মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

লেখালেখির টিপস

‌‌সাজেদা হক

লেখা খুব সহজ নয়। বেশ কষ্টকর। কেন? কারণ যে কোনো চিন্তা যে কেউ করতেই পারেন। কিন্তু যেভাবে তিনি চিন্তা করেছেন ঠিক সেইভাবে চিন্তাটিকে কাগজে কলমে ফুটিয়ে তোলা  কঠিন। ‌ভালো লেখা মানেই হলো চিন্তার স্বচ্ছতা। আর সে কারণেই এটি অত্যান্ত কঠিন’ বলেছেন Pulitzer পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবাদিক ও লেখক ডেভিড McCullough। আমেরিকান সাহিত্যিক জোয়ান Didion এবং ডন DeLillo সহ অনেক মহান লেখক মনে করেন, লেখকের মনের গহিনে থাকা ভাব বা চিন্তার বিকাশ বা স্বচ্ছতার বহি:প্রকাশ ঘটে লেখনিতে।


১৯৫৮ সালের একটি চিঠিতে আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক হান্টার এস.থমসন লিখেছেন, লেখায় অনেককিছু ফুটে উঠে। যে লেখক যত সুন্দর করে নিজের চিন্তাকে কাগজে বিন্যস্ত করতে পারেন, তিনি ঠিক ততটাই সুন্দর করে সাজাতে পারেন নিজের জীবনও।

একজন লেখকের মধ্যে দুটি সত্তাই সমানভাবে বাস করে। এক- সম্ভাবনাময় স্বত্ত্বা। এটা সব দিক থেকেই চরম ইতিবাচক ও স্বপ্নবান। দুই- নিরাশ, হতাশ, নেতিবাচক স্বত্ত্বা। একজন ভালো লেখক তার সেই সম্ভাবনাময়, ইতিবাচক, স্বপ্নবান সত্তার চিন্তাকে ‌‘লেখক মনের খোরাক’ হিসেবে ব্যবহার করেন। আমেরিকান লেখক হেনরি মিলার, Zadie স্মিথ এবং উইলিয়াম ফকনার এর মতো লেখকরা কখনো কখনো নির্দেশিকা মেনে লিখতেন। এমন মহান লেখকদের কিছু টিপস, চিন্তার কেৌশল, অভ্যাস আর উপদেশ নিয়ে আমাদের আজকের এই প্রতিবেদন। বিখ্যাত সব লেখকরাই মনে করেন লেখকের মতো চিন্তার জন্য প্রয়োজন;

১. মহানদের জীবনী পড়ার অভ্যাস,

২. নিবিড় পর্যবেক্ষণ,

৩. দিবাস্বপ্ন দেখা,

৪. সত্য লেখা,

৫. লেখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া,

৬. নিজের সৃজনশীলতাকে প্রেরণা বানানো,

৭. নিজেকে জানা,

৮. প্রিয় নির্জন জায়গা খুঁজে বের করে,

৯. লেখার জন্য বিষয় নির্ধারণ করা,

১০. একসাথে একদিনেই লেখা অথবা একটি বাক্যে লেখা,

১১. নিজের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং

১২. শুধুই আনন্দের সাথে লেখা।

এসব নিয়মই যুগে যুগে লেখকদের প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচিত করেছে। কেউ কেউ পেয়েছেন মহান লেখকের খেতাব ও শ্রেষ্ঠত্বে সম্মান। নিচে এসব বিষয় নিয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো:

মহানদের জীবনী পড়ার অভ্যাস:
মহান লেখকদের জীবনী পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে। যারা নিজেদের বিশ্বের মধ্যে ভালো লেখক, ভালো চিন্তার মানুষ হিসেবে পরিচিত করে তুলতে পেরেছেন তাদের জীবনী বার বার পড়তে হবে। সেখান থেকে খুঁজে বের করতে হবে, তার লেখার মধ্যে কোন জিনিসটার প্রতিফলন বেশি, লেখায় কোন চিন্তার প্রভাব, সেসব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক হান্টার এস থম্পসনের ‘দ্য সান অলসো রাইজেজ এবং এ ফেয়ারঅয়েল টু আর্মস’ বইদুটি থেকে যতদুর সম্ভব জ্ঞান আহরণ করা যেতে পারে।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ:
চারপাশে ঘটে যা তা খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে তৈরি হতে পারে একটি বিশ্বখ্যাত লেখা। আপনার পরিচিতি বদলে দিতে পারে আপনার চৌকষ পর্যবেক্ষণ। এমনি এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উজ্জ্বল তরুণ লেখক মারিনা Keegan। যিনি এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা যান গ্রাজুয়েশনের মাত্র পাচদিন আগে। ‘দ্য ইয়েল ডেইলি নিউজে’ মারিনার শেষ লেখা ‘একাকীত্বের বিপরীত’ প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ১০ কোটি পাঠকের মন জয় করে। মারিনা মনে করতেন, একজন লেখকের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ পর্যবেক্ষণ দক্ষতা বাড়ানো। মারিনা তার রচনায় উল্লেখ করেন, তিন বছর আগে থেকেই তিনি একটি তালিকা তৈরি শুরু করেন। দৈনন্দিন তিনি কি কি করতেন, তার সবটুকই লিখে রাখতেন। শ্রেণীকক্ষ থেকে শুরু করে লাইব্রেরী পর্যন্ত। বাস-ট্রেন কিংবা ট্যাক্সি পর্যন্ত। একজন ওয়েটারের দৃষ্টিকোন থেকে শুরু করে ড্রাইভারের বিবেচনাবোধ--আচরণ কোন কিছুই বাদ যায়নি সে পর্যবেক্ষণ তালিকা থেকে। এমন ৩২ টি ভিন্ন ভিন্ন আংগিক থেকে দেখা পর্যবেক্ষণমূলক লেখাটিই মৃত্যুর পরো মারিনাকে সেরা লেখকের আসনে অধিষ্ঠিত করে।

দিবাস্বপ্ন: .
লেখক হতে হলে শুধু রাতেই নয়, দিনেও স্বপ্ন দেখতে হবে- অন্তত বড় বড় লেখকরাতো তাই বলছেন। আমেরিকান সাহিত্যিক জোয়ান Didion মনে করেন, ‘দিবাস্বপ্ন’ লেখার উৎস হতে পারে। লেখক যা চিন্তা ও অনুভব করে সমাধান করতে পারেন না, তা এই দিবাস্বপ্নে সমাধান হতে পারে।

সত্য লিখুন:
প্যারিস রিভিউয়ের একটি সাক্ষাত্কারে বিশ্বখ্যাত কলোম্বিয়ান সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, তরুণ লেখকদের নিজের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখার উপদেশ দেন। তিনি বলেন, নতুন লেখকদের এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে লিখতে বসতে হবে, যে বিষয়ে লেখা কিংবা বলা তার পক্ষে সহজ। গার্সিয়া মার্কেজ বলেন, ক্যারিবিয়ান বাস্তবতা নিয়ে তার সব লেখাই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটাই তার কাজের সবচেয়ে বড় প্রশংসা বলে মনে করেন গ্যাব্রিয়েল।

লেখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া:
সবার চেয়ে লেখাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বার বার বলেছেন জগতখ্যাত আমেরিকান লেখক হেনরি মিলার। ‘লেখকদের জন্য ১০ আদেশ’-এ তিনি লিখেছেন, সবার আগে লিখুন, সবসময় লিখুন’। এমনকি পেইন্টিং, সঙ্গীত, বন্ধু কিংবা সিনেমারও উপরে লেখার গুরুত্ব থাকা উচিত বলে মনে করেন মিলার।

নিজের সৃজনশীলতাকে প্রেরণা বানানো:
নিজের সৃষ্টিশীল স্বত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলুন, সুযোগ দিন। কথায় আছে না ‘হাড়িতে থাকলে হাতে আসবে’। অর্থ হলো, মনের গহীন থেকে কিংবা চারপাশ থেকে যা আসতে চায়, তাকে আসতে দিন, হয়তো সেটাই আপনার শ্রেষ্ঠ লেখা হতে পারে। লেখার এই ধরনের প্রক্রিয়াকে আমেরিকান কবি Gertrude স্টেইন বলেন, অনুপ্রেরণার উৎস খুঁজতে হবে নিজের ভেতর। তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, আমার জীবনের সেরা লেখার উৎস ছিলো একটি খামারের চারপাশে ড্রাইভিং। প্রতিদিন তিনি খামারের একপ্রান্ত থেকে গাড়ী চালানো শুরু করতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত চালাতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মুড ঠিক হয়ে যেতো, আর তখনি তিনি লিখতে বসতেন! প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট করে সেখানেই লিখতেন বলে জানান স্টেইন।

নিজেকে জানা:
লেখক এর জীবন যাপন করতে চান? তাহলে আপনি আপনার অস্তিত্বের একটি কাল্পনিক আদর্শ দিয়ে মোহগ্রস্ত না থেকে লিখুন। এটাকে শুধু কাজ নয় নেশায় পরিণত করুন। নিজেকে জ্ঞানের ভান্ডার, একটি অপূর্ণাংগ ব্যাকরণ বই কিংবা বাস্তবতার ভান্ডার বানিয়ে ফেলুন। অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকটে প্রতিবেশী বা বন্ধুরা সহযোগিতা করতে পারবে কিন্তু লেখার জন্য আপনাকে আপনার নিজের উপরই নির্ভর করতে হবে। অন্য কেউ আপনাকে সহযোগিতা করতে পারবে না—দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়ে এমনটাই লিখেছেন বিখ্যাত কানাডিয়ান কবি, সাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড।

প্রিয় নির্জন জায়গা খূঁজে বের করে:
লেখকদের জন্য একটি নিয়মের তালিকা তৈরি করতে গিয়ে ব্রিটিশ গল্পকার জেডি স্মিথ লিখেছেন, লেখার সময় বাহিনী বা গ্রুপ এড়িয়ে চলুন। বহু মানুষের উপস্থিতি আপনাকে অমনোযোগী করে তুলতে পারে। লেখার জন্য তাই পছন্দমতো নির্জনতা খুজে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্মিথ। এসময় সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেও দুরে রাখার ব্যাপারে মত দিয়েছেন তিনি।

লেখার জন্য বিষয় নির্ধারণ করা:
কি নিয়ে লিখবেন ভেবে পাচ্ছেন না...তাহলে ফিরে যান নিজের অতীতে, বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে। খুঁজে দেখেন এমন কিছু কোথাও আছে কি না, নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, পরিকল্পনা কিংবা স্বপ্নও হতে পারে। যা আপনার কাছে প্রিয় বা প্রয়োজনীয় কিংবা আনন্দের সেটাই লিখে ফেলুন। কষ্টের কথা, সাহসের কথা কিংবা প্রেরণার কথাও লিখে ফেলতে পারেন অনায়াসে- এমন মত অভিজ্ঞদের।

একসাথে একদিনেই লেখা অথবা একটি বাক্যে লেখা:
কোনো বিষয় নির্ধারণ করা হয়ে গেলে লিখতে বসুন। আমেরিকান সাহিত্যিক অ্যান Lamott লেখকদের জন্য বলেছেন, একই সময়ে, একদিনে বা একটি মাত্র বাক্যে, অনুচ্ছদে লেখার চেষ্টা করুন। অ্যান তার ‘বার্ড বাই বার্ড’ বইয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখেন, তার ভাই একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৩ মাস সময় নিয়েছিলো, যা তার পরের দিনই দেয়ার কথা। পরে বাবার পরামর্শে লেখাটি কোনোমতে শেষ করতে পেরেছিলো বলে উল্লেখ করেন অ্যান।

নিজের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা:
নিজের কাজ নিয়ে সবসময় অসন্তোষ প্রকাশের কথা বেশ জোর দিয়েই বলেছেন আমেরিকার নোবেল বিজয়ী লেখক উইলিয়াম ফকনার। কিভাবে আরো ভালো, আরো সহজ, আরো তথ্যনির্ভর, সত্যনিষ্ঠ লেখা তৈরি করা যায় সে প্রতিযোগিতা করতে হবে নিজের সাথেই-১৯৫৬ সালের প্যারিস রিভিউ বইতে জানিয়েছেন ফকনার। যা লিখেছেন তা শুধুমাত্র আপনার সমসাময়িক বা পূর্বসুরীদের চেয়ে ভাল হতে হবে তা নয়, বরং তার চাইতেও ভালো আপানিই লিখতে পারেন-সেই বিশ্বাস রাখার জন্য প্রত্যেক লেখকের প্রতি উপদেশ দিয়েছেন তিনি।

অনেক পড়ুন, অনেক লিখুন-এ উপদেশ দিয়েছেন আমেরিকান চিত্রনাট্যকার, লেখক স্টিফেন কিং। এছাড়া ভালো লেখক হওয়ার আর কোনো শর্টকার্ট নেই বলে তিনি মনে করেন। আমেরিকান সাহিত্যিক জয়েস কার্ল অটেস তার টুইট বার্তায় লিখেছেন, লিখুন, বার বার লিখুন, আনন্দের জন্য, আনন্দের সাথে লিখুন।

*লেখাটি ক্যারোলিন গ্রেগোরির একটি লেখার অনুস্মৃতি।




লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকায় থাকেন। 

1 টি মন্তব্য: