রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৪

নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য নির্যাস ও অস্তিবাদ

রমিত দে

Gods, my gods! How sad the earth is at eventide! How mysterious are the mists over the swamps. Anyone who has wandered in these mists , who has suffered a great deal before death, or flown above the earth, bearing a burden beyond his strength knows this……. And without regret he forsakes the mists of the earth, its swamps and rivers, and sinks into the arms of death with a light heart knowing that death alone


. . Mikhail Bulgakov

“সবই অনিত্য , সবই দুঃখ……লেখক এই সত্য মানে কিন্তু সর্বধ্বংসের এই বিপুল আয়োজ়ন বা বন্দোবস্তের সামনে দাঁড়ালে সব গুলিয়ে যায়।এই পৃথিবীতেই দাঁড়িয়ে তিব্বতী গুরু লংচেনপা তাঁর শেষ বয়ানে বলেছিলেন-‘এই বিশ্বে আর আমি থাকবো না/কিন্তু থাকবো মৃত্যুহীনতার মহান শান্তির/ঘেরাটোপে।‘-এই কথাও কি শান্তি দেবে? যখন চারিদিকে আলো ঝলসাবে,দপ করে জ্বলে ওঠার জন্যে যখন প্রত্যেকটা অনু,প্রত্যেকটা কার্বন-জোড়ের অলঙ্কার,টোপোলজির চার-রঙের প্রব্লেম,এমন কি তখনও যদি প্রত্যেকটা প্যারামবুলেটর,প্রত্যেকটা দুধের বোতল,প্রত্যেকটা ললিপপ,প্রথম জন্মদিনের ভিডিও টেপ-সকলে অধীর হয়ে উঠবে? এ সময়ে কি কেউ থাকবে? সম্ভবত না।কিন্তু সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।“-(সব শেষ হয়ে যাচ্ছে)- আর এখান থেকেই শুরু হচ্ছে এক বদ্ধ পটভূমি,বাজনারা নড়ে উঠছে আর মনগড়া ইন্দ্রিয়সংবিতের প্রতিরূপ দেখতে জীবন নামের এক সুগন্ধিত শূন্যতায় নেমে পড়ছে হোঁচট খেতে খেতে হলুদ হয়ে আসা মানুষগুলো। এরাই সেই আধ ন্যাংটা হাড় জিরজিরে ছেঁড়া প্যান্ট দিয়ে নুনু বা পোঁদ দেখা নবারুণের জ্যান্ত মানুষ। এরাই নক্ষত্রানুসারী কোনো এক পাহাড়ের ঘুরপথ ধরে নেমে আসা পৃথিবী নামের রঙ্গমঞ্চের পম্পট ।ঘুমের ভেতরই যাদেরকে জেগে থাকার অপরিসর আঠা পেঁচিয়ে ধরছে। সাহিত্যের কোনো পলায়নভূমিতে দাঁড়িয়ে নেই নবারুণের চরিত্ররা কিংবা স্বপ্ন আর সম্বোধির মত কোনো অন্তঃপ্রজ্ঞ সৃষ্টিপ্রপঞ্চে। বরং একধরনের গোটানো অন্ধকার থেকে নিজেকে রোজ রোজ আবিষ্কার করছে অস্তিত্ব নামের এক বোনা চক্রব্যুহে। সেখানে গৃহাভিমান বাতুলতা মাত্র। কেবল হাইফেনের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে চৈতন্যের ভরাডুবি কিছু মানুষ ,যারা অস্তিতের প্রামাণিক কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেনা অথচ অস্বীকার করছে পারছেনা অস্তিত্বকে। চোখ খুলে খুলে মরছে, জলতেষ্টা নিয়ে মরছে, সারা আকাশে তারাদের দেখতে দেখতে মরছে আবার মৃত্যুর পর মরা চোক দিয়ে দেখছে এ পৃথিবী কি সুন্দর! আসলে সব কিছু না থাকার মাঝেও ব্যক্তিগত ধ্বনি ব্যক্তিগত থাকা খুঁজছে প্রতিটি অস্তিত্ব প্রতিটি উদ্দাম উল্লোল কোলাহল আর নবারুণ আবিষ্কার করে চলেছেন সেই ছায়ার মুখগুলোকে সেই ‘আংশিক চন্দ্রগ্রহণ’গুলোকে।

এখন অস্তিত্ব কি? আর সাহিত্যে অস্তিত্ববাদই বা কি ? বহুল আলোচিত একটি বিষয় এবং এ বিষষে বিশ্লেষন করতে গেলে কোনো সামগ্রিক বীক্ষণ পাওয়া অসম্ভব কারণ কেবল দার্শণিক সীমায় আবদ্ধ করা সম্ভবপর নয় অস্তির মত একটি প্রকৃত বাস্তবের প্রতিনিধিকে।তাকে মঞ্চায়ন করা সাধ্যাতীত কেবলমাত্র শৈল্পিক উত্তরব্যক্তি সত্তায়। কারন অস্তিবাদের প্রচারপুস্তিকার হয়ে দাঁড়ায় অস্তি স্বয়ং। সে এক উদ্বৃত্ত আবার কোথাও তাই তার সমগ্র, কোথাও সে স্বাধীন সম্ভাবনার আবার কোথাও সে চৈতন্যের গ্লানি ও ক্লৈব্য মুছে ফেলতে না পেরে চূড়ান্ত প্রমানসাপেক্ষ এক প্রান্তিক প্রতিষ্ঠান। আসলে অস্তিত্বের মেরুধারনায় মানুষই মহাপ্রাণ, তার যন্ত্রনা সংশয় অসহয়াত্বই বারবার চুলকোয় জীবনের সীমিত অপূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ন্যারেটিভটিকে। আসলে মানুষগুলো ম্যানিক ডিপ্রেশনের মত আঁকড়ে রয়েছে মধুর নাড়িগুলোকে, নিভছে,জ্বলছে, আর ঘুম হয়ে ঘাম হয়ে টক নোনতা মর্গের প্রাত্যহিক ময়নাতদন্ত হয়ে পাক খেয়ে তলিয়ে যাচ্ছে অস্পৃহা আর নৈরাশ্যের ক্যানভাসে। নবারুণের কাহিনী নির্মানে অস্তিবাদের প্রশ্ন আলোচ্য হলেই অনিবার্যভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এমনই এক মানব অস্তিত্ব, একাকীত্বকে বিশ্বাস করেও যাদের কন্ঠে অমেয় কৌতুকে রয়ে গেছে অস্তিত্বের জন্য একটা আকুতি,প্রাণপ্রবাহে একটা অন্তগমন । তাঁর প্রথম গল্প ‘ভাসানের’ উত্তরপুরুষ মৃতব্যক্তিটি থেকে শুরু করে যার মৃত দেহের ওপরও রয়ে গেছে স্পর্শলেশহীন এক পাগলির অধিকার, যে অধিকারে উঁকি দিলেই দেখা যাবে চেনা চেতনার ঘরবাড়ি ,মাটি শেষ হয়েও সেখানে ফোঁটা ফোটা জীবন নিয়ে সবুজ এক রেখা , অস্তিত্বের সম্ভাব্য একটি শেকড়, ঠিক তেমনি “আংশিক চন্দ্রগ্রহণের’ ৬০০০০ টাকা স্যালারির রোহিত যে কিনা ৯৮০০০ খুন হওয়া ইরাকি সংখ্যার পাশে দাঁড়িয়ে অতিক্রম করতে পারেনা অসঙ্গতিতে ভরা জৈবিক উপাত্তগুলো, যাপনের তীব্র প্রদাহ আর বেঁচে থাকার অভিব্যক্তিহীন অর্জনগুলো যার কাছে কেবল স্তালিনের ব্যবহৃত বাক্যের মত –‘অ্যাজ দা ডগ রিটানর্স টু ইটস ভমিট” হয়ে দাঁড়ায়,সেখানেও শুরু হয়েছে আত্মজিজ্ঞাসা, ‘সিটি অফ এন্ডে’ দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছে নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, নিজের ফিকে ছায়াটুকু টানতে টানতে জন্ম মৃত্যুর লংমার্চে সবচেয়ে আকর্ষনীয় হয়ে উঠছে অস্তিত্বের অনুসন্ধানগুলি; সেখানেও প্রশ্নটি উঠছে স্বয়ং মানুষকে নিয়ে ,মানুষ শব্দটিকে নিয়ে , মানুষের হয়ে ওঠা নিয়ে, ‘পা ফেলার উৎসবে’ শোনা যাচ্ছে অস্তিত্বের অঙ্গীকার, তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে একটা থাকা, একটা জড়িয়ে যাওয়া ,স্ব-এর সাথে সংঘের সমষ্টির আষ্টেপৃষ্ঠে একটা জড়িয়ে যাওয়া। আসলে মৃত্যুর আগে ও পরে যারা আসছে, দাঁড়াচ্ছে ,ঘুম ফুরোলে চলে যাবে বলে ক্লান্তি শূণ্যতা আর পতনশীল কিছু মুখের ছবি আঁকছে তাই শিল্পীত প্রকাশ হয়ে উঠছে নবারুণের গল্প-উপন্যাসে। আশাবাদের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যা সেই অস্তিত্বের ক্রমপ্রকাশকে , আত্মবাদী ইলিউশনকেই নবারুণ করে তুলছেন তাঁর নিয়োলজিস্ট ডিকশন। ক্ষমতাকাঠামোয় ব্যক্তির প্রতিবাদ প্রতিরোধ বিদ্রোহ আর পরাজয়ের নিপুন প্রতিচ্ছবি নবারুনের অস্তিবাদী দর্শণে ।হাইডেগার যেমন তাঁর “ এক্সিজটেন্স অ্যান্ড বিংগস” এ অস্তিবাদের অন্তর্মূল হিসেবে মানুষকে অ্যাসারটেন করতে চেয়েছেন, জীবনের স্বরূপ ও অভিলাষের ভাষাটির খোঁজে মানুষের অন্তরঙ্গ ভাষ্যের কথা বলেছেন,বলেছেন- “The being that exists is man. Man alone exists. Rocks are, but they do not exist. Trees are, but they do not exist. Horses are, but they do not exist. Angels are, but they do not exist. God is, but he does not exist. The proposition "man alone exists" does not mean by any means that man alone is real being while all other beings are unreal and mere appearances or human ideas. The proposition "man exists" means: man is that being whose Being is distinguished by the open-standing standing-in in the unconcealedness of Being , from Being, in Being. The existential nature of man is the reason why man can represent beings as such, and why he can be conscious of them. All consciousness presupposes ecstatically understood existence as the essentia of man - essentia meaning that as which man is present insofar as he is a man.” – ঠিক সেভাবেই মানুষের মধ্য দিয়েই নবারুণ জীবনকে ছিঁড়ে কেটে জানতে চেয়েছেন, ইলিউশন অফ রিয়েলিটি থেকে জীবন্ত কলামাধ্যমে কৈফিয়ৎ চেয়েছে মানুষের কথোপকথন। নবারুণ সচেতন ব্যক্তিসত্তাকেই করে তুলেছেন তাঁর গল্প উপন্যাসের অস্তিবাদী ডিসকোর্স। শিল্পের চোরাগলিতে নিজেকে পাচার না করিয়ে বা শিল্পকে নিরেট প্রতিশ্রুতি না বানিয়ে জীবনের লড়াইটিকে করতে চেয়েছেন তাঁর গল্পের তাত্তিক ও প্রায়োগিক বয়ান। তাঁর গল্পগুলোতে তাই কেবল সাম্প্রতিক ইতিহাস নয় বরং প্রতিক্ষনের প্রবাহ অপেক্ষা করছে অস্তিবাদের এক দীর্ঘ তেষ্টা নিয়ে। গল্প উপন্যাসের কল্পিত ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে নবারুণ অপেক্ষা করছেন মানুষের সেই রূপকল্প অবধি যেতে যেখানে মানুষ কেবলমাত্র কোনো অনুচ্চারিত অভিব্যক্তি নয় বরং একটি কশগড়ানো রক্তের অ্যাম্পুল , শরীরের ভর ধরে রাখা একটি স্বেদবিন্দু। অস্তিত্বের সম্ভাবনাময় দিকটিকে তুলে ধরতে উঠে এসেছে অস্তিত্বের অস্থিরতা,অস্তিত্বের অবস্থানেই যেখানে ধাক্কা মারছে বিপরীতমূলক এক অবস্থান;যেখানে গৌতম বিশ্বাসের মত সত্তরের দশকের প্রথম দিকের কোনো নকশাল ছাত্রনেতাকে তিনি গল্পের মধ্যে গুলিয়ে দিচ্ছেন মৃত্যুআকীর্ণ জগতের মাঝে ছিন্ন কুটিকুটি তথ্যচিত্রের মত ,যে মানুষের ভাষা দখল করতে চাইছে, যার চোখ বিস্তর প্রশ্ন নিয়ে জেগে রয়েছে বানাউটি রাষ্ট্রের অবক্ষয় গ্লানি আর শূন্যতাবোধের প্রাসপেকটিভে। ‘খোঁচড়’ গল্পে রাষ্ট্রের তৈরী কিলার মেশিনকে দিয়ে যে মনোলগ তৈরী করেছেন নবারুণ তাই ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে পাঠকের সাথে তার ডায়লগ। অর্থাৎ নিকষ অন্ধকার কুঠুরিতে তার চরিত্রদের একা রেখে আসেননি তিনি আবার পাঠককেও নিষ্ক্রিয় পাঠকের ভূমিকায় ছেড়ে দেননি। কোনো প্রসেনীয়াম ফ্রেম করে ব্যবধানকে প্রকট করেনি বরং পোড়াচামড়া গন্ধতেল আর ভীত মুখের ওপর টর্চের আলো পড়তেই চুলকুনিটা বেড়ে উঠেছে পাশের লোকের, তার পাশের লোকেরও। আর এভাবেই প্রসেনিয়ম মঞ্চ থেকে বেরিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছেন নবারুন, পৌঁছে গেছেন মানুষের কাছে। একটি জিনিসেরই অনুসন্ধান চালিয়েছেন তিনি তাঁর সাহিত্যে, একটি জিনিসেরই চূড়ান্ত উপসংহার খুঁজেছেন আর তা হল অস্তিত্ব, অধিকারের সমাজ আর স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত মানুষ। একটা র‍্যাশানাল টোটালিটি। মহাবিশ্বের মানচিত্রে রক্ত শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে দাঁড়িয়ে এ কি নবারুনের স্বঅন্বেষন! নাকি উলটো দিকের অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষগুলোকে চিনিয়ে দেওয়া মুখোশের স্বরলিপি! আসলে গল্প লিখতে এসে কোনোদিনই ‘সার্কাসকে ভালোবাসতে চাননি’ নবারুণ, তাঁর ক্রমাগত জিজ্ঞাসায় উঠে এসেছে সামাজিক স্নায়ুচাষ, উঠে এসেছে অস্তিত্বের আলো না ফেলা অংশগুলো। মৃত গৌতমকে দিয়ে তিনি যখন গল্পের কথকের ভূমিকায় প্রশ্ন করেন –“ গৌতম ! তোমাকে চেরাই করে ওরা কিসের তালাশ করবে ? তুমি কোন পূজার অঞ্জলি?তোমার ভয় করে না?” -তখনই ঝাঁকুনি দেয় ভ্যানটা, হেডলাইটের আলোদুটো নিভে যায়। আসলে ঝাঁকুনি দেয় আমাদের সপ্রাণ নড়াচড়া যা মানবিক স্বাধীনতা সন্ধানে অসহায়ভাবে দুলছে। আসলে গৌতম জানতে পারে না অথচ আমরা পাঠকেরা অনুভব করতে পারি সারাটা রাস্তা রক্ত, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, সারাটা রাস্তা শুঁকে শুঁকে রাষ্ট্র আর ভারসাম্যহীন সমাজব্যবস্থা খুঁজে চলেছে স্বাধীনতা নামের কিছু মুক্তশব্দ, অস্তিত্ব নামের কিছু ইউটোপিয়া। আসলে গৌতম অস্ত্রবিহীন , পিঁপড়ের মত সারিবদ্ধ মানুষের মাঝে সে এক অনন্তকালীন প্রত্যাখান আর এই অগনন অবহেলাতেই দৌড়ে রাস্তা পার হচ্ছে অস্তিত্ব নামের এক জৈব ছায়া, মাংস রক্ত শরীরে হাড়ে মজ্জায় যাদের খালি পায়ের দৌড়োবার শব্দ গেঁথে যাচ্ছে শব্দহীন ঘাতক হয়ে সেই মানব অস্তিত্বকেই নবারুণ খুঁজে চলেছেন তাঁর সাহিত্যে তাঁর অক্ষর সন্ত্রাসে। ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো টুকরো রক্তাক্ত হয়েও উড়ছে কিছু ব্যক্তিসত্তা যারা অস্তিত্ব বিশ্বাস করে যারা বিশ্বাস করে বিদ্রোহের এক বলয় ,মৃত্যুর পরও তাদের পায়ের আঙুলগুলো টেনে টেনে মাটিতে দাগ কাটতে চেষ্টা করে ,চেষ্টা করে অস্তিবাদের টুকরো টুকরো চিহ্ন জুড়ে জুড়ে সেই আশ্চর্য সীমারেখাটুকু পেতে সেই মহাভ্রমনের খোঁজতল্লাশটুকু । এই সেই এসেনসিয়া অফ ম্যান , যা নবারুণের অস্তিবাদের নানা ব্যাখায় ঘুরেফিরে এসেছে। যাদের আত্মজিজ্ঞাসায় নিরন্তন নিবার্চন চলেছে, রাষ্ট্রবাদের আরোপিত পটভূমি ও পরিবেশে যারা ক্লান্ত হয়েও ঘুমোচ্ছে না। এরা কি বোকা? বিস্মিত? নাকি অস্তিত্বের এই জগত আসলে প্রতিমূহুর্তে এক অ্যাবসার্ড অডিটোরিয়ামের দিকে মুখ ফেরাচ্ছে , এক অসুস্থ প্রকাশের দিকে প্রতিমুহুর্তে প্রত্যাখানের মাঝামাঝি জায়গাটা চুলকে নিচ্ছে মিশকালো শ্যাওলা মানবপ্রতিনিধিগুলো! যাই হোক না কেন কিন্তু এরা অবমানব নয়, সাবহিউমান নয়।সন্ত্রাসভূষিত সাবেকী থেকে প্রতিনিয়ত বেরোবার একটা দরজা খুঁজছে এরা। আর তাই হয়ত নাৎসিরা ১২০০০০০ ইহুদী শিশুকে হত্যা করার পরও আলোবর্জিত কয়েকখানায় দাঁড়িয়ে নবারুন ভাবতে পারেন জীবনের দিকে লম্বা একটা দৌড়। লিখতে পারেন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি দেখো… পাতা জড়ো করো…আগুন জ্বালাও’, তাই হয়ত সাইলেশিয়ার লুবিনিয়ের হাসপাতালে আটমাস থেকে দশ বছরের ২৩৫ জন শিশুর শরীরে লুমিনাল ও ভেরোনাল প্রয়োগে হত্যা করার পরেও নবারুনের ভাষার গন্ধ বাড়িয়ে পাওয়া যায় রক্তের বন্ধন, শোনা যায় – ‘ আমি তোমাকে ভালোবাসি বিশ্বাস কর’, তাই হয়ত আউশ ভিৎজ অসউইচেম মৃত্যু ক্যাম্প থেকে ৯৯৯২২ জোড়া শিশুদের জামা ও জাঙ্গিয়া উদ্ধারের পরেও নবারুণের প্রত্যক্ষণ আর পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায় সম্পর্কসেতু, পাওয়া যায় একটিমাত্র আশাবাদের ডায়েরী ,যেখানে চিৎকার নেই শোক নেই কেবল লেখা –‘ আমি তোমাকে ভালবাসি তাই অন্ধকার নিভিয়ে দাও আমি তোমাকে ভালবাসি তাই অন্ধকার নিভিয়ে দাও’। হ্যাঁ , এই ভালোবাসাই তো মানুষের স্বাধীন নিরীক্ষা,এই কাঙ্খিত ভালোবাসাতেই তো নবারুণের অস্তিবাদী প্রতিপ্রশ্ন। মানবিক অস্তিত্বের প্রতি এই বিশ্বস্ততাই হয়ে উঠছে নবারুণের সর্বতো গ্রহণ,স্বাধীন মানুষের মত এক চিরস্থায়ী বিভ্রান্তিতেই জন্ম নিচ্ছে তাঁর অস্তিবাদী বীজগনিত।

সাহিত্যের বিচারে একজন গল্পকার একজন কথাশিল্পীর জীবনের প্রতি দায়িত্ব ঠিক কতখানি? এ প্রশ্ন এড়াবার নয় আর এ প্রশ্নে এসেই অস্তিত্বের সাথে ধাক্কাধাক্কি লাগে লেখকের।, তার সংলাপ ভাষা বা শব্দচয়নে চিৎকার করে ওঠে আবহমানের নিঃশ্বাস, জীবনের প্রতিটি স্তরের চরিত্র দ্বন্ধ। Arnold Kettle কে তাঁর প্রবন্ধে বলতে শুনি- “The history of the novel is, in this sense, the history of the novelists' search for an adequate philosophy of life. This is not to say that the novel is philosophy. A writer may hold a very profound conscious philosophy and yet be no artist (though the chances are that if his philosophy is truly profound in its human understanding his writing will achieve some- thing of the quality of art) ; and a great artist may not be able to formulate his view of life satisfactorily in philosophical terms. But the view of life is nevertheless there, illuminating every word he writes, and it is his view of life which will determine the nature and the profundity of the pattern of his book. Life and pattern are not, in truth, separable. Pattern is the way life develops. নবারুণের নির্মাণপ্রকল্পের প্রায় সবটাই এমনই চেনা পৃথিবীর চিন্তনে ও পার্থিব প্রকাশময়তায় পরিলক্ষিত হয়। মানুষের সাথে মননের ,অস্তির সাথে অনুভবের সেখানে সাবালক বন্ধুত্ব; কোনো অনিবার্য শিল্পবোধের দিকে তাঁর প্রোটাগনিস্টদের ব্যাখা চাননি নবারুণ , হতে চাননি ‘ব্রয়লার গল্পের’ লেখক বরং মানুষকে সেলিব্রেট করেছেন মানবচেতনার গর্ভগৃহে দাঁড়িয়ে,উদঘাটন করতে চেয়েছেন বেঁচে থাকার বাতাবরণটিকে। ‘সব শেষ হয়ে যাচ্ছে’ গল্পে তিনি যখন বলেন-‘ জুডাস দেশ, জুডাস রাজনীতিক, জুডাস নাগরিক, জুডাস বিচারক, জুডাস চলচ্চিত্র-পরিচালক, জুডাস সাহিত্যিক, জুডাস কবি … এইসব ক্লোনেরাই দৃশ্যমান প্রত্যহ, সকাল বিকেল রাত্রি। ক্লোনেরাই সরবরাহ করে চলেছে ব্রয়লার নাটক,ব্রয়লার উপন্যাস,ব্রয়লার কবিতা,ব্রয়লার ছবি, ব্রয়লার সমালোচনা, ব্রয়লার পত্রিকা”- তখনই অনুভাবিত হয় তাঁর সাহিত্যদর্শণ বিধিবদ্ধতার বিরোধিতা। স্পার্টাকিউসের মত ফ্লুরোসেন্ট বাজারী সাহিত্যে দাঁড়িয়ে খুঁজে চলা সত্যিকারের মানুষের প্রকাশ। নিহিলিজম বা শূণ্যতাবাদের বাইরেও আস্থাশীল হতে চেয়েছেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে। শূণ্য স্বাধীনতার অভিমুখেও প্রত্যাশার সিগারেটের রিং ছুঁড়ে দিতে চেয়েছেন নবারুণ। আর এর জন্য জীবিত করে তুলেছেন একের পর এক ভিকটিমকে টার্গেটকে। মার্জিনাল ভয়েসকে করে তুলেছেন মেনস্ট্রিমের প্রতিনিধি। না,প্রতিনিধি অপেক্ষা পম্পট শব্দটাই হয়ত আরও ভোঁতা সূচে গেঁথে নিতে পারে নবারুণের তুলে আনা মানুষগুলোর জন্মদিন মৃত্যুদিন। গেঁথে নিতে পারে থকথকে শাদা আর চটচটে শাদা । কেবল দুলতে দুলতে নেমে আসছে একটা প্যারাশুট ,নেমে আসছে রোগমেয়েকালোছেলেশুয়েথাকাবুড়িঘুমন্তবেড়ালকাশতেথাকাবুড়োপচতেথাকাফলতেলচিটেমশারি- গ্যাসীয় গ্রহের অতল অতল থেকে উঠে আসছে ফ্লুরোসেন্ট কালারের আর্তি,সেখানে কোনো চৈতন্যরূপী হংস নেই কোনো অবক্রচেতা দেহ প্রাণ মনের স্বচ্ছ দেওয়াল নেই বরং ভেতরে টেনে নিচ্ছে সত্ত্বার সহজযান টেনে নিচ্ছে সত্ত্বার ছিমছাম পাকাবাড়ি আর ছোপধরা দাঁত।এই চামড়ার বাজারে আমরা দেখছি বাজি পুড়ছে আর পুড়ে যাচ্ছে শেকলের দাগ মুছতে মুছতে উঠে আসা প্রাণ নামের কিছু প্রামাণিকতা।নবারুণ ভট্টাচার্যের সাথে তাঁর আখ্যান উপন্যাসে ঢোকার কোথাও হয়ত এই একটাই দরজা একটাই ‘সুইসাইড কেস’ । আর বেরোবার? না,জীবনের অতিবেগুনী আত্মাকে ঘিরে সর্বত্র্য সেই সিসিফাসীয় ফাঁদ।তুমি আজ একা।কালও একা। আনন্দ ও বিশ্রান্তিতে একা।ফাঁকা বাড়িতে কোলাহল নিয়ে একা।একটা একটা করে দোকান বন্ধ হচ্ছে আর একটা একটা করে দাগ টানছ।এগিয়ে দিচ্ছ বোরে এগিয়ে দিচ্ছ কোনাকুনি গজ বা সোজাসুজি নৌকো আর পোড়ার গন্ধ আসছে কোথা থেকে? মানুষজন্ম পুড়ছে? বিশাল জ্যাম আর লম্বা ফ্যানগুলো থেকে কি নেমে আসছে জ্বলন্ত্ মার্কশীট!আসলে এই পোড়বার প্ল্যান আমাদের অস্তিত্বেই আছে ,এক নজরবন্দী প্রতিপক্ষ হয়ে। অস্তিত্বের মাঝেই অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করতে রয়ে গেছে এমনই এক অ্যামবিগুইটি ,অস্তির এমনই এক গড়দূরত্বের পারমুটেশন।


নবারুণের গল্পের চরিত্ররা সেই সব মানুষ ‘যারা কোথাও যায় না বা যাবে না”।তাদের প্রতিক্ষনের জীবনে কেবল বেশ খানিকটা হেঁটে নেওয়া আর তারপর থেঁতলে যাওয়া যাত্রাপথ ধরেই ফিরে আসা বিদ্রুপের হাসি নিয়ে ,পা দুটোকে টেনে হাত দুটোকে জড়িয়ে ধরে ফিরে আসা বিষাক্ত এক কালো নালার মধ্যে বিষাক্ত এক চিরন্তন ঘাঁটাঘাঁটির মধ্যে।অনিশ্চিতির শীর্ষে দাঁড়িয়েও গতিশীল জীবনকে বুঝতে চাইছে তাঁর চরিত্ররা,কখনও গিনি দু হাত ওপরে তুলে ভালুকনাচ নাচতে নাচতে হালাল ঝান্ডা বলে বোঝাতে চাইছে সে আছে সংখ্যাহীন মহামিছিলে,মুক্তিকামী এক আত্মঘাতী অ্যাবসার্ডিটি নিয়ে নিজেরই শবের সঙ্গী হয়ে সে আছে, আবার কখনও দীপাইয়ার মত চিতামানুষ ঘেমে চলেছে বিচিত্র এক গন্ধের ভেতর ,অব্যর্থ হনন নিয়ে খেয়ে চলেছে চিতামানুষের ভেপসে ওঠা চটচটে অন্তর্দাহ। অসাম্যের দুনিয়াতেও লেখক অস্তিত্বকে কেবল অ্যাবসার্ডিটির হাতে যে ছেড়ে এসেছেন তা কিন্তু না , বরং ফিরে ফিরে দেখেছেন অনিশ্চিত দাগানো দৃশ্যগুলো।শূণ্যতার বাইরেও রাস্তায় বাতাসে কাদায় লেগে আছে কিছু খাপছাড়া আয়না যা দিয়ে দেখা যায় দ্য কনসেপ্ট অফ আদার, বহুজাতিক এক গল্পের খসড়া।কামু যেমন সিসিফাসের কাছে এসে সর্বহারার স্থির জগতের বাইরেও দেখতে চান অস্তির নিরন্তন বেঁচে থাকার বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম ,দেখতে চান মাটি হারানোর পরেও মানুষের বীজের নিরেট খোঁড়া হয়েও হাঁটা ,যেভাবে তিনি সমূহ অন্ধকারের ফাটল দিয়েও সিসিফাসীয় অস্তিত্বকে নিয়ে দাবী করতে পারেন- “A face that toils so close to stones is already stone itself! I see that man going back down with a heavy yet measured step toward the torment of which he will never know the end. That hour like a breathing-space which returns as surely as his suffering, that is the hour of consciousness. At each of those moments when he leaves the heights and gradually sinks toward the lairs of the gods, he is superior to his fate. He is stronger than his rock." … চিতামানুষের পোষাকের ভেতরও নবারুণও যেন খুঁজে নিয়েছেন কেবল দীপাইয়াকে নয় বরং ইম্পোর্টেড এবং সিন্থেটিক কাঠামোর ভেতরেরে প্রান্তিক মানুষের ডায়াস্পোরিক প্রতিবেদনটিকে। ভুয়ো সামন্তরাজে ঈশ্বরবিহীন মানুষগুলোর গায়েও চিতাবাঘের গন্ধ এসে গেছে যাপনের সাথে পাল্লা দিতে দিতে। মানুষগুলো জেনে গেছে মৃত্যুর সত্যটিকে অথচ জীবনের রুটম্যাপে খুঁজে চলেছে ম্যাজিক মূহূর্তটি , যে মূহূর্ত শাসকের থেকে শোষনের থেকে ব্যক্তির স্বাধীনতার। আবার “আব্বা’ গল্পে হিন্দু দাঙ্গাবাজের বুকে যখন নিরাশ্রয়ী মুসলিম সন্তান বেঁচে থাকার টেক্সট খোঁজে কিংবা নীতিধর্মের সাম্প্রদায়িতার মাঝেও হিন্দু দাঙ্গাবাজটি একটি বিধর্মের এক শিশুকে বুকে জড়িয়ে খুঁজে নিতে চায় মানবিক পংক্তিগুলো তখন আসলে অস্তিত্বকে এবল শূন্যময় বলা যায়না।সে যেন বিশ্বপ্রাণের অভিযাত্রার দিকে এক নতুন প্রদেশের কথা নিয়ে বসে থাকে যেখানে নিত্য দ্বন্ধবাদের মাঝেও মানুষ সর্বোত্তম, অনুভূতিশূণ্য চাঁদোয়ার ভেতরেও লেখক যেন খুঁজে পেতে চান জীবনের মধ্যে তলিয়ে যাওয়ার একটা ঘোষনা, স্থিতবস্থাকে ভাঙতে চাওয়ার মানবিক অনুচ্চার। “এবং ইন্দ্রজিৎ” নাটক প্রসঙ্গে নাট্যকার বাদল সরকারকে প্রশ্ন করা হয় নাটকটি রাজনৈতিক না কি অস্তিবাদী! উত্তরে তিনি বলেন-রাজনৈতিক কোনোভাবেই নয় এবং অস্তিবাদ সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত নন, যার ফলে শেষমেশ এটাকে অ্যাবসার্ড উন্মাদনা বলা যেতে পারে।কি এই অ্যাবসার্ডিটি? যা কিনা ড্রিম ডেসপেয়ার আর ডিসইল্যুশনমেন্টের গঙ্গাসাগরে গুছিয়ে রাখছে প্রোটাগনিস্ট ইন্দ্রজিতের অর্থহীন ভাসমানতা!ইন্দ্রজিত তো কোনো সংঘ নয়,কেবল সংখ্যামাত্র;অমল বিমল কমলের মত সমবায়ের অংশমাত্র অথচ অমল বিমল কমলের গতানুগতিকার বাইরে দাঁড়িয়ে মানুষের মত কিছু ঝরাপাতার পর্যটনক্রিয়ায় কেবল একটি “এবং’ এর মত যাপনের এক অভ্যেস হয়ে থেকে যাওয়া ইন্দ্রজিৎ কিছুতেই মেলাতে পারে না । জীবন ,জীবনের হিসেব।এখানেই প্রশ্ন ওঠে প্রথাগত ভাবনার বাইরে এসে নাট্যকারের খোঁয়াড়ি ভাঙ্গবার বিশ্লেষণে।চরিত্ররা থাকে আলোকবৃত্তে আর দর্শকেরা অন্ধকারে অথচ এক্ষেত্রে নাট্যকার যেন নিজেই হয়ে উঠছেন সংলাপ নিজেই হয়ে উঠছেন মানুষের দাঁতে দাঁত চেপে ‘অস্তিত্ব’ শব্দটির সযত্ন সংরক্ষনের শরিক।অথচ অস্তিত্ব অর্থহীন,তার বয়ান আসলে এক মৃত ব্যক্তির ,জীবন্মৃত জং ধরা লাট্টুর মত যে ঘুরে চলেছে প্রশ্নচিহ্নসহ প্রলাপসহ পরিত্যক্ততাসহ,ঘুরে চলেছে বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতিহীন প্রতিবিপ্লব নিয়ে। নবারুণের চরিত্ররাও যেন বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিতের’ ইন্দ্রজিতের মত অস্থিরতার মাঝে খুঁজে চলেছে একটি সম্পূর্ণ ‘আমি’ কে। জীবন সেখানে এক অতিবাস্তব বোঝাপড়া, একটা লাগামছাড়া অনুসন্ধান যার ভেতর দুঃখ কষ্ট সংকট নিয়েও অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


বারংবার নবারুণ তাঁর চরিত্রদের মাঝে কেবল একটি মানুষ নন বরং খুঁজে চলেছেন আত্মমনোনয়নের দ্বন্ধতত্ত্বটিকে,সেখানে অস্তিত্বের স্তরগুলির কোনো সার্বজনীন মানদন্ড নেই কোনো দানা বাঁধা নেই বরং আস্তে আস্তে শরীরের মধ্যেই নেমে আসছে অন্য একটি শরীর,অস্তিত্বের মধ্যে ঢুকে পড়ছে অন্য একটি অস্তিত্ব;কিছু আনআইডেনটিফায়েড ট্রমা কিছু অযৌক্তিক রক্ত-ঘাম-অশ্রু-বীর্যের সংশয়।আসলে যুক্তির এই পৃথিবীতে এদের যাপনের অধিকাংশটুকুই অযৌক্তিক কিংবা জীবনের স্বরূপ আর অভিলাষকে খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে এদের মধ্যে কেবল এক হাহাকার কেবল এক ক্রমশূণ্যতা কেবল এক অস্তসূর্যের চিৎসংসার। এদের কোনো আরোহনের গল্প নেই, অস্তিত্বের শেকড় নেই অথবা আলোর অন্বেষন নেই কেবল এক ভগ্নাংশে দাঁড়িয়ে আরও এক ভগ্নাংশের শূন্যতা চাইছে এরা ।একটা অপেক্ষা একটা ওয়েটিং ,তামসের ভেতর একটা বর্ণহীন রক্তক্ষয়ী ব্যস্ত ইন্টারলকড সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এ যেন এক অ্যাবসার্ড চেতনাবিপ্লব যেখানে হারবার্টের মত চরিত্ররা হলদে বাতিল আলোতে নিজেরই নুয়ে পড়া শিরদাঁড়াকে দীর্ঘজীবি করতে চান,চিরন্তন ভিক্ষুকাহিনী নিয়ে বসে থাকে অস্তিত্বের মত এক অ্যাবসেন্ট সিগনিফায়েডের জন্য।আসলে এ কেবল অস্তিত্বের সংকটই নয় এ যেন অস্তিত্বের সংগীতও। বাদল সরকারের নাটক ‘প্রলাপ’ যেমন শুরু হয় –“যদি ধরে নেওয়া যায় জীবনের একটা অর্থ আছে, তাহলেও প্রশ্ন উঠতে পারে-জীবনের অর্থ খুঁজে বার করার কোনো অর্থ আছে কিনা” অথবা বেকেটের সাংকেতিক নাটক ‘ওয়েটিং ফর গোডো” এর প্রারম্ভেই যেভাবে এস্ট্রাগন বলে ওঠেন-“Nothing to be done”- সেভাবেই কি নবারুণের চরিত্ররাও আসলে আয়নাফেরত কিছু আকাঙ্খার দ্বন্ধ,যাদের ব্যক্তিগত রং বলতে কেবল ঠান্ডা হিম কিছু ‘অ্যাংজাইটি নিউরোসিস’।পরিপূর্ণ সত্তা বলে তো কিছু নেই,যা আছে তা এক মৃদু স্বপ্ন তা এক গাঢ় ঘুম ,জীবনের অন্তর্বতী পংক্তি ধরে ধরে এক ঘুমঘোর জাগরন।একাকীত্ব সেখানে অনিবার্য অথচ একাকীত্বকে স্বীকার করতে চাইছেনা চরিত্ররা কিছুতেই,কিছুতেই মানছে চাইছেনা তারা আসলে নিজেরই শব ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছে ফিরছে। অথবা বিবর্তণহীন এক জীবনের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন।সত্তা ঠিক কি? সে কি এই ভৌত জগতের মাঝে ভৌতিক বার্তামাত্র!নাকি এই নির্লিপ্ত বন্ধ্যা ধূসর সাম্যসমাজে প্রতিনিয়ত উৎসর্গ করছে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কেবল কিছু অবাধ উইল! নাকি উদ্বাস্তু থেকে উত্তরমানুষের দিকে নবারুণ তাঁর চরিত্রদের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন মালটিপ্লিসিটি অফ এক্সিজটেনশিয়লিজম !‘হারবার্টে’ মৃত নকশাল নেতার মানসিক ভারসাম্যহীন কাকা হারবার্ট যিনি কিনা মৃতের সহিত কথা বলতে পারেন বলে দাবী করেন এবং যার মৃতদেহ চুল্লীতে প্রবেশের পর খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা বহুবছরের নকশাল বোমাগুলো ফেটে ওঠে, তাকে আমরা কি নামে কনটিনিউ করতে পারি? প্রতারক!ভাঁড়!নিরীহ!বিশ্বাসঘাতক-কপট!উগ্রপন্থী! না কি কেবল একজন কথক!চল্লিশোর্ধ্ব মানসিক ভারসাম্যহীন একটি মানুষ যার বিশ্বাস সে মৃতের সাথে কথা বলতে পারে,।যার বিশ্বাস সে ইতিহাস খুঁড়ে দেখতে পারে।আসলে হার্বাটের মত চরিত্র দিয়ে নবারুণ একদিকে বোঝাতে চেয়েছেন সেই সব শর্তাধীন অনিশ্চিত পরাজিত পান্ডুলিপিদের যাদের জীবনের অধিকাংশটুকুই অযৌক্তিক অথচ এরাই সেই আনআর্মড রংবাজ এরাই সেই অ্যাবসার্ড রাউডি যাদের মধ্যে দিয়ে সৃজনীসাহিত্যের বাইরে নবারুন গড়ে তুলেছেন একটা বহুস্বরিক সম্ভাব্যতা। এই জাতীয় চরিত্রগুলো কোনো ছকবন্দী ঘটনা নয় বরং সৃষ্টিপ্রবাহে আস্থা না রাখতে পেরে বুর্জোয়া গ্র্যানজার থেকে আত্মপ্রকাশের উপায় খুঁজতে বিশ্বাস্য অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন কল্প ও ব্যঙ্গ অনস্তিত্বের সম্ভার। ব্যক্তিধ্বংসের মধ্যে দিয়ে এশটাব্লিশমেন্টের কালো ভ্যানের দিকে নবারুণ লেলিয়ে দিচ্ছেন একটা সম্পূর্ণ আন্দোলনকে। ফ্যাতাড়ুদের আবির্ভাব বা হারবার্টের মৃত্যুর শেষে বোমার বিস্ফোরণ আসলে অবজেক্টকে নির্বাসণ দেওয়ার একটা ডেলিবারেট স্টাইলাইজেশন; হার্বাটের মৃত্যু তো কেবল একটি মৃত্যু নয় বরং সে আমাদের সামনের রেখে যায় কিছু আকস্মিক প্রশ্ন সেখানে কোনো অমরতার আদল নেই বরং রয়ে যায় ঈষৎ অন্ধকারের ভেতর হাতড়ে বেড়ানো অনুভূতি রিক্ত অস্তিত্বের পরিভাষাটি,ছোট্ট করে আমরা একটু দেখে নিতে পারি ‘The order of things” এ ফুকোর বক্ত্যবটিকে,অনস্তিত্বের বয়ানেও যেখানে লুকিয়ে রয়েছে অস্তিত্বের দ্বিতীয় কন্ঠস্বর।সেখানে অস্তিত্ব সর্বদা কোনো স্থিরীকৃত বা স্পষ্ট নিশ্চিতি নাও হতে পারে,মৃত্যুর পরেও সে কুয়াশার রঙে তুলে আনতে পারে নতুন সাক্ষাৎকার। ফুকো বলছেন- “The system of signatures reverse the relation of the visible to the invisible. Resemblance was the invisible from of that which, from the depths of the world, made things visible; but in order that this form may be brought out into the light in its turn there must be a visible figure that will draw it out from its profound invisibility.”-হারবার্ট বা ফ্যাতাড়ুদের মত কিছু মাস্টার ন্যারেটিভের কথকসত্তা দিয়ে নবারুণও বিনির্মাণ করতে চেয়েছেন কিছু ফ্রেম ন্যারেটিভকে। ফলে আদতে এই সিগনেচার ক্যারেকটারগুলো থেকে উঠে আসছে কিছু মিসিং মুভমেন্ট, যা সমষ্টির, যা অস্তিত্বের একটা সামুহিক অবস্থানের কথা বলে। আপাত বিযুক্ত হয়েও তারা কোথাও হয়ত ‘এথিক্স অফ অ্যামবিগুইটি’ দিয়ে একে অপরের সাথে যুক্ত, তারা কোথাও সম্পূর্ণ একটা যাপনের পক্ষে সওয়াল করে।


নবারুণের স্বরন্যাসে সত্তার নৈর্ব্যক্তিক পরিধির তুলনায় মানুষের দ্বন্ধে উঠে এসেছে গোষ্ঠীচেতনার অস্তিবাদী দর্শন।ক্লিষ্ট মানুষের ভীড়ে ‘বিট ক্যাওড়া’ বা ‘ফ্যাতাড়ু’ বলে যে বিপ্লবী ভিসন বা বীক্ষার অবতারনা করেছেন নবারুণ তা আসলে নির্ভরতাশূণ্য ব্যক্তিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সামাজিক উত্তোরনের এক জগত প্রতিষ্ঠারই চেষ্ঠা। তাঁর মোটিভ তাঁর মনসমীক্ষণ কি তবে ব্যক্তিক থেকে বিশ্ববীক্ষায় অভিনিবেশের বিষয় হয়ে উঠছে না!গল্পের চরিত্রদের তিনি দাঁড় করিয়েছেন একবারে সমাজের মাঝখানে, আক্রমন প্রতি আক্রমনের মুখোমুখি,নিজের চূড়ান্ত আত্মপরিচয় জানাই সেখানে জীবিতের আনন্দ। আগ্রাসী সর্বগ্রাসী পক্ষাঘাতগ্রস্ত সভ্যতার মাঝে নবারুণ খুঁজে চলেছেন এক বিকল্প রণনীতি। জীবন বিষয়ে মানবসত্তার দীর্ঘ নিদ্রাহীন ফুঁপোনোটা থিতিয়ে এলেই খুঁজে চলেছেন পৃথিবীর সেই শেষ কম্যুইনিস্টকে অথবা কোনো কমরেডের হাত অথবা বুলেটে ঝাঁঝরা কমরেডের হাত থেকে পড়ে যাওয়া রাইফেলটিকে। আসলে কোথাও যেন আজন্ম অসুখী পৃথিবীর বুকে অস্তিত্বের দ্বিধা নিয়েও তাঁর চরিত্ররা তাড়াহুড়ো করে মরতে চাইছেনা ।এই কৃত্রিম ও মেকী সভ্যতার মাঝে দায়বদ্ধ থাকতে চাইছেন লেখক নিজে,সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বের মাঝেও তাই উঠে আসছে কালোসুখ উঠে আসছে লেখকের নিজস্ব বিবেকি চিন্তা।গল্প সংকলনের মুখবন্ধে নবারুণকে আমরা বলতে শুনি –“ যে দশকে মানুষের এগিয়ে চলার, শোষণমুক্তি ও সমাজব্যবস্থা পালটানোর মডেল, পুঁজি ও প্রতিক্রিয়ার আঘাতে ও বামপন্থীদের আবশ্যিক আত্মসমীক্ষার অভাবের কারনে অনেকটাই তছনছ হয়ে গেছে, যে শতক সবচেয়ে আশা জাগিয়েছিল সেই শতক শেষ হচ্ছে অবসাদে, বিষাদে,যন্ত্রনাজর্জর অবস্থায়। আমি দৈনন্দিনতায়,প্রত্যহ , নিকটে ও দূরে, নিয়ত যা দেখতে পাই তা হল পরতে পরতে, স্তরে স্তরে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন বর্গের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শোষণ, নতুনতর ঔপনিবেশিকতা ও সংস্কৃতি-সাম্রাজ্যবাদের অমানুষীকরণের দেখা না দেখা হাতকড়া ও চোখভুলানো ঠুলির ভার। সামন্ততন্ত্র বা পুঁজিবাদের বালক বয়সের প্রত্যক্ষ নিষ্ঠুরতার চেয়েও এ যেন মারাত্ম ,জঘন্য ও অপমানজনক। এই দলিত মথিত মানুষ ও তাদের জীবনের এক বিচিত্র ক্যালেইডোস্কোপের মধ্যে আমার জীবন কাটছে।“-আর এখান থেকেই যেন একটা স্বপ্ন একটা সম্ভাবনা ,ফিরে আসার একটা চূড়ান্ত লড়াই কিংবা প্রতিসাম্যের একটি অসমাপিত জেহাদি হয়ে উঠছে লেখকের কাঁচামাল , যা দিয়ে নবারুণ বানিয়ে চলেছেন একের পর এক বিটক্যাওড়াদের ফ্যাতাড়ুদের কিংবা খোঁচরদের-মত কল্পবিপ্লবীকে , যাদের তিনি এনেছেন অধিকারের রাজনীতিতে এনেছেন কেল্লাদখলের প্রত্যাশায়। হয়ত এরাই নবারুণের সুইসাইড বোম্বার এরাই ক্রেমলিনের দেওয়ালে ধাক্কা খাওয়া ঝড়ের স্লোগান এরাই হয়ত হ্লুদ হ্যালোজেন জোনে চিড়িক চিড়িক ঘুরপাক খাওয়া সেইসব হোপলেস আধমরা লাতখোর,যারা একটু থিতু হওয়ার জায়গা খুঁজছে। রাষ্ট্রীয় শোষনে সোচ্চার নবারুণ। অসাম্যকে পেরোতে তিনি যেন তাঁর চরিত্রদের মাঝে সাম্যের হারানো পেখম খুঁজছেন আর এদের উদ্দেশ্যেই কোথাও যেন নবারুণের গল্পনির্মাণ, এক সংকটশ্রেনীকে জাস্টিফাই করতে ব্যক্তিসত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে এদের জন্যই তাঁর অভিশপ্ত জীবন থেকে বেরিয়ে এসে অস্তিত্বের স্তরগুলিকে আবিষ্কারের চেষ্টা। নেতিমূলক ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা নয় বরং বৃহত্তর জীবনের দিকে তাকিয়েই তাঁর উচ্চারন- “ সারা দুনিয়া জুড়ে কমিউনিস্টরা ফিরে আসবে। হ্যাঁ। আসবে। তবে তার জন্যে আগামী সতেরো বছর বা তারও বেশি সময়ের প্রত্যেকটা ঘন্টা ও প্রত্যেকটা মিনিট কাজে লাগাতে হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে কমিউনিস্টরা ফিরে আসবে। আসবেই। আর দশ নয়, দশ হাজার দিন ধরে দুনিয়া কাঁপাবে।“ তাঁর “শেষ সংলাপে” সার্ত্রকে আমরা সমাজদেহকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য মনুষ্যদলের প্রয়োজনীয়তা মেনে নেওয়ার কথা বলতে শুনি।একা বা কোনো পৃথক গোষ্ঠী নয় বরং বিপ্লবের প্রতিবিপ্লবের মূলবিন্দু হিসেবে তিনি সম্মিলিত মানুষের বা বিবিধ মানুষের ঐক্যবদ্ধতার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছিলেন। সংগ্রামের স্বরূপ খুঁজতে নবারুণকেও আমরা দেখি অ্যাবসার্ডিটির আইডিয়াকে চেতনার দর্শন হিসেবে আত্মস্থ করতে। কিয়েকাগার্দ যে ণৈরাশ্য ও সিদ্ধান্তহীনতার জগতে মানুষের অস্তিবাদী স্পৃহাকে আবিষ্কার করেছিলেন এবং তার মুক্তি প্রার্থনায় মূঢ় মানুষকে তার হাতাশায় বিপর্যস্ততায় একা রেখে এসে তার অস্তিবাদী সঙ্কট বলে চিহ্নিত করছেন কিংবা বেকেটীয় সাহিত্যে অস্তিবাদী দর্শনে যে শীতশীত প্রশ্নমালার ভেতর গোডোর জন্য লেখক রেখে আসেন এক অন্তহীন অপেক্ষা, যেখানে পরিত্রান বা মুক্তি নেই বরং প্রতিটা পদক্ষেপের পরে কেবল কিছু দীর্ঘ বিরতি ,যেখানে অস্তিবাদী দর্শন বলতে অসম্পূর্ণতার অন্তর্লীন দ্বন্ধের মুখোমুখি এসে দাঁড়ানো ,যেখানে অস্তিত্ব বঞ্ছিত ও অসহায়,অদ্ভুত ও অযৌক্তিক, কেবল অভূতপূর্ব সংকটে নির্মিত অন্ধকারের স্নেহসত্তা ,যেখানে দাঁড়িয়ে অস্তিত্বের ব্যাকরণ হিসেবে বেকেটকে আমরা বলতে শুনি- “ The expression that there is nothing to express, nothing with which to express, noting from which to express, no power to express, no desire to express, together with the obligation to express”- সেখানেই নবারুণের ভবঘুরেরা প্রত্যাখ্যান করতে চাইছে অস্তিত্বের ধ্রুপদী নীরবতা। সত্তা ও শূণ্যতা অপেক্ষা সেখানে হালাল ঝান্ডা পুঁতে দিয়ে যায় সত্তা ও স্বাধীনতার সমান্তরাল ইস্তেহার। নিবার্সিত বা নীরব শহীদপেক্ষা বামবাদকেও তিনি তাঁর রাজনীতি সচেতন অস্তির সাথেই মিলিয়ে দিয়েছেন। ফ্যাতাড়ুদের হারিয়ে যেতে দেননি গড় ও গন্ডীবদ্ধ কারাগারমুখী কোনো সামুহিক নিষ্ফলতায়, বরং দাহ্যপর্দাথে ভরিয়ে দিয়েছেন কাহিনির চরিত্রদের,জীবনের চৌহদ্দীতে অধিকার ছিনিয়ে নিতে লুকিয়ে রেখেছেন সন্ত্রাসবাদী সন্তানদের।ভাষার গভীরে সে কেবল কোনো সার্ত্রীয় শূণ্যতা বা বেকেটীয় নীরবতা নয় ,নৈরাশ্যের দ্যোতক নয়, ভ্লাদিমির বা এস্ত্রাগনের মত কেবল কিছু প্রতীক্ষার আলো আলেয়া নয় বরং তাঁর কাকতাড়ুয়া তাঁর ফ্যাতাড়ু তাঁর বিটক্যাওড়াদের দিয়ে নবারুণ বলিয়ে নিয়েছেন নিম্নবর্গীয়ের সেই সব খন্ডিত স্বাধীনতার কথা যা দিয়ে নতুন প্রকাশ পায় যা দিয়ে মৌলিকতা সুনিশ্চিত হয় যা দিয়ে অনায়াসে বলে দেওয়া যায় –“ যে কথাগুলো আমি বলব সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে আর সেই গুঁড়ো গুঁড়ো কথার ছাই জলের ওপর পড়ছে, আপনাদের ইজ্জতের ওপর পড়ছে,আপনাদের সাফ চকচকে জুতোর ওপর পড়ছে, শহরের ওপর পড়ছে খাবারের ওপর পড়ছে ...আকাশের লালার সঙ্গে মিশে রোদ্দুরের ছবির ফলার ওপর মরচে হয়ে জমছে কথাগুলো, কিন্তু এর চেয়েও বড় সওয়াল থেকেই যায় ... ইজ্জত আউর রুস্তমি কা সওয়াল ... পড়ালেখা এত জানি না বলে কথাগুলো এবড়ো খেবড়ো হল্লাবাজ কিন্তু কথাগুলোকে সে রকম ছুট করালে এখনো দৌড়তে পারে ...”- কোনো কসমিক অ্যাবসার্ডিটি নয় বরং স্বাধীনতার আবশ্যকীয়তাকেই অস্তিত্বের মূল্য হিসেবে উপন্যাস গল্প নাটকের পরিসর করেছেন নবারুণ, তাঁর উপলব্ধির উৎসে রয়েছে প্রতিক্ষণের জীবন এবং মানুষ কখনই কেবল শূণ্য নয় বরং তার প্রতীকী অস্তিত্ব ‘বোমা ফাটায় ধোঁয়ায় হাঁপাতে হাঁপাতে মুখের মধ্যে জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে ছোটে... সিসেতে ভারী হয়ে বিষিয়ে যায় লাশ। খুলি ফাটিয়ে, গলা চিরে, পেট বুক ফেঁড়ে ফেলে ফাৎরা ফাই করে ফেলে মর্গের ফাড়াইবাবু । শেয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খায় কাউকে; কিন্তু সওয়াল তারা ফিরিয়ে নেয়না”।


সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার একবার বলেছিলেন- “আমরা কেউ জন্মাতে চাইনা। তার প্রমাণ জন্মের মূর্হুতে প্রচন্ড চিৎকার করে উঠি। প্রতিবাদ, তীব্রতম প্রতিবাদ। মরার চাইতে অনেক বেশি প্রতিবাদ করি। মাতৃজঠরে পরম আরামে ঘুমিয়ে ছিলাম। সেই নিদ্রা ভাঙলে আমরা চিৎকার করে উঠি … আমি কেন জন্মালাম? পৃথিবীর চূড়ান্ত সুখ,চূড়ান্ত শান্তি থেকে বঞ্চিত হলাম। এইভাবেই ফ্রাসটেশন হচ্ছে, সাবকনসাসে ঢুকে যাচ্ছে। সাবকনসাসে ঢুকে ভাবে এর থেকে বাইরে যাওয়ার পথ কই?” সাহিত্যে অস্তিবাদ প্রসঙ্গ এলেই কামু থেকে সার্ত্র,কাফকা থেকে কিয়েকাগার্দ-প্রায় প্রতিটি দার্শনিক সাহিত্যিকই প্রসঙ্গায়িত করেছেন অস্তিত্বের এমনই এক আর্তনাদ,আর্তসমর্পণ,কালোজীবনের এক ‘ন্যুড ইডিয়ম’। প্রতিক্ষেত্রেই অস্তিত্ব আসলে একটা ট্রমা, আক্ষরিক অর্থে মৃত্যু নির্যাস, মৃতের নথি পেতে কবরে দাঁড়িয়ে থাকা জীবিতের কথোপকথন। নবারুণের উপন্যাস গল্পেও ঠিক এমনই কিছু অ্যালিয়েনেটেড মানুষ যারা তাদের নিজেদেরই অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান যারা তাদের বিচ্ছিন্নতার গল্প বলতে বলতেই ফিরে ফিরে আসে ব্যর্থতার সূচী নিয়ে ‘ আর উঠে আসে ‘অস্তিত্বের’ ধারনা সম্পর্কিত এক তীক্ষ্ণ মৌলিক প্রশ্ন। মূক বধির অন্ধ চারজনন শববাহক ও কালো প্লাস্টিকে জড়ানো একটি মৃত্দেহকে নিয়ে তাঁর ‘৪+১’ গল্পে নবারুণ অস্তিত্বের ক্লান্তি আর ভ্রান্তি নিয়ে যে কল্প আবহ তৈরী করেছেন ,গল্পের শেষে প্রশ্ন তুলেছেন –“ ওই মৃত্দেহটি কার? তার নাম কি? তার কেউ আছে? কীভাবে সে মারা গিয়েছিল? ওই চারজন শববাহকের পরিচিয় কি? তারা সেদিন কোন শ্মশানে যাচ্ছিল? কীভাবে পৌঁছত তাঁরা? এরকম একটা ঘটনা ঘটল কি করে?”-এখানেই উঠে আসে অস্তিবাদী দ্বন্ধতত্ত্ব, উঠে আসে আশ্রয়ের ধারনা পেরিয়ে অধিকার অর্জনের এক অমোঘ ঘুরপাক।অস্তিত্বের কি পূর্বনির্ধারিত কোনো সারসত্তা আছে? কোনো যৌক্তিক বিকাশ কিংবা বিনাশ আছে ? নবারুণের গল্পের কাছে এলেই অস্তিত্ব যেন দেহবন্দী একধরনের পানিশ মেমোরি।কিয়েকাগার্দ যেমন বলেন ‘বেঁচে থাকা’ আর ‘অস্তিত্বশীল হওয়া’ এক জিনিস নয়, অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কারের সেখানে মানুষের স্বাধীনতার মনোনয়ন আছে, আছে হতাশা আর উদ্বেগের এক মিশেল আবহ, ঘোড়ার মত হাঁপাতে হাঁপাতেও তারা কোথাও রক্তবাহী শিরার মাঝে গেঁথে নিচ্ছে চামড়ার অভিমান ,গেঁথে নিচ্ছে পথ পেরোনোর এক বিন্যাসছুট চেতনা ঠিক তেমনি নবারুণের চরিত্ররাও কিন্তু প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রান্তিকতার প্রতিদ্বন্ধী এক নতুনতর অভিযানে বারবার আকর্ষিত হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কিয়েকাগার্দের চেয়েও সার্ত্রের অস্তিবাদী ধারনার সাথে নবারুণের উচ্চারিত সুড়ঙ্গপথের সম্ভাবনা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। কিয়াকেগার্দ যেখানে মনোনয়ন বা নির্বাচনের স্তরগুলিকে ঈশ্বরের আদেশের সাথে নিয়ন্ত্রাধীন করে রেখেছেন ,যেখানে তিনি ব্যক্তিক উড়ালে ধরেছেন ঈশ্বরের একছত্র বিভ্রম,যেখানে ব্যক্তির নৈতিকতায় কখনই ঈশ্বরের বিরোধিতায় বিশ্বাসী নন কিয়েকাগার্দ এবং ভগ্নাংশ জীবনেও যেখানে তিনি নির্দেশ করতে চেয়েছেন- “Teleological suspension of the ethical” অর্থাৎ অতিজাগতিক শক্তির পূর্বপরিকল্পিত নির্দেশনার কাছে এসে আনুকুল্য চাইবে মানুষের মোটিভ সেখানেই সার্ত্র ‘আমি’ কে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, ‘আমি আছি’ এই তাঁর কাছে অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য এবং আত্মআবিষ্কারে তিনি চেতনাকেই চলনশক্তি করেছেন। উত্তোরণগুলো যেখানে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট ইঙ্গিতবহ শব্দপিন্ড হয়ে কানে আসে , ‘নস্ত্রাদুমাসের আত্মহত্যা’ কিংবা ‘মৃতদেহ দর্শন’ এর মত গল্পে নবারুণ শুরু থেকেই খুলে দিয়েছেন অস্তিত্বের নেসেন্ট খেলাঘরটিকে, যেখানে আলো খুঁটতে খুঁটতে অন্ধকার খুঁটতে খুঁটতে ছকবাঁধা শব্দ থেকে নৈঃশব্দ্যে নেমে পড়েছে অনন্তের প্রশ্নচিহ্নগুলো। অস্তিত্ব কি? একাকী! অপরিচিত! নাথিংনেস! শূণ্যাতা! সেকি কেবল ব্যক্তিগত চিৎকার নাকি নিঃশব্দে বাড়িয়ে দেওয়া ট্রাপিজের ডিগবাজি ধরে ধরে এগিয়ে যাওয়া নিঃস্ব আত্মাদের! সার্ত্রের কথায় চেতনা আসলে একটি ধারনা মাত্র, একটি তীক্ষ্ণ ও অন্তর্ভেদী স্বাধীনতার চাহিদামাত্র।কিন্তু কি এই স্বাধীনতা! কি এই চূড়ান্ত চাহিদা! আসলে মানসিক সীমাবদ্ধতাকে মানুষ সবসসময়ই অতিক্রম করতে চায়, সার্ত্র যাকে বলছেন- “man is his own transcendence” আর এই অতিক্রমণের মাঝেই এসে পড়ে অস্তিত্ব নামের একটি অধিকতর রাত্রি যা কখনই পেরোবার নয় ,যেখানে একটি আঁধার অংশ থেকে ভেসে আসে আরও একটি শাশ্বত আঁধার। অনির্দিষ্ট কিছু নৈরাশ্য আর স্থবিরতায় ‘ আরশোলা আর টিকটিকিরাও শব্দ করে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যারা সংখ্যায় তাদের কোনো শব্দ নেই।পিঁপড়ে।‘ অজান্তেই কি নবারুণ গোটানো অন্ধকারের মত কালো পিঁপড়েরা যাদের স্বর্গযাত্রা মিথ্যা হয়ে গেছে তাদের সাথে তুলনা করেছেন মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত প্রোটাগনিস্টদের! অস্তিত্ব বলতে যাদের কাছে কেবল মৃত্যুহীন বিড়ম্বনার মাঝে ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়া।; নিষ্ফল জেনেও কাম্যুর সিসিফাসের মত মরচে ধরে যাওয়া জন্ম মৃত্যুর রহস্য কাঁধে নিয়ে আজন্ম বয়ে বেড়ানোই তাদের কাছে মনুষ্যজন্মের সার্থকতা।অস্তিত্বই তাদের কাছে একমাত্র সাফল্য ,অস্তিত্বই তাদের কাছে একমাত্র শীতকাল। নবারুণের জীবনদর্শনে এসে পড়েছে স্টোভ জ্বালানো ভাত বসানো আর একটা করে কামপোজ ফাইভ খেয়ে তামস শূণ্যতায় ঘুমিয়ে পড়া মানুষগুলো! যাদের কাছে জীবন মানে বারবার ছয় পড়ে পড়ে তিন ছক্কা হয়ে পচে যাওয়া,যাদের কাছে জীবন মানে লাল ঘুঁটির ঘর থেকে বেরোতে না পারা, যাদের হঠাৎই মনে পড়েছে তারা একা একা এসেছে।কেউ নেই। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। গল্প বলার কেউ নেই।গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ার কেউ নেই। কেবল প্রায়ান্ধকার বিশ্বব্রহ্মান্ডের মাঝে এক নিরুপায় হতচকিত মুক ভূমন্ডলে এই মরা পোড়া গ্রহে শরীর আড়াল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে কালো সন্তানেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি বেইমান হাওয়া ও একটি বেআইনি যাপন।এই নৈর্ব্যক্তিকতায় কোনো নির্বাচন নেই কোনো নির্দেশ নেই কেবল ক্ষতমুখগুলোকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করা কেবল অন্তর্গুহার শেষ অবধি গিয়ে দেখে আসা বিপরীত ভাগ্যের কথা।এরাই তো নবারুণের চরিত্র। যাদের বাড়ির দেওয়াল ঠিকরে শেকল তোলা দরজার ওপরের ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢোকে গলির মোড়ের মার্কারি আলোর কিছুটা, আর যারা যুগ থেকে যুগ এই মেঘের মত ঘন প্রতিফলিত আলোয় ও অন্তর্নিহিত ছায়ায় ঘুমিয়ে থাকে তাদের নিকটআত্মীয় আর সন্তানসন্ততি জড়িয়ে,তাদের ছত্রাক আর সবজীবাড়ি জড়িয়ে, সূর্যের ধমক খেয়ে প্রতিরাতে চাপ চাপ অন্ধকারে শূণ্যের মত ঝুলতে থাকা একটি জীবনভাণ্ডার জড়িয়ে। অ্যাক্রোমেগালি বা জাইগানটিজমে ভুগতে থাকা যে ছেলেটির মৃত্যু অনিবার্য সেও কিন্তু মরতে চায়না,জীবনের অব্যক্ত অংশে শেষাবধি জেগে থাকতে চায় দলভুক্ত হয়ে, যে ছেলেটির বাবা জানে তার ছেলের আসন্ন মৃত্যুর কথা সেও কপালের রগ দুহাতে টিপে বসে থাকে লাভক্ষতির খাতায় এক রহস্যময় ব্যর্থতা এঁকেও; আসলে এদের কেউই মানতে চায়না -“the major sin is the sin of being born”,কেউই মানতে চায়না জীবনের মাঝে লুকিয়ে থাকা দানবীয় শূণ্যতা,মানতে চায়না অস্তিত্বের খাঁজে খাঁজে ক্রম অঙ্কুরিত অ্যালিয়েনেশন।কেবল সব শেষ হয়ে যাচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে আর এই রিক্ততার নিঃস্বতার আত্মক্ষরণের মাঝে দাঁড়িয়ে এই অস্তিবাদী ‘আমি’ এই লাশপাচার ঘরে ঘরে নিমশব্দের ‘আমরা’, নিয়তি আরোপিত ‘আমরা’ পালন করছি বেঁচে থাকার এক মিনিটের নীরবতা।নবারুণের ছোটগল্পের উপন্যাসের বা নাটকের প্রস্তাবনার দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যাবে চরিত্রগুলি তাদের ব্যক্তিক মুক্তিকামনায় একইসাথে উৎসাহী আবার উদ্বাস্তু।‘মৃতদেহ দর্শনে’ যেন একই সাথে হাঁপাতে হাঁপাতে একটি মানুষকে ঢুকিয়ে ফেলা হচ্ছে তার নিজেরই মৃতদেহে। যে লোকটা মার্ডার হয়ে শুয়ে আছে উপুড় হয়ে যে লোকটার পায়ে সস্তার স্নিকার, কলার তোলা জ্যাকেট সে লোকটি প্লট ক্যারেকটার না হয়েও তারও মনে হতে থাকে তাকেও তো এভাবে কেউ মার্ডার করতে পারত! কেউ টু ফাইভ ফাইভ নাইন জিরো জিরো ডায়াল করে জানাতে পারত তার ছিন্ন হাত পা মৃত মুখের ব্লুপ্রিন্ট!আসলে চরিত্রের মাঝে কিছু প্রিঅকুপায়েড ইনসাইট লুকিয়ে রেখেছেন নবারুণ, যারা শেষ হওয়ার আগেই কল্পনা করছে নিজেরদের চৌচির মাথা,চরম অসহয়তা আর গন্ধময় জীবনের মাঝে অসুস্থ বড় একটা ছ্যাঁদা। ‘মৃতদেহ দর্শন’ পড়তে পড়তে আমাদের কি মনে আসে না বেকেটের ‘calmative’ গল্পের প্রথম পংক্তিটি- “I don’t know when I died’। যেন নাগাল পাওয়ার চেষ্টা বৃথা জেনেও জীবনের শিকড়লিপি খোঁজা হল্লাচিহ্ন খোঁজা।অথচ তুমি জান তুমি নেই,জন্মাবধি একটা না থাকার মাঝে নবারুণ তাঁর চরিত্রদের গুলিয়ে রেখেছেন। কে মরা কে জ্যান্ত কে ধুকপুক করছে কে নেশাখোর কে মৃগিরোগী কে ধুর কে খুন হয়েছে কে হাত পা নাড়বে কে আর উঠবেনা এসব দেখলেই বোঝা যাবে এসব সম্ভাবনা প্রথম থেকেই অস্তিবাদী অভ্যাসের মধ্যে বাঁচবার প্রবন্ধ হয়ে বসে আছে অথচ আমরা নিজেরাই বুঝতে পারছিনা জীবন আসলে একটা অ্যাজাম্পশন, পেচ্ছাপের গন্ধ মশার শব্দ আর জমিয়ে রাখা ওষুধের ফয়েলের মাঝে নীল জিরো পাওয়ারের বাল্প জ্বালিয়ে নবারুণ যাকে বসিয়ে রেখেছেন সে সম্ভব আর অসম্ভবের এক দূরহ ক্রীড়নকমাত্র।যুক্তির পরতগুলো শেষ হয়ে গেলেও সে আত্মহত্যা করেনা বরং ভেতর থেকে গলে যায় , ক্ষুৎপিপাসার শব্দ নিয়ে প্রায় পচে যাওয়া দিগ্বিজয় নিয়ে দৌড়তে থাকে অভ্যস্ত সমাজব্যবস্থার মাঝে দৌড়তে থাকে নৈতিক সংকটের মাঝে শ্বাসহীনতার মাঝে। স্যামুয়েল বেকেটের ‘ম্যালোন ডাইজে’ যেমন সর্বদাই সত্তাকে ধাওয়া করে আরও এক নির্বাপিত সত্তা, নির্বাসিত সত্তা, বেঁচে থাকার ক্ষীণ হাততালি কিংবা মৃত্যুর অন্ত্যানুপ্রাস,সেখানে মরনযন্ত্রনার মাঝে দাঁড়িয়ে জীবন কেবল এক কারুময় কোমা,বেদনাশীল জন্মের রপ্তানী কেন্দ্রে বসে বসে প্রধান চরিত্র সেখানে যেমন বলে ওঠে –“সবকটা ইন্দ্রিয় তাক করে আছে শুধু আমার দিকে, আমারই দিকে। নিষ্প্রভ, নির্বাক আর জরাজীর্ণ আমি তো ঐ ইন্দ্রিয়গুলোর একটা শিকার নই। রক্ত আর শ্বাসপ্রশ্বাসের যে শব্দ-টব্দ, আমি তো সে সব থেকে বহুদূরে, নিজেকেই নিজের কয়েদে বদ্ধ করে রেখেছি। আমার দুঃখকষ্টের কথা আমি বলবনা। সেসব দুঃখকষ্ঠের গভীরে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি, কিছুই বোধ করি না। এভাবেই বসে থেকে থেকে একদিন মরে যাব, আমার বুদ্ধু রক্তমাংসের অজান্তেই। যেটুকু দেখা যায়, চীৎকার করে, প্রচন্ড যন্ত্রনায় যে ছটফট করে-সেটা পুরোটাই হল আমার বোকা গাধা ধ্বংসাবশেষ।(ভাষান্তর-দেবতোষ মিত্র)“-“Death and death alone is what we must consult about life; and not some vague future or survival, in which we shall not be present. It is our own end; and everything happens in the interval between death and now. Do not talk to me of those imaginary prolongations which wield over us the childish spell of number; …… There is no reality, there is no true duration, save that between the cradle and the grave. The rest is mere bombast, show, delusion!”... আসলে কনসাসনেস একটা theosophical hypothesis। জীবন ও মৃত্যুর মাঝে জেগে থাকার একটা ক্রশ করোসপন্ডেন্স।তাঁর অস্তিবাদী সাহিত্যে মৃত্যুকেও তাই নবারুণ জীবনের সাবটেক্সট বা জীবনের বিনির্মাণ হিসেবেই দেখেছেন। যতবার মৃত্যুর থেকে পালাতে চাইছে তাঁর চরিত্ররা ততবারই মৃত্যুর কাছে এসে পড়ছে। অস্তিত্বকে টের পেতে অনস্তিত্বকেও পিওর ফ্লেমে দেখতে চাইছেন তিনি। মৃত্যু কেবল মাত্র একটি নিশ্চিহ্ন নয় বরং নিশ্চিন্তিও। তাই তো তাঁর চরিত্ররা মৃত্যুর পরও বলতে পারে- “ মরা চোখে দেখিতেছিলাম পৃথিবী কি সুন্দর। আমারই মত”।


সাহিত্যে অস্তিবাদের প্রশ্ন এলেই আসবে এটারনাল সাফারিংস এর মত প্রশ্নগুলোও ,আসবে ডেসটিনি বা হ্যাপিনেসের মত শাব্দিক দ্বন্ধসমাসগুলো। কিন্তু সব শেষে অস্তিবাদের শেকড় বাকড়ে সঞ্চালিত হয়ে থাকে যে মৌলিক প্রশ্নটি তা হল মানুষ এবং মানুষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে উপনিবেশ না বানাতে পারার কথা অথচ উঁপনিবেশবাদের কাছে এসে অর্জনের কাছে এসে কি নিঁখুত চূড়ান্ত এক হেরে যাওয়া মানুষ, যারা যাপনের বিপর্যস্ত রূপ দেখতে আলোর কল বসিয়েছে আর একদিন গরম আলোয় ছটফট করতে করতে মরেও যাচ্ছে কিংবা চিড়িক শব্দে ফেটে যাচ্ছে। আসলে অনুবাদ অসম্ভব এই মানুষ শব্দের, এই অস্তিত্ব নামের ভাববাষ্পের। অনুতে ধারনা করতে গিয়ে অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ছে বারংবার , বারংবার শুঁয়ো দুটো একটু নড়াতে নড়াতে স্বাধীনতার চেতনাতে অনুভূত হচ্ছে সীমিত জীবন আর ব্যক্তিসত্তার অক্ষমতার মত কেবল কিছু গলিত রসায়ন। “ইনসেক্ট ফ্ল্যাশারের’ নিচে নবারুণ যে চরিত্রগুলিকে দেখতে চেয়েছেন বারবার তারা আসলে পোকাদের আত্মীয়তা নিয়ে বেঁচে থাকা কিছু নীল লাল ফুটকির মত জীবনের অনুকৃতি, যাপনের সাবভারশন। মানুষের অস্তিত্বই ক্রমশ পীড়িত ধোঁয়াটে হতে থাকা। বেঁচে থাকা যেন অতিজীবিত পৃথিবীতে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন যা ক্রমশ ফুঁপিঁয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে,ঝুঁকে পড়ে দেখে তার জেগে থাকার , চোয়াল আলগা হয়ে পড়ার উঁপসর্গগুলি। অস্তিত্ব সেখানে ধ্রুব সত্য অথচ তারই সংজ্ঞা দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি সংকটিক দোদুল্যমানতার উপর- “Why is there Being at all. And why not rather nothing. That is the question” । হ্যাঁ এই শূণ্যতাই আসলে বারবার অস্তিত্বের পরিপূরক হয়ে উঠেছে তাত্ত্বিকের তথ্যে দার্শনিকের দর্শনে।বারংবার অস্তিবাদীরা দেখাতে চেয়েছেন অস্তিত্বের মাঝে আত্মঅতিক্রমকারী একাকীত্বের ভূমিকা। এই শূণ্যতা এই থেমে যাওয়া মানুষের মাঝে এই সর্বজনিক সীমাবদ্ধতার মাঝেই অস্তিবাদীরা বারংবার খুঁজে ফিরেছে মানুষ নামের সেই একাকী ও অ্যাবসার্ড বিন্যাসছুটটিকে খুঁজে চলেছে মার্জিন বরবার হেঁটে যাওয়া মৃত্যুমুখী পীড়িত জৈবতাগুলোকে যার চেতনাকেন্দ্রিনে যার মাটি পৃথিবীর ঘরে যার মৃত্যু ও ক্ষয়ের আধিপত্যে প্রাত্যহিক এক শব্দদন্ধ- “ নেই-নেই,- মনে হয়েছিল কবে-চারিদিকে উঁচু উঁচু গাছে/ বাতাস? না সময় বলেছে ;- ‘আছে- আছে’ ।“- চেতনার জগতের বাইরেও সামাজিক মানুষ হিসেবে মানুষ শ্রেনীর, সংঘের আর সংঘের বলেই লোভ ঈর্ষা ক্লেদ আর্তনাদ তার ভরভরন্তে বারবার ভরে দিচ্ছে অর্থহীনতার কয়েক রতি মরফিম।কথাবার্তা চলছে দৃশ্য সংস্থাপন চলছে সংলাপ চয়ন চলছে অথচ এরই মাঝে সীমিতসত্তা খুঁজে ফিরছে তার বেঁচে থাকার মূল্য খুঁজে ফিরছে তার স্বাধীনতা। কি এই স্বাধীনতা! সে কি বিশ্বাস না বুদবুদ!তার কি কোনোও স্বতন্ত্র মূল্য আছে?নাকি সে কেবল এক অলীক ধারনা? সার্বিক স্বাধীনতা কি কেবল এক পাগলামো! অস্তিবাদী অ্যাবসার্ডিটি! স্বাধীনমানুষের ধারনা থেকে তার সচেতন উঁপলব্ধির চেতনা থেকে সত্তাবাদের চূড়ান্ত অসুস্থ জগতে তার অবস্থানের আকস্মিকতা, সত্তার শ্বাসশূণ্য সঙ্গতিহীন উদ্ভটতা অবধি এই যে প্রবল আত্মঅন্বেষা সেই তো অস্তিবাদে সাহিত্যের মহাকাশ, তারই মাঝে মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছে পৃষ্ঠা জুড়ে লেখার মত তেমন কিছু না এমন কিছু। অস্তিত্ববোধের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যে “বায়োলজিকাল এক্সিজটেন্সের” কথা রবীন্দ্রনাথ বলেন তার “ Religion of Man” এ তার ভেতরেই অ্যালবের কাম্যু লুকিয়ে রাখেন “ ফিলোজফিকাল সুইসাইড”। মানুষের ভীড়ে মিশে থাকে নির্জন সঙ্গীহীন এক নায়ক। সে বিচ্ছিন্নতার সে ঘুমন্ত সব রাস্তার আর অজস্ত শরবিদ্ধ অন্ধ রক্তের। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ভীড়ে দাঁড়িয়েও নিঃসঙ্গ বিপন্নতাময় দ্বীপের মতন তারা আসলে একা । মানুষের মাঝেই মানুষের এক ভাড়াটিয়া শরীর , বেঁচে থাকার সালমা চুমকি খুঁজতে খুঁজতে যার কাছে পড়ে থাকে দেওয়াল ধরে ধরে কেবল এক দরজাবিহীন ভ্রমণকাহিনী।–এ পৃথিবী আসলে কাম্যুর সেই অবিরল শূণ্যের পৃথিবী যেখানে অস্তিত্বের প্রবাহ থাকলেও প্রত্যাবর্তণ নেই পরিত্রান নেই-যাপনের দ্বৈততাই এখানে মানুষের একমাত্র প্রতিনিধি , সিসিফাসের মত সে কেবল পাথর তুলে যাবে পারাহীন পৃথিবীতে তার প্রয়োজনটুকু জানতে আবার গড়িয়ে দেবে বেঁচে থাকার শূণ্য মঞ্জিলের দিকে সংকরায়িত নিওলজির দিকে। পৃথিবীর সব মানুষ ঠিক এখানটাতেই বন্দী, স্পষ্ট স্পষ্টতর ঢাকনাআবৃত, প্রয়োজনের পৃথিবী স্বপ্নের পৃথিবীর প্রেক্ষিতে প্রতিমূর্হুতে সে গৃহহীনতায় রিক্ত ,প্রতিমূহূর্তে সে ঘুরে মরছে আঁধার-অধিকে। চাবি হাতে প্রমান করে চলেছে তালার অস্তিত্ব খাঁচার অনুরনন , জগতের সংসৃতি থেকে মুক্তি না পেয়ে কুহকবিশ্বে নিজের ফিকে ছায়াটুকু টানতে টানতে অস্তিত্বের শীর্ণ ছাউনিটিকে বড় করে চলেছে।–আর এখানেই সে অ্যাবসার্ড,অস্তিবাদের ঠান্ডায় কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে ভিজে শীত বাড়িয়ে মরে শক্ত হয়ে গিয়েও রক্তাক্ত আত্মার সামনে দন্ডিত হয়ে রয়েছে। -“At this point of his effort man stands face to face with the irrational. He feels within him his longing for happiness and for reason. The absurd is born of this confrontation between the human need and the unreasonable silence of the world. ……………What, in fact, is the Absurd Man? He who, without negating it, does nothing for the eternal. Not that nostalgia is foreign to him. But he prefers his courage and his reasoning. The first teaches him to live without appeal and to get along with what he has; the second informs him of his limits. Assured of his temporally limited freedom, of his revolt devoid of future, and of his mortal consciousness, he lives out his adventure within the span of his lifetime.” । মহাপৃথিবীর মেকআপরুমে নীল নেগেটিভ ধরে ধরে একটি অসীম যাত্রার দিকে এগিয়ে এই মানুষ আসলে জৈব শূণ্যতার বিবিক্ত শূণ্যের। জীবনানন্দীয় নায়কের প্রাণের ধর্মে দাঁড়িয়ে সে আজও প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারে না ,বলে ওঠে- “ কাল যাহা থাকিবে না, আজ যাহা স্মৃতি হয়ে আছে,/ দিনরাত্রি- আমাদের পৃথিবীর জীবন তেমন,/সন্ধ্যার মেঘের মত মূহুর্তের রং লয়ে মূহূর্তে নূতন।“ কিংবা নবারুণের মত সে বলে ওঠেআর এখানে দাঁড়িয়েই আমরা নবারুণকে পাই কেবল একজন দার্শনিক বা সাহিত্যিক হিসেবেই নয় বরং এই সিডিউলড ধৃকথায় এই প্রতীকিবিশ্বে অস্তিত্ব যেন কেবল কিছু চিহ্ন আর চিহ্নিতের ‘ব্যাটেলিয়ন অফ মেটাফরস’। এক নিরন্তর ‘আছে’আছে’আছে’ নিয়ে মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছে অবধারিত মৃত্যুর। মৃত্যুই কি সেখানে একমাত্র স্মৃতি একমাত্র সত্য , মৃত্যু অবধিই তাদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রেখেছে অতিক্রম করার চেষ্টা করে চলেছে সিসিফাস থেকে গোডো, মালোন থেকে দীপাইয়া।


কাচ তুলে দিয়ে জীবনকে সাহিত্যকে আলাদাভাবে দেখতে চাননি নবারুণ। বরং ভেতরে ঢুকে অস্তিত্ব নামের এই অদ্ভুত অচেনা জায়গায় একটু থেমেছেন তিনি আর নড়েচড়ে উঠেছেন নিজেরই অস্থিভস্ম দেখে, কোল্ড ফায়ার দেখে। তার চারপাশের পোড়ানোর জায়গাটা ফাঁকা কারন চরিত্রদের তিনি কলার বোন ভেঙ্গে ডান হাতের কবিজ গুঁড়িয়ে চির উপবাসী জীবনের গন্ধে পুড়িয়ে প্রবেশ করিয়েছেন পৃথিবী নামের এক অন্যগ্রহে, এক বিপন্নতায় যেখানে শীতকাল বসে রয়েছে যাপনের পাশে আগুন জ্বালিয়ে নগ্নের প্রস্ফুটন নিয়ে, অনন্ত জুয়াখেলা নিয়ে।হ্যাঁ, গল্পের পরীক্ষা নিরীক্ষার বাইরে মানবিক অস্তিত্বের একটি স্বঘোষিত ব্যাকরণ নির্মানই নবারুণের সাহিত্য অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফল।গল্পের ভেতর কখনই চরিত্রদের একা প্রতীকের উৎসবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়না বরং চরিত্রের আইকন থেকে চরিত্রের শূন্যতা ও দূরত্ব সরাতে খোদ নবারুণই যেন নিজেকে আত্মঘাতী পরীক্ষায় নামিয়েছেন। সাহিত্যকে বাস্তবতার মোড়কে জড়াতে অথরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন আর পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন কিছু আত্মসত্তা, চরিত্রের সাথে মিশে যাওয়া কিছু মানবেতর চিন্তন; মানুষ একটি মূর্ত সত্তা এবং তার গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনকে স্বীকার করে কথনবিশ্বে অস্তিত্ববাদী জবানী খুঁজেছেন নবারুণ।কেবল মানবিক একাকীত্ব নয় সাথে সাথে মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও ঊঠেছে তার ল্যাংগুয়েজ অফ রিয়েলিজমে।নবারুণের অস্তিবাদী অভেদে আমরা ‘Being-in-itself’ ও “Being-for-itself” দুইয়েরই স্বচ্ছন্দচারী উপস্থিতি লক্ষ্য করতে পারি। যে গল্প নবারুন বলতে চেয়েছেন তা কেবল নবারুণের না , তা কিছু মানুষের মুখবন্ধ আর এই নিরুত্তর নির্বাক একটা ভীড় একটা জটলাকেই দীর্ঘ আরও দীর্ঘতর করে তুলেছেন চেতনার অদ্ভুতত্ব দিয়ে। পা টিপে টিপে এসে দাঁড়িয়েছেন মশাল দৌড়ের মানুষগুলোর কাছে,ধুলোর থিতিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পাশে, কান্নার হাটে বসা মানুষগুলোর পাশে আর তাদের পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন নিজের প্রকাশ। গল্পের পরতে পরতে আমরা একজন স্বাধীন নবারুণকে বারবার খুঁজে পাই যাকে কখনও আধুনিক হিমঘরে মৃতদেহের আদলে রাখা হয়েছে আবার কখনও বা পিটার গ্যাঁড়া বা গিনির মত কোনো ফ্যাতাড়ুর হাতে হালাল ঝান্ডা দিয়ে রিক্রুট করা হয়েছে শব্দের ল্যাবরেটরীতে ঢুকে নিরেট শাব্দিক প্রতিশ্রুতিকে ভেঙে ফেলার তাড়নায়। নবারুণের গল্প উপন্যাসে লেখক নবারুণের স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের থেকেও তিনি জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের মানুষটিকে সংরক্ষণ করতে চেয়েছেন বারবার।ঝুঁকে পড়ে দেখতে চেয়েছেন বেঁচে থাকার নিশ্চিতিটুকুকে। সমাজের চোখে তাঁর চরিত্রগুলি ছিন্নমূল হলেও শাশ্বত স্বাধীনতার চোখে তাদের কখনওই একা বলা যায় না।নবারুণ যেন নিজেই অস্থিরভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন প্রতিটা চরিত্রের আদলে, নিজেই যেন মনস্থ করতে চাইছেন প্রতিটা মৃত্যুর কন্ঠস্বর। শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার বিলোপ ঘটিয়ে সার্বিক জীবন অভিব্যক্তিতে অস্তিত্বগুলোকে পরিণতি দিয়েছেন নবারুণ। তাঁর গল্পের ভুবনে অস্তিত্বের অনিশ্চিতি যেমন নিশ্চিত তেমনি চেনাজানা খিদে খুঁজতে ক্ষতচিহ্ন খুঁজতে আবিষ্কারের আবহও হয়ে উঠেছে অর্থবহ। খুব সহজে ও স্বকীয়তায় তিনি চরিত্রগঠন বা কাহিনী নির্মানের মত লেখক সত্তা থেকে নেমে পড়েছেন মানুষ বিষয়ে, মানবিক কাঠামো ও পঠপরিবেশে। আর এখানেই কেবল অস্তিবাদী নীতিশাস্ত্রের বাইরে সাংগঠনিক নবারুণকে আমরা খুঁজে পাই যিনি গল্পের গনিতচেতনা থেকে বেরিয়ে পাঠকের সাথে বসেছেন অস্তিত্বের প্রাণবায়ু নিয়ে গল্প করতে। যে সত্তাবাদের কেন্দ্রে মানুষ পরিধিতে মানুষ সেই মানুষের স্বাধীনতার আর্তির আর্তনাদের সাক্ষী হতে চেয়েছেন নবারুণ। হারবার্ট থেকে শুরু করে ফ্যাতাড়ু বা কাঙ্গাল মালসাটের কল্পিত চরিত্রগুলি বা কল্পবিপ্ল্ববগুলির মধ্যে দিয়ে নবারুণের রচনাকৌশলের অপেক্ষা তার রাত জাগা অপ্রকাশিত পৃথিবীটাকে দেখতে চাওয়াই হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। অক্ষরের সাদা কালো ছবি পেরিয়ে সেখানে কোথাও নবারুণ প্রতিনিধিত্ব করছেন সামবায়িক চেতনার।আরেকটু স্পষ্ট করে দেখাতে চাইছেন শ্রেনী থেকে কেটে আলাদা করে দেওয়া মানুষগুলোকে।“ লেখকের মৃত্যু” প্রবন্ধে রোঁলা বার্ত বলেন- “ লিপি মানে কেবল কতকগুলি শব্দ বা অক্ষর দিয়ে গড়া কোনো লাইন হয় যা থেকে লেখকের ব্যক্তিসত্তা বা লেখককেন্দ্রিক কোনো বানী গ্রহণ করা যেতে পারে।আসলে তা একটি বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে যার ভেতর লেখক কেবল কিছু ভূতপূর্ব নিয়ে প্রবেশ করেন যা আসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ অভিধান,লেখক তাকে তার নিজস্ব বয়ন দিয়ে বয়ে বেড়ান অশেষ অবধি,এগিয়ে দেন অবিরাম অবধি।“- নবারুণও তেমনি ‘ ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’ বা “মসোলিয়াম” এর মত সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে দিয়েছেন অস্তিত্বের মত এক আদি ও অকৃত্রিম মানসিক বিকার, এগিয়ে দিয়েছেন পৃথিবী জুড়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দানবীয় সংকটের মাঝেও মানুষের মগ্নচৈতন্যে লেগে থাকা সাম্যবাদকে ,বিশ্বাসকে । আর এখানেই লেখকের মৃত্যুর মূল্য চোকাতে পাঠকের জন্ম দিয়েছেন নবারুণ। শূণ্য থেকে জীবনচরিত না লিখে ক্ষুধার্ত সন্তানদের আইডেনটিফিকেশন প্যারেডে নিজেই নেমে পড়েছেন গল্পের অংশ হয়ে। তাঁর যে কল্পচরিত্রদের উড়তে শিখিয়েছেন সে অ্যাবসার্ড অস্তিত্বদের উড়ুক্কু মানুষের গল্প শুনিয়েছেন, তা আসলে এক বৈপ্লবিক অভিযান এক বিস্ফোরণ। মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়েছেন পাঠক লেখকের ব্যক্তিগত ব্যবধান। রক্ষণশীল বর্ণাঢ্য সাহিত্যদর্শন থেকে বেরিয়ে এসে প্রথম থেকেই নবারুণের রচনা বাস্তব জগতের প্রতিরূপ নির্মাণে মনোযোগী হয়েছে।সাহিত্যসত্তা পেরিয়ে লোকসত্তার কাছে তাঁর সৃষ্টি মুক্তির প্রাসঙ্গিক সংগীতটিকে খুঁজেছে। সংগীত, নাকি তাঁর নিজের কথায় ‘বিস্ফোরনের ঝুঁকি’! প্রথম গল্প ‘ভাসান’ থেকেই লক্ষ্য করা যাবে প্রথার বাইরে প্রতীকী সংকেতে কিভাবে লিখিত ভাষার লিখিত আঙ্গিকের রিচুয়ালকে ভাঙ্গতে চেয়েছেন নবারুণ। একজন মৃত ব্যক্তির মুখে বসিয়েছেন জীবিতের সংলাপ জীবিতের অতলান্ত আর্তি। গতানুগতিক গল্পের প্রোসেনিয়ম মঞ্চ থেকে নেমে আসতে সৃষ্টি করেছেন কিছু ইলিউশিভ চরিত্র আর ; নবারুণের চরিত্রের প্রতিদ্বদ্ধী নবারুণের চরিত্ররা নিজেরাই, ব্যক্তিসত্তার মাঝেই তারা খুঁজে চলেছে ব্যক্তির গল্প,খুঁজে চলেছে অস্তিত্বের আপাতবিরোধ। শিল্পীর করনীয় কি কি বলতে গিয়ে কামু যেভাবে বলেন-“ নিজেকে একা রাখা শিল্পীর বিশ্বাস, কিন্তু সেই একাকীত্ব সত্য নয়। তাকে সকলের সাথে জন্মাতে হবে , মরতে হবে সকলের সাথে।তার অস্তিত্ব সকলের অস্তিত্বের সাথে একই সাথে যুক্ত ও বিচ্যুত। অপরের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি না করলে তার নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সংশয়ের অবসান হয়না। যারা এই পৃথিবীর পথে পথে কাজ করে যাচ্ছে সংগ্রাম করে যাচ্ছে তাদের সকলের সাথে একই মাটিতে দাঁড়াতে পারাই শিল্পীর জীবনপ্রয়াস। সমাজ দর্শন ইত্যাদি দিয়ে যারা বন্দী, তাদের মুক্ত করাতেই তার আনন্দ, তার অস্তিত্বের আবিষ্কার।“-তেমনি বাংলা সাহিত্যেও নবারুণকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি বধ্যভূমির মাঝে এক আশ্চর্য টার্মিনাসে,যেখানে অস্তিত্ব আন্দোলিত হয় জীবনের সহবাসে ,যেখানে স্বৈরসাহিত্যের গিলোটিনে মাথা না দিয়ে পৃথিবী আর পাওনার দাবি নিয়ে নবারুণকে শুরুর গান শুরু করতে দেখি, যেখানে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে......

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন