শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প : ‘বোকাডাক্তারের দুই রুগী’

ডাকাতির জন্যে তিন বছর জেল খেটে সন্তোষ টাকি বেলা দশটা দশের ট্টেন ধরল। জেলে এতদিন সে ওয়ার্ডারদের ভাষায় এই ভাবেই মনে রেখেছে-তার খালাস পাওয়ার বাকি আর পাঁচোয়া মাহিনা-তিরিশটা দিন কাটাতেই আর চারি মাহিনা বাকি। খালাস পেয়ে জেল গেটের জেল গেটের বাইরে এসে দেখল কলকাতায় দিব্যি ট্টাম বাস চলছে। তারই একটা ধরে শেয়ালদা। সেখান থেকে ট্টেনে চেপে ঘন্টাখানেকের ভেতর নিজের দেশের স্টেশনে এসে নামলো।
ফাগুন মাসের দুপুর বেলা। মেঘ ইয়ার্কি মারতে আকাশে আসেনি। কখনও ছায় দিচ্ছির- কখনও কিছুটা সরে গিয়ে রোদ্দুর । তার ভেতর দিয়ে সন্তোষ টাকি স্টেশন বাজারে ভদ্রোশ্বর নাপিতের কাছে গিয়ে ইট পেতে বসল।
প্রথমটায় চিনতে পারেনি ভদ্রেশ্বর। কুমড়োর ফালি, কুচো চিঙড়ি গামছায় বেঁধে বাড়ি যাচ্ছিল। দাড়িঅলা লোকটা নিজের থেকে সামনে এসে বসতে ভেবেছিল- আরও একখানা সিকি তার কাছে হেঁটে এল।

ক্ষুর খুলেছিল । গলার স্বর, চোখ সন্তোষ টাকিকে চিনিয়ে দিতেই ভদ্রেশ্বর ক্ষুর ভাঁজ করে বলল, ওই যাঃ ! সাবান নেই যে-
জলে ভিজিয়ে কামিয়ে দে।
না বাপু। এ জেলখানার দাড়ি। মুখখানা একদম মৌচাক করে নে এসেছো । জলে এর দাড়ি রসে না।
সন্তোষের টাকে সামান্য রোদ এসে পড়ল। পাশেই মনোহারী দোকান থেকে তাড়িওয়ালারা নিশাদল আর মিল্ক পাউডারে পুরিয়া কিনে মেশাচ্ছে। কলকাতার বাবুদের ঘোলাটে ভাব দেখাতে পারলে ভালো বিকোয়। সামনে পঞ্চাননতলার আটচালায় পঞ্চানন অপেরার পালা মহলা দিচ্ছে ক’ জনায়। দীনু ডাক্তারের ঘর অবদি হোমোপ্যাথির রোগীদের লাইন। বড় মানকচু পাতার কচি পাঁঠার ভাগা সাজিয়ে বসে আছে কেষ্টর বড় ব্যাটা। খদ্দের নেই। কুকুর ঘুরছে । কেষ্টই প্রথম এ লাইনে হাতে খড়ি দিয়েছিল সন্তোষের। তার টাক দেখে নাম রেখেছিল সন্তোষ টাকি। কেষ্ট আর নেই।
ভয় নেই । পয়সা দেব। এই নে-
তখন একে সাবান বেরোল । ফটকিরি বার করল ভদ্রেশ্বর। কচ কচ করে কামিয়ে মুখভাতের মুখখানা বের করে আনল। ‘কত বয়স এখন গো তোমার’ -এই সব গো টো মিশিয়ে কথা বলতে পারি ভদ্রেশ্বর। তাতে গরম জিনিস ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আয়নায় মুখখানা দেখে আপন মনেই সন্তোষ বলল, তা লঙ্গরখানার সময় বারো বছর বয়স ছিল। বাপের মুখে শুনিছি। নেঃ।
সিকিটা কুড়িয়ে নিয়ে ভদ্রেশ্বর বুঝলো- সন্তোষ এখন চলি¬শ ছাড়িয়েছে। মনে মনে হিসেব করে দেখল-তা সন্তোষ টাকি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই করে আসছে প্রায় বিশ বছরের ওপর ডাকাতিটা অবশ্য মাত্র এই পাঁচ ছ বছর। প্রথম দিকে ভদ্রেশ্বরও সঙ্গে থাকত। বড়দের ব্যাপারে আগেই সে মনে মনে সরে এসেছে। এখন সে শুধু খবরাখবর দিয়ে ভাগা পায় । সেবারে সন্তোষের সঙ্গে ননীবাবুর বাড়িতে হামলা দিল মাঝরাতে। মুখে গামছা বেঁধে শুধু চোখ বের করে রেখেছিল। পুরো হাতার শার্ট গায়ে। পারে চোরাই জুতো। চাপ দেখে কেউ ধরতে পারবে না। জমি কিনবে বলে ননীবাবু তোষকের নীচে টাকা রেখেছিল। পেটাতেই বের করে দিল। ননীর গিন্নি গলার হার দিল। কানের দুলজোড়া সন্তোষ টাকি ছিঁড়ে নিল। আর দেরি করার উপায় ছিল না। পাড়া জেগে উঠেছে। কুকরুগুলো চেঁচাচ্ছে । পঞ্চাননতলায় সংকীর্তনের হরিবোল শোনা যাচ্ছিল । এখন কেউ বন্দুক বের করলেই চিত্তির।
ওরা মাঠে ভেঙে দৌড়তে শুরু করল। যাবার সময় ভদ্রেশ্বর একটা আধমনি চালের বস্তা পিঠে তুলে নিয়েছিল। ডাকাতির বড় কথা - বর্ষাকালে লোভ করতে নেই। বর্ষাকালে সব দেখে শুনে টেকে রাখতে হয়। ফাল্গুন হল গিয়ে ডাকাতের সুবর্ণ সময়। ধান কাটা সারা। যেদিন দিয়ে ইচ্ছে দৌড়োও । বর্ষাকালের মত পা পাঁকে গেঁথে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার বিপদ নেই তখন।
পুলিশ চৌকির হেড জমাদার তারাপদ মালাকারের বউ হোমোপ্যাথির লাইন থেকে ওদের দুজনকে দেখছিল। সন্ধে রাতে এই সন্তোষ টাকি একবার তাদের ঘরে পাঁচ পালি নতুন চাল দিয়ে এসেছিল। সেদিন ঘরে কিছু ছিল না। তারাপদর দাড়ি কামিয়ে দেয় ভদ্রেশ্বর ।, দীনু ডাক্তারের ঘর অবধি লাইন। আর কতক্ষণ দাঁড়াতে হবে বোঝা যাচ্ছে না। দীনুকে এখানকার পুরোনোরা বোকা বল ডাকে। ওরা তিন পুরুষের খ্রীষ্টান । ঘরের দেওয়ালে যীশুর ছবি। মাথার পেছনে নিজের মায়ের ছবি। রোগী পিছু এক টাকা নেয়। খাতায় নাম ঠিকানা- রোগের বিবরণ লেখা থাকে । রোগীরা নম্বর পায়। সেই নম্বর বললে- দীনু খাতা মিলিয়ে সব মনে করে ফেলে।
এক-এক রোগীকে সাতবার আসতে হয়। সাতবারে সাত টাকা । প্রতিবার রোগীর হাতে পুরিয়া তুলে দিতে দিতে দীনু ডাক্তার মাথায় ঠেকিয়ে তিনবার মা মা মা বলে । ওর আসল নাম বোকা। জিপিও-তে সর্টার ছিল। সেখানে থাকতেই হোমিপ্যাথির বই পড়তে শুরু করে। তারপর আস্তে আস্তে ডাক্তার। এখন বাড়িতেই সস্তার সময় আঙুর কিনে পচিয়ে ঘরোয়া ভাটিতে সুরা বানায়। রাতে একটি আস্ত দেশী মুরগীর রোস্ট খায়। পোলট্টির মুরগীর ফাইবার সেদ্ধ হতে চায় না। সমাজে ডাক্তারবাবু বলে পরিচিত। বড়দিনে ডাকঘরের পিওনরা ওর কাছে দশ টাকা করে বকশিস পায়।
মালাকার বউয়ের বয়সটা কম। বোকা ডাক্তার তার হাতখানা নিজের হাতে অনেকক্ষণ চেপে ধরে বলল, রক্তচাপ প্রবল। ডুমুর খাও । থোড় খাও ঘরে তখন আর কেউ নেই। বাকি রোগীরা ওষুধ নিয়ে একটা পনেরোর ট্টেনে কেটে গেছে। মালাকারের বউ উমা হাত ছাড়িয়ে নিল না। আস্তে বলল, একটা ব্যবস্থা কর ডাক্তার । পেটে যে এখন ছেলে এসে গেল।
বোকা ডাক্তার মাথা না তুলেই বলল, তার আমি কি করব?
বাঃ তোমার ছেলে না?
তারাপদ জানে?
সে জানে তার জিনিস। আনন্দে লাফাচ্ছে। তা হলে তো মিটেই গেল।
না, মিটবে নি । ছেলে করে গন্ধ করে দিলেভ এখন দায় চাপাচ্ছ জমাদারের ঘাড়ে? সে বেচারা দাইয়ের খরচ যোগাবে। আর মজা লুটবে তুমি। সে হতি দিচ্ছিনে- এবার বইয়ের ভাষায় বোকা ডাক্তার প্রমাদ শুনলো। চেঁচাচ্ছিস কেন? আমি কি বলিছি পয়সা দেব না? কথা বলতে বলতে দেখল - জানলার ওপাশেই টানা বারান্দায় বসে কে একটা লোক শিকে মাথা রেখে স্য কামানো গাল চুলকোচ্ছে
এই সময়টায় ডাক্তারখানায় কেউ থাকে না। কম্পউন্ডারও সওয়া একটার ট্টেন ধরে পরের স্টেশনে বাড়ি ফিরে যায়। কে ভেবেছিল, ্খন এখানে কেউ বসে থাকবে! লোকটা উঠে দাঁড়াতেই বোকা ডাক্তার চিনতে পারল, তুই? কবে ফিরলি? সন্তোষ টাকি সোজা দাঁড়িয়ে উঠেই বলল, তারাপদ জমাদারকে সব বলে দেব- জমাদার -বউ তক্ষুণি চড়াৎ করে কম্পাউন্ডারের গলিপথ দিয়ে সটকে গেল।
কি বলে দিবি?
এই আর কি! তেমন কিছু না।
তবু?
জমাদারের নামে পেটে বাচ্চা করে যাচ্ছ-
সব শুনেছিস?
নেই ! দু-টাকা নিয়ে যা-
ভাল করে খুঁজে দ্যাখো। অনেক তো ভিজিট পেলে । দাও না দশটা টাকা।
নিয়ে যা। কিন্তু একটা কথা শোন -
সন্ধের দিকে শুনতে আসব ডাক্তারবাবু।
পাটের গোছা মাথায় করে বদ্যিনাথের গোলাম যাচ্ছিল তিনজন। এখন একটু দাম উঠেছে। সন্তোষ একগোছা পাট নামিয়ে রাখল। নামিয়ে মনে পড়ল কি কাজে আর লাগবে। ঘর নেই যে খুঁটির সঙ্গে পাকিয়ে দড়ি করে নেবে। বরং তুলসীর দোকানে গোছাটা ফেলে দিলে বিড়ি দেশলাই হয়ে যাবে। আজ রাতটা প¬্যাটফর্মে কাটিয়ে দিয়ে কাল ভোর ভোর গাঁয়ে ঢুকব। এর ভেতর এক সময় গিয়ে চৌকিতে জমাদার সাহেবের ওখানে দেখা দিয়ে আসতে হবে। থানা থেকে তাই ব্যবস্থা । রোজ একবার -
তারাপদ জমাদার তিনটে আধুলি পেয়েছিল, বউকে বলল, ছ-খানা টেংরি এনেছি। গুঁড়ো কয়লার আঁচে বসিয়ে দে। এই নে- এক আধুলির ঘি দিস। এখন তোর ভাল ভাল জিনিস খাওয়া দরকার। কি বলিস-
উমা বলল, গুঁড়ো মশলায় সোয়াদ দেয় না-
আমি থাকতে তো কি অভাব। এখুনি আনাচ্ছি।
বোকা ডাক্তারের বাক্যলাপ আরেকজন শুনেছিল। সে হল গিয়ে ভদ্রেশ্বর। বারান্দার ওপরে ছিল সন্তোষ টাকি। বারান্দার নীচে ছিল ভদ্রেশ্বর । সে তখন বাজার গোছাচ্ছিল। কুচো চিংড়ি, পচাধচা আলু, বাজার কুড়োনো ভূতিসুদ্ধ কুমড়ো। গোছাতে গোছাতে বোকা ডাক্তারের সব কথা কানে আসছিল।
নিচু হয়ে সব কথা শুনেই ভদ্রেশ্বর হামাগুেিড় দিয়ে রাস্তায় উঠে এসেছে। তারপর তড়িঘড়ি খালপাড়ের বাঁশবাগানে চলে যায়। সেখানে উবু হয়ে বসে নিজেকে বাগে আনার চেষ্টা করেছে খানিকক্ষণ । নিজেই একবার চেঁচিয়ে উঠেছিল ওরে বাবা গো! কি জানলাম গো! বলেই নিজের মুখ নিজের হাতে চেপে ধরেছিল। তারপর দৌড় দৌড়। সোজা ঘরে গিয়ে রান্না চাপাতে তাড়া দিল। তারপর কোনক্রমে নাকে মুখে গুঁজে নিয়ে একদম স্টেশনবাজারে। রেলগেট খোলা, এখন কোন ট্টেন নেই । গম -কলগুলো ভুট্টা ভাঙছে গোঁ গোঁ করে। ইঁটখোলার মেয়েরা কিনতে আসবে সন্ধে সন্ধে।
ভদ্রেশ্বর ঠিক করে উঠতে পারছিল, না কাকে চাপ দেবে? বোকা ডাক্তারকে? কিন্তু তার তো এখন ভাতঘুমের সময়। জাগিয়ে তুলে টাকা চাইলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তারাপদ জমাদারকে বলবে? বলে কত পয়সা পাবে? চাই কি পেটাতেও পারে। সে কি আর পয়সা দেবে! তাও এবার এই প্রথম পোয়াতি । হয়ত বিশ্বাসই যাবে না। চাই কি বউটা উল্টো কথা বলে বেদম ধোলাইয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।
কোন্দিকে যাবে? ঠিক করতে পারছিল না ভদ্্েরশ্বর । এমন সময় বদ্যিনাথের গোলার ছেঁচতলা থেকে সন্তোষ টাকি ডাকল।
তুমি এখানে এত বেলায়?
আমিও তো তাই ভাবছি। এই বাড়ি গেলি। এই ফিরে এলি। কারবার জোর চলছে। তাই না! বিকেলও কামাচ্ছে সবাই!
সন্তোষের মুখের ওপর ভদ্রেশ্বর কখনই কথা বলতে পারে না। হাজার হোক সন্তোষ ডাকাতি করে। সে নিজে থেকে মোটে একবার ওর সঙ্গী হয়েছিল। সেই ননীর বাড়ি ডাকাতিতে। জীবনে সে বেশির ভাগই চুরি করেছে।
দু-জনেরই একসঙ্গে মনে পড়ল- বোকা ডাক্তার তো এখন উঠবে না । সরকারী বউয়ের সঙ্গে খুব ভাল করে দরজা জানলা আটকে ঘুমাচ্ছে। উঠবে সেই চারটের। আবার ওষুধের লাইন। চলবে রাত আটটা অবদি। মাথা পিছু এক টাকা ভিজিট।
তখন- দু-জনই উসখুস করতে লাগল। ভদ্রেশ্বর জানে- সন্তোষ টাকি সব জানে সন্তোষ জানে না- ভদ্রেশ্বর সব জানে।
আজই বিকেল বিকেল পুলিশ চৌকিতে গিয়ে সন্তোষকে হাজিরা দিতে হবে। জমাদারের রিপোর্ট থানায় যাবে। এসব সময় নিয়ম - সোজা গিয়ে চৌকির বারান্দায় বসতে হয়। জমাদার সাহেবকে একটু খাতির দেখাতে হয়।
ভদ্রেশ্বর কথা বলতে বলতে হাঁটা ধরতেই সন্তোষ বলল, কোথায় চলেছিস। জিরিয়ে যা একটু।
নাঃ, তার উপায় নেই। জমাদার খবর পাঠিয়েছে সকালে- আমিও তো ওদিকে যাব। চল ঘুরে আসি।
ভদ্রেশ্বর মনে মনে বলল, তুমি আবার কেন? হাজিরা মারবে? সুলুক খুঁজবে? খবরটা ফাঁস করে কার ট্যাঁক ফাঁক করবে ? জমাদার? না, তা গিন্নির?
সন্তোষ মনে মনে একটা ছবি দেখছিল। একজোড়া মুলো নিয়ে তারাপদ জমাদারে দাওয়ায় গিয়ে হাজির হয়েছে । জমাদার তাকে একটা আদরেরর লাঠির বাড়ি মারল। গায়ে লাগল। তবু সন্তোষ হি হি করে হাসতে লাগল। এই -ই নিয়ম।
হাঁটতে হাঁটতে সন্তোষ বলল, খবর টাবর আন। কোথায় কি আছে দেখি।
খবর মানে - কোথায় কোন্ জিনিস সরাবার মত আছে। কে অসাবধানে সাইকেল বাইরে রেখে বাজার করতে ঢোকে। তার সাইকেলখানা রাতারাতি তিরিশ মাইল উজিয়ে গিয়ে বেছে দিয়ে আাসতে হবে। আউট লাইনে দাঁড়ানো ওয়াগনে চিনিবেস্তা থাকলে তো কথা নেই। মিষ্টির দোকানগুলো হাঁ করে আছে। একবার এনে ফেলতে পারলে নগদ নোট । একখানা পুরো গজ -বড় পাতিল। তখন চাইকি সে পয়সায় টান্টু হবে - সঙ্গে মুরগী মেরে মাংস।
খবরাখবর দিয়ে ভদ্রেশ্বরের দু-পয়সা উপরি হয়। খবর সে দিয়েও থাকে। নানান জায়গায় কামাতে গিয়ে সে নানান রকমের খবর পায়। খবরগুলো শুধু কুড়িয়ে আনা। ডাক্তারবাবুর দাড়ি কামাতে বসে সেদিন স্বর্ণকারদের পুকুরের মাছের খবর পেল। সে- রাতেই স্বয়ম্বর কাওরা টানা জালে পুকুর সাফ করে ভোর ভোর তার বাড়ি নগদ পঞ্চাশ টাকা পৌছে দিয়েছিল।
স্টেশনবাজার এলাকা দু-জনেরই খুব সুন্দর লাগছিল। বাতাসে অল্প শীতভ সারি সারি গুড়ের নাগরিতে মাছির ছররা। সন্তোষ পরিষ্কার বুঝল-বোকা ডাক্তারকে এবার ভালমত দোয়া যাবে। হাত ফুরোলেই হাজির হওয়া যাবে। উঃ কি আনন্দ! যাও আর টাকা চাও! কোন খাটাখাটনি নেই। না দিলে বলে দেব। মোচড়ালেই গাছ থেকে ফল পড়বে! টুপ টুপ করে।
বারোখানা গাল কামালে তবে তিনটে টাকা। ভদ্রেশ্বর মনে মনে ঠিক করে নিল- এবার থেকে কামানোর ঝামেলায় না গিয়ে একবেলার বাজার -হাটের টাকা বোকা ডাক্তারের কাছ থেকে নিতে হবে। আর ঘরবাড়ির ওষুধ-বিষুধ- সে তো আছেই। তখন দু-জনেরই একসঙ্গে মনে হল- রিকশা সাইকেলের প্যাক প্যাক কী সুন্দর আওয়াজ!
উমার দরজার আড়ালে বসে টেংরি চুষছিল। বাইরে দাওয়ায় বসে তারাপদ জমাদার গরম জুসে সবে চুমুক দিয়েছে, ্এমন সময় দুজনে হাজির। চুমুক দিতে দিতেই ভদ্রেশ্বরের দিকে বাঁ পাখানা মেলে দিল তারাপদ।
ভদ্রেশ্বর পায়ের বড়ো আঙুলের নখ গোল করে কাটতে লাগল।
কাটতে কাটতেই বলতে লাগল, ঘরের মাগ থাকবে আড়ালে আবডালে । মাথায় তুলেছে কি-
কেন? তোর বউ কোথায় গেল?
ভেতরে উমার দাঁতে হাড়ের কুচি আটকে যাচ্ছিল। সে অবস্থাতেই বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, হাতের নখগুলো কেটে দাও তো। সারা পাড়া কামিয়ে বেড়ালে বউ থাকে ঘরে!
ও কথা বোলো না গো। অভাবের সংসার । তবু যতেœ রাখি।
ভদ্্েরশ্বর ততক্ষণে তারপদর পা ছেড়ে উমার হাত ধরেছে। বেশ নরম-সরম। এমন মেয়ে বেপথে গেল কি করে! বোকা ডাক্তারই বা অত ভিড়ভাট্টায় আড়াল আবডার পায় কোত্থেকে? বোঝা মুশকিল। দাঁড়াও । পাই তোমার একা। তখন গুমোর থাকে কোথায় দেখব। মুখে বলল, প্রথম পোয়াতি । সাবধানে থাকতে হয়।
মুখ-ঝামটা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল উমা। ঘুরে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে দুপুরের দিকের সেই টেকোটা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। দুই ভ্রƒর মাঝে কাটা দাগ। দাড়ি গোঁফ একদম নিকিয়ে কামানো। একেবারে ছোবড়া ছড়ানো নারকোল। এই লোকটাই তো- কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকেই উমা দেখল, তারাপদ জমাদার বলছে, রোজ এক জোড়া ডাব দরকার যে! লোকটা ঝুঁকে গিয়ে বলল, কর্কচি ডাব তো। এ সময় ও ডাবে শরীরে কাজ দেয়- উমা আরও কেঁপে গেল। দেশসুদ্ধ লোক জানে তাহলে - সে ছেলের মা হতে যাচ্ছে! এতটা চাউর হল কি করে। তারপদর উপর তার খুব ভরসা। হাফপ্যান্টের বাইরে মানুষটার পায়ের থোড়া পাথর হয়ে থাকে সব সময়। বসে থাকা অবস্থাতেই আচমকা লাঠি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিড় ভেঙে দেয়। এর আগে তারাপদ জমাদারের সঙ্গে সে তিন থানা ঘুরে তবে এখানে এসেছে। তারাপদর উপর তার খুব ভরসা। লোকটা করিৎকর্মা।
স্বামী জিনিসটা তো এ জন্যেই।
সন্তোষ টাকি তারাপদ জমাদারের হাতের একখানা আদরের থাপ্পা খেল। সব দিক নজর আছে তো তোর!
তার রাখি স্যার। আপনি এবারে বাবা হবেন- বলে মনে মনে সন্তোষ অষ্ক কষে দেখল, হারামজাদা তার চেয়ে কম করেও আট ন বছরের ছোট। পহলা বারের বাবা তাও ধোকা । জেলে থাকতে শেখা- স্যার স্যার ভাবটা মুখে চোখে বজায় রাখতে রাখতে সন্তোষ দেখল, মেয়েছেলেটার হাতে সোনার মোটা বালা। ভাল করে মোচড়ালে চাই কি একখানাও যদি হাতে আসে- তাহলে না হোক এক ভরির আন্দাজ সোনা তো হবে। দু-জনের কেউই সুবিধে করতে পারল না । তারাপদর হাতের থাপ্পা বেশ ভারি। ভদ্রেশ্বর ভেবে দেখল- তারাপদকে বলে দিলে খানিক মারধোর জুটবে শুধু কপালে। বরং মেয়েছেলেটাকে একা পেলে সুবিধে করা যেতে পারে। এর বেশি আর কিছু না।
ওরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে রেল স্টেশনে এল। সন্তোষ বলল, এক কাঁদি কচি ডাব জোগাড় কর তো-
সে এখন কোথায় পাব?
কর না জোগাড় । কারও গাছ থেকে। তোকে একটা বড় খবর দেব।
সে খবর আমার জানা-
কেমন ?
বোকা ডাক্তার পেটে ছেলে করে গন্ধ কররে দিল তো-
সন্তোষ দাঁড়িয়ে গেল। উরি বজ্জাত ! তুমিও কান পেতে ছিলে?
তারপর দু-জনই একসঙ্গে হাসতে হাসতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। চারটে বত্রিশের লোকাল আওয়াজ করে এসে সে হাসি চাপা দিয়ে দিল। ওঠাউঠির ভিড়ে এক ডাবওয়ালার কচি এক কাঁদি ভদ্রেশ্বর নিমেষে হাবিশ করে দিল।
বদ্যিনাথ, দেবেন- দু-জনেরই ধারের গোলায় একটু একটু করে ধানের দর চড়ছে। জবেদ আলির মাছের খোটিতে ফাগুনের বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে চিংড়ি আসতে শুরু হয়েছে।
চন্দনেশ্বরের গোহাটায় এবার হেলে বরদও আসছে ভাল ভাল।
বোকা ডাক্তারের চেম্বারে ধূপধুনোর ভেতর দেয়ালে দেয়ালে হ্যানিমান, যীশু, নেতাজী, নিজের মায়ের ছবি।
বোকা ফাকে বোঝাচ্ছিল, প্রথমে হল গিয়ে মহাভারত। তারপর হোমোপ্যাথি। রামায়ণ। শেষমেষ ওই হল গিয়ে অ্যালোপ্যাথি । তা যার যা ভাল আমি নিয়ে থাকি।
ফোঁড়াফুঁড়ি ইঞ্জেকশনও দিয়ে থাকি। গরুর অ্যানিমিয়ার চিকিৎসাও কি বেলারমেল ইঞ্জেকশন দিয়ে করিনি?
লো ভোল্টেজের নিভু নিভু ইলেকট্টিকের আলো। তাতে ধূপের ধোঁয়া। দেওয়ালে ওনারা। তার ভেতর বসে বোকা ডাক্তার। নিজের মহিমার কথা বলছিল। অবসর পেলেই বোকা কিছুকাল ধরে এরকম নিজের কথা বলছে। বলে আর থামে। আবার বলে। এরকম মহিমা কীর্তনের মাঝে ওরা দুজনে এসে ঘরে ঢুকলো। বোকা সঙ্গে সঙ্গে কীর্তন বন্ধ করে বলর, কি ব্যাপার?
সন্তোষ টাকি কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলল, ডাক্তারবাবু, ভদ্রার পেটটা দ্যাগো তো। ফেঁপে আছে সারাদিন।
ভদ্রেশ্বর হাফ শার্ট তুলে ধরে বলর, সত্যি দ্যাগো তো।
ঘর ভর্তি লোকজন। কম্পাউণ্ডার দাঁড়ানো। হাত কাঁপছিল। তবু সেই হাত বোকা ডাক্তার ভদ্রেশ্বর নাইকুণ্ডুলিতে রাখল। হুঁ খুব গরম দেখছি। কি খেয়েছিলি দুপুরে? গুরূপাক জিনিস-
সন্তোষ হাসতে হাসতে বলর, একদম হজম হয়নি। হাঁসফাঁস করছে ডাক্তার- সন্তোষ টাকি আর ভদ্রেশ্বরের চোখ চকচক করছে দেখে বোকা ডাক্তার ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল। এবার যেন কম্প দিয়ে জ্বর আসবে, এমন কাঁপনি।
সন্তোষ তখনও বলে যাচ্ছিল, ও কি হজম হওয়ার জিনিস! ও কি চাপা থাকে? বোকা ডাক্তার সাততাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। চল চল পাশের ঘরে শুয়ে পড়। পেটটা বুকটা ভাল করে দেখল। গাদ মেশানো তাড়ি গিলবি! তা অমন হবে না?
ভদ্রেশ্বর, সন্তোষ টাকি- কেউই নড়ে না। ভদ্রেশ্বর বলল, এখানেই দ্যাগো না কেন। সবাই আছেন। পেটটা ফাঁপলো কেন শুধু । কি এমন গুরুতর জিনিস খেয়ে এ অবস্থা। চল না শুয়ে পড়বি । তারপর তো দেখব।
সন্তোষ টাকি হাসতে হাসতে বলল, ও ডাক্তার, আমারও যে পেট ফেঁপে আছে দুপুরে থে-
বোকার চেম্বারের পাশেই কম্পাউন্ডারের কাঠের ফোকর কাটা খুপরি। তার লাগোয়া ফিমেল কেস দেখার ঘর। সেখানে চাটাই পাতা চৌকি । দেওয়ালে থার্মোমিটার ঝুলছিল। পেছনদিকে একটা খিকড়কির দরজা । এর পাশেই বোকা ডাক্তারের পুকুর। হাঁস রাখার ঘর। হাঁসেরা সেখান থেকে প্যাঁক জুড়ে দিল।
তাই শুনে বোকার শীত আরও বেড়ে গেল। ঘরে ঢুকে খুট করে আলো জ্বেলে দরজা বন্ধ করতেই -দু-দুটো আস্ত রুগী সোজা দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে দুজনেরই চোখ বুজে এল। কোণাকুনি দেওয়ালে দুজনেরই উল্টা ছায়া কুঁজো হয়ে পাশে মোটা হয়ে গেল। কারণ তখন দুজনই প্রায় একসঙ্গে পেটে হাত দিয়ে ভাঁজ হয়ে ঝুঁকে আরও খ্যা খ্যা করছিল। সন্তোষ টাকির তো হাসি থামেই না। বুজে আসা। ডান চোখের কোণে এক ফোঁটা জল এসে দাঁড়াল তার।
দুজনের মাঝখানে বোকা ডাক্তার দাঁড়িয়ে । পায়ে পাম্পসু। গায়ে ফুলহাতার শার্ট ওপরে খয়েরি কোর্ট। দু -কানের ভাঁজে কালো রঙের কিছু লম্বা লম্বা চুল। ভারী চিবুক। ধুতির কোঁচা মাটি থেকে অনেকটা ওপরে ঝুলে আছে। গালে গালে আরামের মাংস। নিজের নিজের পাতনে চোলাই হওয়া পাকা আঙুরের সুরাপানে ডাক্তারের দুই গালে দুটি লার ছোপ। স্বাস্থ্যের সেই লক্ষণ এখন লজ্জা, ভয়ে, শীত বন্ধ ঘরের ভেতরে বোজার গলা অবদি ছড়িয়ে পড়েছে। বোকা এখন ভালো বাংলাং একদম ‘কিংকতব্যবিমূঢ়’।
রুগীর পেট ফেঁপেছে। কিন্তু রুগী শোয় না। অথচ পেটা টিপে দেখা দরকার । লিভার কোন্ স্টেশনে এখন না জানলে কি করবে?
নে শুয়ে পড়।
গুচ্ছি গুচ্ছি ডাক্তার। উরিঃ বাস্! এই শিয়রের একটা বালিশ পর্যন্ত নেই। বলতে বলতে ভদ্রেশ্বরের চোখ আবার বুজে এল। এখন আনন্দে, হাসিতে তারও চোখে জল। কতকাল পরে একটা ভাল ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। বাইরের স্টেশনবাজার থেকে একদম আলাদা- চাদ্দিক থেকে বন্ধ এ ঘর এখন শুধু আনন্দের। ভদ্রা হঠাৎ তিড়িং দিয়ে লাফিয়ে উঠল- আর খেউরি করতে হবে না গো। আর হবে না গো। বলতে বলতে তার ডান হাতখানা নিজেরই বাঁ বগলে বাজাতে লাগল। আর কোন চিন্তে নাইগো!
সেই তড়িং যত বাড়ে সন্তোষ টাকির খ্যা -খ্যাও তত বাড়ে। আর ভাঁজ হয়ে ঝুঁকে পড়ে দেওয়ালে নিজের ছায়াকে কুঁজো -পাশে মোটা করে ফেরে। বোকা ডাক্তারের ছায়াটাই শুধু সিধে । কোন নড়নচড়ন নেই।
বাইরে অন্য রুগীরা বসে । কিরীটী বাউরির বউয়ের একটা ডেলিভারি কেস আসার কথা। সবাই তাকিয়ে আছে এ -ঘরের দিকে। মাখখানে একটা শুধু বন্ধ দরজা। সন্তোষ ঢিমেতালে গেয়ে উঠল। বোকার এবার খোকা হবে। হবে-এ-এ চৌদ্দিক বন্ধ বলে ঢিমে গানটুকু ঘরের ভেতর গুমগুম করে উঠলো। স্টেথিসকোপ ফাঁস হয়ে গলা থেকে ঝুলছে সেই থেকে। বোকার নিজেকে গলায় দড়ির কেস লাগতে লাগল। কি চাস তোরা?
হবে। হবে। বলতে বলতে সন্তোষ ঘরের চাদ্দিক নিচু হয়ে খুঁখতে লাগল। আসলে যে এ একটা খোঁজার ভান তা যে কেউ দেখেই বলতে পারত। আচমকা খিড়কির শেকলটা আরও জোর করে চেপে দিয়ে বলল, এ পথ দিয়েই আসত। এ পথ দিয়েই পার করে দিতে? বাঃ! কী বুদ্ধি! হাজার হোক ডাক্তার তো। কি বলিস ভদ্রা?
একশো বার। উরিঃ সন্তোষদারে -আমার যে পেট ফেঁপে উঠল! আর হাসাস নে। না ওগরালে তো পেট ফেটে যাবে। মরে ঘামের ফোঁটাগুলো কাচিয়ে মুছে নিল বোকা ডাক্তার । কি হলে হবে তোদের-
হবে না । দাঁড়াও ডাক্তার ।
তোদের পায়ে পড়ি। আর দাঁড়াতে পারছিনে আমি। বলতে বলতে ডাক্তার চৌকি ধরে বসতে যাচ্ছিল।
সন্তোষ বোকার কোমর ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, উঁহু এখন কি? আগে বাইরে গিয়ে সুখবরটা দি। তোমার গিন্নি চাই কি খুশী হয়ে-
বসতে গিয়ে বোকার ধুতির কোচায় মেঝের ধুলো লেগে গিয়েছিল। নিভু ডুমের আলোয় মাথা নিচু করে ছোট খোকাটির পারা বোকা ধুলো ঝাড়ছিল। এ কথায় কোঁচা ছেড়ে দিয়ে বোকা চোখ বড় বড় করে তাকাল। কোঁচা বোধহয় খানিকটা খুলে গিয়ে থাকবে। তাই লোটানো ধুতির খুঁট আবার ধুলোয়া মাখামাখি।
ওরে বাপ আমার, ওকাজ করিস নে। আমার বড় জামাই এখন এখানে।
তবে তো খুব ভাল সময় । ভদ্রেশ্বর হাসতে হাসতে কাছে এগিয়ে এল। নাকের কাছে নাক নিয়ে বোকার চোখের মণিতে দুই মণি দিয়ে তাকাল । তারপর সেখান থেকে মাথা দুলিয়ে পিছিয়ে এসেই ভাঙা গলায় গেয়ে দিল- বোকার এবার খোকা হবে- সঙ্গে সঙ্গে দু-হাতেত তালি দিয়ে উঠল সন্তোষ টাকি। একদম মহাষ্টমীর বলির বাজনার তাল। থামতেই চায় না।
সন্তোষ টাকির হাতের এক একটা তীল গদাম গদাম বুকে এসে পড়তে লাগল। এক একটা বুকে পড়ে আর বোকা ডাক্তারের মাথার পেছনে লিক করে বাতাস বেরোতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে বুকটা ধড়াস করে ওঠ।
নিভ আলোয় নিকোনো গালের সন্তোষ টাকি তখনও লাফাচ্ছিল। এক সময় ভোল্টেজ বেড়ে গিয়ে আলোটা দপ করে জেগে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বোকা ডাক্তার ধপ করে চৌকিতে বসে পড়ল। কি চাই তোদের কুলে বল আমায়। এবারকার মত বাঁচা । আর পারছিনে ভদ্রা- এই দ্যাখ আমার বুকটা শুধু লাফাচ্ছে
সন্তোষ বলল, এখন তো নাফাবেই। পরে আরও নাফাবে দেখো।
বোকা পরিষ্কার দেখল- তার সামনের দেওয়াল শুধু দুটি লোক দিয়ে তৈরি । সেই দেওয়ালের আধখানা সন্তোষ টাকি। বাকি আধখানা ভদ্রেশ্বর । যে এতদিন তার পায়ের নখ গোল করে কেটে দিত। একবার ওর বাপের চিকিৎসা করায় টানা তিনমাস দাড়ি কামিয়ে ভিজিট, ওষুধের পাওনাগণ্ডা শোধ করে। সে কি না এখন-
সন্তোষ টাকি খোঁচা দিল ভদ্রেশ্বরকে । দ্যাখ দ্যাখ, এখন কেমন খোকা করে ফোঁপাচ্ছে।
অ্যাই দ্যাখো। আবার কাঁদে । হচ্ছে কি?
আমায় ছেড়ে দে তোরা। এই বাহাত্তরটা টাকা আছে। নে তোরা। আমায় ছেড়ে দে আমার একটা মান আছে । আমি ডাক্তার।
সে তো জানি । আমার বাপকে চিকিৎসে করলে। তার বদলি তিনমাস ভোর দাড়ি কামালাম। সারা বাড়ির নখ কাটালাম। বগল কামালাম। তুমি ডাক্তার । এ আর বড় কথা কি? কি বল সন্তোষদা!
সন্তোষ টাকি মজা করে বলল, তা একটা কথার মত কথা তো। মানী লোকের মান আছে না। বাহাত্তর টাকার গোছাটা ফতুয়ার ভেতর পকেটে রেখে দিয়ে বলল, হাতের আংটিগুলো দাও তো-
এ তো গ্রহশান্তির -
কথা শেষ হল না বোকা ডাক্তারের।
ওগো দরজা খোলো গো। সঙ্গে দরজায় দমাদ্দম ধাক্কা। না খুললে ভেঙে ফেলবো। সন্তোষ গিয়ে একলাফে বোকা ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল। ধাক্তাতে বারণ কর। আমার আবার ধাক্কাধাক্কিা একদম পছন্দ হয় না।
ভদ্রেশ্বর এগিয়ে এসে বলল, বোকার সরকারী বউটা তো বড্ড চেঁচায়। থামতে বল-
ডাক্তারের কপাল, নাকেল ডগা ঘামে ভিজে উঠেছে। কোঁচার ফুলকা ঝুল মেঝের ধুলোয়া মাখামাখি । চৌকিতে নিজের শরীরটা যাতে একদম পড়ে না যায় সেজন্যে বসে পড়ে দু-খানা হাত পেছনে ফেলে ভর রেখে হেলে আছে। সেই অবস্থায় বলল, কিছু মাথায় আসছে না, কি করবে বল? তোর পায়ে ধরছি ভদ্রা, বলে দে ভদ্রা-
সন্তোষ টাকি দরজা ধাক্কানোর শব্দের ভেতরেই বোকা ডাক্তারের আঙুল থেকে টুক টুক করে আংটিগুলো খুলে নিচ্ছিল।
আঁতকে উঠে বোকা একবার শুধু বলতে পেল, ওটা নিসনে সন্তোষ। ওটা পুরো এক ভরির-
ধমকে উঠর ভদ্রেশ্বর। দরজা খুলে মাকে গিয়ে বলব? বোকা আবার বাবা হবে।
ক্যাঁথা সেলাই করেছো?
সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের গেঞ্জির নীচের বুকখানায় ভিজে ন্যাকড়া কে মেলে দিল। সেই শীতের ছ্যাঁকায় চড়াৎ করে উঠে দাঁড়াল বোকা । কী বলব বলে দে না বাবা? তোরাই আমার সব। বলে দে লক্ষ্মীটি।
তাড়াতাড়ি বল ভাই । আমি আর পারছি নে সন্তোষ। বলতে বলতে ধুলোভর্তি মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ডাক্তার জোড়হাতে সন্তোষের দিকে তাকিয়ে । হাঁটুর নীচে কাঁকর পড়ে বেদম চিনচিন করে উঠল। সে অবস্থাতেই বোকা আবার বলল, আমায় একটা পথ দেখা ভদ্রা-আমি কিছু দেখতে পাচ্ছিনে-
ঘরের ডুম আবার নিভু হয়ে এল। দরজায় ধাক্কাটাও বেড়ে গেল। তারই ভেতরে সন্তোষ একই রকমের খ্যা খ্যা হাসিত নিজে নিজে ঝুঁকে পড়ল। চোখ বুজে এল। সেই ভঙ্গিতেই বলে উঠল, উরিঃ ব্যস্ ! ভদ্রা রে! আর পারছিনে, অন্ধকে পথ দেখা মাইরি- ভদ্রেশ্বর ধমকে উঠল। এই আমি শুয়ে পড়লাম। যাও। দরজা খুলে বল রুগী দেখছি।
সত্যি সত্যিই ভদ্রেশ্বর চৌকিতে শুয়ে পড়ল। শুতে শুতেই বলল- যাও না দরজা খোলা গে। ভয় নেই কোনও। সন্তোষদা- পকেটগুলো হাতড়ে দেখে নাও একবারটি- সন্তোষ টাকি পকেটে হাতড়ে একখানা দশ টাকার নোট পেল আরও । পেয়েই লাফিয়ে উঠল, ঠিক বলেছিস তো ভদ্র!
ভ্যাবাচ্যাকা বোকা ডাক্তার বলল, দরজা খুলে কি বলব, দাও তোমরা। তোমাদের পায়ে পড়ি বলো-
বোকাকে সন্তোষ ঘুরিয়ে দরজামুখো করে দিল। বলবে, পেট ফেঁপেছে। ডাক্তার না তুমি! যা ইচ্ছে বলে দাও না। তারপর সেই খ্যা খ্যা হাসি দিয়ে বলল, বলগে-গুরুতর জিনিস হজম হয়নি। ওগরাতে না পেরে ব্যথায় টাটাচ্ছে-
বোকা দরজার দিকে এগোতেই চৌকিতে চিৎপটাং ভদ্রেশ্বর সত্যি টাঁটাতে লাগল, ও মাগো -গেলাম গো -

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন