছেন, এই মহাকাব্যিক উপন্যাস, যার আখ্যানাংশ গড়ে উঠেছে যৌথস্মৃতি, আর্কিটাইপ, গোষ্ঠী, পুরাণ, ইতিহাস ও নস্টালজিয়াকে কেন্দ্র করে, লাতিন আমেরিকাতো বটেই সর্বকালের বিশ্বসেরা একটি রচনা। গদ্য আর আখ্যানের শক্তি যে অমোঘ, নতুন করে সেকথাই বুঝিয়ে দিয়েছেন মার্কেস। উপন্যাসটিতে জনপ্রিয় এবং দেশীয় সংস্কৃতিতে জ্ঞানের যথার্থ উত্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, মৌখিক ও লিখিত আখ্যানের যে টানাপড়েন, তারও চমত্কার ব্যবহার আছে। সমালোচকেরা বলেছেন, উপন্যাসটি 'বাইবেলীয়' পরিসরের মতো এমন এক সুবিস্তৃত, মহান এপিক, যা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাঠককে বিমোহিত করবে, ভাবাবে। নিয়ে যাবে আপন ঐতিহ্যের মর্মমূলে। মার্কেস এভাবেই লাতিন আমেরিকার সেইসব জনমানুষকে এমন একটা সাহিত্য উপহার দিলেন যে মানুষেরা এসেছেন ওই মহাদেশের বিচিত্র আর্থ-সামাজিক অবস্থান আর ভূমি থেকে। লাতিন আমেরিকার অজেয় মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম আর ভূখণ্ডের স্বীকৃতিই এই উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য বিষয়।

'শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা'র সাফল্যের প্রেক্ষাপটে পাঠকেরা এরপর অপেক্ষা করতে থাকেন মার্কেসের পরবর্তী উপন্যাসের জন্য। তবে সঙ্গে সঙ্গে নয়, সাত বছর পরে প্রকাশিত হয় তার পরবর্তী উপন্যাস 'গোষ্ঠীপতির হেমন্তকাল'। এই উপন্যাসটিরও প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায় দশ লাখ কপি। সমালোচকদের মতে নতুন ধরনের আখ্যানরীতি ব্যবহার করে মার্কেস এটি লিখেছেন। কিন্তু পাঠকের কাছে উপন্যাসটি দীর্ঘ বাক্য, পরিচ্ছেদ বিভাজিত না থাকা, ইত্যাদি কারণে কিছুটা কঠিন বলে মনে হয়েছে। অনেক পাঠক যেরকম প্রত্যাশা করেছিলেন, জাদুবাস্তবতার ব্যবহারও তারা খুঁজে পাননি। পরবর্তী উপন্যাস 'একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি'র ধ্রুপদী সারল্য, 'কলেরা কালের ভালোবাসা'র অসম্ভব প্রেম, অথবা 'গোলকধাঁধায় সেনাপতি' ইউটোপীয় রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্নের অপমৃত্যুকে যেভাবে রূপদক্ষ শৈলী, ভাষা আর আখ্যানরীতি অবলম্বন করে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা কথাকার হিসেবে মার্কেস নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন।



মার্কেসের নোবেল বক্তৃতা শুনলে বোঝা যায়, তিনি শুধু কথাসাহিত্যে নয়, বাস্তবেই লাতিন আমেরিকার সুবিস্তৃত জনপদের মানুষ নিয়ে কী গভীর স্বপ্ন ছিল তার। তিনি ছিলেন সেরকম স্বপ্নপুরুষ যিনি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে, বিশেষ করে ইউরোপীয়দের নির্যাতিত, নিপীড়িত এই জনপদের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন : "কবি ও ভিক্ষুক, সংগীতস্রষ্টা ও প্রবক্তা, যোদ্ধা ও বদমায়েশ — সেই ঘোর দৌরাত্ম্যেভরা বাস্তবতার সমস্ত জীব, কল্পনার কাছে আমাদের অতি অল্প অনুদানই চাইতে হয়, কারণ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এটাই যে আমাদের চাই নতুন কৃেকৗশল — আমাদের জীবনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবার জন্যে প্রচলিত কৃেকৗশলে মোটেই কুলোয় না। এটাই, ... আমাদের নিঃসঙ্গতার বড় ঘোঁট।" নিঃসঙ্গতার এই যে নির্মম রূপ, ওই ভাষণেই তিনি এর বিরুদ্ধে জীবনের কথা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন এইভাবে : "... সমস্ত দমনপীড়ন, নির্যাতন, লুঠতরাজ, আত্মবিক্রয় সত্ত্বেও, আমাদের উত্তর হচ্ছে : জীবন।" জীবনের এই যে জয়গাথা, মার্কেসের কথাসাহিত্য সেই আখ্যানেরই সমষ্টি। মানুষই, তিনি মনে করতেন অদম্য, অপরাজেয়, লাতিন আমেরিকার মতো বৈশ্বিক পর্যায়েও বিশ্বমানবের অধিষ্ঠান অনিবার্য। 'নিঃসঙ্গতার যে দণ্ড' নিপীড়িত মানুষ দেশে দেশে পেয়ে এসেছে তার উঠে দাঁড়াবার মধ্যেই নিহিত আছে মানুষের মুক্তির সূত্র।

কথাটা বলেছিলেন মার্কেসই, 'মৃত্যুর ওপরে জীবনের নাছোড়' জয়গাথা এভাবেই রচনা করে গিয়েছেন তিনি।

সর্বমানবীয় মুক্তির কথা ভেবেছিলেন যে মানুষটি, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, তার প্রয়াণে আমরা গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন