শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

শামিম আহমেদের গল্প : রশিদা বেওয়ার কিসসা



বদনা হাতে খাটা পায়খানা থেকে বেরিয়ে ছায়ামূর্তিটাকে স্পষ্ট দেখতে পান রশিদা বেওয়া। দেখামাত্র তাঁর বুকের ভেতরে কী যেন একটা ধড়ফড় করে ওঠে। সাদা পিরহানই হবে, খুব বড় জোর মাখন রঙের টেরিকটের পাঞ্জাবি হতে পরে। সারোয়ারের আব্বা এই দুটো রঙ ছাড়া আর কোনও রঙ পরতে ভালবাসতেন না। কিন্তু সারোয়ারের আব্বা আসবেন কী প্রকারে! এক কুড়ি বছর আগে তো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। মৃত্যুর খবর শুনে এই দোওয়াই পড়তে হয়। তাতে মউতার কবরের আজাব কমে, দোওয়া পড়নেঅলার নেকি বাড়ে।
প্রায় বিশ বছর পর ফোঁপানো গলায় সারোয়ারের মায়ের মুখ দিয়ে আবার সেই দোওয়াই বেরিয়ে এল। দোওয়া পড়ার পর তিনি আর বাইরে বসে থাকার সাহস পান না, সোজা ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দেন, আর বিছানার উপর বসে ভাবতে থাকেন, তাঁর কাছের মানুষ তো গত কুড়ি বছরে কেউই গত হয়নি, একমাত্র তাঁর ভাইয়ের পাগল ছেলেটা ছাড়া। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। খ্যাপা ভাইপোর ইন্তেকালের খবর পেতে দিন দশেক লেগেছিল তাঁর। তখন ঘরে ঘরে এত মোবাইল ফোন চালু হয়নি। পোস্টকার্ডে বড় ভাইজান লিখেছিলেন, “বোন রশিদা বেওয়া অত্র পত্রে আমার হাজার২ দুয়া গ্রহণ করিবা পর সুমাচার এই যে তুমার মদ্যম ভাতিজা রজব আলি মিঞা গত ১২ জিলকদ জুম্মাবারে পূব মাঠের ল পুকুরে ছুঁচতে জাইয়া পানিতে ডুবে মারা যায়। চাষাবাদ লাগিয়াছে তাই তুমাকে চিঠি লিখা হয় নাই। উহার চল্লিশাতে তুমি আসিবা।’’

ভাতিজার চল্লিশাতে রশিদা বেওয়ার যাওয়া হয়নি। সেই চিঠির কথা এখন মনে পড়ছে কেন তাঁর! তবে কি রজব আলিকেই তিনি দেখতে পেলেন! কিন্তু সে এমন ধোপদুরস্ত পিরহান তো পরতো না! মউতের পর অবশ্য আল্লাহতালা কাকে কী পরান তা কি আর তাঁর জানার কথা! তবে ওই চেহারা সারোয়ারের আব্বা ছাড়া আর কারও হতে পারে না। এমন সময় মাইকে এশা নমাজের আজান ভেসে আসে। দরজা খুলে এ বার তাঁকে বাইরে বেরোতে হবে। কিন্তু বেশ ভয়-ভয় লাগছে তাঁর। আঞ্জির গাছের নীচেই লোকটা দাঁড়িয়েছিল। তাঁর দিকে কি হাত নাড়ছিলেন সারোয়ারের বাপ? সারোয়ারের মায়ের বুকে তোলপাড় শুরু হল। তিন বার ‘কুল’ পড়ে তিনি সিনায় ফুঁ দিলেন। তার পর ঘরের দেওয়ালে হাত ঘষে তাহাম্মুম সারলেন। পানি না পেলে তেমনটাই করার নিয়ম। এতে ওজুর কাজ হয়ে যায়। এই শেষ বয়সে তিনি আর নমাজ কাজা করতে চান না।

মৃত্যুর আগে সারোয়ারের বাপ তাঁকে কম জ্বালিয়ে যায়নি। বছর খানেক ধরে সে মিনশে বিছানাতেই পড়েছিল। দাওয়াই খাওয়ানো থেকে শুরু করে হাগামোতা করা্নো সবই একা হাতে করেছিলেন রশিদা বিবি। মেয়ে বুড়ির শাদি হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। বাপের পেরেশানির খবর শুনে একবার কাঁদতে কাঁদতে এসেছিল সে। তার আসা তো না, সে আর এক হাঙ্গামা। তার ছেলের দুধ গরম করা থেকে শুরু করে জামাইয়ের নাস্তাপানি করতে তাঁর দম ছুটে গিয়েছিল। বুঝেছিল কিনা কে জানে! তার পর আর বাপকে দেখতে আসেনি। সারোয়ার কলকাতায় চামড়ার কারখানায় কাজ করে। বউবাচ্চা নিয়ে সে ওখানেই থাকে। মাঝেমধ্যে অবশ্য টাকাপয়সা পাঠায়। আর ছোটছেলে মানোয়ার সুরাটে গয়নার দোকানে কাজ করে। বাপের চিন্তা তারা কেউ করে না। বিমারি হলে তারা তো কেউ আসবে না, ইন্তেকালের পয়গাম পেলে এসে গোরের মাটি দিয়ে যাবে। সারোয়ারের বাপের সব দায়িত্ব যেন রশিদা বিবির একার! ওই গু-মুত সাফ করতে কম খোয়ার হয়নি তাঁর! প্রথম দিকে মুখে ভাতই তুলতে পারতেন না। সব খাবারে অরুচি। তার পর ধীরে ধীরে অবশ্য সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মরণের দিন কয়েক আগেও সারোয়ারের বাপ খেল দেখিয়েছিল বটে!

“ওই দেখ ওই দেখ, হারামজাদি মাগি আবার এসেছে। আঞ্জির গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রগড় দেখতেচে। আরে আমার মরুনে তুর অতো হাঁসি ক্যানে রে গুখাকির বিটি!’’ সারোয়ারের বাপের এই বিলাপ শুনে সারোয়েরের মা চমকে উঠেছিলেন। আজরাইল কখন কোন বেশে আসে তারা কি আর সে সব কথা জানে! তার উপর মুখ-খিস্তি করলে কবরের আজাব কি আরও বেড়ে যাবে না! রশিদা বিবি আঞ্জির গাছের নীচে তাকিয়েও কিছুই দেখতে পেতেন না, অথচ সারোয়ারের আব্বার কাছে শুনেছেন, অল্পবয়সী কোনও মেয়ে হাতের ইশারায় তেনাকে ডাকছে আর বলছে, “আয় আয় আমার সাতে আয়; তুকে আমি সাত আসমান ঘুরাবো।’’বহু দিন পর রশিদা বেওয়া সেই আঞ্জির গাছের নীচে সাদা অথবা মাখন রঙের পিরহানঅলা পুরুষমানুষকে দেখে তাই খুব ঘাবড়ে যান। এও কি তাঁকে সাত আসমান ঘোরাতে চায় না কি! তাঁরও কি মরণের কাল ঘনিয়ে এল! না! এ বার ওই আঞ্জির গাছটাকেই কেটে ফেলতে হবে। ওই ফলবতী বৃক্ষের সায়েত খুব খারাপ বলেই তাঁর মনে হতে লাগলো।

সে বার সারোয়ারের আব্বাকে ঝাড়ফুঁক করতে এসেছিলেন মধ্যমপাড়া মসজিদের মৌলবি সাহেব। তিনি বলেছিলেন, “সারোয়ারের আব্বাজানকে খবিস জ্বিনে ভর করেছে। কুরানখানি করতে হবে আপনাদের বাড়িতে।’’ ঘরের মধ্য থেকে সারোয়ারের মা উত্তর দিয়েছিলেন, “সারুয়াল আসুক। উয়ার সাতে কতা বুলে আপনাকে জানাবো।’’ সারোয়ার আসেনি। তাই তার সঙ্গে পরামর্শ করে আর কিছুই জানানো হয়নি মৌলবি সাহেবকে।

সারোয়ার অবশ্য এল, তার ঠিক পরের হপ্তায়। আসতে বাধ্য হল। উনি ইন্তেকাল করলেন। সেই খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল সারোয়ার, তার বউবাচ্চাতাও। মেয়ে-জামাই থেকে শুরু করে সব আত্মীয়রা এসে মাটি দিয়ে গিয়েছিল। একটা গরু জবাই করে খানা হয়েছিল। এত লোক যে সেই গোস্তেও নাকি কুলোয়নি! মানোয়ার শুধু আসতে পারেনি। অত দূর থেকে এলে সে লাশ দেখতে পেত না। তবে খবর পাওয়ার পর সে খুব কান্নাকাটি করেছিল। চল্লিশার দিন এসে সে বাপের কবর জিয়ারত করে যায়। এ বার কি সেই মৌলবি সাহেবকে ডাকতে হবে? কুরানখানি করে যদি কোনও সুরাহা হয়! না, রশিদা বেওয়া মরতে চান না! এই তিন কুড়ি বছর বয়সেও তিনি দিব্যি শক্তপোক্ত আছেন। তাঁর মরণের এখনও ঢের সময় বাকি। কিন্তু এ ভাবে একা থাকাটা তাঁর আর উচিত নয়। জ্বিনের সঙ্গে তিনি এক বাড়িতে কী ভাবে কাটাবেন! তাও সঙ্গে যদি কেউ একটা থাকতো! কিন্তু তাঁর সঙ্গে কেই বা থাকবে! আজকাল কাজের লোকও পাওয়া দুষ্কর। বাচ্চা ছেলে বা মেয়ে পাওয়া যায় কিন্তু তারা সন্ধ্যা হতে না-হতে এমন ঘুম লাগায় যে ওদের থাকা না-থাকা দুইই সমান। কী যে করেন রশিদা বেওয়া, ভেবে কোনও দিশা পান না।

“আর অ্যাকটো নিকা করেন জি সারুয়ালের মা! সারুয়ালের আব্বাজান নাই, ছেলিমেয়ি থেকিও নাই। নিকা করল ক্ষেতি কী?”

পাশের বাড়ির মতু সকালে এঁটো বাসন ধুতে ধুতে সারোয়ারের মায়ের গল্প শোনার পর বলেছিল। সারোয়ারের মা এই মশকরায় বেশ আনন্দ পান এবং মতুকে জিজ্ঞাসা করেন, “হা-টি মাগি, তুর উমর আমার চাইতে এক কুড়ি বৎসর তো কুম হবেই, তা তু নিকা করলি না ক্যানে?” মতু বেওয়া হাসে। সেই হাসির মধ্যে কিছু লুকনো ছিল কিনা তা আর বোঝা গেল না কারণ সে দিন সকালের আকাশ ছিল মেঘলা। এমন মেঘলা দিনেও মতু বেওয়া হেসে ওঠে। বলে, “পাঁচ বাড়িতে বাঁদিগিরি কর‍্যা খাই, নিকা করার সুমুয় কুতা! আমরা তো আপনার লগে আইমাদারের ঘরের বিবি লই জি আমাদের নিকা করার লোক দাঁড়ি আচে! আর আমি তো আপনার মুতুন রেতি মরদ মানুষের ভূত দেকি না!”

সারোয়ারের মা মতুর কথার খোঁচাটা ধরে ফেলেন, আবার মতুর বাক্যের ভিতর যে রহস্যময় কোনও মরদমানুষ লুকিয়ে আছে সেটাও বুঝতে পারেন। মতুকে তিনি নাছোড়বান্দার মতো প্রশ্ন করেন, “হা-লো বেওয়া, আমাকে নিকা করার লেগি তুর কুন ভাতার দাঁড়ি আচে?”

“ক্যানে, লুহা মাস্টার!” মতুর উত্তর যেন তৈরিই ছিল।



সে বার গাজির মেলা উপলক্ষে গ্রামের লোকেরা যাত্রা করেছিল। যাত্রার নাম “দেবী সুলতানা”। হয়েছিল ছোট মিঞার খামারে। কোঠার উপরে বসে অনেকের সঙ্গে সে যাত্রা দেখেছিলেন রশিদা বেওয়াও। যাত্রার মেয়েগুলোকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল দাসকলগ্রাম থেকে। সেই সঙ্গে বাজনদার, মেকাআপ ম্যান আর লাইট। এ তল্লাটে কারেন্টের আলো নামেই আছে। সব শুষে নেয় মাঠের পানি তোলার কল। ছ মাসে-ন মাসে সেই আলো কখনও দেখা যায়। তাও সাব-মার্সিবল পাম্পের দৌলতে টিম টিম করে জ্বলে।

দেবী সুলতানা নবাবজাদি। মুর্শিদকুলি খাঁর বেটি। এক হিন্দু পুরুতের সঙ্গে সে পিয়ার করে। এই নবাবও নাকি হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে। তার বিটি হিন্দুর সঙ্গেই তো পালাবে! পিরিতের খবর পেয়ে নবাব যখন খাপ্পা তখন পুরুত ভৈরব ঠাকুর সেখান থেকে বেপাত্তা হয়ে গেল। চার দিকে নবাবের সৈন্য খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। এমন সময় হাতে বল্লম নিয়ে স্টেজে ঢুকল এক সৈন্য, সে পয়গাম নিয়ে এসেছে। মাথায় তার পাগড়ি, গায়ে ঝলমলে জরিরপোশাক। সৈন্য গলা কাঁপিয়ে বলছে, “শাহেনশা, সেই হারামজাদা ঠাকুরকে খুঁজে পেয়েছে এই অধম।’’ নবাবের মুখে তখন ক্রুর হাসি। তিনি অট্টহাস্য করতে করতে বললেন, “কোথায় সেই পাজির পাঝাড়া? সামনে নিয়ে আয় তাকে! আজ নিজের হাতে আঁশবটিতে করে তাকে আমি টুকরা টুকরা করব।’’

সৈন্য জবাব দিল, “মহারাজ, গুস্তাখি মাফ করবেন। আগে আমার বাত তো সুনেন।’’

“কী বলবি, জলদি জলদি বল। আমার হাতে টাইম নাই। যতক্ষন না সেই খাম্মোশ বেয়াদপকে আমি কোতল করছি ততক্ষণ আমার জানে শান্তি নাই।’’

“হুজুর, পাহাড়ের গায়ে সেই শয়তানকে দেখে আমি তার পিছনে ধাওয়া করি। সে আমাকে দেখেই ছুট লাগায়। আমিও তার পিছু ছাড়ি না। তার পর সেই শয়তানকে আমি হাতের নাগালে পেয়ে তার টুঁটি টিপে ধরি। কোমরবন্ধ থেকে তলোয়ার বের করে তার মুণ্ডু খসাতে গেছি মাগার সে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে চলে গেল।’’

মুর্শিদকুলি খাঁ এ বার সজোরে লাথি মেরে সৈন্যটিকে ফেলে দেন। দ্বিতীয় বার পদাঘাত সহ্য করতে না পেরে সে স্টেজ থেকে নীচে পড়ে যায় এবং সে দৃশ্য দেখে দর্শকরা হাসিতে ফেটে পড়ে। সৈন্যটি তখন নবাবের উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, তার উপর তার মাথার পাগড়ি খসে গিয়েছে। এ বার সৈন্যটিকে বেশ চেনা-চেনা লাগল সবার। আরে এ যে লোহা মাস্টার! সেই প্রথম লোহা মাস্টারকে দেখেন রশিদা বেওয়া। চড়া ডায়নামোর আলোতে।

কেরোসিনের বাতির আলো-অন্ধকারে বসে রশিদা বেওয়া লোহা মাস্টারের কথা ভাবছেন। তিনি শুনেছেন, খুব বেশি দূর লেখাপড়া শেখেনি লোহা। এমনকি গ্রামের স্কুলের গণ্ডী পার হয়েছে কি না সন্দেহ। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বাড়িতে বসে অক্ষর চেনায় আর তাতেই সে মাস্টার বনে গেল। অ-আ আর নামতা পড়ানো ছাড়া আর কিছুই পারে না লোহা। রশিদা বেওয়ার ছেলে মানোয়ারও দিন কয়েক পড়েছিল লোহার কাছে। সে বহু দিন আগের কথা। আজ রশিদা বেওয়া ভাবছেন, তখন যদি লোহার সঙ্গে তিনি দু চার কথা বলতেন, কী এমন খারাপ ব্যাপার হতো! কিন্তু আইমাদার ঘরের বিবি, পর্দানসীন হয়েই থাকতে হবে। লোহা যে পরপুরুষ! আইমার জমি চলে গেলে কী হবে, ঠাট রয়েছে ষোলো আনার উপর আঠারো আনা। রশিদা বেওয়া ভাবলেন, মতু বেওয়াকে দিয়ে লোহাকে একটা খবর পাঠালে কেমন হয়! তার পরেই ইচ্ছেটাকে সংযত করলেন। এ কী ভাবছেন তিনি? ছিঃ! এই বুড়ো বয়সে ভীমরতি হল নাকি তাঁর! আর কীই বা খবর পাঠাবেন তাকে? গ্রামের লোক জানতে পারলে তাঁর আর শরমের শেষ থাকবে না! ছেলেমেয়েরা জোয়ান হয়েছে, তারাই বা মুখ দেখাবে কেমন করে! না, না! অমন ভাবনা থেকে তাঁর সরে আসা উচিত। হ্যারিকেনের আলোটাকে একটু উশকে দিলেন তিনি। হঠাৎ কী মনে হল, আরশিতে নিজের মুখটা দেখতে লাগলেন। নাহ, এমন কিছু বয়স হয়নি তাঁর! রাতের বেলা নাকি আরশিতে মুখ দেখতে নেই, এতে ফেরেশতারা ক্রুদ্ধ হন। তিনি আয়নাটা নামিয়ে রেখে বারান্দা থেকে আবার দেখতে পেলেন আঞ্জির গাছের নীচে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। ভয়ে তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। ঘরে চলে যাবেন, এমন শক্তিও তাঁর নেই। এ বার খিলখিল করে কে যেন হেসে উঠল। মেয়েলি গলা। তা হলে সারোয়ারের আব্বাজান মরণকালে যাকে দেখতে পেতেন সেই আওরত আবার এল নাকি! আজরাইল নিশ্চয় আওরতের বেশ ধরে তাঁর জান কবজ করতে এসেছে।

“আরশিতে রেতির ব্যালায় মুক দেখি কী হবে বোবিবি? আমি লুহাকে খপর দিয়্যাছি। সে মিনশে তো হেঁসি খুন হয়। কাল দ্যাকা করবি।’’ মতুর গলার স্বর শুনতে পান রশিদা। যাক বাবা, বাঁচা গেল! এত ভয় পেয়েছিলেন যে নিজের ঘর অব্দি যাওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু মুখে ‘কিছুই হয়নি’ গোছের ভান করে রশিদা বেওয়া বলে উঠলেন, “রেতির ব্যালা নাং করি ব্যাড়াবি আর লোককে ডর দেখালি সে ভিরমি খাবে নাকি!”

মতু এসে তাঁর পাশে বসে। দুই স্বামীহারা গ্রাম্য রমণী নানবিধ কথায় ডুবে যান। তার ফাঁকেই রশিদা বেওয়া মতুকে জিজ্ঞাসা করেন, “লুহা মাস্টার শাদি করেনি ক্যানে রে?”

মতু বলে, “আপনার লগে। আপনাকে নিকা করব্যা বুলেই না...”। এর পর তার খিলখিল হাসিতে আর কিছুই শোনা যায় না।



“কী দিনকাল পড়ল, এত দিন জানতাম ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পিরিত করে বেড়ায়, একন দেখি কবরের দিকে পা-বাড়ানো মাগিরাও পেরেম-পেরেম খেলা করতেচে। এত রস ওই বুড়ি মাগির!”

“শালা লুহা মাস্টার আর মাগি পেলনা জি, উ হারামি ব্যাটা ছেলেদের কলঙ্ক গো!”

“আগে ওই শালিকে গাঁ থেকে খেদাতে হবে। নইলে গুটা গেরাম পচে যাবে জি!”

পুকুরের ঘাটে, পাড়ার রোয়াকে, চায়ের দোকানে, এমনকি পার্টি অফিসেও এমন কথা ভেসে বেড়াতে লাগলো। লোহা মাস্টার আর রশিদা বেওয়ার প্রেমকাহিনি এখন স্কুলের ছেলেমেয়েরাও আলোচনা করে। বাদ ছিল কেবল মসজিদ। মসজিদে অন্যের গিল্লা গাওয়া উচিত নয়, মসজিদ হল খোদার ইবাদতখানা। সেখানে এসে ওজু করে নমাজ পড়ে আর ধর্মের কথা শুনে চলে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু নিয়ম তো আর সকলের জন্য নয়। তাই এক জুম্মাবারে কথাটা উঠল। তুললেন যিনি তিনি গ্রামের মাতব্বর ফাহিম মিঞা, যার কথায় বাঘে-গরুতে এক ঘাটে পানি খায়। ফাহিম মিঞার মুখের উপর কথা বলে এমন মানুষ এই গ্রামে নেই। সকলেই শুনল তাঁর কথা, ইমাম থেকে তালিব-ই-ইলম সবাই। ফাহিম মিঞা মসজিদে বসেই বললেন, “রেতির বেলা সারুয়ালদের বাড়ির পাশে তালগাছের মাথায় টর্চ ফুকাস ফেলে লুহা মাস্টার, আর রশিদা বেওয়া তখুন রেডি হয়। এই খারাবি আর গেরামে চলতে দেয়া যায় না। আমাদের ইবাদত-বন্দেগি বলে তো একটা বেপার আছে। এই গুনাহ চললে তা কবুল হয় কেমুন কর‍্যা? মৌলবি সায়েব আপনি ফতোয়া জারি কর‍্যান, অদের চুনকালি মাখি গাঁ থেকি খেদাবো।’’

মৌলবি সাহেব চোখের ইশারায় কিছু একটা বলতে চাইলেন ফাহিম মিঞাকে, তার পর সটান উঠে গেলেন বেদিতে যেখানে দাঁড়িয়ে জুম্মার খুৎবা পড়া হয়। মৌলবি সাহেবের খুৎবা পড়াকালীন অল্পবয়সীরা ফিক-ফিক করে হাসতে লাগল আর ফিসফিস করে সেই প্রেমকাহিনির চর্চা শুরু করে দিল। বড়রা ভেবে পেল নয়া, মৌলবি সাহবের বকলমে কী ফতোয়া জারি হবে? এক শো কোঁড়া, না চাবুক! নাকি পাথর ছুঁড়ে ঘায়েল করা হবে দু জনকেই!

লোহা মাস্টার কিন্তু বুঝে গেল ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। জুম্মার পর দিন মাঠে প্রাতঃকৃত্য সারতে গিয়েছে সে, তখনও দিনের আলো ভাল করে ফোটেনি। এমন সময় তার পাঞ্জাবির পকেটে বেজে উঠল মোবাইল ফোন। ‘হ্যালো’ বলতেই ও পারের কন্ঠস্বর ভেসে এল, “শালা, তুর ধুন কেটে লুবো; হা বে বাঞ্চোত, এত যদি রস তুর, চুহার গত্তোয় ঢুকা না বে! গেরাম ছেড়ি চল্যা না গেল্যা শালা জান চলে যাবে তুর।’’

লোহা মাস্টার বেশ ভয় পায়। তার প্রাতঃকৃত্য তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। সে প্রাতঃকৃত্যের স্থানটা পরিবর্তন করে গলায় তেজ ফুটিয়ে বলার চেষ্টা করে, “শালা, আমাকে থিরেট করচিস!” কিন্তু তার মিনমিনে গলা অন্য প্রান্তে শেষ পর্যন্ত পৌঁছয় না। সে বোঝে, এ নিশ্চয় ওই শালা ফাহিমের কাজ। ইতিমধ্যে ফোন কেটে যায়। লোহা মাস্টারের সামনে দিয়ে অন্য কেউ হেঁটে যাওয়াতে সে উঠে দাঁড়ায়। লোকটি একটু আড়ালে প্রাতঃকৃত্য সারতে বসলে লোহা মাস্টার পায়খানা সম্পূর্ণ না করেই পাশের ডোবাতে শৌচকার্য সেরে তড়িঘড়ি বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।



অবশেষে লোহা মাস্টারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হয়। মৌলবি সাহেবের ফতোয়া জারির আগেই সে পাশের গ্রামে তার মামাতো ভাইদের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। ফাহিম মিঞা যখন বলেছেন, তখন আর এই গ্রামে বাস করা চলে না। তা ছাড়া চাবুক অথবা কোঁড়া কোনওটাই তার সহ্য করার মতো বুকের পাটা নেই। কোনও দিন ছিলও না। মামার বাড়িতে গোটা কয়েক ছেলেমেয়ে জোগাড় করে পড়াবে সে, তাতে করে যদি পেটটা অন্তত ভরে।

এ দিকে রশিদা বেওয়াও আর আঞ্জির গাছের নীচে কোনও জ্বিনপরি বা মরদ মানুষের ভূত দেখেন না। এতে করে তাঁর শান্তি পাওয়ারই কথা। কিন্তু লোহা মাস্টার গ্রাম ছাড়ার পর তাঁর মন থেকে সব স্বস্তি ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গিয়েছে। লোহা মাস্টারের যাওয়ার দিন মতু শাড়ির আড়ালে লুকিয়ে একটা ছোট্ট কাগজের বাক্স এনে দিয়েছিল তাঁকে। ওটা নাকি লোহা মাস্টার দিয়েছে। রশিদা বেওয়ার সেটা আর খুলে দেখার ইচ্ছা করেনি। কী হবে! তাঁর জন্যই লোকটাকে বাপের ভিটে ছেড়ে অন্য গ্রামে গিয়ে বাস করতে হচ্ছে, এই কথা ভাবলে তিনি আরও অস্থির হয়ে পড়েন। এখন রাতের জন্য অপেক্ষা, আঞ্জির গাছের নীচে সেই পুরুষ অথবা মহিলারূপী আজরাইলের অপেক্ষা করেন রশিদা বেওয়া। আজরাইল তাঁর জান কবজ করে নিয়ে যাক, তাঁর আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না একটুও।

সন্ধ্যা নামার পর তাঁর বারান্দায় বসে থাকতে ইচ্ছা করল না। ঘরের মধ্যে ঢুকে তিনি খিল এঁটে দিলেন। তার পর বাক্স থেকে বের করে আনলেন বহু পুরনো একটা শাড়ি। সবুজ রঙের। বেশ ভারি। কিন্তু ভাঁজে ভাঁজে যেন ছিঁড়ে গিয়েছে শাড়িখানা। অথচ প্রতি বছরেই ভাদ্র মাসের রোদ খাওয়ানো হয়েছে। সাদা থান ছেড়ে রশিদা বেওয়া তাঁর বিয়ের শাড়িটাই পরলেন। হ্যারিকেনের শিখাটা উশকে দিয়ে আরশিতে তাকিয়ে দেখলেন নিজের প্রতিবিম্ব। তার পর এক অজানা পুলকে তাঁর হাত চলে যায় লোহা মাস্টারের পাঠানো কাগজের বাক্সটার দিকে। সেটা খোলামাত্র বেরিয়ে আসে একটা মোবাইল ফোন। রশিদা বেওয়া রুবাবায় ভেসে গেলেন। আর সেই যন্ত্রটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি এক অনাবিল সুখের আস্বাদ পেলেন। সারোয়ারের বাপের সঙ্গে বিয়ের পরও এই অনুভূতি হয়নি তাঁর। এমনকি যে দিন সারোয়ার প্রথম তাঁর বুকের দুধ খায়, সেদিনও না। কী আছে ওই যন্ত্রটার মধ্যে! কোনও ফেরেশতা লুকিয়ে আছে সেখানে, যে তার মনের কথা পৌঁছে দিয়ে আসবে লোহা মাস্টারের কাছে! সবুজ রঙের শাড়িটা খুলতে পারলেন না তিনি। সেটা পরেই বুকে মোবাইলফোন আঁকড়ে শুয়ে পড়লেন রশিদা বেওয়া।



ছোট মিঞার খামারে আবার যাত্রাপালা হচ্ছে। সেই “দেবী সুলতানা”। ভৈরব ঠাকুর দেবী সুলতানাকে নিয়ে পালাচ্ছে। পথে পড়ছে কত নদীনালা, পাহাড়পর্বত। দু জনেই ছুটছে। তাদের পেছনে ধাওয়া করে আসছে নবাবের অসংখ্য সৈন্য। লোহা মাস্টার সেজেছে ভৈরব ঠাকুর। সবুজরঙা শাড়ি পরে বুকে মোবাইল ফোন আঁকড়ে ভৈরব ঠাকুরের পাশে-পাশে ছুটছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবকন্যা দেবী সুলতানা।






লেখক পরিচিতি
শামিম আহমেদ

জন্ম ১৯৭৩। মুর্শিদাবাদের সালারে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র।
পেশা বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০ টি।
বর্তমানে কলকাতায় বসবাস।






২টি মন্তব্য: