শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

গল্পের শৈলী : পূর্ব আখ্যান (BACKSTORY)

সোনালী দেব
অনুবাদ : নৃপেন্দ্র সরকার

পূর্ব-আখ্যান (Backstory) কেন একটি গল্পের ভিত্তি এবং এর যথার্থ্য ব্যবহার গল্পকে আপনার আকাংখিত লক্ষ্যে পৌছে দেবে।

পূর্ব-আখ্যানঃ পূর্ব-আখ্যান সর্বদাই একটা কালো আবরণে আবদ্ধ থাকে না। কিন্তু এই শব্দটা নব্য লেখকদের অন্তরে প্রচন্ড ধাক্কা দিতে পারে।


পূর্ব-আখ্যান নতুনদের কাছে সদাই ভয়ের সঞ্চার করে থাকে। প্রত্যেক সমালোচক পূর্ব-আখ্যানেরহামটি-ডামটি ব্যাখ্যা উপস্থাপণ করে থাকেন। এটা বোঝার জন্য একটা সহজ পন্থা নিয়ে আলাপ করি।

যে বইটি আপনার খুবই পছন্দ আপনি সেটি নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করুন।

এটা কি মার্গারেট মিশেলের “Gone with the Wind?”, সুজান এলিজাবেথ ফিলিপের “Ain’t She Sweet?”, ক্রিস্টান হিগিনের “Waiting On You?” অথবা মলি ও’কীফের “Crazy Thing Called Love?”

আমি এগুলোর কথা বললাম কারণ অনেক গনমাধ্যমের মত আমারও একটা মতলব আছে। এই বইগুলো পূর্ব-আখ্যানের জন্য শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কয়েকটা তো পূর্ব-আখ্যান তালিকায় মৃত্যুঞ্জয়ী। আপনি এরকম অন্য যে কোন গল্পের কথাও বলতে পারেন যেটা আপনার কাছে অতুলনীয় মনে হবে।

এখন সেই চরিত্রটির কথা ভাবুন যার জন্য গল্পটি আপনার প্রিয় গল্পে রুপান্তরিত হয়েছে। আপনি কি বলতে পারেন চরিত্রটির বাল্যকাল কেমন ছিল?

 আপনি যে চরিত্রগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এখন দিতে যাচ্ছেন তা শুনার যথেষ্ঠ সময় থাকলে আমি বলতাম, এটা অনেকটা এরকম যেন আপনি এই চরিত্রগুলোর সাথেই বেড়ে উঠেছেন। ঠিক কিনা? ঈশ্বরের দিব্যি দিয়ে বলছি আপনি ঠিকই চরিত্রগুলোকে ভাল করেই জানেন। আপনি সারারাত জেগে নিশ্চিত হয়েছেন, শেষ পর্যন্ত এদের যেন এভাবেই গড়ে উঠার কথা ছিল।

এদের শৈশব এবং কৈশোর সমন্ধে যা জানতেন সেটাই কল্পনা করুণ। আপনি কি এখনও ভাবছেন আপনি আন্তরিক ভাবেই এদেরকে জেনেছেন? এদের কার কী হয়েছিল তা নিয়ে ভাববার বিষয়টা এখন কি অর্ধেকে নেমে এলনা?

আমিই আপনারহয়েই উত্তরটা দিয়ে দিচ্ছি। আপনি সজোরেই বলবেন – ‘না।’

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, কোন মূল চরিত্রের শৈশব অবস্থা আপনাকে নির্মোহ ভাবে আসক্ত করেনি। কিন্তু তারপরেও অতীতের একটা সুন্দর বর্ণনা (পূর্ব-আখ্যান) না থাকলে যে গল্পটাকে আপনি এত পছন্দ করেন তা এত পছন্দের গল্প কখনোই হত না।

আচ্ছা, তাহলে এর গলদটা কোথায়? আমাদের নিত্যকার জীবনের মতই, আসল ব্যাপারটা হল ‘ঘটনার সময় কাল’।

পূর্ব-আখ্যান নিয়ে কোন সমস্যা নাই। পাঠক জানতে চায় পূর্বের ঘটনাবলী। পূর্ব-আখ্যান ব্যতিরেকে এখনকার কোন ঘটনাই সৃষ্টি হতে পারেনা। আপনি এবং আমি কোথা থেকে এসেছি, কী করেছি, ইত্যাদি না থাকলে বর্তমানের আপনি এবং আমার কোন অস্তিত্বই থাকত না। সমস্ত ভাল জিনিষগুলো পাঠককে গল্পের প্রারম্ভে একসাথে ঢেলে দেওয়ার মধ্যেই সমস্যাটা বিদ্যমান। এটা অনেকটা যেন কোন পার্টিতে কারওসাথে আপনার পরিচয় হল, আর অন্তরংগতার আগেই আপনার জীবনের সব কিছু তাকে বলে দিলেন।

কাজেই বিশদ আলোচনার আগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা আপাততঃ স্থগিত রাখি। যখন আমি বলি পূর্ব-আখ্যান গল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা গোপন মশলা, আমি কখনোই বলিনা যে আপনি তার যথেচ্ছাচার করুন। আপনি নিশ্চয় আমার কথাটি বুঝতে পেরেছেন। পাঠককে প্রথমে আপনার মূল গল্পে ধরে রাখুন। তারপর গল্পের পূর্ব-আখ্যানে নিয়ে যান যাতে পাঠক গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠতে না পারে।

এখন যেহেতু ব্যাপারটা স্থগিত রাখা হয়েছে, আসুন আমরা বিষয়টি উপভোগ্য করি। এ পর্যন্ত আমি যা বলেছি তা ছাড়াও বলা দরকার যে, শুধু পূর্ব-আখ্যা্নের জন্যই পাঠক আপনার গল্পকে অবমূল্যায়ন করতে পারবে না তা নয়। মূল্যবান পূর্ব-আখ্যানই আপনার মূল্যবান গল্পের উৎকর্ষ বর্দ্ধন করে যখন পূর্ব-আখ্যান এবং বর্তমান গল্পের মধ্যে মধুর সংমিশ্রণ ঘটে।

আপনার ভাল লাগা চরিত্রগুলো তাদের পূর্ব-আখ্যান নয়, লেখকরা পূর্ব-আখ্যানকে অবলম্বন করেই চরিত্রগুলো বেছে নিয়েছেন।

আপনার এতিম হিরোইনকে তার আশ্রয়দাতা প্রহার করত, এ্ররকম একখানি গল্প পুরোটাই মূল্যহীন যদি এই ঘটনাটি তাকে অন্য আর একটি জীবনের দিকে প্রবাহিত না করে। যেমন তার এমন একটি বিশ্বাস জন্মে গেল যে যদি কখনও সে তার নিয়ন্ত্রন ভার অন্য কাউকে দিয়ে দেয়, সে তো তাকে প্রহার করবেই। এখানেই পূর্ব-আখ্যানের প্রয়োজন। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়।

তার পূর্ব-আখ্যান এবং বিশ্বাসের সংমিশ্রণও মূল্যহীন যদি না তার এই বিশ্বাস গল্প তৈরীতে কোন অবদান না রাখে, যদি না সে তার বিশ্বাসকে অতিক্রম করতে প্রয়োজনে একটা পাহাড় অতিক্রম না করে, এর জন্য যদি না সে সব কিছু হারায় এবং তা আবার ফিরে পায়। গভীর বিশ্বাসের বাঁধা অতিক্রম করার বাসনা এবং সাহস নিয়ে যখন একটি চরিত্র সৃষ্টি হয়, তখনই তা পাঠকের রাত জেগে পড়া সার্থক হয়।

যে সব চরিত্র চিন্তা-ভাবনাহীন পরিবেশে সিদ্ধান্ত নেয় তাদেরকে বলা হয় কার্ডবোর্ড। অন্যদিকে অনেক চরিত্র ইতিপূর্বে তাদের জীবনে যা কিছু ঘটেছে তার উপর মেধা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নেয়। গল্পও একটা যুদ্ধ ক্ষেত্র। এখানে তাদের শক্তিই বিকশিত হবে। এবং দুর্বল মূহুর্তগুলো থেকে এই শক্তি সঞ্চয় প্রক্রিয়াই আপনার পাঠককে ভাব-বিহ্বল করবে। আপনার গল্পের সার্থকতা সেখানেই।

কোন যুবকের নিয়মহীন এবং বাঁধা-বিঘ্নহীনজীবনে হয়ত অনেক উত্তেজনাকর বা নির্বুদ্ধিতাজনিত রকমারী ব্যাপার-স্যাপার আছে, কিন্তু আমরা এমন চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হই না কারণ ওদের জন্য আমাদের শুধু করুনা ছাড়া আর কিছু করার নেই। তাদের সাহসিকতা আমরা তখনই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যখন আমরা অনুভব করি, অসম্ভব রকম পরিশ্র্মের ফসলই তাদের জীবন-যুদ্ধে সফলতা নিয়ে এসেছে।

ক্রিস্টান হিগিনের Waiting On You তে লুকাস নামের ছোট্ট ছেলেটি তার মাকে প্রান্তিক রোগে ভূগে মরতে দেখল। সে নিজেই মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের জন্য সর্ব প্রকার সেবা যত্ন করল। ক্লিষ্ট বাবার জন্য করণীয় কিছুই বাকি রাখল না। বাবা খুব স্নেহময় এবং সফল ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু সেই বাবাটিকে শেষবার দেখতেও পারলনা। ছেলেটির কষ্ট হলেও আমরা বাবাটিকে মার্জনা করি যখন দেখি তিনি আমাদের ভাল লাগা নারী চরিত্রটির সাথে ঝগড়া একবার করেই অন্য নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। কারণ আমরাতার ছেলেবেলার ঘটনা থেকেই জেনেছি তিনি অনেক অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এবং এটা দেখতে খুবই ভাল লাগে যে তিনিদীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম করে শক্তি সঞ্চয় করেছেন। শক্তি তাকে সাহস জুগিয়েছে এবং তিনি যাকে ভালবাসবেন তাকেই তিনি গ্রহন করবেন।

Gone With The Windএ স্কারলেট একের পর এক বোকামো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ভাল লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার বদলে,তার সাথে মিল খায় না এমন জনের সাথেই সে লেগে থাকে। এরপরেও পাঠকরা স্কারলেটের সাথেই থাকছে এবং দেখছে তার হৃদয় ভেঙ্গে চৌচির যাচ্ছে। কিন্তু তার প্রতি কি আমাদের অনুভূতিটা সেরকমই থাকছে যেমন বইটির অন্যত্র যেখানে তার মায়ের জীবনে অশান্তির কথা আছে কিন্তু অশান্তি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা নাই; ছোট্ট স্কারলেটতখন ক্ষুধায় মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, অথবা যদি তার ছোট্টমন কী ভাবছে বুঝতে না পারি? আমার তো মনে হয় না। কয়েক দশক ধরে বইটি পড়ার পর, আজকেও স্কারলেটের মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ বিদ্যমান আছে। পরিশেষে সে তার অতীত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে জীবনের এই জটিল ধাপগুলোই তাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। অন্য কোন সহজভাবে হত না। জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার অদম্য প্রচেষ্টাই সাধারণ গল্পকে অসাধারণ করে।

নিশ্চয় এই গল্পগুলো শুধু অদম্য প্রচেষ্টা নিয়েই নয়। সবাই মেধা সম্পন্ন লেখক। অতীতের ঘটনাগুলো বর্তমান সময়ে যথার্থ জায়গায় উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু কখনোই পাঠককে বুঝতে দেননি অতীতের ঘটনাগুলো এসে গেছে। অতীতের ঘটনা বর্তমানের ঘটনাকে কখনোই আচ্ছন্ন করে ফেলেনি। এটা এমনভাবে করেছেন যেন পাঠকরাঅনুভব করতে না পারেন।

নতুন লেখক হিসেবে এরকম দক্ষতা অর্জনে আমরা সচেষ্ট হতে পারি। কিন্তু কয়েকটা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে যেন একদিন আমরা অনুরূপ দক্ষতা অর্জন করতে পারিঃ

১) আপনার চরিত্রগুলো শৈশবে কী ছিল তা নিশ্চিত করুণ, কীসে তাদের ভীতি ছিল, কাকে তারা শ্রদ্ধা করত, কারা তাদের আদর্শ ছিল এবং কাদের তারা অপছন্দ করত। আপনার চরিত্রের খুব বেশী জানার কোন উপায় নাই। আমি চরিত্রকে আইচবার্গের সাথে তুলনা করি। সমুদ্রে ভাসমান আইচবার্গের শুধু চূড়াটাই পাঠকরা দেখতে পায়। কিন্তু লেখক জানে জলের নীচে পর্বতসম বিরাট আইচবার্গ চূড়াটাকে ধরে রাখছে। আপনার চরিত্রের শৈশবকাল এই পর্বতের চূড়াসম। দয়া করে এটা পাঠকদের নজড়ে আনবেন না, তাই বলে আপনি কীভাবে চরিত্রটি গঠন করলেন তার পুরোটা ঢেকেও রাখবেন না।

২) পূর্ব-আখ্যান গল্পের সাজগোজ নয়। আপনার চরিত্রগুলোর ইতিহাস নিয়ে ভাবুন। খুজে দেখুন কীভাবে তাদের বিশ্বাসবোধ সৃষ্টি হয়েছে যার ভিত্তিতেই আজ তারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারছে। জীবনের উদ্দেশ্য এবং প্রেরণা সবকিছুই পূর্ব-আখ্যানে জন্ম নেওয়া বিশ্বাসবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত যা নিয়ে এখন তারা সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারছে।

৩) গল্পের ধারা-উপধারা সবই শুরু হয় পূর্ব-আখ্যানে জন্ম-নেওয়া বিশ্বাসবোধের উপর। চরিত্রগুলোর সবকিছুই এই বিশ্বাসবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অবশেষে একদিন চরিত্রগুলো এই বিশ্বাসবোধের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। চরিত্রগুলোকে এমন কিছু পরিবেশে ছেড়ে দিয়ে দেখুন এই বিশ্বাসবোধ সিদ্ধান্ত নিতে কতটা কার্যকরী। এখানে তাদেরকে সাহসী অথবা কাপুরুষ হিসেবেই দেখা যাবে। বিশ্বাসবোধ যত দৃঢ় হবে, সফলতা তত নিশ্চিত হবে, গল্পের ঘটনা প্রবাহ তত আকর্ষণীয় হবে। গল্প লেখার আগেই এরূপ একটি চিত্র তৈরী করে নিন।

পূর্ব-আখ্যান নিয়ে লেখা গল্প সমন্ধে আপনি যদি কখনও নেতিবাচক মন্তব্য শুনে থাকেন, তবে এই লেখায় আমি যে বইগুলোর কথা বলেছি, সেগুলো পড়ে দেখুন। আপনি গল্পে পূর্ব-আখ্যান সমন্ধে কখনো নেতিবাচক ধারণা করতে পারবেন না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন