বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প ভিক্টোরিয়ার হিরো

আমি বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি
যেন সে কিছুতেই বাঁশি না বাজায়
আজি নিশীথিনী ননদিনী
জাগিয়া জাগিবে প্রহরায়।

ইমন বিলাবল। দ্রুত একতাল। ধা গেড়ে নাগ কদ্দি—ধেড়ে নাগ—ঘ্যরে ঘুরে কাঠের খোলা উঁচু পাটাতনে পাগলিনী রাধা গাইছে। পাটাতনের সামনেই নীচে বৈকুণ্ঠ নট্ট বসে।
তাকে ঘিরে খোল, করতাল, ঢোল, বাঁশি, ক্লারিওনেট বাজছে। তাঁরই বাঁধা গানের সঙ্গে তারই দেওয়া ইমন বিলাবল সুরে। তারই লেখা রাধাকৃষ্ণ পালায়। কোন দূরে কীর্তনখোলা নদী থেকে বেরিয়ে আসা ছোটো নদীটির আকাশে এখন মধ্য রাতের চাঁদ। আকাশের নীচে থোকা থোকা মানুষ এখানে ওখানে বসে। তার ভেতরেই দেখা যায় পাটাতনের নীচের দিকে সাদা কাপড়ের উপর কালো রঙ দিয়ে বাংলায় লেখা—

মাচরং বৈকুণ্ঠ সঙ্গীত সমাজ
বা
নট্ট কোম্পানী
১২৭৬ বঙ্গাব্দ

মানে ইংরাজি ১৮৬৯। মাত্র এগার বছর হল দিল্লি, না, মীরাট—কোথায় সিপাহি বিদ্রোহ জ্বলে উঠে নিভে গেছে। এখন ঘোর মহারানির শাসন। ধানকাটার পরে মাচরং গাঁয়ের নদীর পাড়ে সারারাত ধরে পালাগান বসেছে মাঠে। থানা-বানারিপাড়া। জিলা—বরিশাল।

রাধার সাজ পরেই নেচে গেয়ে পাটাতন থেকে নীচে নেমে এলেন নারীকণ্ঠ ভবানন্দ ভাদুড়ি। তিনি বৈকুণ্ঠ নট্টর কানের কাছে মুখ নিয়ে জানতে চাইলেন—আয়ান?—আয়ান ঘোষ কোথায়?

বৈকুণ্ঠ নট্ট সারা বরিশালে নামকরা পালাকার। গীতিকার। নিজে গাইয়েও বটে। তিনি পালাগানের কনসার্টের বাজনার ভেতরেও চাপা গলায় বলেন, ওই তো আয়ান—

দেখা গেল কৃষ্ণের মাতুল আয়ান ঘোষ—খালি গা—রীতিমত সুপুরুষ—কিছুটা চিন্তিত মুখে সিঁড়ি বেয়ে পাটাতনে উঠছেন। পরণে গোয়ালদের ধাঁচে খাটো আড়োসাটো ধুতি। বাহুতে সোনার তাগা।

ভবানন্দ বললেন, গিরীশ গাঙ্গুলি যেন কিছু চিন্তিত। পালাগানের কথা ভুলে গেল নাকি?
না হে না। গিরীশচন্দ্রর সহধর্মিণীর এখন-তখন দশা। মা হবেন—সকালেই মাচরং থেকে ঊষাঙ্গিনী দাই গেল বাইশাড়ি।
নদীর ওপারে দণ্ডহাট বাজারের পাশের গাঁ বাইশাড়ি।

সম্পন্ন গোয়ালের বেশে আয়ান ঘোষ পাটাতনে উঠেই গেয়ে উঠলেন, আমারই বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমারই আঙিনা দিয়া—

গিরীশচন্দ্র সুকণ্ঠ। কিন্তু এ কী গান গাইছে? বৈকুণ্ঠ নট্ট নরে চড়ে বসলেন। এ গান তো তার লেখা পালায় নেই। ঘরের দুর্ভাবনায় সব ভুলে নাকি গিরীশচন্দ্র? বন্ধুমানুষ। ভাল গায়। বঙ্কিমচন্দ্র কোনও এক ডিপটি ম্যাজিস্ট্রেট তিন বছর হল দুর্গেশনন্দনী বলে কী এক বই লিখে রাজধানী কোলকাতায় সবার মন নাকি কেড়ে নিয়েছেন—এ খবর বন্ধু গিরিশচন্দ্রই তাকে প্রথম দিয়েছে। সাত বছর হল কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ইয় রেলগাড়ি এসে গেছে। গিরিশচন্দ্রই বলেছে—এ বছরই শিয়ালদহে বড় স্টেশন তৈরী হচ্ছে। পোড়া কপাল। এত নদী। বরিশালে নাকি কখনও ট্রেন আসবে না। কিন্তু বরিশাল শহরে কলকাতার ব্রাহ্মধর্ম এসে গেছে। ইস্কুল করতে বিদ্যাসাগর মশাই আজও আসতে পারেননি।

বৈকুণ্ঠ নট্ট বুঝলেন, পালার গান ভুলে গিয়ে তার বন্ধু সিচুয়েশন বুঝে লাগসই পদাবলী ধরে ধরে গাইছে, পাবলিক মুগ্ধ হয়ে শুনছে। আয়ান ঘোষের মনের দশার সঙ্গে এ পদাবলী খাপসই।

এমন সময় বানারিপাড়ার বিখ্যাত ঊষাঙ্গিনী দাই এসে চুপি চুপি বলল, নট্ট মশাই গিরীশচন্দ্রের আবারও মাইয়া হইছে।
আবারও।

পালাগান তো আর থেমে থাকতে পারে না। বৈকুণ্ঠ নট্টকে ঘিরে বসা বাঁশিবাজিয়েরা ততক্ষণে কৃষ্ণের বাঁশির টান ধরেছে। কিন্তু আজ যে নিশিথিনী ননদিনী জেগে থাকবে পাহারায়।

গম্ভীর মুখে আয়ান ঘোষ উঁচু পাটাতন থেকে নেমে আসছেন। দু’দিকের দুটো বড় বাতিতে দুই ছোকরা ঠেসে গ্যাস পাম্প করতেই আলো আরও জোরালো হয়ে উঠল। এবার কৃষ্ণ পাটাতনে উঠবে।

গিরিশচন্দ্রের কাছে গিয়ে ঊষাঙ্গিনী দাঁড়াল। মাইয়া হইছে—

এটি নিয়ে গিরীশের সাতটি মেয়ে হল। তাই ঊষাঙ্গিনীর গলা কিছু নিচু। তার কথা শুনে গিরিশচন্দ্রের মুখ থেকে কিন্তু পলকে সব চিন্তা মুছে গেল। তিনি এক মুখ হাসি নিয়ে পাটাতনের পাশের আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে বললেন, নাম দিলাম ভিক্টোরিয়া। যাক। ভিক্টোরিয়ার মা তো ভাল আছে।

ঊষাঙ্গিনী মাথাটা নেড়ে সে কথায় সায় দিল।


এরপর অনেকদিন কেটে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্র ঋষি হয়ে স্বর্গে গেছেন। নট্ট কোম্পানী কলকাতার শোভাবাজারে বাড়িভাড়া করে অফিস খুলেছে। গিরীশচন্দ্র জোড়া মহিষ মানত করে ছেলের বাবা হয়েছেন। সেই ছেলে মতিলাল এখন খুলনার কোর্টে কাজ করেন। বিয়ে করেছেন। দু’তিনটি ছেলে হয়েছে। মতিলালের বউ কিরণকুমারী। কিরণের ননদিনী সত্যিই নিশিথিনী। সেকথায় পরে আসছি। ভিক্টোরিয়া এখন তার সংসারে। গিরীশচন্দ্র বিয়ে দিয়েছিলেন ভিক্টোরিয়ার। কিন্তু বড়ই মুখরা বলে বিয়ের পরে পরেই শ্বশুরবাড়ি ভিক্টোরিয়াকে পত্রপাঠ বিদায় দেয়। সেসব কতকাল আগের কথা।

এখন ১৯২৫। দেশবন্ধু সবে পরপারে। গিরীশচন্দ্রও। আজ ক’বছর হল ছোটভাই মতিলালের সংসারে উঠেছে দিদি ভিক্টোরিয়া। ওদিকে খোদ মহারানি ভিক্টোরিয়ার নামে কবেই কলকাতার বুকে গড়ের মাঠে বাড়ি উঠেছে। তার বংশের রাজত্ব এদেশে এখন টলোমলো। মো. ক. গান্ধী নামে একজন লোক প্রায়ই জেলে যান—আবার বেরিয়েও আসেন।

কিন্তু কিরণকুমারী সারাদিন সংসারে খেটেখুটে রাতে আর ঘুমোতে পারেন না, ননদিনী সত্যিই নিশিথিনী। হালখাতা করতে গিয়ে মুদিখানা থেকে মতিলাল একখানি ক্যালেন্ডার পান। তাতে বাঁশি হাতে শ্রীকৃষ্ণের ছবি। ছবির সেই শ্রীকৃষ্ণের সামনে সারা রাত ভিক্টোরিয়া ঘুঙুর পরে নাচেন। আরতি দেন প্রদীপ হাতে। কিরণকুমারীর ভয়—পাছে আগুন লেগে ভিক্টোরিয়া পুড়ে যান। নন্দিনী তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। ষাটের কাছে বয়স গেল। নাচতে গিয়ে পা ভাঙতে পারেন। তবু সারারাত ক্যালেন্ডারের কৃষ্ণের সামনে গান গেয়ে নেচে ভিক্টোরিয়া মনে করেন--কৃষ্ণই তার স্বামী। তাই তার বিশ্বাস। আর দিনের বেলায় পড়ে পড়ে ঘুমান। কিরণকুমারীর সংসারের কোনও কাজে আসেন না।

তাও যদি স্বামীর ঘর করার সুখ পেতেন নিশিথিনী! কিরণকুমারী স্বামীর মুখে শুনেছেন—তার দিদির বিয়ে হয়েছিল বারো-তেরো বছর বয়সে। তিনরাতও স্বামীর ঘর করতে পারেননি ভিক্টোরিয়া।

ছেলেরা ছোট ছোট। এক এক সন্ধেয় ভৈরব নদীর কাছে ধর্মসভার আটচালায় রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে কিরণ তার ননদকে নিয়ে যান। সেখানে বাতাসা-ভোগের বাতাসা নিয়ে ফেরেন দু’জনে। ভিক্টোরিয়া ফেরার পথে তার বাতাসাখানি আঁচলের খুঁটে বেঁধে বলেন, এই আমার সোয়ামিরে বাঁধলাম। কোথায় পালায় দেখি এবার—

স্বামীর মৃত্যুর খবর অনেক বছর আগেই এসেছিল। তিনি ভিক্টোরিয়ার চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন। ফের বিয়ে থা করে রীতিমত ঘর-সংসার করেই তিনি পাকা বয়সে স্বধামে চলে যান। সেই থেকে ভিক্টোরিয়া থান পরেন। একদিন সন্ধ্যায় রাধাকৃষ্ণ মন্দির থেকে ফেরার পথে বাতাসাখানি ভিক্টোরিয়ার হাত থেকে পড়ে গেল। জ্যোৎস্নারাত। ঘাসে ঢাকা পথ। চোখে ভাল দেখেন না। খুঁজে না পেয়ে কিরণকে বলেন, ও বউ। আমার সোয়ামি?

কোথায় ফেললেন? ভালো করে খুঁজে দেখুন।
নিচু হয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে কী একটা পেয়ে তুলে নিলেন ভিক্টোরিয়া। হ পাইছি। বড় শক্ত ঠেকে যে—
আর আঁচলে বাঁধবেন না। একেবারে মুখে দিয়ে রাখুন।

ভিক্টোরিয়া খুব সাবধান। মুখ দিয়ে স্বামিকে চুষতে লাগলেন। ভাইয়ের বউ কিরণ অনেক ছোট। আবার বাচ্চা হবে। তাই হাঁটতে গিয়ে পিছিয়ে পড়েছে। ভিক্টোরিয়া কোনওদিন মা হননি। চিকণ চাকণ। তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ও বউ কৃষ্ণ এতো শক্ত?
ভোগের বাতাসা অমন শক্ত হয়। বেশি জ্বাল দিয়েছে হয়তো।

দাঁত কমে গেছে ভিক্টোরিয়ার। তবু তিনি বাতাসাখানি মন দিয়ে চুষছেন। যত চুষছেন –তত ব্যথা লাগছে। তবু কিছু বলছেন না। স্বামী তো। নিজেকে মনে মনে বোঝালেন—স্বামী তো কিছু শক্তই হয়। তাই তো তিনি জানেন।

বাড়ি ফিরে হেরিকেন ধরালেন কিরণ। মতিলাল এখনো কোর্ট থেকে ফেরেননি। বড় ছেলের হাতেখড়ি হয়ে গেছে তিন বছর। তাকে পড়তে বসানো দরকার। সব বাড়িতে ইলেক্ট্রিক আসেনি। আর এ বাড়ি তো মাসে আট টাকা ভাড়ার বাসা। ইলেক্ট্রিক কি বাড়িওয়ালা আনবেন!

বাতাসাখানি মুখ থেকে বের করে ভিক্টোরিয়া হেরিকেনের আলোয় ধরলেন, দ্যাখ তো বউ আমার সোয়ামি কেন শক্ত?

দেখে চমকে উঠলেন কিরণকুমারী। করেছেন কী ঠাকুরঝি? ফেলে দিন। অন্ধকারে বাতাসা ভেবে রাস্তা তৈরির ছোট পাথর কুড়িয়ে মুখে দিয়েছেন। ফেলে দিন-

নারে বউ! ফেলি ক্যামনে? আমার তো সোয়ামি দেখতে কালো! তাই না? বলে ভিক্টোরিয়া ফের পাথরখানা মুখে পুরে চুষতে লাগলেন।
ফেলে দিন বলছি। মুখ কেটে যাবে।

হাসতে হাসতে ভিক্টোরিয়া বললেন, তোর যদি বউ এবারও ছেলে হয় তো তার নাম রাখিস শ্যামল। কিরণকুমারী একথার কোনও মানে বুঝতে পারলেন না।




1 টি মন্তব্য:

  1. পড়লাম। সত্যি বুঝতে পারছিনা কাকে 'ধন্যবাদ' দেবো---শ্যামলদাকে না আপনাকে?
    এই গল্প লেখা প্রয়াত, শ্রদ্ধেয় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের পক্ষেই সম্ভব।
    আমার মন খুব ছুঁয়ে গেল।

    উত্তরমুছুন