শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

হাসান আজিজুল হকের গল্প-‘পাতালে হাসপাতালে’

এমারজেন্সির লোকটি মুখ নিচু করে টেবিলে কিছু একটা দেখছিল। অন্যমনস্কভাবে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো তার থেকে মাত্র হাত দুয়েক দূরে দুজন আধবয়েসি আর এক বুড়ো একটা লোককে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুড়োর পাতলা লম্বা নাকটা এক দিকে বাঁকা। কাঁচাপাকা খুদে দাড়ি বেয়ে ঘাম ঝরছে। যাকে কাঁধে নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখ দেখা যায় না, তার একটা পা ঝুললে আর একটা পা আঁকশির মতো বুড়োর কাঁধে আটকানো। লোকটার শরীরের বাকি অংশে আধবয়েসি দুজনের ঘাড়ে কুকুরকুণ্ডলি হয়ে আছে। তিনজনে একসাথে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো।

টেবিল-সামনে চেয়ার-বসা এমারজেন্সির লোকটি চোখ তুলে তাকালো, কিছু দেকলো না। এই সময়ে একবার টেলিফোন বেজে উঠলো। লোকটার ভুরুতে একটা গিট পড়লো। দ্বিতীয়বার টেলিফোন বাজলো। তার ভুরুতে দুটো গিঁট পড়লো। তিনবারের বার সে চেয়ার থেকে একটু ঝুঁকে টেলিফোন তুলে বললো, হ্যাঁ এমারজেন্সি। তারপর একটু শুনে নিয়ে বললো, জানি না। তারপর আবার একটু শুনে বললো, পারবো না, লোক নেই। বলে টেলিফোন রেখে দিলো। মুখ নিচু করে সে আবার টেবিলের উপর কিছু দেখতে দেখতে সরু লম্বা আঙুল চালিয়ে নাকের ভিতর থেকে লোম টেনে টেনে ছিঁড়তে লাগলো। ফের টেলিফোনের শব্দ লোকটা টেলিফোন তুলে বললো, হ্যাঁ, এমারজেন্সি। একটু শুনে বললো, তাতে হয়েছে কি? মাথা কেটে নেবেন নাকি? আবার শুনে বললো, বেশ করেছি, এখান থেকে কাউকে ডেকে দেওয়া হয় না। লোক নেই। তারপর কিছুই না শুনে একনাগাড়ে বলে চললো, ভদ্রতা, ভদ্রতা দেখাচ্ছ আমাকে... তুমি কি নবাবপুত্তুর- যা যা, যা পারিস কর। বেশি তড়পাস না। বলে ঝড়াম করে টেলিফোন রেখে দিয়ে বললো, তুমি আমার কলা করবে।
দক্ষিণদিকের খোলা দরজা-জানালা দিয়ে হুস করে গরম হাওয়া ঢুকলো। সাথে সাথেই আবার ফোঁস-স করে নিঃশ্বাস ফেলে আধবয়েসি দুজন কাঁধ বদলালো। যে ওদের ঘাড়ে চেপে আছে, তার মুখে এখন দেখা যায়, পোড়া ফরশা, ফ্যাকাশে। জিব দিয়ে ঠোঁট চেটে সে জুলজুল করে তাকালো। এমারজেন্সির লোকটি একসাথে পটাপট ভুরুতে গিঁটের পর গিঁট তুলে বললো, কি? এই একটিমাত্র কথা বলতে গিয়ে রাগে তার দুটি বড়ো বড়ো কান রাল হয়ে উঠলো।
ঘাড় থেকে আঁকশিটা একটু সরানোর চেষ্টা করে বুড়ো একদিকে মাথা হেলিয়ে বললো, হুজুর!
টেলিফোন বেজে উঠলো। তিনবার বাজার পর টেলিফোন তুলেই সে ঝুট করে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে যেন মুখস্থ বলে গেল, জি স্যার, না স্যার, ঠিকই স্যার, ঠিকই স্যার, জি স্যার, না স্যার, আচ্ছা স্যার। বলে টেলিফোন রেখে দিয়ে আর দম পেল না, সঙ্গে সঙ্গেই একহাতে কপালের ঘাম মুছে কানে কাছে রিসিভার তুলে একগাল হেসে বললো, আরে তুই! কি খবর? না না গিয়েছিলা, তো, কাল গিয়েছিলাম, না না পরশু, হ্যাঁ পরশুই গিয়েছিলাম। দুপুরবেলা, কেউ ছিলো না... অতো জানি না... কিছুই জোগাড় হয়নি... ওরে বাসরে, সিনেমা দেখার সময় কই, ডিউটির চোটে অন্ধকার... কালকে ব্যাডাক ছিলো, বিশটা টাকা রেরিয়ে গেল...মাগিকে চেনা আচে, শোন দুলু এসেছে, বাপের গলায় ক্যান্সার হয়েছে- মানে হয়ে গেল কি...না, পারবো না, বৌ পাছায় ছ্যাঁকা দিয়ে দিয়েছে।
আবার একগাল হেসে টেলিফোন রেখে দিয়ে লোকটা এবার স্পষ্ট করে জিগ্যোস করলো, কি ব্যাপার।
লোক তিনটি নেতিয়ে পড়েছিল। বুড়ো ঘড়ঘড়ে গলায় বললো, হুুজুর রোগী এনেছি।
এমারজেন্সির লোকটি খেঁকিয়ে উঠে বললো, বেশ করেছো। নাচবো?
কথি রাখবো?
আমার মাথায়। বলে গলা পাল্টে বললো, নামাও, আরে মেঝেতে নামাও।
তাড়াতাড়ি করে লোক তিনটে ঘাড় থেকে জোয়াল ফেলে দিলো। তাদের কাঁধ থেকে লোকটা ধুপ করে মেঝেয় পড়ে। তার যে পা-টি বুড়ো চাষীটার কাঁধে আঁকশির মতো আটকানো ছিলো, সেই পা-টিকে বাঁচাতে বুড়ো হাঁটু গেড়ে বসতে যায়। এই করতে গিয়ে কোমরের লুঙ্গিটা কষি আলগা হয়ে খুলে পড়লো। বুড়ো হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে। লুঙ্গি সড়াৎ করে হাঁটুর কাছে চলে আসে। এমারজেন্সির লোকটি তার অনেক আগেই টেবিলে মন দিয়েছে। সেখানে কি মধু আছে সেই-ই জানে। চাষী তিনজন গোছগাছ হয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। একজন মাথা থেকে গামছা খুলে নিয়ে হাওয়া খায়। বুড়ো লুঙ্গি ঠিকঠাক করে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে লোকটি টেবিলের উপর দিয়ে একদৃষ্টে তাদের দিকেই চেয়ে আছে। সে বলে, হুজুর।
এমারজেন্সি দেয়ালে দিকে মুখ ফেরালো।
যাকে বয়ে আনা হয়েছে তার একটা পা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। সেই পা-টা মেঝেয় লম্বা করে দিয়ে অন্য পা-টি গুটিয়ে দেয়ালে আধা হেলান দিয়ে সে চুপচাপ শুয়ে চোখ পিটপিট করতে থাকে। ফোলা পায়ের তলা থেকে রস গড়িয়ে পড়ছে। একটা বড়ো নীল মাছি দুবার তার পায়েল তলায় বসে খোঁজ-খবর নিয়ে আপন লোকজনদের খবর দিতে চলে গেল। পুরো বাহিনী এসে পৌঁছুতে বিশেষ দেরি হলো না। কি আশ্চর্য! এমারজেন্সির লোকটা আবার জিগ্যেস করলো, কি ব্যাপার? বুড়ো ফের বললো, হুজুর। অন্য দুজন চাষী কুতকুতে বিষণœ চোখে চেয়ে রইলো।
কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
তালপুকুর থিকে- বুড়ো বলে।
পায়ে কি হয়েছে?
হুজুর ছার- বুড়ো শুরু করে, লোকটা মরে যেছে, পায়ের ব্যাদনায়-
হুড়মুড় করে তিনচারজন লোক ঘরে ঢুকলো। তাদের মধ্যে সামনের ছোকরাটি উৎসাহে টগবগ করছে। সোজা টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে বলে, দেখেছেন?
এমারজেন্সির কর্তব্যরত বলে, কি? বলে নখ খুঁটতে থাকে। দেখেননি, আজকের কাগজ দেখেননি? বলতে বলতে সে টেবিলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে। বাকি কজন তাড়াতাড়ি চেয়ার, বেঞ্চি, টেবিলের কোণ দখল করে উৎসুক মুখে পরস্পরের দিকে চেয়ে থাকে।
আজকের কাগজে বেতনের স্কেল দিয়েছে। দেখেননি?
ঢাকার কাগজে?
না, এখানকার কাগজে। একই কথা, এটাও জাতীয় দৈনিক।
ঘোড়ার ডিম হবে- কর্তব্যরত বলে, গরমেন্ট কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে ঘোড়ার ডিম পাড়বে।
এক হাজার টাকা বেতন দিচ্ছে- ছোকরাটা বলে। আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে কথা চালিয়ে যায়, কোন গ্রেড দেবে আমাদের? সিক্সথ না সেভেনথ? সেভেনথ কেমন করে দেয় একবার দেখবো!
বেঞ্চির উপর থেকে একজন বললো, বেতন বাড়িয়ে লাভ? জিনিসের দাম না কমলে বেতন বাড়লে কি হবে? দুশো টাকায় এক মণ চাল আর একশো টাকায় বউয়ের একটা শাড়ি কিনতে হলে লাভটা কি হবে? বেতন বাড়ানো খুব সোজা? কাগজ ছাপিয়ে দিলেই হলো?
আর একজন বলে, বাবা, অর্থনীতির মারপ্যাঁচ। পোঁদে বাঁশ চলে যাবে। বেতন বাড়িয়ে দরকার নেই, জিনিসের দাম কমাও। মানে উৎপাদন বাড়াও।
বেঞ্চি বললো, বেতন দিয়েই বা দরকার কি! বৌ সারা মাসের একটা ফর্দ করে দেবে- সরকারকে দিয়ে দেবো। সেই সব জিনিস তুমি গরমেন্ট সাপ্লাই করো। বেতন চাই না।
সেই জন্যেই তো সরকার বলছে, উৎপাদন বাড়াও।
বেঞ্চি ভয়ানক রেগে গেল, তুই চুপ করে কর শালা, তোর পাছার গর্ত মাটি দিয়ে বুজিয়ে ধানগাছ লাগাবো। উৎপাদন বাড়াও! ঐ চাষাগুলো বসে আছে- বলে সে আঙুল দিয়ে বুড়ো আর আধবয়েসি দুজনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, ওদের বলে দ্যাখ উৎপাদন বাড়াও। কি চাচা, উৎপাদন বাড়াবে? উৎপাদন? সে বুড়োকে জিগ্যেস করে।
বুড়ো নড়েচড়ে বসে বললো, হুজুর ছার।
বেঞ্চি দাঁত বের করে হ্যা হ্যা বললো, ঔ দেখো, উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। ছোকরাটি একটু দমে গিয়ে বললো, তাহলে বাড়িয়ে সরকারের উদ্দেশ্য কি?
বেঞ্চি বললো, তোর মুত পেয়েছে কি? যা মুতে তলপেট খালি করে আয়।
এমারজেন্সির কর্তব্যরত বললো, সব গুলপট্টি। ঢাকার কাগজে বেরিয়েছে কি?
ছোকরাটি আবার বললো, কথা হচ্ছে বেতন বাড়াব কি বাড়াব না?
এতক্ষণ কথা বলেনি একজন বললো, বাড়াবে।
বাড়াবে? কেন।
সরকার শিক্ষিত লোকের মুখ এমনিতেই বন্ধ আছে। বন্ধ থাকাই ভালো। খুললে দুর্গন্ধে দেশে টেঁকা দায় হবে। শিক্ষিত ােক মারিও না, দ্যাকা আছে।
তবু কথা বললে যারা বলতে পারে তাদের খাইয়ে-দাইয়ে সরকার খুশি রাখতে চায়।
ওসব মামদোবাজি গণতান্ত্রিক সরকার করে। মিলিটারি গরমেন্টের আবার খুশি-অখুশি কি?
এমারজেন্সি এবার অস্থির হয়ে বললো, এই চুপ, চুপ, হাসপাতালে বাজে কথার ইয়ে করি। বেতন বাড়াবে বাড়াবে। যাও দেখি এখন।
লোকগুলো উঠে চলে গেল। গনগনে আগুনে-গরম তামার পাতের মতো হাওয়া ঘরের ভিতরে ঢুকলো। চাষী দুটো একভাবে বসে আছে। একজনরে আবার ঢুলুনি এসেছে। ভিতরের দিকে বারান্দায় টুকটুক করে হাসপাতালের মেয়ে মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে। মাড় দিয়ে করকরে করে ইস্তিরি করা তাদের সাদা পোশাক দরজার ফাঁক দিয়ে একবার একবার দেখা যায়।
পায়ে কি হয়েছে?
বুড়ো আবার গোড়া থেকে শুরু, হুজুর, ছার।
একটা হাত তুলে এমারজেন্সি বললো, জিগ্যেস করছি পায়ে কি হয়েছে? বুড়ো ফস্ করে বলে বসে, পর্শুদিন নাপিতের কাছে গেলছিলো, তারপর- নাপিত, তার মানে?
বুড়ো হড়বড় করে বলে যায়, হুজুর ছার, মনে করেন মাসখানেক আড়ে একটা কাঁটা ফুটেছিলো। মনে করেন সকালবেলায় বাড়ি থিকে জন খাটতে যেছে, এমনি সোমায় এই বড়ো একটা বাবলার কাঁটা- কি বাপ জমিরুদ্দি, অক্ত বেরুচ্ছিলো, বুড়ো পা-ফোলা জমিরুদ্দিকে জিগ্যেস করে।
এমারজেন্সি বললো, কে হয় তোমার?
আমার কেউ নয়, গেরাম সম্পক্কে আমি উয়ার চাচা হই।
ঐ লোক দুটো ওর কে হয়?
কেউ হয় না হুজুর, এই ভাই বুলে ডাকে।
এখানে এনেছ কেন?
ওর বাপ নাই হুজুর।
দুত্তেরি, বাড়িতে টাঁসতে কি হয়েছিলো? এখানে এনেছো কেন?
বুড়ো ভয়ে ভয়ে বললো, হুজুর হাসপাতাল বুলে।
হাসপাতাল তো কি হবে?
হুু, গরিবের আর কি উপায় আছে? পর্শুদিনকে নাপিত পা কেটে কাঁটাটো বার করতে গেলছিলো, তারপর একদিনের মধ্যে এই আবস্তা, পায়ের ব্যাদনায়-পা-ফোলার হয়ে বুড়ো নিজেই নিজেই কঁকাতে শুরু করে। চাষী দুজন দেয়ালে হেলান দিয়ে একভাবে বসে আছে।
এখানে কিছু হবে না- বলে এমারজেন্সি দরজা দিয়ে বাইরের গরম রোদের দিকে চেয়ে রইলো।
আউটডোরে নিয়ে গিয়ে টিকিট করাও। আজ আর হবে না। কাল ওখানে গিয়ে টিকিট করাবে। বাইরে থেকে মুখ ফিরিয়ে এমারজেন্সি বলে।
বুড়ো কিছুই বুঝতে না পেরে তারদিকে বোকার মতো চেয়ে থাকে। তার কাঁচাপাকা দাড়ি থেকে এখন আর ঘাম ঝরছে না। ফোলা পা-টা তেমনি করেই মেঝেয় ছড়িয়ে অন্য পা-টি গুটিয়ে জমিরুদ্দি পিটপিট করে চাইছে।
এমারজেন্সি এতক্ষণে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। রোগা-চেহারা, বাঁদুরে পাত-পা, কান দুটো বড়ো বড়ো। লোকটা লম্বা ছিলো, কিন্তু শির-দাঁড়াটা যেন মচকে গেছে। এদিকে এসে সে জমিরুদ্দি ফোলা পায়ের তলাটা দেখলো। বেশ ঘন রস ঘড়াচ্ছে, একটা ফুটো থেকে। নীল মাছিগুলো মহাব্যস্ত। পায়ের পাতায় আঙুল দিয়ে টিপে সে জিগ্যেস করলো, ব্যথা লাগে? জমিরুদ্দিন আস্তে আসেত মাথা নেড়ে জানালো লাগে।
এখানে হবে না- বলে উঠে দাঁড়িয়ে এমারজেন্সি ঘরের বাইরে যাবার জন্যে এগিয়ে যায়। সে দোরগোড়ায় পেীঁছেছে, জমিরুদ্দি হাসপাতালের শব্দ, শুকিয়ে ওঠা বাতাসের আওয়াজ ছাপিয়ে হুস্ করে একটা ভয়াবহ নিঃশ্বাস ফেললো। বাইরে পা বাড়িয়ে এমারজেন্সি ফিরে তাকালো, ফের বললো, নিয়ে যাও এখান থেকে, হাসপাতাল ছাড়া টাঁসার কি আর জায়গা নেই। বলে সে বাইরে চলে গেল।
এখন ঘরে তারা চারজন ছাড়া আর কেউ নেই। দক্ষিণদিতের দেয়াল ঘেঁষে একটা উঁচু সুরু অয়েলক্লথ-মোড়া বেঞ্চি আছে। সেটার পাশে স্ট্রেচার মইয়ের মতো টেসানো।
বুড়ো ফিসফিস করে বলে, এখুন কি হবে?
চাষীদের একজন হাই তোলে, ঘুষ নেবে লিকিন?
বুড়ো বললো, লিলে দেবে কে? আমার কাছে পাঁচ আনা পয়না আছে।
তাহলে ফিরে লিয়ে যাই। জমিরুদ্দি ফিরে যাবি?
জমিরুদ্দি মাথা নেড়ে জানায় সে ফিরে যাবে না।
তালি? বুড়ো আকাশ-পাতাল ভাবনায় ডুবে যায়!
ছুটে এসে দুজন লোক ঘরে ঢোকে। একজন ছোকরা আর একজন আধবয়েসি। ছোকরার ভারি ফুর্তি, মুখ দিয়ে কথার তুবড়ি ছুটছে, লাও লাও, ধরো, উ পাশটা ধরো, আরে ধেত্তেরি আমার- ছেলেটি একটা নোংরা কথা বললো। আধবয়েসি ধীর স্থির, বললো, শালা, মেগের ভাই, অতো ফুর্তি মারাচ্ছ কেন? তোমার তেল হয়েছে বাঞ্চোৎ। দেয়াল থেকে স্ট্রেচারটা নিয়ে তারা চলে গেল।
বুড়ো সঙ্গী দুজনের মুখের দিকে চেয়ে আবার বলে, তালি? তাদের মাথার উপরে ফ্যানটা ঘটর ঘটর শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায়। দমকা হাওয়ায় আবার খানিকটা আগুন ঘরে ঢোকে। স্ট্রেচার নিয়ে লোক দুটি ফিরে আসে। ভারি স্ট্রেচারটা বয়ে আনতে আধবয়েসি লোকটার কষ্ট স্পষ্ট। তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে। ছোকরার হাতের পেশি ফুলে উঠেছে। অয়েলক্লথ মোড়া উঁচু বেঞ্চিটার সমান্তরাল করে স্ট্রেচার কাৎ করতেই বালির বস্তার মতো একটা মানুষ গড়িয়ে অয়েলক্লথের উপরে পড়লো। ছোকরাটা হুট করে স্ট্রেচার নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে রেখেই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। অশ্রাব্য ভাষায় গাল দিতে দিতে আধবয়েসি লোকটাও তার পিছু নেয়।
বুড়ো চেয়ে দেখে বেঞ্চির উপরে লোকটার জ্ঞান নেই। মাথার খুলি খেলাম-কুচির মতো যেখানে সেখানে ভাঙা। রক্তে সমস্ত মুখটা ডুবে গিয়েছে। কিছু কিছু রক্ত এর মধ্যেই শুকিয়ে কালচে হয়ে এসেছে। শুরু একটা চোখের নিচে থেকে এখনো টকটকে লাল টাটকা রক্ত গড়াচ্ছে।
উরি বাপরি সব্বেনাশ- বলে বুড়ো দু হাতে চোখ ঢাকে।
চাষীদের একজন ঘুমিয়ে পড়েছে ঘাড় গুঁজে। জমিরুদ্দি ঠিক তেমনিই চোখ পিটপিট করে যাচ্ছ্
েকই, কই, কোনদিকে- এইতো এদিকে আনলো- বলতে বলতে একদল লোক ঘরে ঢুকে উঁচু বেঞ্চিটা ঘিরে ধরে লোকটাকে পরখ করে দেখতে লাগলো।
ট্রাকটার নম্বর কতো? দলের একজন বলে।
কি করে জানবো? ট্রাক চলে গেলছে।
রিশকয় লোক ছিলো?
কি করে জানবো? রিশক গুঁড়ো হয়ে গেলছে।
ওদের পিছনে এখন এমারজেন্সির লোকটিকে দেখা যায়। তার পিছনে ডাক্তার। ডাক্তারের সাদা জিন্সের এ্যাপ্রোনটায় কোথায় একটু ধুলো-ময়লা নেই। তিনি সোজা লোক ঠেলে উঁচু বেঞ্চিটার কাছে এসে লোকটার মাথা ধরে নাড়া দিতেই গোলাপি-সাদা খানিকটা গলা মগজ বেরিয়ে এসে বেঞ্চির একটা পা ধরে নামতে থাকে।
ডাক্তার ঠাণ্ডা গলায় বলেন, এক্সপায়ার্ড। বলে সেখান থেকে সরে আসেন। কি হলছে, কি হলছে। অনেকগুলো লোক এক সাথে চেঁচায়।
মরে গেলছে?
হ্যাঁ, মরে গলেছে।
মরা লোকটার মুখের দিকে খানিকক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে দেখে আর কোনো কথা না বলে লোকগুলো মিছিল করে বেরিয়ে যায়। তারা চলে গেলে লোকটা মরা চোখে দরজার মধ্যে দিয়ে বাইরে লম্বা কটাসের উপর দিয়ে নীল ইস্পাতের মতো আকাশের দিকে চেয়ে থাকে।
ডাক্তার চলে যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে বলেন, এরা?
এমারজেন্সির লোকটা শুরু ঘাড় ঝাঁকায়। ডাক্তার জমিরুদ্দির কাছে এসে তীক্ষè চোখে তার ফোলা পায়ের ক্ষতটার দিকে চেয়ে থাকেন। খানিতক্ষণ দেখে বুড়োর দিকে চেয়ে বলেন, এ বাঁচবে না। যা হবার হয়ে গিয়েছে। এখন কিছু করার নেই। কি হয়েছিলো?
বুড়ো এবার বেশ ঠাণ্ডাভাবেই বলে, হুজুর, মাসখনোক আগে একটা বাবলার কাঁটা ফুটেছিলো। তারপর এই পর্শুদিন নাপিতের কাছে যেয়ে-
বুঝতে পেরেছি- নাপিতের বাকি কাজটা সেরে দিয়েছে। নিয়ে যাও।
জমিরুদ্দির শুকনো চোখে পানি চকচক করে ওঠে। এমারজেন্সি ঘাড় নিচু করে মাটির দিকে চেয়ে থাকে। তখন ডাক্তার বলেন, কাগজ ঠিকঠাক করে সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিন। লাভ কিছু নেই।
ডাক্তার চলে গেলেণ। এমারজেন্সিও তাঁর পিছনে পিছনে বেরিয়ে গেল। ,রা লোকটার মাথা উঁচু বেঞ্চি থেকে ঝুলে পড়েছে। বুড়ো এদিক-ওদিক চেয়ে দ্রতুত নিঃশ্বাস পায়ে বিঞ্চিটার কাছে এসে তার মাথাটাকে সোজা করে দেয়। তারপর চট্ করে চোখের পাতা দুটি টেনে বন্ধ করে দিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে।
এমারজেন্সির সঙ্গে স্ট্রেচার-বওয়া ছোকরাটি আর সেই আধবয়েসি লোকটা ফিরে এসেছে।
জমিরুদ্দিকে দেখিয়ে সে বললো, একে সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে রেখে এসো।
আধবয়েসি লোকটা রাগে গজগজ করতে লাগলো, আমরা মানুষ তো না কি? আর কি কেউ নাই?
এমারজেন্সি তার পিঠ চাপড়ে দেয়, যা যায় রেখে আয়-বেচারি হাসপাতালে মরার শখ হয়েছে। যা রেখে আয়! বুড়ো হাতে সে এক টুকরো কাগজ দিলো?
জমিরুদ্দি খানিকটা চেষ্টা করে টেনে হিঁচড়ে নিজেই স্ট্রেচারে উঠলো। ওদের সঙ্গে বুড়ো হাসপাতালের ভিতরের বারান্দায় চলে আসে। চাষী দুজন বসে আছে। এখন দুজনেই জেগে।
জমিরুদ্দিকে নিয়ে দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে স্ট্রেচারে একটা দিক এমন ঢালু হলো যে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ছোকরাটা কোনোরকমে সামলে নিলো। দোতলায় উঠে একটা ঘরে ঢুকে তাকে স্ট্রেচার কাৎ করে মাটিতে ফেলে দিয়ে লোক দুটো প্রায় ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গেল। জমিরুদ্দি গড়িয়ে পড়তে পড়তে বহু কষ্টে কনুইয়ে ভর দিয়ে সামলায়, ফোলা পা নিয়ে তার প্রায় কিছুই করার থাকে না। বুড়ো কুণ্ঠিতভাবে কাগজটি নিয়ে ঘরে ঢুকে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়ালে টেবিলের পিছনে বসে থাকা লোকটি হাত বাড়িয়ে কাগজ নিয়ে বলে রোগী কই?
বুড়ো বললো, ঐ যি। বলে সে হাঁফাতে থাকে।
বেড নেই- মাটিতে থাকতে হবে। পারবে?
কি বুলছেন হুজুর?
বলছি, বিছানা নেই। মাটিতে থাকতে হবে। থাকতে পারবে তো?
পারবে হুজুর।
ঠিক আছে- ঐখানে নিয়ে যাও।
বুড়ো চেয়ে দেখে সারি সারি লোহার খাট। ঘরের পশ্চিমদিকে দুই খাটের মাখানে হাদ দুয়েক চওড়া একটা ফাঁকা জায়গা জমিরুদ্দিনকে নিয়ে যাওয়া দরকার। চোখে অন্ধকার দেখে সে। জমিরুদ্দি রাস্তাজুড়ে শুয়ে আছে। জমিরুদ্দির কাছে এসে বলে, জমিরুদ্দি, বাপ, ঐখানটোয় যেতে হবে যি।
জমিরুদ্দি চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। বুড়ো তখন জমিরুদ্দির পিছনে গিয়ে তাই দুই বগলের তলায় হাত রেখে তাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। জমিরুদ্দি অবশ্য তার ভালো পা-টাকে ব্যবহার করতে। খানিকটা করে তাকে টেনে নিয়ে বুড়ো থেকে যায়, তার বুকের ভিতর থেকে হাঁপরের শব্দ আসে।
বাপ, জমিরুদ্দি, আর একটু-বুড়ো মোলয়েম করে বলে বটে, কিন্তু সে ঘরের কিছুই দেখতে পায় না, সব আবছা ধোঁয়ার মতো হয়ে যায় তার চোখের সামনে। সারি সারি রোগী শুয়ে আছে। তাদের ভিতর দিয়ে লোকজন হাঁটছে, কথা বলছে, বুড়োর কিছুই কানে আসে না, চোখেও পড়ে না। জমিরুদিকে ফাঁকা জায়গাটায় এনে সে নিজেই হুমড়ি খেয়ে দেয়ালের উপর পড়ে। একনাগাড়ে হাঁফিয়ে বুড়ো যখন একটা ধাতস্থ হয়েছে, তখন যে লোকটি তার হাত থেকে কাগজ নিয়েছিলো সে এসে বললো, ব্যস, ঠিক আছে।
বুড়ো তার ভুরুর উপর থেকে ঘাম মুছে বললো, আমাকে আর কি করতে হবে হুজুর?
কিছুই করতে হবে না। যা করার আমরাই করবো।
আমি তাহলে যাই?
যেতে পারো।
বুড়ো আর কথা খুঁজে পেল না। লোকটাও আর সেখানে দঁড়ালো না।
বুড়ো বললো, জমিরুদ্দি, ভুখ লেগেছে?
জমিরুদ্দি একটা ভয়াবহ ফ্যাঁশ শব্দ করে উঠলো। হিম ঠাণ্ডা শব্দ। গলার ভিতরের গভীর গর্ত থেকে আসছে। তার মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে বুড়ো মানুষটি বুঝলো যে সে মানুষের ভাষাতেই কথা বলছে আর বলতে তার পুরো শক্তিটাই খরচ হয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু তবু কান না পাতলে কিছুই শোনা যায় না।
তেমনিই চোখ মুখ ছিঁড়ে মদ্দা হাঁসের মতো ফ্যাঁশ করে সে বললো, না গো।
বুড়ো তার ময়লা হাফ-শার্টের পকেট খুঁজে আধখানা শক্তটক গন্ধঅলা রুটি বের করে বললো, রাখ, ভুখ লাগলে খাস।
জমিরুদ্দি আবার বললো, না গো।
না বুলিস না, রেখে দে।
জমিরুদ্দি চুপ করে রইলো।
আমি তাহলে যাই বাপ?
চাচা! জমিরুদ্দি ডাকে।
তার মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে বুড়ো বলে, কি বুলছিস?
ফোঁস করে তার কানের উপর গরম নিঃশ্বাস ফেলে জমিরুদ্দি বললো, মরে তো যাবো চাচা- আর দেখা হবে না। মনে কিছু লিয়ো না।
বুড়ো একবার বলার চেষ্টা বরলো, না, মরবি ক্যানে?
নিজের কানেই তো শুনলে চাচা। ডাক্তারকে এককার শুদোও ক্যান কদিন দেরি আছে। তিন-চার দিন সময় পালি একবার ছেলে তিনটোকে এনো ক্যানে!
বউকে দেখবি না?
জমিরুদ্দি বলে, দেখবো চাচা।
বুড়ো একটু দাঁড়িয়ে থেকে কোমরে হাত দিয়ে খুঁজে পেতে কিছু একটা পেয়ে দিয়ে বলে, তোর কাছে কিছু নাই, আমার কাছেও তো বাপ কিছু নাই, এই বারো আনা পয়সা ছেলো, তুই রাখ। এই বলে বুড়ো জমিরুদ্দির ডান হাতের বিরাট থাবা খুলে তার ঘেমো মুঠোর মধ্যে খুচরা কিছু পয়া দিয়ে দেয়। জমিরুদ্দি বুড়োর শুকনো হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে চাপ দেবার সঙ্গে সঙ্গে তার দু’চোখ ভর্তি হয়ে যায়।
একটু রূঢ়ভাবে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একবারও পিছনে না চেয়ে বুড়ো সোজা বাইরে চলে এলো।
সন্ধের পর দলবল নিয়ে ডাক্তার আসেন। তাঁর চৌকো মুখটা বসন্তের দাগে ভরা। চোয়াল দুটো চওড়া আর মজবুত। তিনি ঘরে ঢুকেই হাসপাতরে দু’সারি বিছানার মাঝখানের সরু পথটা দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যান আর আড়চোখে এক একজন রোগীর দিয়ে চেয়ে মন্তব্য করেন, সেই আলসারের রোগী বুঝি। বেঁচে আছে এখনো? বাঁচার কথা নয়। ও বাঁচলে মেডিক্যালে সায়েন্স মিথ্যে হয়ে যাবে। বাঁ দিকের বিছানার দিকে চেয়ে বলেন, গড ব্লাডার স্টোন। সঙ্গীসাথী মেডিক্যাল কলেজের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ মটকে বলেন, দারোগা না? মালদার আদমি। গল ব্লাডার স্টোন, হাঃ। আপনার কি? এখানে বসে বসে কি করছেন? একটা বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। সঙ্গে সঙ্গে কালো রোগা একটা লোক ধড়মড় করে বিছানার উপর উঠে বসে খোঁচা-খোঁচা দাড়িগোঁফের ফাঁক দিয়ে কোণঠাসা নেড়ি কুকুরের মতো বিব্রত অপ্রস্তুতভাবে সবকটি দাঁত বের করে ফেলে। ডাক্তার খেঁকিয়ে ওঠেন, এখানে কি, কাল চলে যাবেন এই, আমাকে মনে করিয়ে দিয়ো, কাল একে রিলিজ করে দেবো।
পাঁচ সাত মিনিটের মধ্যে রোগী দেখা শেষ করে এবার তিনি যার খাট না পেয়ে মেঝেতে জায়গা নিয়েছে, তাদের দিকে ফিরে ফেটে পড়লেন, এ লোক মাটিতে কেন?
কর্তব্যরত লোকটি ছুটে এলো, বিছানার ব্যবস্থা করা যায়নি স্যার। তাছাড়া অতো বিছানা পাতার জায়গাও নেই।
তাহলে এদের ভর্তি করা হয়েছে কেন?
ভর্তি করার মালিক তো আমি নই স্যার। আর.এস সাহেব পাঠালে আমি কি করবো?
আর.এস সাহেবের আর কি? খুচ করে লিখে দিলেই হয়ে গেল। হসপিটালের একটা ডিসিপ্লিন নেই? মাটিতে রোগী থাকবে? কাল সব বিদায় করে দিন।
ওরা কেউ হেঁটে আসেনি স্যার। সবাইকে স্ট্রেচারে করে দিয়ে গেছে।
তাহলে স্ট্রেচারে করে বাইরে নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসুন। মরবে তো সবাই অতো কায়দা করে মরতে হবে না।
আর.এস সাহেব বলেন, যাদরে ভর্তি না করলেই নয়, একমাত্র তাদেরই তিনি ভর্তি করেন। সবই তো ক্রিটিক্যাল কেস স্যার।
ক্রিটিক্যাল কি ক্যাল আমি জানি। হাসপাতালে জায়গা না থাকলে কোথায় রাখা হবে? মেঝেতে পা ফেলবার ঠাঁই নেই, বারান্দা দিয়ে হাঁটার উপায় নেই। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। এরপর রোগী তো আমার বেডরুমে পাঠিয়ে দেবনে দেখছি। একঘণ্টার মধ্যে যে রোগী মরবে না, তাকে যে এখানে ভর্তি করা না হয়। এ ঘণ্টার মধ্যে মরা চাই।
তাতেও জায়গা হবে না স্যার কর্তব্যরত লোকটি গাল চুলকোতে চুলকোতে নিরীহভাবে মন্তব্য করে।
ডাক্তার শুরু একবার অনিশ্চিতভাবে হাঃ বলে কোণের দিকে মেঝেতে যে রোগীটি শুয়ে আছে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। একটু নিচু হয়ে ঝুঁকে তিনি বলেন, এ ছোঁড়াটা কে? বলতেই যে খালো দাড়িঅলা লোকটা সেখানে বসেছিলো, সে হাউমাউ করে উঠলো, ছার, আমার পোলা, ঠার, রেলে কাটা গেইছে। আমার একটা মাত্তর পোলা ছার-
রেলে কাটা গেছে তো হাসপাতালে কেন, মরেনি?
একটা পা কাটা গেইছে ছার।
পা থেকে মাথা তো বেশি দূরে নয় বাপ। ফস্কালে কি করে?
এই কথা শুনে লোকটা ঝট করে কান্না থামিয়ে দিয়ে, চোখের পানিটানি শুকিয়ে একদৃষ্টে ডাক্তারের দিকে চেয়ে রইলো।
ডাক্তার বললেন, দেখি, কাপড় সরাও।
কাপড় সরালে দেখা গেল, ব্যান্ডে থেকে চুয়ে চুয়ে তখনো রক্ত পড়ছে। একটু লক্ষ্য করতে ডাক্তার পিছন ফিরে বললেন কি ওষুধ দেওয়া হয়েছে দেখি। প্রেসক্রিপশনটা দেখে-টেনে আবার বললেন, রাতটা টিকলে কাল দেখা হবে।
সবশেষ জমিরুদ্দির পালা।। সে উত্তর দেয়ালের কোনের দিকে ছিলো। ডাক্তার চোয়াল নাড়িয়ে দাঁত কড়মড় করে জিগ্যেস করেন, তোমার কি?
জমিরুদ্দি ফ্যাঁশ করে সেই নিঃশব্দতার ছোরা চালিয়ে কি যে বললো, ডাক্তার শুনতে পেলেন না। কোমরের পিছনে দু হাত বেঁধে ঝুঁকে নিচু হয়ে হাস্যকর ভঙ্গিতে মুখ বিকৃত করে বললেন, এ্যাঁ?
জমিরুদ্দির সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে বললো, আমার পা ছার। পায়ে কি? বলে ডাক্তার আরো নিচু হয়ে তার ফোলা পা-টাকে ভালো করে দেভে বললেন, হুঁ। কলে কোনোদিকে না চেয়ে দলবল নিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
রাত বেড়ে যায়, কিন্তু কোনো আলে নেভানো হয় না। সাদা পোশাকে নার্সরা বিছানায় বিছানায় ঘোরাঘুরি শুরু করে। দেয়ালে হেলান দিয়ে জমিরুদ্দি চোখ বন্ধ রাখে। বিছানা নেই, খালি মেঝেয় তা পা পিছলে পিছলে যাচ্ছে। ফোলা পা-টাকে একবার কটকট দিয়ে ঝিমুতে ঝিমুতে সে মরণের কথা ভাবতে থাকে। পায়ের ক্ষতটা একবার কটকট করে কামড়ে উঠলে তার মনে হলো মরণটা সেখানেই ঘাপটি মেরে বসে আছে। জমিরুদ্দি মনে করার চেষ্টা করে কেমন করে একদিন সকালেবেলায় বোরের শিরশিরে হাওয়ার মধ্যে সে গামছায় গা জড়িয়ে নিয়েছিলো, হাতে ছিলো পুরনো সাদা কাস্তেটা- এই সময়ে হঠাৎ পায়ে তার ফুটলো একটা ধারালো শক্ত কাঁটা, মগজে যেন কিসে একটা আঁচড় কাটলো খড়াং করে, নিচু হয়ে বসে জমিরুদ্দি তার বাঘথাবার মোটা মোটা আঙুল দিয়ে কাঁটাটাকে বের করার চেষ্টা করতেই পট করে সেটা মাঝ বরাবর ভেঙে গেল, একটুও রক্ত এলা না, ভিতরটা একবার শুধু কনকন করে উঠলো, মাথার মধ্যে আরো দুবার আঁচড় কটার খড়র খড়র আওয়াজ হলো, জমিরুদ্দি উঠে দাঁড়িয়ে গামছাটা গা থেকে খুলে কোমরে বেঁধে বেড়া বাঁধার পেয়ে সাত টাকা রোজগার করে হাট থেকে যে চাল কিনেছিলো তাতে রাতে তিন ছেলে বউ আর সে নিজে পেটপুরে খেতে পেয়েছিলো, সেই রাতে স্ত্রী সহবাসে সে খুব আনন্দ পায়, কাঁটার কথা কার কোথাও মনে ছিলো না।
এই ঘটনার কতোদিন পরে ঠিক বলা যায় না, জমিরুদ্দি লক্ষ্য করে কাঁটা ফোটার জায়গায় একরক্তি পুঁজ জমে সাদা হয়ে আছে আর এই পুঁজের চারপাশটা শক্ত, জোর করে টিপলে কবে সামান্য ব্যথা লাগে। এই ব্যাপার তাদের প্রত্যেকেই হামেশা হচ্ছে-কে আর খেয়াল করে হাতের কাছে গাঁয়ের নাপিতকে পেয়ে সে অনুরোধ করে বসে কাঁটাটা বের করে দিতে। লোকটা তো তার কথা না-ও শুনতে পারতো। কিন্তু ক্ষুর, চিমটে, নরুণ এইসব নিয়ে সে কাজে লেগে গেল। কাঁটাটা কি বের করতে পেরেছিলো? জমিরুদ্দি জানে না। সে একটুও সন্দেহ করতে পারেনি যে গাঁয়ের ভালো মানুষ নাপিতটি নরুণের সরু ডগা দিয়ে পুঁজের ঐ ছোট্ট গর্তটায় মরণকে বসিয়ে দিয়েছে। দুপুর থেকে যেদিন তার জ্বর-জ্বর লাগছিলো, মাথা ঝিমঝিম করছিলো, সেই দিন রাত-দুপুরে সমস্ত পা-টা ফুলে গেল। সকালে সে নিজেই বুঝে যায়, বাঁচার কোনো উপায় নেই। কিন্তু জমিরুদ্দি মরারও কোনো উপায় নেই। তার কুঁড়েঘরের দাওয়ায় শুয়ে শুয়ে দেখলো, ঝাঁ ঝাঁ করে রোদ চড়ে গেল, গরম শুকনো হাওয়া দিতে লাগলো, কুণ্ডলি পাকানো সাদা মেঘের মতো ধুলো উঠলো। রান্না নেই, একটা পোড়া কালো ভাঙা মাটির হাঁড়ি দিয়ে উননু চাপা দেওয়া। জমিরুদ্দি কাজে বেরুতে পারলো না, কাজেই আর রাতেও উনুন হাঁড়ি চাপা থাকবে। আস্তে আস্তে সব কিছু তার মাথায় মধ্যে গুলিয়ে উঠলে কারা যে তাকে ধরাধরি করে গরুর গাড়িতে চাপায়, ধুলোর মেঘের মধ্যে দিয়ে, ভ্যাপসা গরম আখের ক্ষেতগুলোর ভিতর দিয়ে গরুর গাড়ি চলে এসব কিছুই এখন তার মনে পড়ছে না। তাহলে এক্ষুণি কি তার মরণে হচ্ছে? সে তার ফোলা পা-টায় একবার হাত বুলোয়। ভোঁত ভারি আরো ভারি মুঠো দিয়ে দুটো ঘা দিতেই বুকের ভিতর থেকে ধুপধুপ আওয়াজ উঠে আসে। একবার চিমটি কেটে দেখে। চিনচিন করে ওঠে। মরলে ঠিক কি রকম লাগবে সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে খুব মৃদু একটা আঃ শব্দ উঠে আসে। নিঃশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে শব্দটাও বাইরে বেরিয়ে যায়। জমিরুদ্দি এতক্ষণে পুরো চোখ খুলে তাকায়।
সামনের বিছানা থেকে টুক করে লাফ দিয়ে একজন নেমে তার কাছে বসে ফিসফিস করে ওঠে, তোমার নাম কি?
জমিরুদ্দি দুটো নিঃশ্বাসের সঙ্গে দুবার ঘড়ঘড়ে আঃ আওয়াজ করে।
কাঁথাটাঁথা কিছুই আনোনি তুমি? লোকটা জিগ্যেস করে।
জমিরুদ্দি চোখ বন্ধ করে ফেলে।
তোমার নাম কি ও চাচা?
এবার কথাটা তার কানে ঢোকে। জমিরুদ্দি বুঝতে পারে মরার কথাটা ঠিক এক্ষুনি নয়।
সে বলে, আমার নাম? আমার নাম জমিরুদ্দি।
তোমার বিছানা নেই? একটা কাঁথাও আনতে পারোনি?
না বাবা- জমিরুদ্দি একই রকম হাঁসের গলায় বলে।
এই বালিশটা নিয়ে শুয়ে পরো।
থাক গো- জমিরুদ্দি বলে।
লোকটা বসে বসেই তার বিছানার উপর থেকে একটা বালিশ নিয়ে তার কাছে রেখে দিয়ে তেমনি চাপা গলায় বলে, এখানে যে আসবে সেই মরবে। বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। সব ব্যবস্থা ঠিক করা আছে। বলে সে সরল বালকের একটু হাসি াসে। আলোতে তার দাঁতগুলো তঝত করে ওঠে, তবে একটু ঘুমাতে পারলেই ভালো চাচা মরার আগে কষ্ট করে লাভ কি?
জমিরুদ্দি চুপ করে থাকে।
আমার নাম রাশেদ, আমিও তোমার মতো হাসপাতলে মরতে এসেছি লোকটা বলে।
জমিরুদ্দি তার কথা ভালো বুঝতে পারে না।
আপনার কি হলছে গো? সে বোকার মতো জিগ্যেস করে।
মরবার আগে তোমাকে বলে যাবো চাচা। শুয়ে থাকো এখন বলে রাশেদ টুক করে লাফ দিয়ে নিজের বিছানায় উঠে যায়।
জমিরুদ্দি বালিশটা টেনে নিয়ে শোবার চেষ্টা করে। ফোলা-পা-টার কোনো ব্যবস্থা সে করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত বালিশটা দেয়ালের কাছে নিয়ে গিয়ে আধশোয়া হয়ে সে একটু আরাম পায়। তার মাথার কাছের ছুপচাপ বিছানাটা এই সময়ে একটু নড়ে ওঠে। জমিরুদ্দি ঢুলুনি এসেছিলো। কিটু উঁহুঁহুঁ আওয়াজে সে চোখ খুলে চেয়ে দেখে মাথার কাছে বিছানায় একটা লোক উঠে বসেছে। ঝককে আলোয় তার ফ্যাকাশে মুখ দেখতে পাওয়া গেলে, চোখ দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে, তলপেট চেপে ধরে সে চিৎকার করে উঠলো, উরি বাবা, মরে গেলাম, আরে এই, উরি শালার, নাওঃ, বাবারে-
একজন নার্স তার কাছে এসে বলে, কি হয়েছে?
মরে গেলাম।
চুপ করে শুয়ে থাকুন।
মরে গেলাম, মরে গেলাম।
এতক্ষণ তো বেশ চুপ করে ছিলেন, হঠাৎ কি হলো?
লোকটা ফেটে পড়লো, হয়েছে আমার মাথা। যান এখান থেকে।
নার্স তার কাছ থেকে সরে যেতেই তিন বিছানা দূরে একজন বেশ শান্তভাবে শুরু করে, বা বা বা, ঠিক ঠিক ঠিক, আয় চলে আয়, আয়, শালা চলে আয়, দেখি তোর কতো ক্ষ্যামতাÑ বলে সে তার তলপেটের নিচের দিকে টোকা দিয়ে বললো, ভ্যালা মোর বাপ, আজ তোর একদি কি আমার একদিন-নার্স তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। লোকটা নিজের যন্ত্রণাকে টিটকিরি দিয়ে ওঠে, ইহিহিহি, বটেরে, আমার জাদু, তোর পাছায় আজ বাঁশ দোব। সে হাঁফাতে লাগলো, বিছানা খিমচে খিমচে ধরতে লাগলো, চোখ ফেটে পানি গড়িয়ে পড়লো, তবু সে একরোখার মতো নিজের কষ্টকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে, শুয়োরের বাচ্চা, দেখবো দেখবো, কতোদূর যাস, তোর মাকে আজ-
নার্স জিগ্যেস করে, খুব কষ্ট হচ্ছে? শুয়ে থাকুন।
চারপাশ থেকে গোঙানির আওয়া আসতে থাকে। এতক্ষণ ঘরটা চুপচাপ ছিলো, এখন নানাদিক থেকে শব্দ ভেসে আসে। জমিরুদ্দির মাথার উপরে লোকটা খম শুয়োর মতো একনাগাড়ে চিৎকার করে চললো। কানে তালা লেগে যায় সেই শব্দে, তিন বিছানা দূরে লোকটু হুহু করে কেঁদে উঠে কেবলি বলতে থাকে, দেখবো রে শালা, দেখবো, উহুহু, ইহিহিহি, বটে বটে বটে, বা বা বাঅ রেলে কাটা পড়া ছেলেটার বাপ ছেলের হয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। মানুষের যন্ত্রণার তরঙ্গে ঘরটা ডুবে গেলে নার্সরা আঁকুপাঁকু করে তীব্র গলায় ধমক লাগায়, চুপ করুন, চুপ করুন, এই এই, কি হচ্ছে!
মুখে বসন্তের দাগভর্তি ডাক্তারটি সকাল নটায় এসে তাঁর ঘরে বসলেন। প্রথমেই তিনি রাশেদকে ডেকে পাঠান। রাশেদ এসে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে তাঁর চোখ দুটি হাসছে। হাসিটা আর একটু টেনে মুখ পর্যন্ত এনে ঠোঁট বাঁকিয়ে তিনি বলেন, আপনার ব্যাপারটার কি করলেন?
আমি কি আর করবো, যা করবার আপনারাই তো করবেন- রাশেদ একটু অবাক হয়ে বলে।
বুঝলেন না- ডাক্তার মজা করে চোখ মটকে বলেন, আপনারা শিক্ষিত লোক, আপনাদের মত ছাড়া কি কিছু করা চলে?
বাঃ, আমার হয়েছে রোগ, আপনি ডাক্তার, যা ভালো বুঝবেন তাই করবেন।
বসুন- একটা খালি চেয়ার দেখিয়ে ডাক্তার বলেন, ডাক্তারদেরই সবকিছু করার কথা বটে, কিন্তু এ দেশে নয়। বুঝলেন, এ দেশে নয়। আমি এ রকম দুটো ওয়ার্ড দেখছি। এখন হাসপাতালে সার্জারিতে একমাত্র আমিই প্রফেসর আছি। একবার হিসেব করুন, দুটো ওয়ার্ডে কজন রোগী হতে পারে। না না, হিসেব করুন না! মেঝেত আর বারান্দায় যারা আছে আর যারা গ্রামগঞ্জ থেকে পিলপিল করে আসছে, এখন পথে আছে- তাদের সবাইকে হিসেবের মধ্যে ধরুন। আচ্ছা, এদের মধ্যে কতজনকে এক্ষুনি অপারেশন করতে হবে বলুন। প্রত্যেক দিন কটা করে অপারেশন করতে হবে বলুন? গ্যাংগ্রিন-এ পচে গেছে, আলসারে স্টমাকে ফুটো হয়ে গেছে, রেলে কাটা পড়ে পচন শুরু হয়েছে, হার্নিয়া বার্স্ট করছে, এ্যাপিনডিসাইটিসের যন্ত্রণায় হার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে- কোন্ অপারেশনটা দুদিন পরে করলে চলে?
এতগুলো কথা বলে ডাক্তার যখন দু চোখ বন্ধ করে মোলায়েমভাবে হাসলেন, তখন তাঁকে খুব খারাপ দেখাচ্ছিল না।
হাসিটা শেষে করে আবাস শুরু করলেন, একটাও দেরি করা চলে না- বুঝেছেন, সব এক্ষুনি করতে হবে। অপারেশন করতে হলে কি কি করতে হয়ে জানেন তো? রক্ত, পায়খানা, প্রস্রাব পরীক্ষা, চমৎকার করে এক্সরে, অঢেল রক্ত জমা করে রাখা, এ্যানাসথেসিয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি। আমার সঙ্গে একটু ঘুরে আসবেন চলুন। অবস্থাটি আপনাকে একবার দেখিয়ে আনি। এর মধ্যে আমাকে আবার কলেজে পড়াতে হয়। কি করবো আমি- এবার ডাক্তার খুব বিরক্তমুখে রাশেদের দিকে তাকান। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার হাসতে হাসতে বলেন, অতএব এদেশে কোনো চিকিৎসা নেই। কসাইয়ের মাংস কোপানো কুডুল আর জবাই করার ছুরি-এই দুটি অস্ত্রই আমার জন্যে যথেষ্ট। সপ্তাহে অপারেশনের দুটি দিনে এই দুটি অস্ত্র চোখ বন্ধ করে চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর কি করার আছে? সেজন্যেই অপারশেন হয়ে লোক মরছে, না হয়ে মরছে। যার আজ অপারেশন দরকার, তার হবে পনেরো দিন পরে। সে বেঁচে থাকবে কি ইয়ার্কি মারতে? না মন্ত্রের জোরে।
রাশেদ এতক্ষণে একটা কথা বললো, আপনি ছাড়া আর কেই নেই কেন?
ট্রান্সফার, ট্রান্সফার- ডাক্তার হতাশ গলায় বলেন, পেরিফেরি থেকে পেরিফেরিতে, সেন্টার থেকে পেরিফেরিতে নয় অর্থাৎ এখান থেকে আর এক মফস্বলে, ঢাকা থেকে এখানে নয়। ঢাকা হলো সেন্টার সেখান থেকে বাইরে পেরিফেরিতে কেউ আসবে না, আর পেরিফেরি থেকে ঢাকায় বদলি হবে তেমন ভাগ্য দু-চারজনেরই। কাইে ঘুরে মরো পেরিফেরি থেকে পেরিফেরিতে। এই ধরনের ট্রান্সফারের প্রতিবাদে দুজন লম্বা ছুটি নিয়ে বসে আছেন, ট্রান্সফার স্বীকারও করবেন না, অস্বীকার করবেন না, কাজেই যাাঁ ছুনি নিয়ে বসে আছেন, তাঁদের বদলিতে লোক আসছে না। এর মধ্যে তদবির-টদবিরে ট্রান্সফার বন্ধ হয় ভালো, না হলে এই অবস্থাই চলবে।
তা এঁরা গেলেই পারেন, চাকরি যখন বদলির, যাওয়াই তো উচিত।
বিনা প্ররোচনায় ডাক্তার ঝককে দাঁত দেখালেন, আপনি তো বশে বলে দিলেন যাওয়াই তো উচিত। কেন? যাবে কেন? এখানে প্র্যাকটিস নেই? গভর্মেন্টের বেতনের কি টাকায় আমাদের কি হয়? চাকরি করতে হয় করছি- নইলে বেতনের টাকায় হবেটা কি? একজন প্রফেসর প্রাইভেট প্র্যাকটিসে কত রোজগার করে মাসে, আপনার কোনো ধারণা আছে? কেউ কেউ লাখ টাকাও কামিয়ে নিচ্ছে। তবে? প্র্যাকটিস জমিয়ে বাড়িতে ক্লিনিক-ট্রিনিক করে হয়তো একজন কেবল বসেছে, সেই সময়ে ট্রান্সফার। তা আবার কোথায়? আর এক মফস্বলে। এতে লাভটা কার বলুন। সবকিছুকেই শুধু শুধু ডিস্টার্ব করা ছাড়া আর কি হয় এতে? একটা জায়গায় বড়ো ডাক্তার থাকলে, হাসপাতালে না হোক লোকদের ডাক্তারের বাড়িতে তো পয়সা খরচ করে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। পাওসাঅলা লোকদের তো একটা সুবিধে হয়। পয়সা যাদের নেই, এদেশে তাদের চিকিৎসা নেই আগেই তো বললাম আপনাকে। ঢাকায় ডাক্তার ট্রান্সফার নিয়ে বাইরে আসেন না কেন জানেন? ঐ পয়সার মধু!
তাঁদেরও তো বদলির চাকরি, তাঁদের ট্রান্সফার হয় না কেন? রাশেদ ন্যাকার মতো জিগ্যোস করলো?
ডাক্তার হাসলে, ঢাকায় প্রফেসররা বদলি হবেন? তাহলে তো দেশে হাহাকার পড়ে যাবে। শুনুন, ঢাকাতে বহু প্রফেসরের দাড়ি-গোঁফ গজাতে দেখেছি, পাকতে দেখেছি, এখন ঝরে পড়তেও দেখছি। যা কিছু আপনি কল্পান করতে পারেন এবং যা কিছু আপনি কল্পান করতে পারেন না, এদেশে তা সবই সম্ভব যেসব লোক গভর্মেন্টের ডিসিশন মেকিং-এ আছে তাদের প্রত্যেকেই সেয়ানা। কিন্তু ডিসিশন নেওয়া হলে দেখবেন একটা গাধাও তার চেয়ে ভালো ডিসিশন নিতে পারতো। আর একটু তলিয়ে ভাবলে বুঝবেন, আপনি গাধা, প্রতিটি ডিসিশনের গুহ্য অর্থ আছে। গুহ্য, অতি গুহ্য অর্থ, বুঝেছেন? এই ছোট দেশে প্রত্যেকটি শিয়াল রাজা, প্রত্যেকটি রুই-কাতলা পরস্পরকে চেনে। সবাই সবাইয়ের পকেটে-বলে ডাক্তার খানিকটা শিয়ালের মতোই খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে নিলেন। হাসিটা শেষ করে ফের গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনার ব্যাপারটা কি করবো বলুন? আমি বলি কি আপনি কেটে পড়–ন।
কিন্তু এখন অপারেশন না করণে তো পরে অসুবিধা হবে?
হবে
তবে?
আরে সেই জন্যেই তো জিগ্যোস করছি। ভ্যালা মুশিকিল বটে। আপনার পেটে একটু বিদ্যে না থাকলে এতদিনে হয় আপনাকে খেদিয়ে দিতাম আর না হয় খ্যাঁচ করে ছুরি চালিয়ে দিতাম। লেখাপড়া শিখেই তো মুশকিলে ফেলেছেন।
আপনি আমাকে গোমূর্খ জ্ঞান করুন- রাশেদ বললো।
যে কথাটি বললেন, গোমূর্খ হলে তো এই কথাটিই বলতে পারতেন না।
তাহলে আর আমি কি করবো- হতাশ গলায় রাশেদ বলে।
শুশুন, ডাক্তার ভীষণ গম্ভীর, চোখ দুটি কুঁচকে গেছে, বসন্তের কোঁদলগুলোর ভিতরে থেকে তেলের মতো চটচটে ঘন ঘাম বেরিয়ে আসছে, শুশুন, আমার বাসায় প্রাইভেটলি এই কাজটি করতে আপনার কাছ থেকে দু হাজার টাকা নিতাম। একটি পয়সা কম নয়। কিন্তু তার উপায় নেই, আপনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেছেন। টাকা যখন পাচ্ছিই না, বিনি পয়সায় দুটো ভালো উপদেশ দিতে দোষ কি! শুশুন তাহলে, আপনার এই জিনিসটা না কাটলে আপনি এক্ষুনি মরছেন- কিন্তু কাটলে-
কাটলে? রাশেদ উৎসুক গলায় জিগ্যেস করে।
এই ব্লিডিং ফ্লিডিং- একগাদা শিরা কাটা পড়বে, মুখটুক বেঁকে যেতে পারে-মানে অপারেশন হলে যা যা হওয়া সম্ভব আর কি-
অন্য লোক হলে কি করতেন?
একবারও জিগ্যেস না করে কেটে ফেলতাম। আমারও একটা নতুন অভিজ্ঞাতা হতো আর তাতে লোকটা মরলে মরতো। ও তো রতদিন মরছে।
আপনি আমার অপারেশন করুন।
বলছেন?
হ্যাঁ।
ডাক্তার রাশেদের দিকে একদৃষ্টে একটুক্ষণ চেয়ে থাকেন। বার কয়েক চোখের পাতা ফেলে হাত দিয়ে ঘামে ভো মুখটা মুছে বলেন, আচ্ছা।
রাশেদ দ্রুত উঠে ওয়ার্ডে চলে আসে। ঘর এখন একেবারে শান্ত। রোগীরা শুয়ে-বসে আছে। মরা চোখে কেউ আস্তে আস্তে পাউরুটি চিবুচ্ছে। রাশেদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, গত রাতে এরাই নরক গুলজার করে তুলেছিলো। এখন মনে হয়, এরা কেউ যেন ভাঁজা মাছটি উল্টে খেতেও জানে না। এককোণে জমিরুদ্দি দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঘাড় গুঁজে আধাশোয়া হয়ে রয়েছে। রাশেদ তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তার ফোলা পা-টি একখণ্ড মোটা তামাটে কাঠের মতো পড়ে আনছে। বোঝাই যায়, ওটা নড়ানোর ক্ষমতা নেই জমিরুদ্দির। রাতে উপস্থির থাকতে না পারলেও, নীল মাছিগুলো পথ ভুলে যায়নি। সকালবেলাতেই এসে হাজির। রাশেদ একদৃষ্টে জমিরুদ্দির দিকে চেয়ে থাকে। মুখের রঙের মতো তার দাড়িগুলোও ফ্যাকাশে। মোটা  মোটা শক্ত গাঁটওঠা অশক্ত আঙুল এলিয়ে পড়েছে। রাশেদের উচ্ছা হলো, প্রচণ্ড চিৎকার করে সে ওকে জিগ্যেস করে, এখানে কি করছো? এখানে কেন এসেছো মরতে? বোধহয় তার নিঃশব্দ প্রচণ্ড চিৎকারের জবাবেই জমিরুদ্দিকে একটা চোখের পাতা দু’বার কেঁপে উঠে তাকে জানিয়ে দেয় যে সে এখনো মরার সুবিধে করে উঠতে পারেনি।
দক্ষিণদিকের বিছানার সারির মাঝামাঝি থেকে একজন রুটি চিবুতে চিবুতে খানিকটা নিজের মনেই বলে, পাউরুটি থেকে যে গুয়ের গন্দো আসে, এতো বাবা কোনদিন দেখিনি। বলে সে হাতের রুটির টুকরোটা আলোর দিকে ফিরিয়ে ভুরু কুঁচকে দেখতে থাকে।
লোকটা কালো ঢ্যাঙা। পুলিশের চাকরি করে, কিন্তু গলায় কাঠের মালা আছে। কুঁচকিতে কি যেন হয়েছে। রাশেদকে বলার উপলক্ষে সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সবাইকে কয়েকদিন আগে শুনিয়ে দিয়েছিলো, আমরা হলাম বৈষ্ণব, হাসপাতালে আমাদের জাত থাকে না। তবে পুলিশে চাকরি করি কিনা- পুলিশ হলো জাতির মেরুদণ্ড।
রুটির টুকরোটা বারকতক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, খুবই সন্দেহ ব্যাকুলভাবে সে বলে, এতে নির্ঘাত গু আছে! কতো পাউরুটি  খেলাম জীবনে, এ হে হে, জাতটা আর থাকলো না-
পাশের বিছানার মোটা ফরশা দারোগা ককাতে ককাতে বলেন, থামো, গরুর গু খেলে তোমাদের জাত ফিরে আসে, আর মানুষের গু খেলেই জাত যায়- না?
কিন্তু তবু, মানুষের খাদ্য নয় মানুষের গু- আগুন ভরা চোখে পুলিশ কবিতায় জবাব দেয়। তারপর দারোগার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চেয়ে করাত-চেরা কর্কশ রূঢ় গলায় বলতে থাকে, চোর মুশাই, সব চোর। হবে না কেন? সারাদেশ চোর আর বদমাইশে ছেয়ে আছে আর এই হাসপাতালেই শুধু সাধু পুরুষ থাকবে?
চোরদের সঙ্গে বাবুর আলাপ পরিচয় অনেক দিনের। পুলিশের লোক আপনি- তিন বিছানা দূরের একটা ঘেয়ো রোগীর বেশ নিরীহভাবে মন্তব্য করে।
এ্যাইয়ো খবরদার, পুলিশের নিন্দা নয়, না খবরদার- চোখ পাকিয়ে বৈষ্ণব পুলিশ ধমক লাগায়, আমাদের মনে রাখতে হবে পুলিশও মানুষ, তারও মাগ ছেলে আছে। পুলিশ না থাকলে চোর, ছ্যাঁচোর, গুণ্ডা, ডাকাত, বদমাশ, নেতা কিছুই নাই। এরা আছে বলেই তো পুলিশ রাখতে হয়- হেঁ হেঁ বাবা, চালাকি নয়। এই হাসপাতালে সেই পুলিশের কি দশা করেছে শোনেন, শোনেন আপনারা-
লোকটা চেঁচিয়ে আকাশ ফাটাতে থাকে। ঘাড় বাঁকিয়ে, কুড়–লের কোপ দেবার মতো করে হাত উঁচিয়ে বলে যায়, প্রথমত : জাত। আমি বৈষ্ণব মুশাই, বাড়ি ছাড়া মাছ-মাংস খাই না। এখানে অবস্থাটা কি? লুটির সঙ্গে গু খাওয়াচ্ছে, ভাতের সঙ্গে গু খাওয়াচ্ছে। এ গু পাচ্ছে কোথায় বলতে পারেন? আরে বাপু, গোদা গোদা ভাতের চালে কাঁকর দে, ইটের গুঁড়ো দে, পাথর দে, মাটি দে, দিচ্ছিস তো- গু দেবার কি দরকার?
ওয়াক থু- বিচ্ছিরি শব্দ করে ঘেয়ো রোগী থুথু ফেলে।
আচ্ছা বেশ, গেল- পুলিশ ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না- মুরগির মাংস য়ে দিচ্ছিস-মুরগির কোন্ জায়গাটা দিচ্ছিস বল দিকিনি। নাঃ, কিছুতেই মুরগি নয়। তলায় তলায় কুকুরের মাংস দিচ্ছে না তো হ্যা?
তোবা, তোবা- তিন-চারজন রোগী একসঙ্গে বলে ওঠে। হাসপাতালের কাউকে এই মুহূর্তে আশপাশে দেখা যাচ্ছে না।
তোমার মাথা, সিনথেটিক মাংস, আমেরিকা থেকে আমদানি-দারোহা ফুট কাটলেন।
আচ্ছা বেশ গেল- পুলিশ ফের শুরু করে- দ্বিতীয়ত, এই তিনদিন আগে আমাকে নিয়ে কি কাণ্ডটা করলে? আমার মুশাই অর্শের অপারেশন? বললে পেত্যয় যাবেন না, আমাকে দড়াম করে চিৎ করে ফেলে দুই ঠ্যাং ফাঁক করে দুজনে ঠেসে ধরে রাখলে। যতো বলি লাগছে, লাগছে- কে শোনে কথা? একটা ইনজেকশান নাই, কিছু নাই, কোথা থেকে এক কসাই ছুরি হাতে এসে একবার ঘ্যাঁচাং করে বসিয়ে দিলে। গরু জবাই করলে মুশাই। একজন আবার বলে, চুওপ বেশি চিল্লাচিল্লি করলে ইয়ে বার খাসি করে দোব।
জমিরুদ্দির পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাশেদ এই আলাপ শোনে। সকালের ঠাণ্ডা ভাবটা খুব তাড়াতাড়ি কেটে যাচ্ছে। এলোমেলো গরম বাতাসের হলকা আসছে মাঝে মাঝে। হাসপাতালের ভিতরের বিরাট চৌকোণা প্রাঙ্গণগুলোয় বুক-সমান উঁচু বেনাঘাস শুকিয়ে ঝনমনে হয়ে আছে। একটুখানি আগুন দরকার। রাশেদের মাথার মধ্যে কথাটা পাত দিতে থাকে। জনগণকে, সমগ্র জনগণকে সঙ্গে নিতে হবে। জমিরুদ্দির অসাড়, পচে ওঠা বিবর্ণ ফোলা পায়ের দিকে তার চোখ যায়। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। জনগণকে সঙ্গে নিতে হবে নয়, জনগণকে সঙ্গে থাকতে হবে, মিশে যেত হবে, তলিয়ে যেতে হবে জনগণের মধ্যে, মাছ যেভাবে গভীর জলে তলিয়ে যায়। রাশেদের কটা চোখ দুটি থেকে মুহূর্তের জন্যে আগুন ঠিকরে বেরোয়, সে হঠাৎ চিৎকার করে ডাকে, চাচা, চাচা, শুনছো?
জমিরুদ্দি ঘাড় গুঁজে শুয়ে থাকে, সাড়া দেয় না। তার পচ-ধরা ফোলা পা-টি সামনে ছড়ানো, মাছি উড়াউড়ি করছে, মাথা  ঝুঁকে এসে পড়েছে বুকের উপর। রাশেদের মাথায় আবার গোলমসাল শুরু হয়ে যায় : তুমি মধ্যবিত্ত, তুমি পাতি-বুর্জোয়া, বিপ্লব তোমার শত্র“ নয়, কিন্তু তোমার দেরি সইবে, বিপ্লব আসতে দেরি হলে তুমি অপেক্ষা করতে পারো- কিন্তু ওই ওর, এই ক্ষেত-মজুরের এক মুহূর্ত বিলম্ব সইবে না, বিপ্লব তার এক্ষুনি দরকার, এক্ষুনি। এক্ষুনি বিপ্লব হলে সে বাঁচে, বিপ্লব হতে দুদিন দেরি হলে সে দুদিন আগে মরে যায়। তাকে এই কথাটা বুঝিয়ে দাও, সে সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের পক্ষে লডুয়ে হয়ে যাবে।
রাশেদ খেপে ওটে, ক্ষোভে হতাশায় তার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করে। আঃ,  দেয়ালের লেখা। আবার সে চিৎকার করে ডাকে, চাচা, ও চাচা, কি অবস্থা? জমিরুদ্দিন গলা থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ আসে, কিন্তু এবার অতিকষ্ঠে সে চোখ মেলে তাকায়। ঘোলা অপরিচ্ছন্ন চাউনি।
পুলিশটির বক্তৃতা একটু আগে থেমেছে। ওয়ার্ড এক রকম চুপচাপ। খুব মৃদু গোঙানির আওয়াজ আসে শুধু। আবার গরম হাওয়া ঢোকে। রাশেদ ফিরে তাকাতেই দু-তিন বিছানা দূরে এক বুড়োর সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে যায় বিছানার উপর বালিশে হেলান দিয়ে সে বসে আছে। খালি গা, গলার নিচে কণ্ঠার হাড় দুটি ভয়াবহ, নিঃশ্বাসে সঙ্গে সঙ্গে তার কোঁচকানো চামড়া জিরজির করে ওঠে, নিজের চোখ দুটির স্যাঁতস্যাঁতে হলুদ আলো দিয়ে সে বাইরের ঝাঁঝালো তপ্ত রোদের আকাশ নিভয়ে দিয়েছে। সেই আকাশের দিকে একবার চেয়ে সে রাশেদের উপর চোখ ফেলে কাঁপা গলায় বললো, আমি এখানে অনেক দিন আছি বাবা।
বুকের ভিতরের সবটুকু জোর গলায় এনে, কথা বলার চেষ্টায় তলপেট পিঠের সঙ্গে আটকে দিয়ে সে আবার বললো, আমি এখানে অনেক দিন রয়েছি। বাঁচবো বলে নয়, মরবার জন্যে। মরণ হচ্ছে না। এতবড়ো হাসপাতাল আমার মরার ব্যবস্থা করতে পারছে না। হাসপাতালের বাইরেও গিয়ে দেখছি- পাড়াদেশ এই হাসপাতালেই মতোন- আমার মরার বন্দোবস্ত করতে পারে না। মরতে না পারার কি কষ্ট রে বাবা! সবাই বাঁচতে চায়, বাঁচবার জন্যে হাসপাতালে আসে, আমি মরার জন্যে এসেছি, কিন্তু কোনো উপায় করতে পারছি না বাপ। অথচ এই দিনকতক আগে একতলা এক শূলের রোগী রাত থাকতে থাকতে গিয়ে ওয়ার্ডের পিছনের আমগাছটায় ঝুলে পড়ে সবাইকে কলা দেখিয়ে চলে গেল। দেখেন বাবা, দেখেন, ঐ যে ঐ ছোটো আমগাছাটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে- ঐ যে ডালটা, মাটি থেকে বেশি উঁচু নয়, লোকটা ন্যাংটো হয়ে ঝুলতে ঝুলতে দুলতে দুলতে চলে গেল।
বুড়োর গলার আওয়াজ চোত মাসের ফাঁকা মাঠের বাতাসের মতো। মাঝখানটা গম্বুজের মতো ফাঁকা, চারপাশে ধুলো আর শুকনো পাতা চর্কির মতো পাক দিতে দিতে উপরে উঠে যায়।
প্রচণ্ড রাগে রাশেদের চোখে রক্ত চলে আসে, দু হাত মুঠো করে সে চাপা গর্জন করে ওঠে, চুপ করুন।
বুড়োর থোরাই তোয়াক্কা, একইভাবে বলে যায়, তা বাদে লম্বা লম্বা ঐ ঘাসের জঙ্গল থেকে এক শেয়াল বেরিয়ে এসে একদিন রেতে ঘুমন্ত মায়ের কোল থেকে ঘুমন্ত বাচ্চা নিয়ে খপ-
রাশেদ আবার দাঁতে দাঁত ঘষে বললো, চুপ করুন।
পুলিশ হাঁ করে বুড়োর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। চোত মাসের ফাঁকা মাঠের ঘূর্ণি হাওয়া ঢুকে ঘর ভরে ফেলেছে।
বুড়ো প্রাণপণ চেষ্টায় শেষ কথাটা বলে ফেললো, অথচ এই ব্যাটারা আমার মরণের ব্যবস্থাটা আজও করতে পারলো না। হায়রে, ঐ আমগাছটা পর্যন্ত যাবার সাধ্যিও যে আমার নাই।
চোখ-মুখ-কপাল-ভুরু কুঁচকে বুড়ো প্রাণপণ চেষ্টা করে, কিন্তু চোখে তার কিছুতেই পানি আসে না। বুড়ো হলে নার্ভের জোর কমে আসে, অশ্র“বাহী নালি শুকিয়ে ওঠে। না হলো বুড়ো যুবকের মতোই ধাঁই-ধাপড় কাঁদতে পারতো, শুকনো হাহাকারের বাতাস এনে ধুলো আর ঝরা পাতায় ঞর ভরে ফেলতো। সবাই চুপ করে থাকে। শুধু বাচাল পুলিশটি বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলে, এই হাসপাতালের তাহলে দোষ কিছু নাই। শুধু ঠিক সময়ে লোক মেরে ফেলতে পারে না। ছ্যাঃ ঘেন্না, লোক এসে এই হাসপাতালে মরার জন্যে হা-পিত্যেশ করে থাকে। ছ্যা ছ্যা ছ্যা-
নোংরা জ্যালজেলে লুঙ্গির উপর হাফ-শার্ট গায়ে গতকালের বুড়ো লোকটা ঘরে এসে ঢোকে। রাশেদ তাকে দেখেই চিনতে পারে। জমিরুদ্দিকে ওয়ার্ডের মেঝের ওপর দিয়ে হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে এখানে এনে রেখে গিয়েছিলো সেই-ই। ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক চেয়ে সে জমিরুদ্দিকে খুঁজতে থাকে। সেখান থেকে জমিরুদ্দিকে দেখতে পাবার তার কথা নয়। আন্দাজে সে দুদিকের বিছানার সারির মাঝখান দিয়ে দু পা এড়িয়ে এলে তার পিঝনে দরজার কাছে একটি মেয়েলোক এসে দাঁড়ায়। তার পিছনে তিনটি বাচ্চা। রাশেদ খুব মনোযোগের সঙ্গে দলটিতে দেখতে থাকে। মেয়েমানুষঠি তাকে প্রায় আশ্চর্য করে দেয়। বিরাট দশাসই চেহারা, মজবুত চাওড়া একজোড়া মাটি-মাখা চোয়াল, মাটি মাখা মুখ, মাটি মাখা মোচা কব্জি, ফাটা ধ্যাবড়া ধুলো ভর্তি একজোড়া পা। ক্ষেত মজুরের বউ এই স্ত্রীলোকটি ঘরের ভিতরে এগিয়ে আসে। পিছনে পিছনে আসে তার তিন বাচ্ছা।
বুড়ো এতক্ষণে জমিরুদ্দিকে দেখতে পায়, মেয়েমানুষটির দিকে মুখ ফিরিয়ে সে বলে, এদিকে এসো গো-ঐ যি জমিরুদ্দি। গুমালছে। রাশেদের পাশ কাটিয়ে সে জমিরুদ্দির মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, আস্তে আস্তে ডাকে, জমিরুদ্দি, অ জমিরুদ্দি, এই দ্যাখ, তোর তিন ব্যাটা আল্ছে।
জমিরুদ্দির কাছ থেকে কোনো সাড়া আসে না। বুড়ো মানুষটা তখন তার উপর ঝুঁকে পড়ে কাঁধ হাত দিয়ে চিৎকার ওঠে, জমিরুদ্দি, জমিরুদ্দি, অ বাপ জমিরুদ্দি, তোর বউ বেটা আল্েছ যি তোকে দেখতে।
স্ত্রীলোকটি একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তার চোখে পলক পড়ে না। একদৃষ্ঠে সে জমিরুদ্দির দিকে চেয়ে থাকে। ছোটো বাচ্চাটি মুখের মধ্যে ডান হাতের তর্জনিটি সম্পূর্ণ ঢুকিয়ে দিয়ে পরম আনন্দে চুষতে শুরু করে। আরও কয়েকটি ঝাঁকুনির পর জমিরুদ্দি আস্তে আস্তে চোখ খোলে, কিন্তু বুড়ো তার গায়ে হাত দিয়ে চমকে পিছিয়ে আসে।
রাশেদ জিগ্যেস করে, কি?
বুড়ো চোখ কপালে তুলে বলে, ছার, জ্বর, জ্বরে যি গা পুড়ে যেছে।
এতক্ষণে জমিরুদ্দি পুরো চোখ খুলেছে, মেয়েমানুষটিও ঝুঁকে পড়েছে খানিকটা তার উপর, কিন্তু তাকে দেখেও জমিরুদ্দির চোখে একটুও আলো দেখা গেল না। চোখ দুটি তার আবার বন্ধ হয়ে হয়ে যেতে চাইছিলো, রাশেদের সঙ্গে কথা বন্ধ রেখে বুড়ো তাড়াতাড়ি তার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে, জমিরুদ্দি, তোর বাউ যি! তোর  ব্যাটারাও আল্ছে।
জমিরুদ্দি কোনো কথা না বলে খুব কষ্টের সঙ্গে আস্তে আস্তে তার ফোলা পায়ের উপর রাখে। সেটাকে দেখে এখন মনে হয় বিরাট পুরুষ্টু একটি মুগুর, যে-কোনো মুহূর্তে প্রচণ্ড শব্দে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। রাশেদ দেখলো ক্ষেতমজুরের বউটি আস্তে আস্তে ঝুঁকে পড়েছে জমিরুদ্দির উপর, ঝুঁকতে ঝুঁকতে সে দেয়ালে উপর এক হাতের ভরে দিলো, তার বিশাল নরম স্তন দুটি জমিরুদ্দির বুক স্পর্শ করলো, সে আরো ঝুঁকছে, তার সবল মোটা ঘাড় ছোবল দেবার ভঙ্গিতে একটু বাঁকা, চোখ দুটি স্থির, অপলক, জমিরুদ্দির নেভা চোখের উপর তার তীব্র স্থির দুটি চোখের আলো ফেলতে পারে। মেয়েমানুষটির দুই ঠোঁট বন্ধ, এতটুকু কম্পন সেখানে লক্ষ্য করা যায় না- শুধু তার প্রবল নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। মানবিক ভাষার জন্যে অসম্ভব পিপাসা বোধ করে রাশেদ, প্রায় নিজের অজান্তেই ওদের দিকে দুপা এগিয়ে আসে- কিন্তু মেয়েমানুষটি কিছুতেই তার ঠোঁট খোলে না।
শধু একবার ঝিলিক দিয়েই জমিরুদ্দির চোখ দুটি ফের নিভে যায়।
ডাক্তার তখনো তাঁর ঘরে। রাশেদ তাঁর টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কাগজপত্র থেকে চোখ তুলে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে রাশেদ সরাসরি বলে, ঐ যে লোকটা ফোলা-পা নিয়ে আপনাদের এখানে এসেছে ওকে দেখেছেন?
ডাক্তার অমায়িক হাসলেন, দেখেছি।
কি অবস্থা ওর?
গ্যাংগ্রিন সেট ইন করে গেছে।
কি করতে হবে?
এক্ষুনি অপারেশন করতে হবে- এই মুহূর্তে। যতটা পচেছে কেটে বাদ দিয়ে দিতে হবে।
অপারেশন আজ না হলে?
ডাক্তার আবার অমায়িক হাসলেন, আপনি ছেলেমানুষ!
রাশেদ চেঁচিয়ে ওঠে, বলুন না, আজ অপারেশন না কি হবে?
কি মুশকিল, মারা যাবে।
ওর আজ অপারেশন করছেন?
না, আজ সম্ভব নয়।
কাল করছেন?
না, সম্ভব নয়।
মরে গেলে করবেন?
আঃ, রাগ করছেন কেন? মরে গেলে অপারেশন হয় না, পোস্ট মর্টেম হয়।
রাশেদ নিজেই নিজের দাঁত ঘষার আওয়ার পেল, একহাতের তালুর উপর আর এক হাত দিয়ে ঘুষি মেরে বললো, আপনি অবশ্যই আজ অপারেশন করবেন।
ডাক্তার তিনবারের বার অমায়িক হেসে ধীরে সুস্থে পান চিবোনোর ভঙ্গিতে বললেন, আজ আরও অনেক লোক মারার জন্যে অপেক্ষা করছে, ওর দিকে আজ আর খেয়াল করতে পারবো না। আরার কুডুলের ধার পড়ে যাবে।
ছাদ ফাটানো চিৎকার করে রাশেদ বললো, আপনাকে আজ ঐ লোকটার অপারেশন করতে হবে।
ডাক্তারের মুখটা স্রেফ চৌকো হয়ে গেল, ষাঁড়ের মতো কুতকুতে চোখ দুটি থেকে আগুন ঠিটোতে ছিটোতে তিনিও চিৎকার করে উঠলেন, আপনার কথাতে নয়। যান এখান থেকে। হাসপাতালের নিয়ম আছে, সেই অনুযায়ী কাজ হবে। যান। যা পারি, তাই করি, যা পারি না, তার পারি না- ব্যস।
রাশেদ দেখলো, মেয়েমানুষটি আর তার তিন বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বুড়ো ডাক্তারের ঘরে ঢুকছে। সো সে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো, দু-একটি মুহূর্ত ভাবলো, তারপর ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়ে বললো, ছার, আমরা ঐ পা-ফোলা রোগীটোকে বাড়ি লিয়ে যাবো।
ডাক্তার তাঁর চেয়ারে পাথরের মতো বসে রইলেন।
বুড়ো আবার বললো, উকে আমরা বাড়ি লিয়ে যেতে চাই। উয়ার পরিবার উকে লিতে আল্ছে।
মৃদুস্বরে ডাক্তার বললেন, বাড়ি কেন?
আমরা উকে বাড়ি লিয়ে যাবো ছার।
ডাক্তার একবার কেঁপে উঠলেন আগাগোড়া, কাল-পরশু এসো, নিয়ে যেতে পারবে। যাও, কাল-পরশু খোঁজ নিয়ো।
বুড়ো উতস্তত করছে। কিন্তু মেয়েমানুষটি হিম ঠাণ্ডা চোখে ডাক্তারের দিকে একবার চেয়ে ফিরলো। যে ছেলেটি আঙুল চুষছিলো, এক হেঁচকায় তাকে কোলে তুলে, আর একটির কব্জি দলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রাশেদ দেখতে পেল ছোট দলটি দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন