শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

শামিম আহমেদের ধারাবাহিক উপন্যাস : সাত জমিন

প্রথম কিস্তি



খেল সমঝা হৈ কহীঁ ছোড় না ন দে, ভুল না জাএ
কাশ!যূঁ ভী হো, কি বিন মেরে সতাএ ন বনে



“রবার্ট অ্যাশবিকেচেনো নানি?” রুনা কামরুন্নেসাকে জিজ্ঞাসা করে।

নানি উত্তর দেন, “না বুবু, আমি কি তোমাদের মতো অত ইংরেজি পড়েছি! আমাদের সময়ে ওই সব ইলমের চর্চা নাজায়েজ ছিল। তা ওই অ্যাশবি না কি যেন বলছ, সে কে বুবু?”

“বলছি। তার আগে বলো তো, নানা তো ইংরেজি শিখেছিলেন, না কি! তা হলে এই শিক্ষাকে নাজায়েজ বলছ কেন। তুমি বোকো হারামের কথা শুনেছ?’’ রুনা নানিকে আবার প্রশ্ন করে বসে।


নানি বলেন, “তোমার এই এক দোষ বুবু। একটা কথার মীমাংসা না করে অন্য কথায় ঢুকে যাও। অ্যাশবির কথা বলো আগে।’’

“রবার্ট অ্যাশবি হলিউডের অভিনেতা। “জিন্নাহ” নামের একটা ফিল্ম হয়েছিল, তাতে জওহরলালের পার্ট করেছেন। সেটা কথা নয়, তুমি যে এত পার্টিশনের গল্প করো, বলো সুহরাবর্দি আর তাঁর দ্বিতীয় বিবির কথা। কী যেন নাম ভদ্রমহিলার?’’

“নুরজাহান বেগম। অবশ্য সেটা মুসলমান হওয়ার পরে। তার আগে তিনি ছিলেন ভেরা আলেক্সা্ড্রোনভনা টিসেনকো কাল্ডার।’’

“তাঁদের তো একটা ছেলে ছিল, তাই না?’’

“হ্যাঁ। দাঁড়াও, নামটা মনে করতে দাও বুবু।’’

“রশিদ। রশিদ সুহরাবর্দি। সেই ছেলেই এখন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রবার্ট অ্যাশবি।’’

“বলো কি বুবু? আমি তো তাঁর অনেক খোঁজ করেছি। কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। শুনেছিলাম, দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু দিন পরে সুহরাবর্দির সঙ্গে তাঁর বিবি ভেরার তালাক হয়ে যায়। তার পর ভেরা চলে যান আমেরিকা। ওই বিবির আগের পক্ষের একটা ছেলে ছিল। তাঁর কোনও খবর বলতে পারো বুবু?’’

“তোমার কাছ থেকেই শুনেছিলাম। তাকেও তন্নতন্ন করে খুঁজেছি, পাইনি। সেই ছেলের নাম ওলেগ। চেখভের প্রাক্তন বউ ওলগা নিপার নাকি ওই নাম রেখেছিলেন! তোমার কাছ থেকেই শোনা।’’

“হ্যাঁ। মস্কো আর্ট থিয়েটারে ভেরা যখন অভিনয় করতেন, তখন সেখানে ডিরেক্টর ছিলেন সুহরাবর্দির বড় ভাই হাসান সুহরাবর্দি। আর ওলগা নিপার ছিলেন অভিনেত্রী-পরিচালক। রশিদ মায়ের কাছ থেকে অভিনয়ের রক্তটা পেয়েছি দেখছি।’’

“আচ্ছা নানি, ভেরার সঙ্গে ডিভোর্সের পর সুহরাবর্দি পাকিস্তা্নেই রয়ে গেলেন?”

“কোথায় আর যাবে বলো! উনি তো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও হলেন, সেটা নিশ্চয় জানো তুমি?”

“না।’’

“সে কি? ভারি মজার ব্যাপার ছিল সেটা! ওই একই সময়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইস্কান্দার মির্জা।’’

“বলো বলো, এত গল্প তুমি মাথায় রাখো কী করে। বয়স তো অনেক হল বুড়ি! বলো, ডিসটার্ব করব না।’’

“গল্প নয় রে বুবু, এ তো সব সত্যি।’’

“বলো। ইস্কান্দার মির্জার কথা বলছিলে।’’

“উনি পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল অব্দি এই আর্মি অফিসার ক্ষমতায় ছিলেন।‘’’

“তোমার মেমরি কার্ড তো এখনও বেশ সচল দেখছি। কিন্তু নানি, ওকে তুমি ফার্স্ট প্রেসিডেন্ট বলছ, অথচ সাল বলছ ১৯৫৬, পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে তো ১৯৪৭-এ। মনে হয় তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে!’’

“না রে বুবু। তার আগে দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন কুইন অব পাকিস্তান। কিছুই ভুল হচ্ছে না আমার। তুমি শুধু কথার মোড় ঘুরিয়ে দাও। আসল কথা হল, এই যে ইস্কান্দার মির্জা প্রেসিডেন্ট আর সুহরাবর্দি প্রধানমন্ত্রী একই সময়ে, এর মজাটা তুমি টের পাও, বুবু?’’

“না। ইস্কান্দার মির্জা তো আর্মি অফিসার বললে!’’

“মেজর জেনারেল সাহেবজাদা সৈয়দ ইস্কান্দার আলি মির্জা হলেন মির জাফর আলির বংশধর। তিনি মুর্শিদাবাদের লোক। সুহরাবর্দি কোথাকার মানুষ বলো তো হে?’’

“কলকাতার?’’

“না। মেদিনীপুরের। তার মানে ভাবো, যে দু জন লোক পাকিস্তান শাসন করছে, তাদের একজন মুর্শিদাবাদের নবাব বাড়ির ছেলে, অন্যজন মেদিনীপুরের এক বাঙালিপরিবারের। অবশ্য তুমি যদি তাঁদের পূর্বপুরুষের বাসস্থান খুঁজতে চাও, সেটা অন্য ব্যাপার। একজনের পারস্য, অন্যজনের ইরাক।’’

“বাহ, এটা তো দারুণ ব্যাপার নানি! তবে শুনেছি, স্বাধীনতার পরে পরেই ভারত-পাকিস্তান একটা যুদ্ধ হয়, সেই যুদ্ধের ব্যাপারে ইস্কান্দার মির্জার নাকি দারুণ একটা ভূমিকা ছিল।’’

“১৯৪৭ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধের গল্প বলব তোমাকে। তার আগে, তুমি ৪৭-এর আগের কয়েকটা ঘটনা একটু ঝালিয়ে নাও।’’

“বলো। ঝালানোর সঙ্গে সঙ্গে তোমার সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী সইয়ের কথাও বোলো একটু।’’

“হ্যাঁ রে বুবু, বলব। তবে তোমার মরহুম নানার কথা না বললে যে এই কাহিনির শুরুই হবে না।’’

“জর্মান মিঞার গল্প! সাত আসমান! হ্যাঁ হ্যাঁ। দেরি কোরো না।’’

“গল্পের তোড় এলে আমি তোমার কথা শুনব না বুবু। তাতে কিছু মনে করো না তুমি।’’

“আমি কিছুই বলব না। বলো।’’

“জর্মান মিঞার ছিল স্বপ্ন দেখার ব্যারাম। তাঁর স্বপ্নগুলো খুব অদ্ভুত ছিল। তবে তোমার মা জন্মানোর আগে তিনি যে স্বপ্নটা দেখেছিলেন, সেই খোয়াব তাঁর পিছু ছাড়েনি কোনও দিন।তবে সেটাকে খোয়াব বলা যাবে কিনা সে একটা ধন্দের ব্যাপার। তখন ভারত স্বাধীন হয়নি। খরা আর মণ্বন্তর চলছে দেশে। তোমার মা জন্মাবে, আমার প্রসব-বেদনা উঠেছে। সেটা ভোর বেলা। আমাকে আঁতুড় ঘরে ঢোকানো হয়েছে। এ দিকে জর্মান মিঞার পায়খানার বেগ উঠেছে। তিনি বাড়ির বাইরে পুরুষদের পায়খানা ঘরে যেতে গিয়ে দেখেন একজন মানুষ, যার হাতের কনুই পায়ের গোড়ালি সব উলটো দিকে। সে তোমার নানার দিকে তেড়ে আসছে, কিন্তু আসলে সে পিছু হাঁটছে। এই ঘটনায় তোমার নানা অচৈতন্য হয়ে পড়েন। তোমার মেজ নানা, মানে আমার মেজ ভাসুর ছিলেন বাড়ির কর্তা। মৌলানা এলেন, কত কী করা হল, কিন্তু খোয়াব দেখার ব্যারাম থেকে রেহাই পেলেন না জর্মান মিঞা। এ দিকে তোমার মা জহুরা জন্মেছে, তার বয়স যখন চার, তখন তোমার কংগ্রেসি নানা স্বপ্নের চক্করে পড়ে মুসলিম লিগের সমর্থক হয়ে পড়লেন। তার পর মেজ নানার চাপে পড়ে চলে এলেন সালারে। সেটা মুর্শিদাবাদ জেলা। দেশ ভাগ হলে এই জেলা নাকি পাকিস্তানে পড়বে, সেই আশায় আমরা কিছু বাড়িঘর-জমিজিরেত কিনে ফেলি সেখানে। আমার অবশ্য মত ছিল না। কিন্তু জানোই তো, তোমার নানার কোনও কাজে আমি কোনও দিন বাধা দিই নি। সালারে এসে জুলফিকার মিঞা, বদরেদ্দোজারা তোমার নানার কাছের মানুষ হয়ে উঠলেন। তবে আর একটা নতুন উৎপাত এসে হাজির হল। তোমার নানার স্বপ্নে নিয়মিত হানা দিতে লাগলেন জিনের বাদশা জুল জেনাহেন। মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে যাতে না ঢোকে, এমনকি দেশভাগের বিরোধিতা করতে মাঠে নামলেন অনেকে। ইস্কান্দার মির্জার বাড়ির লোকও সেখানে ছিলেন। তখন নবাব ছিলেন ওয়াসেফ আলি মির্জা। তিনি কংগ্রেস, আর তাঁর ছেলে কাজেম আলি মির্জা মুসলিম লিগের লোক। জান কবুল করে সবাই আন্দোলনে নেমে পড়েছেন। ভোট হল বাংলাদেশে। সেই নির্বাচনে কেউ মেজরিটি পেল না। তবে মুসলিম লিগ এক নম্বরে আর কংগ্রেস দু নম্বরে। সামান্য একটা আশা দেখা দিল, কংগ্রেসের সঙ্গে লিগের একটা বোঝাপাড়া হবে। তখন বাংলায় কংগ্রেসের সভাপতি ত্যাঁওটা রাজবাড়ির ছেলে কিরণশঙ্কর রায়। তাঁর সঙ্গে মিটিঙে বসলেন সুহরাবর্দির বিবি ভেরা ওরফে বেগম নুরজাহান। কয়েক দিন আগে নাখোদা মসজিদে মুসলমান হয়েছেন এই রুশ নটী। দাবি দাওয়া নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে ঐকমত্য হল না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য নিয়ে লিগ সরকার গড়ল। প্রধানমন্ত্রী হলেন হোসেন সুহরাবর্দি। কয়েকদিন পরেই এল সেই কালো দিন। সেটা ছিল ২৭শে রমজান, ১৪ অগস্ট, ১৯৪৬। হিন্দু মহাসভা আর কংগ্রেসের মুসলমান বিরোধিতার জন্য লিগ ওই দিন কলকাতায় হরতালের ডাক দিল। সুহরাবর্দি অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ, তিনি ওই দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে দিলেন। তার পর তো সব ইতিহাস। সব লোকেই জানে সেই কালো দিনটির কথা। এ সব হয়তো কিছুই হত না যদি ইংরেজ সরকার ভারতীয়দের নিয়ে মধ্যবর্তী সরকার গঠন করে ফেলত। পরে যখন মধ্যবর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হল, তখন মুসলমান প্রতিনিধি হিসেবে যাদের রাখা হল তারা কেউ লিগের লোক নয়, কংগ্রেসের পছন্দ-করা লোকজন। তার ঠিক এক বছর পরে দেশ স্বাধীন হল, ভারতবর্ষ দু টুকরো হল।’’

রুনা বলে ওঠে, “নানি, একটা কথা বলি?’’

“হ্যাঁ, বলো বুবু।’’

“১৪ অগস্ট ১৯৪৬ সালের ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে-র জন্য সবাই তো সুহরাবর্দিকে দায়ি করে। তিনিই নাকি এই দাঙ্গার নায়ক!!’’

“দাঙ্গার জন্য এক পক্ষ অন্য পক্ষকে যে দোষারোপ করবে, এটাই স্বাভাবিক। শোনো বুবু, হোসেন শহিদ সুহরাবর্দি এক সময় কংগ্রেস করতেন। ১৯২৬ সালের গ্রীষ্মকালে কলকাতায় বিরাট দাঙ্গা হয়। সুহরাবর্দি সেই দাঙ্গার জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করে দল ছাড়েন। ১৯৪৬-এর দাঙ্গায় সুহরাবর্দির আব্বা জাহিদ সাহেব রোগশয্যায়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। সেখানে মেয়েরা কোরান তেলাওয়াত করছে। যে কোনও সময় তিনি মারা যেতে পারেন। এমন অবস্থায় কোন পুত্র দাঙ্গার নেতৃত্ব দেবে বলো! অন্য দিকে শিখরা হিন্দুদের পক্ষে লড়ছে। গোপাল পাঁঠা, যুগল ঘোষের বাহিনী কলকাতায় ঘাঁটি গাড়া আমেরিকান সৈন্যদের কাছে অস্ত্র কিনে মানুষ মারছে। দাঙ্গা শুরুর চার দিন আগে ব্রিগেডিয়ার ম্যাকিনলে সৈন্যদের হুকুম দিয়েছিলেন, ১৪ অগস্ট কেউ যেন সেনা ছাউনি থেকে না বের হয়।’’

রুনা প্রশ্ন করে, “তোমরা তো তখন মুর্শিদাবাদের সালারে, সেখানে মারামারি হয়নি?’’

“না, তবে অবস্থা খুব থমথমে ছিল। একটা বছর ভয়ঙ্কর আতঙ্কে কেটেছে। কলকাতার পাশের শহর হাওড়াতে খুনজখম হয়েছিল। তবে হপ্তাখানেক পরে নোয়াখালিতে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়, কত মানুষ যে খুন হয়েছিলেন, সে কথা লেখাজোখা নেই। এ সব কথা জানো নিশ্চয়। লালমোহন সেন নামের এক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে খুন করা হয়। লীলা রায় প্রায় হাজার দুয়েক মানুষকে দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা করেন। গান্ধিজির দ্বারস্থ হন সুহরাবর্দি। এটাই ইতিহাসের পরিহাস!’’

রুনা বলে ওঠে, “কেন? পরিহাস কেন?’’

“যে সুহরাবর্দি ১৯২৬ সালের দাঙ্গার জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করে দল ছাড়েন, তাঁকেই আবার ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের শরণাপন্ন হতে হয়, একে তুমি কী বলবে, বলো?’’

“বোকো হারাম।’’ রুনা উত্তর দেয়।

নানি জিজ্ঞাসা করেন, “ সে আবার কী?’’

“রবার্ট অ্যাশবিকে চেনো কিনা, এই কথা বলাতে তুমি বলেছিলে যে ইংরেজি জানো না, তোমাদের সময়ে নাকি ওই সব পাশ্চাত্য শিক্ষা নাজায়েজ ছিল। সে কথা যদিও ভুল, কারণ তোমার ওই সুহরাবর্দিরা তো ইংরেজি না শিখলে কিছুই করতে পারতেন না। আশরাফ পরিবারের মেয়েরাও পাশ্চাত্য শিক্ষা করেছে। যত কিছু বাধা ছিল মধ্যবিত্তদের জন্য। গরিবদের কথা বাদ দাও, সব শিক্ষাই তাদের জন্য হারাম ছিল। এই যে ‘পাশ্চাত্য শিক্ষা আসলে পাপ’, এই কথাকেই “বোকো হারাম” বলে।’’

নানি বলেন, “সেসব দিনের কথা বাদ দাও। আমি শিখিনি, তোমার মাও হয়তো ইংরেজি শিক্ষা সে ভাবে নিতে পারেনি, কিন্তু তোমরা তো গ্রহণ করেছ। সেটা অন্য যুগ ছিল বুবু। আজ পৃথিবীতে কেউ কোনও শিক্ষাকে হারাম বলতে পারবে না!’’

“তুমি সেই তিমিরেই পড়ে আছো নানি। বোকো হারাম এখনও চলছে সগৌরবে।’’

“কী রকম?’’

রুনা বলতে থাকে,“বোকো হারাম হল নাইজেরিয়ার একটি উগ্রপন্থী সংগঠন। তারা ইসলামের বিরোধী যে কোনও জিনিসকে পাপ বলে মনে করে। তাদের মূল লক্ষ্য হল, খ্রিস্টান এবং তাদের সমালোচক মুসলমানরা। এদের কথা জানা গেল, তার কারণ কয়েক দিন আগে এই সংগঠনের লোকজনেরা নাইজেরিয়ার একটি স্কুল থেকে ২৭০ জন মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, কেননা ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমী শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে।’’

নানি আঁতকে ওঠেন, “সে কি! এমন ঘটনা এই সময়ে ঘটতে পারে না কি! আমি বিশ্বাস করি না। নিশ্চয় এর পেছনে অন্য কোনও চক্র আছে।’’

রুনা বলে, “সে আমি জানি না! তবে এই মেয়েদের অপহরণের ঘটনা যে ঘটেছে, তার প্রমাণ আমি তোমাকে দিতে পারি।’’





শম্অ বুঝতী হৈ, তো উসমেঁ সে ধুআঁ উঠতা হৈ

শোলঃ-এ-ইশক সিযহপোশ হুআ মেরে বাদ



টাঙ্গাইলের অতুল গুপ্ত সব শেষ করে দিলেন। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির প্যাসেজ হিসেবে মালদা জেলা ভারতের দরকার। হুগলি নদীকে বাঁচাতে প্রয়োজন মুর্শিদাবাদ আর নদীয়া। কংগ্রেস মাউন্টব্যাটেনকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছে। ও দিকে মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে স্যার র‍্যাডক্লিফের গভীর দোস্তি। এই র‍্যাডক্লিফ ভাগ-বাঁটোয়ারার যে সব নিয়ম বের করেছেন তাতে মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে থাকে কিনা চিন্তার বিষয়।

১৪ অগস্ট ভারতের একটি অংশ স্বাধীন হল, যার নাম পাকিস্তান। রুনার নানি কামরুন্নেসা তখন স্বামীর সঙ্গে মুর্শিদাবাদের সালারে বাস করেন। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে লাগল। অনেকে খুশিতে ফেটে পড়লেন। যাক! অতুল গুপ্ত কিংবা কংগ্রেস, কারও প্রচেষ্টা কার্যকর হয়নি। একটা সময় বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের লোকে নাকি মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারির কদর বুঝবে না। এখন যে তার চূড়ায় পাকিস্তানের চাঁদ-তারা আঁকা সবুজ পতাকা পতপত করে উড়ছে! নবাব ওয়াসেফ আলি মির্জা যে কোন চক্করে পড়ে দেশভাগের বিরোধিতা করছিলেন, কে জানে!

কামরুন্নেসা হাজার দুয়ারির কথা ভাবতে লাগলেন। এ দেশের সাত আশ্চর্যের অন্যতম হল এই প্রাসাদ। নিজামত কেল্লা ভেঙে এই বড় কোঠি তৈরি হয় নবাব হুমায়ুন জাহ-র আমলে। এই নবাব যখন ছোট ছিলেন, তখন তাঁর গৃহশিক্ষক ছিলেন সালারের মুফতি মহম্মদ মোয়েজ। শোনা যায়, এই মোয়েজ সাহেবের প্রেরণায় নাকি নবাব হুমায়ুন জাহ হাজার দুয়ারি বানান। তবে ইংরেজের হাতে যেহেতু সব ক্ষমতার চাবিকাঠি, তাই মোয়েজ সাহেব লাটসাহেব উইলিয়ম ক্যাভেন্ডিশকে রাজি করান। এই প্রাসাদের হাজারটা দরজা হলেও তার মধ্যে ন শো দরজা মেকি। ১১৪টা ঘর আছে হাজার দুয়ারিতে।

হাজার দুয়ারি থেকে নেমেই সামনে নিজামত ইমামবাড়া। হাজার দুয়ারির অনেক পরে এই সৌধ বানানো হয়। কামরুন্নেসা শুনেছেন, আগে নাকি কাঠের ইমামবাড়া ছিল, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা সেই ইমামবাড়া বানিয়েছিলেন। আগুন লেগে তা পুড়ে গেলে নবাব ফেরাদুন জাহ সেই সময়ে ছ লাখ টাকা খরচ করে নতুন ইমামবাড়া তৈরি করান। এটিই নাকি ভারতের সবচেয়ে বড় ইমামবাড়া। এই সব আর ভারতে থাকল না। তবে নতুন যে রাষ্ট্র হল, সে তো ভারতেরই একটি অংশ, যদিও তার নাম পাকিস্তান। তা হলে কি এখন বলতে হবে, ভারতের সাত আশ্চর্যের একটি চলে গেল পাকিস্তানে! আর সবচেয়ে বড় ইমামবাড়াও পাকিস্তানের দখলে।

কিন্তু কামরুন্নেসার মন বলছে, মুর্শিদাবাদ-মালদা কোনও ভাবেই পাকিস্তানে পড়ার কথা নয়, অথচ পতাকা উড়ল, পাকিস্তান ঘোষণা হল। তবে কি হুগলি নদীতে বাঁধ নির্মাণ করার ব্যাপারে পিছিয়ে গেলেন অতুল গুপ্তরা!এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। সইরা সালারে এসে যে সব কথা শুনিয়ে গিয়েছিল, তাতে কামরুন্নেসার আর স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। প্রতি বারই সই আসত টাকা-পয়সা নিতে। তার আগে সইয়ের সঙ্গে অনেক গোপন কাজে অংশ নিয়েছিলেন কামরুন্নেসা। সে সব আঁচ করে তাঁর বাপ-ভাইয়েরা বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ের পরে তাঁকে নিজেদের বাড়িতে আর কোনও দিন নিয়ে যায়নি আব্বা কিংবা ভাইয়েরা। তা নিয়ে আজ আর কোনও খেদ নেই কামরুন্নেসার। পাকিস্তান ঘোষণা হওয়ার দিন দশেক আগে এসেছিল সই। এ বার তার নাম বলাটা জরুরি। এত দিন তিনি তার নামটা গোপন রেখেছিলেন।

সইয়ের নাম উনসারা বানু। গাইবাঙ্গার দৌলত-উন-নিসা অসহযোগ আন্দোলনে মহিলা সমিতি গঠন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য তিনি গ্রামে গ্রামে প্রচার চালিয়ে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলেন। সই সেই আন্দোলনে যোগ দেন। কামরুন্নেসাও উনসারার বানুর সঙ্গে আন্দোলনে নামেন। কিন্তু কামরুন্নেসার আব্বা-ভাইয়েরা এতে মোটেও খুশি ছিলেন না। উনসারা বানুকে তার বাপ-ভাইয়েরা বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আর কামরুন্নেসার বিয়ে ঠিক হয়। তবু সইয়ের আসা-যাওয়া কমে না। সে নিয়মিত কামরুন্নেসার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে। নানা আপদে-বিপদে এবং অর্থসাহায্যের আশায় সে কামরুন্নেসার শ্বশুরবাড়িতে আসতে শুরু করে। শেষ বার এসেছিল, পাকিস্তান ঘোষণা হওয়ার দিন দশেক আগে। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল এই স্বাধীনতা তারা মানে না। কেন?

মহাকবি ইকবালও বলে গিয়েছিলেন, পাকিস্তান স্বতন্ত্র কোনও রাষ্ট্র হোক, তা তিনি চান না। বরং এটি একটি রাজ্য হোক যার স্বাতন্ত্র্য থাকবে। দেওবন্দের আহমেদ হাসান মাদানিও একটা ফর্মুলা দিয়েছিলেন, কেউ তা মানেনি। মানলে আজ আর দেশভাগ হত না।কামরুন্নেসার স্বামী জর্মান মিঞা একটা সময় বীরভূম থেকে মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন। মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় অনেকের মতো তার প্রাণেও আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু সেই আনন্দ মাত্র চার দিন স্থায়ী হয়। র‍্যাডক্লিফ মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদিয়া ইত্যাদি জেলা ভারতে ঢুকে যায়। আশাভঙ্গ হয় অনেকের। জর্মান মিঞা তল্পিতল্পা গুটিয়ে আবার বীরভূমের দিকে পাড়ি জমান। কামরুন্নেসার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু স্বামীর মুখের উপর তিনি কোনও কথা বলেননি কোনও দিন। ফলে তাঁকেও ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে এক মত হতে হল। তখন কামরুন্নেসার দুটি কন্যাসন্তান। তার এক ভাইপো খোকা ওরফে খাইরুল ইসলামও তাঁর কাছেই থাকে।

আবার বীরভূমের পথে পা বাড়ালেন তাঁরা। জর্মান মিঞার খোয়াব দেখার ব্যারাম। তা ছাড়া, বছর খানেক আগে যখন তিনি গ্রাম ছেড়ে আসেন, তখন কোথাও একটি মৃতদেহদেখেছিলেন তিনি। তার পর দাঙ্গা শুরু হয় কলকাতায়। মৃতদেহটি তাঁর পিছু ছাড়েনি কোনও দিন। শোনা যায়, সেই মৃতদেহ নাকি স্বপ্নেও জর্মান মিঞাকে তাড়া করে বেড়ায়। তার উপরে রয়েছে খোকা। সে সব সময় বলে, “রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না।’’ এ সব শুনে শুনে কামরুন্নেসার শরীর-মন অবশ হতে থাকে। তিনি মোষের গাড়ির ভিতরে গা এলিয়ে দেন। এক অদ্ভুত লোক তাঁদের গাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কামরুন্নেসা কোথায় যাচ্ছেন, তা তিনি জানেন না। এই কি তার স্বদেশ! তাঁর মনে পড়ে যায়, অযোধ্যার বেগম হজরত মহলের কথা। ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য তিনি জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকতেন। মিস্টার নিল এবং ক্যাপ্টেন চিপকে হত্যা করেন তিনি। রানি ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তাঁর চিঠির আদানপ্রদান হত। তাঁর একটাই কথা ছিল, আমাদের দেশ আমাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না কেন! আজিজুন বাঈকে ফাঁসিতে লটকানো হয়। এই সব বীরাঙ্গনাদের জীবনের বিনিময়ে, ত্যাগের বদলে আজ এই স্বাধীনতা পেতে কামরুন্নেসার একটুও ভাল লাগছে না।

বীরভূমের দিকে গাড়ি চলছে। খোকা বলছে, “ফুফুজান, সালার জায়গা তো খারাপ ছিল না, তবে আমরা চলে যাচ্ছি কেন! সালারের মতো কাবাব-রুটি ফুফাজানের গাঁয়ে পাওয়া যাবে না, আমি তা হলে কী খাব? তবে রায়ট একটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না।’’

গাড়োয়ানের পেছনে বসে জর্মান মিঞা তাকে চুপ করতে বলেন। তার পর কামরুন্নেসার উদ্দেশ্য বলেন, “জানো বিবিজান, ঝিনাভাই কী বলেছে?’’

“কী বলেছে?’’ কামরুন্নেসা প্রশ্ন করেন।

“বলেছে মেজরিটি মুসলমানের স্বার্থে তারা অল্প কিছু মুসলমানের শহিদ হওয়াকে মেনে নেবেন। তা হলে আমাদের কী হবে? পাকিস্তানে তো যেতে পারলাম না। এখন হিন্দুস্থানে আমাদের জান-মান-মালের নিরাপত্তা কি পাওয়া যাবে?’’

কামরুন্নেসা জবাব দেন, “মহম্মদ আলি ঝিনাভাইও তো পাকিস্তান চাননি! তিনি এমন কথা বলতেই পারেন না।’’

“সত্যিই চাননি বিবিজান। আমি জানি।’’

“কেউই তো পাকিস্তান চায়নি, কিন্তু দেশটা তৈরি হয়ে গেল মিঞা। এটাই আশ্চর্যের।’’

জর্মান মিঞা জিজ্ঞাসা করেন, “আচ্ছা বিবিজান, মদানি সাহেব কী বলেছিলেন যেন?’’

“সে সব কথা এখন আর শুনে কী হবে মিঞা!’’

“তবু শুনি, বলো।’’

“১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় ভারতের সঙ্গে ইংলন্ডের কিছু কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে টু নেশন থিয়োরি নিয়ে। সেই সময় মদানি সাহেব কিছু পরামর্শ দেন, যাকে মদানি-ফর্মুলা বলা হয়। পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া সেখানে পার্সোনাল ল নিয়ে কিছু সুপারিশ ছিল। মদানি চেয়েছিলেন, ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা ফেডারেল হোক। পঞ্জাব ও বাংলায় কোনও সম্প্রদায়ের জন্য আসন সংরক্ষণ করা চলবে না। সমসংখ্যক মুসলমান ও অমুসলমান জজ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যাবতীয় বিরোধের নিষ্পত্তি করবে। এ সব মেনে নিলে ভারত দু টুকরো হত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হল? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর গভর্নর এসেরি সাহেব মদানিকে গ্রেপ্তার করার অজুহাত খুঁজলেন। তার পর গভীর রাতে তাঁকে অ্যারেস্ট করে নৈনিতালের জেলে পোরা হল। এটার পেছনে শুধু ইংরেজ ছিল ভাবলে ভুল হবে।’’

জর্মান মিঞা বলেন, “দেওবন্দের লোকেরা পাকিস্তান-প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আমাদের বারোটা বাজালেন। এরা যদি কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ না দিয়ে লিগের হাত শক্ত করতেন, তা হলে হয়তো পাকিস্তানের পাঞ্জা শক্ত হত। ভারত নাকি আল্লাহ-র পছন্দের আর অনুগ্রহের দেশ, তাকে টুকরো করা না-ফরমানি, এই সব কথা কি তাঁরা প্রচার করেননি? সালারে শাহ রুস্তমের মাজারে গিয়ে আমি তো এই সব কথা শুনে এসেছি। লিগের তরফে কি আলেম লোক নেই, সত্যি হলে তাঁরা কি এই সব মেনে নিতেন না? যত্ত সব আজগুবি কথা, বুঝলে বিবিজান, কংগ্রেসের প্রচার এ সব। আর মদানি সাহেব তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।’’

“কথা যে মিথ্যা নয়, তা আপনিও জানেন মিঞা। কারণ, আপনি যদি মুসলমান হন তা হলে আপনাকে মানতে হবে যে হজরত আদম আমাদের পূর্বপুরুষ। এই নবি ছিলেন প্রথম মানুষ। তাঁকে পয়দা করারও আগে আল্লাহতালা একটা জিনিস বানিয়েছিলেন, সেটা হল নুর-ই-মহম্মদি—মহম্মদের নুর। এই নুর প্রথম দেওয়া হয় হজরত আদমকে। পয়দা করার পরে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল ভারতের সেরেন দ্বীপে। তা হলে নুর-ই-মহম্মদি প্রথম ভারতে আসে, অন্য সব দেশের আগে। এ কথা আপনাকে তো স্বীকার করতেই হবে।’’

কামরুন্নেসার কথা শুনে জর্মান মিঞা একটু থতমত খান। তার পর বুঝতে পারেন, তিনি কোথাও একটা ভুল করেছেন। কিন্তু সেরেন দ্বীপ জায়গাটা কোথায়? এই প্রশ্ন তাঁর মনে এল। কামরুন্নেসাকে জিজ্ঞাসা করবেন, কিন্তু দেখা গেল, গাড়ির ভিতরে খোকা জর্মান মিঞার প্রথম কন্যা জহুরার উপর খুব চোটপাট করছে। কামরুন্নেসা তাদের ঝগড়া থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

জর্মান মিঞা ভাবতে থাকেন, প্রথম অওরত হবা বিবিকে পয়দা করে পাঠানো হয়েছিল জেড্ডায়। সেরেন দ্বীপ, মানে হিন্দুস্থান থেকে হাঁটতে হাঁটতে মক্কার কাছে আমাদের আদি বাপ-মায়ের মোলাকাত। তার পর আবার ভারতে ফিরে আসা। সেই সময় তো কোনও গাড়ি-ঘোড়া ছিল না, তা হলে অতটা রাস্তা হজরত আদম হেঁটে গেলেন কী প্রকারে!

সুমাই গাড়ি চালাচ্ছে ভয়ঙ্কর গতিতে। মোষ দুটো উল্কার মতো ছুটে চলেছে। গাড়ির নীচে বাঁধা লন্ঠনটা এত জোরে নড়ছে যেন ভেঙ্গে না যায়! সকাল হতে এখনও অনেক বাকি। কামরুন্নেসার ভাইপো খোকাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না তাঁরা। এই ছেলেটির ভিতরে মনে হয় কোনও জিন বাস করে। নইলে ও রায়টের খবর পায় কী করে! গাড়ির ভিতরে কোনও আওয়াজ পাওয়া যায় না। এ দিকে তারা গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছেন। সুমাই এক অলৌকিক তত্ত্ব খাড়া করে নেমে গেল গাড়ি থেকে। সে নাকি জীবিত মানুষ নয়। গাড়োয়ান, যে এতটা পথ তাঁদের নিয়ে এল, সেই যদি মৃত মানুষ হয়, তা হলে দেশের চালক-নেতারা যে কী, তা জর্মান মিঞা আঁচ করার ফুসরত পান না। কারণ, তাঁকেই ওই গাড়ি-চালানোর ভার নিতে হয়েছে।


কোনও ক্রমে বাড়ি আসার পর দেখেন, কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। জর্মান মিঞা চীৎকার চেঁচামেচি করে সবাইকে তুললেন। তাঁদের এই ফিরে আসাকে কেউ তেমন ভাল-চোখে দেখলেন না। জর্মান মিঞার মেজ ভাই, যিনি এ বাড়ির কর্তা; তিনিও না। ভাবিজান তো নয়ই। তাঁর বড় ভাই ঢাকাতে থাকেন, এখন তিনি পাকিস্তানের বাসিন্দা। মেজ ভাই হয়তো ভেবেছিলেন, ছোটও থাকবে পাকিস্তানের মুর্শিদাবাদে। কিন্তু কী করা যাবে! মুর্শিদাবাদ যেমন ভারতে ফিরে এল, তেমনি জর্মান মিঞাও নিজের বাড়ি বীরভূমের গ্রামে ফিরলেন। জর্মান মিঞার মা, যিনি দীর্ঘ দিন রোগশয্যায় ছিলেন, তিনিই একমাত্র খুশি হলেন। জর্মান মিঞা স্ত্রী-কন্যা আর খোকাকে নিয়ে তাঁদের একটি ঘরে বসলেন।




লেখক পরিচিতি
শামিম আহমেদ

জন্ম ১৯৭৩। মুর্শিদাবাদের সালারে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র।
পেশা বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০ টি।
বর্তমানে

1 টি মন্তব্য:

  1. খুব ভাল লেগেছে। পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছি।

    উত্তরমুছুন