শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

বই নিয়ে আলাপ : শামিম আহমেদের আঠারো পর্ব

|| আরে, এ’ যেন এক নয়া ছুটিখানি মহাভারত! ||


আঠারো পর্ব; শামিম আহমেদ
সৃষ্টিসুখ প্রকাশনা এল এল পি, 
বাগনান, জিলাঃ হাওড়া, পিনঃ ৭১১৩১২; 
ISBN 978-1-62590-034-0

এ’হল ষোড়শ শতাব্দির প্রথমার্ধের কথা। গৌড়েশ্বর হুসেন শাহের অমাত্য চট্টগ্রামপতি পরাগল খাঁ মহাভারতের কাহিনি শুনে অভিভূত হন! আদেশ দিলেন সভাকবি শ্রীকর নন্দীকেঃ বাঙলায় এ’ মহাকাব্য লিখতে হবে। পরাগল নিজে এ’ কাব্যের শেষ দেখে যেতে পারেননি। পুত্র ছুটি খান বাপের এই অভিলাষ পূর্ণ করান। সভাকবি পেলেন ‘কবীন্দ্র পরমেশ্বর’ উপাধি। অমর হয়ে রইল ‘ছুটিখানি মহাভারত’। কাশীরাম দাসের আবির্ভাবের প্রায় এক শতাব্দি পূর্বের কথা এ’।


বৃদ্ধ শ্রীকর সম্পূর্ণ মহাভারতের অনুবাদ করতে সময় পাবেন না জেনে নবাব তাঁকে কেবল ‘অশ্বমেধ পর্ব’-টি ভিত্তি করেই অনুবাদের হুকুম দেন। আমাদের আজকের আলোচ্য গ্রন্থকার শামিম আহমেদের নবাব হুকুম দিয়েছেন মহাভারতের আঠেরোটি পর্বের কথা মাথায় রেখে আঠেরোটি স্বল্প-আলোচিত চরিত্রের গল্প শোনাতে, পয়ারে নয়, একবিংশ শতকের বাঙলা গদ্যে। এ’ মহাভারতে তাই ভীষ্ম-দুর্যোধন-শকুনি-অর্জুন নন, শিরোনাম পান ছন্দোদেব-শিখন্ডী-হিড়িম্বা-দেবিকা। আর, শামিমের নবাব যেহেতু শামিমের মনেই, তাই ‘একটি হাদিস ও মহাপ্রস্থান’ বা ‘শব মিলন’--- এমন অধ্যায় থাকতেও বাধা নেই।

সবচেয়ে প্রথম প্রাপ্তি এই পরিকল্পনাটাই---মহাভারতের কয়েকটি স্বল্প-পরিচিত চরিত্র বেছে নিয়ে তাদের নিবিড় গল্প। মহাভারত যে শামিমের বিলক্ষণ পড়া আছে ছত্রে ছত্রে তার প্রকাশ পেয়েছে, নৈলে ঐ অনুপুঙ্খতা নিয়ে ‘দুঃশলা’ ‘তক্ষক’ বা ‘অশ্বত্থামা’-র মত অধ্যায়গুলি লেখা যায় না। ভীমপত্নী হিড়িম্বা তো পরিচিতা, কিন্তু যুধিষ্ঠির-নকুল-সহদেবের পত্নীনাম (যথাক্রমে, দেবিকা-করেণুমতী-বিজয়া) জানতাম না; জেনে, অভিধান ঘেঁটে, শামিমের মুন্সিয়ানা মেনে নেওয়া গেল। রামায়ণ-মহাভারত নিয়ে যুগে যুগে ভাষ্য তো কিছু কম লেখা হয়নি, আজও লেখা চলেছেঃ ‘মহাভারতে যৌনতা’ বা ‘ইসলাম ও মহাভারত’---এমন শীর্ষক রচনাও চোখে পড়েছে। এ’সবের মাঝে শামিম আহমেদের ‘আঠারো পর্ব’ পাকা জায়গা করে নেবে। নবীন লেখকের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।

‘অশ্বত্থামা’ ও ‘দেবী হিড়িম্বা’ অধ্যায় দুটি সবচেয়ে মন কেড়েছে। ভীষ্ম-দ্রোণ-কর্ণ মধ্যগগনে থাকাকালীন অশ্বত্থামার যোদ্ধৃপ্রতিভা চাপা পড়ে ছিল। বিনাশকালের নিকটে এসে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠতে গিয়ে যে পথ তিনি নিলেন, এ’কালের গেরিলাযুদ্ধের নিরিখেও তাকে ঘৃণ্য মানতে হবে। তাই মস্তকে অনারোগ্য ক্ষত নিয়ে অমরত্বের আশীর্বাদ নয়, অমরত্বের অভিশাপ বয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগলেন তিনি। চমৎকার এঁকেছেন শামিম অশ্বত্থামার বেদনা।

কুন্তীদেবীর সবচে’ বড় বৌমা হলেন হিড়িম্বা, পুত্র ঘটোৎকচ তাই সর্বজ্যেষ্ঠ রাজকুমার। কিন্তু এ’ ম্যাগো, বৌ যে মাংসখেকো রাক্ষস! মা-বেটা তাই উচ্চ আর্যঘরে কখনই কল্কে পেলে না, বনে বনেই জীবন গেল। দ্রৌপদী ঘরে আসার পর থেকে ভীমও হিড়িম্বার প্রতি আকর্ষণ হারাল। ভারতের নিজস্ব আদিবাসী মানুষ, যাঁরা বিদেশী ধলা আর্যদের দাপটে জঙ্গলের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের ‘রাক্ষস’ নাম দিয়ে জনজীবনের মূলস্রোতের বাইরে ঠেলে দেওয়াটা সেই মহাকাব্যের কাল থেকেই শুরু হয়েছিল যে! চমৎকার ফুটিয়েছেন শামিম হিড়িম্বার মনোবেদনা। একই কুশীলব নিয়ে লেখা পরশুরামের ‘পুনর্মিলন’ গল্পটি মনে পড়ায়।

এ’প্রসঙ্গে একটা মহা আপত্তির কথা বলতেই হয়, সেটা শামিমের লেখার ঢং-এ’, যেটা কোথাও কোথাও ভয়াবহভাবে প্রকট হয়ে পড়েছে--উদা:, “গণেশ লেখার সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হলেন। সঙ্গে তাঁর মাউস। গণেশ ভীষণ স্মার্ট। ব্যাসদেবকে বললেন, আমার টাইম ভীষণ শর্ট। তাড়াতাড়ি বাড়ি না ফিরলে বউ বড্ড ঝামেলা করবে.....” বা, “পরীক্ষিত বললেন, তাহলে মিস্টার স্যাটেলাইটকে খবর দিন। গণেশ তাঁর মাউস স্ক্রোল করে প্রথম পাতায় চলে গেলেন...”। কী সুধী পাঠিকা, বড্ড ছ্যাবলামির গন্ধ এসে যাচ্ছে না কী? কী বললেন? মহাভারতের গল্প মানেই গুরুগম্ভীর হতেই হবে? তা কে বলেছে? পরশুরাম কী ‘রেবতীর পতিলাভ’ বা ‘ধুস্তুরি মায়া’ লেখেননি? সাহিত্যমানে কত উচ্চে তাদের স্থান, ভাবুন তো? শামিম, চটক দিয়ে রূপচাঁদ পক্ষী হওয়া যায়, একটা ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লেখা যায় না। তার জন্য গভীরতা চাই।

কয়েকটি প্রাসঙ্গিক আপত্তি এই ধরা থাকঃ ‘ঋষ্যশৃঙ্গ’ অধ্যায়টি এই কেতাবে স্থান পেল কী করে? কারণ দশরথের জামাই ঋষ্যশৃঙ্গ তো রামায়ণের চরিত্র, মহাভারতের নয়। ‘একটি হাদিস ও মহাপ্রস্থান’ অধ্যায়টি পুরো ট্যান গেছে। ব্লার্বে প্রকাশক লিখেছেন, ‘মহাভারত ভারতবর্ষের দ্বিতীয় মহাকাব্য’। এতো সহজে ‘দ্বিতীয়’ লিখে দিলেন? রোমিলা থাপার-হেন ঐতিহাসিক তো মহাভারতকে রামায়ণের চাইতেও প্রাচীনতর বলে মেনেছেন। ব্লার্বে এ’ও লেখা হয়েছে যে লেখক মহাভারতের একটি ‘তাত্ত্বিক মতাদর্শে বিশ্বাসী’ এবং তাকে ভিত্তি করেই বর্তমান গ্রন্থখানি রচনা করেছেন। আমরা কিন্তু আঠেরোটি লেখা পড়ে তাঁর এ’হেন কোনো ফল্গুবাহী মতাদর্শের হদিস পাইনি।

তরুণ কবি ও চিত্রি রোহণ কুদ্দুস মশায় প্রকাশনা ব্যবসায়ে নেমে চিরাচরিত ‘প্রাঃ লিঃ কোং’ না খুলে ‘এল এল পি’ খুলেছেন দেখেই বেশ চমক লাগল। ঠিকানাও কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় নয়, বাগনান। এইখানেই দেখ আজকের প্রযুক্তির জয়, বাগনানের এক আনকোরা প্রকাশনালয় চমৎকার ছাপাই-বাঁধাই ও এক নয়া বাঙলা ফণ্টে কী প্রেজেন্টেব্‌ল বই নিয়ে এসেছেন, যেটা আমি উত্তর ভারতে বসে কিনলাম আমাজন ডট ইন থেকে। এটা ই-বুক ফর্মেও পাওয়া যায়! বেশ বেশ। এই তো চাই। ব্যবসায়-বুদ্ধি না থাকলে সাহিত্যরস অতি শীঘ্র শুকিয়ে যায় যে---‘বঙ্গদর্শন’ উঠে যাবার পর ঋষি বঙ্কিম এটা বুড়ো বয়সে বুঝেছিলেন। আর হুগলির যুবক রোহণদাদা ব্যাঙ্গালোরে বসে এখনই বেশ বুঝে নিয়েছেন। সাবাস।

সব মিলিয়ে নতুন লেখক নতুন প্রকাশকের সওয়া শ’ পৃষ্ঠার কেতাবখানি ভাল লেগেছে। তার শুরু রোহণকৃত প্রচ্ছদটি থেকে। শামিমের শামিম (সুগন্ধ) আরও দূরতর বিস্তৃত হৌক---এই শুভেচ্ছা রইল।



২টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. এটি একটি বেশ ফালতু লেখা গ্রন্থ-সমালোচনা

    উত্তরমুছুন