শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

অমর মিত্র'র গল্প : বৃষ্টি বৃষ্টি


কত দিন জল হয়নি বলো ভাগ্নে, সব পুড়ে শেষ! মসলন্দপুরের হরিনাথ বিশ্বাস বলল।
শুভশ্রী তার কথাকে সমর্থন করল, নেচার বদলে যাচ্ছে, কী যে হবে!
মাথা নাড়ল বাসুদেব, বলল, প্রতি বছরই এমনি হয় কম-বেশি, আমরা ভুলে যাই, এ বার যখন শীতটা ভাল করে পড়ল, টানল অনেক দিন, তখন সবাই বলতে আরম্ভ করেছিল আর পারা যাচ্ছে না, এমন শীত বহু দিন পড়েনি, মানুষ সব সময় উত্তেজনা নিয়ে থাকতে চায়।


সন্ধের পরে কথা হচ্ছিল। হরিনাথ এসেছে মসলন্দপুরের দিক থেকে। এসে রয়ে গিয়েছে বুড়ো হয়ে যাওয়া হরিমামা। সে বাসুদেবের মায়ের আমলের লোক। অনেক দিন বাদে এল। বলল, ঘুরতে ঘুরতে চলে আলাম বউমা, জল-বিস্টি নেই অনেক দিন, ভাবলাম তোমাদের কী অবস্থা দেখে আসি।

হরিনাথ বিশ্বাসকে দেখলে মনে হবে সত্যিকারের কাঙাল। জীর্ণ দেহটি নিয়ে কোনও রকমে টিকে আছে। এমনি ঘুরতে ঘুরতে আসে, ঘুরতে ঘুরতে যায়। সকালে এসেছে, দুপুরের ট্রেনে ফিরবে ভেবেছিল, কিন্তু তাকে যেতে দেয়নি শুভশ্রী। কী ভয়ানক রোদ্দুর, প্রত্যেক দিন দু’পাঁচ জন করে মরছে। পথে, রেল স্টেশনে, গাছতলায় হুমড়ি খেয়ে। হরিমামা এই রোদে যাবে কোথায়, ভোরে বেরবে কাল।
হরিনাথ বলল, বললে যখন তা-ই হোক বউমা, যদিও আমি বাজি ধরে এসেছি।
কীসের বাজি?
জলের বাজি, পানি বাজি।
এখন এখানে সাতটা, ইউ কে-তে দুপুর, বিলেতবাসী সম্বিত কথা বলতে এসেছে অনেক দিন বাদে। আজ সে বাড়িতে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে, কেমন একটা শীত শীত ভাব এসেছে আচমকা। বাসুদেব বলল, এ দিকে কোথাও জল নেই আকাশের।
সম্বিত বলল, আমাদের এখানে তো সারা বছর লেগেই আছে, এই এখন তো হচ্ছে।

বাসুদেব নেটওয়ার্কে ফেসবুক খুলে বসেছে। তার এই ভুবন বেশ বড়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বন্ধুতার হাত বাড়াচ্ছে। সে গ্রহণ করলেই হল। তার ভিতরে অচেনারা বেশি। প্রতিদিনই বাসুদেব নানা কথা লিখে দেয় তার নিজের ওয়ালে, তা ছড়িয়ে যায় বিশ্বভুবনে। পশ্চিম থেকে পুবে। বাসুদেবের কাছে এক জন এল, পুরুলিয়ার মৃত্তিকা সেন, দাদা কবে নামতে পারে জল?
সে যেন বৃষ্টির খবর রাখে, লিখল, ভেবে দেখি কবে আসে, আমি বললে হবে?
একটি হাসিমুখ উপহার দিলেন মৃত্তিকা সেন। গৈরিক মাটির দেশের মেয়ে। স্মাইলি আঁকেন যখন তখন। সেই সময় সম্বিত জিজ্ঞেস করল, এখনও আড্ডা হয় কফি হাউসে?
কম হয়, আমি যাই।
কে কে আসে?
তাদের তুই চিনবি না।
তোর কলিগ?
বাসুদেব বলল, না, না, তারা কবি, ব্যবসায়ী, গদ্যকার, সায়েন্টিস্ট...।

সম্বিত চুপ করে থাকে। তখন বাসুদেবকে ডাক দিল হরিনাথ বিশ্বাস, বলল, তোমাদের কী ভাগ্নে, জল হোক না হোক, জলের অভাব নেই, সামনে টালার জল ট্যাঙ্কি।
বাসুদেব ঘাড় কাত করল নেট থেকে চোখ সরিয়ে। হরিনাথ বলল, ২৪ ঘণ্টা জল।
হুঁ, তোমাদের ওখানে কী অবস্থা? বাসুদেব জিজ্ঞেস করল বেলপাহাড়ির সায়েব মুর্মুকে।
বুঝতে পারি না, ভাল আছি না খারাপ আছি, আমি কোনও দিন কলকাতায় যাইনি।
কেন, অনেক দূর তো নয়।
আমার বাবা এই মহকুমা ছেড়ে কোনও দিন বেরয়নি।
কেন, পার্টি যে এত মিটিং-মিছিল করে, আদিবাসীরা কলকাতা অভিযান করে...
সায়েব বলল, আমার ঠাকুদ্দা গাঁ ছেড়েই বেরয়নি কোনও দিন।
বেঁচে আছেন?
হ্যাঁ, খুব বুড়ো।

বাসুদেবের আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। মাওবাদী, পুলিশ, যৌথ বাহিনী, কিন্তু নিজেকে সংবরণ করল। কার পরিচয় কী, তা সে জানে না। এই যে সায়েব মুর্মুর সঙ্গে কথা বলছে, এমন হতেই পারে, বেলপাহাড়ি নয়, এই যুবকটি কথা বলছে কলকাতা থেকে। হয়তো এ যুবক নয়, মধ্যবয়সি কেউ। পুলিশ কিংবা মাওবাদী। খুঁজে দেখছে তার পক্ষে না বিপক্ষে বাসুদেব দত্ত। সম্বিত আবার ফিরল তার কাছে, কত দিন কফি হাউসে যাইনি।
কলকাতায় আয়, এক দিন দুপুর থেকে হবে।
কানাই আসবে?
ও তো বাঁকুড়ায়, ও দিকের ইস্কুলে মাস্টারি করে।
রাকা?
বাসুদেব লিখল, কফি হাউসের দিনগুলি আছে, একটু অন্য ভাবে রে, আয় কলকাতায়।
রাকার কথা বললি না?
রাকা দাশগুপ্ত, ফেসবুকে খোঁজ, পেয়ে যেতে পারিস।

সম্বিত আবার চুপ। হয়তো তার ঘরের জানলা দিয়ে বিলেত দেশটির বর্ষা দেখছে একা একা।
বাসুদেবকে তখন হরিনাথ বলল, আমাদের ও দিকে প্রায় সব মাঠ পুকুর পুড়ে পুড়ে ফেটে গিয়েছে।
হুঁ, বৃষ্টি এ বার নামতে দেরি হবে, বর্ষার মেঘ দুর্বল।
কে বলল বল দেখি ভাগ্নে? হরিনাথ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
হাওয়া অফিস।
হরিনাথ বিশ্বাস হাসল, মিলবে না ওদের কথা, মেলে না কোনও দিন, কী করে মিলবে, যে বলে সে কি ভোলানাথ বিশ্বাস?
তার মানে?

হরিনাথ বলল, আমার ঠাকুদ্দা, ঈশ্বর ভোলানাথ বিশ্বেস বলতি পারত, বাতাসের গন্ধ শুঁকে ধরতে পারত সব, তুমার মা তারে দেখেছিল ওপারে, গাঙে গাঙে ঘুরে সে এই বিদ্যে অর্জন করেছিল।
বেঁচে আছে? শুভশ্রী জিজ্ঞেস করল।

জানা নেই, এ পারে এসেও ওপারে ফিরে গিয়েছিল একা, তার পর কত রোদ বিস্টি দেখি আর ভাবি আমার ঠাকুদ্দা ভোলানাথ এ সব আগাম জেনে বসে আছে, আমরা অন্ধ! হাঁসফাঁস করে মরি।
শুভশ্রী বলল, আর খোঁজ পাওনি মামা?
নাহ্! মাথা নাড়ল হরিনাথ, তার পর বলল, সে লোক তো গাঙে গাঙে গিইছিল, ইছামতীর জলে এক দিন ভাসল, আর ফিরল না, আমার বাবা গাঙে গাঙে কত ঘুরল, পেল না, ঠাকুদ্দা ওপারে গিয়ে জলের নিদান দেচ্ছে ঠিক।

শুভশ্রী নড়ে বসে। আসলে এই জন্য তো লোকটাকে রেখে দেওয়া, না যেতে দেওয়া। এর আগে এক ঠাকুদ্দার কথা বলেছিল যে কিনা বানবন্যে আটকাতে পারত। তার নাম কি ভোলানাথ? না, না, শুভশ্রীর মনে পড়ল এই বছর কয়েক আগে পুজোর আগে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে প্রবল বর্ষা চলতেই লাগল, তার ভিতরে হাজির এই হরিনাথ, তারা কেমন আছে তার খোঁজ নিতে এসেছিল, বলেছিল তার ঠাকুদ্দা বানবন্যে কত আটকেছে, তুমার মা থাকলে বলত। এই সব ঝড়-বাদলা তার কাছে নস্যি, বড় গাঙের লাফানি-দাপানি সব থামাতে ওস্তাদ ছিল সে।

সে বলল, আগে তো শুনিনি এই লোকের কথা।
বলিনি তাই শোনোনি।
শুভশ্রী বলল, এক জনের কথা তো বলেছিলে সে বার, সে কোন ঠাকুদ্দা?

হরিনাথ বলল, ঠাকুদ্দারা ছিল সাত ভাই, তাদের কেউ হবে, এই জন আমার আপন মনে হয়, তিনি বলতে পারত বিস্টি হবে কী হবে না, শীত পড়বে কী পড়বে না, গাঙে তুফান উঠবে কী উঠবে না, ঝড়-বাদলের আগাম খবর।
হরিনাথ বিশ্বাস যখন কথা বলছে বাসুদেবের ফেসবুক ওয়ালে তখন ভেসে উঠল ফরিদপুরের জামাল, লিখেছে সে আব্বাসউদ্দিনের গান... আল্লা মেঘ দে পানি দে, ছায়া দে রে আল্লা...।
সঙ্গে সঙ্গে সিলেটের কবি লিখল, এমনি বরষা ছিল সে দিন... শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন... তব পাতে ছিল অলস দিন... মনে কি পড়ে প্রিয়?

বনগাঁর শ্রাবন্তী লিখল, মেঘমল্লারে সারা দিনমান বহে ঝরনার গান...

কুয়েতের মরুভূমি থেকে লিপিকা লিখল, আসছে আষাঢ় মাস, মন তাই ভাবছে কী হয় কী হয়!
মুম্বইয়ের চন্দ্রাণী লিখল, এল বরষা যে সহসা মনে তাই... রিমঝিম ঝিম, রিমঝিম ঝিম গান গেয়ে যায়...।
পটুয়াখালির আঁধারমানিক নদীর কুল থেকে মহেশ্বর জলদাস বলল, আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেব মেপে... রিমঝিম বরষার গগনে... কাটফাটা রোদের আগুনে...।

বৃষ্টির ফোঁটার মতো গানের কলি ভেসে আসতে লাগল। এদের কাউকে বাসুদেব চেনে না। এদের সঙ্গে এখানে পরিচয়। এদের সঙ্গে কখনও কথা হয়, কখনও হয় না। কেউ কেউ পরিচয়ের পর হারিয়ে যায় একেবারে। এই সব নারী-পুরুষরা সবাই যেন অলীক, বাস্তবে এদের কোনও চিহ্ন কোথাও নেই এই নেটওয়ার্কের বাইরে।
এক জন গন্ধর্ব-কন্যা মলয় পর্বতের সানুদেশ থেকে লিখল, শীতকাল কেটেছে কৃচ্ছ্রতায়, সেই ফাল্গুন থেকে যে কোকিল ডেকে যাচ্ছে, সে ডেকেই যাচ্ছে, বর্ষা তুমি এসো না, কোকিল বধূর কেলিকাকলিতে মধুর হয়ে থাকুক এই পৃথিবী।
হায় ভগবান, কী কস তুই মুখপুড়ি, সবাই বর্ষা চায়, তুমি কোকিলের ডাক শুনবে বলে, এই দাবদাহ রেখে দিতে চাও! লিখল অলীক এক যক্ষ বিন্ধ্য পর্বত থেকে।

কত রকম নাম নিয়েছে কত জন এই ভুবনে। এল অন্য আর এক জন, বলল, হে মেঘ তোমার যাত্রাপথে দেখতে পাবে বিদিশা নগর। এর নাম বেত্রবতী, ঠিকানা বিদিশা, এর চেয়ে ভাল পরিচয় কী হয় আর? সে লিখল, হে, আগ্নেয় মেঘ এসো, এসো জীমূত মেঘ, বলাকারা তোমার ছোঁয়ায় গর্ভবতী হোক, আকাশ তাদের অনিঃশেষ ক্রন্দনে ছেয়ে গেল।
বাসুদেব দেখে যায় সব।
তখন ফরিদপুরের জামাল লিখল, দাদা, আপনাদের কেরলে নাকি মৌসুমি বায়ু ঢুকেছে?
তাই তো খবর।

তা হলে আশা করতে পারি, গরমে লোক মরছে খুব, এমন আগে দেখিনি।
তখন হরিনাথ উবজিয়ে বলল, হাড়োয়ার ও দিকে শুনেছি পানি বাজার বসে।
সে আবার কী? শুভশ্রী জিজ্ঞেস করে।
পানি ফকিরের পুজো আর মেলা।
পানি ফকির তো বরুণদেব।

হরিনাথ বিশ্বাস বলল, হবে হয়তো, কিন্তু সন্দ’ সে আমার ঠাউদ্দা ভোলানাথ বিশ্বেস হতি পারে, তিনি ইচ্ছে করলি বিস্টি আনতে পারত।
রেনমেকার! শুভশ্রী বলল।

কী সুন্দর হেসে ঘাড় কাত করল হরিনাথ, কথাটা পরিষ্কার বুঝল।
ঠিক সেই সময়ে আবার সায়েব মুর্মু এল তার বাসুদেবের জানালায়, স্যর বিস্টির খবর জানেন?
হরিনাথ জানে। লিখে দিল বাসুদেব।
আমাদের এখেনে যে হরিনাথ ছিল, সে জেলখানায়, তার কথা বলছেন স্যর?
চুপ করে থাকল বাসুদেব। কথা যেন কথার বাইরে চলে গেল, সে নিরাপদে নিরুপদ্রবে থাকতে চায়। তার পর লিখল, এ দিকেও নেই বৃষ্টি।
স্যর, আমাদের কানাইশোর পাহাড়ের মাথায় মেঘ দেখা গেল, কিন্তু বিস্টি হল না। সায়েব মুর্মু বলল।

কানাইশোর পাহাড়ে আষাঢ় মাসের দ্বিতীয় শনিবারে পাহাড় পুজো হয়। সেই পুজোর কথা মনে পড়ল বাসুদেবের। সে বছর কুড়ি আগে গিয়েছিল সেই মেলায়। লন্ডন শহরের সম্বিত বসুও ছিল। সেই কানাইশোর পাহাড়টির কথা বহু দিন বাদে কেউ বলল। ক’দিন আগে দূর পাহাড়ের দিকটা কালো মেঘে ভরে গেল, কিন্তু ওইটুকু, ঠান্ডা বাতাস দিয়ে মেঘ ঢেকে গেল অন্ধকারে। পর দিন আবার গনগনে রোদ। বৃষ্টি হলে বুড়ো ঠাকুদ্দাকে একটু ভেজাত তারা। বুড়োর গা ভরে গেছে চাকা চাকা ঘায়ে। ঘাম পচে অমন হয়। বৃষ্টির জলে ঘা নরম হত। ভিজতে ভিজতে বুড়ো সুস্থ হত। তার জ্ঞান আছে টনটনে, বলছে, পানিহ্ আসুক, আমার রোগ যাবে।
ঠাকুদ্দার বয়স?
সত্তর-আশি হবে।
বসতে পারে?
শুয়ে থাকে, বুড়ো বন চিনত ভাল।
তুমি কি বন চেনো না?
ভুলে গেছি বনের কথা।
তুমি কি বনের পাশে থাকো না?

সায়েব মুর্মু অফ লাইন হয়ে গেল। হয়তো বনের ভিতর ঢুকে গেল বর্ষার এই খবর নিয়ে। আর এক হরিনাথের খবর নিয়ে। সেই সময় জানলায় এল ‘আমি ইরাবতী’, বলল, অসম পাহাড়ে জল নামেনি, চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি ফুরিয়েছে জানেন?
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা। বলল বাসুদেব।
মায়ানমার থেকে মেঘ ঢুকবে উত্তর-পুবের পাহাড়ে।
জানি।
কোনও খবর আছে?
হরিনাথের ঠাকুদ্দার কাছ থেকে খবর পেলে দেব। বাসুদেব বলল, কে হরিনাথ আমাদের দেশ সাতক্ষীরার ধুলিহরে বাড়ি, হরিনাথের ঠাকুদ্দা, তার বাবা গাঙে গাঙে ভেসে বেড়াত, কপোতাক্ষ, বেতনা, ভৈরব, রূপসা, মধুমতী...।
পদ্মা, মেঘনা, কীর্তনখোলা?
তুমি জানো ওই সব নদীর কথা?

জানি জানি জানি, আমি বিয়ের পর বাঁকুড়া, আমাদের বাড়ি ছিল কর্ণফুলির কুলে, নদীর কথা কি নদী জানবে না? নদীর সঙ্গে নদী মেশে, না হলে সাগরে গিয়ে দেখা হয়, তাই তো, ঠাকমা বলত, গাঙ! আমার শ্বশুরবাড়ির দেশে তো গাঙ নেই, পাথর আর পাথর।

তখন হরিনাথকে শুভশ্রী বলল, যে দেশে গাঙ নেই, সেখেনে মানুষ কী করে?
শুকনো ভুঁয়ে জাল পাতে, বউমা এসো জাল ফেলি, বাজি ধরি।
বেটিং, বাজি, জুয়া... নিষিদ্ধ।
তুমি বলো জল নামবে কি নামবে না?
বললাম নামবে না, জিতেও গেলাম। শুভশ্রী বলল।
তুমি কি জিততে চাও? শীর্ণকায় বুড়ো তার দিকে জুলজুলে চোখে তাকিয়ে বলল।
বাজিতে তো সবাই জিততে চায়। শুভশ্রী বলল।
চুপ করে গেল হরিনাথ। তার কালো হাড়জিরে দেহটা একটু কেঁপে গেল, বিড়বিড় করল, টালার জল ২৪ ঘণ্টা, ঠান্ডা ঘর, ভাগ্নে তুমার অফিসঘরও কি ঠান্ডা ঘর?

ঘুরে তাকায় বাসুদেব, তখন তার কাছে আবার সম্বিত ফিরে এসেছিল, বলছিল, রাকা দাশগুপ্ত বাহান্ন জন আছে, রাকা আছে একশোর উপর, কারও ছবি দেখে ধরা গেল না বাসু।

বাসুদেব বলল, সে কী আর আগের মতো অল্প বয়সে আছে, তুই তোর ওই আল্পসের চুড়ো থেকে মেঘদূত পাঠিয়ে দে সম্বিত, সে রাকার কাছে যাবে তোর বার্তা নিয়ে, তুই হলি নির্বাসিত যক্ষ, তোর দূত আমাদের তৃষিত বুক ঠান্ডা করবে, গোটা দেশ একসঙ্গে ভিজবে।
সম্বিত একটু সময় নিল, তার পর বলল, দাম লাগবে, মেঘও কি আমদানি করছে ইন্ডিয়া? বৃষ্টি কিনে নিতে হবে, ডলারে পেমেন্ট।
কর বসিয়ে দাম দেব, অলকাপুরীর পথে যাত্রা করিয়ে দে মেঘ।
পৃথিবীটা বদলে গেল কত, আমাদেরও বয়স হয়ে গেল বাসু। বিড়বিড় করল সম্বিত।
ঠেকিয়ে রাখা গেল না। বলে বাসুদেব একটি হাসিমুখ উপহার দিল। তার অর্থ একটু থামতে চায় সে। হরিনাথকে বলল, হ্যাঁ, গাড়ি, অফিসঘর, সব ঠান্ডা, কেন বলো দেখি?
তাহলি বিস্টির কী দরকার তোমার?

বাসুদেব ভাবল লোকটাকে জবাব দেয় ভাল করে। দরকার নেই তো। বৃষ্টি কী হবে তার? কলকাতা ডুববে, বেশ তো আছে, তার কোনও মাথা ব্যথা নেই অনাবৃষ্টি নিয়ে। গাড়িটা এসি, অফিস এসি, বেডরুম এসি। বৃষ্টি হলে কী, না হলেই বা কী। কিন্তু বলতে পারে না লোকটাকে, মা পছন্দ করত, বাবার খুব ন্যাওটা ছিল, বাবাকে মামা বলত, মাকে বলত দিদি। সেই থেকে বাসুর মামা। কত বয়স হবে? সত্তর তো কবে পার হয়েছে, আশি হবে কি? কে জানে। এই রকম দড়ি পাকানো চেহারার মানুষের বয়স ধরা যায় না। মুখের বদলও দেখছে না বাসুদেব। সে বলল, আমার কি আকাশের জলের দরকার আছে হরিমামা?
ধান বুনতিও হবে না ভাগ্নে, কী দরকার জলের?
বাসুদেব বলল, আছে মামা, ঝমঝমে বর্ষা হলেই তবে ইলিশ, ইলিশের জন্য চাই বর্ষা।
হরিনাথ বলল, বউমা, আর এক বার ওই শরবত দিবা, নেবু গন্ধডা ভাল।

হাসিমুখে শুভশ্রী লেমন স্কোয়াস আনতে চলল। হরিমামা সোফা থেকে নেমে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে বলল, কোথাও নাকি জল নেই, সাতক্ষীরে, খুলনা, বরিশালেও না।
চমকে উঠল বাসুদেব, বলল, তুমি জানলে কী করে।
বুঝা যায়, এটুকুন জানতি পারব না!
তোমারও কি ফেসবুক আছে?
আছে মনে হয়। হরিনাথ নির্বিকার
গলায় বলল, ভোলানাথেরও আছে, তার বাবারও আছে।

বাসুদেবের মনে হল কথাটা হয়তো সত্য। এই যে এত বন্ধু তার, তাদের ভিতরে ভোলানাথ, তস্য পিতা শিবনাথ, তস্য পিতা রমানাথ কি নেই আত্মগোপন করে? তার বন্ধু হয়েছে, সে জানতে পারছে না।
তখন গন্ধর্ব কন্যা তার ফেসবুকে এসে বলল, যার যেমন রেস্ত আছে সে তেমন পাবে, তাই বলে আমি আমার ফাল্গুন-চৈত্র ছাড়ব কেন, বর্ষা আমি চাই না, আমি রাজপুত্রের জন্য বসে আছি।

অদ্ভুত! কোন সময় থেকে কে কথা বলছে কিছুই ধরা যাচ্ছে না। ওই গন্ধর্ব কন্যা যদি রূপকথা থেকে বেরিয়ে এসে থাকে মলয় পর্বতের সানুদেশে, ‘আমি ইরাবতী’, তো বলছিল বারাসতের বার্মা কলোনি থেকে, ২০১২-তে।

ইরাবতী বলল, জীবনে প্রেম হয়নি, এখন যৌবন গেছে, নাম ভাঁড়িয়ে গন্ধর্ব কন্যা হয়েছে, ওর দিকে কেউ ফিরেও তাকাবে না, সেলফিশ! ওদের জন্য বর্ষা বিলম্বিত, এখনই খবর এল, ও দিকে গোয়া আর এ দিকে সিকিমে আটক করে রেখেছে আমাদের মৌসুমি বায়ুকে, কী হবে স্যর, কী আশ্চর্য, কাশ্মীরে হানা দিল পশ্চিমি ঝঞ্ঝা, পুরুল্যা শুখা হয়ে থাকল, মায়ানমারের মেঘ এ দিকে আসছে না।
উত্তর দিতে যাবে বাসুদেব তো হরিনাথ বলল, বাজি ধরবে ভাগ্নে?
কী বাজি?
বউমা ধরল, তুমিও ধরো, জল হবে কি হবে না?
বাজি ধরলে কী হবে?
একটা কিছু হবে।

শুভশ্রী ঢুকল লেমন জুস নিয়ে, বলল, আমি তো ধরলাম, হবে না বৃষ্টি।
বাসুদেবও বলল, আমিও তাই বলছি, তুমি যে হেরে যাবে মামা।

হরিনাথ তার ফোকলা গালে হাসল, বলল, আমি তবু বলব হবে, আমি ঈশ্বর ভোলানাথের নাতি, তিনি বিস্টি নামাত, আমি বাজি ধরি তাঁর দিকে চেয়ে!
বাসুদেব বলল, এ কিন্তু জুয়া।
হরিনাথ বলল, হোক জুয়া, বিস্টি তো চাই ভাগ্নে।
তুমি তো হেরে যাচ্ছ মামা।
ঈশ্বর ভোলানাথ বিশ্বেসের নাতি হারবে কেন, টায়েম দাও ভাগ্নে।
কত দিন?
যত দিন না জল নামবে। মিনমিনে গলায় বলল হরিনাথ।
কত দিন চাই তোমার?

সামনে তো অমাবস্যে, পরের পুন্নিমে পর্যন্ত টায়েম দাও।
হেসে ফেলল শুভশ্রী, অত দিন! তা হলে তো এমনিই নামবে, আমরা হেরে যাব।
ভোলানাথের নাতি বাজিতি হারে না বউমা।

এই কথোপকথনের ভিতর, সন্ধে থেকে বর্ষা নিয়ে অলীক ভুবনে নানা জনের নানা কথা শুনে শুনে আচমকা কী যে মায়ায় পড়ল যে বাসুদেব! জিততে এসেছে হরিনাথ বিশ্বাস, জিতুক, নির্মেঘ, শুখা আকাশ নিয়েই জিতুক... সে আচমকা ঘোষণা করে দিল।
‘অবশেষে এলেন তিনি, এই অন্ধকারে আচমকা এসে গেলেন, মেঘমল্লারে শিহরিত হল বিশ্ব ভুবন... বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল... তিনি এলেন ঘন ঘন বিদ্যুচ্চমকিত হয়ে, মেখলা উড়িয়ে আঁচল উড়িয়ে, এলোকেশী মেঘ হয়ে এলেন তিনি...।
কী আশ্চর্য! তখনই সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মসলন্দপুরের হরিনাথ বিশ্বাস, ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে বুড়ো বলল, ‘কী হল ভাগ্নে, বিস্টি এল মনে হচ্ছে, ওখেনে খপর এল নাকি?’ কম্পিউটারের দিকে তর্জনী তোলে হরিনাথ।

লিখেছিল বাসুদেব এমনি। খেয়ালে সে এমনি কত লেখে। অলীক এই ভুবনের সঙ্গে কি অনাবৃষ্টির পৃথিবীর কোনও মিল আছে? না, এ আলাদা ভুবন, এখানে না গ্রীষ্ম না বর্ষা, না বসন্ত। এখানে ইচ্ছা বর্ষা, ইচ্ছা গ্রীষ্ম। তার কথা পৌঁছে যেতেই এই মহাবিশ্ব... ভুবনগ্রাম চঞ্চল হয়ে উঠল... তাই! কোথায় বৃষ্টি? ...নেমেছে নেমেছে, তা হলে এ দিকেও আসবে মেঘ... ঠাকুর আপনাদের সহায় তাই নামল জল... মায়ানমারের মেঘ এল, না পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মেঘ, বিন্ধ্যর বজ্রগর্ভ মেঘ... আপনি ভাগ্যবান, আপনি পুণ্যবান তাই পেলেন বৃষ্টি... বাজি ধরলে জিতে যেতেন।

কম্পিউটারের মনিটরে চোখ রেখে উল্লাসে চিৎকার করে ওঠে বাসুদেব, হ্যাঁ, নেমেছে মামা, নেমেছে, নেমেছে।
নেমেছে! আশ্চর্য! শুভশ্রী উঠে দাঁড়ায়, সত্যি নেমেছে, কোথায়?
কলকাতা, মলয় পর্বত, বিদিশা, বনগাঁ, মসলন্দপুর, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালি, সিলেট, ভুবনজুড়ে বরষা...।
এখানে কই? জানলা দিয়ে অন্ধকারে হাত বাড়াল শুভশ্রী, বাতাস গরম এখনও।

হরিনাথ বলল, দরকার নেই, তাই টের পাচ্ছ না, ভাগ্নে আমি বাঁচলাম, গন্ধ পাচ্ছি ভিজে মাটির। বলতে বলতে সমঝদারের মতো মাথা দোলাতে লাগল হরিনাথ। যেন ঝড়-বাদলে আন্দোলিত হচ্ছে পিয়াসি তরুকুল। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান ধরেছেন মেঘমল্লার। মেঘের মতো ডেকে ডেকে ঘিরে ধরছেন তাকে।
বাসুদেব হাসল, বলল, ইচ্ছা পূরণ হয়ে গেল নিজের দোষে বাজিতে হেরে গেলাম মামা।
আমার ঠাকুদ্দা ভোলানাথের ইচ্ছে, তিনি মনে করলেন, তাই তুমি হারলে।
তখন ফেসবুকে একের পর এক মানুষ ঘিরে ধরেছে বাসুদেবকে, খুব বৃষ্টি, খু-উ-উ-ব?
বাসুদেব লিখল, বড়ে গুলাম আলি খান একটি হাত আকাশে তুলে, একটি হাত চিবুকে ছুঁইয়ে ধরলেন মেঘমল্লার, নামল তখন।
তার পর, তার পর?
গাইতে দাও ঈশ্বরকে, ভোলানাথ বিশ্বাসকে... মেঘমল্লারে ডুবে যাক ঈশ্বরের পৃথিবী।

হরিনাথ সেই সময় শুভশ্রীকে বলল, তিন হাজার ছিল বাজি, তোমাদের দেড়-দেড়, দু’জনেই হারলে, মসলন্দপুরে খুব নামল গো, টায়েম দিল না ঠাকুদ্দা।
আবার সময় চাও এখন! বাসুদেব গরগর করে ওঠে।

‘চাল ছাইতি হবে ভাগ্নে, একেবারে গেছে, কিচ্ছু নেই মাথার উপর, জল নামার আগে না করলি বেপদ, আগের সনে খুব কষ্ট গেছে, এমনি কী আসা, আমার আছেডা কে বলো বউমা, বষার্য় ও ভিটে আর থাকপে না, বাজিডা জিতার দরকার ছেল খুব।’ বলতে বলতে হরিনাথ বিশ্বাস, গ্র্যান্ড সন অব ভোলানাথ বিশ্বাসের ঘাড় বেঁকে গেল। মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সে। ভিজছে অনিঃশেষ ধারায়।


লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র
জন্ম :৩০ আগস্ট১৯৫১

বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কাছে ধুলিহর গ্রামে | বিজ্ঞানের ছাত্র | কর্ম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক দপ্তরে | তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্রউপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।]
প্রকাশিত বই : পাহাড়ের মত মানুষ, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, অর্ধেক রাত্রি, ডানা নেই উড়ে যায়, ধুলোগ্রাম, অশ্বচরিত, আগুনের গাড়ী,ধ্রুবপুত্র, নদীবসত, কৃষ্ণগহ্বর, আসনবনি, নিস্তব্দ নগর, প্রান্তরের অন্ধকার, ভি আই পি রোড, শ্যাম মিস্ত্রী কেমন ছিলেন, গজেন ভূঁইয়ার ফেরা, জনসমুদ্র, সবুজ রঙের শহর, সমাবেশ, সারিঘর, সুবর্ণরেখা, সোনাই ছিলো নদীর নাম, হাঁসপাহাড়ি।
পুরস্কার : সাহিত্য একাডেমী।

1 টি মন্তব্য:

  1. আহা... আয় বৃষ্টি ঝেঁপে... গন্ধ এল ভিজে মাটির, গাছপালার।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন