শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

ছুটির লেখা : ভালবাসা এবং তালগাছ

আনোয়ার শাহাদত 

সে একবার আমাদের বাল্যবন্ধু নকী প্রেমে পড়েছে। এই নিয়ে দুষ্ট-চক্র বন্ধুরা হাসাহাসির হাট বসিয়েছে। আমি বরাবরের গাধা ধরনের, অর্থাৎ আন্তরিক। ফলে আমি সেই উপহাস হাটে সওদা না করতে গিয়ে নকীকেই জানতে চাইছিঃ 'ভাঙ্গাইয়া ক' দেহি ঘটনাডা কী? ও যা বলছে তা এইরকম- ওর ওই দূর সম্পর্কের কাজিনের প্রতি ওর এমন অনুভূতি হইছে যে গাছের উঁচু ডাল দিয়া ঝাঁপাইয়া পড়তে ইচ্ছা করে। আমি জিগাই- কি গাছের ডাল দিয়া পড়তে মন চায়, তাল গাছ? আমি তখন নতুন দলিল লেখক গোত্রে নাম লেখাইছি। দলিল পত্র না লিখে প্রেম পত্র লিখে 'জীবিকা নির্বাহ করি'? অধিকাংশ বন্ধুদের প্রেম পত্রখানি আমার লেখা তাদের ব্রিফ নিয়ে। তখন, নকীর ঘটনার পর, আমি প্রেম পত্র লেখা শুরু করলাম "তোমার জইন্যে আমার উঁচু রেইনট্রি গাছের মগডাল দিয়া ঝাপাইয়া পড়তে ইচ্ছা করে"। প্রেম পত্রের এই ফরম্যাটে প্রচুর সাড়া মেলছে। এমনকি যারা নকীর বিরুদ্ধে মেলা বসাইছিল হ্যাগোরও ওই প্রেম-পত্তর লেইখ্যা দিছি, আসলে নকীর ঝাপাইয়া পরনের কথা। তারা কৃতজ্ঞ। নকী'র প্রতি না, আমার প্রতি। অথচ আমি নকীর কথাডাই কইছি।


তখনই; সেই বাইল্য বেলায় টের পাইছি- বালিকারা ও নাবালিকারা এই ধরনের 'নুন-দরের' সস্তা কথা ও কবিতা পছন্দ করে। তা নাবালক কবি ও চুটকীদারদের কাছ থেকে। অর্থাৎ নাবালক পছন্দের ভিত্তিডা ওই রকমই সস্তা, এবং আবালীয়। অথচ নকী কইছে তার লাফাইয়া পড়তে ইচ্ছা করে তাল গাছ থেকে না। জাম গাছ থেকে। এই সন্দেহ আমার আগেই আছিল। ও তাল গাছের রিস্ক নেবে না, ছাত্রলীগ করা পোলা, হে তালগাছ করে কেমনে ভালবাসার নামে? আশ্চর্য না? নকী'র ধারণা আমি জাম গাছ শুইন্যা অবাক হইছি। তা হই নাই। তারপরও আমি প্রেম-পত্র লেখন পেশাজীবী, খুঁটিনাটি জানতে চাই। সে তখন সেই উত্তরই দেয় যে তাদের মুলাদির গ্রামের বাড়ীর পুকুর পারের জাম গাছ থেকে ঝাপাইয়া পড়তে ইচ্ছা করে। আমি কই পানিতে, না? সে কয় 'হ'! এই নিন্মগামী জাম ডাল থেকে প্রায় জল ছোঁয়া পুকুরে লাফিয়ে পরার নাম আমি এই বলে চালিয়েছি যে তা 'ভালবাসা' বা 'প্রেম' বা 'পীরিতি' "তোমার জইন্যে আমার উঁচু রেইনট্রি গাছের মগডাল দিয়া ঝাপাইয়া পড়তে ইচ্ছা করে"!

নিশ্চয়ই তখন তারা ভেবেছে লোকটা ভালোবাইস্যা তিনশ' ফুট উঁচু তাল গাছের মাথা দিয়া কণক্রিটের রাস্তায় পইড়া রক্তাত ভালবাসার একটা দলিল রচনা করছে!
অথচ আমি নিজে কোন রকম প্রেম বা কিছু ছাড়া আমাদের বড়-পুকুর পারের আষাঢ়ে জাম গাছের ডাল থেকে শালিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাম খেয়ে জলে ঝাঁপিয়েছি দেদারছে!

[গরম বলে স্কটিশ হুস্কির সঙ্গে আমার কোন বিবাদ নেই। সিঙ্গেল মল্ট গ্লেন ফিডিসের গেলাসে বরফে ঢেলে বেশ পিপাসা মিটিয়ে জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা! চিয়ার্স! ]



লেখক পরিচিতি
 আনোয়ার শাহাদাত

জন্ম বরিশালে। কৃষক পরিবারে।
গল্পগ্রন্থ : ক্যানভেসার গল্পকার, পেলেকার লুঙ্গী।
উপন্যাস  : সাঁজোয়া তলে মুরগা।
চলচ্চিত্র : কারিগর। 

শর্ট ফিল্ম : ন্যানী।
দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন