শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

অস্থির সময়ের গল্প লিয়ে আলাপ : সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম-- লিখতে গেলে মন্দিরে হামলার ঘটনা লেখার আগে মাথায় আসে নিজের নামের শেষের পদবীটা ।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম গল্পকার, গবেষক। পেশায় সাংবাদিক। পা নামে তাঁর একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণা হিসেবে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা, দেশভাগ, রিফুজি, গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করেছেন।
সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। এখানে তাঁর সঙ্গে অস্থির সময়ের গল্প নিয়ে যে আলাপ হয় তা নিন্মে পত্রস্থ হল।

গল্পপাঠ :  সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী-দাঙ্গা বিরোধী  কোন কোন বা কার কার গল্প পড়েছেন?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম :  সমরেশ বসু- আদাব, বনফুল- কসাই, বিভূতিভূষন- গায়ে হলুদ, গৌরিকিশোর- প্রেম নেই, কৃষণ চন্দ- পেশোয়ার এক্সপ্রেস, খুশবন্ত সিং- ট্রেন টু পাকিস্তান, সাদাত হাসান মান্টো- ঠান্ডা গোশত দাঙ্গা নিয়ে পড়া আমার কাছে অন্যতম সেরা গল্প। এছাড়াও বুদ্ধদেব বসু, অমর মিত্র সহ আরও বেশ কজন লেখকের গল্প পড়েছি । শৈলেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘দাঙ্গার ইতিহাস’ বইতে প্রতি অধ্যায়ে যেসব সত্যি ঘটনার গল্প রয়েছে তা অনবদ্য । অনেক গল্পের নাম এখন মনে নেই ।


গল্পপাঠ : আপনি কি মনে করেন এ ধরনের অস্থির সময় নিয়ে গল্প খুব কম লেখা হচ্ছে?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : কম লেখা হচ্ছে। এর প্রধান কারণ মনে হয়, লেখকেরা পাঠকের কাছে সহজ-পাঠ-যোগ্য লেখা তুলে দিয়ে খ্যাতি পেতে চান, আর একটি কারণ সমসাময়িক বাস্তবতা। এখন অস্থিরতা শুধু একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে স্থায়ী হচ্ছেনা । মুহূর্তে নতুন অস্থিরতার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। আজ ফুটবল উন্মাদনা তো কালকেই পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে তোলপাড় । পরের দিনই হয়ত কোথাও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটছে, সে ঘটনার রেশ না যেতেই নদীতে লাশ ভেসে উঠছে। এত ঘটনার ঘনঘটায় নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে মনযোগ দেয়াই মুশকিল। কিন্তু লেখকদের জন্য লেখার বিষয়ে একটা বোঝা পড়া চাই। তাঁরা খ্যাতি, লেখার বিষয়, নিজের আগ্রহ সব মিলিয়ে অস্থির সময়ের গল্প লিখতে বোধ হয় আর সাচ্ছন্দ বোধ করেন না। আর একটা ব্যাপার, এ ধরণের গল্প সব পাঠকের জন্য নয় এটাও হয়ত কম গল্প তৈরি হবার একটা কারণ ।


গল্পপাঠ : একজন গল্পকার হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা বিষয় নিয়ে লেখাকে কি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? করলে কেনো মনে? আর না মনে করলে--কেনো করেন না?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : গল্পকারের আগে আমি ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও গণমাধ্যম’ নিয়ে গবেষণা করেছি কথাটা বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি । কয়েক বছর আমাকে এ বিষয় নিয়েই পড়তে হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এ নিয়ে বাংলাদেশে খুব কম লেখা হয়েছে। অন্তত এমফিলের ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করতে যেয়ে দেখেছি পুরনো পত্রিকা ছাড়া এ বিষয়ে বাংলাদেশে তেমন কোন গবেষণা পত্র নেই। যে-সব কিছু পেয়েছি তাও মনে হয়েছে নিরপেক্ষ নয়। কিন্তু আমাদের ভূখণ্ডে তো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা কম ঘটেনি। হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেনের লেখা ছাড়া কারো গল্পে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে সেভাবে কিছু পাইনি। সেসব গল্প নিয়েও দেখি পাঠকের ভেতর মুহূর্তে দু’দল হয়ে যাচ্ছে ।

যা হোক প্রশ্ন ছিল, গুরুত্বপূর্ণ মনে করি কিনা। সাম্প্রদায়িকতা একটা ঠাণ্ডা আগুন।   সাম্প্রদায়িকতার রূ হয়ত বদলেছে কিন্তু তা কি নির্মূল হয়েছে? কেন মনে করবনা এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ? আমাদের খুব সহজাত ধারণা হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতা মানেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। কিন্তু এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। উচ্চ বর্ণের সাথে নিম্ন বর্ণের হিন্দুর দ্বন্দ্ব, বাঙ্গালি– পাহাড়ি সংঘর্ষ, মুসলমানদের আশরাফ- আতরাফ বিভাজনও কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা। গুরুত্বপূর্ণ মনে করি এ কারণে যে গবেষণা পত্র দিয়ে মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া যায় কিন্তু তার মনের পরিবর্তন সম্ভব নয়-- সে শক্তি সাহিত্যের রয়েছে। একটা ভালো গল্প ও কবিতা বা গানের কথা মানুষকে যেভাবে নাড়িয়ে যায় অন্য কিছু তা পারেনা। পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের মানসিকতার জায়গা থেকে তা আসতে হবে যেটা সাহিত্যিকদের দায়বদ্ধতা।


গল্পপাঠ : ১৯০৫ সালের পর থেকে নানা সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে পূর্ব বঙ্গে তার মধ্যে ১৯৪৬ , ১৯৫০, ১৯৬৪, ১৯৯২, ২০০১ এবং গত কয়েক বছরেও এটা ঘটেছে । কিন্তু গল্পকারদের মধ্যে সে রকম উল্লেখযোগ্য লেখা পাওয়া যায়না কেন ?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আপনাকে সময়টা ভাগ করে দেখতে হবে। স্বাধীনতা পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়। দু’সময়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন তবে বাক স্বাধীনতার বিষয়টা কম বেশি একই রকম আছে। ৪৬ এর দাঙ্গার ঘটনা নিয়ে কম লেখা হয়েছে তা বলবোনা । কিন্তু এর পরের যে দাঙ্গা ৭১ এর আগ পর্যন্ত এর বেশিরভাগই ঘটেছে পাকিস্তান সরকারের শাসনামলে । যার বেশিরভাগই আমি মনে করি মানুষের দৃষ্টি বিভিন্ন দাবী থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের উদ্দেশ্য মূলক ভাবে তৈরি। যেমন ৪৮ এ রাষ্ট্র ভাষার দাবী সোচ্চার হয়ে উঠছিল তখন ৫০ এ একটা দাঙ্গা হোল। আবার ৬৪ তে কাশ্মীরের হযরত বাল মসজিদে চুল চুরির গুজব কেন্দ্র করে এ পারে দাঙ্গা শুরু হোল। কিন্তু বিষয়টার এত সহজ সমীকরণ নেই । 

৬৪ তে নারায়ণগঞ্জে আদমজী মিলের বিহারী শ্রমিকেরা যে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা শুরু করলো সেটা যে মুনায়েম খাঁ সরকারের পরিকল্পনায় ঘটেছিল জানা কথা। কেন এ দাঙ্গা ঘটানো হোল ? এ পারের মানুষ তখন অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। হিন্দু-মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় ছিল তারা সবাই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ । এই ঐক্যতায় বিভেদ তৈরি করতে এসব দাঙ্গা সংঘটিত হতো । তবে একটা কথা দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ দুটো এক বিষয় নয়। দাঙ্গা তখনই হয় যখন দু পক্ষই আক্রমণাত্মক থাকে। এক পক্ষ প্রাণ রক্ষার জন্য প্রতিহত করলে বা ঘড়- বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে তাকে কিন্তু দাঙ্গা বলা যাবেনা । কথা হচ্ছে কেন এই সময়ে গল্প লেখা কম হয়েছে। আপনার যখন বাক স্বাধীনতা নেই এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে তখন গল্প প্রত্যাশা করা যায়না। তখন কি লেখকরা গল্প লেখা ও তা প্রকাশের স্বাধীনতা পেত ?

যে সরকারের সময় সরকারী পত্রিকা ছাড়া অন্য কোন দৈনিকের ফাইনাল এডিশন সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রকাশিত হতোনা সে সময় দাঙ্গা নিয়ে খুব বেশি গল্প আশাই করা যায় না । আরেকটা কথা স্বীকার করতেই হবে, ওই সময়টায় কারা লিখতেন গল্প ? তারা কি দেশভাগের পর ছিলেন পূর্ব বঙ্গে ?

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ৯২ এ বাবরী মসজিদ দাঙ্গার পর বাংলাদেশে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে তা নিয়ে কেন কম লেখা হয়েছে? তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ বইটির মান নিয়ে কথা বলবনা, কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটেই তো লেখা হয়েছিল। এর ফলাফল তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আমার দেশের এক নারী লেখিকা দেশচ্যুত হয়ে আছে কত বছর হোল ? অথচ সেই সময়ে জাতীয় পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে কারা রাস্তা দিয়ে বিচরণ করত ? পাক সার জমিন সাফ বাদের পর বই মেলায় হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছিল। এসব প্রেক্ষাপটে একটা নতুন দেশের সব লেখকদের কাছ থেকে অতখানি সৎ সাহস আশা করা যায়না । এছাড়া আগেও বলেছি আমাদের লেখকেরা সহজে জনপ্রিয় হতে চান। লেখকের আসলে সবার হয়ে উঠার একটা ক্ষমতা থাকা চাই। সেই সার্বজনীন না হয়ে বরং বড় বেশি আমি হয়ে উঠার প্রবণতা আমাদের অঞ্চলের মানুষের বেশি। তাই আমাদের ভাবনাটাও সংকীর্ণ পথেই আগায় । লিখতে গেলে মন্দিরে হামলার ঘটনা লেখার আগে মাথায় আসে নিজের নামের শেষের পদবীটা । এই যে নিজেকে নিজে অতিক্রম না করতে পারা এও বোধ হয় একটা কারণ। লেখকেরা ভাবেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিষয়ক গল্প তো সব পাঠকের জন্য নয় । কেন লিখব কষ্ট করে যার বাজার কাটতি কম ?

দেখুন ধর্ম পাল বলুন, অশোক বা মুঘল আমল সব সময়েই সেই ইতিহাস টিকে আছে যে ইতিহাস রাজদরবারে রাজার চোখের সামনে বসে তার মর্জি মত লেখা হয়েছে। কিন্তু সে সময়ের সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পও তো ছিল ? ক'জন লিখেছেন তা ? 
ভাষাকে সব সময় রাষ্ট্র ক্ষমতাই নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দক্ষিণাঞ্চলে যে সহিংসতা ঘটেছে তা নিয়ে আপনি সেই শাসকের আমলেই লিখে প্রকাশ করতে চান? এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বোঝা যায় আমাদের দেশের লেখকেরা কেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে লিখতে আগ্রহী নয়। আর একটা কথা হোল আমাদের পড়ালেখার অভ্যাস । সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে গল্প সেই লেখকেরাই লিখতে চাইবে যাদের এসব ঘটনা প্রভাবিত করে। কিন্তু আমার তো মনে হয় আমাদের লেখকেরা রাজনীতির সাথে জড়াতে চাননা নিজেদের । তাদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখা মানেই আওয়ামীলীগ – বিএনপি পক্ষপাত দুষ্ট হয়ে যাওয়া । কিন্তু রাজনীতি মানে যে শুধু এসব দল নয়, আমার দৈনন্দিন জীবনের প্রতি মুহূর্ত যে রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এ কথাটা বোধ আমরা ঠিক অনুভব করতে পারিনা। আমাদের লেখকদের পাঠভ্যাসের একটা সংকীর্ণ বিষয় আছে। নিজের লেখা নিজেই পড়েন বেশি, বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে আগ্রহ কম। লেখা তো ঘটনার প্রভাব, অন্য লেখার অনুরণন থেকেই তৈরি হয় তাইনা?

1 টি মন্তব্য: