শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের রস : ভাব ভাব কুসুম কুসুম

বিজয় দে

আমাদের এই মফস্বল জেলা শহরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার আদিপর্বে, কী আশ্চর্য, দেবব্রত বিশ্বাসের গায়কীতে এতটাই আচ্ছন্ন ছিলাম যে অন্য পুরুষকণ্ঠ সম্পর্কে খুব একটা আগ্রহ বোধ করিনি। ক্কচিৎ দু-একজন বাদে, হয়তো অবচেতনে কিছুটা অবজ্ঞার মনোভাবই প্রকাশ করতাম, যা কোনও সুরুচির পরিচয় দেয় না। সেরকম সময়ে একদিন শহরের নতুনপাড়ার এক ঘনিষ্ঠ দাদার বাড়িতে রেকর্ড প্লেয়ারে শুনলাম, প্রথম, ‘আমার সকল রসের ধারা/তোমাদের আজ হোক-না হারা...’। গায়ক অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়। কণ্ঠে কী কালোয়াতি ছিল? হয়তো, শুনে আমরা তাজ্জব।
আমাদের ‘গানের ভাণ্ডারী’ ছিল প্রয়াত কবি ও বন্ধু শ্যামল সিংহ। সে যেখানে সেখানে এই গানটি অশোকতরুর গায়কী অনুসরণ করে গাইতে শুরু করল। ফলে ‘রসের ধারা’ ডুবে যেতে বেশি সময় লাগেনি। তখন বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে অনেকটাই চলে এসেছি। তখন ছিল প্রকৃত পেকে ওঠার বয়স। এই গান শুনে বা গেয়ে, যে চিত্ররূপ ফুটে ওঠে, সেখানে এতদিন পরেও মনে আছে, অন্তত আমার, ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ-শাখা’র নিচ দিয়ে ‘ফাগুন মাসে’ হেঁটে-যাওয়া একজন না-অতি তরুণীর সহাস্য মুখ ছিল। কেন না, এর পরেই তো সেই ‘তোমার রূপে মরুক ডুবে দু’টি আঁখি তারা’র অব্যর্থ আবেদন একেবারে মর্মঘাতী হয়েছিল। তখন তো এটাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘নাই রসে নাই, দারুণ দাহন বেলা...’ থেকে ‘চাহিয়া দেখো রসের স্রোতে রঙের খেলাখানি/চেয়ো না চেয়ো না। তার নিকটে নিতে টানি...’ আমরা গানের বাণীর ভাবরসে একাকার। অবশ্য কখনও কখনও ‘বেদনায় ভরে গিয়েছে পিয়ালা...’ একথাও উল্লেখ করতে হয়।
‘...ধানের ক্ষেত’ বললে যেমন ‘রৌদ্রছায়া’ চলে আসে, তেমনই বাংলা গল্পে ‘রস’ বললে অবধারিতভাবে পড়ুয়া পাঠকদের মনে পড়বে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের, বিখ্যাত ছোট গল্পটি। একজন পরিশ্রমী খেজুর রস আহরণকারী ও গুড় বিক্রেতা। মোতি আর তার সঙ্গে বিশিষ্ট দুই নারী, স্ত্রী মাজু বিবি এবং পড়শি ফুলবানকে নিয়ে ভালবাসা ও সাংসারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিচিত্র কাহিনীটি এখনও আমাদের মুগ্ধ করে রাখে। বাংলা সাহিত্যে এই গল্পের কোনও জবাব নেই। তো এই ‘রস’ অনেকদিন পর হয়ে গেল ‘সওদাগর’! অমিতাভ বচ্চন, নূতন বহেল এবং লাস্যময়ী পদ্মা খান্নার অভিনয়সমৃদ্ধ হিন্দি চলচ্চিত্রটি ‘রস’-এর মুম্বাইকরণ ঘটল। না, উপভোগে আমার কোনও অসুবিধা হয়নি। রসে-বশের কাহিনী বা বশীকরণের গল্প, যে-ভাষাতেই হোক বা যে মাধ্যমেই হোক, এর কোনও মার নেই।
নরেন্দ্রনাথ মিত্রের কথা যখন উঠল। তখন তার লেখা ‘আত্মকথা’র একটি ছোট্ট অংশ এখানে উদ্ধৃত না করে পারছি না।...
“...বউদি, আমার চেয়ে দশ বছরের বড়। কিন্তু আমার সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করতেন। তার সঙ্গে আমার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হতো। একই উপন্যাস কাড়াকাড়ি করে ভাগাভাগি করে পড়তাম।
একদিন আমি দাবি করলাম, ‘বউদি তোমার কাছে বড়দা কী লিখেছে দাও না একটু দেখি’।
বউদি হেসে বললেন, ‘হুঁ তোমাকে ওই চিঠি দেখাই পাকা ছেলে কোথাকার’।
তবু আমি কাড়াকাড়ি করে কিছুটা দেখেছিলাম। একটি সম্বোধন ভারি আশ্চর্য আর মধুর লেগেছিল ‘প্রাণের কুসুম’। ভেবেছিলাম ঠিক ওই রকম সম্বোধন করে আমি কবে কাকে চিঠি লিখতে পারব।...”
রসের কারবারিরা জানেন, এই ‘প্রাণের কুসুম’-এর নিহিত অর্থ। এই ‘কুসুম’-র সন্ধানে কত যে চরিত্র একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে, কেউ কেউ জানে, পেকে ওঠবার বয়সে যা সঠিক বোঝা যায় না, সেটাই প্রাপ্তমনস্ক হলে অন্যরূপ নিয়ে আসে। কল্পনার ‘প্রাণের কুসুম’ থেকে কল্পনার ‘বনলতা সেন’-কে যদি এক লাইনে নিয়ে আসি, তবে জীবনানন্দ দাশ-এর ‘কারুবাসনা’ উদ্ধৃত করে বলতে পারি, তার অবয়ব... ‘নক্ষত্রমাখা রাত্রির কাল দিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার—প্রিয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী চমরীর মতো অপরূপ রূপ। মিষ্টি ক্লান্ত অশ্রুমাখা চোখ, নগ্ন শীতল নিরাবরণ দু’খানি হাত, ম্লান ঠোঁট...’। আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলা যায়, সে আমাদের স্বপ্নের মধ্যে আসে ‘মন পবনের নৌকায় চড়ে, নীলম্বরী শাড়ি পরে চিকন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে...’।
কল্পনা বা কবিত্বের কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল? হয়তো তাই। কিন্তু সৌন্দর্যরসের মহান কারিগরিরা এরকমভাবেই ভাবতে পারেন। লেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্র, ব্যক্তিজীবনে, তার ‘প্রাণের কুসুম’-এর সন্ধান পেয়েছিল কিনা জানি না, হয়তো তার লেখা অজস্র গল্পের চরিত্রের মধ্যে শত কুসুম লুকিয়ে আছে। আমরা জেনে, না-জেনে সেই কুসুম-রস আজও পান করে যাচ্ছি।
এই রস-প্রসঙ্গে একটি বিখ্যাত ফিল্মের কথা মনে পড়ছে। বিদেশি ছবিটির নাম A Walk In The Clouds বা বাংলা করলে ‘মেঘের ভিতর দিয়ে পথ-হাঁটা’(পরিচালক আলফানসো আরাউ)। তবে এখানে খেজুর-রস নয়, আঙুর-রস। গল্পটি ছিল এরকম- যুদ্ধফেরত একজন ফৌজি পল সাটন (কিয়ানু রিভস), বাড়ি ফিরে অপর পুরুষে লিপ্ত স্ত্রী’র পীড়াপীড়িতে একটি চকোলেট কোম্পানির ফেরিওয়ালা বনে যান। একদিন পথে আলাপ ভিক্টোরিয়া (আয়তানা স্যানচেজ) নামে এক যুবতীর সঙ্গে। যুবতীটি সদ্য তার বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে এবং শহর থেকে একা একা অনেক জানা-অজানা আশঙ্কা নিয়ে ঘরে ফিরছে। পাহাড়ের কোলে যুবতীদের পারিবারিক একটি বিশাল আঙুর ক্ষেত বা ভিনিয়ার্ড আছে। এই আঙুর-ক্ষেতের প্রেক্ষাপটে পল ও ভিক্টোরিয়ার পরিচয়-অপরিচয়-সম্পর্কের আলো-আঁধারি নিয়ে এই ছবি। প্রাসঙ্গিক যে-দৃশ্যের জন্য এটুকু বলা, সেটা হচ্ছে এরকম সেদিন ছিল আঙুর তোলার উৎসব বা Harvesting Day। পরিবারে সবাই সেদিন আঙুর গাছ থেকে থোকা থোকা আঙুর কেটে একটি বিশাল বাঁধানো গামলায় ফেলে দিচ্ছে। এখানে আঙুরগুলো জমা হবে, রস হবে, অন্যান্য প্রক্রিয়া চলবে, তারপর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে বিলাসী সুরা। যাই হোক, গামলার অর্ধেক ভর্তি হতেই, পুরুষরা তাদের (প্রথানুযায়ী বিবাহিতা) নারীদের নামিয়ে দিল গামলায়। একজন বয়োজ্যেষ্ঠা মহিলা একটি বিচিত্রদর্শন শঙ্খে ফুঁ দিতেই শুরু হল আঙুর-পেষার নাচ বা এটাকে রস-নৃত্যও বলা যায়। গামলার বাইরে পুরুষেরা নানারকম বাদ্য বাজাচ্ছে আর মেয়েরা নানা ভঙ্গিমায় ঘুরে ঘুরে নাচছে। কালো আঙুরের
স্তূপের ভিতর সাদা ধবধবে পা, উঠছে নামছে, পিষছে, ছেটাচ্ছে... গোড়ালি থেকে ঊরুর নিরাবরণ অংশ... শরীরের সমস্ত প্রকাশিত নগ্নতায় আঙুরের রস... এভাবে মনেও যে রস লেগে যায়, সে কথা বলা বাহুল্য। এর মধ্যে কখন যে মেয়েরা জোর করে অতিথি পলকে গামলার ভিতরে টেনি নিল... এবং শুরু হল একজন পুরুষ আর সমবেত নারীদের যৌথনৃত্য...একটি দীর্ঘস্থায়ী কামনামদির চুম্বন! এই চুম্বন ভঙ্গিটি অনেককাল মনে থাকবে। এরপর আঙুর ক্ষেতে আগুন লাগার দৃশ্যটি—যেটি এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
এই ‘প্যাশনেট’ দৃশ্যটির তুলনায় আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বাঙালির ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে ছুটে আয়, আয়...’ খুবই নিরীহ। ‘হাওয়ার নেশা’ যখন মেতে উঠল। তখন ‘দিগ্‌বধূরা ধানের ক্ষেতে...’ এটা সত্যি, এর বেশি কিছু নয়। তবে এটাই বা কম কীসে? ডালা যদি ‘পাকা ফসলে’ ভরে ওঠে, তাহলে এখনও এর চাইতে বেশি আনন্দ আর কিছুতেই হতে পারে না। সৌন্দর্যের আদিভূমি তো এটাই।
যেদিন বাগুইআটি বাজারের ভিতর দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ফিরছি, জলপাইগুড়ির ট্রেন ধরব। কোনও দোকানের সাউন্ড-সিস্টেম থেকে ভেসে এল, আচমকা, একটি গান... ‘গোঁসাই লেজ নড়ে আর খেজুর খায়/গোঁসাইরে দেখছনি খেজুর গাছতলায়...’ হ্যাঁ, এই হল গান। ওদিকে বাজারের মুখে থর থরে নতুন গুড়ের হাঁড়ি... নিয়ে যাবে একটা? এইবার একটা গোপন কথা বলি। যদি ভুল না হয়ে থাকে, তবে বলা যেতে পারে, আমি ‘প্রাণের কুসুম’-এর দেখা পেয়েছি। লোকে তার প্রিয়জনকে কত কিছুই তো উপহার দেয়। আমার ইচ্ছে, এবার শীতটা একটু জমে উঠলে, মতি আর মাজু বিবির হাতে তৈরি এক হাঁড়ি খেজুর ওঁর হাতে তুলে দিতে বলব, ‘কন্যা রসবতী হও, ইতি তোমার...’।

২টি মন্তব্য: