শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

রস, নারী ও নরেন্দ্রনাথ

ড. ফজলুল হক সৈকত

লেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্র (জন্ম : ৩০ জানুয়ারি, ১৯১৬, ফরিদপুর; মৃত্যু : ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫) বাংলাদেশে প্রায়-হারিয়ে যাওয়া একটি নাম। অথচ এই বিস্মৃতপ্রায় গদ্যশিল্পী বাংলা কথাসাহিত্যে স্মরণীয়-সরব অবদান রেখে গেছেন। বাল্যকালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। প্রথম মুদ্রিত কবিতা ‘মূক’, গল্প ‘মৃত্যু ও জীবন’ (দুটোই দেশ পত্রিকায় ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত)। ক্ষণজন্মা সাহিত্যপুরুষ নরেন্দ্রনাথ ‘দ্বীপপুঞ্জ’, ‘চেনামহল’, ‘তিনদিন তিনরাত্রি’ ও ‘সূর্যসাক্ষী’ নামক চারটি বিখ্যাত উপন্যাসসহ একটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ এবং পঞ্চাশটি গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন। তার বেশকিছু গল্প বিশ্বসাহিত্য-পরিসরে বিবেচ্য হওয়ার যোগ্য বলে সাহিত্য-বিশ্লেষকদের অভিমত। কবিতা দিয়ে লেখার পাঠ নিলেও শেষত একজন গল্পকার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তুলেছেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬১ সালে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। গল্পের গতিময়তা, সাবলীলতা তাকে বিশ্বের কালচেতন লেখকদের সমকক্ষে দাঁড় করিয়েছে। জীবনের অতিসাধারণ তুচ্ছ বিষয়ও যে কত অসাধারণ গল্পের বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা তার রচনা পাঠ করলে বুঝতে পারা যায়। তবে, আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গ নরেন্দ্রনাথের ‘রস’ গল্প এবং তাতে নারী ও পুরুষের হৃদয়বৃত্তির নানান প্রসঙ্গ।


‘রস’ নরেন্দ্রনাথের এক অনবদ্য সৃষ্টি। গল্পটি নিয়ে বহু নাটক, টিভি সিরিয়াল ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। হিন্দি চলচ্চিত্র ‘সওদাগর’-এ দুনিয়াখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করেছেন। গ্রাম্য প্রেক্ষাপটের একটা মামুলি ঘটনা কী করে উঁচুদরের শিল্পোত্তীর্ণ, রসসমৃদ্ধ গল্পে পরিণত হতে পারে, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত এই ‘রস’। চরিত্র-রূপায়ণ, বর্ণনাভঙ্গি এবং পরিবেশনশৈলীতে গল্প নির্মাতা বিশেষ শিল্প-সুষমার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘গাছি’ মোতালেফকে নারীভুলানী সরস প্রেমিক-পুরুষ হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি তার প্রতারণার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে জীবন্ত ও আকর্ষণীয়ভাবে। তার জীবনধারা ও স্বপ্নময়তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে গল্পের পরিসর। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবেশ করেছে অন্যান্য চরিত্র। প্রতিবেশ এবং আবহ নির্মাণে লেখক অত্যন্ত সাফল্যের পরিচয় রেখেছেন। গল্পটি পাঠ করতে করতে পাঠক যেন পাড়ি দিতে থাকে প্রকৃতির অপার রহস্যের প্রান্ত আর নর-নারীর জৈবিক তাড়নার বাস্তব কিছু সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত।

গল্পের পরিবেশ শৈলীতে প্রভিন্নতা নরেন্দ্রনাথকে সমকালীন গল্প নির্মাতাদের থেকে স্পষ্টত আলাদা করেছে। তার প্রাতিস্বিকতা খুব সহজেই পাঠকের নজরে আসে। ১৯৪৭ সালে দেশ-বিভাগের সময় তিনি সপরিবারে কলকাতায় ঠিকানা গড়েন। কিন্তু মনে ছিল তার পূর্ববঙ্গের স্মৃতি ও উত্তাপ। শৈশব-কৈশোর-যৌবনের প্রথম পাদে দেখা খাল-বিল-নদী-গ্রাম, প্রান্তিক মানুষের জীবনধারা ও মানুষের মানচিত্র তিনি কথামালায় গেঁথেছেন পরম মমতায়। ‘রস’ গল্পটি তার অন্য অনেক গল্পের মতোই বাঙালির চিরচেনা এক গ্রাম্যসমাজ ও সেখানকার বাসিন্দাদের ‘কলা’ ও কারবারের কাহিনী। সময়ের প্রবাহে শীতকাল, প্রকৃতির অমৃত উপাদান খেজুরের রস, মোতালেফ-ফুলবানু-মাজুর সংসারযাত্রা, সঙ্কট পারি দেয়ার বিষয়াদি, কল্পনা-পরিকল্পনা-কামনা-প্রাপ্তি প্রভৃতি নরেন্দ্রের কলমের ছোঁয়া আর ভাবনার দোলায় দারুণত্ব লাভ করেছে। সমাজের প্রতি লেখকের যে নিবিড় সম্পর্ক আর তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণ-প্রবণতা এখানে প্রতিফলিত, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ‘রস’ গল্প বিষয়ে গল্পকারের একটি বিবরণভাষ্য উল্লেখ করা যেতে পারে :

‘এ গল্পের যে পটভূমি তা আমার খুবই পরিচিত। পূর্ববঙ্গে আমাদের গ্রামের বাড়িতে পূর্বদিকে ছিল একটি পুকুর। সেই পুকুরের চারধারে ছিল অজস্র খেজুর গাছ। ছেলেবেলা থেকে দেখতাম আমাদের প্রতিবেশী কিষাণকে সে সব খেজুর গাছের মাথা চেঁছে মাটির হাঁড়ি বেঁধে রাখত। বাঁশের নল বেয়ে সেই হাঁড়িতে সারারাত ধরে ঝির ঝির করে রস পড়ত। সেই রস কড়াইতে করে, বড় বড় মাটির হাঁড়িতে করে জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতেন আমাদের মা-জেঠীমারা। শীতের দিনে রস থেকে গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়া মায়ের পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে রোজ দেখতাম। আমাদের চিরচেনা এই পরিবেশ থেকে ‘রস’ গল্পটি বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু রসের যে কাহিনী অংশ; মোতালেফ, মাজু খাতুন আর ফুলবানুকে নিয়ে যে হৃদয়দ্বন্দ্ব, খেজুর রসকে ঘিরে রূপাসক্তির সঙ্গে যে জীবিকার সংঘাত তা কোন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে আসেনি। সেই কাহিনী আমি দেখিওনি, শুনিওনি। তা মনের মধ্যে যেন আপনা থেকেই বানিয়ে বানিয়ে উঠেছে।’ (গল্পমালা-১, পৃষ্ঠা ১০)

‘রস’ গল্পে তৎকালীন নিম্নবিত্ত মুসলমান সমাজের মানুষের জীবিকা, জীবনের স্বপ্ন-কামনা, প্রতিজ্ঞা-প্রতারণা আর সঙ্কট-সংকোচ ও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ছবি উঠে এসেছে প্রাতিস্বিক পরিচয় ও পারিপার্শিক প্রতিবেশকে আশ্রয় করে। লেখকের কল্পনার চারপাশে আবর্তিত হয়েছে কাহিনীর পরিকল্পনা। আর তা যেন প্রকাশ পেয়েছে অপ্রকাশের ভার অতিক্রম করে। খেজুরের রস আর জীবনের বাসনার রস যেন এখানে বাইরের ও ভেতরের বিষয় হয়ে পাঠককে বিশেষ এক অভিজ্ঞানের দিকে ঠেলে দেয়। জীবন ও যৌবনের চাহিদা এবং প্রয়োজন পূরণের নানান কৌশল যে মানুষ আয়ত্ত করে, তার একটা হিসাব এখান থেকে মেলানোর চেষ্টা করা যেতেই পারে। কাহিনীটির শুরু-অংশ দেখে নেয়া যাক :

‘কার্তিকের মাঝামাঝি চৌধুরীদের খেজুরগাছ ঝুড়তে শুরু করল মোতালেফ। তারপর দিন-পনেরো যেতে-না-যেতেই নিকা করে নিয়ে এল পাশের বাড়ির রাজেক মৃধার বিধবা স্ত্রী মাজু খাতুনকে। পাড়াপড়শি সবাই অবাক। এই অবশ্য প্রথম সংসার নয় মোতালেফের। এর আগের বউ বছরখানেক আগে মারা গেছে। তবু পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জোয়ান পুরুষ মোতালেফ। আর মাজু খাতুন ত্রিশে না-পৌঁছলেও তার কাছাকাছি গেছে। ছেলেপুলের ঝামেলা অবশ্য মাজু খাতুনের নেই। মেয়ে ছিল একটি, কাটিখালির সেখেদের ঘরে বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঝামেলা যেমন নেই, তেমনি মাজু খাতুনের আছেই-বা কী? বাক্স-সিন্দুক ভরে যেন কত সোনাদানা রেখে গেছে রাজেক মৃধা, মাঠ ভরে যেন কত ক্ষেত-খামার রেখে গেছে যে তার ওয়ারিশি পাবে মাজু খাতুন। ভাগের ভাগ ভিটার পেয়েছে কাঠাখানেক, আর আছে একখানি পড়ো পড়ো শণের কুঁড়ে। এই তো বিষয়-সম্পত্তি, তারপর দেখতেই-বা এমন কী একখানা ডানা-কাটা হুরির মতো চেহারা। দজ্জাল মেয়েমানুষের আঁটসাঁট শক্ত গড়নটুকু ছাড়া কী আছে মাজু খাতুনের যা দেখে ভোলে পুরুষেরা, মন তাদের মুগ্ধ হয়।’

পাড়ার সিকদারবাড়ি-কাজীবাড়ির বউ-ঝিরা গ্রামময় বলে বেড়াতে লাগল — মাজু খাতুন নিশ্চয়ই মোতালেফকে ‘তুক করেছে’ কিংবা ‘ধুলাপড়া দিছে চোখে’। কেননা, তারা সবাই জানে গেছে মোতালেফের ‘চাউনিটা একটু তেরছা-তেরছা’; ‘বেছে বেছে সুন্দর মুখের দিকে তাকায়’ সে। কম বয়সী সুন্দরী কোনো মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনার চেষ্টা যে সে করেনি, তা নয়; তবে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি দরদামের কারণে। ‘পাঁচকুড়ি-সাতকুড়ি’ ছাড়া ‘ডাগর-গোছের সুন্দর মেয়ে’ কেউ দিতে রাজি নয়। মোতালেফ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছিল চরকান্দার এলেম শেখের আঠার-উনিশ বছরের মেয়ে ফুলবানুকে। ‘রসে টলটল করছে সর্বাঙ্গ, টগবগ করছে মন। ইতোমধ্যে অবশ্য এক হাত ঘুরে এসেছে ফুলবানু। খেতে-পরতে কষ্ট দেয়, মারধর করে — এসব অজুহাতে তালাক নিয়ে এসেছে কইডুবির গফুর সিকদারের কাছ থেকে। আসলে বয়স বেশি আর চেহারা সুন্দর নয় বলে গফুরকে পছন্দ হয়নি ফুলবানুর। তালাক নেয়া হলেও ‘চেকনাই ও জেল্লা’ দেহ আর রসের ঢেউ খেলা মন মোতালেফকে টেনেছে বিশেষভাবে; ‘ফরসা ছিপছিপে চেহারা’ আর ‘ঢেউ খেলানো টেরিকাটা বাবরিওয়ালা’ খেজুর রসের কারবারি মোতালেফকেও চোখে ধরেছে ফুলবানুর।

কিন্তু কন্যার বাবা মেয়ের তালাক নেয়ার খরচাপাতি সুদে-আসলে আদায় করে নিতে চায় সম্ভাব্য জামাতার কাছ থেকে। কিন্তু অত টাকা তো মোতালেফের নেই! প্রাথমিক আলাপ সেরে একরকম মন খারাপ করে বাড়ি ফেরার সময় পথে জঙ্গলের ধারে মুখোমুখি হয় ফুলবানুর সঙ্গে। ছল করে জল নিতে আসা ফুলবানু ‘এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিক করে একটু’ হাসি দিয়ে বলে : ‘কী মেঞা, গোসা কইরা ফিরা চললা নাকি?... পছন্দসই জিনিস নেবা, বাজানের গুনা, তার দাম দেবা না?... শোনো, বাজানের মাইয়া টাকা চায় না, সোনাদানাও চায় না, কেবল মান রাখতে চায় মনের মাইনষের। মাইনষের ত্যাজ দেখতে চায়, বুঝছ?’ মোতালেফ ফুলবানুকে ঘরে তোলার জন্য ব্যাকুল। জানায় : ‘শীতের কয়ডা মাস যাউক, ত্যাজও দেখাব, মানও দেখাব। কিন্তু বিবিজানের সবুর থাকবেনি দেখবার?’ অতঃপর এই গ্রাম্য যুবক মল্লিকবাড়ি-মুখুজ্যেবাড়ি-মুন্সীবাড়ি ঘুরে ঘুরে টাকা ধার করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তার লেনদেন ভালো না হওয়ায় কেউ ধার দিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না। কিন্তু মন তার থেমে থাকে না। আর আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করায় মনোবাসনা পূরণে প্রকৃতিও যেন হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে রস-ব্যবসায়ী মোতালেফের দিকে। ‘রস ও নারী’-প্রত্যাশী এক প্রেমিক যুবকের বদলে যাওয়া ভাগ্য সম্পর্কে পাঠককে গল্পকার জানাচ্ছেন :

‘কিন্তু নগদ টাকা ধার না-পেলেও শীতের সূচনাতেই পাড়ার চার-পাঁচ কুড়ি খেজুরগাছের বন্দোবস্ত পেল মোতালেফ। গত বছর থেকেই গাছের সংখ্যা বাড়ছিল, এবার চৌধুরীদের বাগানের দেড়কুড়ি গাছ বেশি হল। গাছ কেটে হাঁড়ি পেতে রস নামিয়ে দিতে হবে। অর্ধেক রস মালিকের, অর্ধেক তার। মেহনত কম নয়, এক-একটি করে এতগুলো গাছের শুকনো মরা ডালগুলো বেছে-বেছে আগে কেটে ফেলতে হবে। বালিকাচার ধার তুলে-তুলে জুতসই করে নিতে হবে ছ্যান। তারপর সেই ধারালো ছ্যানে গাছের আগা চেঁছে চেঁছে তার মধ্যে নল পুঁততে হবে সরু কঞ্চি ফেড়ে। সেই নলের মুখে লাগসই করে বাঁধতে হবে মেটে হাঁড়ি। তবে তো রাতভরে টুপটুপ করে রস পড়বে সেই হাঁড়িতে। অনেক খাটুনি, অনেক খেজমৎ। শুকনো শক্ত খেজুরগাছ থেকে রস বের করতে হলে আগে ঘাম বের করতে হয় গায়ের। এ তো আর মা’র দুধ নয়, গাইয়ের দুধ নয় যে বোঁটায় বানে মুখ দিলেই হল।’

গাছ থেকে রস বের করে আনার সঙ্গে সম্ভবত নরেন্দ্রনাথ মিত্র নারীর মন ও শরীর থেকে পুরুষের রস আহরণের কলা ও কৌশলকে পাঠকের সামনে হাজির করতে চেয়েছেন। নারীর মন পেতে পুরুষের জন্য যে সাধনার প্রয়োজন হয়, তা বোধকরি লেখক খেজুর গাছ থেকে রস বের করার দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রক্রিয়া-বিবরণের ভেতর দিয়ে আমাদের চেতনা-দরোজায় পৌঁছাতে চেয়েছেন। আর রাতভর মাটির হাঁড়িতে ‘টুপটুপ’ করে রস পড়ার ছবির সঙ্গে যেন অদৃশ্য এক মিল দেখা যায় বুদ্ধদেব বসুর ‘রাতভরে বৃষ্টি’ উপন্যাসের ক্যানভাস ও কাহিনীর।

পুরুষ ও নারীর যৌবনকালের আকর্ষণ-আকর্ষণ বোধ ও আকর্ষণ-বিকর্ষণ খেলার কিছু ছবি ও কথামালার পাঠ পেয়ে যাই আমরা বুদ্ধদেব ও নরেন্দ্রের ভাবনাশৈলী থেকে। নারী-পুরুষের সম্পর্কের নিবিড়তা, মানসিক দূরত্ব আর শরীর-স্পর্শ-গন্ধের গাঢ়ত্ব — সব যেন নরেন্দ্রনাথের বর্তমান গল্পটিকে সত্যিকারের ‘রস’রূপে পরিবেশন করার জন্য যথার্থ! গল্পের কাঠামো ও পরিবেশন-কায়দার বিবেচনায় বাংলা গল্পে এ এক নতুন সংযোজন। বিষয়-ভাবনার সঙ্গে উপস্থাপনের মুনশিয়ানা নির্ধারণের জন্য নিঃসন্দেহে নরেন্দ্রনাথকে কাহিনী নির্মাতা হিসেবে উত্তরকালের সাহিত্য-পরিসর একটি স্থির আসন প্রদান করবে।

রসের কারবারি মোতালেফের গুরু রাজেক মৃধার কথা গল্পে এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। বারো আনা ডালই শুকিয়ে গেছে এমন গাছ থেকেও ‘হাতের গুণে’ ও ‘ছ্যানের ছোঁয়ায়’ রস বের করার যে দক্ষতা অর্জন করেছে মোতালেফ, তার প্রায় সবটুকু শিখেছে রাজেকের কাছ থেকে। রাজেকের আরো কয়েকজন শাগরেদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত মোতালেফই হয়েছে সফল গাছুয়া। আর ব্যাপারটা হলো এই যে, রাজেক মরার পর তার স্ত্রীকে ঘরের বউ করে আনার পেছনে একটা কার্যকারণও দাঁড় করানোর প্রয়োজন ছিল গল্পকারের। লেখকের বর্ণনা থেকে জানা যাক সেসব কথা :

‘কিন্তু কেবল গাছ কাটলেই তো হবে না কুড়িতে কুড়িতে, রসের হাঁড়ি বয়ে আনলেই তো হবে না বাঁশের বাখারির ভারায় ঝুলিয়ে, রস জ্বাল দিয়ে গুড় করবার মতো মানুষ চাই। পুরুষমানুষ গাছ থেকে কেবল রসই পেড়ে আনতে পারে — কিন্তু উনান কেটে, জ্বালানি জোগাড় করে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে বসে সেই তরল রস জ্বাল দিয়ে তাকে ঘন পাটালি-গুড়ে পরিণত করবার ভার মেয়েমানুষের ওপর। শুধু কাঁচা রস যখন পাকা রূপ নেবে তখন সিদ্ধি, কেবল তখনই সার্থক হবে সকল খেজমৎ মেহনত। কিন্তু বছর-দুই ধরে বাড়িতে সেই মানুষ নেই মোতালেফের। ছেলেবেলায় মা মরেছিল। দু-বছর আগে বউ মরে ঘর একেবারে খালি করে দিয়ে গেছে।’

এমন পরিস্থিতিতে গল্পের নায়ক মোতালেফকে আমরা এক দিন সন্ধ্যার পর মাজু খাতুনের ‘ঝাঁপ-আঁটা ঘরের সামনে’ আবিষ্কার করি। গত বছর মাজু মোতালেফের রস জ্বাল দেয়ার জন্য মজুর খেটেছে কিছু পয়সার বিনিময়ে। কিন্তু রস বা গুড় সামান্য হলেও চুরি করে — এমন সন্দেহের অভিযোগে পুরোটা শীতকাল সে কাজ করতে পারেনি মোতালেফের রসের কারবারে। এবার অবশ্য সে মজুরি হাঁকে বেশি। অন্তত দ্বিগুণ। কিন্তু মোতালেফের উদ্দেশ্য ভিন্ন। সামান্য রসিকতার পরে, খুব একটা ভণিতা না করে মোতালেফ সরাসরি বলে ফেলে কথাটা — মাজুকে সে মজুরি প্রদান নয়, ষোলআনা লাভের মালিক বানাতে চায়; বিয়ে করে ঘরের বউ করে নিয়ে যেতে চায়। সামনে রসের সময় আসছে। মাজুর মতো আঁটসাঁট মেয়েমানুষ তার প্রয়োজন। তা না হলে এত গাছের এত এত রস সামাল দেবে কে? তবে, মাজুর সামান্য আপত্তি এ জন্য যে, জগতে যুবতী মেয়ে থাকতে মধ্যবয়সী মাজুকে তার কী দরকার? এমন প্রশ্নের জবাবে মোতালেফ বলে :

‘কমবয়সী মাইয়া-পোলা অনেক পাওয়া যায়। কিন্তু শত হইলেও তারা কাঁচা রসের হাঁড়ি।... তুমি হইলা নেশার কালে তাড়ি আর নাস্তার কালে গুড়, তোমার সাথে তাগো তুলনা?’ নারী-ভুলানো কৌশল আর নারীর মাদকতা ও মিষ্টত্ব বিষয়ে সতর্ক মানুষ মোতালেফ। এমন ‘খাপসুরৎ’ আর ‘মানানসই কথা’র লোক — রসিক-সমর্থ পুরুষ মানুষ, তাকে অগ্রাহ্য করে কী করে মাঝবয়সী মাজু? কাজেই শুরু হলো নতুন এক ‘ভাঙাচোরা-জোড়াতালি-দেওয়া’ সংসার! — যেখানে ঝানু খেলোয়াড় মোতালেফ ‘সঙ’ আর পুরুষের আশ্রয়প্রত্যাশী চিরায়ত বাঙালি নারী মাজু হলো ‘সার’। এখন রস-আসবার কাল। শীতের প্রহর। রাতে শরীরের গন্ধ ও উষ্ণতা নেয়ার সময়! খেজুর গাছ আর রস; রস আর মেয়েমানুষ — সব মিলিয়ে শীতের প্রহরই বটে! ব্যস্ত মোতালেফ। দিনে-রাতে মাজু বিবির কোনো অবসর নেই। ‘এর-ওর বাগান থেকে, জঙ্গল থেকে, শুকনো পাতা ঝাঁট দিয়ে আনে ঝাঁকা ভরে ভরে, পলো ভরে ভরে, বিকেলে বসে বসে দা দিয়ে টুকরো টুকরো করে শুকনো ডাল কাটে জ্বালানির জন্যে। বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই, খাটুনি গায়ে লাগে না, অনেকদিন পরে মনের মতো কাজ পেয়েছে মাজুবানু, মনের মতো মানুষ পেয়েছে ঘরে।’

‘কিন্তু পছন্দসই মনের মানুষ কি সত্যিই এল ঘরে?’ — না, আসেনি। মোতালেফের মনে ‘বিশেষ জায়গা জুড়ে’ বসে আছে অন্য নারী — ফুলবানু। তাকে বিয়ে করার জন্য প্রয়োজনীয় জোগাড়-যন্ত্র করতে মাজুবানুর মতো শক্ত-সামর্থ্য সহকর্মী দরকার ছিল গাছুয়া মোতালেফের। রসের কারবারি সে — খেজুর গাছের রস আর নারীর রসকে সে কীভাবে যেন মনে ও চেতনায় এক করে ফেলেছে! তার প্রয়োজন ‘রসের মানুষ’ — যুবতী নারী! মাঝবয়সী শাশুড়ি হয়ে-যাওয়া মাজুকে দিয়ে তার বেশিক্ষণ চলে কি? ফুলবানুকে বিয়ে করার জন্য তার বাবা এলেমের হাতে অগ্রিম পঞ্চাশ টাকা গুঁজে দেয় মোতালেফ। তবে, মাজুকে বিয়ে করে ফেলায় এলেমের আপত্তি। কিন্তু মোতালেফ জানায় : ‘তার জন্যে ভাবেন ক্যান্ মেঞাসাব। গাছে রস যদ্দিন আছে, গায়ে শীত যদ্দিন আছে মাজু খাতুনও তদ্দিন আছে আমার ঘরে। দক্ষিণা বাতাস খেললেই সব সাফ হইয়া যাবে উইড়া।’ ফুলবানুর বাবা খুশি হয়; ফুলবানুও। তবে, ‘রসে ভরপুর’ নারী ফুলবানু খানিক গোসা করার ভান করে বলে : ‘বেসবুর কেডা হইল মেঞা? এদিকে আমি রইলাম পথ চাইয়া আর তুমি ঘরে নিয়া ঢুকাইলা আর-একজনারে।’

অবশেষে মাসদুয়েকের মধ্যেই ফুলবানু তার পুরনো স্বামীর গায়ের গন্ধ এবং মোতালেফ নতুন বউ মাজুবানুর গন্ধ মুছে ফেলে পরস্পর ভিন্নতর গন্ধ ও রসের সন্ধানে মিলিত হলো। ‘মাজুবিবির স্বভাব-চরিত্র খারাপ’ — এই অভিযোগ তুলে তালাক দেয় মোতালেফ। মাথায় মিথ্যা অপবাদ নিয়ে ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে মাজু বলে : ‘তোমার গতরই কেবল সোন্দর মোতি মেঞা, ভিতর সোন্দর না। এত শয়তানি, এত ছলচাতুরী তোমার মনে! গুড়ের সময় পিঁপড়ার মতো লাইগা ছিলা, আর যেই গুড় ফুরাইল অমনি দূর দূর।’ তবে, চাল করে যৌবনের মোহে ঝুঁকে ফুলবানুকে ঘরে তুললেও দিনে দিনে মোতির রসের কারবারে আর গুড়ের ব্যবসার সুনাম কমতে থাকে। কারণ শীতের রাতে ফুলবানু চায় কেবল মোতালেফের গায়ের উত্তাপ; দিনের আলোয় রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর বিষয়ে অভিজ্ঞ নয় সে। লেখক গল্পটিতে নারী-পুরষের সম্পর্ক, ভালোবাসা-প্রতারণার পাশাপাশি জৈবিক চাহিদা এবং সংসার-চাকার নানান ব্যাপার প্রকাশ করেছেন। নারী ও রসের বিষয়ে মোতালেফের চোখ প্রখর হলেও ভালো সংসারী যে সে নয়, তার খানিকটা পরিচয় লিখে রেখে গেছেন কাহিনীকার। পাঠককে জানাতে চেয়েছেন কেবল শরীর দিয়ে সংসার চলে না — তাতে সোহাগের দরকার পড়ে, পরস্পরের প্রতি, ঘরের-বাইরের কাজের প্রতি সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।

জীবনের দরকারে আশ্রয়ের জন্য কিংবা কেবল সমাজের চোখে ‘ভালোটি সেজে’ থাকার জন্য মাজুকে পুনরায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। তবে পাত্র নির্বাচনে সে এবার সতর্ক, বিয়ে করে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মাঝবুড়োকে। কেননা, ‘কম বয়সে তার আস্থা নেই। বিশ্বাস নেই যৌবনকে।... রসের সঙ্গে কিছুমাত্র যার সম্পর্ক নেই, শীতকালের খেজুরগাছের ধারেকাছেও যে যায় না, নিকা যদি বসে মাজু খাতুন তার সঙ্গেই বসবে। রসের ব্যাপারে মাজু খাতুনের ঘেন্না ধরে গেছে।’ প্রকৃতিও যেন শেষ পর্যন্ত মাজুর পক্ষ না নিয়ে পারল না। যে মেয়েমানুষটি বিপদের সময় মোতালেফের পাশে দাঁড়িয়েছে, সুসময়ে তার প্রতি অবজ্ঞা-অপমান যেন বিধাতাও সইতে পারেননি। ঘরে শান্তি আসেনি গাছি মোতির। ‘নীল রঙের শাড়ি’ পরে যে যুবতী রসের পুরুষের অপেক্ষায় থাকে প্রহরে-প্রহরে, সেই ফুলবানুকে দিয়ে রস থেকে বাজারে-চলা গুড় বানানো হয়ে ওঠে কী করে! কাজেই গুড়ের ব্যবসা, বছর ঘুরতেই লাটে ওঠে মোতালেফের। সংসারে শুরু হয় মারামারি-গালাগালি। মন খারাপ হয় মোতির। মাজুর জন্য হৃদয় কাঁদে তার। জীবনের ঘটে-যাওয়া ভুল থেকে জেগে উঠবার জন্য ভেতরে ভেতরে প্রাণপণে হাঁপাতে থাকে গাছি মোতি! তাই কোনো এক প্রহরে, মাজুর নতুন স্বামী নাদির মিঞার বাড়িতে, নিয়তির কঠোর-অপ্রতিরোধ হাত ধরে, হাজির হতে হয় তাকে রসের হাঁড়ি নিয়ে। খেতে দেয়ার জন্য নয়; মোতালেফ চায় মাজু রস জ্বাল দিয়ে খানিকটা গুড় তৈরি করে দিক, সে গুড় অজানা হাটে অচেনা খদ্দেরের কাছে বিক্রি করে মোতালেফ তার হারানো ‘বাজার’ সৃষ্টি করবে আবার। বাড়িতে অবশ্য অভ্যাগত হিসেবে নাদিরের কাছে সমাদর পায় মোতি, কিন্তু ক্ষোভে-লজ্জায় অপমান করতে উদ্যত হয় মাজু। তার পরও কথা থাকে। প্রকৃতির নিয়ম বড় বিচিত্র! ভেতরে ভেতরে বোধ করি মোতালেফের জন্য মাজুরও মন কাঁদে। ভালোবাসার বোধহয় এমনই বিধান — রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার কথায় — ‘আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে/ কিছুই কি নেই বাকি?... রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে।’ নরেন্দ্রনাথ তাই তার ‘রস’ গল্পটির কাহিনী শেষ করছেন এভাবে :

‘গলাটা যেন ধরে এল মোতালেফের। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আরো কী বলতে যাচ্ছিল, বাখারির বেড়ার ফাঁকে চোখে পড়ল কালো বড় বড় আর দুটি চোখ ছলছল করে উঠেছে। চুপ করে তাকিয়ে রইল মোতালেফ আর কিছু বলা হল না। হঠাৎ যেন হুঁশ হল নাদির শেখের ডাকে, ‘ও কী মেঞা, হুঁকাই যে কেবল ধইরা রইলেন হাতে, তামাক খাইলেন না, আগুন যে নিবা গেল কইলকার।’ হুঁকোতে মুখ দিতে দিতে মোতালেফ বলল, ‘না মেঞাভাই, নেবে নাই’।’

হ্যাঁ, তাই তো প্রেমের আগুন কি সত্যি নেভে? রস কি কোনো সাময়িক ব্যাপার? না। সম্ভবত নরেন্দ্রনাথের রস, নারী ও মনের ভেতরে জ্বলা আগুনের কথা মনে রেখে, রবিবাবুর কবিতার সেই হঠাৎ-দেখা-হয়ে-যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে স্মরণ করে একালের এক কবি লেখেন :

‘অবর্ণনীয় আনন্দের মধ্য হইতে হঠাৎ এক যাত্রী
আমাকে প্রশ্ন করলেন
রবিবাবু তাহার ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতাটিতে কোথাও
কেন লেখেন নাই,
সেই রমণীর সহিত তাহার কোন ট্রেনে দেখা হইয়াছিল?
আসাম বেঙ্গল এক্সপ্রেসে?
নাকি, যশোর লোকালে?
বলিলাম,
সে কথা রবিবাবু আমাকে বলিয়া যান নাই।
সেই যাত্রী ভেজা কণ্ঠে জানাইলেন
আমি প্রতিদিন, কখনো
যশোর লোকালে,
কখনো বেঙ্গল এক্সপ্রেসে,
খুঁজিয়া ফিরি একটি হারানো মুখ।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন