শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

মোজাফ্ফর হোসেনের বই নিয়ে আলাপ : দুই হাসান পাশাপাশি রেখে

স্মৃতি থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ততই নির্মোহ থেকে, ততই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় নিজেকে। কাজেই বয়সকালই স্মৃতিকথা লেখবার উপযুক্ত সময়। আপাতদৃষ্টিতে, প্রসঙ্গটা আইরনিক্যাল মনে হলেও এর সঙ্গে সাইকোলজিক্যাল সম্বন্ধ জড়িয়ে আছে “জীবনসায়াহ্নে এসে কার না শিশু হতে ইচ্ছে করে! মৃত্যুভাবনা থেকে বের হওয়ার জন্য শিশুকালে নিজের শিকড় গাড়া মনের একটা স্কেপিজম অবস্থা থেকেই হয়ে থাকে। অনেক সময় স্মৃতিকাতরতা (হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রে হোমসিকনেসও বলা যেতে পারে) একটা বয়সে গিয়ে রোগের মতো আচরণ করে।
এজন্যে দেখা যায়, একজন আধাবয়সি তার শিশুকাল সম্পর্কে অনেক কিছুই মনে করতে পারেন না, অথচ বয়সকালে এসে ঠিকই পায় পায় করে সব বলে দিতে পারেন! সময়ের অন্যতম শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের বেলায়ও হয়ত একই ঘটনা ঘটেছে। তবে তাঁর ক্ষেত্রে মেজর ফ্যাক্টর স্কেপিজম” নয়, দায়িত্ববোধ। বলার কিছু বাকি ছিল বলেই তিনি সত্তর বছর বয়সে এসে আলাদা করে লিখতে শুরু করলেন তাঁর শৈশব-কৈশোর নিয়ে। এর আগে তিনি তাঁর রচনাসমগ্রে ‘গল্প ও উপন্যাসে’ টুকরো টুকরো করে সেইসব দিনকালের কথা কিছু লিখেছেন। কিন্তু পাহাড়সমান স্মৃতির ভার যার মাথায়, তিনি কি আর অল্পতে খুশি হতে পারেন! এজন্যেই তিনি স্মৃতিচালিত হয়ে পড়লেন। গল্প লেখা প্রায় ছেড়ে দিয়ে লিখলেন তিন খণ্ডে আত্মস্মৃতি ও স্মৃতিকহনমূলক গ্রন্থ—‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ (২০০৯, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ), ‘উঁকি দিয়ে দিগন্ত’ (২০১১, ঐ) ও ‘এই পুরাতন আখরগুলি’ (২০১৪, ঐ)। লিখলেন যে দুটি উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ (২০০৬, ঐ) ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ (২০১৩, ঐ)--তাও তাঁর স্মৃতিসিক্ত।

হাসান আজিজুল হকের স্মৃতিকথা মূলত সেলুলয়েড-পর্দায় সমান্তরালে দুটি চরিত্রের গল্প উপস্থাপনের মতো। একদিকে ১৯৪০-এর দশকের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে বেড়ে উঠছে একটি কিশোর। জগৎ সম্পর্কে ততজ্ঞান যা পাচ্ছে তাই লুটেপুটে খাচ্ছে সে। একটু বোকা, একটু খেয়ালি, একটু বেখেয়ালি, একটু নির্জীব, একটু ডানপিটে স্বভাবের সেই কিশোরের অল্প অল্প করে বেড়া ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন কিশোরের সময় থেকে প্রায় ষাট বছর ছিটকে অন্য এক দেশে (রাজশাহী, বাংলাদেশ) বসে যেন অন্য এক মানুষ। তিনি দর্শনের অধ্যাপক। সমাজ, ইতিহাস এবং রাজনীতিসচেতন লেখক। তাঁর ভেতর ভর করে ঐ কিশোর সব লিখিয়ে নিচ্ছে “যেন কিশোরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক জাতিস্মরের মতো কোনো এক জন্মে” তবে সম্পর্কটা আর এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়, কেননা পাঠক যখন পড়ছে তখন দুটি চরিত্রই দুই প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে। পর্দায় পালা করে দুজনকে দেখা যাচ্ছে। দুজনকে যেমন মেলানো যাচ্ছে তেমন আলাদাও করা যাচ্ছে।

স্মৃতিকথার প্রথম পর্ব “ফিরে যাই ফিরে আসি” একালের হাসান গুরুত্বপূর্ণ এক কথা দিয়ে শুরু করেছেন--

“স্মৃতিকে কতোটা পিছনে নেওয়া যায়, নিশ্চয়ই চেতনার পিছনে নয়। আমার ধারণা শুধুমাত্র চেতনাতেও স্মৃতি নেই, যদি থাকেও তা আধো অন্ধকারেই ডুবে থাকে। আত্মচেতনা থেকেই স্মৃতির শুরু। জন্মের পর থেকে চেতনা আছে, গূঢ় রহস্যময় চেতনা কিন্তু স্মৃতি নেই। চেতনা-আত্মচেতনার মাঝখানের সান্ধ্য জায়গায়টায় অনেকবার ফিরে ফিরে যেতে চেয়েছি। তাই ফিরে যাই, ফিরে আসি।”

কী চমৎকার বলে দিলেন, আত্মচেতনা থেকেই স্মৃতির শুরু। অর্থাৎ আত্মচেতনা যখন থেকে তৈরি হয় তখন থেকে স্মৃতিবোধ কাজ করে। স্মৃতিকথার প্রথম খণ্ডটি হাসানের আত্মচেতনা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তের। তখন অনেক ছোটো তিনি। তিনি বলেই নিলেন, চেতনা-আত্মচেতনার মাঝখানের সান্ধ্য জায়গায়টায় পৌঁছানোর জন্যে তিনি স্মৃতিকথা এত আগে থেকে শুরু করেছেন। স্মৃতিকথার দ্বিতীয় খণ্ড শেষ হয়েছে কিশোর হাসানের এই উক্তিতে : “এইবার আমি স্কুলে ভর্তি হবো। আর আমাকে পায় কে?” খুব সাধারণ কথা কিন্তু চরম দ্যোতনা এনে দেয়। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, শুরু হয়েছিল একালের দর্শনসচেতন সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের দার্শনিকভাষ্য দিয়ে, শেষ হয়েছে এক অতি সাধারণ বালকের অস্তিত্ব অম্বেষনী উক্তি দিয়ে। এখানে দুজন যেমন আলাদা তেমন অভিন্নও।

তৃতীয় খণ্ডে “এই পুরাতন আখরগুলি” শুরু হয়েছে কিশোর হাসানের স্কুলভর্তি ও স্কুলজীবনের নানান ঘটনা দিয়ে। হাসানের বাড়িতে চাল-ডালের অভাব না থাকলেও অভাব ছিল নগদ অর্থের। যে কারণে তার স্কুলভর্তি হওয়া নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। আবার ভর্তি হলেও সময় মতো মাইনে পরিশোধ করতে না পারার কারণে স্কুলখাতা থেকে নাম প্রায়ই কাটা যায় যায় অবস্থা। অর্থাৎ কাঁচা টাকার চল তখন ছিল না বললেই চলে। এই সময়ে হাসান আবার বখে যাওয়া রাখাল ছেলেদের দলে নিজের নাম লেখায়। হাসানের স্বীকারোক্তি--

“বেলা এগারোটার দিকে গরুটাকে নিয়ে রাখালদের গরুর পালের সঙ্গে মাঠে চলে যাই। হাত-পা লোহার মতো হয়ে ওঠে, মুখ দিয়ে খারাপ নোংরা কথা বেরিয়ে আসে রাখালদের মতো। ...অশ্বত্থগাছের তলায় রাখালদের সঙ্গে বসে থাকি-- তারা বিড়ি খায়, তামুক খায়, আমিও দুটান দেবো কি-না জিজ্ঞেস করে, খুব নোংরা কথায় কসম খায় আর নিজেদের কতরকম গল্প যে বলে। এদের কথা শুনে মনে হতো এরা ঘুঁটে-কুড়ানি, মাঠের ডোম-বাউরি জ্বালট-কুড়নি মেয়েদের এক-আনা দু-আনা পয়সা দিয়ে কিংবা কিছুই না দিয়ে শুকনো খালের মধ্যে, বনকুলের আড়ালে অনেক কিছু করে। এতে আমারও বেশ লাগতে থাকে।”

এর বেশি এখনকার হাসান এগোন না। তিনি খালি বুঝিয়ে দেন, সেদিনের সেই কিশোর হাসানের এমন খামখেয়ালিপনার জন্যেই আজকের হাসানের পক্ষে ‘শকুন’র মতো গল্প লেখা সম্ভব হয়েছে। আত্মজীবনীর এই পর্বে, আমরা হাসানকে বোধের জগতে একটু একটু পরিণত হতে দেখি। হাসান জীবনের এই সময়ে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে, প্রথম রবীন্দ্রনাথ পড়ে, পড়ে ভারত ও বিশ্বের ভুরি ভুরি সাহিত্যকর্ম। আর হাসান নিজে কবিতা লেখার বাতিক ছেড়ে গদ্যে মনোনিবেশ করে। সেদিনের সেই হাসান যথাসময় সঠিক সিদ্ধান্তটা না নিলে বাংলাসাহিত্যের যে বড় সর্বনাশ হয়ে যেত, তা আর বলতে! বইটির শেষ অংশজুড়ে নীবিড় পাঠক আর লেখক হয়ে ওঠা হাসানের সাক্ষাৎ মেলে। প্রথম দুটি খণ্ড পড়ার পর তৃতীয় খণ্ডটি কোথাও কোথাও ক্লান্তিকর মনে হয়-- অকারণ ঘটনার এত বেশি ডিটেইল যে কিছু কিছু অংশ বাদ দিয়ে পড়লেও চলে। অন্তত আগের দ্ণডখ- পড়া থাকলে।



দ্বিতীয়-খণ্ডে কিশোর হাসান উঁকি দিয়ে জগৎটাকে এক ঝলক দেখে নেয়। তৃতীয়খণ্ডে সে তার দেখার জিনিসকে উপলব্ধিতে আনার চেষ্টা করে। সে শুধু নিজের জগৎটাই দেখে না, ফাঁকি দিয়ে অন্যদেরটাও দেখে নেয়। গাছে উঠে পাখিদের ডিম ভেঙে দেওয়া, জলে লাফ দেওয়া, বুনোসুতার শাদাফুল, তার মিষ্টি গন্ধ, শরতের একগাদা তারা--এগুলো তার নিজস্ব জগৎ। হিন্দু-মুসলিমের পীর মানত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ দ্বিখণ্ডিত হওয়া, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ-- এগুলো তখন অন্যদের জগৎ। সেই জগতের সব মারম্যাচ বুঝে উঠতে না পারলেও খালি চোখে দেখে গেছে। এখন যে হাসান তাঁর শব্দবুননের মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস পাঠ করিয়ে চলেছেন তার রসদ জোগাড় করেছিল সেদিনের সেই কিশোর হাসান। যেন সে বুঝে গিয়েছিল, “He was destined to collect the lives of his time”. জন্ম তার চল্লিশের দশক ছুঁয়ে যাওয়ার বছরে (১৯৩৯)। সেদিনের সেই হাসানের জন্ম সম্পর্কে বর্তমান হাসানের মন্তব্য হলো, তখন “বাচ্চাগুলো আসত শক্ত করে চোয়াল চেপে পৃথিবীতে টিকবে বলে”। মানে রাঢ়বঙ্গের শিশুরা হেলাফেলায় বয়স পাকাতে আসেনি। অন্তত হাসানতো নয়ই। একটা হাহাকারের ভেতর তার বেড়ে ওঠা। উদার প্রকৃতি-মাতা কী এক অজানা কারণে রাঢ়বঙ্গের প্রতি নাখোশ ছিলেন। হাসানের ভাষায়--

“হতচ্ছাড়া গাঁ আমাদের। দেখতে একটুত ভালো না। সব কিছুর টানাটানি, না কি আছে ছাই এই গাঁয়ে? ভালো কুলগাছ, পেয়ারাগাছ, জামগাছ নেই। একটু সবুজ খুঁজে পাওয়া যেকি মুশকিল এখানে? সব ধুলোয় ভরা। খাবার কি জোটে কপালে? আমরা তাই ভাত খাই আর ডাল খাই। ডাল খাই আর ভাত খাই। “আর কিছু পাওয়া যায় না। মোটা ভাত, মোটা খাওয়া একটা ফল পাই না যে চুষি, একটা ফুল পাই না যে তার রং দেখে খানিকটা সময় কাটাই, গন্ধ শুকি। এমন খালি আমাদের দেশ। আর আকাশ যেন স্কেলের গায়ে পেন্সিল ঘষা। ধুলো আর ধোয়া লেপা।”

এমন সৌন্দর্যবঞ্চিত গাঁ আর হাহাকারের ভেতর বেড়ে উঠছে এক কিশোর--কে বলবে সে বড় হয়ে আজকের হাসানের মতো আপাদমস্তক সুশীল-সৌন্দর্যপিপাসু সুসাহিত্যিক হবে! অর্থাৎ এখানে এসে আমরা যেন অন্য হাসানকে পাই। একজন শুধু দেখে গেছে, অন্যজন সেই দেখাকে পুজি করে ভাবনার হাটবাজার খুলে বসেছেন।

কিশোর হাসানের ক্ষেত্রে দুটি জিনিস ঘটেছে-- awakening to the body and awakening to the soul. “এ পোর্টেট অব দ্য আর্টিস্ট এজ এ ইয়াং ম্যান” (জেমস জয়েস, ১৯১৬) এ স্টিফেন ডেডালুস নামধারী জয়েসের ক্ষেত্রে, “আউট অব প্লেস” (এডওয়ার্ড সাঈদ, ১৯৯৯) এ সাঈদের ক্ষেত্রে এবং “লিভিং টু টেল এ টেল” (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, ২০০৩) এ মার্কেসের ক্ষেত্রে। সবখানেই, এই বডি মানে শুধু নারী কিংবা পুরুষের শরীর নয়, এটি হলো বডি এজ এ হোল। আরেকটু মোটাভাবে বললে, জাগতিক জীবন। যখন হাসান বলে—‘মানুষের শরীরে কি কি আছে একদম উদম হয়ে সে (প্রবল দৈহিক শক্তির অধিকারী বলরাম বাবলা) আমাদের তা দেখিয়ে দিয়েছিল, দুঃখ করেছিল সে হাতের কাছে মেয়ে নেই বলে ওদের শরীরে কি কি থাকে, তা শুধু মুখে মুখে বলা হলো সরাসরি দেখানো গেল না। মানুষদের ছেলেপুলে কি করে হয় তা-ও বলা কানে কানে কামড়ে বলে দিয়েছিল।”--তখন বোঝা যায় এই শরীর চেনার ভেতর দিয়ে আসলে তিনি বিশ্ব চিনতে চেয়েছেন। আর সোল বা আত্মা হল শরীরের ঠিক উল্টো বিষয়--এটি যেমন ব্যক্তির তেমন সমষ্টির, আবার তেমনই প্রকৃতির। কিশোর হাসান এভাবে টুকে টুকে কিছু করেনি। আলাদাভাবে ধরা পড়েছে একালের হাসানের চোখে”যিনি শুধু প্রাজ্ঞ লেখক নন, দর্শনশাস্ত্রের পণ্ডিতও বটে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দুই হাসানের জ্ঞানের যেমন ফারাক বেড়েছে, বেড়েছে ভৌগোলিক দুরত্বও। সেই সঙ্গে আলাদা হয়েছে দিনযাপনের তরিকা। দেশভাগের পর উদ্বাস্তু বেশে হাসান আজিজুল হক চলে এলেন খুলনায়। ভৌগোলিকভাবে তিনি শুধু আলাদা একটি রাষ্ট্র (তখন পূর্বপাকিস্তান) পেলেন না, পেলেন আলাদা সংস্কৃতি এবং আলাদা একটি জীবনও বটে। যবগ্রামে তিনি যে হাসানকে রেখে এলেন “তার ভারি একঘেঁয়ে জীবন। আজকের দিনটা কালকের মতো।” আর কিছুই পায় না সে। মোটাভাত, মোটা খাওয়া একটা ফল পায় না যে চোষে, একটা ফুল পায় না যে তার রং দেখে খানিকটা সময় কাটায়। এমন খালি তাদের দেশ। “আর আকাশ যেন স্কেলের গায়ে পেন্সিল ঘষা। ধুলো আর ধোয়া লেপা।” খুলনায় পা দিয়ে হাসান এতদিন না পাওয়া অনেক কিছুই পেলেন। গাছপালা শূন্য “হাড়ের মতো শাদা” মাটির রাঢ়বঙ্গ ছেড়ে তিনি চলে এলেন সবুজে মোড়া জল-কাদায় টইটম্বুর দক্ষিণবঙ্গে। বর্তমানে যেখানে তাঁর বাস (বরেন্দ্র অঞ্চল, রাজশাহী), সেটি হল ফলের দেশ। কাজেই চোষার মতো ফল না পাওয়ার আক্ষেপটাও ঘুঁচে গেল হাসানের। তবে একটা জায়গায় তিনি যবগ্রামের সেই কিশোর হাসানের কাছে ভীষণভাবে হেরে গেলেন। সেই হাসানের বুকে দেশভাগের কোনো ক্ষত ছিল না। কিন্তু এই হাসান একটু একটু করে যখন না পাওয়া সব পেতে থাকলেন তখন তাঁর ভেতরের ক্ষতটাও দগদগে-কাঁচা হতে থাকলো। একসময় মনে হল, খালি ক্ষতটাই আছে আর সব ফাঁকি। তখন কিশোর হাসানের অতো কিছু ‘নেই’ এর মাঝেও তাইরে-নাইরে জীবন দেখে মোটামুটি আয়েশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হাসানের হিংসে হলো। তিনি উঁকি দিয়ে বালক হাসানের সুখ-দুঃখ দুইয়েরই ভাগ বসালেন। শুধু যে স্মৃতি ভাগাভাগি করলেন তা নয়, ভাগাভাগি করলেন ইতিহাসও। স্মৃতি ভাগাভাগি করলেন সেদিন যবগ্রামে রেখে আসা সেই শিশু ও কিশোর হাসানের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে। নিজের লেখক সত্তার পেছনে তার ঋণকে কোনোভাবেই খাটো করতে পারলেন না হাসান আজিজুল হক। আর ইতিহাস ভাগাভাগি করলেন একালের পাঠকদের সঙ্গে, এটা করলেন ইতিহাস এবং পাঠকদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।

আত্মজীবনী লেখার একটা কারণ শুরুতে বলেছি। আরও একটা কারণ এখানে বলা প্রয়োজন : লেখক নিজেকে পাঠ করতে আত্মজীবনী লেখেন। তিনি আসলে অগাস্টিন-এর মতো নিজেকে স্মৃতির কষ্টিপাথরে ফেলে দিয়ে জানতে চান, তিনি কেমন ছিলেন এবং কীভাবে এমন হলেন। হাসানের এই চাওয়ার ভেতর দিয়েই আমাদের জন্য অখ- ভারতের রূপান্তরিত জগৎ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বার খুলে যায়। যবগ্রামে সেদিনের সেই বালক তো আসলে আমাদের অখণ্ড বাংলার স্মৃতি--এ স্মৃতি যেমন আমাদের জন্য শিকড়সন্ধানী, তেমন অস্তিত্বঅণ্বেষনী। এই গল্পে আমাদের চিরন্তন এক সময়কে পাই। দুইকাল ও দুই ভূখণ্ডেরর অখণ্ড আত্মাধিকারী দুই-মানুষকে পাশাপাশি রেখে আমরা এমন এক ইতিহাস ও জীবনের মুখোমুখি, হই যেটা আমাদের সকলের। আমরা পড়তে পড়তে ভাবতে শুরু করি, হাসান আমাদের সকলের স্মৃতিকথা লিখছেন। লেখক হাসান আমাদের কাছে আলাদা ব্যক্তি হলেও, বালক হাসান আর আলাদা থাকে না, হয়ে ওঠে সকল বাঙালির শৈশব।


লেখক পরিচিতি
মোজাফ্ফর হোসেন

সম্পাদক, শাশ্বতিকী
গল্পকার, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক।
পড়াশুনা, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, রাবি।
নির্বাহী সম্পাদ, পাক্ষিক অনন্যা।


০১৭১৭-৫১৩০২৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন