বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

জীবনানন্দ দাশের গল্প

রহমান মতি

যে কোন কবি যখন কথাসাহিত্যে হাত দেন তাঁর বাঁক নির্ধারিত হয় তখনই। কবি যেভাবে লেখেন কথাসাহিত্যিক সেভাবে লেখেন না। কবি ও কথাসাহিত্যিকের রচনার স্বাতন্ত্র্য এবং পার্থক্য আধুনিককালের সাহিত্যচর্চায় বড় আলোচনা-সমালোচনার বিষয়। বিশ শতকের জীবনানন্দ দাশ কবি হিসেবে সবচেয়ে আধুনিক কিন্তু কথাসাহিত্যে তিনি কি আলোচনার এ কেন্দ্রে এসে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

উপন্যাস ও গল্প কবিতার রেখায় চলে না। চলাটা উচিতও নয়। বিশ শতকের অন্যান্য কথাসাহিত্যিকরা কেউ কেউ কবি। কেউ পুরোদস্তুর কথাসাহিত্যিক। জীবনানন্দ দাশের কথাসাহিত্যে উপন্যাস গল্পের সার্থকতার প্রশ্ন-ই উত্থাপিত হয়। আমাদের বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ যেমন তেমন আর কেউ নয়। জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস-গল্প কাঠামো ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে এসেছে। পাঠের পর পাঠক ও সমালোচকদের মনে হয়েছে ঠিক উপন্যাস বা গল্পের ধাঁচ যেমন হয় জীবনানন্দ দাশ তা মানেননি।
আপত্তির জায়গায় অবশ্যই যুক্তি রয়েছে। আরো বলা যায় জীবনানন্দের ব্যক্তি জীবন থেকে। তিনি তাঁর উপন্যাস ও গল্প প্রকাশ করেননি। পড়তে দিয়েছেন একজনকে। প্রভাকর সেন। প্রভাকর সেন জীবনানন্দকেই উপদেশ দিয়েছেন তাঁর গদ্যকে পুনর্গঠিত করার জন্য এবং আদর্শ হিসেবে অন্নদাশঙ্কর রায়কে সামনে রাখতে বলেছেন। কারণ অন্নদাশঙ্করকে বিশ্বসাহিত্যের পাঠে সর্বাপেক্ষা পরিশীলিত ভাবা হতো। জীবনানন্দ তা মানেননি। তবে কি প্রভাকর সেন জীবনানন্দের গদ্যকে বুঝতে পেরেছেন? উৎকৃষ্ট পাঠক আসলে ছিলই না। অথবা, রাজনৈতিক ঘেরাটোপে জীবনানন্দ এক অব্যক্ত লোক হিসেবে পরিচালিত ছিলেন।
কবিতায় ধূসর পা-ুলিপি থেকে তাঁর যে প্রকৃত বাঁক নির্মিত হয়েছিল তার মাত্রা ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের। ক্রমশ বনলতা সেন ইতিহাসমুখর রোমান্টিক চেতনার কাব্য, মহাপৃথিবীর বৈশ্বিক চেতনা, সাতটি তারার তিমির-এর আন্তর্জাতিকতা কিংবা বেলা অবেলা কালবেলার রাজনৈতিকতা প্রচ-ভাবে তাঁকে আধুনিক করেছে। উপন্যাসে গল্পে যে বাঁক নেই এটা নিহায়ত প্রচারমুখী প্রচলিত ভাবস¤পদ এবং তৈরি করা সংস্কারমূলক মানসিকতা। ¯পষ্টই উপন্যাস কবিতা থেকে আলাদা কারণ এতে আছে মনস্তাত্ত্বিক প্রবাহ যা বাংলা উপন্যাসে মাল্যবান এর মাধ্যমেই শুরু। কারুবাসনাÑ যার কেন্দ্রীয় শক্তি-ই হচ্ছে লেখকসত্তা। প্রতিটি লেখক-ই তো এই বাসনার শিকার এবং বাস্তবতার কারিগর। গল্প-তে জীবনানন্দ মানসিকতা ও মনস্তত্ত্বের ধারাবাহিক অথচ ভিন্নভাবে ছড়ানো বহুমুখী বদলকে যেভাবে দেখান তাতে বিশ শতকের একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেখানে উজ্জ্বল মনে হয়। গল্পের প্রচলিত ফর্ম এবং তাকে মানা না মানার যে প্রশ্ন আসে তা কেনই বা আবদ্ধ থাকবে একই রীতিতে। তাকে যদি আলাদাভাবে উপস্থাপন করা যায় তাহলে জীবনানন্দের গল্প আর ব্যর্থ থাকে না।
জীবনানন্দ দাশ গল্পে সাধারণ বা প্রথাগত বিষয়কে পুঁজি করে তার চর্চা করেননি। তিনি বারবার প্রচলিত ফর্মকে ভেঙ্গেছেন। প্রথমতই তাঁর গল্প পাঠের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রচলিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। জীবনানন্দ একান্তভাবেই বিশ শতকে বেঁচে থাকা একজন মানুষ। সেই বিশ শতকে যেখানে উপনীত হতে না হতে মানুষের জীবনযাপন ক্রিয়া হঠাৎ নানারকম দার্শনিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সংঘাতের মুখোমুখি হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত সর্বজনীন শৃঙ্খলাকে ভেতরে-বাইরে আক্রমণ করে স্থানীয়তা আর তাতে স্থির না হতে দেয়া বহিরাগত অভিজ্ঞতা সময়প্রবাহের মাধ্যমে নানা জ্ঞান-নির্জ্ঞান, ভেদ-অভেদকে ¯পর্শ করে। সূত্রগুলো যৌথতার পরিপূরক। সেজন্য-ই তার গল্প হয়ে ওঠে নানা রকমের গঠনকৌশল ও বিষয়সমৃদ্ধ। তাঁর গল্পের মতাদর্শও অভিজ্ঞতানির্ভর ব্যক্তিক-জৈবিক-সামাজিক কঠিন বাস্তবতামুখর।
গঠনকৌশলের চিত্রে তার গল্পের চরিত্র ও পরিবেশের তারতম্য এরকম-
ক. অবিভাজ্য একজন ব্যক্তিপুরুষ ও মানবী।
খ. পরোক্ষ গল্প যা কথকের আওতাভুক্ত।
গ. নাটকীয়তা (যা থাকে মূলত বর্ণনাভঙ্গিতে)।
ঘ. ইতিকথা। অতিকথন বা বক্তৃতার বিতর্ক।
ঙ. কেন্দ্রীয় চরিত্রকে খাড়া করার স্বাভাবিকতা।
বিষয়কে বারবার তিনি কেটেকুটে নেন তা নয় কিন্তু বিষয়ের মধ্যেই তার অন্তঃবৈচিত্র্য আনেন। নর-নারী এটাই তো বিশ্বব্রহ্মা-ের চরিত্র। তাই একে ভেঙ্গে-গড়ার যে প্রবণতা তাতেই জীবনানন্দ গল্পে ব্যবহার করেন নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের রেখা এবং সেগুলো তাঁর শিল্পদৃষ্টির পাশে মতাদর্শিক চিহ্ন হিসেবে প্রকাশিত হয়। যেমন-
ক. ব্যক্তিমানুষ খ. অর্থনৈতিকতা
গ. স্বগত কথন ঙ. চরিত্র ও তার মতাদর্শ
ঘ. মনস্তত্ত্ব ছেদ-বিচ্ছেদ (প্রেম, যৌনতা ইত্যাদি)

ক. ব্যক্তিমানুষ
কেন্দ্রীয় চিন্তায় জীবনানন্দ গল্প রচনা করেছেন এবং প্রতিটি গল্পের ক্ষেত্রে এই কেন্দ্রীয় চিন্তাটি উদ্ভূত হয়েছে। সর্বাত্মকভাবেই তা অস্তিত্বের উপস্থিতিকে বারবার জানান দিয়েছে। তাঁর গল্পের চরিত্র বা জীবনবৃত্তের পরিধির অথবা কিনারের অধিবাসী। যা তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাই তার কাছে নিজস্ব জীবনবোধ। তিনি যে জীবনে বাস করেননি তার বাইরের জীবন যেটি সেটা তাকে টানেনি।
কিনার ? পরিধি
এই বৃত্তের কাঠামোতে অস্তিত্বের মাত্রানির্ণয় করাই আধুনিক বিশ শতকের অভিজ্ঞতালব্ধ শিল্পবীক্ষার অন্যতম সূত্র। গদ্যরীতিতে আমি কে কথকরূপে ব্যক্তিক করে তুলতে জীবনানন্দ সামাজিক অন্তর্বয়ানের প্রতিভু যে ব্যক্তিসত্তা তাকেই নির্মাণ করেন। ব্যক্তিসত্তা তার মৌল জীবনযাপনের সংক্ষুব্ধ সমস্যাগুলো আত্মার অনু-পরমাণু স্তরে উদঘাটন®পৃহা নিয়ে থাকে। বিচ্ছিন্নতাবোধ, বিপন্নতা বা অনির্দিষ্টতা এই গদ্যে বাস্তবতা কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কিয়ের্কেগার্দ ব্যক্তিমানুষকে অস্তিত্ব রক্ষায় বাস্তববাদী হতে বলেছেন। জীবনানন্দের ব্যক্তিমানুষ এই ‘আমি’র মধ্যে ঘুরে ফিরে কথোপকথনে মনোলগ ব্যবহার করে-
এই বিকৃত শবদেহ নিয়ে মানুষ বলে আপনাকে চালিয়ে দিচ্ছি- মনুষ্যত্বের এত বড় অপমান তার বড় অসহ্য মনে হলো।
(ছায়ানট)
কথক আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে সঙ্গঃনিঃসঙ্গ গল্পে হয়ে আসে এককেন্দ্রিক। চিঠি ও ডায়েরির ভঙ্গিতে লেখা। চিঠি বা গল্পের বিষয়বস্তু কী? এ প্রশ্ন খুব হালকা মনে হতে পারে। অথচ এর ভেতরেই বিচ্ছিন্ন বা নিঃসঙ্গ ব্যক্তি আমি। নানাভাবে বিকশিত হতে থাকে। জীবনানন্দের স্বভাবসুলভ হতাশা, মৃত্যু, মরুভূমি, মৃত্যু ও বিচ্ছেদ এখানে তার প্রকাশ তীব্র। তাঁর বিকশিত জগত-ই তাকে নিঃসঙ্গতার মধ্যেই যেন এক ধরনের অহমকে প্রতিষ্ঠা করেছে। দা¤পত্য স¤পর্ক সেখানে একপ্রকার নেই-ই কারণ স্ত্রী বহুদিন থেকেই স্বামীর কাছে নেই। শূন্যতাকে তিনি আদরণীয় করে তোলেন যখন আর কোন হিসাব থাকে না। মনে হয় ব্যক্তি যেভাবে মৃত্যুবরণ করে একা তাতে মনে হয় মৃত্যুটার দায় সবারই। কবিতায় যেমন-
কেবল ব্যক্তির-ব্যক্তির মৃত্যু শেষ করে দিয়ে আজ
আমরাও মরে গেছি সব-
(সূর্যপ্রতিম/সাতটি তারার তিমির)
খ. স্বগতকথন
স্বগতকথন একটি টার্ম হিসেবে সাহিত্যে ব্যবহৃত। নামে তার পরিচিতি। জীবনানন্দ দাশের গল্পে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বয়ানের প্রাধান্যে এই বৈশিষ্ট্য থাকে যেখানে নিজেরা অর্থাৎ নায়করা কথা বলে বেশি। বলবার জন্য তার কথার যেন অভাব নেই। উপন্যাসে হেম, মাল্যবান, সুতীর্থ, হারীত-রাও এ ধরনের বেশি বেশি আত্মভাব প্রকাশকে বড় করে তোলে। মূলত ব্যক্তির স্ফূরণেই তার বিকাশ। ‘ঝবষভ’- বলতে যে বিষয়টি আছে তার জন্য আমাদের এই ব্যক্তির প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। সে যতক্ষণ বলে একাই বলে এবং যতক্ষণ বলে তার বলায় ধীরে ধীরে সমগ্রতা আসে এবং পরিপার্শ্বকে বড় পরিবেশে দেখায়।
‘সঙ্গঃনিঃসঙ্গ’ গল্পে সম্বোধনহীন চিঠিতে বর্ণনার ধাঁচটি স্বগতোক্তির। স্ত্রী অনুপমাকে বিয়ের পর কয়েক মাস তার কাছে রাখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার স্ত্রী সেই যে পিতৃগৃহে গেল আর এল না। পত্রলেখক পুরুষটি তখন কেবল হতাশায় ভোগে এবং তা ক্রমশ মর্ষকামী হয়। স্বগতোক্তিতে তার একান্ত মনস্তত্ত্ব প্রকাশ পায়-
এই যে দীর্ঘকাল তুমি আমার কোনো খোঁজখবর নেও নাই। আমিও তোমাকে কিছু লিখি নাই- এই শূন্যতা আমার কাছে বড় গভীর পরিতৃপ্তির জিনিস।
(সঙ্গঃনিঃসঙ্গ)
গ. মনস্তত্ত্ব ছেদ-বিচ্ছেদ
আধুনিক সাহিত্যকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য চৈতন্যের এমন একটি স্তরকে ছোঁয়ার আকাক্সক্ষা যা সমাজ-সংস্কার, লোকশিক্ষা, ধর্মপ্রচার, ইতিহাসচেতনা, রাজনৈতিক প্রচার এসব ছাড়াও সৃষ্টি রহস্য যা মূলত এক কালহীন অনন্ত গূঢ় শৃঙ্খলার সঙ্গে স¤পৃক্ত। স্মার্ট, ঝরঝরে, চালাক, রাগী বা আক্রমণাত্মক গদ্য নয় বরং স¤পূর্ণ একা একক গদ্যরীতির ভাষা। বোধ-এর জগতে যা ‘স্বপ্ন নয় কোনো এক বোধ কাজ করে’। বোধের স্তরে বহুস্তরকে সামঞ্জস্য করে মনস্তাত্ত্বিক স্ফূরণ ঘটে। সেখানে গতি-প্রকৃতি এত বিচিত্র ও স্বতন্ত্র যে প্রতিটি গল্প-ই সে রেখাকে ¯পর্শ করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন