মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০১৪

অলীক মানুষঃ সৌন্দর্য ও বিষাদের প্রতিমা নির্মাণ

বিপুল দাস

উপন্যাসটি বিবৃত হয় কখনও সহজ বর্ণনায়, কখনও লম্বা-নেকো সেপাই নামের এক পাহারাদারকে আচাভুয়ার মত দাঁড় করিয়ে মনোলগের আকারে, কখনও টুকরো সংলাপে। উপন্যাসে বিধৃত হয় মাটির মায়াবন্ধন, ভোগবাসনার এই দুনিয়া, জীবনের রহস্যময়তা, শফির ক্রমাগত মেটামরফোসিস, ক্রমশ কিংবদন্তীর দিকে উড্ডীন এক নাচার পিরের অসহায় আত্মসমর্পন এবং জীবনের প্রতি ঘৃণা ও ভালোবাসার টানাপোড়েনে তৈরি একটি আলো ও অন্ধকারের নকশাদার জামদানি। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, ওই নক্‌শায় আলো ও অন্ধকারের চৌখুপি সমান উজ্জ্বল। এমন কী, অন্ধকার যেন তীব্রতায় আচ্ছন্ন করে প্রচলিত সমস্ত বোধ, আমাদের বেস্ট-সেলার গ্যাদগেদে রচনাসমূহ। নির্মাণকৌশলের ভেতরে চারিয়ে যাওয়া Negetivism এক অসামান্য দক্ষতায় প্রচলিত, মান্য এবং তথাকথিত শাশ্বত জীবনবোধকে অতিক্রম করে। অন্য এক অপরিচিত ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় পাঠককে। সাদা জিন ও কালো জিন সমস্ত উপন্যাসজুড়ে অদৃশ্য দোরঙা সুতোর বিনুনি বুনতে থাকে। লৌকিক আর অলৌকিকের দ্বন্দ্বে জমিনে ফোটে বিস্ময়কর কুসুম।

Behold the world, and curse your victories.
‘অলীক মানুষ’ মূলত দু’জন হারিয়ে যাওয়া, একলা হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প। বাস্তব ও পরাবাস্তবতার দ্বন্দ্বে দু’টি মানুষ দু’রকমভাবে অলীক মানুষে পরিণত হয়। একজন ধর্মবন্দী ও একজন ধর্মদ্রোহী ব্যক্তিগত পরিত্রাণের পথ খুঁজে নিতে চেষ্টা করে এবং প্রকৃতির রহস্যময়তার কাছে আত্মসমর্পন করে।

বদুপিরের নিয়তি তাকে মহামানব বানিয়েছিল। তার পুরো নামটি ছিল প্রকান্ড। সৈয়দ আবুল কাসেম মুহম্মদ বদি-উজ্‌-জামান আল-হুসেইনি আল- খুরাসানি। এই ভার তাকে ক্রুশকাঠের মত আজীবন বহন করতে হয়েছিল। রক্তমাংসের এই দুনিয়ার প্রতি, কামনাবাসনাময় এই শরীরের জন্য, মানবভোগ্য ছোট ছোট সুখের জন্য যে কান্না চাপা পড়ে মুরিদদের জয়োল্লাসে, পিরবন্দনায় – সেই আকুতি দেখছি – “ বালক বলল, দাদাজি ! লোকে বলে আপনি মাটি ছাড়া হয়ে আশমানে উড়তে পারেন ! সত্যি ? চুপ করে আছি দেখে সে তাগিদ দিল, বলুন না দাদাজি ? শ্বাস ছেড়ে বললাম, হ্যাঁ রফিকুজ্জামান, আমি দুনিয়াছাড়া হয়ে আশমানে ভেসে আছি। দেখতে পাচ্ছ না ? পাবে। আরও বড় হও। জানতে পারবে আমার তকলিফ কী”। আরও পরে বদিউজ্জামানের এই বোধ জাগে – আমি এক অলীক ঘোড়ার সওয়ার। তার দুটি ডানা আছে। সফেদ জিনগুলান আমাকে আসমানে উঁচা জায়গায় শাহী তখ্‌তে বসাইল। লেকিন আমার দেল বনু-আদমের থাকিয়া জাইল। উহা গোশত্‌ আর খুন দ্বারা তৈয়ারী। 

আবার দু’শ কুড়ি পৃষ্ঠায় – ‘ এক বিকেলে ব্রাহ্মণী নদীর ধারে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই পিরের সাঁকোর চিহ্নমাত্র নেই। আচানক বুক হু হু করে উঠল। মনে হল অতর্কিত শূন্যতার কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। কোথাও কিছু নেই, শুধু শূন্যতা। তারপর মনে হল থামগুলো দেখতে পাচ্ছি। সিঁদুরের উজ্জ্বলতা থামগুলিকে নিটোল, মসৃণ, কোমল করে তুলতে তুলতে এক নাঙ্গা আওরত – তওবা, নাউজুবিল্লাহ্‌। শয়তানের জাদু ... আমার বুকের ভেতরে তখন গিরিখাতের সিংহেরা গর্জন করছে অথবা হাহাকার করছে -- যত দূরে সরে যাচ্ছি ব্রাহ্মণী নদী থেকে, তত ওই গর্জন অথবা হাহাকার। যত সরে চলেছি, তত পিছনে সমুদ্রের তলায় ঝলমল মুক্তার মত স্মৃতি, আর আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জে পিঙ্গলচক্ষু এক নাঙ্গা আওরত আমার দিকে তাকিয়ে আছে...

বদিউজ্জামান, নাকি তার পুত্র শফিউজ্জামান – এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনটি, সেই তালাশ আমি এখনও জারী রাখিয়াছি। কহিতে শরম নাই, ‘সত্য’ কখনও জাহের হয়, কখনও গায়েব থাকে। বদুপির নামে খ্যাত এক ফরাজি ধর্মগুরু ক্রমশ ব্যোমপথে উড্ডীন হয়েন। শেষদিকে বৃক্ষবাসী জিনসকলের সঙ্গে তার কথাবার্তা, এমন কী বাহাস হয়। এন্তেকাল হলে তার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মার্বেল পাথরে ফারসি আর বাংলায় সনতারিখসহ ফলক স্থাপিত হয়। জীবদ্দশায় তিনি ঐশী ক্ষমতাসম্পন্ন এক মহাপুরুষ সাব্যস্ত হয়েন। এমন কী, কোনও কোনও কীর্তি, যা আপাতদৃষ্টিতে সংসারের নিয়মে পরাজয়, তাহাও শাগির্দের চোখে পিরের বুজুর্গিতে রূপান্তরিত হয়। অথচ তার বুকের ভিতরে হাহাকার ওঠে – ‘ ওহাবি হয়েও আমি কেন মোজেজা দেখি ... আমি যে সত্যি পির বুজুর্গ হয়ে পড়লাম। বুকের ভিতরে আর্তনাদ করে উঠল, আমি মানুষ, নিতান্ত এক মানুষ’। একমাসব্যাপী তার মসজিদে স্বেচ্ছা নির্বাসনকালে (ইত্তেফাক) এক প্রলয়ের রাতে এ রকম ভাবনা আসে – তিনি তো সর্বত্যাগী সাধকপুরুষ নন, তিনি ভ্রান্ত মতানুগামী সুফিও নন। তিনি ওহাবিপন্থী ফরাজি মুসলমান। ইহলোকের সব রকম নৈতিক সুখ উপভোগ করাই তো যথার্থ ইসলাম ... পবিত্র কোরানে আল্লাহ্‌ বলেছেন কৃষক যেমন শস্যক্ষেত্রের দিকে গমন করে, পুরুষ তার নারীর দিকে একই নিষ্ঠা ও প্রেমে অনুগমন করবে বলেই আদিমানব আদমের বুকের বাঁ পাঁজর থেকে নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথচ তিনি এ কী করছেন, কেন করছেন ? 

স্বাভাবিক কামনাবাসনাযুক্ত মানুষের মতই নারী শরীরের প্রতি আকর্ষণ, সন্তানের গালে একটি চুমু খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সংসারের সুখদুঃখের অংশীদার হওয়া, স্বাভাবিক মানুষের মতই হাসিকান্না – এ সবই তার বুকের দরিয়ায় অবিরত তুফান তোলে। কিন্তু সে অতি সঙ্গোপনে। তাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু কখনও দলিজঘরে একা বসে, মসজিদে ইত্তেফাক নিলে, কখনও বা একা বাঁশঝাড়ের নীচে আলের ওপর দাঁড়িয়ে, ভাঙা পিরের সাঁকোর ওপর ভাঙা থাম দেখতে দেখতে বুকের ভেতর তোলপাড় করে ওঠে। বুজুর্গ পিরের তকমা-আঁটা ইহ শরীর সওয়ার হয় এক অলীক ঘোড়ার ওপর। সে-ও তো এক ধরনের সুখ। তুচ্ছ মাটির বাঁধন ছিঁড়ে তার সামাজিক স্থানাঙ্ক নির্মিত হতে থাকে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বায়বীয় স্তরে। তবু বদিউজ্জামান এক সময় বলেন, তার ‘তকলিফ’-এর কথা। সাদা জিনসকল তাকে শাহী তখত্‌-এ বসায়। রক্তমাংসের বদিউজ্জামান গাথায়, উপকথায় কিংবদন্তীর মানুষ হয়ে যান। তবু মাটি মায়া ছাড়ে না। এই কথা বলতে হয় – ‘ ... তবু আমার দেল বনু আদমের থাকিয়া জাইল, উহা গোশত্‌ আর খুন দ্বারা তৈয়ারী’। রক্তমাংসের এই বাস্তব জৈবিকতা, লৌকিক প্রয়োজন এবং ক্রমশ শূন্যমার্গে ধাবমান অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পিরসাহেবের প্রকান্ড ছায়া – এই দুই-এর দ্বন্দে তার সমস্ত জীবন অশান্ত থেকে গিয়েছিল। পিরসাহেব একটি বালকের কাছে confess করতে বাধ্য হন যে, সমস্ত মুরিদগণ, যাবতীয় এলাকাবাসী বেরাদরে এসলাম তাকে এক ঘোড়ার পিঠে সওয়ার করে দিয়েছে। ওই ঘোড়ার ডানা আছে। বদুপিরের পৃথুল শরীর, সবুজ পাগড়ি, মন্ত্র ও সুরেলা কন্ঠস্বর, মোজেজা দেখানোর তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতা ওই ডানায় প্রবল কম্পন সৃষ্টি করে। তিনি ওপরে উঠতে থাকেন। সাধারণ থেকে অসাধারণ স্তরে তার উত্তরণ হতে থাকে। এখানেই নাচার বদুপিরের তকলিফ। তার কলিজা তো কোনও দিব্যকুসুম নির্মিত নয়, সাধারণ মানুষের মতই রক্ত আর মাংস দিয়ে তৈরি। ওই হৃদয়ে নারীশরীরের জন্য তীব্র আসঙ্গলিপ্সা জাগে। সন্তানের প্রতি স্নেহ, স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য – সবই মনে আসে। অথচ নাচার এক ধর্মবন্দী মানুষ এই তকলিফে ক্রমশ রক্তাক্ত হতে থাকেন। পিরেরা ওড়েন না, শিষ্যরাই তাকে ওড়ায় – বহুল প্রচলিত এই প্রবাদ বদিউজ্জামানের জীবনে পাষাণের মত সত্য হয়। 

সমস্ত উপন্যাসজুড়েই আছে দৃশ্যমান জগৎ ও অদৃশ্য জগতের সংঘর্ষের কথা। মানুষ বদিউজ্জামান ও সাধক বদুপিরের সংঘর্ষ। কৃষক যেমন বীজ বপনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মৃত্তিকার দিকে এগিয়ে যায়, কোরানের বাণী মোতাবেক বদুপিরেরও এই গমনেচ্ছা থাকে, অথচ যার প্রতি এই তীব্র কামনা জেগে ওঠে, সে আবদুল কুঠোর বউ, নীল চোখের এক বেশরম আওরত। এই কি সেই হিন্দু স্ত্রীলোক, যার সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর ছিল। যাকে আবদুল তার স্বামীর চিতা থেকে তুলে এনেছিল। ইকরাতন। ‘হাম্মালাতুল হাতাব’। এই নারী তার দৈনন্দিন জীবনযাপনের ‘বন্ধুর মাঠের শাদামাঠা কোনও লৌকিক বাস্তবতার কোনও সুক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে’ অলৌকিক এক মায়ানদী হয়। লৌকিক ভালোবাসার কাঙালপনা তার চোখে পরাবাস্তবতার যে অঞ্জন মাখায়, তার ফলে রুক্ষ মাঠের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদীর আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ তার ধূসর মানসে এমন অবসেশন সৃষ্টি করে যে, শেষ পর্যন্ত ‘ধূসর গোধূলির পটভূমিতে প্রাতিভাসিক বক্ররেখাটি তাকে শিহরিত করত, হঠাৎ আবিষ্কার করতেন সিঁদুরে আভা’। বলা বাহুল্য, এই সিঁদুর ইকরাতন নাম্নী এক প্রাক্তন হিন্দু নারীর সিঁথির উজ্জ্বলতা। আর যখনই বুকের ভেতর প্রথমে খেঁজুরকাঁটা ও পরে দিগন্তব্যাপী মরুভূমির মাঝে কাঙ্খিত শীতল জলের ধারা জেগে ওঠে, ততক্ষণাৎ বদুপিরের বিশাল ফোলানো অবয়ব সবুজ পাগড়িসহ ঢেকে দেয় ওই নদী। ওই দৃশ্য না-পাক, শয়তানের ইন্দ্রজাল – এই কথা ভাবেন পিরসাহেব। চাপা পড়ে যায় রহস্যময় নদী, যা ‘স্নিগ্ধতার অনুপুঙ্খ চাপে যেন বা একটি স্ত্রীলোক’। 

পরাবাস্তবতার কুহকি মায়ায় আক্রান্ত, তবু গোশত্‌ আর খুন দিয়ে তৈরি কলিজা মানুষের উষ্ণ সান্নিধ্য কামনা করে। শরীরের গ্রন্থিগুলো্র হরমোন নিঃসরণ এত জপতপেও কন্ট্রোল হয় না। মায়া ও বাস্তবতার সংঘর্ষ জারী থাকে।
একটা সাঁকো ছিল। অনেক কালের পুরনো। এই সাঁকো বদিউজ্জামানের জীবনে এক প্রতীক-পিলার। এই সাঁকো ছিল তার জীবনের অনিবার্য স্পষ্টতা। অথচ নিজেকে উঁচুতে তুলে রাখার দরুন এই স্পষ্টতাকে ‘দেখব না’ বলে চোখ ঢেকে রাখতে হয়েছে। এই সাঁকো তার জয় ও পরাজয়ের মিনার। আবদুল কুঠো মারা যাওয়ার পর তার বিবি ‘ডাইন’ হয়ে যায়। ‘নদীতে পিরের সাঁকোর কাছে রাতে নাঙ্গা হয়ে চেরাগ জ্বেলে হিন্দুদের মত পুজো করে’ – এই সংবাদ বদুপিরের বুকের ভেতর অচানক তুফান তোলে। পুরো মৌলাহাট যখন ফরাজি হয়ে গেছে, তখন হিন্দুদের মত ‘বুতপরস্থি’ আচার অনুষ্ঠান কোন বেশরম বেতমিজ নাদান আওরত করতে সাহসী হয়। এ তো তার পরাজয়। আবার, এবং অবশ্যই সংবাদবাহক মারফত প্রাপ্ত বাক্যটি তিনি ভিসুয়ালাইজ করেন। তীব্র সত্য চোখ বন্ধ রাখলেও মস্তিষ্কের দর্শনকেন্দ্রে প্রক্ষেপিত হয়। ‘আমার নজর খুলে যাচ্ছে...’ এই নজর আসলে অবদমিত চক্ষু। প্রাণের চাওয়া, অথচ চোখের না চাওয়া – বিখ্যাত গানের সেই লাইন বদুপিরের জীবনে সবচেয়ে সত্য। পাপদৃশ্য যাতে তার সাধনায় বিঘ্ন না ঘটায়, সে জন্য প্রকট দুই চোখ তিনি দুহাত দিয়ে বন্ধ করেন। তবু ভেতরের চোখে তীব্র কামনায় ‘একটি কালো থামের গায়ে দগদগে লাল সিঁদুরের ছোপ’ তিনি অনেক দূর থেকে দেখতে পান। আবার ওই দৃশ্যের বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগে। মনে প্রশ্ন উঠে আসে – ‘নাকি দেখতে চাইছি বলেই দেখছি ?’ প্রশ্নবোধক চিহ্নে বদুপিরের সংশয় স্পষ্টই প্রকাশিত হয়। তিনি নিজেও জানেন তিনি দেখতে চেয়েছেন। তার এই শরীর, শরীরের চালক পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও মন দেখতে চায় ‘ওই কালো থামের মধ্যে চেহারা নিচ্ছে একটি স্ত্রীলোক, নাঙ্গা আওরত, সিঁথিতে সিঁদুর, আর ওই নদী, চিতার মত দাউদাউ রোদ...’
এখানে ‘নদী’ এবং ‘চিতার মত দাউদাউ রোদ’ উপমাগুলো ঘুরেফিরে আসে। কারণ আবদুল কুঠো ওই নারীকে তুলে এনেছিল নদীর পারের সাজানো প্রজ্জ্বলিত চিতা থেকে। নদী এবং আগুন থেকে ওই নারীর উঠে আসা। নাঙ্গা আওরতের অনুষঙ্গে সব সময় থাকে সিঁদুর,নদী, মসৃণ উজ্জ্বল কাল থাম, রৌদ্র। ইকরাতন নামের ওই নারী নদী হয়ে জেগে ওঠে বদুপিরের শুকনো কলিজার ভেতর। ‘চিতার মত দাউদাউ রোদ’ এই উপমা প্রতিষ্ঠা দেয় ইকরাতনের তীব্র ফিরে আসা, সেই আঁচে এক সাধকের ঝলসে যাওয়া। আগুনের অমোঘ শিখা ছারখার করে দেয় তিল তিল করে জমে ওঠা সমস্ত পুণ্যের মহিমা। তখন বদিউজ্জামানকে আর্তনাদ করতে হয় – ‘ আল্লার পবিত্র হাত আমার চোখ ঢেকে দিক।‘ তখন তিনি শরণাগত দৈবের কাছে। তখন তার হাতদুটো অবশ থাকে, তাই পাপচক্ষুদুটো ঢাকার জন্য, ওই দৃশ্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লার কাছে প্রাণপণে পরিত্রাণ প্রার্থনা করেন। ওহাবি হয়েও মোজেজা দেখার জন্য অনুতাপ জাগে।
হুঁশিয়ারনামা কেতাবে যেমন লেখা আছে, আবদুল কুঠোর বউ ছিল অবিকল সেই বর্ণনার নারী। প্রাক্তন ব্রাহ্মণ ঘরের এই হিন্দু রমণীর চোখদুটো পিঙ্গল, ঠোঁটে ছিল তিল, চঞ্চলা। অবিকল যেন আবু লাহাবের কাঠকুড়োনির বউ। আবু লাহাব ছিল অভিশপ্ত, কারণ সে হাত দিয়ে প্রেরিত পুরুষকে আঘাত করেছিল। পবিত্র কেতাবে সেই গল্প আছে। এদের বিষয়ে কেতাবে হূঁশিয়ার করা হয়েছে। একদিন হঠাৎ জঙ্গলে বদুপিরের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল এই নারী। তার হাতে কাটারি ছিল। সম্ভবত সে কাঠ জোগাড় করতে বেরিয়েছিল। চোখাচোখি হতেই পিরসাহেব দেখলেন সেই পিঙ্গল বর্ণ চোখ থেকে নীল রোশনি ঠিকরে বেরোচ্ছে। তারপর সেই আওরত যখন চলে যাচ্ছে, তিনি যেন দেখলেন একটা ঘুর্ণি বাতাস ওই বেশরম আওরতকে ঘিরে পাক দিচ্ছে। বাতাস খুলে নিচ্ছে তার পরনের সামান্য আবরু। প্রায় নাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে ওই নারী শরীর। চোখ বুজে ফেলেছিলেন বদুপির। 

সত্যি কি হাওয়া উঠেছিল ? এই হাওয়া সম্ভবত মানুষ বদিউজ্জামানের মনপবন। উলঙ্গ করে দেখতে চায় ঠোঁটে তিল, কয়রা চোখের চপল এক নারীকে। নাউজুবিল্লাহ্‌। রাগে, দুঃখে, অভিমানে বদুপির ক্রমশ রক্তাক্ত হতে থাকেন। যে কলিজা রক্তমাংস দিয়ে তৈরি, সেই কলিজা ব্যর্থতায় অবসন্ন হয়ে পড়ে। মনে হয়, সব নিষ্ফল। সমস্ত সাধনা, আরাধনা, পাঁচ ওয়ক্ত ছাড়াও অতিরিক্ত নফল-নমাজ অর্জিত সমস্ত নেকি বুঝি বিফলে যায়। এই যে উড়ান, উচ্চাবস্থান, জলদমন্দ্রস্বরে শাস্ত্র ব্যাখ্যার সময় সামনে সারি সারি বিস্ময়বিমূঢ় শ্রাদ্ধাবনত মুখ, তার সঙ্গে কালো জিনের সংঘর্ষ ও সাদা জিনের সৎসঙ্গবাবদ অর্জিত খ্যাতি – সব কিছু বরবাদ হয়ে যায় একটি দৃশ্যের কাছে। ব্রাহ্মনী নদীর ওপরে অনেক কালের পুরনো একটা সাঁকো, পিরের সাঁকো বলে সবাই – সেই সাঁকোর কালো থামের নীচে , রাত্রিবেলা এক পিঙ্গলচক্ষু হরিণী মাথায় প্রদীপ নিয়ে নৃত্য করে। হিন্দু আচার। ওই নারী হিন্দু ছিল। আবদুল ওকে দাউদাউ আগুন থেকে উঠিয়ে এনেছিল। বেপরদা বে-শরম আওরত। 

এই দৃশ্য থেকে নিষ্কৃতি, অথবা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে তিনি ফতোয়া জারি করেন অই সাঁকো ভেঙে ফেলার জন্য। সাঁকোর পাথরের থাম, যা মসৃণতায় যেন জঙ্ঘা, উদোম – তার হুকুমে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। অই থামে বন্দী ছিলেন অসহায় বদুপির। 

তবু হায় ! এবাদতখানায় বসে, অথবা নিশুতিরাতে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বদিউজ্জামান অবিকল সিঁদুরের ছাপমারা সেই থাম দেখতে পান। তারপর দৃশ্যের পরিপূরক হিসেবে অবধারিতভাবে সেই অন্ধকারের পটে চিত্রিত হয় এক নাঙ্গা আওরত। চোখ বুজে ফেলতেন। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করতেন – ‘আল্লাহ্‌, শয়তানের জাদু থেকে আমাকে বাঁচাও।‘ নিজেকে অনেক উঁচুতে তুলে রাখতে গিয়ে সংসারী মানুষের হাসিকান্না, আনন্দবেদনা, মিলন ও বিরহের তীক্ষ্ণ গ্রাফগুলো তাই নজরে আসে না। অথচ মাটির কী ভীষণ প্রবল টান। প্রকৃতির সেই অনিবার্য রসায়ন সক্রিয় হয়ে উঠলে তার মনে হয় ওই উচ্চাবচ গ্রাফ আসলে শয়তানের জাদু। তাকে বুঝি আশমান থেকে টেনে নামায়। বা ‘মেনকা’ অথবা ‘মার’। বদিউজ্জামানের ধীরে ধীরে একা হয়ে যাওয়ার দুঃখ, মানুষ থেকে অলীকমানুষ হয়ে ওঠার যন্ত্রণা, লৌকিক জগৎ থেকে অলৌকিকের জগতে নির্বাসনের বেদনা যেন তার নিয়তি ছিল। এই ‘নিয়তি’ তাকে আকাশে ভাসিয়ে রাখে। আবার প্রকান্ড এই পৃথিবী শুধু তার জলজঙ্গল, নদীসাগর, পাহাড়পর্বত দিয়ে নয় – এই দুনিয়া তার শত শত কথা, গাছ থেকে খসেপড়া পাতা, নিতান্ত শারীরিক খাহেস – এই সব তুচ্ছ জিনিস দিয়েও তাকে মাটির দিকে টানে। সারারাত ঘুম না আসার কারণ তিনি নিজেই খুঁজে বের করেন। “উঁচুতে উঠে গেলে যেন মানুষের সবটুকু চোখে পড়ে না নিচে থেকে। ওরা ভাবে আমার ঘরগেরস্থালি নেই, স্ত্রীপুত্র নেই, আমি এক অন্য মানুষ। অথচ আমার মধ্যে এই সব জিনিস আছে। টিকে থেকে গেছে সব কিছুই ... আমার কষ্ট, আমার মনে খাহেস। তসবিহ জপে ভুল হয় ... আমার চারদিকে তারপর থেকে হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার ... অথচ রাত নিশুতি হলে সেই হুঁশিয়ারির মধ্যেও চাপা হাসিকান্নার মানবিক আর্তি ভেসে আসে ... সারারাত ঘুম আসে না দুচোখে।“

অসাধারণ দক্ষতায় একজন সাধক মানুষের যন্ত্রণা চিত্রিত হয় এই উপন্যাসে। পুকুরের পানিতে জ্যোৎস্নার খেলা, পায়রার ডাকের মত শতসহস্র সাংসারিক কথা তাকে মায়ার বাঁধনে বাঁধতে চায়। পুকুরের পানি ডাকে – আয়। পিরের সাঁকোর কালো মসৃণ স্তম্ভ লালছোপ নিয়ে হাতছানি দেয়। পিঙ্গল চোখের বেপরদা এক নারী, যেন বা এই নারী তারই বুকের বাঁ-পাঁজর থেকে তৈরি – সেও ডাক দেয় আদিম ও রহস্যময় খেলার জন্য। বুকের ভেতরে কাতর পাখি ডানা ঝাপটায় – বদু, আমি বাইরে যাব। তখন সমস্ত চরাচরজুড়ে রাত-পাহারাদার হেঁকে ওঠে – হুঁশিয়ার বদিউজ্জামান, হুঁশিয়ার হো। একটু আগে বুকের গিরিখাতে আসঙ্গলিপ্সায় যে সিংহগর্জন উঠেছিল, এখন হাহাকারে পরিণত হয়।
এই উপন্যাসে গড়ে ওঠে কামনাবাসনায় পৃক্ত দৃশ্যমান ধুলোবালি ও অদৃশ্য, অথচ শক্তিশালী এক মায়ার ভুবন। লৌকিক-অলৌকিকের সংঘাত, বাস্তব ও অলীকের দ্বন্দ্ব, তীব্র প্রেম ও অপ্রেম – এই সব গতি ও বিরুদ্ধ গতির ফলে ঘুর্ণি তৈরি হয়। এ উপন্যাস অসংখ্য ঘুর্ণির এক চন্ড-নদী।
Hatred and vengeance, my eternal portion,
Scarce can endure delay of execution,
Wait, with impatient readiness, to seize my
Soul in a moment. ( Cowper ) 

“বালক পয়গম্বর যখন রাখাল ছিলেন, হঠাৎ সেই উপত্যকায় নেমে এল দুই ফেরেশতা।তাঁকে ধরে ফেলল তারা। চিত করে শোয়াল। তারপর তাঁর বুক চিরে ফেলে তাঁর কলজে থেকে অসৎ টুকরোটি কেটে নিয়ে সৎ এবং স্বর্গীয় একটি টুকরো জুড়ে দিল। ... এই ঘটনার নাম ‘সিনা-চাথ’ বা বক্ষবিদারণ।“

কিশোর শফিউজ্জামানের ‘সিনা-চাথ’ পর্ব অনুষ্ঠিত হয় উলুশরার জঙ্গলে। নবাব বাহাদুরের দেওয়ান আবদুল বারি চৌধুরি ছিলেন সেই ফেরেশতা। শফির বারিচাচা। একটা হাতির পিঠে চাপিয়ে উলুশরার মাঠে শফিকে নিয়ে গিয়ে যেন এমন কিছুই তিনি করেছিলেন। সেদিন শফি বুঝতে পারেনি কখন যে কলজে বদল হয়ে গেছে। এই ‘সিনা-চাথ’ বুঝতে শফির আরও তিরিশ বছর লেগে গিয়েছিল।

পাঠক জানেন, বারি চৌধুরি সেদিন উলুশরার মাঠে শফির কানে কানে কোন ফুঁসমন্তর ফুঁকেছিলেন। এক স্বাধীনতার কথা প্রকৃতি থেকে এক্সট্রাক্ট করে শফির বুকের ভেতরে চালান করে দিয়েছিলেন বারি চৌধুরি। এলিট, সত্যদ্রষ্টা, নির্মম বারি চৌধুরি। বারিচাচা শফিকে জীবনের অন্য পাঠ দিতে চেয়েছিলেন। অল্প বয়সে বিয়ে এবং প্রথাগত জীবনযাপনের বিরুদ্ধে শফিকে তিনি টেনে বাইরে আনতে চেয়েছিলেন। পির পরিবারের এই ছেলেটিকে তাঁর অন্য রকম মনে হয়েছিল। তাকে প্রকৃতির গোপন-পাঠ, যা মানুষকে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শেখায় – তেমন কিছু বলতে চেয়েছিলেন।
হাতির পিঠে চেপে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ‘বারি চৌধুরির কন্ঠস্বর ক্রমশ ভরাট হয়ে উঠছিল ... তোমার সঙ্গে রুকুর শাদির কথা পাকা হয়ে গেছে।‘ এই রুকুকে শফি স্বপ্নের মাঝে দেখত। বোররাখের ছবি, ‘যার মুখ সুন্দরী নারীর, শরীর পক্ষীরাজ ঘোড়ার’ – শফি তার ঘরের দেওয়ালে সেই ছবি দেখতে দেখতে আবিষ্কার করতই মুখ আস্তে আস্তে রুকুর মুখ হয়ে যাচ্ছে। ‘ আমার বুক ঠেলে কান্না আসত, মনে হত কেঁদে ফেলি ... আমার বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগল। রুকুর সঙ্গে আমার শাদি হবে ? এ কি সত্যি ? রুকু আমার বউ হবে এবং সে আমার পাশে শোবে এবং আমি তাকে --- এ কি সত্যি হতে পারে ?’

বারিচাচার মুখে তার সঙ্গে রুকুর শাদির কথা যখন প্রথম শুনল, তখন শফি উলুশরার জঙ্গলে দেখছে ‘নেচার’। দু’চোখের ভেতর দিয়ে প্রাকৃতিক স্বাধীনতা, আসলে যা প্রকৃত স্বাধীনতা, শফির বুকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অধিকার করে নিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে একটা ‘বদল’-এর খেলা শুরু হয়েছিল। খুব দ্রুত অর্জন এবং বর্জনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে শুরু করে। একঝাঁক বুনোহাঁস কেমন কাশবনের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, কোথাও একলা কোনও হাট্টিটি পাখি ডাকছে, আর শফি দেখতে দেখতে আবিষ্কার করে ‘এই সব নানা রং-এর নানা ঘটনার টানাপোড়েনে গাঁথা বারু চৌধুরির নেচারকে কেউ বা কিছু এক অগাধ বিষাদে আচ্ছন্ন করে আছে।‘ কুয়াশার মত বিস্তৃত সেই বিষাদ, হরিণমারার জমিদার বাড়িতে শোনা বেহালার গম্ভীর, করুণ এক সুর। 

উলুশরার বনে একলা একটা শামুকখোল পাখি, একঝাঁক বুনো হাঁসের হঠাৎ উড়াল দেওয়া, হাট্টিটি ডাক – এসব মিলে একটা দুঃখের অবয়ব গড়ে উঠেছিল। নির্জন প্রকৃতির এক মহান স্তব্ধতার ভেতরে পরিপূরক এই সব শব্দ নৈসর্গিক ঘটনামাত্র। কিন্তু শফি দেখে বিষাদ। কোথা থেকে আসে এই বিষাদ ? সমস্ত বিশ্বজগতজুড়ে অশ্রুত যে সঙ্গীত বেজে যায়, সে কি অনন্ত দুঃখময় কোনও ballad. রুকু নামের একটি মেয়ে তার নারীশরীর নিয়ে ক্রমশ দূরে যেতে থাকে। আত্মা অধিকার করে কুয়াশার মত দুঃখের মলিন আবরণ। এই বিষণ্ণতা আজীবন শফির সঙ্গী হয়ে ছিল। পিরজাদা হয়েও নিসিং পন্ডিতের পাঠশালায়, পরবর্তীতে ইংরেজি স্কুলে পড়া শফিকে বারিচাচা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে বলতে থাকেন – শফি, তুই এখনও নাবালক। সাদি দিলে তোর লেখা পড়া কিছুতেই হবে না বাবা। ‘ষড়যন্ত্রসংকুল’ উল্লেখিত হলেও স্পষ্ট শোনা যায় বারিচাচার ব্যাকুল স্বর। যেন – জয়লাভ করলেই মহী তোর ভোগের জন্য। যেন – তুই পারবি শফি, হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিতে মুসলমানের মুখ উজ্জ্বল করতে। তুই আমার বাজির ঘোড়া শফি ...
বারিচাচা যখন শফিকে এসব শোনায়, তখন এক অদ্ভুত বিষাদময়তার ভেতরে আস্তে আস্তে শফি লগ্ন হতে থাকে। একলা হতে থাকে। একদিকে রুকু, বুজুর্গ পির আব্বাসাহেব, মুরিদমুসল্লিদের শ্রদ্ধা, পিরজাদা হওয়ার দরুণ সামাজিক উচ্চাবস্থান – অন্যদিকে ঘনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে দুরন্তবেগে ছুটেচলা একটা বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হওয়ার আদিম কামনা, অবাধ স্বাধীনতাময় প্রাগৈতিহাসিক বন্যতাকে চিনে নেওয়ার দুরন্ত বাসনা। রূপান্তর পর্ব শুরু হয়ে যায়। হিম-নিষ্ঠুরতার বীজ বপন হয়। 

তখন শফির বয়স ষোলো। শফি তখন অল্প অল্প শরীরের রহস্য বুঝতে শিখেছে। ক্লাসের বন্ধুরা তাকে নারী-শরীরের গভীরগোপন রহস্যের কথা ব্যাখ্যা করে। কিশোর শফির বুকের ভেতরে দুরদুর করে। রুকুর দিকে এই তীব্র আকর্ষণ কামজাত, নাকি এ-ই প্রেম – এই সংশয়ও আসে। রুকুকে মনে হয় ‘আকাশচারিণী পরি ... যার বাসস্থান আকাশের দ্বিতীয় স্তরের পরিস্থানে, যেখানে ফুটে আছে লক্ষকোটি নক্ষত্র দিয়ে গড়া প্রলম্বিত ছায়াপথ।‘ তার আব্বা মহামান্য বদিউজ্জামান যখন শফিকে প্রশ্ন করেন শাদিতে তার সম্মতি আছে কিনা, শফি শুধু বলেছিল -- ‘জি’। চল্লিশ বছর বাদে ফাঁসির জন্য গারদে অপেক্ষমান শফিউজ্জামান ব্যক্তিগত সংলাপাকারে লম্বানেকো শান্ত্রীকে সাক্ষী রেখে সেই ‘জি’ ধ্বনির ব্যাখ্যা শোনায়। সেই শব্দের অর্থ মূর্খ বদুপির শফির সম্মতি মনে করেছিল। অথচ সেই ‘জি’ ছিল অর্থহীন একটি ধ্বনিমাত্র। নিরর্থক শব্দ। কিছু কিছু শব্দ আছে – প্রকৃতিজাত, যা তার জড়ত্বে একান্তই তার, সাংসারিক উপমাহীন সেই সব শব্দের মত শফি শুধু ‘জি’ উচ্চারণ করেছিল। অথচ সাধারণের মতই পিরসাহেবেরও ভ্রান্তি ঘটেছিল। তিনি ভেবেছিলেন শফি ‘হ্যাঁ’ বলেছে। চল্লিশ বছর বাদে শফির মনে হয় – ‘ ... যদিও আমি হ্যাঁ বা না কিছু বলতে চাইনি। কারণ তখন আমার দু’পাশে দাঁড়িয়ে ছিল দু’জন। বারুচাচাজি এবং রুকু। আমি ভাবছিলাম কার দিকে যাব – কে আমার প্রিয়।‘

পরদিন বাড়িতে সাদির জন্য সাজো-সাজো রব শুরু হলে শফি পালিয়ে এসেছিল হরিণমারায়। মাকে বলেছিল – ‘আম্মা, আমি চললাম। স্কুল কামাই করলে নাম কেটে দেবে।‘ পরবর্তীকালে এই রুকুর সঙ্গে শাদি হয়েছিল শফির প্রতিবন্ধী বিকৃতকাম দাদা মণিরুজ্জামানের। মনি পাছা ঘষটে ঘষটে হাঁটত, টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করত, তার মুখ দিয়ে লালা গড়াত, সে দুহাতের আঙুল দিয়ে সঙ্গমের মুদ্রা দেখাত, শফির দিকে তাকিয়ে খ্যা খ্যা করে হাসত। ঠিক হয় যে, পিরসাহেবের দ্বিতীয় পুত্র এই মনিরুজ্জামানের সঙ্গে শফির আকাশচারিণী পরির শাদি হবে।
শফি বলেছে ‘ হঠাৎ একটা জোরালো অভিমান আমার বুকের ভেতর চেপে বসল। সেই অভিমান সূর্য ওঠার আমাকে বলিয়ে দিল – আম্মা, আমি চললাম। যে অভিমানে শফি রুকুর দিকে পিঠ রাখে, বারিচাচার দিকে মুখ রাখে, কৈশোরের সেই অভিমান, অন্তত শফির মত ক্রমশ একলা-হয়ে-যাওয়া পিরের সন্তান, সম্প্রতি ‘প্রকৃতি যার বোধে তুমুল ওলোটপালট ঘটায়, বিষণ্ণ ‘নেচার’ যার মননে বিস্তীর্ণ হয়, তার ক্ষেত্রে এই অভিমান অত্যন্ত জটিলভাবে ক্রিয়াশীল হতে শুরু করে। 

কেন সে সেদিন রুকুকে অস্বীকার করেছিল ? যার ফল তার জীবনে তাৎপর্যময় এবং সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। আব্বার প্রকান্ড ছায়ার বাইরে এসে প্রকৃত রোদ্দুর ডানায় মেখে নেওয়া ? নাকি দু’টি কাঙ্ক্ষিত বস্তুর ভেতরে যখন একটি পাওয়ার জন্য অন্যটি বর্জন করতে হয়, তখন সেই না-পাওয়া বস্তুর জন্য অবিরত গোপন কান্না, নিষ্ফল অভিমান এবং কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর এই দায় চাপিয়ে দিতে না পেরে সমস্ত পৃথিবীর প্রতি ক্রোধ ? এবং এই ক্রোধ পরিবর্তিত হয় ঘৃণায়। এই উপন্যাস শুরু হওয়ার আগে সৈয়দ সাহেব মুখবন্ধ হিসেবে H.G.Wells-এর কয়েকটি লাইন উল্লেখ করেন, যার প্রথম লাইন – Hatred is one of the passion that can master a life …

ঘৃণা জন্ম দেয় ঘাতক সত্তার। শফির ফিলসফি – জড়ের অভ্যন্তরীণ শক্তির মুক্তি। যে মুক্তিবেগ সে নিজেও সংবরণ করতে পারেনি। প্রকৃত সৌন্দর্য, যা স্বভাবত প্রাকৃতিক, সেই সৌন্দর্য সে আগ্রাসী ক্ষুধায় আত্মসাৎ করতে চেয়েছে। যে স্বাধীনতা আরোপিত নয়, স্বতঃ – “ এখানে যা আছে, তা প্রকৃতিসৃষ্ট এবং স্বাভাবিক, এইসব উদ্ভিদ, পাখি, প্রজাপতি, শিশির, পোকামাকড়, চতুষ্পদ যাবতীয় প্রাণী কী অবাধ, স্বাধীনতাময়।“ সেই স্বাধীনতার দিকে তীব্র আকাঙ্ক্ষা শফির আপাত-নির্লিপ্তির ভেতর সমস্ত জীবন ধরে ভয়ানক ভাবে সক্রিয় ছিল। এই স্বাধীনতার ধারণায় সিতারা, স্বাধীনবালা, রত্নময়ী ছিল তার দ্বারা defined, মুক্ত-সৌন্দর্য। এই definition থেকে যখনই এইসব নারীরা সামান্য মানুষের হাতে বন্দী হয়ে সংজ্ঞাচ্যুত হয়েছে, তখনই ‘ঘাতক সত্তা’ আড়মোড়া ভাঙে। শফির লজিক বলে –“ সে বধ্য প্রাণী, যেহেতু সিতারাকে গৃহস্থালীর আসবাবে পরিণত করিয়াছে, এবং প্রেমহীন করিয়াছে বলিয়াই কাল্লু সিপাহি বধ্য ছিল।“
এই কাল্লু ছিল সিতারার স্বামী। আর সিতারা ছিল প্রকৃতির অন্তর্গত এক সৌন্দর্য, যে একদিন নদীতে মৎস্যকন্যার মত সাবলীল সাঁতার কাটতে কাটতে শফিকে ডাক দিয়েছিল –“ আও শফিসাব, খেলুঙ্গি”।

শফির ভেতরে এই ঘাতক-সত্তার উন্মোচন, ধর্মদ্রোহিতা, নৈরাজ্যবাদী চেতনার সংক্রমণ – কোনও কোনও সময় মনে হয় যা প্রার্থিত ছিল, সেই বস্তু না পাওয়ার জন্য তীব্র অভিমান এবং ক্ষোভের ফল। না। এই চিন্তা স্থূল ব্যাখ্যা হয় বটে, কিন্তু সমগ্র উপন্যাসের মূল ধারণা থেকে আমাদের ভুল পথে চালিত করবে। এই উপন্যাসে ‘নাস্তি’ এক ভয়ানক অভিঘাত তৈরি করেছে। অধরা সৌন্দর্য, স্বাধীনতাময় প্রকৃতি, স্থিতিজাড্য ও গতিজাড্যের অবিরাম সংঘর্ষ এবং জড় ও চেতনের দ্বন্দ্ব -- এসব কিছু যেন একটা মোড়কে বন্দী করে বলা হয় – এই দেখো, কিছু নেই। সমস্ত জীবনব্যাপী শফি চেষ্টা করে গেছে ওই মোড়ক পাহারা দিতে। আর যে হতভাগা নিতান্ত সহজ সাংসারিক নিয়মে অধরাকে দৈনন্দিন ব্যবহারে আবিল করতে চেয়েছে, মায়া-মঞ্জুষা খুলে দেখতে চেয়েছে, প্রকৃতিকে গৃহস্থালীর উপাদানে পরিণত করতে চেয়েছে – শফি তাকে শাস্তি দিয়েছে। H.G.Wells কথিত justice এবং Revenge এভাবে একজন প্রেমিক demonstrate করে।
খয়রাডাঙা ছেড়ে সেকেড্ডো মখদুমনগরে যাওয়ার পথে কয়েকটি ঘটনা ঘটে। বদিউজ্জামান এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারতেন না। শিষ্যবর্গকে কাঁদিয়ে ঠাঁইনাড়া হয়ে স্মভবত এক ধরণের আত্মসুখ অনুভব করতেন। তিনি ছিলেন ফরাজি ধর্মগুরু, হাতদুটো নাভির ওপর রেখে নমাজ পড়তেন। তাঁর জোরালো উদাত্ত কন্ঠস্বরে ফজরের আজান শুনে সমস্ত গ্রামের ঘুম ভেঙে যেত। তারপর একদিন সমস্ত ভক্তবৃন্দকে অনাথ করে অন্য গাঁয়ে গিয়ে ডেরা বাঁধতেন।
তো সেবার তাদের সাতটি গোরুর গাড়ির কাঁরবা গন্তব্যে পৌঁছয়নি। বদিউজ্জামানকে মৌলাহাটের মোমেনবৃন্দ আটকে দিয়েছিল। কারণ তাদের চোখে ছিল ‘ঐশী নিদর্শন অনুসন্ধানের আকুলতা’। কারণ তারা একখন্ড পাথরের ওপর মৌলানাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভেবেছিল –‘চৈত্রের নীলধূসর আশমানের গায়ে আঁকা সাদা আলখাল্লা আর সাদা পাগড়িপরা ওই মানুষটি দুনিয়ার নয়’। এরপর খুব দ্রুত পুরো মৌলাহাট ফরাজি হয়ে যায়। কারণ ‘ তিনি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে পরে মৌলাহাটের মুসলমানদের কাছে শোনা যায় যে, হুজুর নাকি তাদের কানে গরম সীসার মত কিছু ঢেলে দিয়েছিলেন।‘ আর কিশোর শফি পুরো দল থেকে একা হয়ে মৌলাহাটের পুকুরপারে গিয়ে দেখল দিলরুখ আর দিল আফরোজ, যমজ দু’বোন বুকে পেতলের কলসি নিয়ে সাঁতার কাটছে।
সাতটি গোরুর গাড়ির সেই ক্যারাভ্যান অনেক ঝোপজঙ্গল,উলুশরার মাঠ, শুকনো নদীখাত পার হয়েছিল। এই পথে একটি কালোমানুষ তাদের ভুল পথ দেখিয়ে বিপদে ফেলেছিলেবং একটি সাদামানুষ তাদের সঠিক পথের নিশানা বলে দিয়েছিল। স্পষ্টই বোঝা যায়, গাঁয়ের এক রোদেপোড়া কালো চাষাভুষো এবং একজন অ্যালবিনো ‘যার ভুরু এবং চোখের পাতা পর্যন্ত সাদা ছিল’, তারাই এসব কান্ড ঘটায়। কিন্তু শফি নিশ্চিত ছিল সাদাজিন ও কালোজিন বিষয়ে।

সুন্দরের সঙ্গ যদি চাও, জীবনে মরণে তুমি একা। ( হিমেনেথ, অনুবাদঃ শঙ্খ ঘোষ)
সেই দীর্ঘসফর শফির মনে চিরিস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছিল। সেই প্রথম শফি যেন ‘strange liberty’-এর স্বাদ পাচ্ছিল। এই পথে সে প্রথম একাকীত্ব টের পায়। ‘তখন শফির মন ভারাক্রান্ত, মগজে অন্য দুনিয়ার ঝড়’। বোঝা যায় শফি ধর্মীয় আবহাওয়ায় বড় হতে থাকলেও তার সত্তায় এমন ধাতু কাজ শুরু করে দিয়েছিল, মৌলানা বদিউজ্জামানের পুত্রকে যা মানায় না। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ছিল সেই ধাতু। 

মৌলাহাটে সবাই যখন মওলানা এবং তার পরিবারকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন শফি হঠাৎ একা হয়ে পড়েছিল। এই মহান আপ্যায়ন-পর্বে শফিকে কেউ গণ্যই করেনি। ভীষণ একা। তার খুব অভিমান হয়েছিল। ‘তারপর বাকি জীবন সে একা হয়েই বেঁচে ছিল। জীবনে বহুবার অস্থিরতার মধ্যে ক্রুদ্ধ ক্ষিপ্ত শফিউজ্জামানের আশ্চর্যভাবে মনে পড়ে যেত মৌলাহাটের দক্ষিণপ্রান্তে শাহি মসজিদের নীচে প্রকান্ড বটতলায় একা হয়ে পড়ার ঘটনাটি’। সেদিন যেন সবাই তাকে ভুলে গিয়েছিল। তারপর থেকে ভুলেই রইল। 

সেই সফর ছিল প্রকৃতির কাছে শফির প্রথম পাঠ। প্রথম সমর্পণ।সেদিন সে সম্পূর্ণ ‘নতুন আর অচেনা দুনিয়ায়’ ঢুকে পড়েছিল। ঘাসফড়িং, হনুমান, বটের চিকন পাতার দুলে ওঠা, ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি, একটা খরগোশ। ‘শফি বুঝতে পারছিল এটা মানুষের দুনিয়া নয়’। শফির মনে হচ্ছিল ধু ধু মাঠে, জঙ্গলের বাতাসে একটা সম্মোহনী আরক ছড়ানো রয়েছে। শফির অজান্তেই সম্মোহন-ক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সমস্ত NATURE, যাকে শফি তখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি, সমস্ত শক্তি দিয়ে শফির বুকের ভেতরে ঢুকে পড়ছিল। আরকের অণুর ফাঁকে ফাঁকে যে আন্তর-আণবিক ব্যবধান থাকে, সেই ফাঁকফোকরে মিশে যাচ্ছিল শফির অস্তিত্ব। জলে যেমন চিনি মিশে গেলেও গ্লাসে জলতলের উচ্চতা বাড়ে না, তেমনি সেই প্রকৃতি আগের মতই থেকে যায়, কিন্তু ভ্রমণের পর শফির মগজে জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। বাদবাকি জীবন সে এই নেচারকে রক্ষা করার চেষ্টা করে গেছে। এই নেচারকে যে ছুঁতে চেয়েছে নোংরা হাত দিয়ে, তার জীবনজোড়া বিষণ্ণ গীতিময়তায় যখন কোনও অবাঞ্ছিত স্বর প্রবেশ করেছে – শফিউজ্জামানের সেই ধাতু হঠাৎ জেগে উঠেছে। যেন এ সব কিছুর স্ব-নির্বাচিত পাহারাদার সে-ই। কুমারী প্রকৃতির স্বনিযুক্ত রক্ষাকর্তা। প্রাকৃতিক স্বাধীনতায় যে মূর্খ হাত দিয়েছে, শীতল নিষ্ঠুরতায় তাকেই সে হত্যা করেছে। ফ্রয়েড-ইয়ুং, ডারউইন-ল্যামার্ক, মার্ক্স-এঙ্গেলস-এর ছুরি দিয়ে এ উপন্যাস ব্যবচ্ছেদ ঘটালে শফির মনোজগত বিষয়ে ভুরি ভুরি তত্ব পাওয়া যাবে, কিন্তু তার পরেও কিছু বাকি থাকে।

শফি বলছে -- “ বইটির পাতা উলটেই একটা বাক্য চোখে পড়ল। চমকে উঠলাম। ‘স্ট্রেঞ্জ লিবার্টি’। সত্যই তাই। আমিও প্রকৃতিতে যাই এবং ফিরে আসি অদ্ভুত স্বাধীনতা নিয়ে। সেই স্বাধীনতা প্রকৃতিরই অংশ’। অন্য জায়গায় শফি আবার – “ আমি ধার্মিক নই ... বারিচাচাজি সেই যে কবে আমার মাথায় ‘নেচার’ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তাই আমায় গিলে খেয়েছে। ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায় নাকি ছেলেবেলাতেই পরম সত্য টের পান। আমিও কি পেয়েছিলাম ? সেই সেদিন উলুশরার মাঠে গাড়ির সারির পেছনে আসতে আসতে একলা হয়ে গেলাম, আর তৃণভূমিতে প্রকৃতির রহস্যময় সঙ্গীত শুনতে পেলাম
WHOSE HEART-STRING ARE A LUTE 

মানুষ কি তার নিজের রহস্যময়তা টের পায় ? মানুষ কত সহজে ভুলে যায় তার ইহশরীর, বড় আদরের এই শরীর আসলে আকাশবাতাস, তেজোময় শক্তিকণা, জল, মাটি দিয়ে তৈরি। মৃত্যুতে তো উপাদানের পরিবর্তন মাত্র। জড় ও জীবের ক্রমাগত পরিবর্তন এই জীবন-প্রবাহ। প্রকৃতিকে মানুষ কেমন করে ভুলে থাকে। যদি এই পৃথিবীতে শুধুই জীবন থাকত, কণামাত্র জড় নেই কোথাও, তবে চেতন ও অচেতনের দ্বন্দ্বে জীবনের যে লীলাময়তা ফুটে ওঠে, যথার্থ অর্থে জীবন বিকশিত হয় – কেমন করে সেই সুর বেজে উঠত ? শফিউজ্জামান প্রকৃতির ভেতর সেই সুর শুনতে পেয়েছিল। কে বাজায় ভুবন-দুলিয়ে-দেওয়া পরমসঙ্গীত ? মানুষ বড় বেশি সাংসারিক শব্দে সেই ধ্বনি, বিপুল তরঙ্গময় সেই বীণা শোনে না। আর যে শোনে, তার বড় তকলিফ হয়। এই সঙ্গীত কুয়াশার মত তার মগ্ন-চৈতন্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই সঙ্গীতের সুর দিব্য অথচ বিষাদময় রাগরূপ তৈরি করে। সে একা হয়ে যায়। সে আর এই সংসারের থাকে না। শফি উলুশরার মাঠে প্রথম সেই সুর শুনতে পেয়েছিল। অনন্ত দুঃখের পাষাণ-ভার সেদিনই তার বুকে চেপে বসেছিল। এই পীড়ন দুঃসহ হলে মানুষ চিৎকার করে ওঠে – কেন জন্ম, কেন নির্যাতন ( শংকর চট্টোপাধ্যায় ), তখন গোপনে স্বীকারোক্তি – বিশ্বাস করুন/ এই জন্ম গোগ্রাসে আমার রক্তমাংস খাচ্ছে (শংকর চট্টোপাধ্যায় )। পাতালছায়ার আড়ালে সামান্য একটা ফড়িং-এর ডানার কম্পন, বটের চিকন পাতার বাতাসে দুলে ওঠা – এসব কড়ি ও কোমলে বাজতে থাকে। ‘পরম সত্য’ খুঁজে ফেরেন কনফুসিয়স, সোক্রেতেস, গৌতম বুদ্ধ, সুফি সাধক। শফির সিনা-চাথ হওয়ার আগেই তার কানে মন্ত্র পড়েছিল যে, আকাশপরিধিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই নিহিত পাতালছায়ার গভীরে টানটান বাঁধা ছিল তন্ত্রী। উলুশরার মাঠে হাওয়া উঠেছিল। একটি হাত অসম্ভব সুরেবাঁধা সেই তার ছুঁয়ে দিয়েছিল। whose heart-strings are a lute. সেই হাত এগিয়ে এসে শফিকে বলেছিল – এই নাও, তোমাকে দুঃখ দিলাম। যদি strange liberty চাও, তবে তুমি একা। তোমাকে দিলাম বিষাদ-সিন্ধুর অতলান্ত গভীরতা। এই গভীর থেকে দম নেবার জন্য যখনই শফিকে ওপরে আসতে হয়েছে, যখনই একাকীত্বের পীড়ন দুঃসহ হয়েছে, একটি করে বহ্ন্যুৎসব হয়েছে।
দ্রষ্টাকবি বোদলেয়র বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর লেখায় পাওয়া যায় –‘ তার বিষাদ পরিণত হয়েছে বিতৃষ্ণায় – শুধু জগতের প্রতি নয়, তার নিজেরও প্রতি; এবং বিতৃষ্ণা থেকে সঞ্জাত হয়েছে নির্বেদ ... যার প্রভাবে সময়ের মন্থরতা অসহ্য হয়ে ওঠে, নিজেকে মনে হয় নামহীন ত্রাসে পরিণত এক শিলাখন্ড মাত্র। 

শফির জীবনচক্রের সঙ্গে আশ্চর্য সাদৃশ্য বোদলেয়ারীয় দর্শনের। রুকুকে না পাইবার যন্ত্রণা ইত্যাদি ক্লিশে ভাবনা সরিয়ে রাখলে দেখা যায় বারি চৌধুরি নামের একজন নিপুণ শল্য-চিকিৎসক সেদিন শফির বুকে সফল অস্তর করেন। তার কলিজা থেকে স্থূল আবেগ কেটে বাদ দেওয়া হয় এবং ‘নেচার’ নামক ব্যাপ্তি জুড়ে দেওয়া হয়। ইহাই সিনা-চাথ। এই ব্যাপ্তিই শেষ পর্যন্ত শফিকে অধিকার করে নিয়েছিল। ধর্ম বিষয়ে শেষ পর্যন্ত তার এই ধারণা হয় – “ জিনগ্রস্তের মত একলা, জনহীন কোনও স্থানে থুথু ফেলে মনে মনে বলি, ঘৃণা ধর্মকে – যা মানুষের মধ্যে অসংখ্য অতল খাদ খুঁড়েছে। ঘৃণা, ঘৃণা এবং ঘৃণা। ধর্ম নিপাত যাক। ধর্মই মানুষের জীবনে যাবতীয় কষ্ট আর গ্লানির মূলে। ধর্ম মানুষকে হিন্দু অথবা মুসলমান করে। ধর্ম মানুষের স্বাভাবিক চেতনা আর বুদ্ধিকে ঘোলাটে করে। তার চোখে পরিয়ে দেয় ঘানির বলদের মত ঠুলি।“

শফি ধর্মকে ঘৃণা করতে শিখেছিল। শিখেছিল বললে ভুল হবে। এই ঘৃণা একশ কুড়িদিন পরপর শরীরে লোহিতকণিকাদের মত তার শরীরেও জন্ম হচ্ছিল। এ উপন্যাসে শরীরের কথা অনেকবার এসেছে। শফির প্রথম নারীশরীর গ্রহণের অভিজ্ঞতা সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র কৌশলে লেখা হয়েছে। তার হরিণমারার স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠি রবি তাকে শরীরের রহস্য বোঝাত। অই সময়ে নারীশরীরের বঙ্কিমরেখার রহস্য মনে অনেক ফ্যান্টাসির জন্ম দেয়। শফি তখন রুকুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখত। প্রথমবার অনাত্মীয়া যুবতীর উন্মুক্ত স্তন দেখার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিক্রিয়া এবং পরে আসমার সঙ্গে মিলনের কথা আছে। এ কথাটি খেয়াল রাখা দরকার, কারণ আসমাকে তো সে নিজেই কলুষিত করেছিল, তবু কোনও ঘাতক প্রবৃত্তি তো জাগেনি। বরং সে নিজেই ‘প্রাকৃতিক স্বাধীনতার এই হঠকারিতায়’, শরীরের কাছে আত্মার পরাজয়ে তার মস্তিষ্ক থেকে শরীরকে আলাদা করে নিয়েছিল। তার কাছে হঠাৎ অপরিচিত মনে হয়েছিল তার নিজেরই শরীর। ‘আসমার শরীরে আমার শরীর মাথা কোটার ভঙ্গিতে আছড়ে পড়ছিল। হায় শরীর ! মানুষের হারামজাদা শরীর ! শুয়োরের বাচ্চা শরীর’। দেহমিলনের বর্ণনায় কোনও প্রচলিত উপমা নয়, ‘ মাথা কোটার ভঙ্গি’ এই তুলনা শরীরের কাছে শফির অসহায় সমর্পণ এবং পরাজয়ের ব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। জীবনে একবার অন্তত শফি টের পায়, শরীর কখনও কীভাবে বেইমান হয়ে ওঠে। সব প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ হয়ে যায় এই শরীর।
কিন্তু এসব তো ভূমিকামাত্র। যে ‘সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে মৃত্যুর কাছে উৎসর্গীকৃত হতে হয় ‘ ( প্লাতিন, জার্মান কবি), আসমাক্কে শফি কখনও-ই সেই আসনে বসায়নি। সিতার, স্বাধীনবালা বা রত্নময়ী ছিল সেই প্রকৃতির অন্তর্গত রহস্যময় সৌন্দর্য। অথচ আসমার ক্ষেত্রে – ‘মনে হল সৌন্দর্য বা লালিত্যের তুলনায় আসমার হাতখানি ঈষৎ রুক্ষ আর শক্ত। স্রমজীবী নারীর হাত’। আসমাকে গ্রহণ করে শফি শুধুমাত্র শরীরের হঠকারিতায় বিমূঢ় হয়েছিল। 

সিতারা ছিল কাল্লু পাঠানের বউ। নবাব বাহাদুরের দেওয়ান আবদুল বারি চৌধুরির বরকন্দাজ ছিল কাল্লু পাঠান। লালবাগে নবাব বাহাদুর ইন্সটিটিউশনে ভর্তি হওয়ার জন্য ওরা রওনা হয়েছিল। পথে ইন্দ্রাণী মহালে পৌঁছে শফি খবর পেল রুকুর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে তার অর্ধপশু দাদা মনিরুজ্জামানের। সেখানেই এক সন্ধ্যায় আসমার সঙ্গে তার প্রথম যৌন-স্বাধীনতার আস্বাদ। লালবাগে আসার পর খুব দ্রুত তার রূপান্তর পর্ব শুরু হয়ে যায়। সেখানেই একদিন পান্না পেশোয়ারিকে ইট মেরে শফি লালবাগ ছেড়ে পালিয়েছিল। এই লাইনটি পড়ার সময় আমার অবধারিত ভাবে মনে হয়েছিল এই নামের কোনও বিকল্প হয় না। ‘পান্না’ শব্দে যেন খনিজ কাঠিন্য, ‘পেশোয়ারি’ শব্দ যেন ‘পেশল’ শব্দেরই অনুগ। বিবিমহল্লার দেখভাল, সেলামি আদায় ছিল সমকামী পান্নার পেশা। এই পান্নাকে শফি ইট মেরে পালিয়েছিল। অনেক পরে জানা যায়, তার ঘিলু বেরিয়ে গিয়েছিল। 

সিতারা একটা খেলায় শফিকে জড়িয়ে দিয়েছিল। পান্নার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য শফিকে তাতিয়েছিল সিতারা। পান্নার সমকামিতা, বিবি মহল্লায় মাস্তানি, পান্নার জন্য সিতারার বিপন্নতা একটা চরম বোঝাপড়ার লক্ষে শফিকে বলেছিল – আঘাত করো। এই ঘটনা শফির জীবনে বারে বারে ঘটেছে। প্রকৃতির স্বাধীনতার অন্তর্গত সিস্টেমে যে আঘাত করেছে, disintegrate করার চেষ্টা করেছে, অই রহস্যময়তাকে ছুঁতে চেষ্টা করেছে – সেই মুহূর্তে বিষাদময় এক কুয়াশার ভেতর থেকে ‘নামহীন ত্রাসে পরিণত এক শিলাখন্ড’ জেগে উঠেছে। H.G.Wells—সেই justice আর revenge, বিদ্রোহী ঘাতক সত্তা জেগে উঠেছে। 

এই সিতারা ‘মনুষ্যভোগ্য নহে’ – এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল শফি। ‘উহা প্রকৃতির অন্তর্গত’। একদিন বিকেলে কেল্লা নিজামতের পেছনের গঙ্গায় সাঁতার দিতে দিতে সিতারা শফিকে ডাক দিয়েছিল –‘ আও শফীসাব খেলুঙ্গি।‘ শফি সে ডাকে সাড়া দেয়নি। কারণ –‘ আমি যদি জলে ঝাঁপ দিতাম, ও নষ্ট হয়ে যেত’। স্বর্ণময় সৌন্দর্য ছুঁয়ে দিলে মোহাবরণ খসে যায়। কনক-বিভা নিতান্ত পাউডারে ও যা ছিল তেজস্ক্রিয়, অস্পৃশ্য, উজ্জ্বল ধাতু, সেটি disintegration-এর ফলে শেষ পর্যন্ত সিসায় পরিণত হয়। 

সেই সিতারাকে বহুদিন পরে শফি আবার যখন দেখল, তখন সিতারা দৈনন্দিন ব্যবহারে ধূসর। তখন সে আর আশমানের সিতারা নয়, লেখক তাকে উল্লেখ করেন – সিপাহী বধূ। মুহূর্তে সেই বোঝাপড়ার আকাঙ্ক্ষা শফির বুকের ভেতর জেগে উঠল। সিতারাকে যে সিপাহী বধূ বানায়, সে অবশ্য বধ্য। ‘চোখের সে দীপ্তি কই ? সুরমার টান আছে, কিন্তু দৃষ্টিব্যাপী ধূসরতা। কন্ঠার হাড় ঠেলে উঠেছে। শফি কুরশিতে বসল, কিন্তু মুহূর্তে অনুমাণ করল কাল্লু এগুলো কেল্লাবাড়ি থেকে আত্মসাৎ করেছে।‘ যথেষ্ট, যথেষ্ট। এই চ্যুতি, System-এর পরাজয়ে শফির বোদলেয়ার কথিত ‘শহীদ ও ঘাতকের আবেশ জাগ্রত হয়ে উঠল। 

মৃত্যু নয়, শফি চেয়েছিল জীবন ও মৃত্যুর এক সম্বন্ধস্থাপন। কিন্তু আমরা দেখি জীবনের শেষ। শফি দেখে রূপান্তর। তার কোনও পাপবোধ জাগে না। লম্বা-নেকো সেপাই দেখে গারদের ভেতরে শফির একা একা কথা বলা। সিতারার জন্য বধ হয়েছিল কাল্লু পাঠান আর পান্না পেশোয়ারি। স্বাধীনবালার জন্য স্ট্যানলি-হত্যা সংঘটিত হয়েছিল। আর রহস্যময়ী রত্নময়ীকে মুন্সিজি শফির থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। শফির কাছে জানতে চেয়েছিলেন –‘কেন এসেছ তুমি ? কীসের জন্য ? ... বৃদ্ধের এই স্পর্ধা ‘শিলাখন্ডকে আবার চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করাল। সম্ভবত ‘বেশি জানতে চাইলে মাথা খসে যায়’ এই নোটিস বৃদ্ধের জানা ছিল না। ‘চূড়ান্ত প্রশ্নের দিকে ধাবিত হওয়ার দরুণ এক সেমেতীয় বৃদ্ধ নিহত হন।‘ 

এই চূড়ান্ত প্রশ্নের দিকেই তো শফির ক্রমাগত অণ্বেষণ ছিল। এই চূড়ান্ত প্রশ্নই ছিল শফির গোপন ত্রাস এবং সংসারের মলিনতা থেকে দূরে, বিষাদময় কুয়াশায় লুকিয়ে রাখা সম্পদ। অথচ বৃদ্ধ আবিল হাতে ছুঁতে চেয়েছিল ওই স্বর্ণময় নিস্তব্ধ যন্ত্রণা। একটা বোঝাপড়ার সামনে শফির অস্ত্র উদ্যত হয়, সত্যিই বৃদ্ধের মুন্ডূ খসে পড়ে। বৃদ্ধ দার্শনিক সম্বন্ধে শফির আরও সন্দেহ ছিল – ‘ যে রত্নময়ীকে সে একটু আগেই দেখেছিল পুজোর নৈবেদ্য নিয়ে চলেছে, শরীরে পিচ্ছিল গরদ, অনাবৃত পীত দুই বাহু’ ... শফি নির্নিমেষ দর্শন করে সেই রূপ অথবা মায়া ... অথচ কিছুক্ষণ বাদে যখন ... প্রাচীন দেওয়াল থেকে টেরাকোটা রূপ ত্যাগ করে জীবন্ত হয় অর্থাৎ মায়া বর্জন করে নিতান্ত লৌকিক হয়ে ওঠে, তখন শফির সন্দেহ দৃঢ় -- ‘মুন্সি আবদূর রহিম, আপনার কারচুপি সবই।‘ সেই মুহূর্তেই বৃদ্ধের মৃত্যু সুনিশ্চিত হয়। কারণ সেই বৃদ্ধ মায়া-জগৎ থেকে রত্নময়ীকে নিতান্ত এক লৌকিক নারীতে পরিণত করে। মূর্খ প্রকৃতির স্বাধীনতায় হাত দিয়েছিল।
দীর্ঘ, প্রায় একশ বছরের সামাজিক পট পরিবর্তনের ইতিহাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে মূলত একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাস। কখনও সলিটারি সেল-এ শফির আত্মকথন, কখনও বদিউজ্জামানের বয়ান, জেলা-সমাচার বার্তার রিপোর্টিং-এর আড়ালে, পুরনো দলিলদস্তাবেজ, শেষ পর্বে বৃদ্ধা দিলরুখ বেগম ও নাতিনাতনিদের মধ্যে কথোপকথনের মাধ্যমে এই উপন্যাসের নির্মাণ। দিলরুখ(রুকু) বেগমের আত্মবিলাপের ঢং-এ তার প্রতিবন্ধী স্বামীর কবরের সামনে confession পর্বের শেষে তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে নির্জনে প্রকৃতিগত পারিপার্শ্বিকের শব্দসমূহ হঠাৎ অর্থবহ হয়ে উঠেছিল। এই তো শফি ফিরে এল। ওই তো শফির কন্ঠস্বর। শফি, তার শ্বশুরের ছোটপুত্র। অনেকদিন আগে ষোলো বছরের কিশোর শফিকে পুকুরঘাটে প্রথম দেখেছিলেন। তিনি তো ওই কিশোরের জন্যই নির্দিষ্ট ছিলেন। শফির সঙ্গে তার শাদি হয়নি। এমন কী, ফাঁসি হওয়ার পর তার লাশ পর্যন্ত মৌলাহাটে আসেনি। শফি তাকে ফেলে চলে গিয়েছিল অনেক দূরে। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে ‘ল্যাংড়াভ্যাংড়া’ স্বামীর কবরের সামনে বসে বৃদ্ধা যখন সেই স্বামীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন, তখন সমস্ত ঘাস, ফড়িং, লাইম-কংক্রিটের চাঙড় – এসব ঘিরে পাক খায় একটা বাতাস। চুপচাপ, ফিসফাস উচ্চারিত শব্দগুলো বহন করে শফির নির্ভুল কন্ঠস্বর – রুকু রুকু রুকু ...
এক একটি স্তরের ভেতর দিয়ে শফির ক্রমশ রূপান্তর এবং সেই সূত্রে উপন্যাসের পর্বান্তরের মধ্য দিয়ে ঊনিশ-বিশ শতকের একটি পির পরিবারের অবস্থান, সামাজিক পট-পরিবর্তন, মুসলিম সমাজ, ব্রাহ্ম সমাজ, বিপ্লবী কর্মকান্ড – এসব কিছু এমন নিপুণ ভাবে বিন্যস্ত যে, পাঠকের পক্ষে সময়ান্তর কোনও সমস্যা সৃষ্টি করে না। সমস্ত উপন্যাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আরবি, ফারসি শব্দ উপন্যাসের গতিকে কখনও বিঘ্নিত করেনি, বরং প্রার্থিত আবহ বিস্তারে প্রসাধন কর্মই করেছে। এ উপন্যাসে ওইসব শব্দের কোনও বিকল্পের কথা ভাবাই যায় না। 

হিন্দু পাঠকের কাছে এই উপন্যাস আশ্চর্য জানালা খুলে দেয়। অচেনা, অজানা দৃশ্য ফুটে ওঠে পরিচিত আয়নায়। বিস্ময় জাগে। এই বাংলার বাংলা ভাষার পাঠক, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছেন যারা, তাদের কাছে মুসলমানী সাধারণ সমাজ, তাদের আদবকায়দা, তাদের বিশেষ আচারব্যবহার অপরিচিত নয়। কিন্তু একজন মৌলানা ও তার পরিবারকে কেন্দ্র করে প্রতিটি খুঁটিনাটি, বিশেষভাবে পালনীয় ধর্মীয় আচরণ, হিন্দুদের তুলনায় শিক্ষিত মুসলমান সমাজের পিছিয়ে পড়ার আক্ষেপ, ধর্মের প্রতি আনুগত্য এবং পির পরিবারের অন্তঃপুরের ব্যক্তিগত হাসিকান্না এমন নিপুণ Details-এ বর্ণিত যে, পাঠকের কাছে অপরিচিত জগৎ বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে শুধু বয়ন কৌশলে। ইসলামিক শাস্ত্র থেকে কাহিনির প্রয়োজনে অনেক টুকরো ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তার মর্মোদ্ধারের জন্য কোনও পাঠককে আলেম বা ফাজিল হতে হয় না। অসংখ্য শাস্ত্রীয় বচন, প্রবচন, ঐশী ঘটনার প্রয়োগে মানুষের জীবনের কথাই বলা হয়েছে। 

একটি কাহিনি তখনই পাঠকের বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন পাঠক ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কাহিনির সত্য যাচাই করে। এ উপন্যাস পড়তে পড়তে “ যাঃ এ রকম হয় না” এ রকম ভাবনার কোনও অবসরই নেই। এ উপন্যাসের অবয়বে আমাদের লৌকিক জীবনের সমস্ত উপাদান উপস্থিত থেকেও অদ্ভুত এক রসায়নে আলাদা হয়ে যায় বাংলা ভাষায় লেখা অন্যান্য উপন্যাস থেকে। নির্মাণরীতি, বিষয়বস্তু, নির্মাণের কারুকুশলতার অভিনবত্বে এটি সহজেই আলাদা হয়ে গেছে আমাদের সাহিত্যে। লৌকিক উপাদান শনাক্ত করা সহজ, কিন্তু উপন্যাসের রক্তমাংসের আড়ালে মাননীয় মুস্তাফা সিরাজ যে ‘সত্য’ রচনা করেছেন, সেটি ব্যাখ্যা করা যায় না। সেটি অনুভবের। মনযোগী পাঠক নিশ্চয় টের পেয়েছেন দুটি লাইনের মাঝে ধাতব-শীতল নির্লিপ্তির সেই অপেক্ষমানতা। Strange Liberty যখনই বিপদে পড়েছে, তখনই সেই ধাতব-শীতল ক্রুদ্ধ গরগর ধ্বনি। কঠিন ও জটিল পরিকল্পনা, মানবমনের জটিলতা, ইতিহাস-সমাজ-ধর্ম-দর্শন – এসবের প্রাজ্ঞতা মন্থন করে, শৈল্পিক শুচিতা অক্ষুন্ন রেখে ‘অলীক মানুষ’ নির্মাণ করেছেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। এই নির্মাণের দৃঢ় ফাসাঁদ, তীক্ষ্ণ মিনার, খিলানওয়ালা গম্বুজ ও ললিত ঝরোকা ‘‘অলীক মানুষ’ কে অন্যতম মহতী উপন্যাসের মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের নিতান্ত লৌকিক উঠোনে দেখি ‘সেদরা বৃক্ষ’। সেই স্বর্গীয় তরু।

একটি বাজে কথা
এই কেতাবের প্রতিটি অধ্যায়ের পূর্বে একটি অশ্বের চিত্র মুদ্রিত হইয়াছে। ওই চিত্র ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। আমি নিশ্চিত, ছবি রঙিন হইলে অশ্বের শরীরে সিঁদুরের লালছোপ দেখা যাইত। পিরের সাঁকোর নীচে এইরূপ দেখা যায়। ইহা টোটেম। উহা মন্দিরগাত্রের টেরাকোটার ঘোড়া বা ‘বোররাখ’ হইতে পারে। কিংবা এই অশ্বের আরোহী হইয়াই কি শফিউজ্জামান মৌলাহাটে তাহার আম্মার সহিত সাক্ষাৎ করিতে রওয়ানা হইয়াছিল ? কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই দিবস তাহার সহিত কোনও ঘোড়া ছিল না। এইরূপ শুনা যায়, একটি কালো জিন অশ্বরূপ ধারণ করিয়া শফিকে মৌলাহাটে পঁহুছায়। শফি একা ছিল।



লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস

গল্পকার, উপন্যাসিক
জন্ম : ১৯৫০, থাকেন শিলিগুড়িতে।
গল্পগ্রন্থ: শঙ্খপুরীর রাজকন্যা
উপন্যাস : লালবল। সরমার সন্ততিরা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন