বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

নীহারুল ইসলামের স্মৃতিচারণ : আমাদের রাজা আমার অভিভাবক --সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

যে তিনটি ছোটগল্প না পড়লে আমি হয়ত ছোটগল্প লেখার কথা কখনোই ভাবতাম না তার মধ্যে অন্যতম গল্পটি হল সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘গোঘ্ন’। ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ আনন্দ প্রকাশিত 'রানীঘাটের বৃত্তান্ত' গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প। বইটি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন আমার মাস্টারমশাই শ্রী অলক সান্যাল মহাশয়। এক আশ্চর্য ঘোরের মধ্যে আমি ওই সংকলনের প্রতিটি গল্প পড়ে ফেলেছিলাম। ‘রানীঘাটের বৃত্তান্ত’, ‘উড়ো চিঠি’, ‘পোকামাকড়’...


ওই গ্রন্থের উৎসর্গ পত্রে লেখক লিখেছিলেন, “প্রয়াত নেজের আলি ওরফে কটা শেখকে, যাকে 'গুরুজি' বলে ডাকতাম, কারণ, সেই নিরক্ষর মেঠো মানুষটিই ছেলেবেলা থেকে প্রকৃতির পাঠশালায় আমাকে পড়িয়েছিল, জীবন্মৃত্যুময় স্যাঁতসেঁতে প্রাকৃতিক জরায়ুর অভ্যন্তরে পৌঁছে যে তার নিজের ভাষায় উচ্চারণ করেছিল, ‘Mans like the earth, his hair like grasse is grown/ His veins the rivers are, his heart the stone/ ...’।”

ওই গল্পগ্রন্থের সব গল্পগুলি বিষয় আমার মগজে এমনভাবে দানা বেঁধে যায় যে, সেই লেখক সম্পর্কে আমি প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে উঠি। আব্বার সংগ্রহে আমাদের বাড়িতেই পেয়েছিলাম তাঁর ‘হিজলকন্যা’, ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ...। বই আকারে। গোগ্রাসে পড়ে ফেলেছিলাম। আর আশ্চর্য হয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলাম আমার পৃথিবীকে। যার মধ্যে থেকেও যাকে আমি দেখতাম না। চিনতাম না। যেমন তাঁর ‘অলীক মানুষ’। ‘অলীক মানুষ’-এর বিষয় একেবারে যেন আমার নিজস্ব বিষয়। যে বিষয়ের মধ্যে আমার জন্ম - আমার বেড়ে ওঠা। জন্ম থেকে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত আমি আবাস ছিল মামার বাড়িতে। সেটা সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রাম। আমার মাতৃকুল পীর বংশ। তাই শফিউজ্জামান আমার পরিচিত। শুধ শফিউজ্জামান কেন, ‘অলীক মানুষ’ -এর সব চরিত্র আমার চেনা, সব ঘটনা আমার দেখা।

পাঠক নই, আমি তখন আবিস্কারক। কী আবিস্কার করছি?

নিজেকে আবিস্কার করছি। আমার মামার বাড়ির কিষাণ বাবুলাল, কিংবা সংসার-বিমুখ ফকিরভাই যে ওই নেজের আলির মতো মানুষ, আমি বুঝতে পেরেছিলাম। ঘাসের ডগায় শিশির কণা দেখিয়ে নেজের আলি লেখককে বলেছিল, পরিরা চান করে গেছে, তার জল।

যেমন আমার ফকিরভাই হেমন্তের জ্যোৎস্নাভরা সন্ধ্যা রাতে ভাতারবান পুকুরপাড়ে বসে গাঁজা টেনে মদিনার মাঠের দিকে তাকিয়ে বলত, পরি দেখবি? পরি! আমি বলতাম, হ্যাঁ। ফকিরভাই আমার হাতে গাঁজার কল্কে ধরিয়ে দিয়ে বলত, চুপচাপ তাকিয়ে থাক্‌। ঠিক দেখতে পাবি।

ফকিরভাইয়ের কথা মতো আমি নিস্পলক তাকিয়ে থাকতাম মদিনার মাঠের দিকে। সদ্য পাকা ধান কেটে নেওয়ায় মাঠটা তখন সন্তানহারা মায়ের কোলের মতো। সেই মাঠে পরি নামবে কেন? আমি ধৈর্য হারিয়ে গাঁজার কল্কেতে টান দিতাম। আমার গাঁজার ঘোর ধরত। আর আমি দেখতাম ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখিকে মাঠে নামতে। জমিতে পড়ে থাকা ধান কুড়িয়ে খেতে আসত তারা সেই পদ্মা নদী থেকে।



আমি লিখতে শুরু করলাম। কিংবা বলা ভালো নিজেকে আবিস্কার করার জন্যই লিখতে শুরু করলাম। ছোটগল্প। প্রথম গল্প ‘ফুলি’ বহরমপুরের রৌরব পত্রিকায়। গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্পকার হিসাবে খ্যাতি জুটল। খবরের কাগজেও গল্পটির প্রশংসা বেরোল। ‘ওভারল্যান্ড’ পত্রিকায় অভিজিৎ সিরাজ নামে এক ব্যক্তি লিখলেন, “ ... পত্রটিতে (রৌরব) নীহারুল ইসলামের একটি চমৎকার গল্প পড়া গেল। ‘ফুলি’ শীর্ষক রচনাটি মানবিক আবেদনে সমৃদ্ধ, যার কাঠামো অতিশয় সাদামাটা ... ”।

অভিজিৎ যে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের পুত্র, আমি তখনো জানতাম না। এও জানতাম না পরবর্তী কালে অভিজিৎ সিরাজ আমার প্রিয় ‘টুটুলদা’ হবেন!

২০০২-এ আমার একটা গল্প বেরোল, ‘প্রদর্শিকা’ পত্রিকায়, ‘অথঃ সীমান্ত কথা’। সেই গল্পের সূত্র ধরে আলাপ হল সৈয়দ সুশোভন রফির সঙ্গে। তিনি মুস্তাফা সিরাজের ভাইপো। অসম্ভব গুণী মানুষ! যদিও তার আগে ওই পরিবারের সৈয়দ খালেদ নৌমান ও তার দুই পুত্র শুভাশিষ-স্নেহাশিষের সঙ্গে আলাপ।

যাইহোক, সুশোভনদার সঙ্গে আলাপের মধ্যে দিয়ে ওই পরিবারের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। টুটুলদা, অমিতাভদা, রাণাদা, তপনদা, বোউদি-বোনেরা, তাঁদের সন্তানেরা , জেঠিমা ... , দ্বারকা নদীর পাড়ে তাঁদের পারিবারিক বার্ষিক বনভোজনেও আমি সপরিবার উপস্থিত থেকেছি। খোসবাসপুরেও গেছি বহুবার। সেখানে মুস্তাফা সিরাজ আলাদা করে একটা স্বপ্নের বাড়ি বানিয়েছিলেন। বাগানবাড়ি। গাছ-গাছালিতে ভরা সেই বাড়িতে তিনি মাসে একবার করে আসতেন। ক’দিন কাটিয়ে যেতেন। নিজ হাতে গাছ-গাছালির যত্ন নিতেন। গ্রামের মানুষের খোঁজখবর করতেন। একবার সেই বাগানবাড়িতে আড্ডার মাঝে তিনি আমায় বলেছিলেন, তাঁর পিসির বাড়ি ছিল আমাদের লালগোলার শিমুলিয়া গ্রামে। ছেলেবেলায় সেই শিমুলিয়া গ্রামে তিনি বহুবার গেছেন। শুধু তাই না, সেই শিমুলিয়া গ্রাম যেতে তাঁর প্রথম ট্রেন-এ চাপার অভিজঙতা। তারপর লালগোলার রথের মেলা দেখতে যাওয়া। শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম! পরে আরো অবাক হয়েছিলাম যখন শুনেছিলাম তাঁর পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন আমার পিতৃভূমি মৃদাদপুরের বাসিন্দা! কোনো কারণে তাঁরা চলে যান খোসবাসপুরে। সেই সূত্র ধরেই হয়ত শিমুলিয়া গ্রামে তাঁর পিসির বিয়ে হয়েছিল। সেখানে তিনি বারবার আসতেন। তাঁর কথায়, “ ... আমার আরও একটা পালাবার জায়গা ছিল উত্তরে এক জায়গায়। সেটা মুর্শিদাবাদের পদ্মাতীরবর্তী উত্তরপূর্ব অঞ্চল। ওটাকে বাগড়ি অঞ্চল বলা হয়। সেখানে শিমুলিয়া নামে গ্রাম ... ”

এবছর আমাদের লালগোলা এম এন একাডেমী পাবলিক লাইব্রেরীর শতবর্ষ! একবার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আমাকে বলেছিলেন আমাদের এই লাইব্রেরীর কথা। সে এক মজার গল্প! লাইব্রেরীর শতবর্ষ স্মরণিকায় সেই ঘটনাটি যদি উল্লেখ করা যায়! লাইব্রেরীর মিটিং-এ কথাটা তুলতেই সবাই স্মরণিকায় সেই ব্যাপারটা উল্লেখ থাকলে ভালো হয় বলে সম্মতি দিল। এবং সেটার দায়িত্ব বর্তাল আমার ওপর।

আমি জানতাম এদিকে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। অনেক দিন তিনি তাঁর গ্রাম খোসবাসপুরে আসতে পারেন নি। তাঁর স্বপ্নের বাড়ি, বাগানবাড়ির জন্য তাঁর মন খারাপ করত। তাঁর নিজের হাতে লাগানো গাছগাছালির জন্য তাঁর মন কাঁদত। তাই আমি তাঁকে ফোন না করে টুটুলদাকে ফোন করে ব্যাপারটা বললাম। শুধু বললাম না, লাইব্রেরী নিয়ে যে ঘটনা সেটা আমি যেমন শুনেছিলাম, সেটা লিখে টুটুলদাকে মেল করে বললাম যে,



লেখাটা যেন জেঠুকে দেখিয়ে নেয়। তারপর একদিন কি দু’দিন! হটাৎ টুটুলদার ফোন। কিন্তু কণ্ঠটা জেঠুর! প্রায় ১২ মিনিট তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন। লালগোলা, শিমুলিয়া, বাগড়ি অঞ্চলের আরো কত কথা! আমি শুনলাম। সবশেষে তিনি বললেন, ‘হারানো দিনের ডায়েরি’ শিরোনামে এসব নিয়ে তিনি একটা লেখা লিখেছেন। যে লেখাটি দে’জ প্রকাশিত “শঙ্খগড়ের ভ্যাম্পায়ার রহস্য” গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে।

কী জানি কেন ক’দিন আগে তাঁর ‘রানীঘাটের বৃত্তান্ত’ গ্রন্থটি পড়তে ইচ্ছে হয়েছিল। আলমারি থেকে গ্রন্থটি বের করে প্রথম দু’টি গল্প পড়েছি। তারপর ৫ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। ৪ সেপ্টেম্বর দুপুর নাগাদ যখন সমীরণ দা (ঘোষ) আমায় খবরটা দিল, গ্রন্থটি আমি আবার হাতে তুলে নিয়েছিলাম। কিছু ভাবছিলাম! কিংবা কিছুই ভাবছিলাম না। আনমনে গ্রন্থটির পাতা ওলটাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা গল্পে চোখ আটকে গেল। মিথলজির রাজা।

“ আমাদের গাঁয়ে এক রাজা ছিলেন।
কিন্তু আমি প্রথম রাজা দেখি যাত্রার আসরেই। দেখে তো আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। রাজা তলোয়ার তুলে সাদা পোশাকপরা একটা সুন্দর লোককে বলেছিলেন ...
কী বলেছিলেন কে জানে, আমি শুনেছিলাম 'কাটবো'। তারপর আর তাকাতে পারিনি আসরের দিকে। ছোট মামাকে বলেছিলাম- বাড়ি যাব। ছোটমামা তো এই শুনে রেগে কাঁই। পরে এক সময় ছোট মামার কাঁধে চড়ে বাড়ি যাচ্ছি, অন্ধকারে ধানক্ষেতের ওপর জোনাকি জ্বলছে। শেয়াল ডাকছে। আর একটা লন্ঠন। ছোট মামা লন্ঠনটাকে বলে ওঠেন- চরণ নাকি? লন্ঠন জবাব দিয়েছিল- হ্যাঁ মশাই। এবং একটু পরে ঘুরে দেখি, টিমটিমে লন্ঠন দুলতে দুলতে আকাশভরা তারার সঙ্গে মিশে গেল...”

৫ সেপ্টেম্বর আমি যখন খোসবাসপুরে পৌঁছলাম, আকাশে মেঘ। আমাদের রাজা শুয়ে আছেন শববাহী খাটে। চারপাশে সব অসংখ্য মানুষ! সব সাধারণ মানুষ।তাদের চোখের জল যেন ইলশেগুড়ি বৃষ্টি হয়ে ঝরছে অবিরাম। তার মধ্যেই জানাজা হল। তারপর আমাদের রাজাকে নিয়ে যাওয়া হল তাঁর স্বপ্নের বাগানবাড়িতে। তাঁর নিজের হাতে পোঁতা নিম গাছতলায় তাঁকে সমাধিস্ত করছি। বন্ধু আমিনুল (হক) বলল, দ্যাখো- কেমন আকাশবাতাস কাঁদছে! পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সৈয়দ কাউসার জামাল এবং শুভাশিষ সৈয়দ। একজন আমাদের রাজার ভাই। অন্যজন আমাদের রাজার ভাইপো। দু’জনের চোখেই জল। শুধু ওই দু’জন কেন সেখানে আমরা যে ক’জন ছিলাম প্রত্যেকের চোখেই তখন জল। আসলে রাজা নয়, আমরা প্রত্যেকেই তখন দেখছিলাম আমাদের অভিভাবককে আকাশভরা তারার সঙ্গে মিশে যেতে!

কার কী মনে হচ্ছিল জানি না, অসহ্য কষ্টের মধ্যেও আমার কিন্তু গর্ব হচ্ছিল ...





লেখক পরিচিতি
নীহারুল ইসলাম

‘সাগরভিলা’ লালগোলা, মুর্শিদাবাদ, ৭৪২১৪৮ পঃ বঃ, ভারতবর্ষ।
 জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (মাতুলালয়)। 
শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। 
সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। 
রৌরব, দেশ সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেন নববই দশক থেকে। 
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ 

পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব (১৯৯৬),  জেনা (২০০০),  আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল (২০০৪), ট্যাকের মাঠে, মাধবী অপেরা (২০০৮), মজনু হবার রূপকথা (২০১২)। 
দু’টি নভেলা--,  জনম দৌড় (২০১২), উপন্যাস।
 ২০০০ থেকে ‘খোঁজ’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী’র সম্পাদনা। 
পুরস্কার : 
লালগোলা ‘সংস্কৃতি সংঘ’ (১৯৯৫)এবং শিলিগুড়ি ‘উত্তরবঙ্গ নাট্য জগৎ’ কর্তৃক ছোটগল্পকার হিসাবে সংবর্ধিত
 (২০০৩)। সাহিত্য আকাদেমি’র ট্রাভেল গ্রান্ট পেয়ে জুনিয়র লেখক হিসাবে কেরালা ভ্রমণ (২০০৪)। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)। রুদ্রকাল সম্মান (২০১৩) প্রাপ্তি। 
niharulislam@yahoo.com





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন