শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

অলাত এহ্সানের গল্প : রক্ত মাখা নোট

দাঁতের গোড়ায় গোড়ায় জিহ্বের আগা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সামচেল মিয়া গত কালের মাংসের একটু ছিলা খোঁজে। কিন্তু পায় না। মনে হয় জিহ্বটা অন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু দাঁতে কেমন যেন একটা অস্বস্থি লাগে। মনে হয় কিছু একটা আটকে আছে। সে অনুমানের উপর দাঁতের ফাঁকে পালা করে হাতের পাঁচ আঙ্গুলের নখ দিয়ে ক্রমাগত ঠেলতে থাকে। তবু স্বস্থি মেলে না। একটা খিলান হলে ভাল হতো।


তার গতকালের একটা খিলানের কথা মনে পড়ে যায়। পাঞ্জাবির পকেটেই রেখেছিল। এখনো থাকতে পারে। কিন্তু খিলানের কথা মনে হলেও তা খোঁজার জন্য বিশেষ কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। বরং অন্য কিছু হলে ভাল হতো। গতকাল দাওয়াত খাওয়ার পর সবাইকে ঐ রকম খিলান দিয়ে ছিল। আর সেই খিলান দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্ত বের করেছে সামচেল মিয়া। খোঁচাতে খোঁচাতে তার যেন নেশা ধরে গিয়ে ছিল। তাও বুঝতে পারতো না, যদি না পানটা মুখে দেয়ার আগে ফেলা থু থু খেয়াল করতো। কিংবা পানটা মুখে দেয়ার পর দাঁতের গোড়ায় একটু জ্বলে না উঠত। তবে কাল তার লালচে দাঁতের ফাঁকে অনেক মাংসের ছিলা লেগে ছিল। জিহ্বটা একটু ঘোড়ালেই বাঁধছিল। মুখ ভর্তি ছিল তার গন্ধ। সত্যিকারের খাসির মাংসের গন্ধ। ডালডা দিয়ে রান্না। সামচেল মিয়া বেশি খেতে পারে নি। তবু মনে হয়েছে একেবারে ঢোর পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। ঢেঁকুর দিলেই একটা গন্ধ মাথার তালুতে ঠোকর খেয়ে নাক দিয়ে গল গল করে বেরিয়ে আসে। সামচেল মিয়া সেই কথা ভাবতে ভাবতে আরো দ্রুত নখ চালায়। হঠাৎ একটু বেরিয়ে এলেও না হয় দুই কামড় দিয়ে ফেলে দেয়া যেত। একটু স্বস্থি মিলতো।

সকাল থেকে তার দাঁতের তলায় কিছুই পড়ে নাই। দাঁত সিরসির করছে। আসলে সকালে তার বাড়িতে রান্না হয় নাই। ঘরে চাল ছিল না। গতকাল দাওয়াতের চিন্তায় সামচেল মিয়া এতটাই বিভোর ছিল, কিংবা তার কাছে বাজার করার টাকা ছিল না, যে কারণে সে ভেবেই নিয়ে ছিল ঘরের মুষ্ঠ চাল দিয়েই হয়তো দুই দিন চলবে। অথচ মুষ্ঠ চাল ফুরিয়েছে গত পরশু দিন। গতকাল সকালে বাড়িতে খুদের ভাত রান্না হয়ে ছিল।

সামচেল মিয়া তার ছেলে মুসাকে ডেকে বলে, 'তোর মা'রে একটু আগে আগে রান্দা করব্যার ক গা। হাটে যাওন লাগবো।' কথাটা সে এতো জোরেই বলে যে মুসা'র মারফত কথাটা চুলা-পাড়ে পৌছানোর আগেই উত্তর চলে আসে। 'তর বাপেরে ক মরছিদে যাইতে।' তারপর স্বগোক্তির মতো বলে,'সাপ্তার একটা দিন। সারা সাপ্তা নামাজ না পড়ছে, জুমার নামাজটা তো পড়বো। সকাল থ্যা কিছু খায় নাই, কি ওইছে? দেহি তো, ঘরে ভাত থাকতেও এরুম হিটকি ধৈর‌্যা কত দিন পইর‌্যা রইলো। পান তো গিলছে কত ডি। নামাজ পইরা আসতে আসতে রান্দা-বাড়া ওইয়্যা যাইবো। খাইয়্যা হাটে যাইব্যার পরবো।'

চুলার আঁচ থেকে মুখ বাঁচিয়ে কথাগুলো বল ছিল হাজেরা। মাঝে মাঝে তেলের মধ্যে পানি ছিটার ঝা ঝা শব্দের সাথে গলার স্বরও উঠা-নামা করছিল। সামচেল ঘরে থেকেই সব শুনেছে। তারপরও মুসা ঢ্যাং ঢ্যাং করে নাচতে নাচতে এসে সামচেল মিয়ার নিকটা কথাগুলো নিজের মতো করে পুনরাবৃতি করে। সে দিকে কোনো খেয়াল দেয় না সামচেল মিয়া। সে আরো একটা পান মুখে পুড়ে ইট দিয়ে তোলা দেয়া চোকির উপর পা ঝুলিয়ে বসে ভাবে, সারা সাপ্তাই এক রকম, কাজের চোটে দম পাওয়া যায় না। একদিন নামাজ আর পড়ে কি হবে? আর নামাজ পড়বেই বা কার পিছে। যে মফিজ মওলানা ওয়াজের টাকা চুরি করে, সকালে আরবী শেখানোর সময় জোয়ান মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার একশ একটা অভিযোগ। তারপরও টিকে আছে দেওয়ানদের চাটুকারি করে, তার পিছনে! নামাজ শেষে মিলাদের পর দুইটা জিলাপির আশায় মুসা যেতে পারে। ভাবতে ভাবতে সে কাঁধের কামছা হাতে নিয়ে গা হেলিয়ে দেয় শুধু খেজুর পাতার বিছনা পাতা চোকিটা উপর। তারপর গামছা দিয়ে গায়ে বসা মাছি তাড়াতে তাড়াতে গতকাল আক্কাস চেয়ারম্যানের বাড়ির দাওয়াতের কথা চিন্তা করতে থাকে। ভাবনা মদকতা আচ্ছন্ন করে সামচেলকে। সে তৃপ্তির সঙ্গে পানের জাবর কাটতে কাটতে আক্কাস মোল্লার অতীত কাহিনিতে ডুবে যায়। তার খুব অবাক লাগে, এই আক্কাস মোল্লারাই এক সময় তাদের চেয়ে নিম্ন ছিল, ভাতের কষ্ট করতো। সামচেলের বাবাই তাদের পথ দেখিয়েছে। তার বাবা মেহের আলী সেই সময় গন্নার নৌকায় কাজ করতো। সেই গন্না রাজশাহী-দিনাজপুর চাতাল থেকে ধান-চাউল কিনে ঢাকায় সাপ্লাই করতো। অবস্থা খারাপ দেখে মেহের আলী আক্কাস মোল্লার বাবা গয়জদ্দি মোল্লা ও বড় ভাই জহুরুদ্দি মোল্লাকে সেই নৌকায় নেয়।

তখন দেশেও খুব আকাল। শুধু নৌকার ব্যবসা ভাল। রাজশাহী থেকে নৌকা বোঝাই করে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়ে। মাঝে ফরিদপুর-নারায়নগঞ্জ ঘাটে মাল দেয়। গয়জদ্দি মোল্লা আর তার ছেলে নৌকার মাঝি মাল্লাদের হাত করে ঘাটে ঘাটে গোপনে চাউল বিক্রি করে। এ রকম বেশ কিছু দিন চলতে থাকার পর এক দিন মহাজনের হাতেনাতে ধরা পড়ে। তারপর তাদের নারায়গঞ্জ ঘাটে গন্না থেকে নামিয়ে দেয়। এই নামিয়ে দেয়ার সময় সবচেয়ে বড় দাইন মারে, মহাজনের টাকার তোফিলগুলো থেকে একটা তোফিল গোপনে নিয়ে যায়। তারপর গ্রামে ফিরে সেই টাকা সুদে খাটাতে খাটাতে তাদের আজকের এই অবস্থা। মেহের আলী গ্রামে ফিরে না এলে এই কথা গ্রামের মানুষ জানতোই না। এখন জহুরদ্দি মোল্লারা সূতার কারবার করে। তবে ইতোমধ্যে সূতার সরকারি ডিলারশিপ নিয়ে, এলাকার তাঁতীদের রেশনের সূতা আটক করে নাকি বড় দাইন বাধিয়েছে। সামচেল সে কথা শুনেছে বটে, কিন্তু সে তাঁতি নয়, পরের জমি বর্গা নিয়ে হালচাষ করে, তাই ওসব নিয়ে বিশেষ ঘাটাঘাটি করেনি। সে তাদের এড়িয়ে চলে। সামচেল মিয়ার কাছে তার বাবার সম্মান অনেক বড়। তার বাবার সততায় খুশি হয়ে চাকুরি ছেড়ে আসার সময় মহাজন তিন হাজার টাকা দিয়ে ছিল। সেই টাকা দিয়েই সেই যুগে গাথা বেড়ার এই একুশে বন্দের ঘটা দিয়ে ছিল। তখন অনেকে দেখতে এসে ঘরের তলে বসে মেহের আলীর সততা আর ঘরের প্রশংসা করে যেত। সামচেল দেখে তার ঘরের চাল রোদে পুড়ে ঝাঝড়া হয়ে গেছে, জাগায় জাগায় পানি পরে। চালের কোণার দিকের জয়েন্ট বল্টু খুলে গেছে, একটু বাতাসে ঝন্ ঝন্ করে বাজতে থাকে। বর্ষাটা গেলেই টিন বদলাতে হবে। সে জন্য টাকা দরকার, হতে তার কিছুই নাই। তারপরও এই ঘরের কথা সারা গ্রাম জানে, টিন বদলালে কি সেই নাম কাম আর থাকবে? তার বাবার সততার আদর্শটুকু সে গর্বের সাথে বহন করতে চায়।

হঠাৎ হাজেরার খাখানি সামচেলের সুখ চিন্তা ছিড়ে ফালাফালা করে দেয়। 'মরার মতো ওমনে পৈড়্যা না থাইক্যা নাইয়্যাও তো আসপ্যার পারো। নামাজ কালাম তো ধুইয়্যা গ্যাছে।' হাজেরা সব সময় এরকম। এসব আর সামচেলের ভাল লাগে না। তখনো সে প্রশন্ন চিত্তে খাওয়ার কথাটাই ভাবছিল। ক্ষুধার্ত পেটে খাওয়ার কথা ভাবতে বড়ই আরাম। কিন্তু হাজেরার জন্য তার আর করার জো রইলো না। তবে হাজেরা একটা জরুরী কথা বলেগেছে। পালের একমাত্র গরুটা বিক্রি করে দেয়ার পরই তার এমন দশা। বিক্রি করেছে তো আর এমনি নয়। 'বেইচ্যা নাউ না কিনলে এই বর্ষায় পার হইতাম কি দিয়্যা? মাইনসের নায় কয় দিন পার হওয়া যায়?' এও এক সত্য কথা বটে, সামচেল এক দমে বলে যায়। হাজেরা তার মতো আবার রান্নায় মনে দিয়েছে। কিন্তু সামচেল আর খাবারের চিন্তায় মন দিতে পারে না। সে উঠে ঘরের ভেতরের চার ভাগের একভাগ জুড়ে থাকা বাঁশের মাচা থেকে সরষের বস্তা মেঝেতে নামায়, কাঁপা কাঁপা হাতে কষে বাঁধার চেষ্টা করে। এই সরষেই আজ হাটে বিক্রি করে সদাই করতে হবে। 'উয়া বাইর করছাও ক্যা?' ভূমিকাহীন ও অবজ্ঞার স্বরে পেছন থেকে কথা বলে উঠে হাজেরা। সামচেল এমন ভাবে চমকে উঠে যেন সে সরিষা চুরি করছিল। 'উয়া যে বেচপ্যা, কয় দিন পরেই না লাগব্যানে, হে কালে দেহুম পায় কনে। আমার কইলে ওইবো না। কিনোনের তো মুরদ থাকব্যানে না।' হাজেরা আবার কখন ঘরে এসেছে, মসলা বাটা নিতে, সামচেল একদম খেয়ালই করে নি। সে সত্যি চমকে গেছে। এবং সে কার্যত ক্ষেপে উঠে, 'দুর অ হারাম জাদি। বেচুন লাগলে বেচুম না? যহন লাগে তহন দেহা যাইবো। যা এ্যান থ্যা।' ঝাড়িটা শোনার আগেই সে চলে গেছে। বাতাসে শুধু একটা শব্দই ভাসিয়ে দিয়ে, 'হুহ্, মরদ খান!'

সামচেল মুসাকে ডেকে বলে, বিকেলে তার সাথে হাটে যেতে হবে। নৌকায় বসে থাকতে হবে, পাহাড়া বাবদ । কিন্তু নৌকায় বসে থাকা মুসার একটুও ভাল লাগে না। তারও ইচ্ছে হয় বাবার সাথে হাটে যেতে। সেখানে এত সব রং তামাসা রেখে নৌকায় বসে থাকতে কারো ভাল লাগে? কিন্তু সামচেলের ক্রমাগত ধমকের মুখে সে রাজি হয় বটে, তবে তার একটা আখুটে আবদার থাকে- তাকে একটা বল খেলার প্যান্ট কিনে দিতে হবে। কিন্তু তার আবদারের বিষয়টা অমিমাংশিত রেখেই আলোচনা শেষ হয়।


(২)

বরাবরের মতোই সামচেল যত তাড়াতাড়িই করুক সে হাটে পৌছাতে পৌছাতে হাটের বেলা অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। সরিষার হাটে বস্তার মুখ খোলার সাথে সাথে মুখের সামনে নবীন কাহারকে দেখে তার মেজাজ একদম খারাপ হয়ে যায়। নবীন কাহার তোলা উঠায়। তারা এই ফসলের হাটের ডাক নিয়েছে। তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু শস্য বেচা হোক বা না-হোক, নবীন কাহারের বড় বড় দুই হাত একবার ডাবলেই এক কেজি শস্য নাই। আজ সামচেলে মাপা সরিষা, কাটায় কাটায় পনে এক মন। তাই সে নবীনকে সরিষা নিতে বারণ করে। কিন্তু নবীন তা মানেই না। বরং এক মহা বিরক্তিতার সাথে বলে-'হুহ্ হু, কত নুম্বারে দেখলাম। জিনিস ব্যাচা ওইলে আর খুইজ্যা পাওয়া যায় না।' বলেই সে এক আজল ভরে সরষে বাটিতে তুলে। নবীন কাহারের পর বেপারীদের দাম শুনে সামচেলের মেজাজ আরো বিগড়ে যায়। হাজেরা ঠিকই বলেছিল, এই সময় বেছন জিনিসের দাম পাবে না। তারপরও সামচেল বেছনের ব্যাপারটা বেপারীদের ভাল করে বোঝানোর চেষ্টা করে। তবু তারা কেমন আদনা-খাদনা দাম করে। সামচেল তাই গৃহস্থ ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করে। আজ তারও দেখা নাই। যাও জোটে তারা দুই সের, পাঁচ সের নিতে চায়। খুব বেশি হলে দশ সেরের কথা জিজ্ঞেস করে। একসাথে নেয়ার মতো কেউ নাই। ভেঁঙে বেচলে কি আর পড়তা পড়ে। খাটনিটাই বেশি। শেষে দেখা যায় এক-দুই সের রয়েই গেছে, তা কেনার আর গাহাক পাওয়া যাবে না। চারপাশে বেপারীদের উপহাস পূর্ণ হাঁটাও বিরক্তি কর। শেষ পর্যন্ত ঐ বেপারীদের কাছেই কিনা আধা দামে বিক্রি করতে হয়, এই ভেবে সামচেলের কপালে দুঃচিন্তার ভাঁজ পরে। সে গামছা দিয়ে কপাল মুছে। প্রসন্ন চিত্তে বড় কাস্টমারের জন্য এদিক-ওদিক তাকায়। বেলা পড়ে আসছে, কিন্তু গরম কমছে না।

সারা হাটই কেমন যেন গম গম করছে। সামচেলের ভাল লাগে না। কখনো হয়তো নৌকার জন্য দুঃচিন্তা হয়। মুসা হয়তো নৌকা থেকে নেমে রাস্তায় উঠেছে। মুসা করেও তাই। বাবার হাতে কাগজে মোড়ানো নতুন প্যান্টের দুর্দমনীয়টান তাকে বারবারই নৌকা থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে। উত্তেজনায় বর্ষার কালো জলে দাগ কাটতে চায়। হাত দিয়ে পাতা ছিড়ে কুটি কুটি করে। কখনো পাশের নৌকার আরেক ছেলের প্যান্টের দিকে তাকায় বা পড়নের মলিন প্যান্টাকেই দেখে। বেলা বয়ে যায়, সবার বাবা আসে কিন্তু তার আসে না। তার অপেক্ষার উত্তেজনাও কমে না। এক সময় পাশের নৌকার ছোট ছেলেটিকে ক্ষণিকের জন্য নৌকা দেখার ভার দিয়ে রাস্তায় নেমে পরে। রাস্তার ধরে হাটের দিকে একটু আগ-পাছ করে, বাবাকে দেখা যায় কি না। সামচেলের তখনও সরিষা বেচা হয় নি। কিন্তু গরমে টেকা যায় না। শেষ বেলায় সূর্যের এমন তেজ সচরাচর দেখা যায় না। সূর্যের আলো সরাসরি তার মুখের উপর এসে লাগে। পশ্চিমে নদীর ঘাটে বড় বট গাছের ছায়া পড়েছে অনেকটা জুড়ে। সূর্যটা ওপাশেই ঢলে পড়েছে। তবু ওদিকে তাকানোই দায়। অনেক ট্রলারের ভিড়ে হঠাৎ সেখানে ছাউনি দেয়া একটা ছিপছিপে ট্রলার ভিড়তে দেখা যায়। সেখান থেকে একটা প্রলম্বিত ছায়া এদিকে এগিয়ে আসছে। গাছের ছায়ার মধ্যে বোঝা যাচ্ছিল না। আলোতে আসতেই বোঝা গেল একই রকমের পোশাক পড়া দশ-পনের জন জোয়ান লোক, তাদের সবার মুখমন্ডল কালো কাপড়ে মুড়ানো। কাঁধে রাইফেল, হাতে কি যেন ধারালো, ভাল বোঝা যায় না। তাদের দেখেই সামচেলের মনটা কেমন মোচড় দিয়ে কঁকিয়ে উঠে। সামচেলের যথেষ্ট পেছন দিয়ে তারা সটান পায়ে হাটের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের দিকে যায়। তাদের অমন হট হট করে যেতে দেখে ইতোমধ্যে সবার মাঝে কেমন অস্থির নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। তারা যেদিকে গেছে সেই দিক থেকেই হঠাৎ রব এলো- দুই জন শ্যাষ রে, মাথা নিয়া গ্যাছে। সামচেল বস্তা গোছানো সময় পায় নি। ভীড়ের মধ্য এক কোণা ধরে অনেক ক্ষণ টেনেটেনে দৌড়েছে। কিন্তু কে যেন পিছন থেকে টান দিল, সব সরিষা মানুষে পায়ের তলায়। তখন এমনিতেই ডাল গিয়ে চালে, আলু আর কচুতে, সরিষা গিয়ে মুরগীর সাথে গিয়ে মিশেছে, পায়ের নিচেও সদাই-পাতির গড়াগড়ি। অন্যান্যদের সাথে সামচেলও দৌড়াচ্ছে। কোন দিকে তা জানে না। শেষ পর্যন্ত সুতার হাটে গিয়ে থমকে যায় সামচেল। মুন্ডহীন দু'টো লাশ পড়ে আছে, রক্তে চারপাশ ঢালাঢালি। রক্তের মধ্যে লেগে আছে শত শত টাকার নোট। সামচেলের মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। সে যেন এক ঘোরে বাস করছে। এরই মধ্যে কে যেন বলে, এটা আক্কাস মোল্লা আর তার ছেলের লাশ। সে বিস্ময় প্রকাশ করতে পারতো যে, গতকালই এদের বাড়িতে দাওয়াত খেয়েছে; কিন্তু সে আবার দৌড়াতে শুরু করেছে। এরা নাকি সরকারের রেশনের সুতা তাঁতীদের নামে এনে আরত করে ছিল, কাউকে দেয় নাই। তাঁরা নাকি অনেক বার বলেছে, চিঠি দিয়েছে, সুতা বিলিয়ে দিতে। কিন্তু দেয় নি। তাই তাদের কল্লা কেটে নিল। একজন শুরু করা কথা আরেক জনের দ্বারা শেষ হয়। ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত একজন বলে- তাঁরা এসে দাঁড়ানোর পর চোখে চোখ পড়তেই আক্কাস মোল্লা নাকি দৌড় দিতে চেয়েছিল। আক্কাস মোল্লা বলে ডাক দেয়ার পর তাদের পায়ে পরতে গিয়েছিল। তাঁরা মানা করেছে। তারপর আক্কাস মোল্লা বলে- সে আজই সব সুতা বিলিয়ে দিবে। তাঁরা বলে- অনেক বার কৈ ছি, তহন তো দ্যাস নাই। আপনারা কি চান, সব নিয়ে যান। শুধু আমাদের কিছু কৈরেন না- এই বলেই বস্তা থেকে টাকা বের করে দুই বাপ-বেটা উড়াতে থাকে আক্কাস মোল্লা। কিন্তু তারা, আজ তো ঐসব কিছুই নিতে আসি নাই, খালি তর আর তর ছেলের মাথাডা নিয়া যামু- এই বলে সবার সামনে তাদের মুন্ডটা কেটে নিয়ে গেল। লোকটা পাশাপাশি দৌড়াতে দৌড়াতে উর্দ্বশ্বাসে ঘটনাটা বলছিল।

সামচেল মিয়া হন্তদন্ত হয়ে নৌকার কাছে এসে মুসাকে খুঁজে না পেয়ে আরেক দুশ্চিন্তায় পরে। মুসা রাস্তার উপর মানুষের ঢলে অসহায়ের মতো এর ওর মুখের দিকে তাকাতাকি করছিল। সামচেল মিয়া ছৌ মেরে তার হাতে বাহু ধরে এনে নৌকায় তুলে। নৌকা ভাসানো মাত্র উন্মাদের মতো বৈঠা চালাতে থাকে। চারদিকে হালকা অন্ধকার হয়ে এসেছে। অনেক দূর এসেও সামচেলের ভয় যায় নি। কোনো কিছু পরিষ্কার না বুঝেই মুসাও এই ভয়ের অংশিদার। এভাবে বেশ কিছু ক্ষণ চলার পর মুসার বৈঠার গতি শ্লথ হয়ে এলে সে বাবাকে প্যান্টের কথা জিজ্ঞেস করতে চায়। কিন্তু দম পায় না। সামচেল তখনো ঘরের চালের কোণ খসা টিনের মতো ঝন্ ঝন্ করে পানিতে বৈঠা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাতে কেউ তেমন কথা না বলে আগে ভাগে শুয়ে পড়ে। সামচেলের চোখে ঘুম আসে না। সে মেলাতেও পারে না। তাঁরা কারা? কেমন মানুষ যে, সব দিতে চাইলো কিন্তু কিছুই নিল না। অন্যের সুতা আরত করেছে বলে তাঁরা শাস্তি দিল! তার স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ে, একসময় সে নকশালদের কথা শুনে ছিল বটে, কিন্তু দেখে নাই। এরাও কি তাই? তার মনে স্পর্শহীন এক প্রকার সুখ জাগে, আবার দুঃচিন্তাও হয়। আচ্ছা, তাদের চোখ কি খুব রাগী লাল? সামচেল মিয়া তাদের চেহারা মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। পাশেই স্ত্রী-সন্তান ঘুমাচ্ছে, তাদের বুক হাঁপড়ের মতো উঠানামা করছে, নিঃশ্বাস ছাড়ছে তেমনই। তার চোখে ঘুমের ছায়া নামে। ঢুলু চোখে ভাসতে থাকে, নদীর পাড় ধরে গন্নার নৌকার মাল কোছা দেয়া মাঝিরা কায়ক্লেশে গুণ টেনে পশ্চিমের অপসৃয়মান আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমের ঢলে পরা সূর্যের লাল আলো হঠাৎ ঝলক দিয়ে উঠে। কিন্তু তার চোখে ভেসে থাকে রক্তে মাখামাখি করা কতগুলো টাকার নোট। ০



লেখক পরিচিতি
অলাত এহ্সান

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। পদ্মার পাড় ঘেঁষে গ্রামের অবস্থান। গহীন গ্রাম। এখানে প্রধানত কলু, কাহার, জেলে, মুচি নিম্নবর্গে মানুষেরা বসত করে। প্রতিবছর পদ্মায় ভাঙে। অজস্র মানুষ স্বপ্নভাঙ্গা স্মৃতি নিয়ে শহরমুখী হয়। অধিকাংশ তরুণ জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমায় বিদেশে। এসবের ভেতরেও থাকে ঘটনা, নানা ঘটনা। এইসব জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। গুলতির বোবা রেখা তাক করে জঙ্গলে জঙ্গলে কেটেছে শৈশব। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন ব্যবস্থাপনা বিভাগে; ঢাকা কলেজ থেকে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। লেখেন সব মাধ্যমেই। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত।

alatehasan@yahoo.com; +88 01714 784 385

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন