শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

ইঁদুর গল্পের পাঠপ্রতিক্রিয়া : সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম

প্রায় ৬০ বছর আগে লেখা ইঁদুর এখনো সমসাময়িক গল্পই মনে হয় আমার কাছে


গল্পপাঠ : . সোমেন চন্দের ইঁদুর গল্পটি পড়েছেন?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : পড়েছি ।


গল্পপাঠ :  পড়লে কখন পড়েছেন?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : গল্পটি আমার সম্প্রতি পড়া ।


গল্পপাঠ :  কার মাধ্যমে বা কিভাবে গল্পটি পেয়েছিলেন?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : বাংলাদেশে ‘দাঙ্গার গল্প’ নামে ঢাউস সাইজের একটি বই বের করা হয়েছে। আমি তার ভেতর খুঁজে না পেয়ে বেশ কয়েকজন পড়ুয়া বন্ধুকে অনুরোধ করেছিলাম ‘ইঁদুর’ গল্পটির জন্য, পাইনি। কদিন আগে ফেসবুকে ‘গল্প পাঠ’ এ দাঙ্গা নিয়ে কয়েকটি গল্প চোখে পড়ায় তাঁদের মেইল করলাম সেই ইঁদুরের জন্য। পরেরদিনই আমাকে গল্পটি পিডিএফ ফাইলে পাঠানো হোল ।


গল্পপাঠ :  গল্পটি পড়ার পরে আপনার পাঠ প্রতিক্রিয়া কি ছিল?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : প্রতিক্রিয়া মিশ্র অনেকগুলো কারণে। এটা এমন একটা সময় নিয়ে লেখা, যে সময় আমাদের প্রজন্মের অনেক অনেক আগের ইতিহাস। মন্বন্তর নিয়ে বাংলায় আর কোন গল্পে এত পরিপূর্ণ বর্ণনা পাইনি । যেমন ধরুন, একটি ইঁদুর মারার কল একটি পরিবারে খুব প্রয়োজন অথচ সেই শস্তা যন্ত্রটি কিনবার সামর্থ্যটুকু তাদের নেই। এই থেকে যে গল্পের শুরু। সেখান থেকে চলে গিয়েছে বুর্জোয়া শ্রেণীর চরিত্র বর্ণনায় । এ যায়গায় লেখক কেঁচো ও জোঁক দুটো প্রাণীর প্রসঙ্গ এনে বুর্জোয়া শ্রেণীকে তুলে ধরেছেন । একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে এক ঘটি দুধ ইঁদুর এসে উলটে দেয়ায় সেই পরিবারের মানুষ গুলোর প্রতিক্রিয়ার বর্ণনায়, সে সময়ের গোটা সমাজের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এমন বেশ কিছু বিষয় রয়েছে ইঁদুর গল্পে যা খুব সহজে ভুলে যাবার মত নয়।

ইঁদুর গল্পটি বুঝতে হলে সেই সময়ের দুর্ভিক্ষের কিছু কথা পাঠকের আগে থেকে জানা প্রয়োজন। ১৯৪৩-৪৪ সালে ভারতের দুর্ভিক্ষ ছিল বিশ শতকে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। ব্রিটিশ সরকারের কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট এই সংকটে ৪০ লাখ লোক মারা গিয়েছিল । খাবারের অভাবে আগের কোনো দুর্যোগে এত বেশি মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এত বড় মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়ে ইতিহাসের বইগুলোতে তেমন কোনো কথা কিন্তু নেই। এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হচ্ছে এর সময়কাল। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হিটলারের জার্মানি পুরো ইউরোপকে তছনছ করে ফেলছিল। ইহুদি, স্লাভ ও রোমানদেরকে নির্মূলের পথে আগাচ্ছিলেন হিটলার। যেখানে হিটলারকে ১২ বছর নিতে হয়ছে ৬০ লাখ ইহুদিকে নিধন করার ফর্মূলা নিয়ে আসতে, সেখানে তাদের সমগোত্রীয় ব্রিটিশরা মাত্র একবছরের মধ্যেই ৪০ লাখ ভারতীয়কে দুর্ভিক্ষে শেষ করে দিলো। ১৯৪৩ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের দল কলকাতায় ভিড় জমায় যাদের বেশিরভাগই রাস্তায় মারা যায়।

এমন সময়ের কথা পরিবারের মানুষদের ক্ষুধা মন্দা, ব্যক্তি সম্পর্কের ভাঙ্গন- বিপর্যয় আবার সামান্য ছয় আনার জুতো কেনায় জগৎ জয়ের উল্লাসের মত বর্ণনা যে গল্পে তুলে ধরেছেন সোমেন চন্দ, সেই গল্প নিয়ে আসলে কিছু বলা খুব কঠিন। গল্প পড়তে যেয়ে ‘সুকু’ কে আমার মনে হয়েছে লেখক নিজে। যে সুকুর মুখ দিয়ে নিজের পরিবারের কথা বলেছেন। বলেছেন ইয়াসিনের সাম্যবাদের স্বপ্নের কথা। ট্রেড ইউনিয়ন আর একজোট হবার আকাঙ্খার কথা।

দেখুন, বেশীরভাগ মানুষ এখন গল্প পড়ে বিনোদনের জন্য । যা সহজ ও আনন্দদায়ক। কিন্তু আমাদের পূর্ব প্রজন্ম, আমাদের দেশ- সমাজ কতটা পরিবর্তন এর ভেতর দিয়ে আজ এখানে এসেছে, কি তার ইতিহাস সেটা বুঝতে হলে সহজ পাঠের দ্বার গ্রস্থ হলে কিছুই জানা হয়না। এ কথাগুলো এ কারণে বললাম, কেননা ইঁদুর ও আদাবের মত গল্প সব পাঠকের জন্য নয়। এই গল্প আপনাকে এমন এক সময় আর জীবনের এমন কিছু অনুভূতির মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয় যা অপ্রস্তুত করে তোলে । নিজের স্বত্বায় ধাক্কা দেয়। আজকের বর্তমানটার পেছনে যে অনেক জয়-পরাজয়, অপ্রাপ্তি আর ব্যররথতার তীব্র দহনের দাগ রয়েছে তা দেখিয়ে দেয় । ইঁদুর তেমনি শক্তিশালী এক গল্প যা যন্ত্রণা ক্লিষ্টভাবে মোহগ্রস্থ করে রাখে পাঠককে।


গল্পপাঠ : এই সময়ে গল্পটি বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কি।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : প্রশ্নটি কিছুটা জটিল। কখনো গল্প লেখা হয় সমসাময়িক বাস্তবতায় কখনো পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী । সম্প্রতি একটা কথা মনে হয় যে, পাঠকের চাহিদাও আবার তৈরি করেন লেখকেরা । আমি যদি সমসাময়িক হিসেবে ধরি তবুও ‘ইঁদুর’ যেমন সেই দুর্ভিক্ষের সময়ের গল্প তেমনি এখনকারো গল্প । হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘পাক সার জমিন সাফ বাদ’ এ একটা টার্ম ইউজ করেছিলেন, ‘ঠাণ্ডা আগুন’ । যে আগুন অধিক পোড়ায় কিন্তু লেলিহান শিখা দ্যাখা যায়না । সেই দুর্ভিক্ষের সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু আসলেই কি সমাজের ভেতরের মন্বন্তর থেমেছে ? ইঁদুর গল্পে সুকুর পরিবারের মত হাজার হাজার পরিবার এখনো রয়েছে দুই বাংলায়। এখনো কৃষক ফলন না পেয়ে পথে বসে যায় । মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ফসল ফলানোর দামটুকুও হাতে পায়না কৃষক। ফলে তারা রাস্তায় আলু, টম্যাটো ফেলে প্রতিবাদ করে। অথচ শহরের মানুষেরা আগুনের দামেই সেই সব্জি বাজার করে। এখনো সুকুর বাবার মত অনেক পিতা একজোড়া প্লাস্টিকের স্যান্ডেল কিনে বর্তে যায় । আমরা প্রযুক্তির সহজলভ্যতা দেখে ভাবি আধুনিকতার শীর্ষে উঠেছি। কিন্তু এর পেছনের অন্ধকারটুকু যে আরও ঘনীভূত হচ্ছে তা অস্বীকার করে যাই । সেই প্রেক্ষাপটে প্রায় ৬০ বছর আগে লেখা ইঁদুর এখনো সমসাময়িক গল্পই মনে হয় আমার কাছে। আর ইঁদুর গল্পে লেখকের দ্যাখা ও যে বর্ণনা তা নিয়ে কথা বলা আমার জন্য দুঃসাহস দেখানো ।

----------------------------------
সোমেন চন্দের ইঁদুর গল্পটি পড়ার লিঙ্ক : 


লেখক পরিচিতি
সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম

ফরিদপুর জেলার দয়ারামপুর গ্রামে।
পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও গণমাধ্যম নিয়ে গবেষণা করছেন।
২০০৬ থেকে সাংবাদিকতা করছেন।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : পা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন