মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

শামিম আহমেদের গল্প ; লখিন্দর

মাইকে তারস্বরে বাজছে মমতাজের গাওয়া একটা গান, ‘আকাশটা কাঁপছিলো ক্যান, জমিনটা নাচছিলো ক্যান সেই দিন, গান গাইছিলো খাজায় যেই দিন।’ এক আঁটি খড়ে বসে লখাই দুলে দুলে সেই গান শুনছিল আর দূর থেকে দেখছিল মীরদের খামারবাড়িতে বিরাট উনুনগুলোতে চেপেছে ভাতের হাঁড়ি, কষা গোস- আর কলজে-কুমড়ো দিয়ে ছ্যাঁচড়া। মীরদের মেয়ের বিয়ে। একটু পরেই বরযাত্রী আসবে। ভোরভেলা নাস্তা বানিয়ে রেখে গেছে রশিদ বাবুর্চি। সেসব বন্ধ আছে ভাণ্ডার ঘরে। সেই সকাল থেকে লখাই এখানে বসে আছে। সূর্য ফোটার পর থেকেই।


এখন প্রায় ন’টা বাজে। ভাত আর গোসে-র ম-ম গন্ধে তার খিদেটা ক্রমাগত চাগাড় দিয়ে ওঠে। খাবারের খুশবুতে পাড়ার সব কুকুর রান্নার চারপাশে ছোঁক ছোঁক করছে। মীরবাড়ির মুনিশরা লাঠি হাতে সেই সব কুকুর তাড়াচ্ছে। লখাইও তাদের দেখিয়ে ‘ছেই ছেই’ বলে কুকুর হাঁকাতে থাকে। কুকুর তাড়াতে আসা এক মুনিশকে খুব মোলায়েম সুরে লখাই বলে, ‘আব্বাজান, বরযাত্রী কখন আসবেন?’ তার দিকে দৃকপাত না করে মুনিশটি কুকুর তাড়াতেই ব্যস- থাকে।

‘আব্বা রে, শুনছি ঢাকাই পরোটা হইসে’, লখাই দ্বিগুণ মধুর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে তাকে। সে কোনো উত্তর দেয় না। লখাই এবার উঠে পড়ে তার পিছু নেয়। বলে, ‘আব্বাজান, আপনি ক্যানে কুকুর খেদাইবেন, আপনার লেগি ওই কাম খারাপ দেখায়। আপনি হলেন মীরবাড়ির খাস লোক - আপনি যান, শুয়োরের বাচ্চাগুনাকে আমি তাড়াবো, আপনি সাত কাজের মানুষ।’

মুনিশটি লখাইয়ের দিকে না তাকিয়ে তার হাতে লাঠিটা দিয়ে বলে, ‘লাঠিটা হারাস না যেন।’ লখাই ‘শুয়োরের বাচ্চা’ কুকুরগুলোকে তাড়ানোর কাজ পায়। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরেই সে বোঝে, কুকুর তো একটা নয়, পাঁচটাও নয় যে সে তাড়াবে। পুবদিকে লাঠি নিয়ে যখন ধেয়ে যায় একটি কুকুরের দিকে, অন্য তিন দিক থেকে আরো সব কুকুর পালে পালে ঢুকে পড়ে খামারবাড়িতে।

‘শালাদের গায়ে গরুম পানি না ছিটালে যাবে না’ - এই কথা বলতে বলতে লখাই পুনরায় বসে পড়ে আগের জায়গায়। ঠিক তখনই একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে তার পিছন দিক থেকে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখে তার পিছনে দাঁড়িয়ে জাদুর মা। জাদুর মা মীরবাড়ির খাস বাঁদি। লখাইয়ের মাথায় বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। জাদুর মায়ের সঙ্গে সে ভাব জমাতে চেষ্টা করে।‘জাদুর বাপ বুলসিলো, তুমার নাকি মাজার ব্যথা?’

জাদুর মা বলে, ‘তা বাজপড়া কুনো রাতে কামাই দিয়্যাছে...’ হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে খেঁকিয়ে ওঠে, ‘হারামি! তুর সাতে জাদুর বাপের কবে দেখা হলু রে নামুনি। গেল বসর বদর পীরের উরসের দিন সে তো জমিনের নিচুনে চঁলি গ্যালো। মিছা কথা, উলাউঠার খালি ঢ্যালা মারা কথা। দিনের বেলায় খুয়াব দেখচি।’

লখাই বুঝতে পারে। এরকম মারাত্মক ভুল তো তার করা উচিত হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে সে কথা চাপা দিতে উদ্যোগী হয়, ‘রওজার কিরে চাচি, হসরত চাচার সাতে কতা বুলবা তুমি? শুনো, মসজিদের মোলবি জিনের বাদশার সাতে কতা বুলে, হসরত চাচা তো কুন ইনসান! আমার শালা রজবের মুবাইলে তাইলি ধরি দিব, বুলবা কতা/ আরে শালারা আবার ধেয়ি আসে। ছেই ছেই।’

জাদুর মা লখাইয়ের চালাকি ধরতে পারে। বলে, ‘ঢ্যামনার বাচ্চার নিজের মুবাইলের টাওয়ার নাই, বুলে কিনা শালার মুবাইল! ভারি আমার শালারে, বিবি নাং করি বেড়ায়, আর শালা দেকাস। যা যা, ভাগ; দুফরে আসিস, তার আগে কিস্‌সু পাবি না।’

তবু লখাই বসে থাকে। রান্নার গন্ধেই তার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। অনন্ত কাল জুড়ে সে বসে থাকে। সময় যেন কিছুতেই কাটতে চায় না। আজ তার বাপ বেঁচে থাকলে পিঠের চামড়া তুলে নিত। অন্যের বাড়িতে খাবার লালসায় বসে-থাকা বাপ সহ্য করতে পারতো না একদম। বাড়ি বয়ে নেমনতোন্ন না করলে বিয়েবাড়ি তো কোন ছার - সুন্নতবাড়ি বা আকিকার বাড়িও সে যেত না। আর যাবেই বা কোন সুখে! তার তো তিন বিঘে জমি ছিল, হালের বলদ ছিল, ভিটেবাড়িও ছিল। কিচ্ছু উড়িয়েও সে যায়নি। মরার সময় লখাইয়ের হাত ধরে বলেছিল, ‘বাপ রে, বুদ্দি-হুঁশ করে চলোস; পরের কতায় নাচোস না।’ বাপের কথা ভাবতে ভাবতে তার দুচোখ বেয়ে পানি নামে। সে তো পরের কথায় নেচেই সব হারালো - ধানিজমি, বাড়ি সব। কোন গাঁয়ে খায়, কোন পাড়ায় ঘুমোয় তার কোনো হদিস নেই। জাদুর মা ঠিকই বলে গেল, ‘ভারি আমার শালা রে!’ ওই শালা ইবলিশের জন্যেই আজ তার এই দশা।

ইবলিশের বোন তানু। তানুকে বিয়ে করেই তার যত সর্বনাশ। তানু হলো পচা মেম্বরের ভাগ্নি। সেই লাল পাটির পচা মেম্বর। একদিন তার বাড়ির সামনে এসো ডাকলো ‘লখাই, লখাই’ - এখনো তার কানে সেই ডাক যেন লেগে আছে। তখন মগরেবের আজান হয়েছে। এই সন্ধ্যাবেলায় তাকে পচা মেম্বর ডাকছে। কাউকে দিয়ে নয়, নিজেই এসেছে।

লখাই বিগলিত হয়ে বলে, ‘বুলেন চাচাজান, খারাব সুমাচার কিসু নাই তো!’ ‘না, তু কাল ফজরে একবার আমার বাড়িতে আসোস, তুর চাচি ডাকসে।’ পচা মেম্বরের কথা শুনে তার দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না। সে পচা মেম্বরকে বাড়িতে ডাকে, কিন্তু অন্ধকারে কিছু ঠাহর করতে পারে না; কখন পচা মেম্বর দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছে। বাড়িতে বসাতে পারলে তার মান-ইজ্জত বাড়তো, এই আক্ষেপে তার আনন্দে সাময়িক ভাটা পড়লেও সে উত্তেজনায় রাতে ঘুমোতে পারে না। মেম্বরচাচি তাকে ডাকছে, এ কী কম কথা নাকি!

পরদিন ফজরের নামাজের পরেই সে সোজা চলে যায় পচা মেম্বরের বাড়ি। তখনো সেই বাড়িতে কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। সদর দরজার কাছে ঠাঁয় বসে থাকে লখাই। প্রায় ঘণ্টাখানেক। দরজা খুলতেই সে-বাড়ির মধ্যে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলে, ‘চাচিজান, আমারে কইসিলেন!’

পচা মেম্বরের বউ তাকে চা-মুড়ি দেয়, ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে। ‘শালীর বিটি শালী যে পুয়াতি, সে-কতা কি জানতাম আমি? আমার ঘাড়ে চাপাইয়ে আমার ঘটিবাটি সব লেকাজোকা হয়ে গেল, আর আমি শালা মীরবাড়ির সামুতে পোঁদে খ্যাড়ের আঁটি টিপি গোসে-র ঘ্রাণ লিই! হায়রে বাপ, তুমার কতা মুনে হয়নি একবারও!’

পচা মেম্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে লখাই সেদিন গান ধরেছিল, ‘দেখা হি প্যাহেলি বার, সাজন কি আঁখো মে পিয়ার। টিক টিকা টিক...’

আর সেই সন্ধ্যায় মৌলবি ডেকে তার বিয়ে পড়িয়ে দেয় পচা মেম্বর। জমি-বাড়ি সব তানুর নামে লিখিয়ে নেয়। তখন ঢ্যামনার বাচ্চারা বলেছিল, কাবিননামায় টিপছাপ লাগবে, নইলে শাদি নাজায়েজ হয়ে যাবে। সাক্ষী ছিল দুজন, দুই হারামিই পচা মেম্বরের সাগরেদ।

বিয়ের ছ’মাস পরেই তানু বাড়ি বেচে দিয়ে বলে, ‘আমি ভাইয়ের বাড়িতে থাকুম, তুমিও থাইকো। পুয়াতি তো, বাপের বাড়িতেই থাকতে হয়।’

আরে মাগি, তাই বলে আমার ভিটেবাটি বিক্রি করবি?

তানু বলেছিল, ‘যদি হাসপাতালে যাতি হয়, তখুন পয়স কুতা পাব! হাতে টাকা থাকা ভালো।’সেই তানুর ব্যাটাছেলে হলো। ভাইয়ের বাড়িতেই হলো। ছেলে নিয়ে সে ভাইয়ের বাড়িতেই থাকে। তার ভাই রজব আলি এখন লখাইকে ঢুকতে দেয় না ওই বাড়িতে। রজব আলি দখিনে কাজ করতে গেলে সে ওই বাড়ি ঢোকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তানুও তাকে ঢুকতে দেয়নি। দরজায় খিল এঁটে শুয়েছিল। তার আশনাই কালুয়া নাকি ও-বাড়িতে আসে প্রায়ই। অনেক রাতে। পাড়ার লোকে সব জানে।

হঠাৎ কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। বরযাত্রীদের বাস এসে গিয়েছে। লখাই দেখে, বাড়ি থেকে অনেক লোক বেরিয়ে এসেছে। খামারবাড়ির দক্ষিণ দিকে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে, বরযাত্রীরা বাস থেকে নেমে সেদিকেই হাঁটা দিয়েছে। আহা রে! বরযাত্রী যাওয়া কি কম ভাগ্যের ব্যাপার! সেও একবার গিয়েছিল। বছর পাঁচ-ছয় আগে, উত্তরপাড়ার শাহ আলমের বিয়েতে। কুড়িটা লুচি খেয়েছিল কুমড়োর ঘ্যাঁট আর বোঁদে দিয়ে। উফ্‌, সে-খাবার এখনো মুখে লেগে আছে। অমন খাবার তারপর আর খেল কই! কে জানে ঢাকাই পরোটা কেমন হবে খেতে, তবে লুচির মতো হবে না নিশ্চয়ই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন তন্দ্রা ঘনিয়ে আসে লখাইয়ের দুই চোখে। হঠাৎ কুকুরের চিৎকারে তার তন্দ্রা চটলে যায়। ঝুড়িতে করে নাস্তার পাতা ফেলা হচ্ছে, আর কুকুরগুলো সেখানে মারামারি করছে। আল্লারে আল্লা! যত দেশের কুকুর এই গাঁয়ে। লখাই গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে। একজন মুনিশের খাছে গিয়ে বলে, ‘বেলা তো অনেক হইসে আব্বাজান, এবার তবে কিসু হবে তো! মেহেরবানি আপনাদের।’

‘নাস্তা-ফাস্তা হবে না। থালা বার করো, চাট্টি ফ্যান ভাত লি যাও। বইকালে যদি কিসু বাঁচে, তখুন লি যাবা।’

এমন সময় মীরবাড়ির ছোট ছেলে আসে সেখানে। ওই পাকারাস্তার ধারে যার ওষুধের দোকান। সে এসে বলে, ‘কুকুরগুলোকে ভাতের ফ্যান দাও না এট্টু, চুপ করবে হারামিগুলান। আর ফ্যানে এইটা মিশায়ে দাও।’ ছোট মিয়া কাগজে মোড়া অনেকটা পাউডার দেয় মুনিশের হাতে, তারপর সে হাসে, ‘শালাদের খুব বাড়, মানুষ খেতি পায় না, আর কুত্তাগুলান ঘ্যানঘ্যানায়। কী লখাই ভাই, তুমি এট্টু পাউডার খাবা নাকি? ওরে, ফ্যানাভাতে গোসে-র সুরুয়া দে লখাই ভাইকে।’

একটু পাউডার লখাইয়ের ভাতের থালাতেও মিশিয়ে দেয় সে। ফ্যানভাতে গোসে-র ঝোল পেয়ে লখাই যারপরনাই আহ্লাদিত হয়ে ওঠে। তার আপাত-বাসভূমি সেই খড়ের আঁটিতে বসে সে গপগপ করে, কখনো-বা সপসপ করে নিমেষে পরিষ্কার করে ফেলে থালা।

ছোট মিয়া মুনিশদের বলে, ‘কুত্তার পুলারা এবার সাঁঝ পর্যুন্ত ঘুমাবে।’

টিউবওয়েলের জলে বাকি পেটটা ভর্তি করে মবিন মিয়ার দলিজের বারান্দায় গিয়ে শুয়ে পড়ে লখাই, মানে লখিন্দর - তার বাপের দেওয়া নাম। আর শোওয়ামাত্রই কোথাকার এক বেবাক ঘুম এসে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। লখিন্দর ঘুমোতে থাকে, ঘুমোতেই থাকে। ঘুমের তাপে টুকরো টুকরো হয়ে ফেটে পড়ে তার খোয়াবগুলো। ‘বাপ গিয়্যাছে ঘুড়া কিনতে, ঘুড়া পায়নি, ছাগল কিন্যাছে, বাপ লখাই চাঁদমুখ দ্যাখলা?’

--জি, দ্যাখলাম।

‘বাপ গিয়্যাছে তলুয়ার কিনতে, তলুয়ার পায়নি, কেসি- কিন্যাছে, বাপ লখাই চাঁদমুখ দ্যাখলা?’

-- জি, দ্যাখলাম।

‘বাপ গিয়্যাছে দালান কিনতে, দালান পায়নি, ঝুড়ি কিন্যাছে, বাপ লখাই চাঁদমুখ দ্যাখলা?’

-- মুখ দেখবু কি খালা, উ বিটি তো ঘুমটাই খুলে না। মেনুকা মাথায় দিলি ঘুমটা রে ঘুমটা রে ঘুমটা...

ধীরে ধীরে তরল হয়ে আসে তার ঘুম। ঘোমটার ভেতরে কিছুটা খোয়াবে আর কিছুটা জাগরণে সে এক নারীর মুখ দেখে, আর নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে, ‘আলহামদোলিল্লাহ, শাদি কবুল, শাদি কবুল, শাদি কবুল। আমার তিন বিঘা জমি আর ভিটাবাটি আমারে ফিরায়ে দাও মেনুকা।’

বাকি ঘুমটাও চটকে যায় মাইকের প্রবল আওয়াজে। রিকশায় মাইক বেঁধে একটা ছেলে ক্রমাগত চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কী যেন বলে যাচ্ছে - ওই শালা মাঘ মাসেও এসেছিল। বলেছিল, মদ্দা কুকুর ধরে দিতে পারলেই দশ টাকা দেবে। কাটান দিয়ে ছেড়ে দেবে। সেবার একটা কুকুরও ধরে দিতে পারেনি লখাই। তবে এবার ধরবে।

ছেলেটা মাইকে হিন্দি গানের ফাঁকে ফাঁকে বলে যাচ্ছে, ‘আপনার ফ্যামিলির কুনো ওসুবিধা নাই... পাপ্পু কান্ট ডান্স শালা... যেমন রাতে শোন, বউয়ের সাথে মিলন খান, কুনো ওসুবিধা হবে না... তিরকিত ধানা তিরকিত ধানা তিতি ধা না... শুধু বাচ্চা পয়দা হবে না।’

লখাই হাসে। তার কি আর মিলন খাওয়া হবে! তানু তো ঢুকতেই দেয় না ঘরে। কী করলে তানুর সঙ্গে মিলন খাওয়া যায়, এ ছোকরা নিশ্চয় তার পথ বলে দিতে পারে। বারান্দা থেকে লাফ মেরে রাস্তায় নামে সে, রিকশার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

ছেলেটি বলে, ‘পচা মেম্বরের কাছে নাম লিখাবা, ছশো টাকা পাবা, আর সামনের রোববার হাসপাতাল যাবা সক্কাল সক্কাল। তবে টাকাটা পাবা হাসপাতাল থেকে ফিরার পর। তুমাকে হাসপাতালে এগারোশো টাকা দিবে, তুমার বেশি আদ্ধেক- - ছশো টাকা। আর পাঁচশো দিবা পচা মেম্বরকে, রাজি আছো?’

লখিন্দর ভাবে, এতগুলো টাকা। এমনি দেবে? না, না - একদম দেরি করা ঠিক নয়। এই সময় চলে গেলে তারও সর্বনাশ, পচা মামারও ক্ষতি। এক্ষুনি গিয়ে নামটা লেখানো জরুরি। পচা মেম্বরের বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটা দেয় সে। বাড়ি অবধিও যেতে হয় না তাকে। রাস্তায় দেখা হয়ে যায় পচা মেম্বরের সঙ্গে। বলে, ‘মামুজান, আপুনার পাঁচশো, আমার ছশো, রোববার হাসপাতাল যাওনের নামটা লেখি ল্যান। পায়ে পড়ি মামুজান।’

‘হবে, হবে। এখুন যা, বাড়ি যা।’ বলে পচা মেম্বর উলটো দিকে হাঁটা দেয়।

লখিন্দর তার পিছু ছাড়ে না। বলে, ‘তবে মামুজান, আমার তো আবার ভুলু মুন, যদি ভুলি যাই... ইখানে উখানে তো পড়্যা থাকি - তবু জমাই তোই বুটি। আপুনি হাসপাতাল থেকি টাকাটা লি আসবেন। একশো টাকা না হয় কুম দিবেন। আমাকে যদি অরা ঠকায়। আপুনি যান, ও মামু, মামু গো।’



পচা মেম্বরের হাঁটার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে লখাই ছুটতে আরম্ভ করে। তখন মগরেবের আজান শুরু হয়েছে। পচা মেম্বর লখাইয়ের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মসজিদে উঠে পড়ে। লখাইয়ের ‘মামু গো’ নামক গোঙানি ছিন্ন খঞ্জনির মতো বাজতে থাকে মাইকের ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনির সঙ্গে।



লেখক পরিচিতি
শামিম আহমেদ

জন্ম ১৯৭৩। মুর্শিদাবাদের সালারে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র।
পেশা- বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০ টি।
বর্তমানে কলকাতায় বসবাস।

৩টি মন্তব্য:

  1. গল্প নিয়ে কিছু বলব না। সে যাঁরা বোঝেন বলবেন। আমার লাভ মূর্শিবাদের গ্রামের মানুষের কথ্য যাপন । সাহিত্যিক আবুল বাশারের লেখা মনে পড়ছিল।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লাগল বললে কম বলা হবে। বরং বলি ঋদ্ধ হলাম। ধন্যবাদ লেখক।

    উত্তরমুছুন