বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

শামীম আজাদের একটি অতিপ্রাকৃত গল্প : ফ্ল্যাট থ্রি, রোকা কোর্ট

একটা অতি প্রাকৃত গল্প লিখতে হবে কিন্তু আমাদের নতুন এ ফ্ল্যাট সে ঘোর তৈরি করতে পারছি না। এ বাবদে আমার আগের বাড়িটা ঠিক ছিল। ঘরে ঘরে জর্জিয়ান আমলের ঘুলঘুলি, দরোজার ফ্রেমের মধ্যে লুক্কায়িত হিব্রু তাবিজ, বাড়ির বাইরে ভ্যালেন্টাইন পার্কের হুহু হাওয়া আর কমলা ললি পপ আইস্ক্রিমের মত ঝুলে থাকা রাস্তার হ্যালোজেন বাতি, হলদেপনা রোয়ান গাছের হেলান। রাতে জেগে থাকলেই হল। পেছনের ছায়া ঘন হয়ে উঠতো। কেঁপে ঊঠতো একশ বছরের সে পুরনো ইতিহাস।

আজাদের শরীরের অবনতি হবার পর সে বাড়ি বেঁচে এখানে তিন নম্বর রোকা কোর্টের নতুন এ ফ্ল্যাটে উঠেছি। এমন ঝকঝকে ফ্ল্যাট যে ছায়াও পড়েনা। ফার্নিচারগুলোর গায়ে কোন জোব্বা নেই, বিছানার কাভারে কোন ঝুল নেই, অহেতুক কোন ওয়ার্ডোব নেই। টয়লেট ও এমন ডিজিটাল যে কর্তব্য শেষে পিস মার্কের মত রূপালী গোলকে হাত ছোঁয়ালেই ফ্ল্যাশ হয়ে যায়। সেকেন্ডে ম্যাজিকের মত বর্জ্য উধাও হয়ে যায়, টিপটিপ করে জল ঝরে না। ১২ টি ফ্ল্যাটের এ গুচ্ছে এমনকি আমাদের মত কোন জবুথবু বুড়োবুড়িও থাকেনা। এরা সবাই স্লিম এ্যান্ড ট্রিম শ্বেতাংগ তরুন অথবা যুগল। এর মধ্যে এক পুরুষ জুগলও আছে।

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে একসাথে থাকে শার্লট আর জেমী। একজন যেন জুলিয়া রবার্টস আর অন্যজন হিউ গ্রান্ট। কি করে এমন হল কে জানে! ওদের কুকুর যুগলও যেন সিনেমা থেকে জেনেটিক্যালি মোডিফাই করে আনা। এক ফুট উচ্চতার পুতুল মার্কা পুডল। একজন ধূসরিকা অন্যজন সাদা সাহেব! তো ধূসরিকার গায়ে লম্বা লোমের ঝোপ। সে লোমে তার বেত ফলের মত চোখগুলো ঢেকে থাকে। কিউট!মনে হয় আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দেই, বেনী বেঁধে দিই। আর সাদা সাহেব এর দুই জোড়া পা ই সুতীব্র কালো।

জেমী সাইকেলে বা টিউবে করে অফিস যায়। ফিরে এসে আন্ডার গ্রাউন্ড কার পার্কের লাগোয়া জিমে গিয়ে বাইসেপ ট্রাইসেপ করে। সে কাজ করে উইম্বিল্ডনের মাঠ ঠিকঠাক রাখার কাজ করে। শার্লট সিভিল এঞ্জিনিয়ার। কিন্তু মেয়েটি যে ব্রেনের আর ছেলেটি করে বাহুর কাজ। ব্যাপারটা জানার কথা না। এখানে আসার পর একদিন মহা তুষারপাতের সময়ই দেখি আমাদের ডিজিটাল হিটার বন্ধ। মেশিন ঘরের কপাট খুলে দেখি কি যে জটিল হারমনিয়ামের রিটের মত সব বসানো। এখন কোনটা দেখে কোনটায় হাত দিলে কি নাকি হয়ে যায়! শেষে যদি হিটার চালাতে গিয়ে আগুন লাগিয়ে বসি! অনেকক্ষন ম্যানুয়েল পড়েও উদ্ধার করতে না পেরে জেমীকে ডেকেছিলাম। ছয়ফুটের ঐ দেহের মগজ দেখি আমারই মত। সে বল্ল শার্লটের কথা। জানলাম তার পেশার কথা। আর সে যখন অফিস থেকে ফিরলো তখন আমরা দুজ’ন ঐ ডিজিটাল বাক্সের বয়লার রুমে ঢুকি। ভেতরে এত অল্প স্থান যে প্রায় গা লাগালাগির মত অবস্থা। ওর পারফিউমটা অরগানিক, অনেকটা পীচ ফলের মত ঘ্রাণ।

ওদের সঙ্গে টুকটাক কথা হয় মূলত পেছনের বাগানে। আমাদের কাঠের ডেক এর ওপারেই ওদেরটা। পেছনটা দারুণ সবুজ আর রহস্যময়। কালো ফ্যান্স আর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই বিশাল বাদামী বাঁধানো চত্তর আর হু হু হাওয়ার ওক, শিশু নাসপাতি গাছের লটপটি আর ময়ূর বসা ঘাস। ওখানে একটু অন্যরকম হাওয়া। পেছনে বাঁশ ঝাড়ের নিচে খেক শেয়ালের গর্ত। রাতে বাগানের ল্যাভেন্ডার ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে ফ্লোরসেন্ট বাতিগুলো জ্বললে মাটি আটকানো খাড়া খাড়া, সরু সরু, কিরি কিরি লগগুলোকে মনে হয় যেন না মাজা হলুদ হলুদ দাঁত। অথচ দিনে ঐ গাছতলাই আবার উজ্জ্বল এক সম্মোহনী।
=

জেমীরা সেদিন ওখানেই বার-ব্যা-ক্যূ করেছিল। ঝলসানো মাংস, গান, গিটার আর ও লাল ওয়াইন। চল্ল রাত পর্যন্ত। আমরা দুই জবুথবু ততক্ষনে ঘুমের জামা গায়ে রাতের ওষুধ খেয়ে বৈদ্যূতিক ব্ল্যাঙ্কেটের ওমে ঢুকে গেছি। কিন্তু ঘুম আসেনি। অনেক ক্ষন হয়েছে বাগানে ওদের হুল্লোর থেমে গেছে। টম হ্যারি ডিক ক্লারা... একে একে বিদায় নিয়েছে। ওদের চাবি ঘোরানোর শব্দ, ‘গুড নাইট’, তাও শুনলাম। যা হোক এবার নিস্তব্ধতা এল। এবার আমি লিখবো। এমন সুন্দর সময়ই আমার মাদক। প্রেমে পড়ার জন্য গোধুলির আলো, পরীক্ষা পাশের পড়ার জন্য সুবেহ সাদেক আর কবিতায় পড়ার জন্য হু হু অন্ধকার যামিনী।

লিখবো বলে ডাইনিং স্পেসে বসে পেছনের পারদহীন কাচে তাকিয়ে দেখি বিশাল ওক, শিশু নাস্পাতি গাছ আর শেয়ালের ফুটোজুড়ে কালোর ডিনামাইট ফুটছে। কালোর এ ম্যাজিকে মজা পেয়ে গেলাম। আজ রাতে কিছু একটা হবেই। সয়াদুধের চা বানিয়ে আমার খন্ডচিত্র সম্পাদনা করতে বসে গেলাম। আজাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। সরু প্যাসেজ দিয়ে ঘুমের শব্দ আসছে।

কি বোর্ডে লহড়া তুলেছি আর মাঝে মাঝে ব্লাইন্ডতোলা কাচের জানালার বাইরে অন্ধকারের ওক আর পীত পাইনের আউট লাইন দেখছি। পাশের ওল্ড হোমের কূঁচকানো আলো এসে পড়েছে। আবছা দেখা যাচ্ছে বাগানে পড়ে আছে তাদের কিছু তৈজস আর নেভানো কয়লা। আশ্চর্য ওরা তাহলে মাটিতেই আগুন জ্বেলেছিল। এখন সাধারণত মানুষ পোর্টেবল চুল্লিতেই এসব করে। একটি ব্যবহৃত বাদামী টিস্যূ পেপার আনকুকড মাংস খন্ডের মত বাতাসে উড়ছে। বাগানের বাতির বাল্ভ কি নষ্ট! হঠাৎ মনে হল আমার ঘাড়ের কাছের জানালায় কী যেন একটা সাদা থেবড়ে গেল। আমার হাত পা চোখ আর নড়েনা। কোন মতে তাকাতেই নির্ভার হলাম এ যে শার্লট! জানালার কাঁচে এমন ভাবে ওর মুখটা ঠেসে ধরেছে যে মনে হয় মুখটা থেতলে আছে। বেগুনী নেইল পলিশ মাখা নখে খুট খুট শব্দ তুলে ইশারায় বাইরে ডাকছে। যাক বাবা, স্বস্তি এল। দরোজা খুলে ডেকে নামতে না নামতে সে চলে গেল দূরে ঐ ওক তলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে তার কাছে যেতেই বলে, সো স্যরি, আই লস্ট মাই কী। বলেই কয়লা আর ছাই ঘাটতে লাগলো। অগত্যা আমিও ... ভাবা যায়! রাত তিনটা হবে। পেছনে গভীর এপিং ফরেস্ট, ডানে ওল্ড হোমের ঘুমন্ত মাথা কালো বাড়ি, বাঁয়ে হাফ ফিনিশড বাড়ির খোঁচা খোঁচা স্ক্যাফ্লডিং, মাথার ওপরে বাতাসে উড়ছে বাদামি মাংশ খন্ড। সামনে কিরিকিরির পর আমাদের আর তাদের ফ্ল্যাট। আমার ডাইনিং স্পেসে বাতি জ্বলছে, ওদেরটা অন্ধকার। সেই অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে পুডল যুগল বার বার তাদের কাচে আছড়ে পড়ছে। হায়রে দুই কুকুরের সে কি হাউ কাউ। পারলে ওরা কাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসে। সে ফিস ফিস করে বলে, মাই ডগস আর মাই বেবীস।

শার্লটের মেকাপ দেখা যায় না কিন্তু তীব্র আফটার শেভের মত ঘ্রাণ পাচ্ছি। আজ কি অন্য সুগন্ধী পরেছে? জামাটা এত লাল যে অন্ধকারেও জলন্ত অংগার। আমি চাবি খুঁজছি, একটু ঢিলা ভাবে কিন্তু সে খুঁজছে মাটি খেয়ে ফেলবে এমন। আমি জানি না চাবি রূপালী না হলুদ, চ্যাপ্টা না সরু, কী রিংএ না গুচ্ছে? কিছু খোঁজার আগে ঐসব প্রশ্ন করা উচিত ছিল। আমি করিনি। শার্লটের গায়ে যেন গ্লু, তার সঙ্গে লেগে থাকাই এখন জরুরী ব্যপার। একবার ভাবলাম আজাদ ঘুমভেঙে যদি আমাকে না পায়! লাঠি হাতে খুঁজতে খুঁজতে ঐ জানালা দিয়ে তাকায়। কি ভাববে সে! অন্ধকারে আমি আর শার্লট মাটিতে উবু হয়ে আছি এটাতো একদম স্বাভাবিক না।

আর ইউ স্কেয়ার্ড? মাটিতে মুখ রেখেই জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু উত্ত্র দেবার আগেই সাফাই গাইল জেমী ঘুমিয়ে গেছে বলেই আমাকে সে এই কষ্টটা দিচ্ছে। আর আমি জেগে না থাকলে তাকেই একা একা এই ভূতো অন্ধকারে চাবি খুঁজতে হত। তাইতো, আহারে জুলিয়া রবার্টস তুমিও তাহলে সঙ্গী পুরুষকে ভজ! এসময় লাল লাফিয়ে উঠে বলে, হিয়ার ইট ইজ! গট ইট, গট ইট! আর আমাকে নতজানু অবস্থায় রেখেই হাসতে হাসতে সেই কিরি কিরি ধরে দৌড় দেয়। আমি ওর পেছনে পেছনে কিন্তু ওকে ধরতে পারিনা। আফটার শেভ মিলিয়ে যায়। কোন দূরায়ত শব্দ বলে, থাঙ্কু। পেছনের বাড়ির ময়ূর ভাঙা কন্ঠে কেঁদে ওঠে।

ভেতরে পা দিয়েই বুঝি বাইরে কী ঠান্ডা ছিল। হবে না? এটা লন্ডন না! ভাগ্যিস পায়ে মোজা, গায়ে কার্ডিগান ছিল। শার্লটের গায়ে কি গরম জামা ছিল? না তো! সে শুধু হাতা কাটা লাল জামা পরা ছিল। যাকগে, এখন ওদের যৌবন, ওদেরতো খালি গায়েই যুদ্ধে দিয়ে টিকে যাবার কথা। আমি রীতিমত কাঁপছি। টাইমারে দেয়া হিটার উউ উউ করে উষ্ণতা বিলি করতে শুরু করেছে। সয়াদুধের ঘন চা শীতল হয়ে গেছে। গরম কফি খেতে হবে। ঘড়িতে বাজে সাড়ে তিনটা। সামারের সকাল হবে একটু পরেই। কফিজল কেটলী সরগরম করে জাল হবার সময় শুনি কুকুর দুটো কুঁই কুঁই করছে, যেন কারো কোলে মাথা ঘষছে। একটু আগে কি পাগলের মত ডাকছিল। আমি হাতের মাটি ধুয়ে একটি ভূতের গল্পে হাত দিলাম। কুকুরের অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে লিখবো।
==

মাস দু’মাস পর। চা বানিয়ে প্রথম আলোর লেখাটা শেষ করছি। চার্চের বেলে বুঝলাম রাত ৩টা হয়েছে। আমার স্টাডিতে লিখছি, গান শুনছি, চোখ বন্ধ করে আশে পাশের শুব্দ গুনছি। কোথা থেকে কি ঘ্রাণ আসছে তা ধরার চেষ্টা করছি। হঠাৎ নাকে এসে লাগে সে আফটার শেভ। ঠিক চাবি খোঁজার দিনের মত। ভাবলাম এ আমার অনুমান। দরজা খুলে পরখ করবো নাকি? আমার আবার অনুমান নিয়ে নিজের নিজের একটা খেলা আছে। তার নাম হতে পারে অনুমান ও অনুসরণ। আমি যা অনুমান করছি তা আসলে কতটুকু সত্য হতে পারে তা অনুসরণ করা আরকি। পথে ঘাটে, ট্রেনে, টিউবে এটা খেলি। যেখানে যে অবস্থায় আছি এক সেকেন্ড সময় চোখ বন্ধ করে নিজের চারপাশের ঘ্রাণ, শব্দ, আর সিক্সথ সেন্স দিয়ে একটা সম্ভাবনা নির্মান করি- একটা ভিজুয়াল তৈরি করি। আর পর মুহুর্তেই চোখ খুলে তা মিলিয়ে নিই। আমার স্টাডির লাগোয়া আমাদের প্রবেশ দরোজার সঙ্গেই জেমী-শার্লটদের দরোজা আর তার পাশে টকিং লিফট। কোড টিপে অথবা ইন্টার কমে কথা বলে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতে হয়। আমি সব সময় আড়ি পেতে মানুষের চাবি, হিল আর ট্রলির চাকার শব্দ শুনে শুনে অনুমান করি কে আসে যায়। দরোজাটা খুলবো কি খুলবো না, কুকুগুলো মহা হৈচৈ করছে। পা টিপে টিপে উঁকি দিয়ে স্পাই হোলে চোখ দিতেই লালে পুরো ফুটো ভরে যায়। ব্যপার কি, এত রাতে কি করছে সে এখানে? খটাস করে চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা খুলতেই শার্লট একদম অপ্রস্তুত। ফিস ফিস করে বলে, স্যরি স্যরি আই ওয়াজ এ্যাবাউট টু নক। কি হয়েছে? খারাপ কিছু? না। মিষ্টি কিন্তু সেরকমই অপ্রস্তুত হাসিতেই বলে, ক্যান ইউ কাইন্ডলি ডু মাই জিপার প্লিজ! শিওর! বললাম বটে তবু একটু অবাক হলাম। সে আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বাঁ হাতে চুল গুছিয়ে উপরে তুলে দাঁড়ালো। ওর জামার পেছনে জিপার টেনে দিতে হবে।

আচ্ছা, এসব ব্যক্তিগত কাজ তার বয়ফ্রেন্ড জেমীর করার কথা না? ভাবা মাত্রই যেন সে শুনতে পেয়েছে এমন ভাবে বলে ওঠে, জেমী ইজ’নট হোম। তাই হবে। এদিকে ওদের দরোজার ভেতর থেকে কুকুর দুটো যুদ্ধে লেগে গেছে। শার্লট ফিসফিসিয়ে বলে, মাই বেবীস, মাই ডগস। আমি ওর ভিষন টাইট জামাটার জিপার টানতে গিয়ে টাইট লাগলো না। এ মেয়ের গায়ে কি হাড়গোড় নেই। টানার সময় সে কেমন দলা একরত্তি দলা হয়ে গেল আর জিপারটা টেনে দিতেই দেহ স্বস্থানে চলে গেল। থাঙ্কু শামীম। চোখ নাচিয়ে হাতের সেই আগুনে পোড়া চাবিটা দেখিয়ে দরজা খুলে টুক করে ঢুকে গেল। কুকুররা আবার কুঁই কুঁই।

=

ব্যপারটা কি! ওদের ঝগড়া চলছে নাকি। কে জানে? দেখি, এ রোব বারে চা খেতে যাবো। কিন্তু তার আগেই একটা ঘটনা হল কাল। গরম ছিল বলে পেছনের কাচের দরোজা , জানালা খুলেই ডাইনিং স্পেসে কম্পূটার নিয়ে বসেছি। যথারীতি অনেক রাত। লেখা শুরু করার আগে একটু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম “ধারনা (আইডিয়া) কে বিশ্বাস (বিলিফ) ভাবা ঠিক না। মস্ত ভুল। “ দিতেই দেখি ফটাফট লাইক আসতে লাগলো। আর টুন টুন করে ইন বক্সে মেসেজ। ক্যানাডা থেকে টুক্লা। ওর এখন সন্ধ্যা। তারপরই বাংলাদেশ থেকে ঈশিতা। মা ঘুমোওনি যখন একটু স্কাইপ খোলনা, তোমাকে দেখি। আমার অফিসে আজ দেরিতে যাচ্ছি।

আমি যে রাত জাগি তা ফেইসবুকের জন্য অনেকেরই জানা। লিখি আর যাই করি মাঝে মাঝে ফেইস বুকে টুকটাক কমেন্ট করি। আমার কন্যা ঈশিতা প্রায় তিন বছর হল বাংলাদেশে। আমরা মাঝে মাঝে স্কাইপে কথা বলি। বেশি সময়ই আজাদের স্বাস্থ্য নিয়ে। স্কাইপ খোলার পর কিছুক্ষন কেমন আছ, ভাল আছি, এসব চলে। এদিন এসব শেষে সে বলে, মা তোমার পিঠের পেছনে কে? সামাহা? আরে নাহ কেউ না , সামাহা আসবে পরের উইকে, গরমতো জানালা খোলা। ওহ, মনে হল যেন লাল জামা পরা কেউ দাঁড়িয়ে ছিল, এখন নেই। আরে দূর কি বলিস, এখন রাত না, কে থাকবে এখানে। ও আচ্ছা।

তারপর দ্রুত কথা শেষ করেই লাফিয়ে কাঁচের দরোজা বন্ধ করি। জানালা লাগাতে চেয়ার বেয়ে উঠি। লাগাবার মুহূর্তে বাইরের শেষ খন্ড আফটার শেভ নাকে ছুড়ে দেয়। আমার ভয় জাগে। তবু কী এক অপ্রতিরোধ্য টানে এদিক থেকে বাগানে তাকাই। দেখি ব্রাউন সাহেব শুন্যে ভেসে যাচ্ছে...

সব বাতি জ্বলানো অবস্থায়, কম্পুটার খোলা রেখেই দৌড়ে আজাদের ঘরে গিয়ে ওর পেছনে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ি।
=

আজ রোববার। নাস্তা শেষে জেমীদের ফ্ল্যাটে যাবো, ব্যপারটা কি? মুখ ধোবার উঠে দাঁড়াতেই পেছন থেকে আজাদ বলে, তোমার পিঠে কিসের এত দাগ? মানে? আমি অবাক হয়ে যাই। দাগ হবে কেন? আজাদ এবার বেশ জোর দিয়েই বলে, আরে বাথরুমে গিয়ে পেছনে আমার ছোট আয়নাটা দেখনা। মনে হয় যেন কেউ নখ দিয়ে খামচিয়েছে। দেখলাম, অবাক হলাম, ভাল পেলাম।

জেমী দরোজা খুল্ল। দৌড়ে এল পুডল যুগল। শার্লট স্নান করছিল, বেরিয়ে এল, আমি ফলের গন্ধ পেলাম। সব বললাম। ওরা আমাকে পাগল ভাবলো না। তড়িতে একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে বল্ল, উই মাস্ট চেঞ্জ আওয়ার লক।

=

সুজান শার্লটের যমজ বোন ছিল। সুজানেরই প্রেমিক ছিল জেমী। আমরা এখানে আসার আগেই ওরা দুটো কুকুর নিয়ে এই ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে। কয়েক বছর আগে এক সাত জুলাইতে লাল জামা পরে অফিসের যাত্রা পথে আন্ডার গ্রাউন্ড এ টেররিস্ট বোমা হামলায় সে মারা যায়। শার্লট তখন বোনের কুকুরগুলোকে দেখাশোনা করতে এখানে আসতে শুরু করে। ওভাবেই তাদের প্রেম এবং পরে এক সঙ্গে থাকা। এখন ওরা বিয়ে করবে। ক’মাস আগে পার্টির দিন ঘরের চাবি হারিয়ে গেলে ওরা নতুন চাবি বানিয়ে নেয়। কিন্তু সেদিন থেকেই তাদের কুকুরেরা মাঝে মাঝেই অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ঘরের জিনিস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। রাতে ঘুম ভাঙছে কফি মেশিনের শব্দে...

উই আর রিয়েলি স্যরি শামীম... বলে জেমী আমাকে হাল্কা একটা হাগ দেয়। স্যরি এ্যাবাউট অল দ্যাট।
=
ঘরে ঢুকেই মনে পড়লো পিজিওন হোলে ক’দিন আগে আসা একটা ফ্রি পোস্ট এর কথা। আজই, এ রোববারেইনা পার্কের কাছে হোমসডেল শেলটার্ড হোমের ওপেন ডে। ওদের এক বেডরুমের ফ্ল্যাটগুলোর ছবি ভারি সুন্দর। আমাদের ফ্ল্যাট ছাড়তে হবে।

--------------

৫।৬।১৩

লন্ডন


পরিচিতি
শামীম আজাদ
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। কবিতা,অনুবাদ সংকলন, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও নাটক সহ গ্রন্থ সংখ্যা ত্রিশের ওপর। তৃতীয় বাংলা বলে খ্যাত বিলেতে তিনি বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত।
সাপ্তাহিক বিচিত্রা-বাংলাদেশ, ইয়ার অব দা আর্টিস্ট-লন্ডন আর্টস কাউন্সিল, সংহতি সাহিত্য, সংযোজন পুরষ্কার, সিভিক এওর্য়াড, চ্যানেল এস এবং হুস হু এওর্য়াড-লন্ডন পুরুষ্কার লাভ করেছেন।

1 টি মন্তব্য: