হাসান আজিজুল হকের গল্পে সাধারণ নরনারীর ম্লান ও তুচ্ছ জীবনকেই উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেনI এ গল্পের প্লট হিসেবেও তিনি বেছে নিয়েছেন আশির দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের অব্যবস্থাপনা। সহস্রাব্দের লক্ষ্য অর্জনে ডামাডোল পিটালেও বাংলাদেশ কি সেই অব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, মনে হয় না। গল্পের দ্বিতীয় প্যারায় হাসান আজিজুল হক সে সময়ে একটি হাসপাতালের এমারজেন্সির রিসেপসনের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এখনকার কোন সরকারি হাসপাতালের অভ্যর্থনার বাস্তব চিত্র-
'টেবিল-সামনে চেয়ার-বসা এমারজেন্সির লোকটি চোখ তুলে তাকালো, কিছু দেকলো না। এই সময়ে একবার টেলিফোন বেজে উঠলো। লোকটার ভুরুতে একটা গিট পড়লো। দ্বিতীয়বার টেলিফোন বাজলো। তার ভুরুতে দুটো গিঁট পড়লো। তিনবারের বার সে চেয়ার থেকে একটু ঝুঁকে টেলিফোন তুলে বললো, হ্যাঁ এমারজেন্সি। তারপর একটু শুনে নিয়ে বললো, জানি না। তারপর আবার একটু শুনে বললো, পারবো না, লোক নেই। বলে টেলিফোন রেখে দিলো। মুখ নিচু করে সে আবার টেবিলের উপর কিছু দেখতে দেখতে সরু লম্বা আঙুল চালিয়ে নাকের ভিতর থেকে লোম টেনে টেনে ছিঁড়তে লাগলো। ফের টেলিফোনের শব্দ লোকটা টেলিফোন তুলে বললো, হ্যাঁ, এমারজেন্সি। একটু শুনে বললো, তাতে হয়েছে কি? মাথা কেটে নেবেন নাকি? আবার শুনে বললো, বেশ করেছি, এখান থেকে কাউকে ডেকে দেওয়া হয় না। লোক নেই। তারপর কিছুই না শুনে একনাগাড়ে বলে চললো, ভদ্রতা, ভদ্রতা দেখাচ্ছ আমাকে... তুমি কি নবাবপুত্তুর- যা যা, যা পারিস কর। বেশি তড়পাস না। বলে ঝড়াম করে টেলিফোন রেখে দিয়ে বললো, তুমি আমার কলা করবে।'
পরিবেশ পরিস্থিতি বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে হাসান আজিজুল হকের কোন জুড়ি নেই। হাসপাতালের আনাচে কানাচের ছোটছোট ঘটনার নিখুত বর্ণনায় তিনি হাসপাতালের অসহনীয় পরিবেশকে জীবন্ত করে তুলেছেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা যে সকলের জন্য নয় বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা তা গল্পর বর্ণনায় বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি পরিবেশ, সমাজ নিয়ে স্যাটায়ার করেন গল্পোচ্ছলে। এমারজেন্সিতে আড্ডা দিতে বসা কতিপয় লোকের মধ্য থেকে একজন জখন বলে ওঠে-'শিক্ষিত লোকের মুখ এমনিতেই বন্ধ আছে। বন্ধ থাকাই ভালো। খুললে দুর্গন্ধে দেশে টেঁকা দায় হবে!'
বর্তমান সময়ে ডাক্তারদের বদলী বানিজ্য নিয়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থতি চলছে তা হাসান আজিজুল হক উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন ১৯৮০ সালে, গল্পটি লেখার সময়কালে। তখনকার পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ কি বেরিয়ে আসতে পেরেছে, গল্পের এই উদ্ধৃতিটুকু পড়লেই পাঠক তা উপলদ্ধি করতে পারবেন-
ট্রান্সফার, ট্রান্সফার- ডাক্তার হতাশ গলায় বলেন, পেরিফেরি থেকে পেরিফেরিতে, সেন্টার থেকে পেরিফেরিতে নয় অর্থাৎ এখান থেকে আর এক মফস্বলে, ঢাকা থেকে এখানে নয়। ঢাকা হলো সেন্টার সেখান থেকে বাইরে পেরিফেরিতে কেউ আসবে না, আর পেরিফেরি থেকে ঢাকায় বদলি হবে তেমন ভাগ্য দু-চারজনেরই। ঘুরে মরো পেরিফেরি থেকে পেরিফেরিতে। এই ধরনের ট্রান্সফারের প্রতিবাদে দুজন লম্বা ছুটি নিয়ে বসে আছেন, ট্রান্সফার স্বীকারও করবেন না, অস্বীকার করবেন না, কাজেই যারা ছুটি নিয়ে বসে আছেন, তাঁদের বদলিতে লোক আসছে না। এর মধ্যে তদবির-টদবিরে ট্রান্সফার বন্ধ হয় ভালো, না হলে এই অবস্থাই চলবেI
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র অঙ্কনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অনৈতিক দিকটিও তিনি তুলে ধরেছেন। অসুস্থ্যতার কারনে হাসপাতালে ভতর্ি হওয়া শিক্ষিত তরুণের যখন অপারেশন হচ্ছিল না, তখন ডাক্তার একদিন তাকে চেম্বারে ডেকে নিয়ে বলে-' শুনুন, আমার বাসায় প্রাইভেটলি এই কাজটি করতে আপনার কাছ থেকে দু হাজার টাকা নিতাম। একটি পয়সা কম নয়। কিন্তু তার উপায় নেই, আপনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেছেন। টাকা যখন পাচ্ছিই না, বিনি পয়সায় দুটো ভালো উপদেশ দিতে দোষ কি!'
পাতালে হাসপাতালে গল্পের কাহিনী ও সমাজের শ্রেণি চরিত্র গল্পের বুননকে বহুমাত্রিকতা দান করেছে। সমাজের নিম্নবিত্ত শে্রণীর জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা যে সুদুর পরাহত তা তিনি মূর্ত করে তুলেছেন। গল্পে ঘটনার ঘনঘটা নেই কিন্তু হাসপাতালের পারিপাশ্বর্িক বর্ণনায় তা সময়ের দর্পণ হিসেবে ফুটে উঠেছে।
হাসান আজিজুল হকের গল্পের নায়করা নির্মোহ, প্রেম ও রোমান্সের বিপুল ঐশ্বর্য নেই, চরিত্রগুলো নিতান্তই সাধারণ, তাতে কোনো চমক নেই, আবেগ নেই, আকাশস্পর্শী আদর্শ নেই, আছে বাস্তবজীবনের উত্তাপ। 'পাতালে হাসপাতালে গল্পের চরিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন সহায় সম্বলহীন দিনমজুর জমিরুদ্দীকে, কাজ করতে গিয়ে তার পায়ে ঢোকে গাছের কাটা, টেনে বের করতে গিয়ে তা ভেঙ্গে অর্ধেকটা বেরিয়ে আসে। কয়েকদিনপর সেস্থান থেকে অল্প অল্প পুজ বের হতে থাকলে সে শরণাপন্ন হয় এলাকার নাপিতের। নাপিত ছিদ্রমুখে নরুন ঢুকিয়ে ভাঙ্গা কাটা বের করে আনার চেষ্টা করে, কিন্তু সম্ভব হয় না। সপ্তাখানেকের মধ্যে পা ফুলে ঢোল। ব্যথার জ্বালায় অস্থির জমিরুদ্দিকে গ্রামের দুজন শুভাকাঙ্খি দিনমজুর ঘাড়ে করে নিয়ে এসে দড়াম করে ফেলে সরকারি হাসপাতালের এমারজেন্সির রিসেপশনের সামনে।
এখানে এনেছ কেন?
ওর বাপ নাই হুজুর।
দুত্তেরি, বাড়িতে থাকতে কি হয়েছিলো? এখানে এনেছো কেন?
বুড়ো ভয়ে ভয়ে বললো, হুজুর হাসপাতাল বুলে।
হাসপাতাল তো কি হবে?
হুজুর, গরিবের আর কি উপায় আছে?
এখানে কিছু হবে না- বলে এমারজেন্সি দরজা দিয়ে বাইরের গরম রোদের দিকে চেয়ে রইলো।
দিনমজুর জমিরুদ্দিনের শেষ ভরসাস্থল হাসপাতালে এসে রিসেসশনিষ্ট এর কথাশুনে হতাশ হয় কিন্তু আশা ছাড়ে না, চুপচাপ দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিক্ষিত তরুণ রাশেদ জমিরুদ্দিনের কষ্ট দেখে প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছেন কিন্তু ডাক্তারের ধমকে তিনিও মিইয়ে গেছেন পরক্ষণেই। গল্পে হাসান আজিজুল হকের প্রতিবাদী চরিত্রের ধরণ এরকম-
মেয়েমানুষটি আর তার তিন বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বুড়ো ডাক্তারের ঘরে ঢুকছে। সে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো, দু-একটি মুহূর্ত ভাবলো, তারপর ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়ে বললো, ছার, আমরা ঐ পা-ফোলা রোগীটোকে বাড়ি লিয়ে যাবো।
ডাক্তার তাঁর চেয়ারে পাথরের মতো বসে রইলেন।
বুড়ো আবার বললো, উকে আমরা বাড়ি লিয়ে যেতে চাই। উয়ার পরিবার উকে লিতে আল্ছে।
মৃদুস্বরে ডাক্তার বললেন, বাড়ি কেন?
আমরা উকে বাড়ি লিয়ে যাবো ছার।
ডাক্তার একবার কেঁপে উঠলেন আগাগোড়া, কাল-পরশু এসো, নিয়ে যেতে পারবে। যাও, কাল-পরশু খোঁজ নিয়ো।
বুড়ো উতস্তত করছে। কিন্তু মেয়েমানুষটি হিম ঠাণ্ডা চোখে ডাক্তারের দিকে একবার চেয়ে ফিরলো। যে ছেলেটি আঙুল চুষছিলো, এক হেঁচকায় তাকে কোলে তুলে, আর একটির কব্জি ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রাশেদ দেখতে পেল ছোট দলটি দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।
হাসান আজিজুল হকের গল্প মানেই উপমা বর্ণনায় বাঙময় করে তোলা একটি আখ্যান যেখানে গল্প প্রাধান্য না পেয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি মূখ্য হয়ে ওঠে। সময়ের সঠিক চিত্রনে তিনি বরাবরই সিদ্ধহস্ত। গল্পের পাত্রপাত্রীরা যখন বলে-'ওসব মামদোবাজি গণতান্ত্রিক সরকার করে। মিলিটারি গরমেন্টের আবার খুশি-অখুশি কি?' তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকেনা গল্পে কোন সময়ের কথা বলা হচ্ছে।
সনৎকুমার সাহা ‘হাসান আজিজুল হক : ফিরে দেখা’য় লেখেন, ‘হাসান একজন সত্যিকারের সাহিত্যিক হতে চেয়েছেন। গল্প লেখার কৌশল জেনে অনেকেই হয়ত ভাল গল্প লিখতে পারেন; চমক আর নাটকীয়তা মিশিয়ে ভাষার যাদুতে মাত করে পাঠককে একবারে মজিয়ে দিতে পারেন। এগুলো সাহিত্যিক হবার পূর্বশর্ত অবশ্যই। কিন্তু শুধু এসবেই সাহিত্য হয় না। বাস্তবতার গভীরতর তল থেকে তার ভেতরের সত্যকে লেখায় তুলে আনতে না পারলে তা শুধু লেখাই থেকে যায়, সাহিত্য হয় না'
হাসান আজিজুল হক গল্প লিখেই উভয় বাংলার সেরা কথা সাহিত্যিকের মর্যদা পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের হাতে জন্ম নিয়ে বাংলা ছোটগল্প প্রায় এক শতাব্দীর পথ পাড়ি দিয়ে আজ কী উৎকর্ষ অর্জন করেছে তা দেখতে অবশ্যই হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোর দিকে তাকাতে হবে।
লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম
মোমিনুল আজম
জন্মেছেন - ১৯৬৫ সালে, গাইবান্ধায়
পড়াশুনা করেছেন- শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কাজ করেন- বাংলাদেশ ডাক বিভাগে
বর্তমানে- কানাডায় থাকেন
ফিলাটেলি- ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ নামে একটি প্রকাশনা আছে।


0 মন্তব্যসমূহ