শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

সাক্ষাৎকার : নবারুণ ভট্টাচার্য--লেখালেখি করে উপার্জন করি না

০ আপনি ঠিক কবে থেকে লেখালেখি শুরু করেন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : আমি লেখালিখি শুরু করি ষাটের দশকের শেষ থেকে।

০ ছাপার অক্ষরে আপনার প্রথম লেখার প্রকাশ কীভাবে হয়? সেটি কবিতা না গল্প?

নবারুণ ভট্টাচার্য : গল্প। কবিতা বেরিয়েছিল কিনা মনে নেই। হয়তো বেরিয়ে থাকতেও পারে। তবে ১৯৬৮ সালে 'পরিচয়' পত্রিকায় 'ভাসান' নামে আমার একটি ছোটগল্প বের হয়। তখন 'পরিচয়' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। গল্পের নামকরণটা উনিই করে দেন। ছাপার অক্ষরে এটাই আমার প্রথম প্রকাশিত গল্প।


০ কোনো পিতা তাঁর সন্তানকে বলছেন, 'বড়ো হয়ে তুমি লিখবে।' এরকমটা তো প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু সেটা আপনার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। সেই পিতার সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : টোট্যাল পারসোন্যালিটি বলতে যা বোঝায় আমার বাবা ছিলেন সে রকমই একজন মানুষ। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক জীবন পর্যন্ত অনেক রকম গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। স্নেহ-ভালোবাসার একটা দিক ছিল, আর একটা দিক ছিল সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া। থিয়েটার জিনিসটা তিনি একেবারে আমাকে ধরে ধরে হাতে কলমে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। ভালো ভালো লেখার খোঁজ অবশ্য মা-ই আমাকে এনে দিতেন। জীবনটাকে যাঁরা খুব গভীরভাবে জানেন অর্থাৎ একজন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতোই বাবা আমাকে বলেছিলেন যে, আমি লিখব। সমাজে কোন ধরনের চরিত্রদের নিয়ে থাকতে হবে সেটা বাবার কাছ থেকেই শিখেছি এবং সেইভাবে নিজেকে তৈরিও করে নিয়েছি। বাবার সঙ্গে আমার প্রথম অভিনয় 'গত্যান্তর' নাটকে। ওই নাটকে একটা ছাত্রের চরিত্রে আমি অভিনয় করি। ১৯-২০ বছর বয়সে তাঁর 'দেবী গর্জন' নাটকে একটা বড়ো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। এছাড়া আরও অনেক নাটকে বাবার সঙ্গে থেকেছি। বাবার মধ্যে যে কত গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তিনি বাজনা বাজাতে পারতেন, গান গাইতে পারতেন। জীব-জন্তুদের প্রতি তাঁর একটা অদ্ভুত প্রেম ছিল। কখনও কখনও দেখেছি তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। শিল্পীকে যে ক্রয় করা যায় না এটা আমি বাবার কাছ থেকে শিখেছি। সাম্প্রতিক রাজনীতি, বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে বাবার সঙ্গে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বাবার কিছুু লেখা অসমাপ্ত আছে সেগুলো নিয়ে পরে কাজ করার ইচ্ছা আছে। বাবা আর মায়ের আলাদা আলাদা দুটো জলচৌকি ছিল লেখার জন্য, সেগুলো আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। এছাড়াও বাবার ব্যবহৃত কলম, নাটকের পোশাক সব আমার সংগ্রহে আছে। সব দিক থেকেই বাবা ছিলেন আমার আদর্শ।

০ আজকের নবারুণ ভট্টাচার্য হয়ে ওঠাতে আপনার মা মহাশ্বেতী দেবী এবং বাবা বিজন ভট্টাচার্যের ভূমিকা কতখানি?

নবারুণ ভট্টাচার্য : আমি খুব ছোটবেলা থেকেই নাটক, লেখালিখি ছাড়া আর কিছু জানি না। কাজেই যে সমস্ত কাজ নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসি, পারিবারিক পরিম-ল আমাকে সেইদিক থেকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছে। আমরা বড়োলোক ছিলাম না ঠিকই, কিন্তু আমাদের সম্পদ বলতে ছিল বইপত্র, সাংস্কৃতিক পরিম-ল ইত্যাদি। কাজেই এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

০ আপনি তিনটি বড়ো পুরস্কার_ বঙ্কিম, নরহিংস দাস, আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনে পুরস্কারের প্রয়োজন কতটা?

নবারুণ ভট্টাচার্য :পুরস্কার জীবনে যদি আমি কোনোদিন নাও পেতাম তাহলেও আজকে যেমন লিখছি ঠিক লিখে যেতাম। পুরস্কার পেতে অবশ্য খারাপ লাগে না কিন্তু পুরস্কারটাকে জীবনে আমি কোনোদিন বড়ো করে দেখিনি। পুরস্কারেরর আশায় তো আর কেউ লেখে না, পরে সেটা এসে যায়।

০ সাহিত্য জীবনের গোড়াতে আপনি কবিতা লিখতেন না গল্প লিখতেন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : দুটোই সমানতালে লিখে গেছি। অবশ্য আমি নিজেকে কবি বলেই পরিচয় দিই। আমি কোনোদিন কোনো লেখাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখি না। যখন যেটা মনে আসে তখন সেটা লিখে ফেলি।

০ এবার 'হারবার্ট' প্রসঙ্গে আসি। এই ধরনের একটা উপন্যাস কীভাবে লিখে ফেললেন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : অবচেতনে অনেকদিন ধরেই মাথার মধ্যে ছিল। বহু টুকরো-টুকরো ঘটনা, অনুষঙ্গ স্মৃতি আস্তে আস্তে যেন দানা বেঁধেছে মাথার ভেতর। আসলে কোনো একটা বিষয় আমার মাথার মধ্যে ঘোরে অনেকদিন ধরে, তারপরে সেটাকে নিয়ে আমি লিখতে বসি। হঠাৎ ভাবলাম আর হঠাৎ লিখে ফেললাম এটা আমার ক্ষেত্রে হয় না। 'হারবার্ট' আমার নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা। সবমিলিয়ে 'হারবার্ট'-এর স্ট্রাকচার, তার মধ্যে কৃৎকৌশলগত ব্যাপার যেগুলো একটা লেখকের মধ্যে অবশ্যই থাকা দরকার, সবকিছুরই একটা মেলবন্ধন 'হারবার্ট'-এর মধ্যে ঘটেছে বলে আমার ধারণা।

০ আপনি যখন কোনো গল্প বা উপন্যাস লিখতে শুরু করেন তখন শেষটা কি আগে থেকে ভেবে নেন বা লিখতে লিখতে এসে যায়?

নবারুণ ভট্টাচার্য : শেষটা মোটামুটি একটা ভাবা থাকে। তবে অনেক সময় আমি আগে পরে করে লিখি। হয়তো শেষ দিকটা অনেক আগে থেকেই লিখে রাখলাম। পরে আবার একসঙ্গে মিলিয়ে দিলাম। এতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না।

০ হারবার্ট আপনি যেভাবে শেষ করেছেন সেই শেষটা কতটা আপনার ভাবনা ও আদর্শ অনুসারী?

নবারুণ ভট্টাচার্য : এটা একটা খুব মজার প্রশ্ন। অনেকেই আমাকে বলেছে যে 'হারবার্ট' বিস্ফোরণে শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু আমি মনে করি বিস্ফোরণটাকে ওই রকমভাবে হাইলাইট করার কোনো দরকার নেই। আমি যেভাবে উপন্যাসটাকে শেষ করেছি সেটা বলা যায় একটা ওপেন এন্ডেড শেষ। এটা ঠিক একটা ভেস্টিবিউল ট্রেনের মতো, যার এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাওয়া যায়।

০ আপনার লেখায় রাজনীতি এবং তার পাশাপাশি প্রতিবাদ একটা অন্য আবহাওয়া নিয়ে আসে। এটা কীভাবে হয় বা এর মূল কোথায়?

নবারুণ ভট্টাচার্য : আমি তো সম্পূর্ণ একটা র‌্যাডিকেল পরিম-লে বড়ো হয়ে উঠেছি। আমার মূল যে রাজনৈতিক বিশ্বাস তা থেকে আমি সরে যাইনি। আমি কিন্তু 'ইজম' পড়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিনি। চোখের সামনে আমি অবজেকটিভলি যেটা দেখি_ মানুষের অপমান, বঞ্চনা এগুলো আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। পরে স্বাভাবিকভাবে সেটা তার একটা রাজনৈতিক বেসিস খুঁজে পেয়েছে এবং সেই বেসিস সম্বন্ধেও আমার অনেক সমালোচনা আছে। আমি কপি বুক মার্কসইজম গ্রহণ করতে রাজি নই। পড়ব আর প্রয়োগ করব এটা কিছুতেই হতে পারে না। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও হয়নি। যেগুলো হয়েছে সেগুলো কোনোটাই সফল নয়। অনেক কিছু লিখবার আছে, অনেক বেশি ওপেন মাইন্ডেড হওয়ার দরকার আছে।

০ প্রথম শ্রেণীর বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে আপনার লেখা প্রায় দেখা যায় না বললেই হয়। কেন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : আমি তো প্রধানত লিট্ল ম্যাগাজিনের লেখক। তাছাড়া আমার মতো সামান্য মানুষকে ওরা চিনবেই বা কী করে। বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে লেখার খুব একটা তাগিদ আমি অনুভব করি না। একেবারেই যে লিখিনি তা নয়। 'দেশ' পত্রিকাতে আমার তিন-চারটে কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

০ আপনি সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে ঘুরে এলেন। শুনেছি ঐ দেশে আপনি খুব জনপ্রিয়। ওখানে আপনার কবিতা থেকে গান হয়েছে। এই ব্যাপারে যদি কিছু বলেন।

নবারুণ ভট্টাচার্য : বাংলাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আমার কবিতাকে সেস্নাগান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এবারে ওখানে গিয়ে দেখলাম আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে আমি খুবই পরিচিত। এই ধরনের রেকগনিশন পেতে খুবই ভালো লাগে। এটা পুরস্কারের চেয়ে অনেক বেশি। লেখক সবসময় যে স্পর্শগ্রাহ্য কোনো ঐশ্বর্য নিয়ে বাঁচবে তা তো নয়, সেটা টাকাকড়ি নয়, ছাপা কোনো জিনিস নয়, মানুষের ভালোবাসা একজন লেখককে বেঁচে থাকতে অনেকখানি সাহায্য করে। সবচেয়ে যেটা আমার অবাক লেগেছে তা হলো, ঢাকা তো বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র, কিন্তু এই শহর ছাড়াও আমি আরও যেখানে যেখানে গেছি যেমন, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর সর্বত্রই যে আমার পাঠক আছে এবং তারা যে আমার বই পড়ে_ এটা খুব একটা আনন্দের ব্যাপার।

০ বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সময় বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যে যে বাংলা-প্রেম দেখা গিয়েছিল আজকের প্রজন্মের মধ্যেও কি সেই প্রেম আছে?

নবারুণ ভট্টাচার্য : পরিপূর্ণভাবেই আছে এবং এই একটা ব্যাপারে ভুল বোঝাবুঝির কোনও অবকাশ নেই। বাংলাকে তারা যেভাবে ভালোবাসে এবং যেভাবে বাংলাভাষাকে তারা প্রাত্যহিকতায় নিয়ে এসেছে তা থেকে আমাদের এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।

০ সাহিত্য রচনা ছাড়াও আপনি আরও অনেক কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন।

নবারুণ ভট্টাচার্য : আমি নাটক করি। এখন অবশ্য সময়ের অভাবে নাটকে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কয়েকদিন পর থেকে আবার পুরোদমে নাটক করা শুরু করব। দৈনন্দিন জীবনে যা যা করণীয় সব কাজই করি। কিছু কিছু সামাজিক কাজও থাকে এবং এই কাজগুলো করে আমি ভীষণভাবে আনন্দ পাই। যেমন, বাউড়িয়া জুট মিলে যে আন্দোলন হচ্ছে, ওরা একটা প্রদর্শনী করছে তার সেস্নাগানগুলোকে আমি লিখে গিয়েছে। এটা আমার কাছে খুব গর্বের ব্যাপার, কারণ এই সমস্ত কাজে এখনও আমার ডাক পড়ে।

০ শারদীয়ার লেখালিখি নিয়ে আপনি কীরকম ব্যস্ত থাকেন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : শারদীয়ার লেখালিখি নিয়ে আমি খুব একটা ব্যস্ত থাকি না। তবে আগামী পুজোতে 'প্রতিদিন'-এ একটা উপন্যাস লেখার কথা আছে।

০ আপনি কি মনে করেন বেশি লিখলে লেখার মান কমে যায়?

নবারুণ ভট্টাচার্য : অবশ্যই যায়। যদি আমাকে ছ'টা উপন্যাস লিখতে বলা হয়, আমি তো জীবনেও পারব না। দেখুন, আমি তো লিখে উপার্জন করি না তাই বেশি লেখার দায়ও আমার নেই।

০ সাহিত্য রচনার সময় আপনি কি কোনো কবি বা গদ্যকার দ্বারা প্রভাবিত হন?

নবারুণ ভট্টাচার্য : একেবারেই না। ভালোবাসি অনেককে কিন্তু এখানে প্রভাবের প্রশ্ন ওঠে না। আমি যখন একটা লেখা তৈরি করি তখন অন্যান্য আর্টফর্ম থেকেও আমি উপাদান সংগ্রহ করে থাকি। পাশ্চাত্যের মার্গ সংগীত, নাটক, ফিল্ম থেকে শুরু করে এমনকি ভূতত্ত্ব বা ফুটবল খেলাও আমি আমার লেখাতে কাজে লাগাই। আমার প্রভাব জীবন থেকে আর এইসব অবিন্যস্ত পড়াশোনা থেকে।

সাক্ষাৎকারটি দৈনিক সংবাদের প্রকাশিত। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন