শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

নবারুণ :: নিপীড়িতের সাহিত্যের অগ্রপথিক

সৌম্য মণ্ডল

নবারুণ ভট্টাচার্য, কতসালে কোথায় জন্মেছিলেন, বাবা বিজন ভট্টাচার্য, মা মহাশ্বেতা দেবী-র সাথে তার সম্পর্ক, ঋত্বিক ঘটকের হাত ধরে তার বেড়ে ওঠা, তার চাকরি, তার ৬০-৭০-এর দশক...

এসব ইতিহাসের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এগুলো জানতে হলে পাঠক নির্দ্বিধায় অন্য কোনো প্রবন্ধ খুঁজতে পারেন।

আমার কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো - নবারুণ সমস্যায় ফেলে গেলেন, আঙ্গুলে গোনা কয়েকটি মগজ - যার সাথে দৃঢ় মেরুদণ্ডের সম্পর্ক আছে, তার একটির অধিকারী ছিলেন তিনি নবারুণ চলে যাওয়াতে একটা কমে গেল। যা অপূরণীয় ক্ষতি।
তখন ক্লাস ১০ কী ১১, হারবার্ট সিনেমার মাধ্যমে প্রথম নবারুণ-এর সাহিত্যের সাথে পরিচয়। এরপর গোগ্রাসে গিলেছি একের পর এক উপন্যাস, গল্প, কাব্য গ্রন্থ। নবারুণ-এর গল্প - উপন্যাসের ফ্যাতারুরা কখন আমাদের নায়ক হয়ে গেছে, অথবা আমরাই ফ্যাতারু হয়ে গেছি, ঝকঝকে দেয়ালে বহুবার লুকিয়ে লিখে এসেছি, “প্রাসাদ গাত্রে মুতিয়া ভাঙ্গিব আইন”, বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ফ্যাতারুদের কায়দায় হামলার ছক কষেছে কযেকবার।
মনে পড়ে সিঙ্গুরে পুলিশের লাঠি-চার্জের পর ছাত্র-ছাত্রীদের ডাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিক্ষোভে এসেছিলেন নবারুণ, ২০০৬ সাল, সিপিএম বিরোধিতা তখন সেফ ছিল না। আর ঠিক সেই সময় নন্দনে কোনো একটা সরকারি মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভীড় জমিয়েছিলেন তত্কালীন সরকারি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীকুল। সেই প্রসঙ্গ উঠতেই নবারুণ দা বললেন, “এক দিকে চাষীরা মার খাচ্ছে, অন্যদিকে উনারা দাঁত কেলাচ্ছে, কবিতা পাঠ করছে, বানচোদগুলো মানুষ না অ্যামিবা!!”। সেই “অ্যামিবা”রা পরবর্তীকালে কেউ কেউ কৃষক সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, বড় বড় বাতেলা ঝেরেছে কেউ, তারপর তৃনমূলের কাছে কেউ খেতাব, কেউ জলের দরে জমি, কেউ মন্ত্রিত্ব, কেউ বা রেল দপ্তর এর এঁটো কাঁটা দপ্তরের চেয়ারম্যান হয়ে বাধ্য শিশু বনে গেছেন। কবির সুমনের ভাষায় যাকে বলে, “চার আনা - আট আনায়” বিক্রি হয়ে যাওয়া।
নবারুণ বিক্রি হননি, কারণ উনি নবারুণ, উনি উনার ঐতিহাসিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, কৃষক আন্দোলনে ডায়লগ বাজি করে, কৃষক ও রাজনৈতিক কর্মীদের লাশ ভাঙিয়ে উনি কোনো পুরস্কার পাননি। মন্ত্রী হননি ঠিকই, কিন্তু তিনি পেয়েছেন ছাত্র-ছাত্রী, প্রগতিশীল মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা, তিনি এমনই এক আদর্শ। বাকি আখের গোছানো সুশীল বাবু-বিবিদের মতো উনি ইতিহাসের পাতায় ছিচকে হিসাবে স্থান পাবেন না। অন্ততঃ তাদের লেখা ইতিহাসে।
নবারুণ ক্ষমতার মুখের ওপর না বলতে পারতেন। কর্তৃত্বকে উদ্ধত মধ্যমা দেখিয়ে মিশে যেতে পারতেন নিপীড়িত জনতার হুল্লাটে। তাই নবারুণ বেছে থাকবেন - বৈভবের মুখে গু ছোড়াদের দলে, স্ট্রিট ফাইট, বিদ্রোহে, আর উত্সবে।
নবারুণ আপোষহীন সাহিত্যিক। তবে উনি নিছকই সাহিত্যিক নন, সাহিত্য উনার এক্টিভিজম, উনার জীবনাচারে, কর্মকাণ্ডে যার প্রতিফলন। “বিভূতি ভূষণ, ক্ষুধার দলিল ও প্রসঙ্গিকতা” প্রবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, “পশ্চিমী প্রাতিষ্ঠানিক নিরিখের হিসেবে সাহিত্যের কোনো আধুনিকতার সংজ্ঞায় আমি আস্থাশীল নই। কোনো দেশ বা মহাদেশের সেরা সাহিত্যের চরিত্র গুণ বা তার শব্দ দেহ নির্মাণের বিশিষ্টতা বিচারের ক্ষেত্রেও বিলেতে - আমেরিকার পণ্ডিতদের অজস্র উচ্চারণ আমি মোটেই সর্বতসিদ্ধ বলে মনে করিনা। আমি আদ্যন্ত বিশ্বাস করি যে, গরিব দেশের সাহিত্য অর্থাৎ এই সেদিনও যারা উপনিবেশবাদের প্রত্যক্ষ জালে আবদ্ধ ছিল এবং পরোক্ষভাবে এখনো আবদ্ধ রয়েছে, তার সাহিত্য - অপমানিত, নির্যাতিত মানুষের সাহিত্য - অন্যবিধ পরিবর্তনমূলক দৃষ্টিভঙ্গির দাবি করে। আমি বিশ্বের একটি অন্যতম বিশাল জনবহুল, শোষণজর্জর ও অভুক্ত, অন্ত্যজ অধ্যুষিত দেশের সাহিত্যকর্মী... শোষণ, রাষ্ট্রীয় ও অন্যবিধ সন্ত্রাস, দুর্নীতি, উত্তর-দক্ষিণ ফারাকের মতোই নিদারুণ বৈষম্য, এখনো এই অসম উন্নত দেশের ঘাড়ে চেপে বসা একাধিক ভূত-প্রেত, এসবের সাফাই গাওয়া সাহিত্যের কাজ হিসেবে আমি মনে করিনা। পৃথিবীতে কোথাও এর পক্ষে সাফাই গেয়ে কিছু মাত্র মূল্যবান সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার জানা নেই”।
বাস্তবিকই তার সাহিত্যের মূল চরিত্র বহুতলে থাকা, দুপুরে ভাতের বদলে জিরা রাইস খাওয়া, ‘পরকিয়া প্রেম’ ছাড়া যাদের জীবনে আর কোনো সমস্যা নেই, সেই অঙ্গস নয়, বরং তার চরিত্ররা ভিখিরী, রোড রোলার বা অটো ড্রাইভার, বাউণ্ডুলে, ভবঘুরে, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, গরিব, শ্রমজীবি মানুষ। ‘ঝিন চ্যাক’ বড়লোকি মেট্রো সিটির মধ্যে তিনি আবিষ্কার করেন বিপরীত একটা শহর, তাদের জীবনের কার্নিভাল।
বিতর্ক আচ্ছে নবারুণ দার লেখার ভাষা, খিস্তির প্রয়োগ নিয়ে। অনেকে নবারুণ-এর সাথে খিস্তিযুক্ত সাহিত্যকে এক করে দেখানোর চেষ্টা করেন। তথাকথিত মধ্যবিত্ত ভাষার সুচিশীলতামূলক পূর্ব ধারণাকে বাদ রেখে যদি কেউ নবারুণ পড়েন, তবে দেখা যাবে খিস্তির কি অসাধারণ ব্যবহার! যেখানে খিস্তিগুলো আর বিচ্ছিন্ন খিস্তি থাকছে না। বাংলা সাহিত্যে অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিক রয়েছেন - যাদের উপন্যাসের এর চরিত্ররা হাগে, মোতে না, বমি করে না, রাগে গালা-গালিতে ফেটে পড়ে না। নবারুণ সেই রাস্তায় হাঁটেন নি।। তার চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষ। সাহিত্যিকের সততা, তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, তার সাহস - তার চরিত্ররা বাস্তবে যেরকম, তাদের সেরকম রাখতে বাধ্য করেছে। আবার লুব্ধকের মতো উপন্যাসে ১ টি খিস্তিও নেই। কারণ তার প্রয়োজনও ছিল না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমিতো রবীন্দ্রনাথের ভাষায় লিখব এটা হতে পারে না, আর সাম্প্রতিক মানুষের ভাষা, মানুষ যা বলে আমি তার বাইরে যাই না”।
তিনি সেই সাহিত্যিকদের মধ্যে পড়েন, যারা বাংলা সাহিত্যকে ধার্মিকসুলভ সুচিশীলতার জঞ্জাল থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। বিতর্ক আছে - তার লেখা, যাদের নিয়ে লেখেন তারা পড়ে কিনা? জনতাকে তার লেখা ভাবায় কিনা? বাস্তবিকই এই অভিযোগের মধ্যে বাস্তব সত্যতা আছে। তবে আমার মনে হয় - যারা জনতাকে ভাবাবে, নবারুণ তাদেরকে ভাবান, তাদের মাথার খিদে মেটান। নবারুণ বাজারী, চামচা সংস্কৃতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বিকল্প সাহিত্যবোধ, বিকল্প জীবনবোধের পরিচয় ঘটিয়েছেন আমাদের সাথে। আর একজন সৎ সাহিত্যিক, বাস্তব সংগ্রাম বিমুখ থাকতে পারেননা, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সিপিআই (এম-এল)-এর সাথে ছিলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি উপন্যাসে উনি লেনিন-এর মুখ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস বলিয়েছেন, “এখন প্রচার আন্দোলনের সময়, পরবর্তী বিপ্লবী জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে”। আবার তিনি ভারতে মাওবাদী আন্দোলনের প্রতিও যতেষ্ট স্নেহ, ভালবাসা, শ্রদ্ধা রাখতেন হৃদয়ে। সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে তার পা কেঁপে ওঠতো না। রাতের সার্কাস কাব্য গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “ছন্দেতে নয়, ক্ষমতা দখল চেয়ে / স্বপ্নের কুড়ি মাইনের মত ফাটছে / প্রশ্নবোধক সাতটি তারারা চেয়ে / কারা এত রাতে রাইফেল কাঁধে হাটছে!”
ভারতের গণতন্ত্র, ভোট রাজনীতি, সামন্ততন্ত্রকে বোঝার জন্য “কাক তারুয়া”র মানের ছোট গল্প ক’জনই বা লিখতে সক্ষম। বাস্তবেও যে কোনো শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসী মানুষের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি ধিক্কার জানিয়েছেন দ্বিধাহীন কণ্ঠে। ছুটে গেছেন লালগড়ে, আবেগাপ্লুত হয়ে অভিবাদন কুড়িয়েছেন হাজার হাজার বিদ্রোহী জনতার। গ্রামসিকে অনুসরণ করে বলা যায় ৫০, ৬০, ৭০, ৮০-এর দশকের শ্রেণী সংগ্রাম, সামাজিক উত্থান-পতন জন্ম দেয় নবারুণ ভট্টাচার্য দের মত জৈব বুদ্ধিজীবিদের। ঋত্বিক ঘটক সমন্ধে আলোচনায় তিনি খুবই স্পষ্ট ও সোজাসোজি বলেন, “খুব সহজ কথা কিন্তু - মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত হওয়া, গরিব মানুষের প্রতি সততা বজায় রাখা, বেশি বড়লোকের সাথে মাখামাখি করার দরকার নেই, তাতে কখনো শিল্প হয়না... দালালি হয়। এবং এগুলো হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা”।
হ্যাঁ, তার ঔদ্ধত্ব ছিল, তিনি ঔদ্ধত্ব দেখাতেন - কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে, শাসকের বিরুদ্ধে, জনতার বিরুদ্ধে নয়। তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, সাহিত্যিকদের কাছে তিনি আড্ডার বন্ধু, শুধু যাকে বেশি মাত্রায় শ্রদ্ধা করা হয়। অবাধ্য যৌবন তাদের ফ্রেন্ড, ফিলোসফার, গাইডকে হারালো। ভবিষ্যতই বলে দিবে - নবারুণ যে তরুণ সাহিত্যকর্মীদের হাতে ব্যাটন তুলে দিয়ে গেলেন, তারা সাহস, সততা, ঔদ্ধত্ব দিয়ে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আর শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন কিনা! আজ নবারুণ নেই, তবে একেকটা উপন্যাস, গল্প, কবিতা, কখন-কোথায় কোনো তরুণের বুকের গভীরে ডিনামাইট ফাটাবে, রাষ্ট্র তা কোনোদিন জানতে পারবে না।
“একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে / সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে”।।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন