রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৪

লেখন-খরা এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়

লেখালেখির টিপস

সাজেদা হক

লেখন খরা। এটা একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা। একটি সৃজনশীলতার প্রতিবন্ধকতা। মনে হয় যেনো সৃষ্টির শেষ সীমান্ত। আসলেই কি তাই হয়? হতে পারে?

কোনো কোনো লেখকের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটতে পারে। লেখার খেই হারিয়ে ফেলা যেটাকে আমরা বলছি লেখন খরা, অর্থাত লিখতে লিখতে থমকে যাওয়া, যেনো আর কোনো ভাষাই জানা নেই লেখকের। ঘটনার বর্ণনা করার জন্য কোনো শব্দই বের হচ্ছে না তার মাথা থেকে, স্মৃতি থেকে। মনে হয় লেখকের চিন্তার ভান্ডারও বুঝি ফুরিয়ে গেছে। আসলেই কি এমন ঘটে? ঘটতে পারে। এটা নিয়ে কখনও ভেবেছেন কি?

মানুষ যেমন একই সাথে অনেক ধরণের সমস্যার মধ্যে পড়ে, তা থেকে বের হওয়ার উপায়ও বের করে, বের হয়ও। তেমনি লেখকও লিখতে বসে বহুমূখী সমস্যায় পড়েন। তা থেকে বের হওয়ারও নিশ্চয় অনেক পথ আছে।

আসলে লেখকদের বেলায় লেখন-খরা কেবলি একটা মানসিক অবস্বাদগ্রস্থতা। যা কখনও কখনো আমাদের সৃজনশীল মনকে স্থবির করে দেয়। কিংবা বলা যেতে পারে সৃজনশীল আত্মাটাকে সাময়িকভাবে অস্থির করে রাখে, যেকারণে খরায় পড়তে হয় লেখকদের। প্রত্যেকটা সমস্যার যেমন সমাধান আছে। তেমনি এ সমস্যারও সমাধান আছে। সমস্যার ধরণে যেমন আছে ভিন্নতা, তেমনি সমাধানের ধরণেও রয়েছে ভিন্নতা।


আসুন লেখন খরার কয়েকটি ধরণ ও এ থেকে মুক্তির উপায়গুলো জেনে নিই।


একাধিক ধারণা নিয়ে লেখা শুরু করুন

ধরুন আপনি লিখতে বসেছেন। কিন্তু একটি সাদা কাগজে অনবরত লিখছেন আর কাটছেন। বুঝে উঠতে পারছেন না, আসলে কি লিখতে চান। পাঠককে ঠিক কোন কথাটা জানাতে চান আপনি। খেই হারিয়ে ফেলছেন। মনে হচ্ছে লেখা শুরুর আগেই থেমে গেলেন আপনি।

যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েন বা পড়েছেন তাদের জন্য দুটো সুসংবাদ

ক) ধারণা একা নয়, আসে ডজন ধরে। একবারে একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা না করে অনেক বিষয় নিয়ে ভাবা শুরু করতে পারেন। কাজটা নি:সন্দেহে কঠিন।

খ) একটু বিরতি নিন। কিংবা কিছূ "লেখার ব্যায়াম" করুন। যেমন আপনার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ের কথা ভাবুন, তা থেকে যেভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন তা নিয়েও ভাবুন। টাইপ করুন গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট। চরিত্র তৈরি করুন। লেখা হোক বা না হোক লিখতেই থাকুন। প্রেমের কথা লিখুন, স্বপ্নের কথা লিখুন। বিশেষ কারো কথা লিখুন, যাকে নিয়ে ভাবতে আপনার ভালো লাগে তাকে নিয়ে লিখুন। এলোমেলো হলেও লিখুন। লিখতেই থাকুন। সাজানোর চিন্তা মাথা থেকে ছেড়ে ফেলুন, পরে সাজাবেন। লেখন খরা থেকে উত্তরণের এটাই সবচেয়ে সহজ পথ।

অনেক ধারণা থাকলেও কোনোটাকেই প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না:

জীবনটাই একটা খেরো খাতা। অনেক অভিজ্ঞার সঞ্চয়ের নাম। তাই প্রত্যেকের রয়েছে অনন্য অভিজ্ঞতা। অনন্য হওয়ার কারণেই কিছুটা জটিলও বটে। অনেক বিষয় নির্ধারণ করলেন, ভাবছেন একটা উপান্যাস লিখে ফেলবেন, কয়েকটা অনুচ্ছেদ লেখার পর দেখলেন এটি ছোট গল্প হয়ে গেছে। এখানটাতেই আপনার মুন্সিয়ানা। অজস্র ধারণা থেকে নির্যাস বের করে এনে তা কাজে লাগাতে পারেন খুব কম মানুষই। কখনও কখনও একটি বা দুটি ঘটনাই বদলে দিতে পারে আপনার চিন্তার ধরণ, জীবনবোধ কিংবা লাইফস্টাইল! সেই ঘটনাগুলোকেই পুজি করুন। খুজে বের করুন জীবনের পাতা থেকে। তারপর সাদা কাগজের উপরে কালো অক্ষরে তুলে আনুন পাঠকদের জন্য।

যদি দেখেন, জীবনের খেরো খাতা থেক এমন কিছুই খুজে পাচ্ছেন না, তাহলে ঘাবড়াবেন না। ভাবুন, আবারো ভাবুন, বার বার ভাবুন। ভেবে বের করুন আপনার জীবনের প্রত্যেকটি টার্নিং পয়েন্ট। নিজেই সিদ্ধান্ত নিন। ঠিক কোন গল্পটা সবাইকে জানাতে চান আপনি। কোনটা শেয়ার করতে চান আপনার পাঠকদের সাথে। স্থির করুন। যখনি সেটা খুজে পাবেন, তখুনি লিখে ফেলুন। সেটাই হবে আপনার গল্প। যা আপনি অন্যদের জানাতে চান। এবার দেখুন তো লেখন খরাই ভুগছেন নাকি!!

ভাল খবর। যখন একসাথে অনেক ধারণা নিয়ে কাজ করছেন, তখন কোনোটাই ঠিকমতো কাজ করছে না। কিন্তু হঠাত করেই কিছুদিন আগেই ঘটে যাওয়া এমন একটা ঘটনার কথা মনে পড়লো যেটা আপনার চিন্তার জগতটাকেই ওলট-পালট করে দিলো। ব্যস, এবার লিখতে বসে পড়ুন। পাছে দেরী না হয়ে যায়।


একটি সীমারেখা তৈরি করুন কিন্তু নিজেকে ওই সীমায় আবদ্ধ করবেন না:

অনেক লেখকই গন্ডির মধ্যে থেকেও চমতকার গল্প লিখতে পারেন, আবার অনেকেই পারেন না। কারো কারো জন্য গন্ডি বা সীমারেখা তৈরি করে লিখতে বসতে পারাটাই আসল কাজ। কিছু লেখকদের ক্ষেত্রে, একটি সীমারেখা সত্যিই ভাল কাজ করে। সীমারেখা সেই লেখককে পরিচালিত করে বা করেত পারে। তাই লেখার ক্ষেত্রে লেখকভেদে তৈরি হবে লেখার গন্ডি। তবে এটা ঠিক কোথাও আটকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। প্রত্যেকটা লেখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই গল্পের সব ধরণের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উপায়। লেখক হিসেবে সেটাই উপলব্ধি করতে হবে আপনাকে। তাইলেই আর কোথাও আটকাবেন না আপনি। কারণ আপনার মাঝে সে সম্ভাবনা আছে।


মূলত দুই কারণে আপনি লেখন-খরায় ভুগতে পারেন:

১) আপনার সীমারেখার একটা নিজস্ব গতি আছে, কিন্তু আপনি তা মানতে চাইছেন না। যেমন আপনার গল্পের কোনো একটি ঘটনা আপনি চিন্তা করছেন কেবল এ বা সি চরিত্রই করতে পারবে। অন্য কোনো চরিত্র এ কাজটি করতে পারবে না। এই ভাবনাটাই আপনার লেখার জন্য খরা তৈরি করেছে। আপনি অনায়াসে ওই একই কাজ বি কে দিয়েও করিয়ে নিতে পারেন। অর্থাত চরিত্রগুলোকে ভাংগুন। দেখবেন আপনার লেখা আপনাকেই চমকে দেবে। পাঠককে তো বটেই।

২) সীমারেখা অবশ্যই রাখতে হবে, তবে তা লেখার প্রয়োজনে বদলও করতে হবে আপনাকেই। যুক্তি দিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আপনাকেই। কেনো কেবল অতীতকেই মনে রাখবেন, গল্পের প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও যা ঘটবে তারও ইঙিত থাকতে পারে আপনার চরিত্রের বর্তমান কার্যকলাপে। সুতরাং ভাবনায় যোগ করুণ বহুমূখিতা। দেখবেন হঠাত করেই শান্ত মুহুর্তকে অশান্ত করে তুলেছেন, আবার অশান্ত মুহুর্তকে করে তুলেছেন শান্ত। সবই আপনার চিন্তার অসীমতা।


কি করে উপন্যাসের দুই মেরুতে সেতুবন্ধন তৈরি করবেন?

যখন আপনার উপন্যাসের শান্ত মুহূর্ত আসে, তখন কি করেন আপনি? কখনও যদি বাঁক নিতে হয়, কিংবা স্পর্শকাতর কোনো বিষয়কে উপস্থাপন করতে হয় কিংবা উপন্যাসে দিতে হয় নাটকীয় মোড়, তখন কিভাবে সেতুবন্ধন তৈরি করেন? শান্ত একটা মুহুর্তকে কি করেই বা অশান্ত করে তোলেন কলমের আঁচড়ে?

আপনি নিশ্চয় খুজে বের করেন ঠিক কোন জায়গা থেকে মোড় নেয়া শুরু করবে আপনার কাহিনী। সেখানেই নিশ্চয়ই আপনি আপনার চরিত্রে নিয়ে আসেন বৈচিত্র্য। যুক্তি-তর্কে-আদর্শে তৈরি করেন চরিত্রের কাজ। কেন চরিত্রটি এ কাজ করছে তার একটা বিবরণ অবশ্যই থাকে আপনার উপন্যাসে, নয় কি? না করলে একবার এভাবেও ভেবে দেখতে পারেন!


কাহিনীর মাঝখানে আটকে গেছেন এবং পরবর্তী কি হবে তার কোন ধারণা করতে পারছেন না:

হয় আপনার কোনো সীমারেখাই তৈরি করা নাই, অথবা আপনি পিছিয়ে পড়েছেন। এমন অবস্থায় অনেক কিছুই ঘটতে পারে। যদি আপনি একটি চরিত্রকে আগের দিন একভাবে কল্পনা করেছেন, সে মোতাবকে চরিত্রের অনেক উন্নয়ন সাধন করেছেন। আজ আবার পুনরায় পড়তে গিয়ে দেখলেন যে কাহিনী কোথায় গিয়ে দাড়াচ্ছে বুঝতে পারছেন না। ভেবেছিলেন, গতকাল এমন এক জায়গায় লেখা ছেড়ে দিয়েছেন সেখান থেকে আজ অনায়াসে যেকোনো পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে কোনো অসুবিধায় হবে না আপনার। কিন্তু পড়ে মনে হচ্ছে আটকে গেছেন আপনি। কাহিনী মোড় ঘুরানোর কোনো পথই খুজে পাচ্ছেন না! মনে হচ্ছে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে অনেক কিছু বাকি।

এমন পরিস্থিতিতে সত্যিই আপনি খরায় ভুগছেন। আটকে গেছেন। তাইলে কি করবেন এখন। কাগজ কলম রাখেন, লেখায় কিছুটা বিরতি দিন। পুনর্বিবেচনা করুন। প্রয়োজনে আগের লেখাগুলো আবারো পড়ুন। এটাই আপনাকে মুক্ত হওয়ার পথ দেখাতে পারে। হয়তো আপনার লেখার মধ্যেই রয়েছে আপনার মুক্তির পথ, হয়তো নতুন নতুন যোগ করার তালে পুরোনো ধারণাটার খেইটা হারিয়ে ফেলেছেন। সুতরাং কি হবে, হতে পারে না ভেবে পুনরায় লেখাটি পড়ুন। পেয়েও যেতে পারেন মুক্তির পথ।


আপনি যদি উপন্যাসের ঠিক মাঝখানে এসে আটকে যান, তাহলে কি করবেন? এর অর্থ হচ্ছে আপনি সম্ভবত গল্পটার আরো একটি মোড় দিতে চান, কিংবা আপনার গল্পে নতুন কিছু যোগ করার সময় এসেছে। এখানেই নতুন একটা চরিত্র কিংবা ঘটনা যোগ করুন। পরিচয় করিয়ে দিন আপনার পাঠকদের সাথে। ছুরিতে ধার না থাকলে আমরা যেমন নতুন করে ধার দিয়ে নেই, ঠিক তেমন আর কি।

মার্ক টোয়েনের হাকলেবেরি'র ফিনের কথা মনে আছে আপনাদের? যেখানে নদীর উপর ভুল বাক নেয়ার ফলে হুক এবং জিম শেষ পর্যন্ত হারিয়েই গেলো। সেটাও কিন্তু গল্পে দারুণ মোড় এনে দিয়েছিলো। আগ্রহী করে তুলেছিলো পাঠকদের। যার ফলাফল হলো বিশ্বখ্যাতি। এর অর্থ কি! এর অর্থ হলো লিখতে বসে মাঝপথে এসে যদি থমকে দাড়ান, তবে হতাশ না হয়ে আবার ভাবুন। যোগ করুন নতুন কিছু।


১০০ পাতা লেখা শেষ! দেখছেন গল্প একটি ভুল মোড় নিয়েছে, ভয়ানক অনুভূতি:

এটাই সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। আপনি সাহসী এবং চতুর একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সে মোতাবেক আপনি পাশাও ছুড়ে ফেলেছেন তখনি আপনার মনে হলো ভয়ঙ্কর একটা ভুল করে ফেলেছেন এবং আপনার আর কিছুই করার নেই! এর পর গল্পে আর কিছুই যোগ করার নেই বলে মনে হচ্ছে আপনার। ঠিক তখনি ভেবে দেখবেন এটাই বলতে চেয়েছেন কি না!! ভেবে দেখবেন, আসলে এখানেই গল্পটা শেষ করতে চান কি না?

যখন আপনি নিশ্চিত যে, ভুল পথে যাচ্ছে আপনার গল্প, তখন আর গল্প এগিয়ে নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আর কোনো বিকল্প না থাকলে, শুরু থেকে শুরু করারও আর দরকার নেই। হ্যা, ঠিকই বলছি। কিন্তু কখনও কখনও মনেই হয়, যা লিখেছেন, তা মোটেই চান না আপনি। তাহলে আসলেই লেখা বন্ধ করুন। থামুন। ভেবে দেখুন, প্রয়োজনে ৫০ পাতা পর্যন্ত ফিরে যান...সেখান থেকে আবার লেখা শুরা করুন, যেভাবে চান, সেভাবে। তাতেও যদি তৃপ্ত না হন তাহলে আবার শুরু করুন শুরু থেকে।

অথবা, এখান থেকেই শুরু করুন নতুন অন্য একটি গল্প। যার সমাপ্তি হবে সমান্তরালভাবে। কে জানে হয়তো এই ট্রেন্ডই আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে।


সব চরিত্রের উপর বিরক্ত, তারা কিছুই করছে না:

আপনিই তৈরি করেছেন সাহসী, স্পন্দনশীল এসব চরিত্র। অথচ এক পর্যায়ে এসে দেখলেন একটা চরিত্রকেও পছন্দ হচ্ছে না আপনার! এখন আপনি আপনার চরিত্রগুলো দিয়ে কেবল তাদের দাঁতের মার্জন এবং তাদের বিড়ালদের খাওয়ানোর বিষয় নিয়ে লিখে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরাচ্ছেন।

তাহলে এটা স্পষ্ট যে, চরিত্র যদি কিছুই না করে তবে তা মোটেই আকর্ষন বাড়াতে পারে না। তার মানে আপনি এখনো আপনার প্রধান চরিত্র নির্মাণ করতে পারেননি। কিংবা চরিত্রের মূল সহায়ককেও খুজে পাননি অথবা আপনি যা বলতে চান ঠিক তাই বলতে পারছেন না। আপনার চরিত্র নির্মান ঠিক হয় নি। এর অর্থ হলো আপনার এখন পর্যন্ত কিছু চরিত্র আছে কেবল। গল্পটা এখনো তৈরি হয় নাই। কখনো কখনো ছুরিতে ধার দেয়ার আগে ছুরিটাকেই খুজে পেতে হয়।

আপনি খেয়াল করে দেখবেন সারাবিশ্বে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে শত শত পাতা পড়ার পরও মূল কাহিনী কি বুঝে উঠা যায় না। এটা দোষের কিছু নয়। লেখার যে কোনো স্থান থেকেই দ্বন্দ্ব বা সাসপেন্স তৈরি হতে পারে। হোক সে সামান্য একটি চরিত্র কিংবা ছোট একটি ঘটনা। তাও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে আপনার গল্পের জন্য। এভাবে ভেবেছেন কখনও, না ভাবলে এবার ভাবুন।


আপনি স্বপ্ন দেখুন, সব বিষয় নিয়ে ভাবুন, কল্পনা করুন

নিজের গল্পের নিজেই সমালোচক হয়ে উঠুন। এছাড়া আর কোন বিকল্প নেই আপনার। কারণ আপনি জানেন, কিভাবে একজনের মনের গহীনে ঢুকে কাদাতে হয়। আসলে পাঠক নয়, এখানে ধারণা করছে আপনার ভিতরকার সমালোচক মন। যখন কোনো লেখা আপনি সংশোধন করতে যাবেন বা লেখা শেষ হওয়ার পর প্রথম থেকে পড়া শুরু করবেন তখন আপনি আপনার মনের কথা শুনবেন।

আপনি আপনার ধারণাগুলোকে ভয় পান। ভাবেন, হয়ত যা ভাবছেন তা অতি সাধারণ কিংবা অতটা খারাপ নাও হতে পারে ধারণাটা, তাই না? আর যদি তা মনে হয়েই যায়, অসুবিধা কি, আবার নতুন করে লেখা শুরু তো করতেই পারেন। পারেন না কি?এর মানে কিন্তু এই না যে, যা লিখবেন একবারেই লিখে ফেলবেন, পড়ে কিছু আর সংশোধন বা সংযোজন বা বিয়োজন করবেন না। মোদ্দা কথা হলো, প্রথম যা মনে আসে তা একবার লিখে ফেলুন। পরে আবার পড়ুন। রিভাইজ দেয়ার পর যেখানে যতটুকু শোধরাত মন চাইবে, সেখানে ততটুকুই ঠিক করে নেবেন। এতে ভয় পাওয়ার কিছু আছে??


এক শব্দ না পারলে এক অনুচ্ছেদে বোঝাতে চেষ্টা করুন।

আমি কি করছি, তা আমি জানি, আমি এও জানি যে, আমি পরে কি করতে যাচ্ছি- এটাই গল্পকারের মূল শক্তি। কখনও কখনও কি করতে চাই বা কি বলতে চাই, সেটা বুঝে উঠতে পারি না। বুঝে উঠতে পারিনা, কোন শব্দ দিয়ে ভাবনাটাকে রূপ দেব!! ভাবনাকে শব্দে রূপ দেয়ার জন্য রাত-দিন এক করে ফেলছেন, কিন্তু সঠিক শব্দটাই খুজে বের করতে পারছেন না।

অযথা সময় নস্ট করছেন আপনি। এক শব্দে না হোক, এক বাক্যে বিষয়টি বা ভাবনাটিকে উপস্থাপন করতে সমস্যা কোথায়? এক বাক্য সম্ভব না হলে এক অনুচ্ছেদে আপনার ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলুন। দেখেন কেমন আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে আপনার গল্প বা উপন্যাস। পেয়েছে নতুনমাত্রাও।


আপনার মাথায় অবিশ্বাস্য শীতল একটি বিবরণ ঘুরপাক খাচ্ছে, আপনি লিখতে বসলেন, কিন্তু হঠাতই মাথাটা জাম হয়ে গেলো??

আসলেই কি তাই? সত্যিই কি আপনি আর কিছুই ভাবতে পারছেন না? মন থেকে ভেবে বলছেন তো?

তাহলে ঠিক আছে। আপনি আসলে আপনার ধারণা আর বাস্তবতার মধ্যে সমস্যা দেখছেন। এবং ভাবছেন কিভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন। বা আপনার গল্পে বা লেখায় এর প্রতিফলন কিভাবে হবে?

আপনি কি জানেন, এমন একটি উপন্যাস বাদ দিলে বা পুনরায় আরম্ভ করলে কতবড় উপকার পেতে পারেন আপনি। আসলে ভুল বলে কিছুই নেই। কখনও কখনও এই অর্ধ-সমাপ্ত উপন্যাস আপনাকে মহত লেখক হিসেবে পরিচিতি পাইয়ে দিতে পারে।

কিন্তু এটা খুবই সত্যি খুব দ্রুত হতাশ হওয়া যাবে না। এই ধারণাটাও সত্যি যে, কখনও কখনও আপনি সত্যি সত্যি শীতল হয়ে যেতে পারেন। নিজেকে অনেক অসহায়ও মনে পারে তখন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আপনার খন্ড খন্ড ধারণাগুলোকে একত্রিত করুন। আবার ভাবুন।

কখনও কখনও একধাপ পিছনেও নিতে হয়। এগিয়ে যাওয়ার জন্য। হয়তো সেই পিছিয়ে আসাটাই আপনার গল্পে বাক তৈরি করতে পারে। আপনি ইতিমধ্যে যা লিখেছেন, এটি তার সারমর্ম লিখতে সহায়ক, গল্পের বিভিন্ন দৃশ্য কল্পনা করুন। প্রয়োজনে বিন্দু থেকে আবারো আপনার গল্প লেখার চেষ্টা করুন। দেখবেন এটা সত্যি সহায়ক হবে।

রিভিশন দিন

অনেকেই দ্বিতীয়বার নিজের লেখা পড়তে চান না। কিন্তু অবশ্যই নিজের লেখা রিভাইজ করবেন। আপনি চিন্তার "দ্রুত একটি প্রথম খসড়া লিখুন এবং এরপর আবারও তা স্থির করুন’’। যতোবার নিজের লেখা পড়বেন তত নিখুত হবে আপনার লেখা। একাধিকবার পড়লে কোথাও কোনো সমস্যা আছে কিনা, গল্প বা লেখায় কোথাও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে কি না। কিংবা লেখনিতে কোনো দুর্বলতা আছে কি না তা সংশোধন করতে পারবেন। প্রয়োজন অন্য কারো কাছ থেকে আরো মতামত নিতে পারেন এবং আপনার লেখায় তা ব্যববহার করতে পারেন।



লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 

1 টি মন্তব্য:

  1. একটি সাধারণ আলোচনা, অনেক সময় লেখক থমকে যান, তাঁর দার্শনিক অনুভূতি ও সময়স্থিত সত্যকে যখন তিনি লেখায় না আনতে পারেন। তাঁরা শুধু ফিকশন লিখেই শান্তি পাননা। তাঁরা তাঁদের বিশ্বাসকে মূলধারার লেখায় ফুটিয়ে তুলতে চান। সেটা ফুটিয়ে তোলার জন্য লেখার মান ও পাঠক-সংবেদনশীলতা যখন তাঁদের ভাবায়-তখনই লেখা থমকে যায়, যেটা থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই এই লেখায়।

    উত্তরমুছুন