বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

অমর মিত্রের গল্প : সাত রঙের কার্ডিগান

হরিশংকর জিজ্ঞেস করে, আপনি কি আমারই জন্য বসে আছেন? ঘন নীল শাড়ি, পাতালের আলোয় যা ঈষৎ ধূসর, আকাশি নীল ব্লাউজ, পায়ে সস্তার কাপড়ের নিউকাট, বিষণ্ণ চোখের তরুণী উঠে দাঁড়িয়েছে। ঠোঁট পাতলা, ডিমের ছাদে মুখ, শ্রীময়ী রূপ, অবাক হয়ে দেখছে হরিশংকরকে, একটু খুঁটিয়ে।
কালোর ভিতরে সাদা অক্ষরে লেখা এস, ও, এস, টুপি মাথায় এই তরুণীকে অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছে হরিশংকর। টিকিট কাউন্টারের পাশে খালি জায়গাটিতে নীল রঙের মোল্ডেড চেয়ারে বসে আছেন ইনি।
অথচ হরিশংকর এর কাছেই অন্তত মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে, এস, ও, এস টুপি খুঁজেছে, পায়নি। তারপর ভেবেছে না পেয়ে সে যাবে না। টিকিট কাউন্টারের ভিতরে উঁকি মেরেছে, খুঁজে না পেয়ে যখন সে শূন্য দেখে ফিরে আসছিল, তখনই দেখল কালো অন্ধকারে সাদা অক্ষরগুলি যেন জ্বলজ্বল করছে। তরুণী এত সময় মাথার টুপিটি খুলে মাথার রেশমি চুল সেট করছিল। হরিশংকর দেখল তরুণী বছর পঁচিশের, বিবাহিতা কি না ধরা যাচ্ছে না মাথা ঢাকা থাকায়। কব্জি দেখল হরিশংকর, ডান হাতে অনেক দিনের পুরনো মডেলের একটি দম দেওয়া ঘড়ি। ওই ঘড়ি তার বউ চন্দ্রিমার আছে। বাইশ বছর আগে বিয়েতে পাওয়া। হরিশংকর ভাবল এই তাহলে বাতিঘর। তার এস, ও, এস মেসেজ রিসিভ করছে বলে মনে হচ্ছে না। কোনও দিকে নজর নেই। বছর পঁয়তাল্লিশের একটি পুরুষ মানুষ মিনিট দশ পনেরো এখানে ঘুরছে তারই জন্য, অথচ চোখ তুলে দ্যাখেনি। হরিশংকর নিজে জানে তার ভাবভঙ্গি খুব স্বাভাবিক নয়। এখন আট মিনিট অন্তর মেট্রো, এর ভিতরে দুটি মেট্রো পাতাল পথে দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলে গেছে। দুটি মেট্রো দক্ষিণে গেছে উত্তুরে বাতাস বয়ে। কলকাতায় শীত ঢুকছে। এই মেট্রো স্টেশনকে খুব পছন্দ হরিশংকরের। কোনও কোনও স্টেশনে প্রায় একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণগামী গাড়ি এসে পৌঁছয়। চাঁদনি চক, রবীন্দ্র সদন। তখন একই সময় দুই দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা মনের ভিতরে তৈরি হয়ে যায়। এইভাবে কত গাড়ি যে তাকে না নিয়েই চলে যায়। শেষপর্যন্ত কোনও এক গাড়িতে উঠতে হয়েছেই। মেট্রো স্টেশনে তো থাকা যায় না। এখানে ভবঘুরেপনা নিষিদ্ধ।
তরুণী জিজ্ঞেস করল, আপনি! এস, ও, এস, খুঁজছেন?
অনেক সময় ধরে।
আপনি কি...? আপনার হাতে সময় আছে তো?
হরিশংকর দেখছিল তরুণীকে। কেমন অবিশ্বাস্য চোখে তার দিকে তাকিয়ে। অথচ এ তো সত্যি, সে তার মতো অনেকের জন্যই বসে আছে। হরিশংকর অন্য দিকে ফিরল। কত নারী পুরুষ পাতালের আরও গভীর থেকে উঠে আসছে। সুন্দর, অসুন্দর, নানা রঙের পোশাক। তার এমন মনে হয় অনেক অনেক কন্যা এই কলকাতা শহরে হয়তো নেমে এসেছে আকাশ থেকে। ডানা গুটিয়ে ফেলেছে গোপনে। তারা কী সুন্দর! তাদের বয়স কত সুন্দর! এই এস, ও, এস কর্মী হয়তো তাদের মতো অতটা রূপবতী নয়, কিন্তু অন্য রকম যে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন? জিজ্ঞেস করল তরুণী।
হরিশংকর জবাব দেয় না। পাতাল গহ্বর থেকে অনেক অনেক মানুষ উঠে আসছে উপরে। আবার ঘোষণাটি শোনা যাচ্ছে, আপনি যদি অবসাদগ্রস্ত হন, এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে এই জীবনের ভার...
এস, ও, এস — নীল শাড়ি আবার জিজ্ঞেস করল, আমি কেন বসে আছি এখানে, জানেন আপনি?
জানতাম না, ওই যে আবার ঘোষণা হচ্ছে। বলল হরিশংকর। বলতে বলতে দেখল তরুণী মাথা থেকে টুপি খুলে নিচ্ছে। চুল ঘাড়ের কাছে লুটোচ্ছে। মাথায় নীল রঙের হেয়ার ব্যাণ্ড। হরিশংকরের বিস্ময় লক্ষ করে বলল, অ্যানাউন্সমেন্টের পরে এই টুপি দেখে সবাই এমন চোখে তাকায়! যখন কোনও ট্রেন এসে চলে যায়, তখনই অ্যানাউন্সমেন্টটা হয়, প্যাসেঞ্জাররা উঠে আসে উপরে — তারা ভাবে আমিই হয়তো সুইসাইড করতে বসে আছি, আপনি?
আমি হরিশংকর গুপ্ত। হরিশংকর এগিয়ে গেল।
আমি মানিনী রায়। হাসল তরুণী, দিন পনেরো এই প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে, সারা দিনে আপনিই প্রথম, একা বসে বসে হাঁপ ধরে যাচ্ছে প্রত্যেকদিন।
কেউ আসেনি আজ?
নো স্যার। বলতে বলতে মেয়েটি তার পাশের মোল্ডেড চেয়ারটি ঠেলে এগিয়ে দেয় হরিশংকরের দিকে। তার কোলের ব্যাগ থেকে একটি নোটবই বের করে, হেসে বলল, আমাকে প্রতিদিন রিপোর্ট করতে হয়।
কী রিপোর্ট?
ক’জনের সঙ্গে মিট করলাম, ক’জনকে ফেরাতে পারলাম সুইসাইডের রাস্তা থেকে, কত সময় ধরে কথা বলেছি, কী কী কথা বলেছি।
হরিশংকর বলল, আমারটা আপনি লিখতে পারবেন না।
বাহ্‌, তা কী করে হবে, এই পনেরো দিন তো ফিকটিশাস রিপোর্ট গেছে আত্মহত্যা নিয়ে, আপনিই তো বলতে গেলে প্রথম এসেছেন।
হরিশংকর বলল, যেমন রিপোর্ট দিচ্ছিলেন, তেমনিই দেবেন, আমার সম্পর্কে নোট নিলে আমি কিন্তু বেরিয়ে যাব, সুইসাইড নোট রেখে যাব আপনার সম্পর্কে, আপনি কি?
আমি মানিনী, বললাম তো।
মানিনী কে?
আজ্ঞে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট অ্যাড হক, আমাদের লাইফ সেভিং কোম্পানি আপনাদের প্রতিরোধ করতে আমাকে এখানে ডিউটি দিয়েছে।

হরিশংকর বলল, আমার আশ্চর্য লাগছে আপনার মতো কেউ আমার জন্য বসে আছেন, অদ্ভুত লাগছে, আমি ভাবতেই পারতাম না আমার জন্য কেউ বসে থাকতে পারে, শুনুন আমি এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি, কী করা উচিত আমার।
মানিনী রায় বলল, আমি শুনছি আপনার কথা, কিন্তু একটা কথা জানা প্রয়োজন, আমাকে বিশেষ কারও জন্য বসতে বলা হয়নি, বলা হয়েছে, কেউ কেউ আসতে পারে, কলকাতা মেট্রো রেলে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
আবার হরিশংকর শুনতে পাচ্ছিল ঘোষণাটি — আপনি যদি অবসাদগ্রস্ত হন, কোনও কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, আপনি যদি মনে করেন বেঁচে থাকা নিরর্থক... আর সেই কারণে যদি আপনি আত্মহননের কথা ভেবে থাকেন, তাহলে মেট্রো রেলের নির্দিষ্ট টিকিট কাউন্টারের নিকটে আপনারই জন্য অপেক্ষা করতে থাকা — এস, ও, এস কর্মীর সঙ্গে দেখা করুন, তিনি আপনাকে বেঁচে থাকার পথ সন্ধান করে দেবেন, আপনার সমস্ত কথা তাঁর কাছে খুলে বলুন...
ঘোষণা থামলে হরিশংকর বলল, এক এক সময় মনে হয় আত্মহননেই মানুষের স্বাধীনতা।
মাথা নাড়ল মানিনী, ও সব ঠিক ভাবা নয়, এই যে এত মানুষ আমরা বেঁচে আছি, আমরা কি স্বাধীন নই, সাত রকম স্বপ্ন দেখি না আমরা?
হরিশংকর বলল, বেঁচে থাকাটা মানুষের ইচ্ছেয় ঘটে না, এই দেখুন কত মানুষ মরছে প্রতিদিন, অসুখে, দুর্ঘটনায়, যুদ্ধ বিগ্রহে... এরা কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবেনি, শীতের ভিতর না খেয়ে মরছে, দুর্ভিক্ষে মরছে, বন্যায় মরছে... প্রতিদিন যারা মরে যাচ্ছে, তাদের ভিতরে বাঁচবার সাধ ছিল কিন্তু... কিন্তু সেই স্বাধীনতা ছিল না বলেই মরতে হয়েছে তাদের, অথচ আমি যদি আত্মহত্যা করতে চাই, কী চমৎকার ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি মেট্রোর থার্ড রেলে...
শেষের দিকে হরিশংকরের গলা বুঁজে গেল। শোনাই গেল না। পাতালে এখন রবীন্দ্রনাথের গান...আকাশ ভরা সূর্য তারা... মানিনী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করছে হরিশংকর গুপ্তকে। হরিশংকরের কথাগুলো তার মুখখানিতে যেন আরও বিষণ্ণতা এনেছে। মানিনী বিড়বিড় করে বলল, ক’দিন আগে একজন এলেন, গাল ভর্তি ময়লা দাড়ি, ময়লা জামাকাপড়, কেমন ভবঘুরের মতো চেহারা, দেখলেই মনে হবে সুইসাইড না করে ফিরে যাবে না।
মরেছিল নাকি?
শুনুন না, এ কথা ও কথার পর বলল তার কিছু টাকার প্রয়োজন, ধার, না হলে সে ঠিক মরবে, কিছুতেই বেঁচে থাকবে না, টাকা ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না।
কী করলেন তখন?
নানাভাবে বোঝাতে গেলাম, সে বলে টাকাই প্রাণবায়ু, দর কষাকষি করে পঞ্চাশ টাকা ধার নিয়ে সে এসকালেটর ধরে উঠে গেল।
ধার শোধ করেছে?
উহুঁ! মানিনী মাথা নাড়ে, পাতাল থেকে উঠে গিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল, সেই ভবঘুরে, আমার তো মনে হয় সুইসাইডই করেছে লোকটা, সবে সিগনাল সবুজ, গাড়িগুলো পুরো স্পিড পেয়ে গেছে, তখন সে পার হতে গেল।
সেই দিনই?
হ্যাঁ, আমার দেওয়া টাকাটা তখনও তার হাতে ধরা, আপনার কি মনে হয় এটা কোনও অ্যাকসিডেন্ট, নাকি সুইসাইড?
হরিশংকর বলল, বেঁচে থাকার আনন্দ অনেককে মেরে ফেলে, ওর তো মরে যাওয়ারই কথা ছিল, মরতে হয়নি, সেই আনন্দে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছিল হয়তো, ইস, তখন যদি সিগনাল লাল থাকত, ও ঠিক পার হয়ে যেত, কয়েক মুহূর্তের এদিক ওদিক, একটু ভুল... রিফ্লেক্স ঠিক মতো কাজ করলেই বেঁচে থাকত, আমরা আমাদের রিফ্লেক্সের জোরেই বেঁচে আছি মনে হয়, এক মুহূর্তের ডিসিশন বাঁচিয়ে দিচ্ছে কিংবা মেরে ফেলছে আমাদের।
মানিনী রায় মাথার ক্যাপটি খুলে ফেলে চুল সেট করতে করতে, আরও সুন্দরী হয়ে যেতে যেতে বলল, ইনফ্যাক্ট আপনি দ্বিতীয়জন, প্রথমজন প্রতারক না সুইসাইড করতেই চেয়েছিল তা বুঝতে পারছি না, একটা ঘটনা সত্যি, সব মেট্রো স্টেশনে এস, ও, এস মেয়েরা আছে, কিন্তু এর ভিতরেই বেলগাছিয়ায় দুটি, শোভাবাজারে একটি, রবীন্দ্র সরোবরে একটি, মোট চারজন সুইসাইড করেছে, এরা একজনও আমাদের কাছে আসেনি।
হরিশংকর বলল, ওরা ঠিকই করে নিয়েছিল, মরবেই।
আমাদের স্পাইরাও কিছু বুঝতে পারেনি, তারা তো ঘুরছে প্ল্যাটফর্মে।
হরিশংকর বলল, তারা কাজে হয়তো মন দেয়নি, হতে পারে তো।
হতে পারে। মন্তব্য করে মানিনী তার হাত ব্যাগ থেকে ছোট্ট আয়না বের করে মুখচোখ, ঠোঁট দেখে নিচ্ছিল। বোধহয় ঠোঁটের হালকা গোলাপি রং মুছে গেছে, ব্যাগ থেকে লিপস্টিক বের করে বিউটি টাচ দিয়ে নিচ্ছিল অনাঘ্রাত-প্রায় ওষ্ঠাধরে। দেখে তেমনই মনে হয় হরিশংকরের। মানিনী তার কপালের নীল রঙের সোয়েডের টিপটা ঠিক করে বসিয়ে নিল। নিজের মুখখানি বারবার দেখে নিতে লাগল দর্পণের ভিতর। শেষে নিশ্চিত হয়ে হাসল, বলল, নিজেকে দেখতে দারুণ লাগে না!
হরিশংকর বলল, আমি তো আয়নাই দেখিনি কত দিন।
কেন?
এমনি, নিজেকে দেখলে মনে হয় অন্য কেউ।
খিলখিল করে হাসে মানিনী, এ আপনার অদ্ভুত কথা, তা কেন হবে?
হরিশংকর দেখছিল হাসতে হাসতে মানিনী তার বুকের আঁচল টেনে আরও মোহময়ী হল। ঈষৎ ধূসর চোখের মণিতে কটাক্ষ এনে তার ভিতরে কাঁপুনি ধরাল যেন। সে ঝুঁকে দেখল মানিনীকে, বলল, আপনি কিন্তু বিউটিফুল, আপনাকে বেশ লাগছে।
মানিনী বলল, আমরা যারা এস, ও, এস কর্মী আছি, তাদের ভিতরে আমিই বোধহয় — যাক গে, আমার সব সময় মনে হয় টিপটা সরে গেল, ঠোঁট শুকনো হয়ে রং জ্বলা হয়ে গেল — এই যে শীত আসছে, শীতে এত ঠোঁট ফেটে যায়।
হরিশংকর বলল, শীতটা আমার একদম ভাল লাগে না।
মানিনী বলল, মুখের একটু প্রবলেম হয়, ঠোঁট, গাল, স্কিন, কিন্তু শীতের মতো এত সুন্দর সিজন আর নেই, আমার সাত রঙের কার্ডিগান আছে, প্রত্যেকদিন একটা করে সাতখানা গরম চাদর আছে।
হরিশংকর বলল, ঠাণ্ডায় কেমন কুঁকড়ে যাই আমি, রাত্তিরে মনে হয় শীত আর শেষ হবে না। সারা রাত্তির পাশের ফ্ল্যাটে কে যেন কেশেই যায়, ভিখিরি বাচ্চাগুলো ঠাণ্ডায় কী রকম কুঁকড়ে থাকে দেখেছেন?
দেখেছি, কিন্তু ওরা আগুন পোহায় কী সুন্দর!
আগুনটা যতক্ষণ জ্বলবে, নিভে গেলে দেখেছেন?
দেখেছি, কিন্তু যে যেমনভাবে বাঁচে, সারা দিন ওরা রোদ পায়, আমি এই পাতালে বসে থাকি।
পাতাল হলেও এ কি সত্যিই পাতালের মতো? হরিশংকর বলে।
পাতালপুরী যেমন, পাতালপুরীতে শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই, বর্ষা নেই। বলতে বলতে অন্যমনস্ক হল মানিনী, ট্রেনটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে যায়, আমার একদম ভাল লাগে না।
হরিশংকর জিজ্ঞেস করল, সমস্ত দিন কী করেন?
যে লোকটা মরতে গিয়েও হাতে সময় আছে বলে আমার কাছে ঘুরে যাবে তার জন্য অপেক্ষা করি, আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে যখন উপরে উঠে যেতে লাগল এসকালেটরে, কী বলল বলুন দেখি? সে এক আশ্চর্য কথা, বলতে গেলে বেঁচে ওঠারই কথা।
হরিশংকর চুপ করে শুনতে থাকে মানিনী রায়ের কথা। লোকটা উঠতে উঠতে বলেছিল নাকি ‘মরতে হলে আকাশের নীচে, বাতাসের ভিতর, রোদে বা অন্ধকারে বা চাঁদের আলোয়, একদম একা একা, চেনা কেউ থাকবে না সামনে...আশ্চর্য!
হরিশংকর উঠে দাঁড়ায়, আমি এবার যাব।
কোথায়, এর ভিতরে সময় হয়ে গেল?
ঘড়ি দেখল হরিশংকর, মাথা নাড়ে, না, হয়নি, আর একটু বসা যেতে পারে, আপনার ছুটি হবে কখন?
আমার তো ছুটি হয়ে গেছে।
তাহলে যে বসে আছেন?
এমনি, আমার পরের জনও তো এসে গেছে, আমি গেলেই সে এসে বসবে, আচ্ছা বাইরে কি মেঘ হয়েছে, শীতের সময় মেঘ হলে এত মন খারাপ হয়ে যায়।
হরিশংকর বলল, না, রোদ একেবারে ঝলমল করছে।
আমি ভেবেছি রোদ নেই, ঘোলাটে হয়ে আছে সব।
আপনি রোদে বেরিয়ে পড়ুন, রোদটা এখনই নরম।
বেরোব, কিন্তু কী হল মিথ্যে রিপোর্টও লিখতে আর ভরসা পাচ্ছি না, এনকোয়ারি হচ্ছে, আবার আমার কাছে কেউ আসছেও না, অ্যাড হক অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কাজ না হলে তো রাখবে না কোম্পানি, আমি যে এখন কী করি, আমাকে না জানিয়েই একজন সুইসাইড করল উপরে, একজন নীচেও।
আপনার আর কে আছে?
ভাই, অটো চালায়, টালিগঞ্জ স্টেশন থেকে ও আমাকে প্রত্যেকদিন আমাদের বাড়ি সাঁপুইপাড়া, কবরডাঙা নিয়ে যায়।
আপনাকে কেউ ভাল বাসে না?
ভালবাসত, বাঙ্গালোরে চলে গেছে চাকরি নিয়ে, আর খোঁজ নেই।
এজেন্সি কত দেয়?
দু’ হাজার, নো ওয়ার্ক নো পে, কেস না দিতে পারলে কাজ থাকবে না।
এখন আপনি কোথায় যাবেন? হরিশংকর জিজ্ঞেস করে।
নীচে, আরও পাতালে, ট্রেন ধরব।
যদি উপর দিয়ে যান?
মানিনী জবাব দিল না, বিনবিন করে বলল, এক এক সময় একদম একা বসে থাকতে থাকতে, যে মানুষ মরবে তার অপেক্ষা করতে করতে মনে হয় এ জীবনের বোধহয় কোনও মানে নেই।
হরিশংকর বলে, সাত রঙের কার্ডিগান থাকতেও?
বিষণ্ণ তরুণী পাতাল পৃথিবীর কংক্রিট-আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হরিশংকর তখন বলল, এমন যদি হয়, আমি হয়তো মরব বলে আসিনি এইখানে।
তাহলে! চমকে মুখ নামায় তরুণী, মরতে চান না? সত্যি?
হরিশংকর বলল, আপনার রামধনু রঙের কার্ডিগানটির কথা বলুন।
হাসল মানিনী, সাত রঙের কার্ডিগান, সাতখানা সাত রকম গরম চাদরের কথা, পিঠে পুলির কথা সব এস, ও, এস মেয়েই বলবে, চলে যান বেলগাছিয়া, শোভাবাজার, সেন্ট্রাল, চাঁদনি চক, নেতাজি ভবন... আমাদের ট্রেনিং-এ এই সব বলতে শিখিয়েছিল, বর্ষার সময় ঘন কালো মেঘের কথা বলতে হয়, মেঘদূতের কথা, উজ্জয়িনীর কথা, লাল নীল বর্ষার ছাতা, বর্ষার গান... বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল... বলতে শিখেছি আমরা, এ সব শুনে কারও যদি আবার মায়া বসে যায় পৃথিবীর উপর, কিন্তু আমার তো মনে হয় এ সব সবার জীবনে বোধহয় সত্য হয়ে ওঠে না।
হরিশংকর বলল, শীতের রোদ, ভিখিরির আগুন?
আজই যেন প্রথম শুনলাম।
তবু কোনও মানে নেই জীবনের?
মুখ থমথম করছিল লাইভ সেভিং কোম্পানির কর্মী মানিনীর। চুপ করে থাকল অনেকটা সময়। কংক্রিট-আকাশে তাকাল আবার। তারপর যেন কংক্রিট থেকেই কথাটা পেড়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, অদ্ভুত লাগে কী করে খাবার আর বোমা একসঙ্গে নেমে আসে আকাশ থেকে, কথাটা বলেছিল সেই ভবঘুরে, আর এ সব ভাবতে ভাবতেই হয়তো মরে গেল একটুখানি ভুলে, সে সুইসাইড করেছে বলে মনে হয়?
কী জানি, দুর্ঘটনাই সত্য হতে পারে।
আমার সঙ্গে কথা বলেও যদি পাতাল থেকে উপরে উঠে ও মরে যেতে পারে, তাহলে সমস্ত দিন কেন বসে আছি আমি?
কাউকে না কাউকে বাঁচাতে, এই আমাকে বাঁচাতে কেউ সমস্ত দিন অপেক্ষা করছে, এটা জানতে পারার পর আমি কী করে পাতালে নেমে যাই?
মানিনী বলল, পাতালে বর্ষা নেই, বসন্ত নেই, শীত নেই, বৃষ্টি নেই, রোদ নেই, নেই বলেই যারা মরতে আসে তারা ফিরতে পারে না মনে হয়, কী দেখে বাঁচবে বলুন, মেঘও যদি থাকত, আকাশের নীল রং!
হরিশংকর ভাবছিল কী করবে এখন? লাইফ সেভিং কোম্পানির এই কর্মী তরুণীর সামনে থাকবে, না এসকালেটর ধরে উঠে যাবে উপরে? মানিনী রায়ের চোখ দুটি ছলছল করছে। কেমন যেন গুটিয়ে যাচ্ছে সে। কুঁকড়ে যাচ্ছে। শীত কোথায় এই পাতাল দেশে? হরিশংকর জিজ্ঞেস করল, আপনার শরীর কি ভাল নেই?
ভয় করছে, আচমকা ভয় করে উঠল।
কেন, কী হল?
কীভাবে পঞ্চাশ টাকা হাতে ধরে ভবঘুরেটা মরে গেল সেদিন! মানিনী বলল।
এই রকম তো প্রতিদিনই হচ্ছে শহরের রাস্তায়।
সেই জন্য ভয় করে ওঠে একা বসে থাকতে থাকতে, খুব ভয় করে, অটো রিকশায় ছ’জন চাপিয়ে সতেরো বছরের ভাই ছুটে যায় মস্ত মস্ত দৈত্যর মতো গাড়িগুলোর পাশ দিয়ে, একটু ভুল হলেই... বুক কেঁপে যায়... ওর কিছু হয়ে গেলে সাত রঙের কার্ডিগান, সাত সাতখানা গরম চাদর — ইস! কী করে পাব আমি?
কত মানুষ তো এইভাবে বেঁচেও আছে।
তাই তো সেও আছে, আমিও, থার্ড রেল দেখতে এত ভয় করে! বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল তরুণী, উপর দিয়েই যাব, এসকালেটর আমাকে উপরে নিয়ে যাবে।
হরিশংকর দেখল পাতাল থেকে উঠে যেতে যেতে ইট চাপা ঘাসের মতো হয়ে যাওয়া নগরনন্দিনীর রং আবার যেন ফিরে আসছে। ভাবল বলে, পাতালে বসে মৃত্যু-সন্ধানীর জন্য অপেক্ষা করলে তার সাত রঙের কার্ডিগানও ধূসর হয়ে যাবে, যেমন হয়ে গেছে সে আর তার ঘন নীল শাড়ি। চলমান সিঁড়ি পাতাল-কন্যাকে উপরে নিয়ে যাচ্ছে। হরিশংকর ঘুরে পরের মেট্রোর সময় দেখতে লাগল। দেখল মানিনীর চেয়ারে কেউ বসে নেই। শূন্য হয়ে পড়ে আছে খালি জায়গাটা।

লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র
জন্ম :৩০ আগস্ট১৯৫১

বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কাছে ধুলিহর গ্রামে | বিজ্ঞানের ছাত্র | কর্ম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক দপ্তরে | তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্রউপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।]
প্রকাশিত বই : পাহাড়ের মত মানুষ, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, অর্ধেক রাত্রি, ডানা নেই উড়ে যায়, ধুলোগ্রাম, অশ্বচরিত, আগুনের গাড়ী,ধ্রুবপুত্র, নদীবসত, কৃষ্ণগহ্বর, আসনবনি, নিস্তব্দ নগর, প্রান্তরের অন্ধকার, ভি আই পি রোড, শ্যাম মিস্ত্রী কেমন ছিলেন, গজেন ভূঁইয়ার ফেরা, জনসমুদ্র, সবুজ রঙের শহর, সমাবেশ, সারিঘর, সুবর্ণরেখা, সোনাই ছিলো নদীর নাম, হাঁসপাহাড়ি।

পুরস্কার : সাহিত্য একাডেমী।

২টি মন্তব্য:

  1. একেবারে অন্যরকম। আলাদা। পড়ি নি এমন লেখা আগে।

    শ্রাবণী।

    উত্তরমুছুন