মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

ফেরদৌস নাহারের জার্নাল : সায়াহ্নের মেঘলা চিঠি

বড়ো বড়ো ম্যাপেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছি হুইল চেয়ারে বসা ক্যাতেরিনাকে নিয়ে | অনেকক্ষণ চেয়ার ঠেলে ক্লান্ত হয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি | ক্যাতরিনার বয়স সত্তরের মতো | খুব মিশুক আমুদে, ছটফট করে, গলা ছেড়ে গান গায় | সব সময় ইংরেজিতে কথা বললেও গান গায় কিন্তু গ্রিক ভাষায় | ওর নিজের ভাষায় | মাঝে মাঝে গুছিয়ে কথাও বলে | কবে এসেছে এই ওল্ড হোমে ওর মনে নেই | ও কেবল গান গায় আর উল বোনে | কার জন্য বোনে তাও জানি না, সোয়েটার না মাফলার তাও বুঝি না | জিজ্ঞেস করলাম, ক্যাতরিনা তুমি এটা কী বুনছ, কার জন্য? তার গানের মতো এই প্রশ্নের উত্তরটিও ছিল গ্রিক ভাষায়, যার কিছুই বুঝলাম না |
সে যে ভূখণ্ড থেকে এসেছে তার জল হাওয়া, ভাষা কিছুই আমার জানা নেই | কাজেই সে কী বলছে তাও জানি না | এই ওল্ড হোমের বেশির ভাগ মানুষের ভাষাই যে আমার জানা হয়নি | মাঝে মাঝে সে ভাইয়ের কথাও বলে | জানাল, অপেক্ষা করে আছে তার জন্য | একদিন ভাই অ্যান্থনি এসে তাকে নিয়ে যাবে | সে অবিরাম গ্রিসের ছোট্ট কোনো মফস্বল শহরের ছবি এঁকে যায় | বলে যায় ছেলেবেলা | মায়ের বানানো মজাদার সব সালাদ বা স্যুভলাকির কথা | তারপর বিশাল একটা গ্যাপ | তারপর যেন অপেক্ষা আর অপেক্ষা | কানাডায় বসবাসের কোনো স্মৃতিই কি তার মনে নেই? এখন কেবলি ছেলেবেলা | অ্যালঝাইমারে ভুগলে বুঝি ছেলেবেলাই স্মরণে বেঁচে থাকে কেবল! আজ আমি তাকে নিয়ে বের হয়েছি | সে বলে যাচ্ছে, গেয়ে যাচ্ছে | আর আমি তাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে চলেছি সাজানো বাগানের পাশ দিয়ে |

কত রকমের ফুল ফুটেছে | খুব যত্ন নিয়ে গড়া গ্রীষ্মের ফুলবাগান এখানকার বড়ো আদরের বিষয় | পার্ক, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, হাসপাতালসহ প্রায় সব জায়গাতেই এই ফুলের মেলা | ফিনফিনে বাতাসে বয়ে আসছে অজানা ফুলের সৌরভ | গ্রীষ্মের প্রায় প্রতিদিনই এই ওল্ড হোমের কাউকে না কাউকে নিয়ে বেরুতে হয় | ঘুরে ঘুরে দেখাতে হয় প্রকৃতির রূপ | গায়ে রোদ লাগিয়ে ঘুরে ফিরে এলে ওদের মন চনমনে আনন্দে ভরে উঠবে- এটাই এখানকার গ্রীষ্মকালিন সকাল এগারোটার রুটিন |

আমি কাজ করি ২৮৮টি রুমের বিশাল ওল্ড হোম প্রোভিডেন্স হেলথকেয়ারে | এখানে প্রতিদিন দুপুরে লাঞ্চের সময় হেলেনকে দেখতে হয় | সে কথা বলতে পারে না | নিজে নিজে খেতেও পারে না | সারাক্ষণ তার মাথাটা কাঁপতে থাকে | তাকে লাঞ্চ করানোর জন্য ঘরে গিয়ে হুইল চেয়ারে করে ডাইনিং রুমে নিয়ে আসি | তার ঘরের বেডসাইড টেবিলে অনেকগুলো ছবি সাজানো রয়েছে | পরিবারের সকলের সঙ্গে হেলেন | কী অপরূপ দেখতে! যেন একেবারে চল্লিশ দশকের হলিউডের বিখ্যাত নায়িকা ইনগ্রিড বার্গম্যানের সঙ্গে বদলে নেয়া যায় | আমি আন্দাজে বোঝার চেষ্টা করি, এই ছবিগুলোর কোনটি তার স্বামী, মা-বাবা বা অন্য কারো সঙ্গে | এ ব্যাপারে হেলেন কোনো সাহায্য করতে পারে না | আড় চোখে দেখি, মাথাটা নেড়েই যাচ্ছে | হেলেনের ছেলে মেয়েরা আসে মাঝে মধ্যে | সে তাদের চিনতে পারে কিনা জানি না |

প্রথম কয়েক বছর আমার কাজ ছিল বয়স্কদের নিয়ে বাইরে বের হওয়া, দুপুরে লাঞ্চ খাওয়ায় সহযোগিতা করা, খবরের কাগজ পড়ে শোনানো | আমি আমার পেশাগত কারণে খবরের কাগজ পড়ে শোনাই | তারা শুনছে কী শুনছে না কে জানে! কারণ এসব কিছুর মূল্য আদৌ তাদের কাছে আছে কি? তবে টিভি ছেড়ে দিলে বুঝুক আর নাই বুঝুক অন্তত চলমান কিছুর দিকে চেয়ে থাকে | পরবর্তীতে এই কাজ থেকে সরিয়ে আমাকে দেয়া হল ক্রিয়েটিভ ওয়ার্কশপে | এখানে ছবি আঁকা, কাঠ দিয়ে পাখির বাসা বানিয়ে তাতে রং করা, সৈকতের আরাম চেয়ার ফিক্স করা | এসব বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয় | নানা রকমের সৃষ্টিশীল কাজকর্ম করি | মাঝে মাঝে বয়স্কদেরকে ছবি আঁকার জন্য নিয়ে আসি | কেউ আঁকার চেষ্টা করে, কেউবা কাগজে রঙের টান-টুন দিয়ে উঠে চলে যায় | বুঝতে পারি, খবরের কাগজ, ছবি আঁকা বা পাখি বানানো কোনোটাই তাদেরকে তেমন আনন্দ দেয় না, যেমন আনন্দ তারা পেতে পারে একজন স্বজনের কাছ থেকে |

এখানেও মানুষ প্রেমে পড়ে, আবার একা হয়ে যায় | বয়স হলেও স্বাভাবিক জীবনের কোনো কিছুই অনুপস্থিত নয় | জুলির বয়স পঁচাশি আর স্যামের বিরাশি | ওরা দুজন বন্ধু | আপনজন | প্রতিদিন তিনবেলা একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার সারে | টিভি দেখে | গল্প করে | জীবনের এই পরন্তবেলায় কাছের আত্মীয়-স্বজন, ছেলে মেয়ে কেউ নেই সাথে | দুজন সম্পূর্ণ অজানা মানুষ এখন দুজনার বন্ধু, সাথি | যেন কত যুগ যুগ ধরে তারা পরস্পরের কাছাকাছি | এরকম যুগল এখানে আরো অনেকেই আছে | পাশাপাশি হেঁটে বেড়ায়, সময় কাটায় | মূলত খাবারের সময়গুলো এরা অনেক আনন্দ নিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারে | খুব ভালো লাগে এইটুকু তৃপ্তি বা খুশি হওয়া দেখে | স্যাম ও জুলিকেও সেরকম দেখি |

সামনে খ্রিসমাসের ফান্ড তোলার প্রোগ্রাম | তাই নানা রকমের জিনিসপত্র বানাতে ব্যস্ত | খ্রিসমাস কার্ড থেকে শুরু করে হাতের তৈরি অনেক কিছুই বিক্রি হবে সেখানে | তাই ব্যস্ততার শেষ নেই | একদিন লম্বা হলওয়ে ধরে স্যামকে একা একা হেঁটে আসতে দেখে হেসে বললাম, হাই স্যাম! কোনো উত্তর নেই | আবারো জিজ্ঞেস করলাম, জুলি কেমন আছে? সে কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেল | বুকটা ধক করে উঠল! বেশ কিছু দিন হয় হাউজের এদিকটায় আসা হয়নি | তাড়াতাড়ি গিয়ে নার্সকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, কয়েকদিন আগে জুলি মারা গেছে | সেই থেকে স্যাম ঠিক মতো কিছুই খাচ্ছে না | কারো সঙ্গে কথাও বলছে না | অনেক সাধ্য সাধনা করেও কিছু হচ্ছে না | তার কোনো নিকটজনও নেই, যাদের খবর দিলে তারা এসে তাকে সঙ্গ দেয়, ভুলিয়ে রাখে | এবার স্যামের দিকে ভালো করে তাকালাম | মনে হল সে যেন আরো অনেক বুড়িয়ে গেছে | তাকে খুব দুর্বল, ক্লান্ত ও দুখি লাগল | একদিন সব ফেলে হয়তো এই ওল্ড হোমে এসে উঠেছিল | সে দিন একাকী জীবনে খুঁজে পেয়েছিল আরেকজন একাকী মানুষকে | আর তারই কারণে হয়তো জীবনটা নতুন করে ভালো লাগত | আজ সেটুকুও হারিয়ে গেছে | এই কষ্ট কারো সঙ্গে ভাগ করে নেবার নয় | এখানে কাজ করতে এসে, মানুষের সবচেয়ে চূড়ান্ত দিনগুলোর যবনীকাপাতের কাহিনিগুলো সেলুলয়েডের ফিতের মতো চোখের সামনে ঘটে যেতে দেখে, মাঝে মাঝে অবাক বিস্ময়ে বলে উঠেছি, এরি নাম কি জীবন! সায়াহ্নের শেষ সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরা পাখিদের এই একত্রিত আয়োজনকে কী নামে ডাকব?

কেবল মৃত্যু নয় এখানে প্রতি মাসে পালা করে জন্মদিনও পালন করা হয় | মোমবাতিতে ফুঁ দিয়ে আগুন নেভানো, কাগজের তৈরি বার্থ ডে ক্যাপ মাথায় পরে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ...’ বলে কেক কাটা | সেইসব আনন্দ ভাগ করে নিতে অনেকেই উপস্থিত থাকে | নিকট আত্মীয়, সন্তান, বন্ধু থেকে শুরু করে আমরা পর্যন্ত | এ এক জীবনপ্রবাহ | আর যার কেউই নেই, তারও রয়েছে কত আপনার জন | যাদের সঙ্গে জীবনের শেষ দিনগুলো পার করে দেবার জন্য এখানে এসেছে তারা | হয়তো এদের অনেকেরই সন্তান আছে, কিন্তু তাদের কর্মব্যস্ত দায়িত্ব আর ছুটে চলা জীবন থেকে কখনো কখনো সময় বের করে বাবা অথবা মাকে দিতে পারছে না | এ বিষয়টি এদেশে খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা | নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা অনেক সময় নিজের প্রতিও ফিরে তাকানোর সময় করে দেয় না | সেখানে বৃদ্ধ মা-বাবাকে সময় দিতে হলে হয়তো সবকিছু ফেলে ঘরে বসে থাকতে হবে | কারণ তাদের জন্য চাই নিরবচ্ছিন্ন সেবা যত্ন | মা-বাবার শরীরে নেই যৌবনের শক্তি | তারা তাদের নিজস্ব কাজগুলো করতে পারে না এখন | সব কিছুর জন্যই প্রয়োজন সার্বক্ষনিক আন্তরিক সাহায্য সহযোগিতা বন্ধুত্ব | তাই এদেশে ওল্ড হোম কনসেপ্টটি অত্যন্ত পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই গ্রহণীয় | আমরা ভেবে থাকি, আমাদেরই বুঝি মা-বাবার জন্য প্রাণ ভরা দরদ ভালোবাসা আছে, আর এদেশের মানুষগুলো বুঝি সেদিক থেকে পিছিয়ে | আসলে মোটেও তা নয় | আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে এ ভাবনা ধোপে টেকে না | এদেশের মানুষেরা বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, তা থেকে আধুনিক চিন্তা করতে শিখেছে | একজন অসহায় বৃদ্ধ মানুষের কারো না কারো বাড়িতে একা একা করুণা নিয়ে বেঁচে থাকার চাইতে, ওল্ড হোমে যত্ন, পরিচর্যা এবং সমবয়সীদের সঙ্গ পেয়ে জীবনকে অর্থবহ করে তোলা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় | কারণ সেখানে সে একা নয়, তার সঙ্গে রয়েছে তারই সমবয়সী আরো অনেকে | ছুটির দিনে ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনিরা আসে | মা অথবা বাবা দিবসে ওল্ড হোমের পোস্টাপিসে জমা হয় কার্ডের পাহাড় | সাথে আসে হাজারো রকমের উপহার ফুল, চকোলেট, মা-বাবার বিশেষ প্রিয় কিছু | তা পেয়ে এদের খুশির অন্ত থাকে না | দেশে থাকতে ওল্ড হোম নিয়ে আমারও কিছুটা নেতিবাচক মনোভাব ছিল | কিন্তু আজ মনে হয়, উন্নত বিশ্বের চিন্তাধারার সাথে ব্যক্তি মূল্যবোধ ও যথার্থ সম্মান খুবই গুরুত্বপূর্ণ |

মার্থা এখানে এসেছে আজ পাঁচ সাত বছর হয় | বেশ ঝকঝকে বৃদ্ধা | তাকে নিয়ে প্রতিদিন তার তিন মেয়ের কেউ না কেউ এসে হুইল চেয়ারে করে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায় | ওরা পালা করে মায়ের জন্য চলে আসে | আর মেয়েগুলোর চেহারাতেও দারুণ মিল | আমি তো প্রায়ই ভুল করে বড়ো মেজ ছোটো গুলিয়ে ফেলি | ওরা হেসে দেয়, আমিও মজা করি | মার্থার মেয়েরা মায়ের সাথে সাথে মার বন্ধুদের জন্যও নিয়ে আসে নানা রকমের খাবার দাবার | হাসিখুশি মেয়ে তিনটে যখনই আসে সাথে করে একরাশ আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে | মার্থার সন্তান ভাগ্য সত্যি বলে বেড়াবার মতোই | কারণ ওর মেয়েগুলো পালা করে মাকে দেখে যাচ্ছে | ওরা এভাবেই দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে | নির্দিষ্ট কারো বাড়িতে নয়, মাকে মায়ের পছন্দ মতো হোমে রেখে প্রায়দিনই কাজের পরে এসে তারা সময় দিয়ে যাচ্ছে |

এখানে রয়েছে লাইব্রেরি, কার্ড খেলার রুম, বিউটি পার্লার, মিউজিক রুম আরো কত কী | আশি নব্বইয়ের ঘরের সৌন্দর্য পিয়াসীরা নিয়মিত সৌন্দর্য পরিচর্যা করতে আসে | অনেকেই কড়া রঙের নেইল পলিশ লাগায় ভালোবেসে, বয়স সেখানে কোনো বাধাই না | একতলের বিশাল হলওয়েতে প্রতিদিন কোনো না কোনো ইভেন্ট লেগেই থাকে | কখনো সকাল এগারোটায় আবার কখনো বিকেল তিনটের দিকে | হয় পুরানো সিনেমা, না হয় গান বা বিংগো খেলা। সকলে এসে জমা হয় এখানে | হুইল চেয়ারে করে একে একে এনে বসানো হলে শুরু হয় এক একদিন এক এক ধরনের পর্ব। টরন্টোর অনেক নাম করা সেলিব্রেটি সংগীত শিল্পীকে এখানে এসে গান শুনিয়ে যেতে দেখেছি | অথবা পুরানো দিনের রেকর্ড বাজিয়ে ফিরিয়ে আনা হয় এদের যৌবনের দিনগুলো | সুবিখ্যাত গায়ক ফ্রাংক সিনাত্রা, এলভিস প্রিসলির জনপ্রিয় গানগুলো বারবার ঘুরে ফিরে শুনতে চায় এরা | সপ্তাহের কোনো বিকেলে দেখানো হয় পুরানো মুভি | এখানে এসে এদের সাথে আবারো নতুন করে দেখেছি অড্রে হেপবার্ন, গ্রেগরি পেকের ‘রোমান হলিডে’ ইনগ্রিড বার্গম্যানের ‘ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা’র মতো আরো অনেক ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র |

একদিন পুরো ওল্ড হোমের পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল | কাকে যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না | প্রতিটি ওয়াশরুম, বারান্দা বন্ধ করে দেয়া হল, যেন হারানো মানুষটি সেখানে গিয়ে চুপটি করে লুকিয়ে থাকতে না পারে | তুমুল খোঁজাখুঁজি চলছে | জানলাম, দোতলায় বাস করে মিলার, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না | সারা হোমের কোথাও নেই সে! গেল কোথায় এই প্রায় স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষটি! অ্যালঝাইমায় আক্রান্ত মিলার তো কিছুই চেনে না | কর্তৃপক্ষের দৌড়াদৌড়ি আর সিকিউরিটি দলের নাভিশ্বাস অবস্থা দেখে বেশ চিন্তা হতে থাকে | পুলিশকে খবর দেয়া হল | ঘণ্টা দুয়েক পর পুলিশ মিলারকে নিয়ে এল | সে নাকি এখান থেকে প্রায় তিন কিলমিটার দূরে ড্যানফোর্থে হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিল মেয়ের কাছে যাবে বলে | যদিও মিলার জানে না মেয়ের কাছে যেতে হলে কোন পথ ধরে বা কতদূর তাকে যেতে হবে | সে শুধু জানে, সে তার মেয়ের কাছে যাচ্ছে |

এত যে যত্ন, এত যে দেখভাল, তবু মাঝে মাঝে মনের অজান্তে কেউ কেউ পুরানো আবর্তে ফিরে যেতে চায় বৈকি | হয়তো মন খুঁজে বেড়ায় আপনজনদের | বার্ধক্য ভুলিয়ে দিয়ে গেছে সেই ক্ষমতা, সে কারণে হয়তো পরিষ্কার করে প্রকাশ করতে পারে না আজ তার মন কী চাইছে | মিলারকের ফিরে পেয়ে সকলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সিকিউরিটি বিষয়ক তৎপরতা নিয়ে বৈঠকে বসে গেল | আর যাকে নিয়ে এত সব কাণ্ড সে কিন্তু একেবারে নির্বিকার, ভাবলেশহীন। মাঝে মাঝে ‘স্যান্ড্রা’ বলে মৃদু স্বরে মেয়ের নাম ধরে ডাকছে, এদিক সেদিক তাকাচ্ছে |

সে বছর তখন কেবল মাত্র শীতের শুরু হয়েছে | কাজের জায়গায় ঢোকার আগে এককাপ কফি খেতে ইচ্ছে করল | কফি শপে যে টেবিলে কফি নিয়ে বসলাম, তার কোনাকুনি টেবিলে বসে থাকা এক একাকী বৃদ্ধাকে দেখে মনটা খুব বিষণ্ন হয়ে গেল | নাম্বার খুঁজে বের করে রহমান ভাইকে একটা ফোন করলাম, খালাম্মা কেমন আছেন রহমান ভাই? জানলাম, তিনি আর এই ইহজগতে নেই | খবরটা জেনে হুড়মুড় করে একটার পর একটা ছবি মনের পর্দায় ভেসে উঠল |

এদেশে তখন সবেমাত্র কিছু দিন হয় এসেছি | কঠিন শীতে একটি কাজ জুটল এলডারলি কেয়ার হোমে | একজন বাঙালি বৃদ্ধা মহিলাকে প্রতিদিন ওল্ড হোমে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের জন্য দেখাশুনা করার | আমেনা বেগম | বাড়ি ফরিদপুর | বয়স প্রায় আশির কোটায় | দুবার স্ট্রোক হয়ে যাবার পর স্মৃতির ঘরে এখন কেবল অতীতের পাখিরা উড়ে উড়ে বেড়ায়। বর্তমানকে চিনতে পারেন না তিনি | তাঁর যা কিছু সবই ফেলে আসা স্মৃতি | এখন পর্যন্ত সেই আমার ওল্ড হোমে কোনো বাঙালির সাথে প্রথম ও শেষ কাজ করা | তাও হত না, যদি না ভদ্রমহিলার ছেলেকে বিষয় সম্পত্তির জরুরি কাজে সপরিবারে দেশে যেতে না হত | এদিকে এমন কেউ নেই যে প্রতিদিন মাকে এসে ওল্ড হোমে দেখে যায় | বাধ্য হয়ে পেপারে বিজ্ঞাপন দিলো | মা ইংরেজি জানেন না, তাই বাংলা জানা কেউ হলে ভালো হয় | আমি দেখা করে কাজটি পেয়ে গেলাম | আমার কাজ তাঁর দেখাশোনা, পরিচর্যা, ওষুধপত্র, খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, প্রতিদিন এসে সে সব খোঁজ নেয়া এবং আমেনা বেগমের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো | এই কাজগুলো মূলত তাঁর ছেলেই করে থাকে | এখন বাধ্য হয়ে অন্য কারো ভরসায় মাকে রেখে যেতে হচ্ছে | যদিও বেশিদিনের জন্য নয়, মাত্র মাসখানেকের কাজ | তাও কাজটা নিলাম |

অঝরধারা তুষারপাতের ভেতর বাস ধরে বরফ ভেঙে প্রতিদিন বিকেলে সেখানে যাই। ঘণ্টা দুয়েকের আগে তিনি আমাকে ছাড়েন না | যদিও আমাকে দেয়া হবে মাত্র একঘণ্টার মজুরি | তারপর আমিও তাঁকে ফেলে আসতে পারি না | এক অজ্ঞাত মমতায় বসে থাকি তাঁর সঙ্গে | খালাম্মা বলে ডাকি | তিনিও যেন অনেকদিন পর বাংলায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন | অতীতকে বর্তমান ভেবে স্বামী সন্তানের কথা বলে যান | যেন তিনি তাঁর সংসারেরই রয়েছেন | মাঝে মাঝে আমাকে রাবেয়া রাবেয়া বলে ডাকেন | আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন, রাবেয়া তোমার মা কেমন আছে? আমি জানি না কে এই রাবেয়া | আমাকেই বা রাবেয়া বলে ডাকছেন কেন? তবে বুঝতে পারি রাবেয়া নামে তাঁর কোনো বোনের মেয়ে ভেবে নিয়েছেন আমাকে | আমি আমার নাম পরিচয় বললাম, তিনি মনে রাখতে পারেন না | একসময় আমি তাঁর কাছে রাবেয়া হয়েই গেলাম | মন্দ লাগত না এভাবেই কোনো এক অজানা অচেনা রাবেয়া হয়ে উঠতে | আমার মুখে খালা ডাক শুনে বিষয়টি আরো পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল | প্রতিদিন বিকেলে তিনি আমার পথ চেয়ে থাকতেন | কারণ আমি পৌঁছালে ভীষণ খুশি হয়ে বলতেন, এসেছ মা, এত দেরি করলে কেন? হয়তো মনে মনে অব্যক্ত প্রতীক্ষা তাঁর অনেক প্রলম্বিত মনে হত |

এখানকার ডাক্তার, নার্স, সুপারভাইজার সকলে তার নাম ধরে ডাকে অ্যামেনা...অ্যামেনা! তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন | যেন এ তাঁর নাম নয় | হয়তো কত যুগ, কত বছর হয়ে গেছে কেউ তাঁকে তাঁর নিজের নামে ডাকেনি | তাই তাঁর কানও আজ চিনতে পারে না এই নাম! মা খালা চাচি ভাবি মামি ফুপু পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছে তাঁর আসল নাম | আর আজ আশি বছরে পৌঁছে কীইবা প্রয়োজন তার | কিন্তু এ দেশ তো ব্যক্তিনাম ও পরিচয়ের দেশ | এখানে ছোটো বড়ো সকলকেই নাম ধরে ডাকা হয়, এটাই এখানকার নিয়ম | আমেনা বেগম তা জানেন না |

খাওয়ানোর সময় মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করতেন, তোমার খালুকে কি খেতে দিয়েছ মা? আমিও বানিয়ে বলতাম, হ্যাঁ খালাম্মা দিয়েছি | তা না হলে তাঁকে খাওয়ানো যেত না | খুব দরদ দিয়ে কাছে ডেকে বলতেন, আমার পাশে এসে শুয়ে থাক মা, সারাদিন অনেক খাটা খাটনি করেছ | তাঁর দরদী কণ্ঠস্বরে চোখে জল এসে যেত | কারণ এদেশে আসার মাত্র কয়েক মাস পরই মাকে হারিয়েছি আমি | মায়ের মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে না পারার যন্ত্রনায় বিদীর্ণ হয়ে উঠতাম | আমেনা বেগমের স্নেহ মমতা সেই বেদনাকে নতুন করে জাগিয়ে দিয়ে যেত | একদিন তিনি সহসাই বললেন, জানো মা তোমার খালু খুব রাগী মানুষ, মাঝে মাঝে আমাকে মারে | আমি অবাক হয়ে যাই, কী বলেন খালাম্মা! খালু আপনাকে মারে? তিনি কথা সামলে নেবার মতো করে বলেন, পুরুষ মানুষ, এত বড়ো সংসারে কত পয়সা লাগে, রোজগার করতে গেলে কি মাথার ঠিক থাকে মা, তাই মাঝে মাঝে রাগ হলে... | আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকি তাঁর দিকে! কবে তাঁর স্বামী চলে গেছে, এখনো কতটা ভালোবাসেন বলে স্বামী না খেলে আমেনা বেগম খেতে চান না | কিন্তু সুপ্ত মনের কোথাও যেন একটুকরো অভিমান আজও জীবন্ত হয়ে আছে | তাই আজকের এই অবচেতন মনও ভুলে যায়নি তাঁর উপরে স্বামীর সেই হাত তোলার বিষয়টি | একথা জানার পর আমি অপার বেদনা ও মমতায় তাঁকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি | তিনিও আমাকে ধরে থাকেন।

একদিন খুব তুষার ঝড় হল | ঝড়ের কারণে আমি সেদিন আমেনা বেগমের কাছে যেতে পারিনি | তাই পরদিন সকাল সকাল চলে গেলাম | গিয়ে শুনি তিনি নাকি গতকাল বিকেলে খুব অস্থির হয়ে ছিলেন | আর আমি তাঁর রুমে গিয়ে ভীষণ ধাক্কা খেলাম | দেখলাম তাঁর ডান হাতে বিশাল এক কালো কালশিটে | কী করে এটা হল? তাঁকে বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পেলাম না | পাবার কথাও নয় | বরং তিনি আমাকে দেখে কত না খুশি! তাঁর এই কালশিটে নিয়ে ওখানকার কারো কাছে কোনো সদুত্তর না পেয়ে প্রশাসন পর্যন্ত ছোটাছুটি করে অভিযোগ করলাম এবং ঢাকায় ফোন করে তাঁর ছেলে রহমান ভাইকেও জানালাম | শিশুর মতো এই অবোধ মানুষটির জন্য ভীষণ কষ্ট হতে থাকে |

দেখতে দেখতে একমাস কেটে গেল | তাঁকে একমাস সঙ্গ দেবার পর চলে আসার দিন যখন তাঁর হাত ধরে বিদায় চাইলাম, খালাম্মা আমি যাচ্ছি, আমার জন্যে দোয়া করবেন, আপনি ভালো থাকবেন | তিনি আমার হাত টেনে ধরে রাখলেন | কিছুতেই ছাড়লেন না | হয়তো টের পেয়েছিলেন আমি আর আসব না |

বেরিয়ে এলাম | বরফ ঝরা দিনে একা একা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হেঁটে যেতে যেতে টের পেলাম রাবেয়ার চোখের পাতা ভিজে উঠছে |


লেখক পরিচিতি 
ফেরদৌস নাহার 
কবি ও প্রাবন্ধিক 
বাবার বাড়ি বরিশাল, মা'র কুষ্টিয়া, নিজের সম্পূর্ণ বাংলাদেশ জন্ম কর্ম বেড়ে ওঠা সব ঢাকাতে। দীর্ঘদিন কানাডার টরেন্টোতে বসবাস করছেন। 

প্রকাশিত বই : কবিতা: ছিঁড়ে যাই বিংশতি বন্ধন, সময় ভেঙ্গেছে সংশয়, উলঙ্গ সেনাপতি অক্টোপাস প্রেম, দেহঘর রক্তপাখি, সমুদ্রে যাবো অবিচল এলোমেলো, বৃষ্টির কোনো বিদেশ নেই, চারুঘাটের নৌকোগুলো, নেশার ঘোরে কবিতা ওড়ে, পান করি জগৎ তরল, উদ্ধত আয়ু, বর্ষার দুয়েন্দে। 
গদ্য: কবিতার নিজস্ব প্রহর, পশ্চিমে হেলান দেয়া গদ্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন