শুক্রবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৪

হাসান আজিজুল হকের গল্প পরবাসী

কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করল সে। কিছু একটা শব্দ। কিন্তু কিছুই শোনা গেল না। বাতাস কিংবা পাতা ঝরার শব্দ ... কোনো কিছুই তার কানে এলো না। এই এতটুকু সময়ের মধ্যেই মাটি বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। নিঃশব্দ শিশিরের হিমে স্নান করে বিবর্ণ পাতাগুলো ভিজে। শীতের শেষ বলে সারাদিন ধরে উত্তর দিক থেকে ঝড়ের বেগে বাতাস দিয়েছে ... খোলা মাঠ পেয়ে বাতাস হু হু করে দৌড়ূতে দৌড়ূতে শরীরের সমস্ত উত্তাপ শুষে নিয়ে চলে গেছে।
তারপর নতুন করে আবার ঝাপটা এসেছে। কিন্তু সন্ধ্যার সূচনাতেই বাতাস দু'একবার ডানা ঝাপটা দিয়ে শুকনো পাতা ঝরিয়ে একেবারে এ দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে এসেছে বড় বড় মাঠ, ছিলে ছিলে পানি-জমা ডোবা এবং খাল, আধ শুকনো হলদেটে অপরিচিত লতাপাতা কাঁটা-গুল্মের স্তূপাকার জঙ্গল। ওর চারপাশের কয়েক হাত জায়গা বাদ দিয়ে নিউমোনিয়া রোগীর শ্লেষ্মার মতো জমে বসেছে কুয়াশা। সারাদিনের ঝড়ো বাতাসের জায়গায় এসেছে কুয়াশা। সেই কুয়াশা এবং ম্লান রঙের আকাশ ও বাসি মড়ার মতো জলো অন্ধকারের নিচে তার চারপাশের পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কান পেতে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করল। কিছু একটা শব্দ। কিন্তু কিছুই শোনা গেল না। বাতাস কিংবা ঝরা পাতার শব্দ, নিদেনপক্ষে শুকনো পাতার ওপর শিশির পড়ার টপ টপ শব্দ অথবা কোনো ছোট বন্যপ্রাণীর চকিত পদধ্বনি। কোনো কিছুই তার কানে এলো না। মোটা ছেঁড়া র‌্যাপারটা ভালো করে জড়িয়ে সে এবড়োখেবড়ো মাটির ওপর, খড়ের রঙের ভিজে দুর্বার ওপর দুই কনুইয়ের ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে কুয়াশার দিকে চেয়ে রইল। এখন একমাত্র বক্ষস্পন্দন ছাড়া ওর কাছে শব্দের জগৎ সম্পূর্ণ রকম হারিয়ে গেলেও সারাদিন এবং সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত অবশ্য অজস্র শব্দের বিরাম ছিল না। অনেক দূরের কালো পিচঢালা রাস্তা দিয়ে গোঁ গোঁ করে বাস-ট্রাক যাচ্ছিল। মিষ্টি দ্রুত স্বল্পস্থায়ী শব্দ করে ছোট গাড়িগুলোর ... এমনকি তীক্ষষ্ট হুইসেল বাজিয়ে ঝকঝক করে যে ট্রেন গেল তার শব্দও সে শুনতে পেয়েছে। এক রকম সারাদিনই এসব শব্দ সে শুনেছে। নির্জন মাঠটিতে বড় ঝোপটার ভেতরে শুয়ে শুয়ে তার আকাশ-পাতাল ভাবনার সঙ্গে এসব শব্দ মিশে গেছে, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক কাক উড়ে গেছে, জোড়ায় জোড়ায় বক উড়ে গেছে, তারপর দেখা দিয়েছে শঙ্খচিল, সবার শেষে দু-একটি একাকী পাখি, তার মধ্যে একটা বিরাট পাখি বিশাল পাখা অনেকক্ষণ পরপর নাড়তে নাড়তে, পা দুটি পেছনে ফিরিয়ে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল করে, সুন্দর মাথাটি এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে চলে গেছে। সোঁ সোঁ শব্দ তুলে পরম নিশ্চিন্তে সে আকাশের পুব কোণের দিকে ছোট হতে হতে এক সময় মিলিয়ে গেছে। মাঠের এক প্রান্তে গ্রামটার বাঁশঝাড়ে ছোট-বড় অসংখ্য পাখি তখন একসঙ্গে কলরব শুরু করেছে। রাত আরেকটু এগোনোর সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য ওদের কাউকেই আর দেখা যায়নি। সে তখন শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে র‌্যাপারটা ভালো করে মুড়ি দিয়ে, পেটের কাছে র‌্যাপারের বিরাট ফুটোটা লুঙ্গি দিয়ে ঢাকতে গিয়ে নিজেকে প্রায় বিবস্ত্র করে ফেলেছে এবং এ অবস্থার মধ্যেও প্রচণ্ড খিদে অনুভব করেছে। ময়লা ছোট এক টুকরো কাপড়ে বাঁধা মোটা চিড়ে বের করে অন্যমনস্কের মতো চিবুতে চিবুতে সে ভাবল হুঁ, অরা ঘুমুইতে গেল।

এর পর অনেকক্ষণ সে আর কিছুই ভাবেনি। একটা খালে জমা পানি অতি সাবধানে কাদা বাঁচিয়ে আঁজলা ভরে তুলে খেয়ে টলতে টলতে হাঁটতে শুরু করেছে। শীত যখন দুর্দম হয়ে উঠল, মাথা হয়ে উঠল নিরেট একটা বরফের চাঙড়, পা দুটি যখন তার অবশ হয়ে এলো তখন পশুর মতো সে এই শুকনো খালটায় আশ্রয় নিল। কোনো রকম গুটিশুটি মেরে একটু গরম পেতেই আবার ভাবতে পারল সে। ভাবতে গিয়ে দেখল তার চারদিকের পৃথিবী জমে গেছে। সে ভাবল, তাইলে রাত তো অনেক হল্ছে। শালো কতক্ষণ হাঁটছি গ ... কোতা অ্যালোম তা যি মুটেই ফোম করতে পারছি না। আর শালার আচ্ছা জাড় বটে!

ফসল কাটা মৃত মাঠের কঠিন শীতের মধ্যে উবু হয়ে থাকা মানুষটার ভোঁতা মাথার মধ্যে এ বছরের প্রথম শীতের চিন্তা এলো। চিৎকার শুনতে পেল যেন, বচির বচির র‌্যা, এ বচির, ঘুম মারচিস শুয়ে শুয়ে, মুনিব যি কান কাটবে র‌্যা। আচ্ছা ঘুম র‌্যা তোর। চিৎকারটা যেন সে একবারই শুনল তার মাথার ভেতরে। তারপর আবার স্তব্ধ সব।

এবার প্রচণ্ড শীতই গেল বলা চলে। শীত এলো যেমন সকাল সকাল, অঘ্রান ভালো করে পড়তে না পড়তেই, তেমনি তাড়াতাড়ি যাওয়া তো দূরের কথা, মাঘের এই শেষদিকেও তার দাঁতের তীক্ষষ্টতা একটুও কমেনি। এবার শীত এসেছিল হেমন্তকে বেশি দিন তার শব-শয্যায় শুয়ে থাকার সুযোগ না দিয়েই। শরতের শেষে গাছের পাতাগুলো মোটা ও হলদেটে হওয়ার উপক্রমেই এবং শীত শীত বাতাসের আমেজ ভালো করে অনুভব না করতেই হুড়মুড় করে জাড়কাল এসে পড়ল। প্রত্যেক বছরের মতোই বুড়োরা বলল, জাড় বটে বাপু, জাড় বটে। হাড়কাঁপুনি জাড় ইয়াকেই বলে, এতোটা বয়স হলো, চুলদাড়ি পাকিয়ে ফ্যাললোম, এমুন জাড় কুনদিন দ্যাখলোম না। প্রত্যেক বছরের মতোই জোয়ানরা হেসেছে এ কথায়, উহ তোমাদের ওমনি মনে হচে। আমাদের জাড় য্যামুন মালুম হচে না, আমাদের বয়সে তুমাদেরও তেমনি জাড় লাগত না। উ কিচু লয় গো, অক্তটোই আসল। মাথা নেড়ে কেউ সায় দিয়েছে, তা হবে, অক্তটোই আসল। তোদের বয়সে জোস্তা থাকলে পোষ মাসেও রাত দুপুর পর্যন্ত ধান কেটেচি, ভুলকো তারা দেখে মাঠে গেইচি ... ঐটোই কথা, অক্তটোই আসল। কিন্তু যে দু'চারজন বৃদ্ধ সায় দেয়নি, শেষ পর্যন্ত তাদের মতটাই সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে এ বছরে। সত্যি করেই প্রচণ্ড শীত এসেছে। বিশেষ করে মধ্যরাতের এই শুরুতেই চ্যাপটা দেশে ঠাণ্ডাটা যেন আকাশ থেকে উপচে উপচে পড়েছে।

অঘ্রানের শুরুতেই উত্তুরে এলোমেলো ঝড়ো বাতাস সারা দিনে দেশটির শরীরে হিমের কালো পরদা ফেলেছে এবং সন্ধ্যার পর সেই বাতাসের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে মাটি বরফকুণ্ড হয়ে গেছে। ধবধবে সাদা মাটির দেশ এ বছরের শীতে কালো হয়ে গেছে এবং সে দেশের সবাই তা লক্ষ্য করেছে। পাতলা পিছল কালচে একটা আবরণ পড়েছে মাটির ওপর ... সেটাকে কোনোমতোই শরতে ধানের জমিতে জমা ঘন শ্যাওলার আস্তর বলা চলে না।

এই কঠিন শীতে এ বছরের কাজ আরম্ভ হয়েছে। শীতে কী করতে পারে যতক্ষণ হাতে কাজ আছে? শীত যত প্রচণ্ডই হোক না, যতই নিরাশাব্যঞ্জক হোক ফলনের পরিমাণ এবং হোক না সেই ফসলের অর্ধেকটাই জমির মালিকের বাড়িতে তুলে দিয়ে আসতে, তবু শীত কী করতে পারে? কাজেই গোটা গাঁয়ের কাস্তে সচল হয়ে উঠেছে যথারীতি। মোটা-ছেঁড়া র‌্যাপার কিংবা ময়লায় দুর্গন্ধ কাঁথা গায়ে দিয়েই মানুষগুলোকে শীত এবং উত্তুরে বাতাসের সম্মুখীন হতে হয়েছে। পৌষের মাঝামাঝি আসতেই রুপোর মতো শাদা হয়ে এলো সামান্যমাত্র ইস্পাত ছোঁয়ানো লোহার কাস্তে। মাঠের ধান কাটা হয়ে গিয়ে আঁটি বাঁধা শেষ হলো ... যুদ্ধক্ষেত্রে অগণিত মৃত সৈনিকের মতো মোটা মাথার আঁটিগুলো জমিতে পড়ে রইল কিছুদিন। শিশিরে ধুয়ে ধুয়ে ধানের শীষগুলো চকচকে সোনার বর্ণ নিল। এরপর কাস্তের কাজ মোটামুটি শেষ হলো। গাঁয়ের মুচির তৈরি তোবড়ানো উৎকট চটি পায়ে হটহট হেঁটে আঁটিগুলোকে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো সাজাতে শুরু করল ওরা।

সমতল চ্যাপ্টা দেশ থেকে তখন সবুজের চিহ্ন বিলুপ্ত হয়েছে ... খালগুলোতে মিশমিশে কালো রঙের কাদা ছাড়া আর কিছু নেই। কাদাখোঁচার লম্বা ঠোঁট খচখচ করে ক্ষতবিক্ষত করছে কাঁচা কাদাকে, এক ঠ্যাংয়ের ওপর ভর দিয়ে কালোয়-শাদায় মেশানো বিরাট সারস লম্বা সারি দিয়ে বসতে শুরু করেছে। উত্তুরে বাতাস দিন দিন সংকুুচিত করতে শুরু করল দেশটাকে, গাছগুলো সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গেল এবং ঘাসপাতার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে গাঢ় সবুজ বর্ণের ফড়িং মেটে হয়ে গেল। আর ধূসর চ্যাপ্টা দেশ গরুর গাড়ির নেমি চিহ্নিত সমান্তরাল চওড়া রাস্তায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেল।

এ সমগ্র শীতকালটা, শীত আক্রান্ত দেশের এই ছবিটা তার অশিক্ষিতপ্রায়_ বর্বর মনে আবছাভাবে ভেসে ওঠে। পুঙ্খানুপুঙ্খতার দিক থেকে ওপরের বর্ণনা অনেক বেশি সঠিক ... কিন্তু ওর মনের ছবিটা অনুভূতির সজীবতায় গাঢ় এবং উত্তপ্ত। কাজেই শুকনো খুঁটিনাটি অনেক বাদ পড়লেও সে যোগও করল অনেক কিছু এবং ছবিটা তার কাছে চরম সত্য ও সমগ্র হয়ে উঠল। ছবিটাকে যখনই সে পেয়ে গেল, সেই শীতঝরা বীভৎস স্তব্ধ নির্জন রাত্রির আকাশের নিচে অসাড় হয়ে যেতে যেতে, ক্ষুধায় চেতনা হারাতে বসেও সে দু'কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে আকুল হয়ে পেছনের দিকে ঘাড় ফেরাল। কুয়াশা জমাট হয়ে তার চোখের ওপরই পর্দা ফেলল। সে কিছুই দেখল না। প্রান্তর নিথর হয়ে রইল। যে খালটায় সে আশ্রয় নিয়েছিল তা তাকে উষ্ণতা দেওয়ার পরিবর্তে বড় বড় দাঁত দিয়ে কামড়াতে লাগল। তবু গোল একটি পুঁটুলির মতো হয়ে সে মনের চোখে ছবি দেখে আর তার কানে স্পষ্ট ভেসে আসে, বচির, বচির র‌্যা ... অ্যাই বচির, ঘুম মারচিস শুয়ে শুয়ে, কান কাটবে যি মুনিব!

চিৎকার করে যে ডাকত তার আর বেশি কষ্ট করতে হতো না। বশির বৌ-এর শরীরে ওম থেকে এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিত। বিছানা ছেড়ে ঠাণ্ডা মেঝেয় মাংসল একটা শব্দ করে পড়ত সুডৌল হাতটা। আট বছরের ছেলেটা সরে যেত বিছানা ছেড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই নুয়ে পড়ত বশির, বৌ-এর হাতটা আস্তে আস্তে তুলে গলার ওপর রাখত, বাচ্চাটাকে আর একবার কাছে টেনে নিত। তারপর সাবধানে কাঁথা সরিয়ে সে বিছানার বাইরে আসত। র‌্যাপারটা দড়ি থেকে টেনে নিয়ে মাথা থেকে সমস্ত শরীরটা ঢেকে নিত। অন্ধকারের মধ্যে কাস্তেটা চকচক করতে থাকে ... পেতে একটুও দেরি হয় না তার। আম কাঠের পলকা দরজা খুলে সে বেরিয়ে আসে, চাচা লিকিন? হুঁরে বাপু হুঁ ... ডেকে ডেকে হয়রান হচি, কি ঘুম র‌্যা তোর আঁ ... ওয়াজদ্দির কণ্ঠে অপ্রসন্নতা, চ এখন, দেরি হয়ে যেচে আবার, বিশে কত্তা লোকটো বেশি সুবিধের লয়, বুইলি না? কত্তার সাঁওতাল মুনিষ কটা আর উদের কামিনীগুলোর তো ঘুম নাই রেতে ... শালোরা সারারাত মদ মারে, আর তিনপোহর রাত থাকতে মাঠে যেয়ে হাজির হয়। ওদের লিয়ে হয়েছে আমাদের বেপদ। রাত দুপুরে যেতে হবে এই জাড়ে। চ বাপু অ্যাকোন তাড়াতাড়ি।

যেচি যেচি ... বশিরের তাড়া নেই, একটু তামুক খেয়ে লি দাঁড়াও এগু।

দেরি হয়ে যাবে র‌্যা ... তু তবে তামুক খা, আমি চললোম।

দাঁড়াও চাচা, বেস্ত হচো ক্যানে বলো দিকিন ... অ্যাই দ্যাখো তো কতক্ষণ, লেলোম বলে।

বিশে কত্তাও বলবে লেলোম বলে, বলবে, মানে মানে পথ দ্যাখো।

ভারি বয়ে যাবে তাইলে। পোষ মাসে কাজের অভাবটো কী? সব শালোর মুনিষের পেয়োজন। ভারি তোমার বিশে কত্তা!

বশির খড়ের পাকানো বিনুনি থেকে খড় টেনে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলে।

খানিকটা খড় নিয়ে গোল একটা গুলি পাকায় সে ... ধীরেসুস্থে দলাটাকে হাতের তেলোয় রেখে রগড়াতে থাকে, তামুক না খেয়ে বেরুতে পারব না বাবু... সে যোগ করে।

বারেবারে তামাকের কথা শুনে এই সাংঘাতিক শীতের ভোরে ওয়াজদ্দিরও তামাক খাবার বাসনাটা আস্তে আস্তে প্রবল হতে থাকে। দাওয়ার এক কোণে বসে পড়তে পড়তে বলে সে, লে বাপু, ছাড়বি না য্যাকোন, দু'টান দিয়েই লি। লে লে লুটি হয়েছে, গুঁড়িয়ে ফেললি যে।

রগড়াতে রগড়াতে গোল দলটাকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলে কলকির ওপর সেটাকে রেখে খটখট করে কড়া হাত দুটোয় চাপড় দেয় বশির। দাওয়ার কোণ থেকে চকমকি ইস্পাত শোলা এনে শোলায় আগুন ধরায় অভ্যস্ত হাতে, সেখান থেকে আগুন ধরায় খড়ের দলায়। তামাকটা যখন তৈরি হতে থাকে ওয়াজদ্দি চুপ করে চেয়ে থাকে ওর দিকে... শীতে হি হি করে কাঁপে সে, একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসে, ঘরে ঘরে মানুষ জেগে ওঠে... ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ঝকমক করতে থাকা কাস্তে হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওরা। কেউ নিজের ক্ষেতে, কেউ পরের ক্ষেতে।

বশির তামাক তৈরি করে টান দেবার নামে বার দুই চুম্বন করে হুঁকোটাকে। আস্বাদ করে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে সে হাত বাড়িয়ে দেয়, লাও।

ওয়াজদ্দি হুঁকো নিয়ে মিনিট পাঁচেক নিবিষ্ট মনে টান দিয়ে ধোঁয়ার মধ্যে প্রায় গোপন থেকে বলে, তামুকটো না খেয়ে কাজে যাওয়াটো কোন কাজের লয় বাপু।

ল্যায়কো? তবে? বললোম তুমাকে, তুমি বিশে কত্তা বিশে কত্তা করে তামুকের এ্যাটাই নষ্ট করে দিলে।

তোর ধান কটা কবে কাটবি? ওয়াজদ্দি প্রশ্ন করে।

ঐ ক'টা ধান বাপু... উ আর কতক্ষণ লাগবে। দ্যাড় বিঘে জমির ধান... উ শালো কাটলেও তিন মাস, না কাটলেও তিন মাস। মরশুমের পেরথম তো, কদিন না হয় মুনিষই খাটি, বুইলে না, কটো টাকা ঘরে আসবে তেবু। তোমার ধানটো কাটলে?

আমারটো? লে হুঁকো লে। আমারটো? শালোর পেটরোগা হেগো রুগীর মতুন ছিঁয়েপড়া ধান... কবে কেটে ঢিপ দিয়ে রেখেচি। আমার ধানের ঢিপ দেখিস নাই তু... ওয়াজদ্দি খ্যাঁকশেয়ালীর মতো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসে, কেল্লাই ঢিপ র‌্যা, খলখলের ঢিপ ষাটতলা থেকে দেখা যায় জানিস... একটো ছাগল লুকোনোও ফ্যার আচে।

উ কতা বাদ দে দিকিন।

না, তা লয়, কথাটো তুমিই তুললে কিনা, তাতেই।

চ চ, আর দেরি করিস না।

চলো।

ওরা বেরিয়ে পড়ে।

একটু দূরের আবছা অন্ধকারের মধ্যে একটা দল থেকে কেউ চিৎকার করে, কে?

ক্যারে, ভক্ত লিকিন?

অ, অজদ্দি চাচো? আর কে গো সঙ্গে?

আমি র‌্যা ভক্তা। বশির জবাব দেয়।

অ, কোন মাঠে আজকে?

জামতলা। তোর?

ভেরেণ্ডাগড়ে। কার কাজে যাচ্ছিস?

বিশে কত্তার। তোর নিজের ধানটো কাটা হোল র‌্যা ভক্তা?

হয়েচে ... বুইতে লাগব পর্শু থেকে। কদিন এসে পিটিয়ে দিস ধান কটা।

দোব, দোব। দোব না ক্যানে?

বশির, ওয়াজদ্দি এগুলো। সকাল হয়নি এখনও। পাতলা একটা কুয়াশা পড়েছে। কালচে রঙের মাটি অল্প ভিজে এবং পাথরের মতো কঠিন। গরুর গোয়াল থেকে ধোঁয়া এসে কুয়াশায় মিশেছে। ভারি একটা পর্দা পড়েছে গাঁ-টিকে ঘিরে। সেই পর্দা ভেদ করে ওরা মাঠে এসে পড়ল। ভিজে ভারি ধানের লুটিয়ে পড়া শীষ চাবুকের মতো আঘাত করে পায়ের গোছায়। শিরশির করে বাতাস দেয়, ধানে ধানে ঘষা লেগে শন শন শব্দ হতে থাকে এবং এই অল্প একটু শব্দ ছাড়া বিরাট খোলা মাঠের কোথাও কোনো শব্দ নেই। অন্ধকারে ছায়ার মতো মানুষগুলোকে হুস হুস করে হাঁটতে দেখা যায়। তারপর কুয়াশার পাতলা চাদর ছিঁড়ে হঠাৎ সূর্যের অজস্র আলো লাল হয়ে মাঠে পড়তেই দেখা যায় বিরাট মাঠে প্রায় জনারণ্য। তখন একটা শব্দ ওঠে, একটা বিশাল গম্ভীর গুঞ্জন ... মাঠের আকাশ এবং বাতাস বেষ্টন করে বাজতে থাকে। এর অন্য কোনো নাম নেই, একে জীবনের গুঞ্জন বলা চলে। বেঁচে থাকার গুঞ্জন... উষ্ণ উত্তপ্ত এবং চিরকালীন।

খালটায় গুটি মেরে শুয়ে এই ছবি দেখতে দেখতে এখন তার মনে হলো সে মরে যাচ্ছে। মানুষ কেমন করে মরে যায় তা সে জানে না। কিন্তু তার মনে হলো মরার ঠিক আগে মানুষ তার সমস্ত জীবনের ছবি একবারে দেখতে পায়। তার আরও বিশ্বাস ছিল মরার সময় কেউ কিছু ভাবতে পারে না, সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে না, শুধু দেখতে থাকে। সেও কিছু ভাবতে পারছিল না... এই শীতে শরীরটার মতো মনটাও অবশ হয়ে জমে গিয়েছিল, সে যেন সুখ-দুঃখের অতীত হয়েছিল, কারণ আর তার কোনো কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা ছিল না। এখন আর সে শীত থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টাও করছিল না। কিন্তু তবু চোখ বন্ধ করে একদৃষ্টে মনের দিকে চেয়ে নিরীহ অসহায়ভাবে সে একটির পর একটি ছবি দেখতে পাচ্ছিল। স্পষ্ট রঙে-রঙ করা ছবিগুলো এবং সেগুলোতে যা কিছুই ছিল... মানুষ কিংবা প্রান্তর, আকাশ অথবা বৃক্ষ সবকিছুই যেন তার গা-ঘেঁষে স্পর্শ করে যাচ্ছিল।

সকালের সেই আশ্চর্য গুঞ্জনের সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে কাস্তে চালানোর ঘস্ ঘস্ শব্দ, শুকনো শামুক বা কাঁকড়ার পায়ের নিচে কুড় কুড় করে গুঁড়িয়ে যাওয়া, হঠাৎ কোনো ইঁদুরের পালিয়ে যাওয়া, গুঞ্জন ছাড়িয়ে অতর্কিত চিৎকার এবং মেঠোসুর, ধানকাটা, আঁটি বাঁধা, ধানের স্তূপ সাজানো এবং ধানবোঝাই মোষের গাড়ির মন্থর গতি এবং তৈলপিপাসু চাকার চিৎকার, রেষারেষি করে ধান পেটানোর ধুপধাপ শব্দ এবং আরও অসংখ্য খুঁটিনাটি... তার দেশের মাটির এবং তার নিজের জীবনের অজস্র ঘটনা তার হৃৎপিণ্ডের সামনের বুকের দেয়ালে প্রতিফলিত হতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাল রোদ কটকটে শাদা হতে থাকে... দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ... গুনগুন ধ্বনিটা আস্তে আস্তে মাঠের নিস্তব্ধতার উচ্চকণ্ঠের চাপে ডুবে যায়... অসংখ্য কাস্তে একসঙ্গে দুপুরের রোদে ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

এই ছবিদের সঙ্গে গায়ে গায়ে লাগালাগি করে শেষ ছবিটা এসে মনের ওপরে সেঁটে গেল। আগাগোড়া কেঁপে উঠল সে। ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইল চিত্রটাকে। অন্ধকার দিয়ে লেপে দিতে চাইল। কিন্তু স্থির হয়ে ছবিটা ঝুলে রইল... সে দেখতে বাধ্য হলো, কেঁপে উঠল, চিৎকার করে উঠতে চাইল ... কিন্তু তবু চিটচিটে আঠার মতো জড়িয়ে রইল সেটা।

মাঠ থেকে সেদিন তখন প্রায় সবাই ফিরে গেছে। সাঁওতাল পুরুষ এবং নারীরা আগুনের চারপাশে বসে গেছে... ইঁদুর কিংবা কাঠবিড়ালী পুড়িয়ে সাবধানে তার ছাল ছাড়াচ্ছে ... সারাদিনের ঝাড়া ধানের হিসেব করছে চাষি এবং গৃহস্থরা। বশির এবং ওয়াজদ্দির সেদিন ফিরতে একটু রাত হলো। কান ঢেকে মুখে কাপড় জড়িয়ে খুব তাড়াতাড়ি ওরা বাড়ি ফিরছে। কেউ কাউকে কথা বলছে না। পায়ের নিচের মাটি কনকনে ঠাণ্ডা। বেশ খানিকটা চুপ থেকে হঠাৎ বশির বলল, চাচা?

আঁ... একটু যেন অন্যমনস্ক ছিল ওয়াজদ্দি।

বলি, অ চাচা?

বল্।

কী শুনচি বল দিকিন্।

ক্যানে, কী আবার শুনলি তু?

তুমি শোনো নাই?

কী বেপারটো, তা তো বলবি?

আবার হিড়িক লিকিন লাগবে?

কোতা?

তুমি কিচুই শোনো নাই গ?

কই বাপু, আমি তো কিচুই শুনি নাই।

আচ্ছা লোক বটো বাপু, তুমি ... সারোটা দিন আজ খালি কানাকানি হলচে... একানে ফিসির ফিসির, ওকানে গুজুর গুজুর, তুমি কিছুই শোনো নাই? পাকিস্তানে হিঁদুদের লিকিন একছার কাটচে... কলকাতায় তেমনি কাটচে মোচলমানদের।

ক্যা বললে ক্যা তোকে? ওয়াজদ্দি খেঁকিয়ে ওঠে।

লোকে বলাবলি করচে যি!

তা করুক গো, তু আপনার বাড়ি যা দিকিন... ভাত মেরে শুয়ে থাকগা।

কিন্তুক আজ রেতে যি আমাদের গাঁটোকে...

এ্যাই দ্যাকো... ওয়াজদ্দি বলে, ইয়াকেই বলে মুরুক্ষু... মুরুক্ষু কি আর গাছে ধরে র‌্যা? আজ রেতে গাঁটোর কী করবে, কী?

আসবে।

কুন শালোরা?

লবাবপুর, ছিষ্টিধরপুর থেকে মা কালীর পুজো দিয়ে হিঁদুরা আসবে।

বাড়ি যা... নিদারুণ বিরক্তিতে ওয়াজদ্দির মুখে কথা আসে না।

শোনলোম, তাইতি বলচি।

কেস্তে দিয়ে সি শালোর গলাটো ঘ্যাঁচ করে কেটে দিতে পারলি না?

সবাই বলছে যি।

তু বাপু চুপ কর দিকিন এট্টু... বড্ডা জাড় লাগচে।

দু'জনেই চুপ করে। কিন্তু একটু পরেই আবার বশির বলে, চাচা, আমার মনে হচে আবার অরম্ব হবে।

এটা কমনেকার মোনাকাটা গ আঁ... বলচি বাড়ি যা তেবু ব্যাদর ব্যাদর করবে।

বশির কিন্তু কান দিল না কটূক্তিতে। ফিসফিস করে বলল, কতকটা যেন নিজের মনেই, হাজার হলেও পাকিস্তানটো মোচলমানদের দ্যাশ, সিখানে মোচলমানদের রাজত্বি...

তাইলে যাস নাই ক্যানে?

আমাদের কি সায়োস হয় চাচা ঘরসংসার লিয়ে কোতাও যেতে! তেবু দ্যাশটো ...

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল ওয়াজদ্দি... বশিরের মুখের ওপর তীব্র চাহনি ফেলে নিঃশব্দে ওকে যেন দগ্ধ করতে থাকে সে। বশির দাঁড়িয়ে পড়ে বোকার মতো, তেমনি করেই চেয়ে থাকতে থাকতে ওয়াজদ্দি জিগ্গেস করে, তোর বাপ কটো? এ্যাঁ... কটো বাপ? একটো তো? দ্যাশও তেমনি একটো। বুইলি? যা... বলেই ওয়াজদ্দি নিজেই চলে গেল হ্নহন্ করে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরা এলো। দূর দূর গ্রাম থেকে, ছোট ছোট মাটির ঘরের উষ্ণতা ত্যাগ করে কপালে চওড়া করে সিঁদুর লেপে অপরিচিত মানুষদের হত্যা করতে এলো ওরা। ওদের আসার আগে ঘণ্টাতিনেক ধরে তারা মেঝেতে পাতা ঠাণ্ডা বিছানায় বসে ঢাক, কাঁসর এবং শাঁখের শব্দ শুনল। নিস্তব্ধ মাঠ এবং শীতের কুয়াশা ছিঁড়ে ভেসে এলো ঢাকের গুড়গুড় শব্দ। মাঘের আকাশ শিউরে উঠল কাঁসরের ঢং ঢং আওয়াজে এবং রাত্রি বিরাট একটা ঈগলের মতো কুৎসিত নখর দিয়ে নিরীহ পায়রার মতো গ্রামটাকে চেপে ধরল।

সামান্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল সহজেই... রাস্তার ওপরে আড়াআড়ি করে লাগানো গরুর গাড়িগুলো ভেঙে ফেলা হলো এবং বশিরের চোখের ওপরেই প্রথম বলি হলো ওয়াজদ্দি। তারপর খড়ে ছাওয়া মাটির ঘরগুলো বেষ্টন করে আগুনের শিখা উঠল... আগুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল অপরিচিত খুনিদের মুখ, তাদের কপালের সিঁদুর এবং তীব্রভাবে উঠল ঝলকে ওয়াজদ্দির তাজা রক্ত এবং মৃত ও ভীষণভাবে বিস্মিত তার মুখের ওপর আগুন খেলা করতে শুরু করল।

বচির, বচির... তোর বাড়িটোর দিকে ওরা গেল।

কই, কখুন?

উই যি... উই যি... আর আমাদের বাড়িটোও...

এ্যাই রকিব... উই যি শালোরা...

দল ছেড়ে প্রাণপণে ছুটল বশির। বাড়িটা পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। বাড়িটা শান্ত। বাড়িটা স্থির। বাড়িটা মূক। ওরা চলে গেছে। বল্লম দিয়ে মাটির সঙ্গে গাঁথা বশিরের সাত বছরের ছেলেটা। বাড়িটার মতোই শান্ত এবং মূক ও ছাবি্বশ বছরের একটি নারীদেহ... কালো এক খণ্ড পোড়া কাঠের মতো পড়ে আছে ভাঙা দগ্ধ ঘরে। কাঁচা মাংস পোড়া উৎকট গন্ধে বাতাস অভিশপ্ত।

আল্লা, তু যি থাকিস মানুষের দ্যাহোটার মধ্যি... বুকফাটা চিৎকার করে উঠল বশির, কোতা, কোতা থাকিস তু, কুনখানে থাকিস বল?

সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে সে। যে খালটার মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে গুটিশুটি মেরে সে শুয়ে ছিল, শীতে আড়ষ্ট হয়ে এসেছিল তার হাত-পা, ভয়-ভাবনা-চিন্তার অতীত হয়ে, শারীরিক কষ্টের বাইরে চলে গিয়ে সে যেখানে স্থির হয়ে শুয়ে, কুয়াশার দিকে চাইতে চাইতে ছবি দেখছিল, এই শেষ ছবিটা দেখতে দেখতে সে ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল... তার গলার শিরাগুলো ফুটে উঠল। শিরাওঠা হাত দুটি লোহার ডাণ্ডার মতো শক্ত হয়ে উঠল। আর সে কোনো ছবি দেখতে পেল না। হঠাৎ একেবারেই অন্ধ হয়ে গেল সে। অন্ধ হয়েই এগিয়ে চলল।

এই ভয়ঙ্কর রাত্রির ছবি দেখতে দেখতে অন্ধ হয়ে পাগল হয়ে তাড়িত হয়ে গত কয়েক রাত্রি ধরে সে এত দূর পর্যন্ত চলে এসেছে তার দেশ ছেড়ে। ঝোপে-ঝাড়ে সে লুকিয়ে থেকেছে সারাদিন... কোনো মানুষের সামনে যায়নি, সাহায্য চায়নি কারও কাছে, প্রার্থনা করেনি। ঈশ্বরের কাছেও না। মনে মনে সে বলেছে, আমি আর বচির নাই... বচির শ্যাষ, বচিরের হয়ে গেলচে... দ্যাশ-ফ্যাশ নাই... আমি এ্যাকোন আর এক দ্যাশে জন্ম লোব।

আজ সারাটা দিন ঠিক এমনি কেটেছে তার, একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কত রকমের শব্দ শুনেছে পৃথিবীর... অর্থহীন ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সেইসব শব্দ। সারাদিন ধরে উত্তর দিক থেকে ঝড়ো বাতাস এসেছে, পৃথিবীর পাত্র ঠাণ্ডা হয়েছে ধীরে ধীরে। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস বিদায় নিয়েছে... কিন্তু ততক্ষণে জমে গেছে পৃথিবী এবং আকাশ আর কুয়াশার পর্দা নেমেছে ভারি হয়ে। কখন নিস্তব্ধ হয়েছে তার চারপাশের জগৎ, সে খেয়াল করেনি। যখন খেয়াল হয়েছে কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো শব্দই সে শুনতে পায়নি। এই মাত্র সে অনুভব করল তার দেশের প্রান্তে পেঁৗছেছে সে... এবার কখন নিজের অজান্তেই যে দেশে সে পালাচ্ছে, সে দেশের মাটিতে পা দেবে। অত্যন্ত সাবধান হতে হয়েছে তাকে যেন কারও চোখে না পড়ে। মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর চোখেই সে পড়তে চায় না। সে আরও শুনেছে নিজের দেশ যেমন ছাড়তে দেওয়া হয় না, অন্য দেশে তেমনি ঢুকতেও দেওয়া হয় না। প্রতি মুহূর্তে এখন তার মনে হচ্ছে, এখুনি তার চোখের ওপর টর্চ পড়বে, গম্ভীর গর্জন উঠবে একটা, তার প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়বে মাটিতে।

প্রচণ্ড শক্তিধর শীতের একটি তরঙ্গ এলো। তার হাড় ভেদ করে মজ্জায় গিয়ে পেঁৗছল শীত... ধারালো চাকুর মতো কাটল তার মাংস, তার হাড়, তার মজ্জা; মগজের কোষে কোষে তীক্ষষ্ট একটা যন্ত্রণা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠল এবং এক সময় তার বোধ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হলো। তবু কিন্তু সে এগোচ্ছিল... অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হচ্ছিল। আসলে যন্ত্রের মতোই পা পড়ছিল তার... অবশ পা দেহের সঙ্গে সম্পর্কহীন আলাদা এক অঙ্গ হয়ে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে যেখানে সেখানে পড়ছিল। হঠাৎ চষা জমির একখণ্ড কঠিন মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধেই গড়াতে গড়াতে ওর শরীরটা আশ্রয় পেল একটা খালে। এবার তার বিশ্বাস নিশ্চিত হলো যে, সে মরে যাচ্ছে।

সে সম্ভবত মরেই যাচ্ছিল। কারণ তার আশপাশে কোনো কিছুই তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বেঁচে ছিল না। মাঠ, জলা, খাল, ঝোপ-ঝাড় এবং আকাশ নিয়ে প্রকৃতি এমন একটা অবস্থায় ছিল যে, সে অবস্থার সঙ্গে একমাত্র মৃত্যুর তুলনাই সম্ভব। যে খালটার মধ্যে সে শুয়ে ছিল তার পুবদিকের পাড়টা ছিল এত উঁচু যে, খালের ভেতর থেকে কিছুই দেখার উপায় ছিল না। পৃথিবীটা অত্যন্ত ছোট হয়ে এলো তার চোখের ওপরে এবং সেই অত্যন্ত সংকীর্ণ পৃথিবীতে সে মরতে মরতে আবার ছবি দেখতে লাগল।

কিন্তু সবচাইতে হাস্যকর ব্যাপারটা এই যে, এই সময় পুরো চাঁদের চার ভাগের এক ভাগেরও কিছু কম জঘন্য হলদে রঙের একটা চাঁদ উঠেছিল। বীভৎস একটা কাণ্ড ঘটাল চাঁদটি... সে মৃত্যুকে একবারে ন্যাংটো করে দিল।

এই চাঁদের আলোয় এক পা এক পা করে পুবদিকের মাঠ পেরিয়ে খালটার উঁচু পাড়ের মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে একটি মানুষের মূর্তি। পরনে হাঁটু পর্যন্ত তোলা ময়লা মোটা পাড়ের ধুতি... মোটা একটা চাদর জড়ানো গায়ে। কাঁধে বাঁক... বাঁকের দু'দিকের ঝুড়িতে অনেক রকমের জিনিস... বড় একটা কুড়ূল... চাঁদের আলোতে ঝমকম করছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ঘাড় তুলে তাকাল বশির... তার মাথা মাটিতে অস্পষ্ট ছায়া ফেলল। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝুঁকে পড়ল ওর মাথা। তন্ময় হয়ে ছবি দেখছিল সে... মূহূর্তের মধ্যে সমস্ত জীবনটা দেখতে পাচ্ছিল। সে দেখছিল বিশাল বিরাট চ্যাপ্টা একটা দেশ... সেই বিরাট দেশটা সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়ে যেন ছোট্ট হয়ে দুলছিল তার চোখে; তারপর উল্কার বেগে পট বদলাতে থাকে... সে দেখে ওয়াজদ্দির তাজা রক্ত, তার বিস্মিত মৃত মুখ, দেখে লাল টকটকে... আগুনের চাইতেও লাল তপ্ত রক্ত, বল্লম দিয়ে গাঁথা তার সাত বছরের ছেলেটাকে, কয়লার মতো কালো চাবি্বশ বছরের যুবতীকে, প্রেয়সী এবং ঘরণীকে।

অকস্মাৎ উৎকট একটা শব্দ করে খালটা যেন বিদীর্ণ হলো... কাঠবিড়ালীর মতো উঠে এলো বশির, এসে দাঁড়াল বাঁক কাঁধে নির্বাক মানুষটার সামনে। দু'জন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ চাঁদের আলোয়, হিমবর্ষী আকাশ-আক্রান্ত মাঠে এই খালটার উঁচু পাড়ের কিনারায় মুখোমুখি দাঁড়াল। বশির দেখল সে মানুষটার পরনে মোটা ধুতি, গায়ে চাদর, কাঁধে বাঁক। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল, চিৎকার করে কে যেন ডাকল, বচির বচির, তার মুখে ঝলকে পড়ল বল্লম গাঁথা সন্তানের উষ্ণ রক্ত। মৃত মাছের চোখের মতো ওয়াজদ্দির শাদা চোখ অর্থহীনভাবে চেয়ে রইল যেন তার দিকে। তীব্র চোখে ওর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ কুড়ূলটা তুলে নিয়ে মানুষটার মাথায় প্রচণ্ড একটা আঘাত করল বশির। বাজ পড়ার মতো যেন কড় কড় আওয়াজ হলো এবং বাঁকসুদ্ধ সেই মানুষটা বিস্মিত হতচকিত একটা মৃত্যু-চিৎকার করে খালটার ভেতরে গড়িয়ে পড়ল।

পালাইছিলে শালো ই দ্যাশ থেকে... শালো... চাঁদের মৃদু আলোতেও গরিলার মতো বিরাট দু'পাটি শাদা দাঁত ঝকঝক করে ওঠে।

একসঙ্গে দুটি টর্চের আলো পড়ে... বশিরের মুখে একটি আর একটি মৃত্যু-যন্ত্রণাখিন্ন হতবাক সেই মুখের ওপর। টর্চের আলো মুখ থেকে সরে গেলে বশির দেখল সেই মুখ... ঠিক যেন ওয়াজদ্দির মুখ... রক্তাক্ত, বীভৎস, তেমনিই অবাক। চোখের ওপর থেকে অন্ধকার পর্দাটা যেন সরে গেল। আর তার চোখের পানিতে ধূসর হয়ে এলো দুটি পৃথিবী... যাকে সে ছেড়ে এলো এবং যেখানে সে যাচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন