শুক্রবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৪

অরিন্দম বসুর গল্প নক্ষত্রের রাত

এইসব তারা সে নিজের হাতেই লাগিয়েছিল আকাশে। না, আকাশে তো নয়। আকাশ নয় ওটা। ঘরের সিলিং। ওই সব তারাই নকল। ফ্লুরোসেন্ট কাগজ সাঁটানো আসলে। দিনের বেলা আবছা হয়ে থাকে, রাতে শোয়ার সময় ঘরের আলো নিভলেই একসঙ্গে ফুটে ওঠে সকলে। যেমন এখন উঠেছে আর অন্ধকারের মধ্যে মশারির ভেতর দিয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রঙ্গন। এ হলো তাদের নিজেদের আকাশ।
তিস্তা খুব খুশি হয়েছিল অতো তারা পেয়ে। তাদের চার বছরের মেয়ে। প্রথম প্রথম তাকে পাশ ফিরিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলেও সে ঘুরে গিয়ে সোজা ওপরদিকে তাকিয়ে থাকত। মোহনা গলা তুলে বলত, ‘শোও, শুয়ে পড়ো তিস্তা, কাল সকালে স্কুল আছে কিন্তু।’

এখন আর ওদিকে দেখে না তিস্তা। পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। এখন রঙ্গন তাকিয়ে থাকে মাঝে মাঝেই। যেমন আজ তাকিয়ে রয়েছে। ‘আজি যত তারা তব আকাশে... সবে মোর প্রাণ ভরি প্রকাশে...’ এই গান কি সে গুনগুন করে উঠেছিল? বছরখানেক আগে? এই তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে? মিহি সবুজ আলোর ঘরের ভেতর ভাসতে-থাকা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে? একরকমের সবুজ আলো ছড়িয়ে রাখে ওই তারারা মিলে। অথচ সব মিলিয়ে গোটা একটা জোনাকির চেয়েও কম। জোনাকি তো আজকাল আর দেখাই যায় না। এই তিনতলায় কবে যেন একটা ঢুকে পড়েছিল জানালা দিয়ে। মনে নেই। এই গান কি গেয়েছিল রঙ্গন? মনে নেই।
জানালা দিয়ে হাওয়া এসে মশারি ফাঁপিয়ে তুলল। এলে ভালো লাগে। এই উত্তরদিকের দেয়াল-ঘেঁষে শোয়ার বন্দোবস- সে নিজেই বেছে নিয়েছে। পাশে মেয়ে। তার ওদিকে মোহনা। তার গরম বেশি বলে পাখার নিচে। রঙ্গনের দিকে পাখার হাওয়া জোর ফুরিয়ে ফেলে। মশারি ঘষটে যাচ্ছে বাঁ-হাতে, প্রায়ই যায়। মশা যেদিন কামড়ায় সেদিন কনুই, কাঁধে লাল ফুসকুড়ি গজিয়ে ওঠে। উঠুক। ভালো ঘুম হলে এসবে কী আসে-যায়। কিন' ঘুম না এলে পরপর এসব ঘটনা টের পাওয়া যেতে থাকে।
‘অফিসে কিছু বলল?’ মোহনা গলা নামিয়ে রেখেছে। মেয়ের ঘুমের ভেতর যেন তার কথা ঢুকে না পড়ে। কিন্তু রঙ্গন জেগে আছে সে বুঝল কী করে? তার খোলা চোখ দেখতে পাচ্ছে সে?
‘ঘুমিয়ে পড়েছ কি তুমি?’
ঘুমিয়ে থাকলে এ-প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা নয় রঙ্গনের। জবাব না-পেলে মোহনা ধরে নেবে রঙ্গন ঘুমিয়েছে। অথচ মোহনা জেনেশুনেই জানতে চাইছে।
‘কী বলবে অফিসে?’ এতক্ষণ মেলে রাখা চোখের পাতা এবার, কথা বলার সময়, নামিয়ে আনে রঙ্গন। চোখ বুজে কথা বলতে আরাম লাগে। অন্ধকারেও। একটা কথা ভাবল সে। আলোতে তো চোখ বুজে কথা বলে না কেউ। অন্ধকারে যখন চোখ বন্ধ না করলেও চলে তখন কেন সবাই চোখ বুজে কথা বলে? আশ্চর্য! এরকম কি দেখেছে রঙ্গন? হ্যাঁ, কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে আধশোয়া হয়ে দেখেছে। কাকে? মনে হয় অনেককেই। মোহনাকেও। দেখবে এখন? না, জানাই আছে। ‘হ্যাঁ বা না কিছুই বলছে না?’
‘না, বলছে না।’ কথাগুলো এমনভাবে গলায় চেপে বসিয়ে দেয় রঙ্গন যেন মনে হয় রাগ ছোঁয়াচ্ছে মোহনাকে, যার কোনো কারণ নেই। না কি মোহনা জানতে চাইছে বলেই তার রাগ? তাই যেন সে আবার বলে, ‘কাজের পর কাজ চাপিয়ে যাচ্ছে। অসম্ভব প্রেশারে রাখছে। অথচ এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন কাজ তেমন নেই।’ ‘চাকরিটা থাকবে কি না তুমি বুঝতে পারছ না?’
এই কথায় প্রায় আধাআধি উঠে পড়ল রঙ্গন। ‘শুধু আমি নই, অন্য স্টাফদেরও কেউ কিছু জানে না। বলেছি তো তোমায়। দুমাস আগেই আটজনকে ছাঁটাই করে দিলো। ওরা আমাদের মতো পুরনো নয়। পুরনোদের মধ্যে আছি শুধু আমি আর বম্বের পুণীত। পুণীতেরও তো দুটো ছেলেমেয়ে, বম্বে থেকে ওকে এখানে ট্রান্সফার করেছে এক বছর হয়ে গেল। ওখানকার অফিসটা কিন্তু ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে। রিসেশনের যত কোপ আমাদেরই ঘাড়ে।’
বলতে বলতে আবার গা ছেড়ে দিয়ে বালিশে মাথা রাখতেই এবার যেন স্পষ্ট করে মনে হলো পুণীতের কথা। সে যখন ট্রান্সফার হয়ে এখানে এলো তখন রঙ্গনই তাকে ভাড়ার ফ্ল্যাট দেখে দেয়। সেখানেও কি আজ রাতে তারই মতো জেগে রয়েছে পুণীত? তারও কি ঘুম আসে না রোজ? তার বউও কি এভাবেই জানতে চাইছে চাকরির ভবিষ্যৎ? কিংবা অন্য কোথাও? পৃথিবীর অন্য কোনো কোণে? কেউ?
মোহনা মেয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পাশ ফিরে যায়। ঘাড়টা অল্প নড়ে ওঠে। মোহনা বলতে থাকে - ‘মাস পড়লেই কল্পনাদির মাইনে, জমাদারের টাকা, চালের দোকানে বললেই তো দশ কেজি দিয়ে চলে যায় - তার টাকাও তো দিতে হবে, তিস্তার স্কুলের মাইনে, পুল কারের টাকা - এ সমস্তই তো ফ্ল্যাটের লোনের টাকা কেটে নেওয়ার পর দিতে হচ্ছে, সংসার চালানোর খরচ তারপরেও কম নয়।’
এবার রঙ্গনও পাশ ফেরে। ‘প্রতিদিন একই কথা কেন বলো? আমি কি জানি না এসব? একই পিন দিয়ে খুঁচিয়ে চলেছ রোজ। আমি তো ইচ্ছে করে পরিসি'তিটা তৈরি করিনি। ঠিকই তো চলছিল এতদিন। হঠাৎ করে এরকম হবে জানব কী করে। কিন' আমার চাকরিটা তো যায়নি এখনো। মাইনেও তো দিচ্ছে। মরে তো যাইনি আমরা আজো।’ বলে থামতেই রঙ্গনের মনে হয় সে কি এরমধ্যে কোনো কবিতার লাইন উচ্চারণ করল? যেন মনে হচ্ছে বলেছে। কোন কবিতা? কবিতা আসে কেন এখানে?
‘আসে- কথা বলো, মেয়ের ঘুম ভেঙে গেলে কাঁদতে থাকবে। আমি একই কথা রোজ বলি না তোমায়। বললেও বাধ্য হয়ে বলতে হয় কারণ সংসারের সমস- হিসাব করে আমাকেই সামলাতে হয়। মাইনে যদি বন্ধ হয়ে যায়? এত খরচ কোথা থেকে সামলাবে? ইএমআই দিতে না-পারলে ব্যাংক ফ্ল্যাট নিয়ে নেবে না?’
জানে, রঙ্গন নিজেও সবই আঁচ করে; কিন্তু অন্য কাউকে বলতে পারে না। মোহনার সঙ্গে কথা বলতেও ভালো লাগে না তার, বরং মোহনা এসব নিয়ে কিছু বললেই ভেতরের তাপ বেরিয়ে আসতে থাকে। পালটা কথাগুলো তাই মেয়েকে টপকে ওপাশে পাঠাতে হয়। ‘ও-বাড়ি ছেড়ে কেন তাহলে আসতে বললে ফ্ল্যাটে? আরো কিছুদিন পরেও তো কেনা যেত। লোনটা ঘাড়ে চাপত না। এখানে ঢুকতে গিয়েও কতগুলো টাকা খরচ হলো। ও-বাড়িতে বাবা-মা শুকনো মুখ করে ঘুরে বেড়ায়। বাবার পেনশনের টাকা আছে বলে ওখানে কিছু দিতে হয় না। তা না হলে তো -’
‘বাজে বলো না। তোমাদের ওই বাড়ির জয়েন্ট ফ্যামিলি নামেই জয়েন্ট, ভেতরে তো ভেঙেচুরে গেছে। দিনরাত এর সঙ্গে ওর খিটখিট, তোমার মেজো বউদির চারটে বেড়াল বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছে, লোম উড়ছে, দোতলায় যাওয়া যায় না, সেখানে একটা বিরাট কুকুর। তোমার বাবা-মা আর ভাইয়ের জন্যে একটা ঘর, পাঁচ বছর আগে বিয়ের সময় তুমি একটা ঘর বানালে, তার অ্যাসবেস্টস চুঁইয়ে জল পড়ে। আমি পেছনে লেগে ছিলাম বলে তো এই ফ্ল্যাটটা কেনা হলো। তাও কিছু বলিনি, মেয়ের তিন বছর পর্যন- তো ওই বাড়িতেই ছিলাম। তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে একদিনের জন্যও কোনো খারাপ ব্যবহার করেছি? আমাদের এখানে আসাটা কোনো দোষের নয়, এই চাকরিতে তুমি যে এতকিছু সামলাতে পারবে না সেটা বুঝিনি।’
‘এই চাকরিতে মানে? আমি সফট্‌ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরেও তো তোমার বাবা ভাবতেন আমি তার মেয়েকে খাওয়াতে পারব না। পাঁচ-ছ’ বছর আগে আমার যা সেলারি ছিল সেটা থ্রি টাইমস বেড়ে গেছে।’ চোখ খোলা ছিল রঙ্গনের, অনেক আগে থেকেই, দেখতে পেল সে মোহনা উঠে বসেছে, হাঁটুতে চিবুক, ম্যাক্সিতে টান পড়েছে বলে পিঠের অনেকটা মোলায়েম সাদা বেরিয়ে এসেছে।
‘মাইনে শুধু বাড়লেই হয় না, চাকরিটা পারমানেন্ট থাকাও দরকার। রোজ যদি ভাবতে হয় কালকের দিনে কী হবে তাহলে কি বেঁচে থাকা যায়?’
না, রঙ্গন রাগ করবে না, বরং ভাববে সে খুব ঠান্ডা, খুব শান্তভাবে সব কথা বলে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। সে জ্বলজ্বলে তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে - ‘এটা হঠাৎ একটা অ্যাবনরম্যাল সিচুয়েশন এসে পড়েছে মোহনা। শুধু আমাদের এখানে তো নয়, পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই। শুধু আমরা তো সাফার করছি না। আমরা তো এখন জুড়ে গেছি পুরো পৃথিবীর সঙ্গে।’ বলতে বলতে রঙ্গন কপালের ওপর ফেলে রাখা হাত সরিয়ে আনে। চোখ সরিয়ে সরিয়ে সব তারা যেন একটা একটা করে দেখতে চায়। এটুকু জায়গাই তো ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না সে। পুরো পৃথিবী বলতে তো অনেকটা আকাশ, অনেকখানি জায়গা বোঝায়। সেই আন্দাজ কি ঠিক করতে পারে সে? হাঁকপাঁক করে ওঠে না ভেতরটা? সে মোহনাকে বলতে চায় - আমরা মন্দা তৈরি করিনি মোহনা। পৃথিবীর অন্যদিকে ওরা তৈরি করেছে, ওদের রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা মার খেয়েছে, ওদের ব্যাংকগুলো ধার দেওয়া টাকা আদায় করতে পারেনি, ওদের কোম্পানিগুলো ফেল মেরে গেছে, ওরা ঘায়েল হয়েছে আর আমাদেরও ঘায়েল করেছে। এর সঙ্গে জুড়ে আছে শেয়ারবাজার, ইন্ডাস্ট্রি, ব্যবসা। ইকোনমিস্টরা মাথা ঘামাচ্ছে। কত বড় একটা ব্যাপার! আমি তো একটা নাটবল্টুও নই সেখানে। আর দু-একটা স্ক্রু বা নাট খুলে গেলেও ওদের কিছু যাবে-আসবে না। পড়তির বাজারে কাউকে না কাউকে তো পড়তেই হবে।
নিচে রাস্তায় একটা কুকুর চেঁচাচ্ছিল এতক্ষণ। কটা বাজছে কে জানে। ছোট দেয়ালঘড়ির চেহারাটা বোঝা গেলেও কাঁটা দেখা যায় না অন্ধকারে। মোহনা মুখ ঘোরাল রঙ্গনের দিকে। ‘হঠাৎ কী হলো বলো তো? রিসেশন এরকম হয়? কেন হচ্ছে এমন? তোমাদের চাকরিতে কোনো প্রোটেকশন নেই?’
এতক্ষণ যে-কথাগুলো মোহনাকে মনে মনে বলছিল রঙ্গন, সেসব আর মুখে এলো না। তার বদলে শব্দ করে দেয়ালের দিকে ফিরতে ফিরতে ঝাঁঝে সে বলে উঠল - ‘খবরের কাগজটা পড়ো না কেন? সব জানতে পারতে। আমার সঙ্গে এত কথা বলতে হতো না। কাগজটা পড়ো।’
ঘুমন্ত তিস্তা উঁ-আঁ করে রঙ্গনের গায়ের কাছে সরে যাচ্ছিল, পা ছুড়ল একবার। মোহনা তাড়াতাড়ি ঠেলে দেওয়া কোলবালিশ চেপে দিলো মেয়ের পায়ের ফাঁকে।
গলি বেয়ে কোনো গাড়ি আসছে। সে তার হেডলাইটের আলো দূর থেকে একবার বুলিয়ে নিল তিনতলার এই ঘরেও। পেছনে না ঘুরেও রঙ্গন জানে দেয়ালে জানালার গ্রিলের প্রকাণ্ড ছায়া। মোহনা শুয়ে পড়েছে বোধহয়। মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে রোজ ভোর ৫টায় উঠতে হয় তাকে। কাগজ পড়ে মন্দার কী বুঝবে মোহনা? গোড়ার দিকে কোম্পানি বন্ধ হওয়ার আর চাকরি যাওয়ার খবর থাকত। লোকের আহা-উঁহু থাকত। এখন বিশ্লেষণ থাকে। ভবিষ্যতের মাঠে প্রচুর আশার ফলন ঘটবে - এমনই বলা হয়ে থাকে।
গেল রোববার অনিন্দ্যর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বন্ধুদের আড্ডা আছে একটা চায়ের দোকানে, রোববার করে অনেকেই সেখানে বেঞ্চে পা দোলায়। ইদানীং যাওয়া ছেড়ে দিলো রঙ্গন। গেলেই অফিসের কথা উঠবে। তবু বাজার সেরে ফেরার পথে অনিন্দ্যর মুখোমুখি।
‘কী রে! চোখের নিচের চামড়ায় ভাঁজ ফেলে দিয়েছিস, গোঁফের চুল পেকে গেছে কত, মাথার চুলও তো তোর এতো পাকা ছিল না, কী করেছিস কী চেহারাটা!’
রোজই দাড়ি কামিয়ে অফিসে যেতে হয়, তবু আয়নায় নিজেকে এতটা খেয়াল তো করেনি রঙ্গন। সে হাসে। বলে ‘আমাদের ওদিকের জলটা খারাপ। চুল পাকিয়ে দেয়, গায়ে দাগ ধরিয়ে দেয়। তুই বত্রিশের মতোই আছিস।’
‘বাজে বকিস না। ওই একই জল তো আমাদের ওখানেও যায়। এত চিন্তা করছিস কেন চাকরি নিয়ে?’ অনিন্দ্যর চাকরি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সামলায়। ওরা একটার পর একটা কলেজ খুলছে। চাকরি যাবে না ওর। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার সময় কেউ মন্দার কথা ভাবে না। ভবিষ্যৎ সোনালি সেখানে। রঙ্গন তাকিয়ে ছিল অনিন্দ্যর দিকে। ‘চিন্তা করব না বলছিস? যে-কোনো দিন হ্যান্ডশেক করে বলবে - এসো।’
‘অন্য জায়গায় অ্যাপ্লাই কর।’
‘করেছি দু-একটা, কিছু হয়নি, হওয়া খুব মুশকিল। এখানে কাজ করতে করতে আমি তো সেভাবে চেষ্টাও করতে পারছি না। আর এরা যদি জানতে পারে তাহলে আরো আগেই বের করে দেবে। সবদিকেই আটকে গেছি।’ ‘তোদের তো বড় কোম্পানি, প্রজেক্ট বেইসড কাজও তোরা করিস না যে তার ওপর তোদের চাকরি টিকে আছে। রেগুলার ক্লায়েন্ট আছে, তোদের বানানো সফটওয়্যার প্রোগ্রামের দামও আছে মার্কেটে। সবদিক থেকে ওয়েল প্রোটেকটেড। তাহলে?’
‘ওই তাহলেটা নিয়ে আমিও তো বসে আছি।’
‘না, আসলে কী হচ্ছে বল তো? এই রিসেশনের সময়টাতে বিভিন্ন কোম্পানির কাজের পেমেন্ট ডিলেড হয়ে যাচ্ছে। এক কোটি টাকা পাওয়ার কথা হয়তো ছ’মাসে, সেটা পেতে পেতে বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। ক্লায়েন্ট কোম্পানিগুলো মন্দার কারণে টাকা পেমেন্ট করতে পারছে না ঠিকমতো, আর টাকা রিকভার না হলে যে-কোম্পানি কাজ করেছে সে ব্যাংক ফান্ডিংয়ের ইন্টারেস্ট গুনতে চাইছে না, স্টাফ ছাঁটাই করে দিয়ে খরচ বাঁচাতে চাইছে। ওসব মন্দা-ফন্দা বাজে কথা। পুরো ব্যাপারটা রিসেশনের নাম করে চালিয়ে দেওয়ার ধান্ধা। একেবারে কোনো এফেক্ট হয়নি তা নয়, কিন্তু সব জায়গায় হয়নি, যাদের হয়নি তারাও এই সুযোগে কম লোক দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নিচ্ছে। চাকরি বাঁচাতে চাইলে মুখ বুজে তাই করো, নয়তো কাটো। এটা যে-কোনো দিন যে-কোনো সময়ে হতে পারে। এখন একটা ইস্যু পাওয়া গেছে, এই যা। এরা দিতে দিতে কবে কেড়ে নেবে কেউ জানে না।’
রঙ্গন বলেছিল, ‘সকাল ন’টায় অ্যাটেনডেন্স করে দিয়েছে, বেরোতে বেরোতে আবার সাড়ে আটটা-ন’টা, কিচ্ছু বলার উপায় নেই। মুখ বুজেই আছি। মাসের শেষে অনেকগুলো টাকা লাগে। একটু এদিক-ওদিক হলে একদিনও চলবে না। টিকে থাকতে হলে যা করার করতে হবে।’
রঙ্গনের এসব ভাবনার ভেতরে, সে জানে না কখন, মোহনা আধাআধি উঠে তাকে দেখছিল। এখন সে মেয়েকে টপকে ওপাশে চলে গেল। হালকা করে শরীরটাকে তার ওপর ছেড়ে দিয়ে মাথা রাখল রঙ্গনের বুকে। চোখ খোলেনি রঙ্গন, শুধু দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল মোহনার পিঠ। গভীরভাবে মোহনা ঠোঁট ডুবিয়ে দিচ্ছে তার ঠোঁটে।
‘আমি জানি, তোমার অনেক চিন্তা, তুমিও ভাবো খুব, আমি কী করব বলো? তোমায় ইরিটেট করি না কিন' আমারও তো বলতেই হয়।’ রঙ্গনের চুলে বিলি কাটছে মোহনা। তার ঠোঁটের ফিসফিস কথাগুলো যেন রঙ্গনের কানে নয়, ঠোঁটেই পৌঁছে যাচ্ছে। ‘কতদিন তোমার বুকে মুখ রাখতে দাওনি বলো তো আমায়’ - রঙ্গনের বুক থেকে বড় শ্বাস যেন শুষে নেয় মোহনা। ‘আমায় আদরও করোনি কতদিন।’
জানালা খোলা থাকলেও আর আশেপাশে বাড়ি থাকলেও অন্ধকারে কে আর কার জানালায় চোখ ভাসিয়ে রাখতে যাচ্ছে। তিস্তাকে সামান্য সরিয়ে রঙ্গনের পাশে শুয়ে পড়ে মোহনা।
‘এসো, আমার এখানে এসো।’ মোহনা নিজেই ম্যাক্সির বোতামগুলো খুলে পর্দার মতো সরিয়ে দিতেই ভেসে ওঠে সাদা স-ন। চেনা নরম জায়গায় রঙ্গন নিয়ে যায় নিজেকে। মুখ নিচু করে মোহনা বলে, ‘দেখি কেমন তুমি পাগলামি করো’, হেসে ওঠে।
মোহনার বুকে এলোমেলো মুখ ঘষতে ঘষতে রঙ্গন বুঝতে পারে তার স-ন ঈষৎ শক্ত হয়ে উঠেছে। সে মোহনার নরম ঠোঁটে পৌঁছে যায় আবার। তারপর পায়ের কাছ থেকে টান দিয়ে ম্যাক্সি তুলে দেয় কোমরের ওপরে। চিরপরিচিত নাভিতে গরম নিশ্বাস। হাঁচড়-পাঁচড় করে প্যান্টি নামাতে থাকে রঙ্গন। তখনই মোহনা তাকে থামায়। রঙ্গনের হাত টেনে নিয়ে আবার নিজের বুকে রাখে।
‘এই ওরকম করো না, ওটা নয়, এমনি আদর করো।’ ‘কেন?’ মোহনার বুক থেকে হাত তুলে নেয় রঙ্গন।
‘এখন কিছু করলে বিপদ হতে পারে, সেফ পিরিয়ড কিনা আমার ঠিক মনে নেই, দিন মনে করতে পারছি না, যদি গুনতে ভুল হয়!’
‘কিছু হবে না, ভুল হয়নি তোমার, ভুল তো হয় না তোমার।’ রঙ্গন পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে অর্ধেক টেনে নামানো প্যান্টি ঠেলে দিতে থাকে নিচের দিকে। একইসঙ্গে পাজামার দড়িতে টান দিতে ফট করে খুলে যায়। ‘না না’। কোমর সরিয়ে নেয় মোহনা। ‘এরকমভাবে হয় না, কিছু হয়ে গেলে খুব গোলমাল হয়ে যাবে। এমনিতেই তোমার কাজের ঠিক নেই এখন।’ রঙ্গন বুঝতে পারে তার কঠিন শরীর ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। নিভে আসছে তাপ। মোহনার মসৃণ ভরাট ঊরু থেকে নিজের লোমশ পা সরিয়ে নিয়ে সে বলে, ‘তাহলে এলে কেন?’ ‘আমি এমনি আদর পেতে চাইছিলাম, সবসময় শেষ পর্যন- যেতে হবে?’ রঙ্গন চুপ করে যায়। গা ছেড়ে দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে থাকে। মোহনা তার দিকে ফেরে। ‘তোমার কাছে প্রোটেকশন নেই?’ মোহনার স-ন ও তার খয়েরি বৃত্ত একেবারে রঙ্গনের মুখের সামনে। যেন সে ছ্যাঁকা খায়। কনুইয়ে ভর দিয়ে তোলে নিজেকে। ‘প্রোটেকশন!’
‘হ্যাঁ, নেই কিছু?’
পাজামার দড়িতে ফিরে গিঁট দেয় রঙ্গন। বালিশে মাথা রাখে। মোহনাকে বলে, ‘ওদিকে যাও, আমি শোব। না, কোনো প্রোটেকশন নেই আমার কাছে।’
‘ব্যবস্থা রাখ না কেন? দরকার পড়লে -। তোমারই তো অসুবিধে। থাকলে তো -।’
ম্যাক্সির বোতাম আটকাচ্ছে এখন মোহনা।
দুই পায়ের মাঝখানে হাত রেখে পা গুটিয়ে আনে রঙ্গন। কুঁকড়ে শুয়ে থাকে। মোহনা তার জায়গায় ফিরে গেছে। বিড়বিড় করে বললেও তার কথাগুলো রঙ্গন শুনতে পায় ঠিকই।
‘এই যেমন হলো, যদি সব ঠিক হয়েও যায়, আবার যদি হয় এরকম! চলতেই থাকে যদি। হয়তো শুরু হয়েছে এখন।’ রঙ্গন সোজা হয়ে শোয়। মেয়ের সুন্দর শান্ত নীরব নিস্তব্ধ মুখে দেখে একবার। তারপর উঁচুতে তাকায়, এইসব তারা সে নিজের হাতেই লাগিয়েছিল আকাশে। না, আকাশে তো নয়। আকাশ নয় ওটা। ঘরের সিলিং। ওইসব তারাই নকল। দিনের বেলা আবছা হয়ে থাকে, রাতে শোয়ার সময় ঘরের আলো নিভলেই একসঙ্গে ফুটে ওঠে সকলে। ঠিক আসল তারার মতোই। একটু একটু করে সে এসব বানিয়েছে, জুড়েছে, লাগিয়েছে। এই আকাশের নিচে শুয়ে থাকতে থাকতেই কতবার ভেবেছে আমরা সুখী হয়েছি। এই আকাশ যদি ধসে পড়ে? বা মিলিয়ে যায়? কোনো প্রোটেকশন তো নেই। রাত কতটা গভীর হয়েছে এখন? রাতের কোন সময়ে তারারা মুছে যেতে থাকে আকাশ থেকে? রঙ্গনের চোখ বুজে আসতে থাকে। সে চোখের পাতা খোলা রাখার খুব চেষ্টা করে। তারাগুলো কি একটা একটা করে আবছা হয়ে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে? রঙ্গন তার নিজের আকাশের মৃত্যুদৃশ্য দেখতে চায় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন