শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

লেখকবন্ধ অথবা শিকারিদের সময়, দুঃসময়

এনামুল রেজা

দুইঘন্টা পর হুমায়ুন দেখলেন, দু পৃষ্ঠা তিনি লিখে ফেলেছেন। তবে দুপাতা ভরে আছে একটি মাত্র শব্দে। শব্দটা হল আম!

প্রারম্ভ টিকাঃ শুরুতেই বলি পুরানো একটি লেখা এটি। পুনরায় প্রকাশের তাগাদায় আবার সামনে আনা গেল। কিছু এদিক সেদিক পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। সেটা লেখাটি পড়তে গিয়ে পরিষ্কার হবে। পড়ে ফেলা যাক..

বাস্তব এবং করুণ একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। জাপানী লেখক রিউনুসুকে আকুতাগাওয়াকে বলা হয় জাপানী ছোটগল্পের জনক। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছিলেন। মৃত্যুর আগে একটা হিনমন্যতা বা মানসিক যাতনায় ভুগতেন তিনি। তার ধারণা ছিল পৃথীবিকে দেওয়ার মত আর কোন গল্প তার কাছে নেই, সে কারণে তিনি বেঁচে থাকাটাকে শ্রেয় মনে করেননা আর!


আকুতাগাওয়া কিন্তু যে সে লেখক ছিলেন না। তার রাশোমন গল্পগ্রন্থটি বিশ্বের জীবিত প্রায় অধিকাংশ ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তার “ইন আ গ্রেভ” পড়ার পর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, এমন অদ্ভুত গল্পও লিখতে পারেন কেউ! একটা খুনের বর্ণনা চারজন ব্যক্তি করছেন চারভাবে। শেষতক যে খুন হয়েছে- তারও জবানী আছে একদম গল্পের শেষে! আকিরো কুরোসাওয়া এই গল্পটা নিয়েই তার ভুবন বিখ্যাত রাশোমন সিনেমাটা বানিয়েছিলেন ১৯৫০ সালে!

আগেভাগে এই গল্পটা বলার কারণ আমি খোলাসা করছি সামনে।

লেখকদের মাঝে সবচেয়ে কমন ব্যপারটা হল প্লট। মানে বলতে চাইছি যারা ফিকশন লেখেন, তাদের বেশির ভাগই লেখা শুরু করেন মাথার ভিতর গল্পটা গুছিয়ে নিয়ে। মানে, একটা প্লট বের করে সেটা সাজিয়ে গুছিয়ে তারপর বসেন খাতা-কলম নিয়ে (আজকাল পিসির কি-বোর্ড নিয়ে বসেন অনেকে)। আর একদল আছেন, যাদের মাথায় নির্দিষ্ট কোন প্লট থাকেনা, তবে তাদের মাথায় ধোঁয়া ধোঁয়া ভাবে গল্পের একটা আবছায়া শুধু থাকে। এরা লেখা শুরু করার পর আসলে বুঝতে পারেন, কি নিয়ে লিখছেন। কিন্তু লেখা শেষ করার আগে নিজেও অনেক সময় জানেননা শেষে আসলে কি হবে।

দুই দলের হাত ধরেই এই বসুন্ধরা অসংখ্য সব মানবিক আখ্যানের সাহিত্যরুপ পেয়ে ধন্য হয়েছে। হচ্ছে। তবে বলা হয়, লেখকেরা (সে তিনি উপরোক্ত দুই দলের যেকোন দলেরই হোন না কেন) তাদের লেখাগুলোর যোগান পান অতীন্দ্রিয় কোন জগৎ থেকে। ব্যপারটা বুঝিয়ে বলি। গল্পগুলো তো আসলে নিত্য আমাদের চারপাশেই ঘুরছে। তাহলে অতীন্দ্রিয় জগত থেকে কেন লেখকদের লেখার যোগান আসবে? উত্তরটা হল, আমাদের সবার জীবনেই অজস্র গল্প আছে। কিন্তু সেগুলো আমরা সবাই ধরে রাখতে পারছি কই? লেখকেরা এই কাজটা করেন। গল্প শিকার করার যে ক্ষমতাটা তারা পান, সেটি অতীন্দ্রিয়। কোন গল্পটা কখন তারা ধরবেন, সেটার অলৌকিক নির্দেশও আসলে আসে জগতের অজানা কোন উৎস হতে! সেই নির্দেশ অলৌকিক বলেই হয়তো লেখক নিজেও কখনো সেসব ধরতে পারেননা।

ব্যপারটা মোটেও উদ্ভট কিন্তু না। লেখালিখি কম বেশি যারা করেছেন, তারা এই ব্যপার খুব ভাল বোঝেন। যে উৎস থেকে তারা গল্প পান, উৎস বন্ধ হয়ে গেলে কিন্তু লেখক তখন আর লিখতে পারেন না। যে অবস্থাকে সোজাসাপটা ইংরেজী শব্দে বলা হয় রাইটার্স ব্লক। লেখকের মাথায় এই অবস্থায় অজস্র গল্প গিজগিজ করে। কিন্তু দেখা যায়, যখনি তিনি লিখতে বসছেন, তার ঘুম পাচ্ছে। কিংবা মনে হচ্ছে পরে লেখা যাবে। আরো অদ্ভুত সব ব্যপার হয়। দেখা যায় লেখক আসলে তার রাইটিং প্যাডে চিত্রকলার চর্চা শুরু করে দিয়েছেন! রবীন্দ্রনাথ মনে হয় এই কাজটা সবচেয়ে ভাল করতেন। কবিতা বা লেখার উপর কাটাকুটি করতেন। তৈরী হয়ে যেত অদ্ভুত সব রেখাচিত্র!

সাময়িক ব্লককে বড় বড় লেখকেরা বরাবর নেন রিক্রিয়েশনের অবসর হিসেবে। লেখা আসছেনা, তো লেখা যেন আসে, তার জন্য কতনা কান্ড! নির্জন কোন দ্বিপে চলে যাওয়া, পাহাড়চুড়ায় ঘর বানিয়ে থাকা। অনেক লেখক আবার ভ্রমণেও বেরিয়ে পড়েন! সবচেয়ে মজার গল্পটা আমাদের হুমায়ুন আহমেদেকে নিয়েই আছে। তিনি একবার রাইটার্সব্লকের অস্থিরতায় ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে চলে গিয়েছিলেন! আরেকবার লিখতে বসেছেন এক দুপুরে, ড্রয়িংরুমে শুকনো মুখে তার প্রকাশক বসা। দুইঘন্টা পর হুমায়ুন দেখলেন, দু পৃষ্ঠা তিনি লিখে ফেলেছেন। তবে দুপাতা ভরে আছে একটামাত্র শব্দে। শব্দটা হল আম! রাইটার্স ব্লককে তিনি বলতেন লেখকবন্ধ।

তবে দীর্ঘস্থায়ি ব্লক ভয়ংকর। সেই ব্লকেজ থেকে অনেকেই কিন্তু উঠতে পারেন না। অনেক সম্ভাবনাময় নতুন লেখক হুট করেই যে নেই হয়ে যান, এটা তার একটা কারণ। তবে মূল ব্যপারটি হল অস্থিরতা। একজন মানুষ সবসময় ভালবাসে সেই কাজটি করতে, যা করে সে আনন্দ পায়। এবং যেই আনন্দ পাওয়াটা তার জন্য সহজ, সেটাই সে বেছে নেয়। অনেক মজার মজার উদাহরণ কিন্তু আমার হাতে আছে।

আমাদের দেশে এখন স্যাটেলাইট খুব সহজলভ্য। ঘরে ঘরে ডিশের লাইন। এর ফলে আমাদের নারীরা একটা ব্যপারে চরম আসক্ত হয়েছেন। সেটি হচ্ছে হিন্দি সিরিয়াল। সারাদিন ঘৃহস্থালী অজস্র ক্লান্তিকর কাজের শেষে তারা এই সিরিয়ালগুলো দেখে বিনোদিত হন। শুরুর সেই বিনোদন এখন আসক্তিতে পৌছেছে। এমন অনেকে আছেন, প্রিয় সিরিয়ালটির একটা পর্ব মিস হয়ে গেলে তাদের হাসঁফাস শুরু হয়ে যায়। আবার একদল আছেন, যারা একটা পর্ব পরের দিন দুবার পুনঃপ্রচার হলে, সেটিও মিস করেন না! হিন্দি সিরিয়ালের ভালমন্দ নিয়ে পরে কখনো কথা বলা যাবে। প্রসঙ্গ ছিল আনন্দের উপকরণ।

মানুষ সেই সহজ আনন্দের উপায়টিই বেছে নেয়, যেটি তার সময়কে পূর্ণতা দেবে। এবং বারবার সেই আনন্দটি মানুষ সহজে লাভ করতে পারবে! হিন্দি সিরিয়াল এখন বঙ্গললনাদের সবচে সহজ আনন্দ লাভের উপায়। ঠিক একই ভাবে মানুষ গান শোনে, ছবি দেখে, প্রেম করে, বই পড়ে। অনেকে তো এখন ফেসবুক ছাড়া তাদের দিনের শুরুই করতে পারেন না। চা খাওয়ার আগেও অনেকে স্ট্যাটাস দেন, হাতে ধুমায়িত চায়ের চায়ের কাপ, কানে বাজছে Look into my eyes..

লেখকেরা ঠিক এখানেই একটু আলাদা। তারা লিখে আনন্দ পান। সৃষ্টির আনন্দ। যারা লেখক তাদের জন্য এই আনন্দ পাওয়া সবচেয়ে সহজ। কিন্তু যখন দেখেন, সহজ কাজটি করতে তাদের সমস্যা হচ্ছে, সমস্যাটির শুরু হয় তখনই। মানে জেলে মাছ কি ধরবে, জাল ধরতে গেলেই তার কান্না পায় এমন অবস্থা! আবার জাল থেকে এ দুরেও সরে যেতে পারেনা। কারণ জেলে হিসেবে একমাত্র মাছ ধরাটাই তার কাজ।

রাইটার্স ব্লক এক দিক দিয়ে ভাল। কারণ ব্লকের মধ্যে পড়লেই বুঝতে পারা যায়, লেখক প্রকৃতই একজন লেখক, নাকি শখের। শখের লেখকের এক্ষেত্রে মর্ম যাতনা কম। লেখা না আসলে দুঃশ্চিন্তা খুব একটা কাজ করেনা। কিন্তু সত্যিকার লেখকেরা জীবন থেকেই ঝরে যান অনেক সময়। কখনো বা তারা ভাবেন, পৃথিবীকে দেওয়ার মতো আর কিছুই তাদের কাছে নেই। রিউনুসুকে আকুতাগাওয়ার গল্পটা একারণেই শুরুতে বলেছিলাম। আমার জানা নেই, আকুতাগাওয়া তার শেষ দিনগুলিতে ব্লকের ভিতর দিয়ে গিয়েছিলেন কিনা। সেসব জানা যাবেনা হয়তো কখনো। কিন্তু ব্যপারটা সহজেই অনুমেয়.. কারণ একজন লেখক ততোক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু বরণের ইচ্ছা পোষণ করেন না, যতক্ষণ না তার মাথায় একটা হলেও নতুন লেখার আইডিয়া বা ইচ্ছা থাকে।

লেখকরা শিকারি। চারপাশের অনেক অজানা আর জানা গল্প তারা প্রতিনিয়ত শিকার করে চলেন। আর কে না জানে, শিকারি যখন দিনের পর দিন শিকার করতে পারেনা, সেই না পারার বোঝাটা বহন করাও তার জনয দুঃসাধ্য হয়ে যায়। অস্থায়ি রাইটার্স ব্লক লেখককে নতুন ভাবে জন্ম দেবার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু একজন লেখক কখনই তার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে মৃত্যু বরণ করেন না। নিজের কাছে অনেক আগেই তার মৃত্যু হতে পারে। কারণ একজন লেখক যখন আর লিখতে পারেন না, তিনি তো মৃতই!


তবে একটা ছোট্ট শেষ কথা আছে। সেই লেখকটির কথা ভাবতে আমার খুব আনন্দ লাগে, যৌবনে একদিন যার লেখকস্বত্তা মারা গিয়েছিল। শেষ বয়সে লেখক হঠাৎ বুঝতে পারলেন তার আবার জন্ম হয়েছে। কারণ হাত নিশপিশ করছে। মাথায় নতুন একটা গল্প ধোঁয়া পাকিয়ে উঠছে উপরের দিকে! সুতরাং এই লেখা পড়তে পড়তে যারা ভাবছেন যে ফুরিয়ে গেছেন, তাদের হতাশ হবার কিছু নেই। গল্প শিকারিরা এক জীবনে অজস্রবার জন্ম নিয়ে থাকেন!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন