শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

সোমেন চন্দের ‘ইঁদুর’ : ছেঁড়া কাঁথায় পট্টি লাগানো জীবনের ইতিকথা

দীপংকর গৌতম

সোমেন চন্দ। বাংলা সাহিত্যের তিন উদীয়মান তরুণ সাহিত্যিদের একজন। সুকান্ত কবি হিসেবে ও সোমেন চন্দ আধুনিক কথাশিল্পের স্থপতি হিসেবে এবং খান মোহাম্মদ ফারাবী উভয়কেই ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই তিন সাহিত্যিকের কেউই ২২ বছরও বাঁচতে পারেননি। অর্থাৎ ২২ বছরের পূর্বে, ২১ শের ঘরে তাঁদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। সোমেন চন্দকে হত্যা করা হয়। আর অন্য দু’জন মরণব্যাধী যক্ষা ও ক্যান্সারে মারা যান।


সোমেন চন্দকে বলা যেতে পারে মার্কসবাদী চেতনা, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও প্রগতি সাহিত্য সংঘের এক যুগতারকা। প্রগতিশীল সাহিত্য ধারায়, এক যুগ প্রবর্তক। বিশেষ করে তাঁর ছোটগল্পগুলো বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণের ধারা থেকে প্রাতস্বিক একটি ধারায় সমুজ্জ্বল ও অভিস্নাত।

ইঁদুর সোমেন চন্দের শ্রেষ্ঠ গল্প। জীবনের সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি, গল্পের কাঠামো নির্মাণ, নির্মাণ শৈলী, ঘরোয়া ও সামাজিক চরিত্র সৃষ্টি এবং গল্পের মুন্সিয়ানা বাংলা গল্পের একটি নান্দনিক অভিযোজন। তাছাড়া ছেঁড়া কাঁথায় পট্টি লাগানোর মতো আমাদের ছিন্নভিন্ন নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের তিক্ততা ও স্থুলতা, ফুটে ওঠেছে ইঁদুর গল্পে। এ গল্পে দেখা যায়, একটি সংসারের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় খুঁটি-নাটি এমন কিছু নেই যা সোমেন্দন চন্দের দৃষ্টিকে এড়িয়ে গেছে—আমাদের বাসায় ইঁদুর এত বেড়ে গেছে যে আর কিছুতেই টেকা যাচ্ছে না। তাদের সাহস দেখে অবাক হতে হয়। চোখের সামনেই, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদলের সুচতুর পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার মতো ওরা ঘুর বেড়ায়, দেয়াল আর মেঝের কোণ বেয়ে-বেয়ে তর-তর করে ছুটোছুটি করে। যখন সেই নির্দিষ্ট পথে আকস্মিক কোনো বিপদ এসে হাজরি হয়, অর্থাৎ কোনো বাক্স বা কোনো ভারি জিনিসপত্র সেখানে পথ আগলে বসে, তখন সেটা অনায়াসে টুক করে বেয়ে তারা চলে যায়। কিন্তু রাত্রের আরও ভয়ংকর। এই বিশেষ সময়টাতে তাদের কার্যকলাম আমাদের চোখের সামনে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হয়ে যায়। ঘরের যে কয়েকখানান ভাঙা কেরোসিন কাঠের বাক্স, কেরোসিনের অনেক পুরোনো টিন, কয়েকটা ভাঙা পিঁড়ি আর কিছু মাটির জিনিসপত্র আছে, সেখান থেকে অনবরতই খুট-খুট টুং-টুং ইত্যাদি নানা রকমরেম শব্দ কানে আসতে থাকে। তখন এটা অনমান করে নিতে আর বাকি থাকে না যে, ঝাঁক ন্যুব্জদেহ অপদার্থ জীব ওই কেরোসিন কাঠের বাক্সের ওপরে এখন রাতের আসর খুলে বসেছে’।

গল্পের এই শুরুটা ও এর মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রতীকি চেতনা ইঁদুর গল্প বৈশ্বিক নতুন মাত্রার একটি নবতর সংযোজন। এখানে মা ও বাবার মনোজগৎ, নিম্নমধ্যবিত্তের অভাব-অনটন প্রসূত মানসিক যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা, শঙ্কা ও পলায়নপরতা গল্পকে বিন্যাসী এক শিল্পে পরিণত করেছে। এরমধ্যে সন্দেহপরায়ণতা তো আছেই, দরিদ্র ও জীর্ণ একটি সংসারের ইঁদুর মারার কল কেনার পয়সারও সংকট, দারিদ্র্যের এক নির্মম চিত্রায়ন। যা তিনি ভেতর থেকে দেখেছেন। ইঁদুর গল্প মূলত প্রতীকি চেতনা সর্বস্ব। সামগ্রিকভাবে ইঁদুর গল্পের সমালোচনা করতে গেলে যায়, এ গল্পে পুঁজিবাদী সমাজের নিম্নতর শ্রেণির মধ্যে যে আত্মবিরোধ, স্বপ্রতারণা, ক্ষয়িষ্ণু রূপেরই প্রতিফলন। এছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত বিত্তহীন অক্ষম মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দেখানো-- তারা সর্বোতভাবে আত্ম-প্রবঞ্চক। তাদের চাওয়া অর্থ সামান্য কয়েকটা পয়সা, অসহায় স্ত্রী-কন্যা ও পুত্রদের উপর ভোগের উপকরণ স্ত্রীর শরীর, আর বীরত্বের আস্ফালন কয়েকটি ইঁদুর ধরা পড়ায়। ইঁদুরের এই মোটিফটি গল্পের শুরু থেকেই ব্যবহার হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজের এই নিচের স্তরটির শিরায় শিরায় চলে চোরের আক্রমণ। এগল্পের মূল চরিত্র সুকু বা সুকুমার এই বৃত্তের বাইরে যাবার পথ কাটে। রেল শ্রমিক সংগঠনে সে দেখে এসেছে নতুন কলের কর্মী মানুষের সংকল্প। গল্পটি ঘুরে এসে আবার বন্দি ইঁদুর ধরার পর্বে উল্লসিত।



সোমেন চন্দ ইঁদুর গল্পটি লিখেছেন বেশ আগে। কিন্তু এই ইঁদুর প্রতিকীর অভিধা আজকের সমাজেও উজ্জ্বল। এই ইঁদুর তার তীক্ষ্ম দাঁতে কোথায় না কাটে। ইঁদুর বই কাটে, টাকা কাটে, কাপড় কাটে, সংস্কৃতি কাটে, সাহিত্যকাটে, অর্থনীতি কাটে; লেপ-তোষক-বালিশ সবই কাটে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ইঁদুর দেশও কাটে। তাই এ ইঁদুর মারতে হবে। সর্বশেষ ইঁদুর খাবারও নষ্টকরে-- মাঝে মাঝে দুধের পাত্রে সাঁতরায়। অতএব ইঁদুর মারতে হবে। কারণ ইঁদুরের জ্বালাতন থেকে বাঁচতে হবে।

সোমেন চন্দের গল্পের নায়ক সুকুমার বললো-- ‘মা, তুমি যা ভিতু।’--ইঁদুরটা অনবরত পালাবার চেষ্টা করছিল। বললাম, ‘আচ্ছা মা, বাবাকে একটা কল আনতে বলতে পার না? কোনোদিন দেখবে আমাদের পর্যন্ত কাটতে শুরু করে দিয়েছে।’

সোমেন চন্দ যেমন মার্কসবাদী, বিপ্লবী ও সংগ্রামী মানুষের চিত্র এঁকেছেন। তেমনি এঁকেছেন পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং আদর্শব্যক্তিত্বের সাংঘর্ষিক বিক্ষত-বিপর্যস্ত-রক্তাক্ত এবং যন্ত্রণার কাতর চিত্র। সুকুমারদের পরিবারে যেমন আর্থিক যন্ত্রণা, তেমনি রয়েছে অভাবে তাড়না। দুঃখ-যন্ত্রণা, অভাব-অনটন, পারিবারিক অশান্তি সুকুমারদের সংসারকে নিরন্তরভাবে কাটে। এই কাটা স্বাভাবিক কোনো ইঁদুরের যন্ত্রণা নয়। একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের লেপ্টে থাকা অনটন, ক্ষয়, সাংসারিক পরিম-ল থেকে তথাকথিত ‘ভদ্রতা’ নামক শব্দটি উবে যাওয়া-- বাস্তব জীবনের এ বড় নির্মম চিত্র। সেচিত্রের প্রকাশ ঘটে সুকুমারের বাবা-মায়ের তর্ক-বির্তকের মধ্যদিয়ে--

‘শুনতে পেলুম, এর পরে বাবার গলার স্বর রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বোমার মতো ফেটে পড়ল।--’তুমি যাবে? এখান থেকে কি না বলো? গেলি তুই আমার চোখের সামনে থেকে? শয়তান মাগি...।’ বাবা বিড়বিড় করে আরও কত কী বললেন, আমি কানে আঙুল দিলুম, বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে রইলুম অসাড় মৃতদেহ হয়ে.....’

সোমেন চন্দের গল্পে বাস্তব জীবনের মরাচেপড়া অংশ ওঠে এসেছে বিন্যস্তভাবে। তাই তার জীবনবাদিতা এবং নৈরাশ্যহীনতা, ক্লান্তি ও শূন্যতাকে ভাসিয়ে দেয়। ঘনগভীর কালো মেঘের আস্তরণ ভেদ করে পূর্ণিমার চাঁদ সবকিছুকে দেয় আলো করে। এই আলো আঁধারের দুটি চিত্রই তার গল্পে বিম্বিত হয়েছে।

সোমেন চন্দের নৈরাশ্যহীন জীবনবাদিতা তার গল্পকে শূন্যতার হাহাকারের মধ্যে নিয়ে ছেড়ে দেননি। তাই তার গল্পে জীবন মৃতেরাও জেগে উঠে-- ব্যর্থতাকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আসে গল্পের ভেতরে। আবর্জনা ও জীর্ণতার স্তুপ থেকে অভ্যুদয় ঘটে নতুন প্রাণের। চরিত্রগুলো মুক্তি পায় বিবমিষার অন্ধকার থেকে। তাই তিনি ইঁদুর গল্পে মধ্য রাত্রের যে চিত্র আঁকেন তা নবজীবনের অভ্যুদয়ের নতুন আশার সঞ্চার করে। যে কারণে তার গল্পে দেখি সুকুমারের বাবা তার মা’কে যখন বলে-- ‘তুমি যাবে? এখান থেকে কি না বলো? গেলি তুই আমার চোখের সামনে থেকে? শয়তান মাগি...।’ বাবা বিড়বিড় করে আরও কত কী বললেন...’

এ বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সুকুমার লজ্জিত হয়ে তার মুখ বালিশে গুঁজে। কিন্তু সোমেন চন্দ একজন মার্কসবাদী গল্পকার হিসেবে সুকুমারের এই লজ্জাকে নিম্নমধ্যবিত্তের একধরনের ভদ্রলোকিভাব হিসেবে গণ্য করেছেন। যে সংসারে অনটন আছে সে সংসারে ঝগড়া বিবাদ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ তো থাকে আশা নিয়ে সুন্দর দিনের অপেক্ষায়। পরিবর্তনে বিশ্বাসী যারা তারা পারিবারিক এই বচসাকে কেন্দ্র করে গল্প পাঠকদের হতোদ্যম করেননি। তাই একই গল্পে একই পাত্র-পাত্রী দিয়ে তিনি আবার শুনিয়েছেন আশার বাণী।

‘ বাবা মাকে ডাকছেন নাম ধরে। ভারি চমৎকার মনে হল, মনে মনে বাবাকে আমার বয়স ফিরিয়ে দিলুম; আর আমার প্রতি ভালোবাসা কামনা করতে লাগলুম তাঁর কাছ থেকে। যুবক সুকুমার তার বউকেও এমনি করে ডাকবে, চিৎকার করে ডেকে প্রত্যেকটি ঘর এমনি সংগীতের প্রতিধ্বনিত করে তুলবে।

‘কনক? ও কনক?’

প্রৌঢ়া কনকলতা অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনো উত্তর দিলেন না, কোনোবার কঁকিয়ে উঠলেন, কোনোবার উঃ-আঃ করলেন। আমি এদিকে রুদ্ধ নিশ্বাসে নিম্নগামী হলুম। বালিশের ভিতর মুখ গুঁজে হারিয়ে যাবার কামনা করতে লাগলুম। লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠলুম। লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠলুম, শরীর দিয়ে ঘামের বন্যা ছুটল।’

নিশ্চয়ই গল্পের এ অংশটুকু হতোদ্যম পাঠককে আশার সাগরে ভাসিয়েছে। এরপরে সোমেন চন্দ যে বর্ণনাটুকু দিয়েছেন তা আরো হৃদয়স্পর্শী।

‘ ওদিকে মধ্যরাত্রির চাঁদ উঠেছে আকাশে, পৃথিবীর গায়ে কে এক সাদা মসলিনের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে, সঙ্গে এনেছে ঠাণ্ডা জলেরর স্রোতের মতো বাতাস, আমার ধরের সামনে ভিখিরি কুকুরদের সাময়িক নিদ্রাময়তায় এক শীতল নিস্তবদ্ধতা বিরাজ করছে। কিন্তু মাঝে মাঝে ও বাড়ির ছাদে নিদ্রাহীন বানরদের অস্পষ্ট গোঙানি শোনা যায়। মধ্যরাত্রের প্রহরী আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে কখন?

অবশেষে প্রোড়া কনকলতার নীরবতা ভাঙল, তিনি আবার আপন মাহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন, অল্প একটু ঘোমটা টেনে কাপড়ের প্রচুর দৈর্ঘ্য দিয়ে নিজেকে ভালোভাবে আচ্ছাদিত করলেন, তারপর এক অশিক্ষিতা নববধূর মতো ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হতে লাগলেন। অঙ্গভঙ্গির সঞ্চালনে যে সংগীতের সৃষ্টি হয়, সেই সংগীতের আয়নায় আমার কাছে সমস্ত স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি লক্ষ করলুম দুই জোড়া পায়ের ভিরু অথচ স্পষ্ট আওয়াজ আস্তে আস্তে বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

অনেক রাত্রে বাবা গুন্ গুন্ সুরে গান গাইতে লাগলেন; চমৎকার মিষ্টি গলা বেহালার মতো শোনা যাচ্ছে। সেই গানের খেলায় আলোর কণাগুলি আরও সাদা হয়ে গেছে, মনে হয় এক বিশাল অট্টলিকার সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে-বেয়ে সেই গানের রেখা পাগলের মতো ঘরে বেড়াচ্ছে। শেষ রাত্রর বাতাস অপূর্ব স্নেহে মন্থর হয়ে এসেছে। একটা কাক রোজকার মতো ডেকে উঠেছে। বাবাকে গান গাইতে আরও শুনেছি বটে, কিন্তু আজকের মতো এমন মধুর ও গভীর আর কখনও শুনিনি। তাঁর মৃদু-গম্ভীর গানে আজ রাত্রির পৃথিবী যেন আমার কাছে নত হয়ে গেল। তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।’

ইঁদুর গল্পের কাহিনী, ঘটনা সংস্থাপন, যুগ মানসের চেতনা ও সমাজের শ্রেণি চরিত্র বিশ্লেষণ গল্পের বুনন শৈলীকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। ইঁদুর গল্প বাংলা সাহিত্যের একটি স্বার্থকতম রচনা। এ গল্পে গল্পকার সোমেন চন্দ তার গল্পের নির্মাণশৈলীর মধ্যদিয়ে প্রমাণ করেছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ আরোপিত সমস্ত ফাটলে অস্বস্থি কর ইঁদুরের উৎপাত। ইতিহাসের ব্যাখ্যায় বিশ্লেষণবৃত্তির সাহায্যে, বিদ্রুপের উত্তাপে ও আন্তরিকতায় তিনি নিজের রচনাকে বাঙময় করে তুলেছেন।

তার লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরিণত বয়সে না যেতেই তার লেখার আগা- গোড়া সাহিত্য রসে নিষিক্ত। তাই তিনি নিজের ভাষায় এবং দার্শনিক চেতনায় ঋদ্ধ হয়েই লেখাটি লিখেছেন। একটি দারিদ্র পীড়িত শ্রীহীন পরিবার কতটা অমানবিকভাবে জীবন যাপন করে তা একটি ইঁদুরের জীবনকেও হার মানায়। এসব নিম্নমধ্যবিত্তদের উচ্চবিত্তরা চায় পুঁজির কলে ফেলে পিষে মারতে। এই যে মারা না-মারার টানাপোড়েন, অন্যদিকে নিম্নমধ্যবিত্তদের সামাজিক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইঁদুরের মতো কিল বিল করে বেড়ে ওঠে। তাদের অন্তর্গত রাগ, ক্ষোভ, অভাব-অনটন সবকিছু মিলিয়ে শোষক-শোষিতের যে নিষ্ঠুর দ্বন্দ্ব তা চিত্রায়নের মধ্যদিয়ে সোমেন চন্দ তার ইঁদুর গল্পের স্বার্থক রূপায়ন করেছেন। জীবনের ক্ষুদ্রতা ও দীনতা তার সংবেদনশীল হৃদয়কে যতটা পীড়িত করেছে, চারদিকের এই বাস্তবতাকে অবলোকন করে সতেজ, রূপধর্মী এবং অর্থবহ ঘটনার বিন্যাসে তিনি বিন্যস্ত করেছেন তার গল্পকে। স্বাভাবিক দক্ষতা, সংযম এবং ইঙ্গিতময়তা তার গল্পে সুপরিনতি লাভ করেছে। যে কারণে গল্পটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পে রূপায়িত হয়েছে। সোমেন চন্দ সম্পর্কে কমরেড মুজফ্ফর আহমেদ বলেছেন--’সোমেন চন্দ বিশের কোঠায় পা দিতে না-দিতে ঘাতকের ছোরার আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তখন আমি আমাদের বে-আইনি পার্টির সভ্য হিসেবে গা ঢাকা দিয়েছিলাম। সোমেন চন্দের নাম জানা ছিল। কিন্তু তাকে কখনো দেখিনি। কিংবা তখন তার কোনো লেখা পড়িও নি। পার্টি যখন আইন সম্মত হলো তখন বাইরে এসে সোমেন চন্দের লেখা ‘ইঁদুর’ গল্পটি প্রথম বড়লাম। আমার মন তখন হাহাকার করে উঠলো। হায় হায়, এমন ছেলেকে রাজনীতিক মন-কষাকষির জন্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিরা মেরে ফেলল! সোমেন বেঁচে থাকলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিরাট স্তম্ভ গড়ে তুলতে পারতেন। তার ছোট গল্প ‘ইঁদুর’এর ইংরেজি তর্জমা করছেন শ্রী অশোক মিত্র আইসিএস। এই গল্প পৃথিবীর বহুভাষায় অনুবাদিত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ লোক তা পড়েছেন। ‘ইঁদুর’- জগতের একটি শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প।’

সোমেন চন্দের ‘সংকেত’, ‘দাঙ্গা’, ‘বনস্পতি’ ও ‘ইঁদুর’ সবচেয়ে আলোচিত গল্প। এই গল্পগুলো, বিশেষ করে ‘ইঁদুর’ বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর মধ্যে একটি-- একথা দ্বিধাহীন চিত্তেই বলা যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব মহাযুদ্ধের তা-বে মানুষের জীবন যেখানে বিপর্যস্ত। সেখানে ঠিক এমনি সময় একটি দরিদ্র ক্ষত-বিক্ষত পরিবারের পারিবারিক অন্তর্গত গভীরতার সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতর বর্ণনাত্মক গল্প ইঁদুর। এ গল্প সম্বন্ধে অচ্যুত গোস্বামী বলেছেন--

‘দ্বিতীয় বিশ্ব মহাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সোমেন তার বিখ্যাত ইঁদুর গল্পটি লেখে। মনে আছে, সঙ্ঘের বৈঠকে সোমেন নিজে এই গল্পটি পাঠ করেনি। তার শরীরটা ভালো ছিল না বলে পড়তে আরম্ভ করে বারবার হোঁচট খাচ্ছিল। সেই সময় ভাগ্যক্রমে সেদিন বৈঠকে ঢাকা রেডিওর একজন ঘোষক উপস্থিত ছিলেন (নামটি এখন আর মনে করতে পারছি না।) এমন একজন সুকণ্ঠ, সুদর্শন পড়ুয়াকে হাতের কাছে পাওয়ায় আমরা তাঁকেই গল্পটি পড়তে অনুরোধ করি। স্বাভাবিক দক্ষতার ফলে তিনি খুব সুন্দর করে পড়ে কখনো কণ্ঠ উচ্চ করে, কখনো খাদে নামিয়ে তিনি গল্পটির প্রতি সুবিচার করতে পেরেছিলেন। গল্পটি শুনে উপস্থিত সবাই অভিভূত হয়েগিয়েছিল। প্রথম যে কথাটি আমার মনে হয়েছিল তা এই যে-- এরকম গল্প আমি লিখতে পারতাম না।’

সোমেন চন্দ কমিউনিস্ট ছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী ছিলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখকদের সংগঠন প্রগতি লেখক সঙ্ঘের উদ্যোক্তাদের তিনি ছিলেন অন্যতম। সোমেন চন্দের সহকর্মী সদ্যপ্রয়াত দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম সোমেন চন্দের গল্প নয়, তাঁর সম্পর্কে বলেছেন-- ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিলো অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবি ও লেখকরা শহরে এক ফ্যাসিবাদ বিরোধী সম্মেলন আহবান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত হন। সম্মেলন উপলক্ষ্যে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামোটিভাবে তুষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয় দলে ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভিন্ন লোকেরা। যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পরও যথারীতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আমাদের প্রতি আরও লোক আকৃষ্ট হয়।’

সোমেন চন্দের অনেক গল্পেই আমরা তাঁর, তাঁর বাবা গরেন্দ্রকুমার ও মা সরযূবালা ছায়া দেখা যায়। তার গল্প পড়ে মনে হয়, গল্পের পাত্র-পাত্রী সবই তার ঘরের মধ্যে। যে কারণে গল্পের বর্ণনা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকরএবং বিন্যস্ত ও বিস্তৃত। গল্পের কাঠামো নির্মাণ একদম নিজস্ব রীতিতে গড়া। গল্পের টানও তেমনি মানুষকে সহজেই গল্পের ভেতরে বিচরণ করাতে সক্ষম। সোমেন চন্দের জীবনের বড় একটি অভিধা ছিল, যে কোনো পরিস্থিতিকেই তিনি অবলোকন করতেন ঘটনার ভেতর থেকে। বিশেষ করে প্রগতি সাহিত্যের ধারাগুলো তিনি অতিব স্বার্থকতার সঙ্গে রূপ দিতে পারতেন। চরিত্রগুলোকেও এই আলোকে ফুটিয়ে তুলতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। একজন কমিউনিস্ট হিসেবে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের সঙ্গে নিবিরভাবে যুক্ত থেকে তার লেখক জীবনকেও বৈচিত্র্য মণ্ডিত করার, গতিময়তা দানের প্রত্যাশায় লিখে যেতেন এ লেখক। এবং খুব অল্প কালের মধ্যেই তিনি তাঁর সৃজনশীল প্রতিভাকে সম্পূর্ণতা দান করার পথে এগিয়ে চলেছিলেন। প্রতিবিপ্লবীরা তাঁকে এগুতে দেয়নি। তাতে কি তাঁর অগ্রযাত্রাকে থামানো গেছে? যায় নি। ইঁদুর এখন ঘরে ঘরে বিস্তৃতি লাভ করেছে। সমাজের শোষক শ্রেণি যত দিন থাকবে, শোষণ যতদিন থাকবে, পুঁজির দস্যুপনা যতদিন থাকবে -ততদিন ইঁদুর তার স্বীয় চরিত্র নিয়ে বিশ্বের ফ্যাসিবাদ-পুঁজিবাদ বিরোধী গল্প হিসেবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর প্রতিনিধিত্ব করবে। ০




লেখক পরিচিতি 
দীপংকর গৌতম

কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক। জন্ম : কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত। বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত। লিখেন দেশ-বিদেশের কাগজে। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষণাসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২টি। তার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ মেঘ-বিচ্ছেদ(২০০৩) এবং মেঘ বলি কাকে (২০০৪) নব্বইয়ের কবিতায় বিশেষ নিরীক্ষার দাবি রাখে। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। ই-মেইল :

1 টি মন্তব্য: