শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

দীপেন ভট্টাচার্যের গল্প : প্রজাপতির স্বপ্ন

Even a bureau crammed with souvenirs,Old bills, love letters, photographs, receipts,

Court depositions, locks of hairs in plaits,
Hides fewer secrets than my brain could yield.
It’s like a tomb, a corpse-filled Potter’s field,
A pyramid where the dead lie down by scores.
I am a graveyard that the moon abhors.
- Charles Baudelaire

১. আমার স্বপ্ন
রাত তিনটের দিকে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার। গ্রীষ্মের রাত। কি স্বপ্ন যেন দেখছিলাম? মনে হল কয়েক ঘন্টা ধরে দেখলাম। কি দেখলাম মনে করতে চাইলাম। গরমে ক্পালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এ.সি.টা কি চলছে? মনে হয় না। উঠে গিয়ে ছোট জানালাটার পর্দা সরিয়ে রাস্তাটা দেখলাম। নিঝুম। সামনের লিকার স্টোরের ওপরে মিলার বিয়ারের রঙ্গীন নিয়ন বিজ্ঞাপনটা জ্বলছে আর নিভছে। জ্বলছে আর নিভছে। অনেকক্ষণ স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। স্বপ্নটা কী ছিল?


এখানে থেকে অনেক দূরে, একটা খুব শীতের জায়গা নিয়ে ছিল স্বপ্নটা। মিনিয়াপলিস, শিকাগো? বিরাট একটা ঘরে একটাই মাত্র টেবিল, তার পাশে একটাই চেয়ার। সেখানে বসা আমি। একটা খাতায় পাগলের মত কি যেন লিখে যাচ্ছি। এমনভাবে লিখছি যেন এখন না লিখলে সব ভুলে যাব। ঘরটা বোধহয় তিন কি চার তলায়। সামনে একটা বিরাট কাঁচের জানালা, বলতে গেলে সমস্ত দেয়ালটাই কাঁচের। তাই দিয়ে বাড়িটার দুপাশে বন আছে সেটা বোঝা যায়। গাছগুলো তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে। সামনে একটু ফাঁকা জায়গা, তারপর একটা রাস্তা নিচে নেমে গেছে। বাড়িটা তাহলে একটা ছোট পাহাড়ের ওপর। রাস্তাটা শেষ হয়েছে খুব কাছেই একটা রেল স্টেশনে। সেখানে একটা তিন কামরার ট্রেনও দাঁড়িয়ে। তুষার ঢাকা সবকিছু। বিকেলের পড়ন্ত রোদে সাদা তুষারে একটু লালচে ভাব আসছে।

আমি কি লিখছি? বেটা আমিলয়েড পেপটাইড!

খাতা থেকে চোখ তুলে নিচে ট্রেন স্টেশনের দিকে তাকাই। স্টেশনে একটি মাত্র মানুষ, কিন্তু এত দূর থেকেও যেন আমি তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। শীতের কালো ওভারকোট পড়া ছিল তার। কালো-বাদামী লম্বা চুল টুপির নিচ থেকে বেরিয়ে পিঠের ওপর ছড়ানো। আমার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সেই নারী। এত দূর থেকে কাঁচের ভেতরে আমাকে দেখতে পাবার কথা নয়। কিন্তু সে জানে আমি এখানে বসে আছি। তার ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের দাগ, শীতের হাত থেকে ঠোঁট বাঁচানোর সহজ উপায়। তার খয়েরী চোখ হাসছে, সে জানে আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি। তাকে কি আমি চিনি? চিনি। নিশ্চয় চিনি, নইলে সে এখানে কেন? হাত নেড়ে সে আমাকে নিচে নেমে স্টেশনে আসতে বলে। অন্ততঃ তাই আমার মনে হয়। আমি চেয়ার ঠেলে উঠতে চাই। সেই মূহুর্তেই ট্রেনের দরজা খুলে যায়, সে ট্রেনে উঠে পড়ে, আমার দিকে হাত নাড়ায়, ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়। ট্রেন ছেড়ে দেয়। কেন জানি মনে হয় এই শেষ দেখা। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে নিচে যেতে চাই, স্টেশনে। কিন্তু চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারি না। আমার পা যেন জমে গেছে, স্বপ্নের মধ্যে যা প্রায়শঃই হয়।

কিন্তু পর মূহুর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করি আর একটি ঘরে। কিন্তু অন্য কোন এক জায়গায়। এখানে গরম। জানালায় কাঁচ নেই। তার মাঝ দিয়ে দূরে সাগুয়ারো ক্যাকটাস দেখা যাচ্ছে। কোথায় আমি? আরিজোনায়? নিউ মেক্সিকোতে? কিন্তু এসব ভাবার সময় নেই। আমি এখানেও পাগলের মত কী যেন লিখে চলেছি। অ্যাপলিপোপ্রোটিন?

তারপর আরো একটি জায়গা। আরো একটি ঘর। পাগলের মত লিখে যাওয়া। লিখছি HDAC2, বারে বারে একই কথা লিখে যাচ্ছি। কিন্তু সেই জায়গাটা মনে করতে পারি না।

ঘুম ভেঙ্গে যায়। লস এঞ্জেলাস শহরের একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে আমি থাকি। জানলা দিয়ে মিলার বিয়ারের বিজ্ঞাপন দেখি। সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে চলল, কিন্তু গরম কমছে না। কাল রোববার, কিন্তু কাজে যেতে হবে। গাড়ির দোকান কোনদিন বন্ধ থাকে না। ক্রাইসলার গাড়ির দোকান, আমি একটা জানালার পিছনে বসি, ক্যাশিয়ার ও একাউনটেন্ট।

কিন্তু আমি নিউরোবিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম। আমেরিকায় এসেছিলাম পি.এইচ.ডি. করতে, কিন্তু দু বছরের মধ্যেই কি যেন একটা হয়েছিল আমার, মনেও করতে পারি না এখন আর। বিজ্ঞান পড়া হল না, কিন্তু ম্যানেজমেন্টে পড়তে ঢুকে আমার ছাত্র ভিসাটা বজায় রাখতে পেরেছিলাম।

ঘুম হবে না আর, আমি বরং স্বপ্নটা ভুলে যাবার আগে লিখে রাখি। বাতিটা জ্বালিয়ে চেয়ারটা টেবিলের কাছে নিয়ে বসি। লিখতে গিয়ে মনে পড়ল স্বপ্নে আমি পাগলের মত লিখছিলাম বেটা আমিলয়েড পেপটাইড…কী জিনিস সেটা? কম্পিউটারে নামটা লিখে অনুসন্ধান করি। অনেক কোম্পানির নাম আসে। আধ মিলিগ্রাম নাকি ২২৫ ডলার। দেখি লেখা আছে বেটা আমিলয়েড পেপটাইড - আলজাইমারে আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কে আমিলয়েড প্লেকের মূল উপাদান। প্লেক অর্থে বুঝলাম ছেঁড়া ছেঁড়া অংশ। উইকিপিডিয়ায় দেখলাম লেখা - কিছু কিছু এনজাইম আমিলয়েড প্রিকারসর প্রোটিন বা APPকে কেটে এই বেটা পেপটাইড বানায়। আর এই বেটা আমিলয়েড পেপটাইড মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষগুলোর জন্য একেবারেই বিষের মত।

কিন্তু আমি তো আমিলয়েড নামটা আগে কখনো শুনি নি। স্বপ্নে কী করে দেখলাম? আর অ্যাপলিপোপ্রোটিন? উইকিপিডিয়ায় দেখলাম এর E4 ভার্শানটি প্রোটিন কেটে আমিলয়েড বেটা পেপটাইড বানায়। তাই কারো জিনে বা অ্যালেলে অ্যাপলিপোপ্রোটিন E4 থাকলে তার আলজাইমার হবার সম্ভাবনা আছে।

আর HDAC2? হিস্টোন ডিঅ্যাসিটাইলেজ ২। এক ধরনের এনজাইম যা কিনা হিস্টোনকে অ্যাসিটাইল গ্রুপ থেকে মুক্ত করে, যাকে ডিঅ্যাসিটাইলেজ বলা হচ্ছে। আর হিস্টোন কি? এটা একটা প্রোটিন যাকে ঘিরে ডিএনএ জট পাকিয়ে রাখে। আর হিস্টোন যদি ডিএনএকে জট পাকাতে সাহায্য না করত তবে ডিএনএ এত লম্বা হত যে কোষের মধ্যে তার জায়গা হত না। হিস্টোনকে ডিঅ্যাসিটাইলেজ করলে ডিএনএর সঙ্গে তার বাধনটা শক্ত হয়। আরো তথ্য ছিল ইন্টারনেটে, কিন্তু আমি সব কিছু পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু আমার মাথায় এই সব নাম কেমন করে আসল বুঝে পেলাম না। আমি কি আলজাইমার নিয়ে কোন আর্টিকাল পড়েছি এর মধ্যে? মনে পড়ল না।


২. প্রফেসর শুভ্র
কয়েক দিন আগে আমার এক পুরোনো বন্ধু শুভ্র ফোন করেছিল, বোধহয় পনেরো বছর বাদে। কোথা থেকে যেন আমার ফোন নম্বর পেয়েছে। শুভ্রর সাথে আমি একসাথে আমেরিকায় পড়তে আসি, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে, একই বিষয়ে। আমার আর পড়াশোনা হল না, শুভ্র নিউরোবিজ্ঞানে পি.এইচ.ডি. করে জনস হপকিনসে চলে গেল পোস্ট ডকটরাল প্রোগ্রামে। তারপর থেকে ওর সাথে আর যোগাযোগ নেই। গতকাল ফোন করে বলে, আগামী সপ্তাহে আসছে UCLAতে মস্তিষ্কের ওপর একটা কনফারেন্সে, আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু তার হাতে সময় নেই, আমাকে UCLAর আশেপাশে কোথাও দেখা করতে বলল। আমি বললাম ওখানে একটা কফি বিন কোম্পানির দোকান আছে, সেখানে না হয় বসে একটু কফি খাওয়া যাবে। শুভ্র এখন পূর্ব তীরের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোবিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর। শুভ্রর কথা আমি তেমন মনে করতে পারি না, এমন কি তার ভাল নামটাও। তবে আমার গ্রাজুয়েট স্কুলের স্মৃতি প্রায় সবই অস্পষ্ট।

পরদিন রোববার কাজে বসে আগের রাতের স্বপ্নটা নিয়ে ভাবলাম। আলজাইমার রোগ, ধীরে ধীরে সমস্ত স্মৃতি, চিন্তা ও চেতনার লোপ। অবশেষে মৃত্যু। কত বছর হল বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন, অথচ এর কোন নিরাময় বের হল না। কিন্তু আমি কেমন করে এই সংক্রান্ত কিছু জিন, এনজাইম আর প্রোটিনের নাম জানলাম? কোথাও নিশ্চয় পড়েছি, হয়তো টেলিভিশনে বিজ্ঞানের প্রোগ্রাম দেখেছি। ভাবলাম এই নিয়ে একটা গল্প লিখলে হয়। মাঝে মধ্যে ছোট গল্প লিখি, এটাই আমার একমাত্র শখ। গল্প লিখে অবশ্য কাউকে দেখানো হয় না। গত পাঁচ বছরে দশখানা গল্প লিখেছি, একটা ফোল্ডারে পড়ে আছে। এদিকে অর্থনীতির মন্দা চলছে, গাড়িও খুব একটা বিক্রি হচ্ছে না, হাতে সময় আছে।

তিনদিন ধরে আমার স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে গল্পটা সাজাই। ভাবলাম শুভ্র মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করে, ওকে দিয়ে বিজ্ঞানের জায়গায় কোন ভুল আছে কিনা দেখিয়ে নেব।

পরের বুধবার শুভ্রর সঙ্গে দেখা করতে হাজির হই UCLAর কাছে ওয়েস্টউডের সেই কফির দোকানে। আমি একটু আগেই এসে গিয়েছিলাম। একটা কফি নিয়ে শুভ্রর জন্য অপেক্ষা করি। নতুন লেখা গল্প আমার ব্যাগে। গল্পটা যেভাবে সাজিয়েছি সেটা নিয়ে আমি বেশ গর্বিত। ভাবতে থাকি নিউরোবিজ্ঞানী হিসেবে শুভ্র নিশ্চয় এটা appreciate করবে। এর মধ্যেই একজন বাঙ্গালী চেহারার লোক কাঁচের দরজা ঠেকে ভেতরে ঢোকে, বুঝলাম এই হচ্ছে শুভ্র। শুভ্রর চেহারা কিরকম ছিল দেখলাম সেটা আমার একেবারেই মনে নেই। আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ি। কাছে এসে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে, ‘কেমন আছ অমল। তোমাকে প্রায় সতেরো বছর দেখি নি।’

সতেরো বছর, আমি ভাবি। সে তো অনেক দিন। আমি কি বছরের হিসাব গুলিয়ে ফেলেছি। শুভ্রকে মনে করার চেষ্টা করি, কিন্তু কিছুই মনে করতে পারি না। তখনই শুভ্রর ভাল নামটা আমার মনে পড়ল। আমি বলি, ‘তুমি এতো বড় বিজ্ঞানী, তোমাকে লোকজন কি তোমার অত বড় নামে ডাকতে পারে।’ শুভ্র বলে, ‘জানো, আমাকে সবাই হয় ডক্টর শুভ্র নইলে প্রফেসর শুভ্র বলে।’

আমি শুভ্রকে বলি, ‘আমাকে একটু আমাদের গ্রাজুয়েট স্কুলের কথা বল, আমার স্মৃতিটা এমন হয়েছে, কিছুই মনে রাখতে পারি না।’ শুভ্র হেসে বলে, ‘আমিই কি মনে রাখতে পারি। আমাদের স্মৃতি নিতান্তই selective। তুমি এক ধরণের জিনিসকে ভাল করে মনে রাখ, আমি আর এক ধরনের।’ শুভ্রর কথার মাঝে বহুদিনের বন্ধুর আন্তরিকতা ছিল। আমি বলি, ‘বিয়ে করেছ?’ ও বলে, ‘হ্যাঁ, একটি মেয়ে ও একটি ছেলে, তারা এখন স্কুল শেষ করছে।’ আমি বললাম, ‘শোন তোমার ফোন পাবার পরে আমি রাতে একটা স্বপ্ন দেখি, হয়তো তুমি মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করছ বলেই স্বপ্নটা দেখলাম, কারণ স্বপ্নটা জিন, এনজাইম এই সব নিয়ে। আমি আবার মাঝে মধ্যে ছোট গল্প লিখি। ভাবলাম তোমার বিষয়বস্তু নিয়ে একটা গল্প লিখি। তারপর তোমাকে দিয়ে পড়িয়ে ভুল ভ্রান্তি কিছু আছে কিনা সেটা দেখিয়ে নেব। খুব বেশী হলে মিনিট দশেক লাগবে, তুমি কি একটু দেখে দেবে?’ শুভ্র রাজী হল। ওকে ব্যাগ থেকে কাগজগুলো বের করে দিলাম। চশমা পড়ে নিয়ে ও পড়া শুরু করল। একটু উৎকন্ঠিত ছিলাম। এত বড় বিশেষজ্ঞ, কি ছাই-পাঁশ লিখেছি, আবার জোর করে পড়াচ্ছি। আমি পাশে রাখা একটা পত্রিকাতে চোখ বোলাতে লাগলাম।


৩. আমার গল্প
জানালা দিয়ে পাশের বনটা দেখা যায়। বনের চিরসবুজ স্প্রুস, হেমলক আর সিডার গাছের ওপর দেখা যায় দূরের ছোট ছোট পাহাড়ে এখনো তুষার জমা। ঘরটা খুব একটা বড় নয়, তার মধ্যেও জনা কুড়ি লোক। প্রফেসর স্যান্ডবার্গ অবসর নিচ্ছেন। মাত্র ৬০ বছর বয়েস, এই সময়ে এই দেশে কেউ অবসর নেয় না, এত আগে প্রফেসরের অবসর নেবার পেছনে হয়তো কারণ আছে, আমি সেটা জানি না। আজকের বিদায়ের অনুষ্ঠানে নিউরোবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান কল্ডওয়েল শ্যাম্পেনের গ্লাস তুলে স্যান্ডবার্গের উদ্দেশ্যে টোস্ট করল, ‘মানুষের ডিমেনশিয়া রোধে প্রফেসরের দানের কোন তুলনা হতে পারে না, নিউরোডিজেনেরেটিভ যত ধরণের অসুখ আছে তার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট একমাত্র স্যান্ডবার্গেই ভাল ভাবে বুঝেছেন।’ পক্ককেশ স্যান্ডবার্গ মৃদু হেসে বললেন, ‘ধন্যবাদ।’

আমি পেছনের একটা চেয়ারে অনেকক্ষণ বসে থাকি, প্রায় সবার অলক্ষে। আমি জানি এরপরে এরা শহরের কোন একটা রেস্তোঁরায় নৈশভোজে খেতে যাবে। কিছুক্ষণ পরে একজন এসে স্যান্ডবার্গকে বলল, ‘আমরা সানডে গ্রিল রেস্তোঁরায় যাচ্ছি, তোমার সঙ্গে ওখানেই দেখা হবে।’ আমি দেরি করি না, ঘর থেকে বের হয়ে আসি। ওদের অনেক আগেই পৌঁছে যাই সানডে গ্রিলে। আমার গাড়িটা পার্ক করি রেস্তোঁরার সদর দরজার সামনে, এখান থেকে কে ঢুকছে আর কে বের হচ্ছে সেটা সহজেই দেখা যায়। তারপর ভেতরে ঢুকি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজনদের জন্য কোন টেবিল রিজার্ভ করা হয়েছে জেনে কোণায় একটা ছোট টেবিল নিয়ে বসি, খাবার অর্ডার দিই। ইতিমধ্যে স্যান্ডবার্গসহ অন্য লোকেরা এসে পড়ে। দু-ঘন্টা মত তারা খুব হৈ-হল্লা করল। তারপর আস্তে আস্তে লোকজন বিদায় হতে লাগল। আমি বিল চুকিয়ে দিয়ে আমার গাড়িতে যেয়ে বসলাম। এর মধ্যে তুষার পড়া শুরু হল। স্যান্ডবার্গ যখন বের হল তখন প্রায় সবাই চলে গিয়েছে। এক্জন রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে স্যান্ডবার্গের সাথে কয়েক মিনিট কোন একটা ব্যাপারে কথা বলল, বিজ্ঞান নিয়েই বোধহয়।

ঐ লোকটি বিদায় নিয়ে গেলে আমি গাড়ি থেকে বের হই। স্যান্ডবার্গ তার গাড়ি রেস্তোঁরার পেছনে পার্ক করেছিল। আমি তাকে অনুসরণ করি। সাদা তুষার স্যান্ডবার্গের কোটে লেগে থাকে। রেস্তোঁরার পেছন দিকটা নির্জন। আমি ডাক দিই, ‘প্রফেসর স্যান্ডবার্গ!’ স্যান্ডবার্গ দাঁড়ায়, আমার দিকে তাকায়। ‘ইয়েস?’ তার উত্তরে বিস্ময়। ‘প্রফেসর, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি আপনার এক্জন প্রাক্তন ছাত্র।’ এই বলতে বলতে খুব কাছে চলে আসি। স্যান্ডবার্গ চশমার কাঁচের মধ্যে দিয়ে আমাকে চিনতে চেষ্টা করে। ‘আমার নাম মাক্সওয়েল জোনস,’ আমি বলি।

প্রফেসরের মুখে মনে হল একটা ভীতির চিহ্ন দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। সামলে নিল সে। বলল, ‘ম্যাক্সওয়েল?’

এত দূর এসে আমি পিছিয়ে যেতে পারি না। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ প্রফেসর, ম্যাক্সওয়েল। আমাকে ভুলে যাবার কথা নয় আপনার, প্রফেসর।’

‘তুমি কি চাও, ম্যাক্সওয়েল?’

‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে।’

‘ঠিক আছে, আমার অফিসে আগামী সপ্তাহে এস।’ প্রফেসরের চোখে আবার যেন ভীতির একটা ঝলক দেখা গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন আর কেউ আশেপাশে আছে কিনা।

‘প্রফেসর, আমার কথাটা খুব জরুরী। আমি আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারব না,’ আমার কথায় ধৈর্যের অভাব।

‘তাই?’ তার গলার স্বরে এবার আতঙ্ক স্পষ্ট।

‘হ্যাঁ প্রফেসর। আমি পনেরোটা বছর এর জন্যে অপেক্ষা করেছি। এই পনেরো বছর আমার রাতে ঘুম হয় নি। আর আমি অপেক্ষা করতে পারব না।’

‘তুমি কি এই ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে কথা বলবে?’

‘না, প্রফেসর, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে।’

‘তোমার মাথা খারাপ হয়েছে, ম্যাক্সওয়েল। তুমি কি আমাকে অপহরণ করতে চাও?

‘অপহরণ একটা খারাপ শব্দ প্রফেসর। আপনাকে আমি আমার জীবনের গল্প শোনাতে চাই।’ প্রফেসরকে কি কি বলতে হবে সেটা আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম।

‘আমি তোমার সঙ্গে যাব না।’

‘আপনাকে তো যেতেই হবে প্রফেসর। এ বিষয়ে আপনার কোন choice নেই।’ আমি পকেট থেকে পিস্তলের বাঁটটা একটু ওপরে উঠিয়ে আনি, স্যান্ডবার্গ সেটা লক্ষ করে।

আমার গাড়ির কাছে স্যান্ডবার্গকে নিয়ে আসি। ‘আপনি গাড়ি চালান,’ বলি তাকে।

স্যান্ডবার্গ বাধ্য ছেলের মত কথা শোনে। গত কয়েক মাস হল একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছি, তিনটে ঘর, তার মধ্যে একটা ঘরকে সাজাতে হয়েছে ল্যাবের যন্ত্রপাতি দিয়ে। এক তলায় অ্যাপার্টমেন্ট, আমাদের কেউ ঢুকতে দেখে না। স্যান্ডবার্গকে দ্বিতীয় ঘরটাতে ঢুকিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে তার হাত পা দড়ি দিয়ে চেয়ারের সাথে বাঁধি।

‘তুমি এই কাজটা কেন করছ সেটা কি আমি জানতে পারি,’ স্যান্ডবার্গের গলার স্বর শান্ত। ব্যাটা সেয়ানা আছে, মনে মনে বলি। কিন্তু তার কথা আমাকে রাগিয়ে দেয়।

‘তুমি জান না কেন এই কাজটা করছি। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে বল যে তুমি সত্যিই জান না।’ রাগে আমি কাঁপতে থাকি। ‘তুমি আমাকে চিনেছ তারপরও তুমি জিজ্ঞেস করছ কেন আমি তোমাকে বাঁধছি।’

স্যান্ডবার্গ চুপ করে যায়। সে ঠিকই জানে কখন চুপ করতে হয়। ওর মুখটা বেঁধে দিয়ে বাইরে আসি। আমার এখন করণীয় কি? আমি যে পদক্ষেপ নিয়েছি তার থেকে যেন আর বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। এত বছরের জমানো ক্ষোভ, দুঃখ, অপমান, ব্যথা আমাকে যেন অমানুষ করে দিয়েছে।

শোবার ঘরে ঢুকে ছবিগুলো নিয়ে আবার ফিরে আসি। স্যান্ডবার্গকে ছবিগুলো দেখাই। প্রায় সতেরো বছর আগের ছবি। স্যান্ডবার্গের সাথে আমি, লরেনেরর সাথে আমি, লরেন, আমি আর স্যান্ডবার্গ। আমি বলি, ‘প্রফেসর, তোমাকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতাম। জীবন দিয়ে বিশ্বাস করতাম। তুমি শুধু সেই বিশ্বাস কেড়েই নাও নি, আমার জীবনকে নিংড়ে তার যা কিছু আছে সব নিয়ে গেছ।’

স্যান্ডবার্গের দৃষ্টি উদভ্রান্ত মনে হয়। কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু সে অনেক বলেছে, বাইরের জগতের বাহবা কুড়িয়েছে, আজ আমার বলার সময়। ‘এই ছবিগুলোর দিকে তাকাও,’ আমি বলি। ‘কি রকম জীবন ছিল আমাদের? লরেনকে মনে পড়ে?’ এই বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি আমি।

‘কিন্তু তাকে আমার মনে পড়ে না। তুমি আমার সব স্মৃতি কেড়ে নিয়েছ, প্রফেসর। সব। এক তরুণ ম্যাক্সওয়েল জোনস তোমাকে বিশ্বাস করেছিল, সেই বিশ্বাসের বদলে তুমি তাকে স্মৃতিভংশ করেছে। আমার ওপর এক্সপেরিমেন্ট করেছ। ইঁদুরের ওষুধ আমার ওপর প্রয়োগ করেছ। শুধু এক্সপেরিমেন্টই কর নি, তুমি লরেনকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছ। তারপর তাকে ফেলে দিয়েছ। তুমি জান লরেন আত্মহত্যা করেছে।’ এক নিঃশ্বাসে বলি কথাগুলো।

স্যান্ডবার্গের চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে, পাগলের মত মাথা ডানে আর বাঁয়ে নাড়াতে থাকে। আমি তার মুখের বাধন খুলে দিই। সে চিৎকার করে ওঠে, ‘তুমি থাম, ম্যাক্সওয়েল, তুমি সব গুলিয়ে ফেলেছ। এখনই থাম কোন বড় ক্ষতি করার আগে। আমার কথাটা শোন।’

তার কথা শোনার মত আমার আর ধৈর্য ছিল না। এই লোকটি শুধু আমার ক্ষতি করে নি। আমাদের আগে ও পরে অনেক ছাত্র আর ছাত্রীর জীবন নষ্ট করে দিয়েছে।

স্যান্ডবার্গ বলে, ‘HDAC2 এনজাইমের কথা তোমার মনে পড়ে না, ম্যাক্সওয়েল। মনে করার চেষ্টা কর। তোমার স্ত্রীর নাম ছিল অ্যালিস। লরেন না। তোমার আর অ্যালিসের একটি বাচ্চা মেয়ে ছিল। মার্গারেট নাম ছিল তার, সুন্দর ফুটফুটে ছিল তোমাদের কন্যাসন্তান। চার/পাঁচ বছর হবে তখন তার বয়েস। তোমরা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলে হাইওয়ের ওপর, একটা বড় ট্রাক উল্টে পড়ে তোমাদের গাড়ির ওপর। অ্যালিস আর মার্গারেট ওখানেই মারা যায়। কিন্তু তোমার শরীরে কোনই আঘাত লাগে না। এই দুর্ঘটনার জন্য তুমি নিজেকে দায়ী কর, বারে বারে আত্মহত্যা করতে চাও। তুমি আমাকে এসে বল এমন কিছু করতে যাতে তোমার ব্যথার স্মৃতি মুছে যায়।’

বলাই বাহুল্য আমি স্যান্ডবার্গের একটা কথাও বিশ্বাস করলাম। আমার কোন কন্যাসন্তান ছিল না, তবে মার্গারেট নামটা যে আমার পছন্দ সেটা অস্বীকার করব না। আর আমার স্ত্রীর নাম ছিল লরেন।

কিন্তু স্যান্ডবার্গ বলে চলে, ‘তুমি আর আমি দুজনে মিলে এই সময়ে ইঁদুরের মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করছিলাম। তোমার পি.এইচ.ডি.র গবেষণাই ছিল কেমন করে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি সৃষ্টি হয় তার ওপর। কিন্তু সাথে সাথে অল্পমেয়াদী স্মৃতি দীর্ঘমেয়াদী হতে কী কী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায় সেটাও আমরা বার করা চেষ্টা করছিলাম। আমরা বের করতে পেরেছিলাম যে হিস্টোন ডিএসিটাইলাইজ বা HDAC নামের জিনটা ডিমেনশিয়া, আলজাইমার এই সমস্ত স্মৃতিধ্বংসাত্মক রোগের জন্য আংশিক ভাবে দায়ী হতে পারে। HDAC জিনটা যেন কাজ করতে না পারে সেই জন্য আমরা বিভিন্ন ড্রাগ বা inhibitor তৈরি করছিলাম। দেখা গেল এটা যুদ্ধ থেকে ফেরা সৈনিক, দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া কিংবা নিকটজনকে হারিয়েছে এমন লোকজনদের জন্যেও কাজে লাগে। অর্থাৎ post traumatic stress disorder বা PTSD যাদের আছে তাদের জন্য। এদিকে HDAC2 জিনটাকে যদি কাজ করতে দেওয়া না হয় তবে পুরোনো স্মৃতিকে ধ্বংস করে তার ওপর নতুন স্মৃতি গঠন সহজ হয়ে যায়। পুরোনো ব্যথার স্মৃতি থেকে তুমি মুক্ত হতে পার। কিন্তু আমরা শুধু সেটা ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করেছিলাম। এদিকে তুমি অ্যালিস আর মার্গারেটের মৃত্যুতে প্রায় পাগল হয়ে গেলে। তুমি বললে তোমার পুরাতন স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে। আমি রাজি হই নি। কিন্তু তুমি নিজে প্রতি রাতে ল্যাবে এসে সেই ইনহিবিটর নিতে। মনে পড়ে, মনে পড়ে তোমার।’

স্যান্ডবার্গের কথার মধ্যে কোন কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু আমি জানতাম সে এরকম লোক যে কিনা সহজেই মানুষকে বশ করতে পারে। এমন কথা আমি লোকজনের মুখে শুনেছি।

আমি দু-কান চেপে চিৎকার করে উঠি, ‘তুমি থাম, তুমি থাম। তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা করছ। পনেরোটা বছর আমি এর জন্যে অপেক্ষা করেছি। তুমি আমাকে এখন মিথ্যে বলে নিরস্ত করতে পারবে না।’

স্যান্ডবার্গ তার কথা থামায় না। ‘আমার কথা না মেনে তুমি নিজেই ইঞ্জেকশন করে হিনহিবিটরটা শরীরে ঢোকাতে। কিন্তু শুধু স্বল্পমেয়াদী স্মৃতির বদলে সেটা তোমার সমস্ত স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে দিল। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট ব্যাপারটা জেনে ফেলল। তারা আমার গবেষণার ল্যাব বন্ধ করে দিল। আমাদের সমস্ত কাজ বিফলে গেল। তুমি জান কিনা জানি না, এই গবেষণাই দশ বছর পরে MITর ল্যাবে করা হয়। তাদের এখন অনেক নাম ডাক, আর আমাদের কাজটার কথা কেউ জানল না।’

স্যান্ডবার্গ যে আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে তা আমি জানতাম। আমাকে ইচ্ছে করে রাতে কাজ দিয়ে আটকে রাখত, শনিবার, রোববার কাজে ডেকে নিয়ে আসত। অনেক সময় আমাকে ডেকে নিজে থাকত না। পরে আমি বুঝেছি ঐ সময়টা লরেনের সাথে কাটাতো। আমি পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে আনি।

আবারো চিৎকার করে ওঠে সে। ‘তুমি একবার আমার কথা শোন। তোমার ঘরে কম্পিউটার আছে, ইন্টারনেট আছে। না থাকলে আমার পকেটে মোবাইল আছে। তুমি একটি বার ইন্টারনেটে অনুসন্ধান কর। দেখ বছর পনেরো আগে অ্যালিস আর মার্গারেট নামে কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেছে কিনা। তবে পনেরো বছর আগের সব কাহিনী হয়তো তুমি লেখা পাবে না।’

আমি পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখি। ঠিক আছে, অসুবিধা কি। কয়েক মিনিটের তো ব্যাপার। শোবার ঘর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে আসি। প্রথমে লরেনের নাম লিখে অনুসন্ধান করি, কিছু আসে না। তারপর অ্যালিস আর মার্গারেটের নাম লিখে দেখি। সেখানেও কিছু নেই। সব ধোঁকা। আমি এই প্রফেসরের শঠতা জানতাম। আক্রোশে আমার গলার স্বর বদলে যায়, ‘আমাকে এই সব বলে এখন তুমি পার পাবে না স্যান্ডবার্গ।’

স্যান্ডবার্গ বলে, ‘আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে ওদের নাম তুমি ইন্টারনেটে পাবে না। আমার পক্ষ থেকে আমি শেষ চেষ্টা করব। তোমার কাছে অ্যালিসসহ তোমার কোন ছবি আছে?’ আমি বললাম, ‘মানে লরেনসহ?’ স্যান্ডবার্গ মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, লরেনসহ।’ আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে প্লাস্টিকে মোড়া ছবিটা স্যান্ডবার্গকে দেখাই। সে বলল, ‘ঠিক আছে। এখন তুমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে যাও।’

আমি আর সময় নষ্ট করতে চাইছিলাম না। তবু কেন জানি আমার পুরোনো উপদেষ্টার কথাটা উপেক্ষা করতে পারলাম না। তার ওয়েবসাইটে গেলাম। স্যান্ডবার্গ বলল, ‘এবার ঠিকানার জায়গায় /ম্যাক্সওয়েল যোগ কর। এই পাতাটা আমার সূচীতে নেই, তাই সবাই যেতে পারে না।’

স্যান্ডবার্গ আমার নামে ওয়েবে একটা পাতা রেখেছে?

পাতাটায় একটা মাত্র ছবি। একটা ছোট ঘর, একটা কফি টেবিল, এক পাশে বড় ওভেন/স্টোভ, তার সামনে দাঁড়িয়ে লরেন রান্না করছে, কফি টেবিলের পাশে দুটি নিচু চেয়ারে স্যান্ডবার্গ ও আমি বসে আছি। লরেনের মুখ ক্যামেরার দিকে ঘোরানো, হাস্যোজ্জ্বল। আর আমার কোলে একটি ছোট বাচ্চা মেয়ে।

স্যান্ডবার্গ বলল, ‘তোমার ঐ বাচ্চা মেয়েটিকে মনে পড়ে। সে ছিল তোমার খুব আদরের জিনিস। তাকে ভোলার জন্যই তুমি HDAC2 ইনহিবিটর নিয়েছিলে। কিন্তু তাকে তুমি এমন ভাবেই ভুলেছ যে তার অস্তিত্বকে তুমি এখন অস্বীকার করছ।’

আমি স্যান্ডবার্গের সামনের চেয়ারটাতে বসে পড়ি। শুধু বিড়বিড় করে বলি, ‘মনে পড়ছে, মনে পড়ছে, আমার এখন মনে পড়ছে। মার্গারেট তোমাকে আমি কেমন করে ভুলে গেলাম।’

ম্যাক্সওয়েলের এক তলার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দূরে, প্রায় দশ মাইলে দূরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্ট। সেই ডিপার্টমেন্টের বেসমেন্টে একটা ছোট ঘর। এই ঘরটার অস্তিত্ব সবাই জানে না। ডিপার্টমেন্টের এক্জন পি.এইচ.ডি. ছাত্র ডেভিড ডিয়াজ সেই গভীর রাতে একটা কম্পিউটার মনিটারের সামনে বসে আছে। সেই মনিটারে ম্যাক্সওয়েল জোনসের ঘরটা দেখা যাচ্ছে। ডেভিড দেখছে ম্যাক্সওয়েল স্যান্ডবার্গের হাত ও পায়ের বাধন খুলে দিচ্ছে। ম্যাক্সওয়েল বলছে, ‘আমি খুব দুঃখিত প্রফেসর স্যান্ডবার্গ। আমি জানি না কেন আমি এই কাজটা করতে গেলাম। কি হয়েছে আমার?’ ডেভিড ডিয়াজ টেবিলের ফোনের হাতলটা তুলে কাকে যেন ফোন করল, ও-পাশ থেকে কেউ ফোন ধরলে বলল, ‘প্রফেসর কল্ডওয়েল, ম্যাক্সওয়েল জোনসকে দিয়ে কাজটা করানো গেল না।’


৪. প্রজাপতির স্বপ্ন
গল্প এখানেই শেষ। শুভ্র চোখ তুলে বলল, ‘ব্যস। কি হলে শেষে?’ আমি বললাম, ‘ম্যাক্সওয়েল অ্যালিস আর মার্গারেটের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছিল না। এই জন্য সে স্যান্ডবার্গের কথা অমান্য করে নিজেই HDAC2 ইনহিবিটরের ইঞ্জেকশন নেয়। এতে তার প্রায় সব স্মৃতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তার আর পি.এইচ.ডি. হয় না। এদিকে ডিপার্টমেন্টের চেয়ার কল্ডওয়েলের সঙ্গে স্যান্ডবার্গের খটমট ছিল। কল্ডওয়েলের কিছু অসাধুতা স্যান্ডবার্গ সবাইকে জানিয়ে দেবে বলে হুমকি দিয়েছিল, তাই কল্ডওয়েল স্যান্ডবার্গকে খুন করার একটা পরিকল্পনা করে। ম্যাক্সওয়েল যে স্মৃতিভ্রংশ সেটা কল্ডওয়েল জানত। সে ম্যাক্সওয়েলকে খুঁজে বার করে শহরে আবার নিয়ে এসে সেই অ্যাপার্টমেন্টে তোলে। তারপর নাজুক ম্যাক্সওয়েলকে কোন ভাবে বোঝায় যে তার স্মৃতিভ্রংশের জন্য স্যান্ডবার্গই দায়ী। শুধু তাই নয় স্যান্ডবার্গ তার স্ত্রীকে ফুসলে নিয়ে গেছে। নিজের স্ত্রীকে ম্যাক্সওয়েলের মনে ছিল না। কল্ডওয়েল ম্যাক্সওয়েলকে বলে তার স্ত্রীর নাম লরেন যাতে ম্যাক্সওয়েল অ্যালিস নাম দিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান না করতে পারে। কল্ডওয়েল আরো বলে যে, লরেন পরে আত্মহত্যা করে।

‘সাংঘাতিক ব্যাপার, কিন্তু পাঠক কি এত সব বুঝতে পারবে?’ শুভ্র জিজ্ঞাসা করে।

‘আমি ঠিক জানি না,’ আমি বলি। ‘আমি গল্পের শুরু করেছিলাম এরকম একটা প্যারাগ্রাফ দিয়ে, পরে সেটা আবার মুছে দিই। তুমি এটা পড়ে দেখ।’ এই বলে আমি আর একটা কাগজ শুভ্রর দিকে এগিয়ে দিই। সেখানে লেখা -

“ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান ক্রিস কল্ডওয়েলের বয়স মাত্র পঞ্চাশ, উচ্চাভিলাষী। সেই উচ্চাভিলাষের পথে কাউকে পায়ের নিচে মাড়াতে বা অসাধু পন্থা অবলম্বন করতে সে পিছ-পা হয় না। ডিপার্টমেন্টের অন্যান্যরা কল্ডওয়েলের অসততা দেখেও দেখে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর থেকে থেকে আরম্ভ করে ন্যাশানাল সাইন্স ফাউন্ডেশন পর্যন্ত কল্ডওয়েলের প্রভাব। তাকে কেউ ঘাঁটাতে চায় না। স্যান্ডবার্গ দু-একবার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে ছেড়ে দিয়েছে, পরে নিজের নীতি বজায় রাখতে ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

তারপর বলি, ‘এটা দিয়ে আমি স্যান্ডবার্গের অবসর গ্রহনের অনুষ্ঠানটা শুরু করেছিলাম। পরে ভাবলাম পাঠক বুঝে যাবে যে ম্যাক্সওয়েল হয়তো কল্ডওয়েলের কারসাজিতে পড়েই অপহরণ ও খুনের পরিকল্পনা করছিল।’

‘হ্যাঁ, বুঝলাম,’ বলে শুভ্র। তারপর বলে, ‘কিন্তু এই গল্পটা তো নতুন নয়। এরকম অনেক প্লট বহুবছর ধরে বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। Eternal sunshine of the spotless mind দেখেছ না, কিংবা Memento? তোমার এই গল্প তো চুরি করা।’

‘চুরি করা’ কথাটা বলে মনে হল শুভ্র একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ‘চুরি করা’ আমি যেন যান্ত্রিকভাবে কথাটা পুনরাবৃত্তি করি। ‘আমি চুরি করেছি?’ কথাগুলো বলতে বলতে শুভ্রর চোখের দিকে তাকাই। তার কালো চোখের তারায় দোকানের প্রতিফলন দেখি, আমাকেও যেন দেখি। তারা চোখের মণির কালো তারারন্ধ্রে মনে হয় লুকিয়ে আছে অনেক দিন আগের ভুলে যাওয়া স্মৃতি। অন্ধাকার গহ্বর থেকে মনে হয় উঠে আসে হঠাৎ আলোর ঝলকানি। সাথে সাথে আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। রাতের আঁধারের পর ভোরের সূর্যের মত। ‘সাহানা,’ আমি আবার বললাম, ‘সাহানা। আমার স্বপ্নে সেই সন্ধ্যার তুষারের মধ্যে ট্রেন স্টেশনে সাহানা দাঁড়িয়ে ছিল আমার জন্য। কিন্তু আমি তার কাছে পৌঁছাতে পারি নি। কেন?’ তারপর আমি শুভ্রর চোখের দিকে তাকালাম, বললাম, ‘সাহানা কেমন আছে, শুভ্র?

‘সাহানা?’ কেঁপে যায় শুভ্রর গলা। দুদিকে তাকায়, পালাবার যেন পথ পায় না। তারপর বলে, ‘ভাল আছে।’

মহাকর্ষের অমোঘ আকর্ষণ আমাকে যেন ধীরে ধীরে সময়ের কোন গভীর বিছানায় শুইয়ে দিল। আমি অস্ফূট স্বরে বললাম, ‘এক সন্ধ্যায় আমার সাহানার সঙ্গে আমাদের রেল স্টেশনে দেখা করার কথা ছিল। আমাদের কোথায় যেন যাবার কথা ছিল। কোন ক্লাসিকাল কনসার্টে। আমি কাজে আটকে গেলাম, যাওয়া হল না। সেদিনে সারা সন্ধ্যা তুষার পড়ছিল।’

শুভ্র চেয়ারটা পেছনে ঠেলে ওঠার চেষ্টা করে।

আমি আমার ডান হাত দিয়ে ওর বাঁ হাতটা ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিলাম। আমি কথা বলতে থাকি, নিজেই বুঝি না সেই কথাগুলো কোথা থেকে আসছে। আমি বলি, ‘সাহানা কোথায় যেন চলে গেল, শুভ্র? আর জেকবসন, আমাদের পি.এইচ.ডি. advisor? এখন আমার মনে পড়েছে, শুভ্র। আমি ও জেকবসন HDAC2 ইনহিবিটর দিয়ে যে PTSD থেকে মানুষকে মুক্ত করা যায় সেটা আবিষ্কার করেছিলাম। না, না, মানুষ নয়, আমাদের এক্সপেরিমেন্ট ছিল ইঁদুরের ওপর। কিন্তু তুমি?’

এটুকু বলে আমি আবার শুভ্রর দুটি চোখের তারারন্ধ্রের দিকে তাকাই। সেখানে অতল গহ্বর তখনো বিরাজ করছে। কিন্তু আমি যেন একটা দড়িতে টান দিয়ে সব লুকিয়ে রাখা স্মৃতির বাক্স টেনে টেনে তুলছি।

আমি বলতে থাকি, ‘তুমি আমার প্রাণের বন্ধু ছিলে, যাকে বলে বেস্ট ফ্রেন্ড। তুমি আমাকে convince করলে ইঁদুরের ওপর যা কাজ করে সেটা মানুষের ওপর ঠিকমত কাজ করে কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্য। তুমি বললে আমরা দুজন একসাথে হিনহিবিটরের ইঞ্জেকশন নেব, কিন্তু জেকবসন যেন জানতে না পারে।’

শুভ্র তার হাতটা আমার মুঠি থেকে ছাড়াতে চেষ্টা করল। সে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল, ‘তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, অমল, কি সব যাতা বলছ, হাতটা ছাড় আমার। আমরা দুজনেই যদি ইনহিবিটর নিতাম তাহলে তো দুজনেরই স্মৃতিভ্রংশ হত।’

আমি কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলাম, বললাম, ‘কিন্তু তুমি সেই ইনহিবিটর ইঞ্জেকশন নাও নি, শুভ্র। আমি নিয়েছি, তুমি নাও নি। তুমি ভান করেছ যে নিয়েছ, কিন্তু নিজে নাও নি। মাঝখান থেকে আমি HDAC2 ইনহিবিটর নিয়ে পাগল হয়ে গেলাম, ধীরে ধীরে আমি সব ভুলে গেলাম। ইঁদুরের ওপর যা কাজ করেছে মানুষের ওপর তা করে নি, অথবা তুমি আমার জন্য ইনহিবিটরের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলে। আমার পড়াশোনা আর হল না, সাহানাও কোথায় চলে গেলে। আজ বুঝলাম সে তোমার সাথেই গিয়েছে। ম্যাক্সওয়েলের গল্প কেমন করে সত্যি হল, শুভ্র?’

শুভ্র আবার ওর হাত ছড়াতে চেষ্টা করে। আমি তাও জোর করে ধরে রাখি। আশেপাশের লোকজন আমাদের দিকে তাকায়। আমি বলি, ‘তোমার টেলিফোন নিশ্চয় আমার মনের কোণের কোন সুপ্ত স্মৃতিকে জাগিয়েছে। আমার মাথায় হিপক্যাম্পাসে স্নায়ুর কাছে প্রিওন প্রোটিন স্মৃতি ধরে রেখেছিল আমারই মনের অজান্তে। সেই রাতে তাই আমি স্বপ্ন দেখি। আর আজ তুমি বললে আমার গল্প চুরি করা। সেই কথা শুনে, তোমার চোখে আমার প্রতিবিম্ব দেখে তারা সব জেগে উঠেছে। কে কার থেকে কি চুরি করেছে, শুভ্র?’ শুভ্র তার হাতটা আমার মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে।

‘কিন্তু কেন তুমি এত বছর পরে ফিরে এলে,’ নিজের অজান্তে আমার চোখ দিয়ে জল গড়ায়, ‘তোমার এক্সপেরিমেন্টে কি ফল হয়েছে দেখার জন্য? খুনী যেমন কৌতূহল ত্যাগ না করতে পেরে খুনের জায়গাটায় আবার ফিরে আসে। আমার দুর্দশা দেখার জন্য? নাকি বিজ্ঞানী হিসেবে হিনহিবিটরের ফলাফল দেখার জন্য।’

শুভ্র আর দাঁড়ায় না। প্রায় দৌড়ে দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যায়। আমার আর করার কিছু ছিল না। শুভ্রকে ধরে আর লাভ নেই, যে জীবন চলে গেছে তাকে ফেরানো যায় না। শুভ্র রাস্তা পার হয়ে আমার দৃষ্টিগোলকের বাইরে চলে গেল। তার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে চীনদেশের মাস্টার দার্শনিক ঝুয়াংঝি বলেছিলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমি রঙ্গীন প্রজাপতি, ঘুরে বেড়াচ্ছি ফুলে ফুলে পাতায় পাতায়। ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি আমি মানুষ। নাকি আমি আসলেই প্রজাপতি যে কিনা ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখছে যে সে মানুষ।’

আমার প্রজাপতির কাহিনীও শেষ এখানে। আমি ফিরে গেলাম আমার দৈনন্দিন কাজে, ক্রাইসলার গাড়ির দোকানে। বহুদিন পরে ইন্টারনেটে এক দর্শনের পাতায় দেখলাম লেখা যে, বিশেষজ্ঞরা নাকি ঝুয়াংঝির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান। এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক পরে, তৃতীয় শতকে, কুয়ো শিয়াং নামে একজন টাও দার্শনিক নাকি প্রজাপতি নিয়ে একই কথা বলে গেছেন। সেখানে আরো লেখা আছে যে, ঝুয়াংঝি নিজেই নাকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না।

শুভ্র, সাহানা আর HDAC2র স্মৃতি আবারো ধীরে ধীরে আমার মন থেকে মুছে যেতে লাগল। স্মৃতি বিস্মরণ মানুষের অস্তিত্বকে জীবজগতের বাইরে নিয়ে যায়। তুষার সন্ধ্যায় ট্রেন স্টেশনে সাহানার স্বপ্ন আমি আর দেখি না।



লেখক পরিচিতি
ড. দীপেন (দেবদর্শী) ভট্টাচার্য

 জন্ম ১৯৫৯ সালে। আদি নিবাস টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায়।

ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটে গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা-রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশুন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দূরবীন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় রিভারসাইড কলেজে অধ্যাপক। 

দীপেন ভট্টাচার্য বাংলাদেশের বিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ্ভাবে যুক্ত। ১৯৭৫ সাথে বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ছাড়াও তাঁর নিওলিথ স্বপ্নঅভিজিৎ নক্ষত্রের আলো ও দিতার ঘড়ি নামে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিভিত্তিক ভিন্ন স্বাদের তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন